📄 ষষ্ঠ অধ্যায়: সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের সম্মান ও মর্যাদা
সাহাবীগণ হলেন আল্লাহর তা'আলার নবী ও রাসূলগণের পরে দুনিয়ার সকল মানুষের মধ্য সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যদাবান মানুষ। আর ঈমানের দিক থেকে তারা হলেন নবী-রাসূলগণের পর অগ্রগামী পূর্বপুরুষ এবং দয়াময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকারী ব্যক্তিবর্গ। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ) [آل عمران: ١١٠]
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানব জাতির কল্যাণের জন্য যাদের আগমন হয়েছে।" [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০]
তিনি আরও বলেন;
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شهِيدًا ﴾ [البقرة: ١٤٣]
"আর এভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী (সর্বোত্তম) জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির ওপর স্বাক্ষী হও এবং রাসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হতে পারেন"। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৪৩]
এ আয়াত দু'টি সকল সাহাবীর মর্যাদার ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণাপত্র। কেননা, এ বক্তব্যের দ্বারা সরাসরি সম্বোধিত ব্যক্তিবর্গ হলেন সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু 'আনহুম। তাছাড়া আল্লাহ তা'আলা সাহাবীগণের উপমা পেশ করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জীলের মতো প্রসিদ্ধ আসমানী কিতাবে, যে কথা তিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন এভাবে:
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَبُهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَنَةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْهُ فَازَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ، يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا [الفتح: ٢٩]
"মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু' ও সাজদায় অবনত দেখবেন। তাদের লক্ষণ তাদের মুখমণ্ডল সাজদাহ'র প্রভাবে পরিস্ফুট। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইঞ্জীলে তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একটি চারাগাছ, যা থেকে নির্গত হয় কচিপাতা, তারপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯]
তাছাড়া আল-কুরআনের আরও কতগুলো আয়াত রয়েছে যেগুলোতে সাহাবীগণের প্রশংসা, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বিবরণ রয়েছে, রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি ক্ষমা ও সন্তুষ্টির সুস্পষ্ট ঘোষণা, যে আয়াতগুলো আমরা এ গ্রন্থের শুরুর দিকে বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ আলোচনা করেছি।
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তার সাহাবীগণের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে বলেছেন,
لَا تَسُبُّوا أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِي، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ لَوْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ».
"তোমরা আমার সাহাবীগণের কাউকে গালি দিবে না; কারণ, তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ স্বর্ণও দান করে, তবে সে তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেক পরিমাণ দানের সাওয়াবও অর্জন করতে পারবে না।"¹⁴³
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
«خير أمتي قرني ثم الذين يلونهم ثم الذين يلونهم. قال عمران: فلا أدري أذكر بعد قرنه قرنين أو ثلاثا».
"আমার যুগের উম্মত হলো আমার শ্রেষ্ঠ উম্মত, অতঃপর তাদের সাথে যারা সম্পৃক্ত হবে তারা শ্রেষ্ঠ, তারপর তাদের সাথে যারা সম্পৃক্ত হবে তারা শ্রেষ্ঠ। 'ইমরান বলেন: আমি জানি না, তিনি তাঁর যুগের পরে দু'টি যুগের কথা উল্লেখ করেছেন, নাকি তিনটি যুগের উল্লেখ করেছেন।"¹⁴⁴
আর সাহাবায়ে কেরামের সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য ছাড়াও বিশেষ ব্যক্তিবর্গের পক্ষ থেকে আরও অনেক বক্তব্য পাওয়া যায়, তন্মধ্যে কিছু বক্তব্য নিম্নরূপ:
১. আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহ 'আনহুমা বলেন,
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمُقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةٌ مَعَ النَّبِيِّ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْرٌ مِنْ عَمَلٍ أَحَدِكُمْ أربعين سنة».
"তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে গালি দিও না; কারণ, তাদের কোনো একজনের এক ঘন্টা সময় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অবস্থান করার মূল্যবান তোমাদের কোনো একজনের চল্লিশ বছরের আমলের চেয়ে অনেক বেশি উত্তম।"¹⁴⁵
২. আর ওকী' রহ.-এর অপর এক বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহ 'আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمُقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةً خَيْرٌ مِنْ عبادة أَحَدِكُمْ عُمْرَهُ ».
"তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে গালি দিও না; কারণ, তাদের কোনো একজনের এক ঘন্টা সময় (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে) অবস্থান করার মূল্যবান তোমাদের কোনো একজনের গোটা জীবনের ইবাদতের চেয়েও অনেক বেশি উত্তম।"¹⁴⁶
৩. মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
لا تسبوا أصحاب محمد إن الله قد أمر بالاستغفار لهم وقد علم أنهم سيقتتلون».
"তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহাবীগণকে গালি দিও না। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি জানেন যে, তারা অচিরেই নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে।"¹⁴⁷
৪. ইমাম আহমদ রহ. তার আকীদা প্রসঙ্গে বলেন, "সাহাবীগণের মধ্য থেকে একজন নগণ্য সাহাবীর মর্যাদা ঐ যুগের সকল ব্যক্তির চেয়েও শ্রেষ্ঠ, যারা তাকে দেখে নি, যদিও তারা তাদের সকল আমল নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে।"¹⁴⁸
৫. ইমাম নাওয়াওয়ী রহ. বলেন, "এক মুহূর্তের জন্য হলেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহচর্য পাওয়ার মর্যাদার সমতুল্য কোনো আমলই হতে পারে না; আর কোনো কিছুর বিনিময়ে তার সমমর্যাদা অর্জন করা সম্ভব নয়। আর ফযীলত বা মর্যাদার বিষয়টি কিয়াসের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় না। এটা হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, যা তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন।"¹⁴⁹
৬. আর আবু উমার ইবন আবদিল বার রহ 'আল-ইস্তি'য়াব' গ্রন্থে বলেন,
قد كفينا البحث عن أحوالهم، لإجماع أهل الحق من المسلمين، وهم أهل السنة والجماعة؛ على أنهم كلهم عدول».
"তারা সকলেই ন্যায়পরায়ণ -এ কথার ওপর মুসলিমগণের মধ্য থেকে হকপন্থীগণের ইজমা'র কারণে আমাদেরকে তাদের অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধানীয় আলোচনা-পর্যালোচনা করতে নিষেধ করা হয়েছে আর হকপন্থীগণ হলেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত।"¹⁵⁰
৭. মুহাম্মাদ ইবনুল ওযীর আল-ইয়ামানী সাহাবীগণের ন্যায়পরায়ণতার প্রশ্নে সংঘটিত 'ইজমা'-এর বর্ণনা নকল করেছেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের পক্ষ থেকে এবং শী'আয়ে যায়েদিয়া ও মু'তাযিলাদের পক্ষ থেকেও। আর অনুরূপ বক্তব্য আস-সানা'য়ানী রহ.-এরও।¹⁵¹
টিকাঃ
¹⁴³ সহীহ বুখারী, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: আমি যদি অন্তরঙ্গ বন্ধু গ্রহণকারী হতাম, হাদীস নং ৩৪৭০; মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত, পরিচ্ছেদ: সাহাবা রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমকে গালি দেওয়া হারাম, হাদীস নং ৬৬৫২
¹⁴⁴ সহীহ বুখারী, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের ফযীলত, হাদীস নং ৩৪৫০; মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত, পরিচ্ছেদ: সাহাবী, তৎপরবর্তী ও তৎপরবর্তীদের ফযীলত, হাদীস নং ৬৬৩৮
¹⁴⁵ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা, শরহু লামিয়া ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১ (মাকতাবা শামেলা, আল-ইসদার আস-সানী)
¹⁴⁶ ইমাম আহমদ, ফাযায়েলুস সাহাবা: ১/৫৭; ইবনু মাজাহ, ১/৩১ (আল-আ'যামী); ইবনু আবি 'আসেম, ২/৪৮৪; আল-বুসাইরী 'যাওয়ায়েদু ইবন মাজাহ' এর মধ্যে (১/২৪) খবরটিকে সহীহ বলেছেন; আল-মাতালেবুল 'আলীয়া, ৪/১৪৬
¹⁴⁷ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৭৪; আরও দেখুন: মিনহাজুস সুন্নাহ, ২/১৪; আছার, ইমাম আহমদ তা ফাযায়েল অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন, হাদীস নং ১৮৭, ১৭৪১; তার সনদকে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা, ইবন বাত্তার মিনহাজুস সুন্নাহতে হাদীসটি সংযোজন করেছেন: ২/২২
¹⁴⁸ আল-লালকায়ী, শরহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাত ১/১৬০
¹⁴⁹ নাওয়াওয়ীর ব্যাখ্যাসহ মুসলিম: ১৬/৯৩
¹⁵⁰ উদ্ধৃত: ড. নূর উদ্দিন 'আতর, 'মানহাজুন্ নাকদ ফী 'উলুমিল হাদীস', পৃষ্ঠা ১২২
¹⁵¹ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১২২
📄 উপসংহার
উপসংহারে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলব যে, সাহাবীগণ হলেন আল্লাহর সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথী এবং নবী ও রাসূলগণের পরে আল্লাহর সবচেয়ে পছন্দনীয় ও প্রিয় মানুষ। আর ঈমানের দিক থেকে তারা হলেন অগ্রগামী পূর্বপুরুষ এবং রাহমানের সন্তুষ্টি অর্জনকারী ব্যক্তিবর্গ। তাদেরকে মহব্বত করাটা আনুগত্য ও ঈমান এবং তাদেরকে ঘৃণা করাটা নিফাকী ও সীমালংঘন। তারা হলেন এ উম্মতের মধ্যে মনের দিক থেকে সবচেয়ে সুহৃদ ও সৎ মানসিকতাসম্পন্ন, ঈমানের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী, জ্ঞানের দিক থেকে সবচেয়ে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন, সবচেয়ে কম আনুষ্ঠানিকতা প্রিয়, (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের) সাহচর্য ও সহযোগিতার দিক থেকে তারা অনেক দূর এগিয়ে এবং তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রত্যয়ন ও প্রশংসার দ্বারা তাঁর মহান মর্যাদায় উপনীত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে, পুরস্কারের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি এবং পরিমাপকের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হলেন সিদ্দীকে আকবর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, তারপর হলেন 'ফারুক' নামে প্রসিদ্ধ উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু; আর এ ব্যাপারে সাহাবী ও তাবে'ঈন মুমিনগণের পক্ষ থেকে 'ইজমা' সংঘটিত হয়েছে। অতঃপর যুন-নূরাইন উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, তারপর আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, যিনি বালকদের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম ঈমান গ্রহণ করেছেন। আর তারা হলেন খোলাফায়ে রাশেদীনের চারজন এবং সুপথপ্রাপ্ত ইমাম। আর তাদের পরবর্তী পর্যায়ের হলেন 'আশারায়ে মুবাশশিরীনের (জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জনের) অবশিষ্ট ছয়জন। আর তাদের পেছনে রয়েছেন পুণ্যবান মুহাজিরগণের একেবারে প্রথম ধাপের অগ্রগামী দল। তারপর আছেন প্রথম শ্রেণির আনসারগণ। তার পরবর্তী স্তরে রয়েছেন বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, অতঃপর উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, তার পরবর্তী স্তরে রয়েছেন বাই'আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারীগণ। তাদের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে রহমত ও সন্তুষ্টি বর্ষিত হউক।
আর যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করবে এবং তাদের জন্য রহমতের দো‘আ করবে, সে ব্যক্তি নিফাকী থেকে মুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা বিশ্বাস করি যে, তাদের মাঝে যা কিছু সংঘটিত হয়েছে, তারা তাতে ব্যাখ্যা দানকারী হিসেবে প্রতিদান পাবে। কারণ, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের প্রতি ক্ষমা ও সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা রয়েছে এবং তারা হলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী, যার ব্যাপারে অন্য কোনো বর্ণনা দ্বারা সন্দেহ পোষণ করা বৈধ হবে না। সুতরাং তাদের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ বা অনাকাঙ্খিত বিষয়ে আলোচনা ও সমালোচনা থেকে বিরত থাকা এবং এ বিষয়টিকে তাদের ব্যাখ্যা ও গবেষণার দিকে ফিরিয়ে দেওয়াটা ওয়াজিব বা আবশ্যক। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُم مَّا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْـَٔلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾ [البقرة: ١٣٤]
“সে সম্প্রদায় অতীত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে, তা তাদের। আর তোমরা যা অর্জন করেছ, তা তোমাদের। আর তারা যা করত, সে সম্পর্কে তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩৪]
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إذا ذكر أصحابي فامسكوا».
“যখন আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে আলোচনা হবে তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাক।”
সুতরাং আবশ্যক হলো এ বিষয়ে নিরবতা পালন করা এবং তাদের কোনো একজনকে সম্মানহানী হতে পারে এমন কোনো বিষয় থেকে দূরে থাকা। কারণ, তাদের কোনো একজনের মর্যাদাহানি করার মধ্যে সকল সাহাবীর মর্যাদাহানি করার বিষয়টি আবশ্যক হয়ে পড়ে। যখন তাদের কোনো একজনকে অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সকলেই অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে পড়ে। কারণ, যদি বলা হয় যে তাদের মধ্য থেকে কোনো একজন সাহাবী ভালো নন, তখন যে কেউ বলতে পারে যে, তাদের মধ্য থেকে কোনো একজনও ভালো নন।
আর আবশ্যক হলো তাদেরকে ভালোবাসা, তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা, তাদের জন্য রহমতের দু‘আ করা এবং তাদের গুণাবলী আলোচনা করা। সুতরাং শুধু তাদের ভালো ও সুন্দর বিষয়গুলোই আলোচনা করা যাবে, আর যে ব্যক্তি তাদের মন্দ সমালোচনা করবে, সে পথভ্রষ্ট বলে গণ্য হবে এবং কঠিন শাস্তির মুখোমুখী হবে।
পরিশেষে আমাদের আবেদন আল-কুরআনের শিখানো ভাষায়:
﴿ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ ءَامَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴾ [الحشر: ١٠]
“হে আমাদের রব! আমাদেরকে ও ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ঐ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত করুন, যে ব্যক্তি আপনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে ভালোবাসে, তাদেরকে (অপবাদের অভিযোগ থেকে) রক্ষা করে, তাদের প্রশংসা ও গুণগান করে এবং তাদের জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করে।
وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله و صحبه وسلم.
সমাপ্ত
📄 গ্রন্থপঞ্জি
০. আল-কুরআনুল কারীম
১. আল-বুখারী, আল-জামে আস-সহীহ
২. মুসলিম ইবন হাজ্জাজ, আস-সহীহ
৩. আবু দাউদ, আস-সুনান
৪. আন-নাসায়ী, আস-সুনান
৫. ইমাম তিরমিযী, আস-সুনান
৬. ইবন মাজাহ, আস-সুনান
৭. মুহাম্মদ ইবন আবদিল্লাহ আল-ওহাইবী
৮. ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ
৯. আখলাকু আহলিল কুরআন [আল-মাকতাবা আশ-শামেলা, দ্বিতীয় প্রকাশ]।
১০. আল-লালকায়ী, শরহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাত
১১. ইবনু রজব, জামে'উল 'উলুম ওয়াল হিকাম, দারুল ফুরকান, প্রথম সংস্করণ, ১৪১১ হি.
১২. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, শরহু লামিয়া ৮ম খণ্ড, (আল-মাকতাবা আশ-শামেলা, আল-ইসদার আস-সানী)
১৩. ইমাম আহমদ রহ, ফাযায়েলুস সাহাবা
১৪. ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, আস-সারেমুল মাসলুল, মুদ্রণ: দারুল কুতুব আল-'ইলমিয়াহ, সম্পাদনা: মুহাম্মদ মহিউদ্দীন আবদুল হামীদ।
১৫. ড. নূর উদ্দিন 'আতর, 'মানহাজুন নাকদ ফী 'উলুমিল হাদীস', দারুল ফিকর, প্রথম মুদ্রণ: ১৯৭২
১৬. ড. 'আজ্জাজ আল-খতীব, 'উসূলুল হাদীস', দারুল ফিকর, চতুর্থ সংস্করণ: ১৯৮১
১৭. সম্পাদনা পরিষদ, আল-মু'জাম আল-ওয়াসীত, হোসাইনিয়া কুতুবখানা, দেওবন্দ (তা.বি)
১৮. ড. আবু আমীনাহ বিলাল ফিলিপস, মাযহাব: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, সিয়ান পাবলিকেশন, প্রথম বংলা সংস্করণ: এপ্রিল ২০১৪
১৯. ইবনু হাজার 'আসকালানী, মা'আরেফাতুল খিসালিল মুকাফ্ফারা, সম্পাদনা: জাসিম আদ-দাওসারী, প্রথম মুদ্রণ: ১৪০৪ হি.
২০. ইবনুল কায়্যিম, আল-ফাওয়ায়েদ, আল-মাকতাবাতুল কায়্যিমা, প্রথম প্রকাশ, ১৪০৪ হি
২১. মুহাম্মদ ইবনুল 'আরাবী আত-তাবানী, ইত্তিহাফু যবিউন নাজাবা, দারুল আনসার
২২. বিবিধ গ্রন্থ, (আল-মাকতাবা আশ-শামেলা, দ্বিতীয় প্রকাশ)