📄 উপসংহার
উপসংহারে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলব যে, সাহাবীগণ হলেন আল্লাহর সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথী এবং নবী ও রাসূলগণের পরে আল্লাহর সবচেয়ে পছন্দনীয় ও প্রিয় মানুষ। আর ঈমানের দিক থেকে তারা হলেন অগ্রগামী পূর্বপুরুষ এবং রাহমানের সন্তুষ্টি অর্জনকারী ব্যক্তিবর্গ। তাদেরকে মহব্বত করাটা আনুগত্য ও ঈমান এবং তাদেরকে ঘৃণা করাটা নিফাকী ও সীমালংঘন। তারা হলেন এ উম্মতের মধ্যে মনের দিক থেকে সবচেয়ে সুহৃদ ও সৎ মানসিকতাসম্পন্ন, ঈমানের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী, জ্ঞানের দিক থেকে সবচেয়ে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন, সবচেয়ে কম আনুষ্ঠানিকতা প্রিয়, (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের) সাহচর্য ও সহযোগিতার দিক থেকে তারা অনেক দূর এগিয়ে এবং তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রত্যয়ন ও প্রশংসার দ্বারা তাঁর মহান মর্যাদায় উপনীত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে, পুরস্কারের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি এবং পরিমাপকের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হলেন সিদ্দীকে আকবর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, তারপর হলেন 'ফারুক' নামে প্রসিদ্ধ উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু; আর এ ব্যাপারে সাহাবী ও তাবে'ঈন মুমিনগণের পক্ষ থেকে 'ইজমা' সংঘটিত হয়েছে। অতঃপর যুন-নূরাইন উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, তারপর আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, যিনি বালকদের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম ঈমান গ্রহণ করেছেন। আর তারা হলেন খোলাফায়ে রাশেদীনের চারজন এবং সুপথপ্রাপ্ত ইমাম। আর তাদের পরবর্তী পর্যায়ের হলেন 'আশারায়ে মুবাশশিরীনের (জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জনের) অবশিষ্ট ছয়জন। আর তাদের পেছনে রয়েছেন পুণ্যবান মুহাজিরগণের একেবারে প্রথম ধাপের অগ্রগামী দল। তারপর আছেন প্রথম শ্রেণির আনসারগণ। তার পরবর্তী স্তরে রয়েছেন বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, অতঃপর উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, তার পরবর্তী স্তরে রয়েছেন বাই'আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারীগণ। তাদের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে রহমত ও সন্তুষ্টি বর্ষিত হউক।
আর যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করবে এবং তাদের জন্য রহমতের দো‘আ করবে, সে ব্যক্তি নিফাকী থেকে মুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা বিশ্বাস করি যে, তাদের মাঝে যা কিছু সংঘটিত হয়েছে, তারা তাতে ব্যাখ্যা দানকারী হিসেবে প্রতিদান পাবে। কারণ, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের প্রতি ক্ষমা ও সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা রয়েছে এবং তারা হলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী, যার ব্যাপারে অন্য কোনো বর্ণনা দ্বারা সন্দেহ পোষণ করা বৈধ হবে না। সুতরাং তাদের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ বা অনাকাঙ্খিত বিষয়ে আলোচনা ও সমালোচনা থেকে বিরত থাকা এবং এ বিষয়টিকে তাদের ব্যাখ্যা ও গবেষণার দিকে ফিরিয়ে দেওয়াটা ওয়াজিব বা আবশ্যক। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُم مَّا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْـَٔلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾ [البقرة: ١٣٤]
“সে সম্প্রদায় অতীত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে, তা তাদের। আর তোমরা যা অর্জন করেছ, তা তোমাদের। আর তারা যা করত, সে সম্পর্কে তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩৪]
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إذا ذكر أصحابي فامسكوا».
“যখন আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে আলোচনা হবে তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাক।”
সুতরাং আবশ্যক হলো এ বিষয়ে নিরবতা পালন করা এবং তাদের কোনো একজনকে সম্মানহানী হতে পারে এমন কোনো বিষয় থেকে দূরে থাকা। কারণ, তাদের কোনো একজনের মর্যাদাহানি করার মধ্যে সকল সাহাবীর মর্যাদাহানি করার বিষয়টি আবশ্যক হয়ে পড়ে। যখন তাদের কোনো একজনকে অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সকলেই অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে পড়ে। কারণ, যদি বলা হয় যে তাদের মধ্য থেকে কোনো একজন সাহাবী ভালো নন, তখন যে কেউ বলতে পারে যে, তাদের মধ্য থেকে কোনো একজনও ভালো নন।
আর আবশ্যক হলো তাদেরকে ভালোবাসা, তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা, তাদের জন্য রহমতের দু‘আ করা এবং তাদের গুণাবলী আলোচনা করা। সুতরাং শুধু তাদের ভালো ও সুন্দর বিষয়গুলোই আলোচনা করা যাবে, আর যে ব্যক্তি তাদের মন্দ সমালোচনা করবে, সে পথভ্রষ্ট বলে গণ্য হবে এবং কঠিন শাস্তির মুখোমুখী হবে।
পরিশেষে আমাদের আবেদন আল-কুরআনের শিখানো ভাষায়:
﴿ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ ءَامَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴾ [الحشر: ١٠]
“হে আমাদের রব! আমাদেরকে ও ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ঐ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত করুন, যে ব্যক্তি আপনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে ভালোবাসে, তাদেরকে (অপবাদের অভিযোগ থেকে) রক্ষা করে, তাদের প্রশংসা ও গুণগান করে এবং তাদের জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করে।
وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله و صحبه وسلم.
সমাপ্ত
📄 গ্রন্থপঞ্জি
০. আল-কুরআনুল কারীম
১. আল-বুখারী, আল-জামে আস-সহীহ
২. মুসলিম ইবন হাজ্জাজ, আস-সহীহ
৩. আবু দাউদ, আস-সুনান
৪. আন-নাসায়ী, আস-সুনান
৫. ইমাম তিরমিযী, আস-সুনান
৬. ইবন মাজাহ, আস-সুনান
৭. মুহাম্মদ ইবন আবদিল্লাহ আল-ওহাইবী
৮. ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ
৯. আখলাকু আহলিল কুরআন [আল-মাকতাবা আশ-শামেলা, দ্বিতীয় প্রকাশ]।
১০. আল-লালকায়ী, শরহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাত
১১. ইবনু রজব, জামে'উল 'উলুম ওয়াল হিকাম, দারুল ফুরকান, প্রথম সংস্করণ, ১৪১১ হি.
১২. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, শরহু লামিয়া ৮ম খণ্ড, (আল-মাকতাবা আশ-শামেলা, আল-ইসদার আস-সানী)
১৩. ইমাম আহমদ রহ, ফাযায়েলুস সাহাবা
১৪. ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, আস-সারেমুল মাসলুল, মুদ্রণ: দারুল কুতুব আল-'ইলমিয়াহ, সম্পাদনা: মুহাম্মদ মহিউদ্দীন আবদুল হামীদ।
১৫. ড. নূর উদ্দিন 'আতর, 'মানহাজুন নাকদ ফী 'উলুমিল হাদীস', দারুল ফিকর, প্রথম মুদ্রণ: ১৯৭২
১৬. ড. 'আজ্জাজ আল-খতীব, 'উসূলুল হাদীস', দারুল ফিকর, চতুর্থ সংস্করণ: ১৯৮১
১৭. সম্পাদনা পরিষদ, আল-মু'জাম আল-ওয়াসীত, হোসাইনিয়া কুতুবখানা, দেওবন্দ (তা.বি)
১৮. ড. আবু আমীনাহ বিলাল ফিলিপস, মাযহাব: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, সিয়ান পাবলিকেশন, প্রথম বংলা সংস্করণ: এপ্রিল ২০১৪
১৯. ইবনু হাজার 'আসকালানী, মা'আরেফাতুল খিসালিল মুকাফ্ফারা, সম্পাদনা: জাসিম আদ-দাওসারী, প্রথম মুদ্রণ: ১৪০৪ হি.
২০. ইবনুল কায়্যিম, আল-ফাওয়ায়েদ, আল-মাকতাবাতুল কায়্যিমা, প্রথম প্রকাশ, ১৪০৪ হি
২১. মুহাম্মদ ইবনুল 'আরাবী আত-তাবানী, ইত্তিহাফু যবিউন নাজাবা, দারুল আনসার
২২. বিবিধ গ্রন্থ, (আল-মাকতাবা আশ-শামেলা, দ্বিতীয় প্রকাশ)