📄 চতুর্থ অধ্যায়: সাহাবীগণের মধ্যকার সংঘটিত ঘটনা নিয়ে সমালোচনা থেকে বিরত থাকা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إذا ذكر أصحابي فامسكوا، وإذا ذكر القدر فامسكوا، وإذا ذكر النجوم فامسكوا».
"যখন আমার সাহাবীগণকে নিয়ে সমালোচনা হবে, তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে। আর যখন তাকদীর নিয়ে আলোচনা হবে, তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে আর যখন তারকারাজি তথা জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা হবে, তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে।"¹⁰⁹
আর এ জন্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নীতি হলো সাহাবীগণের ভুল- ত্রুটি আলোচনা এবং তাদের বিচ্যুতি বা পদস্খলনের বিষয়ে সমালোচনা থেকে বিরত থাকা, আর তাদের মধ্যকার সংঘটিত বিতর্কের মধ্যে ডুবে না থাকা।
আবু না'য়ীম রহ, বলেন, "সুতরাং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের ভুল-ত্রুটি আলোচনা এবং তাদের বিচ্যুতি বা পদস্खলনের বিষয়ে সমালোচনা থেকে বিরত থাকা, তাদের ভালো ও সুন্দর দিকসমূহ এবং তাদের গুণাবলী ও কৃতিত্বসমূহ প্রকাশ করা, আর তাদের কর্মকাণ্ডসমূহকে অনিবার্য কারণের দিকে ফিরিয়ে দেওয়াটা তাদেরকে যথাযথ অনুসরণকারী মুমিনদের লক্ষণ, যাদের প্রশংসা করেছেন আল্লাহ তা'আলা তাঁর বাণীর মাধ্যমে:
وَالَّذِينَ جَاءُو مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ ءَامَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴾ [الحشر: ١٠]
“আর যারা তাদের পরে এসেছে, তারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে ও ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।’" [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]
তিনি নির্দেশিত হাদীসের ব্যাখ্যায় আরও বলেন: “তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের ভালো ও সুন্দর দিকসমূহ এবং তাদের মর্যাদা ও ফযীলতসমূহ আলোচনা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন নি। তাদেরকে শুধু তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং রাগজনিত উত্তেজনার সময় তাদের থেকে যেসব বাড়াবাড়ি হয়েছে, তার সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”¹¹⁰
হাদীসে নির্দেশিত বিরত থাকার মানে নির্দিষ্ট বিষয়ে বিরত থাকা, যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাদের মধ্যকার সংঘটিত যুদ্ধসমূহ ও মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে ডুবে না থাকা এবং বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা না করা আর এ বিষয়গুলো সাধারণ জনগণের মাঝে প্রকাশ না করা অথবা এক দলের দোষ ধরা এবং অপর দলের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করার মাধ্যমে তাদের পিছনে না লাগা।¹¹¹
আর আমাদেরকে পূর্বে যা অতিবাহিত হয়েছে, সে বিষয় আলোচনার নির্দেশ দেওয়া হয় নি; বরং আমাদেরকে শুধু নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে, তাদেরকে ভালোবাসতে এবং তাদের সৌন্দর্যপূর্ণ দিক ও মর্যাদাপূর্ণ বিষয়গুলো প্রকাশ করতে; কিন্তু যখন কোনো বিদ'আতপন্থী আত্মপ্রকাশ করে তাদের ব্যাপারে অপবাদ দেয়, তখন জরুরি ভিত্তিতে তাদেরকে সে অপবাদ থেকে রক্ষা করা এবং ইলম ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে এমন বিষয় আলোচনা করা, যা তার যুক্তিকে অসার করে দিবে তা বর্ণনা করা অপরিহার্য।¹¹²
আর এটি এমন একটি বিষয়, আমাদের সময়ে আমরা যার প্রয়োজন অনুভব করি, যেমন মুসলিম জাতিকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও মদরাসাসমূহে পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে এমন কতগুলো সিলেবাসের মাধ্যমে, যা তার সৃজনশীল ও শিক্ষা সম্পর্কিত কতৃপক্ষের চিন্তার ফসল। তারা সাহাবীগণের মাঝে সংঘটিত অনাকাঙ্খিত ঘটনার মাঝে ডুবে থাকে অন্যায়ভাবে, কোনো প্রকার আদব-কায়দার তোয়াক্কা না করেই, যা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।
অনুরূপভাবে আফসোসের বিষয় হলো, এ শত্রুতামূলক আচরণ কোনো কোনো ইসলামপন্থী ব্যক্তির মাঝে অনুপ্রবেশ করেছে, এমনকি তাদের কেউ কেউ সাহাবীগণের মধ্যে সংঘটিত বিশৃঙ্খলাকে কেন্দ্র করে বর্ণিত বর্ণনাসমূহ থেকে বাজে বর্ণনা কিংবা দামী কথা সংগ্রহ করে, অতঃপর সে বিশেষজ্ঞ ইমামদের কথা ও তাদের বিশ্লষণসমূহের কোনো প্রকার সঠিক দিকনির্দেশনা তোয়াক্কা না করেই সেগুলোর উপর ভিত্তি করে সাহাবীগণের ব্যাপারে হুকুম দেওয়া আরম্ভ করে দেয়, এ জন্যই আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি যে, আমরা এমন কিছু মূলনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করব, যেগুলো একজন গবেষকের জন্য জেনে নেওয়া উচিত হবে, যখন তিনি সাহাবীগণের মাঝে সংঘটিত বিষয় নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজন অনুভব করবেন।
টিকাঃ
¹⁰⁹ তাবারানী, আল-কবীর: ২/৭৮; আবু নাঈম, আল-হিলইয়া: ৪/১০৮; আর আল-ইমামা এর মধ্যে বর্ণিত আছে, ইবনু মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু-এর হাদীস থেকে এবং আলবানী কয়েকটি সনদের মাধ্যমে বর্ণনাটিকে শক্তিশালী করেছেন; আস-সিলসিলাতুস সহীহা: ১/৩৪
¹¹⁰ আল-ইমামা, পৃষ্ঠা ৩৪৭
¹¹¹ মুহাম্মদ ইবন সামেল আল-আলইয়ানী আস-সুলামী, মানহজু কিতাবাতিত্ তারিখিল ইসলামী: পৃষ্ঠা ২২৭, ২২৮
¹¹² মিনহাজুস সুন্নাহ: ৬/২৫৪, সম্পাদনা: ড. রাশাদ সালেম।
📄 পঞ্চম অধ্যায়: সাহাবীগণের ইতিহাস আলোচনার মূলনীতিমালা
প্রথমত: সাহাবীগণের মাঝে সংঘটিত বিষয় নিয়ে কথা বলাটাই আসল নয়; বরং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নিকট মৌলিক আকীদাগত বিষয় হলো সাহাবীগণের মাঝে (অনাকাঙ্খিতভাবে) সংঘটিত বিষয়ে আলোচনা ও সমালোচনা থেকে বিরত থাকা। আর এটাই আকীদা বিষয়ে লিখিত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সকল কিতাবে বিস্তৃত হয়ে আছে। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবন আহমদ ইবন হাম্বলের 'আস-সুন্নাহ', ইবন আবি 'আসেমের 'আস-সুন্নাহ', আস-সাবুনীর 'আকীদাতু আসহাবিল হাদীস', ইবনু বাত্তার 'আল-ইবানা', ত্বহাবীয়া ইত্যাদি।
আর এটা জোর দেয়, ঐ ব্যক্তির নিকট এ ধরনের বিষয় আলোচনা করা থেকে বিরত থাকার বিষয়টিকে, যার নিকট এমন আলোচনা করলে জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে আর এ ধরনের জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে তার স্মৃতিতে সাহাবীগণ, তাদের ফযীলত, মর্যাদা ও ন্যায়পরায়ণতার সম্পর্কে যে ধারণা রয়েছে, তার সাথে ঐসব বর্ণনার বিরোধের মাধ্যমে, তার বয়সের স্বল্পতার কারণে বিষয়টি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে না পারার কারণে অথবা দীনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার নতুনত্বের কারণে... সাহাবীগণের মাঝে যা সংঘটিত হয়েছে এবং এ ব্যাপারে তাদের ইজতিহাদী তথা গবেষণাগত মতবিরোধের বাস্তব অবস্থা অনুধাবন করতে না পারা। ফলে সে এমন ফিতনা বা বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত হবে যে, সে তার অজান্তেই সাহাবীগণের মর্যাদাহানি করে বসবে।
আর এটা হচ্ছে পূর্ববর্তী আলেমদের নিকট একটা স্বীকৃত শিক্ষানীতির ভিত্তি, আর তা হলো: জনগণের নিকট এমন কোনো জ্ঞানগত মাসআলা বা বিষয় পেশ না করা, যা তাদের আকল বা মেধা অনুধাবন করতে সক্ষম হয় না। ইমাম বুখারী রহ. তাঁর সহীহ গ্রন্থের মধ্যে এক অধ্যায় রচনা করেন এ শিরোনামে:¹¹³
باب من خص بالعلم قوما دون قوم كراهية أن لا يفهموا
[পরিচ্ছেদ: বুঝতে না পারার আশঙ্কায় ইলম শিক্ষায় কোনো এক কওম (গোত্র বা জাতি)-কে বাদ দিয়ে অন্য আরেক কওমকে বেছে নেওয়া।] আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন,
حدثوا الناس بما يعرفون, أتحبون أن يكذب الله تعالى ورسوله صلى الله عليه وسلم».
"তোমরা মানুষের কাছে সে ধরনের কথা বল, যা তারা বুঝতে পারে। তোমরা কি পছন্দ কর যে, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মিথ্যা আরোপ করা হোক?"¹¹⁴
আর হাফেয ইবন হাজার 'আসকালানী রহ. এর ব্যাখ্যায় 'ফাতহুল বারী' গ্রন্থে বলেন: "এর মধ্যে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সাধারণ জনগণের নিকট 'মুতাশাবেহ' বা অস্পষ্ট বিষয় আলোচনা করা উচিত নয়।”
অনুরূপ কথা বলেছেন 'আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু:
مَا أَنْتَ بِمُحَدِّثٍ قَوْمًا حَدِيثًا لَا تَبْلُغُهُ عُقُولُهُمْ إِلَّا كَانَ لِبَعْضِهِمْ فِتْنَةٌ.
"যখন তুমি কোনো সম্প্রদায়ের কাছে এমন কোনো হাদীস বর্ণনা করবে যা তাদের বোধগম্য নয়, তখন তা তাদের কারও কারও পক্ষে ফিতনা হয়ে দাঁড়াবে। "¹¹⁵
অনুরূপভাবে ইমাম আহমদ রহ., তিনিও অপছন্দ করতেন ঐসব হাদীস নিয়ে আলোচনা করা, যেগুলোর বাহ্যিক আবেদন হলো ক্ষমতাসীন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। ইমাম মালেক রহ. অপছন্দ করতেন সিফাত তথা গুণাবলীর হাদীসসমূহ নিয়ে বেশি আলোচনা করতে। ইমাম আবু ইউসূফ রহ. অপছন্দ করতেন দুর্বোধ্য অর্থসম্পন্ন হাদীসসমূহ নিয়ে আলোচনা করতে...শেষ পর্যন্ত তিনি বলেন: “আর এ (দুর্বোধ্য অর্থসম্পন্ন হাদীস) ব্যাপারে বিধিবদ্ধ নিয়ম হলো, হাদীসের বাহ্যিক দিকটি বিদ‘আতকে শক্তিশালী করবে এবং তার বাহ্যিক দিকটি মূলত উদ্দেশ্য নয়। সুতরাং যে ব্যক্তির ব্যাপারে তার বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের আশঙ্কা করা হবে তার নিকট এ ধরনের হাদীস আলোচনা করা থেকে বিরত থাকা। আর আল্লাহই সবচেয়ে বেশি ভালো জানেন।"¹¹⁶
দ্বিতীয়ত: যখন সাহাবীগণের মাঝে (অনাকাঙ্খিতভাবে) সংঘটিত বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিবে, তখন অবশ্যই সাহাবীগণের মাঝে সংঘটিত বিশৃঙ্খলাকে কেন্দ্র করে উল্লিখিত বর্ণনাসমূহের সত্য-মিথ্যা বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقُۢ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوْمًا بِجَهَٰلَةٍ فَتُصْبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَٰدِمِينَ ﴾ [الحجرات: ٦]
“হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখ এ আশঙ্কায় যে, অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়কে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হবে।” [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬]
এ আয়াত মুমিনদেরকে তাদের নিকট ফাসিকদের মাধ্যমে আসা সংবাদের ব্যাপারে সত্য-মিথ্যা বিচার-বিশ্লেষণ করার নির্দেশ দিচ্ছে, যাতে তার আবশ্যকীয়তা দ্বারা জনগণের ওপর এমন কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া না হয়, যার কারণে তারা লজ্জিত হবে। সুতরাং মুমিনদের নেতা সাহাবীগণের সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে, সে ব্যাপারে বিচার-বিশ্লেষণ করা ওয়াজিব বা আবশ্যক হওয়াটা অতি উত্তম ও যুক্তিসঙ্গত। বিশেষ করে আমরা জানি যে, এসব বর্ণনাগুলোর মধ্যে মিথ্যা ও বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, হয় মূল বর্ণনার দিক থেকে অথবা কম ও বেশি করার মাধ্যমে বিকৃত করা হয়েছে, ফলে বর্ণনাটি নিন্দা ও অপবাদের উৎপত্তিস্থলে পরিণত হয়। আর এ প্রসঙ্গে বর্ণিত বর্ণনাগুলোর অধিকাংশই সুস্পষ্ট অপবাদের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত প্রসিদ্ধ মিথ্যাবাদীগণ বর্ণনা করেছে। যেমন, আবু মিখনাফ লুত ইবন ইয়াহইয়া, হিশাম ইবন মুহাম্মদ ইবন সায়েব আল-কালবী এবং তাদের উভয়ের মতো আরও অনেকে।¹¹⁷
এ জন্য সাহাবীগণের সৌন্দর্য বা সততা এবং তাদের মর্যাদার বিবরণ সংক্রান্ত মুতাওয়াতির পর্যায়ের বর্ণনাসমূহকে এমন বর্ণনার দ্বারা প্রত্যাখ্যান করা বৈধ হবে না যে বর্ণনাগুলোর কিছু বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত, কিছু বিকৃত। কারণ, সন্দেহপূর্ণ বিষয় দ্বারা নিশ্চিত বিষয়ের নড়চড় হয় না। আর তাদের মার্যাদার ব্যাপারে যা সাব্যস্ত ও প্রমাণিত আছে, আমরা তা নিশ্চিতভাবে জানি। সুতরাং বর্ণনার ক্ষেত্রে সন্দেহপূর্ণ কোনো বিষয় এ ক্ষেত্রে দোষারোপ করতে পারে না।¹¹⁸
তৃতীয়ত: যখন বিশুদ্ধতা যাছাইয়ের মানদণ্ডে বর্ণনাটি সহীহ হবে এবং তার বাহ্যিক অর্থটি নিন্দা বা অপবাদের মত মনে হবে, তখন তাদের জন্য অপবাদ থেকে মুক্ত করার সর্বোত্তম পথ ও উপায় অনুসন্ধান করবে। ইবন আবু যায়েদ বলেন, মানুষের উপর তাদের হক হচ্ছে তাদের মাঝে (অনাকাঙ্খিতভাবে) সংঘটিত বিতর্কের বিষয়ে আলোচনা ও সমালোচনা থেকে বিরত থাকা আর মানুষের নিকট তাদের অন্যতম হক বা অধিকার হলো, তাদের জন্য (মন্দ সমালোচনা থেকে) বের হওয়ার সর্বোত্তম পথ অনুসন্ধান করা এবং তাদের ব্যাপারে সর্বোত্তম ধারণা পোষণ করা।¹¹⁹
ইবন দাকীকুল 'ঈদ রহ. বলেন: "তাদের মাঝে সংঘটিত বিষয় ও তারা যে ক্ষেত্রে মতবিরোধ করেছেন, সে বিষয়ে তাদেরকে নিয়ে যেসব বর্ণনা এসেছে, তার মধ্য থেকে কিছু বর্ণনা এমন, যা বাতিল ও মিথ্যা। সুতরাং কেউ যেন সে দিকে দৃষ্টি না দেয় আর তন্মধ্যে যা বিশুদ্ধ আমরা তার উত্তম ব্যাখ্যা করব। কারণ, পূর্বে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের প্রশংসা বিবৃত হয়েছে আর তাদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সমালোচনামূলক যেসব কথা আলোচিত হয়েছে, তা ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে। আর সন্দেহ ও ধারণাপূর্ণ বিষয় বাস্তব ও জ্ঞাত বিষয়কে বাতিল করতে পারে না।"¹²⁰
তাদের দোষারোপ করে যত বর্ণনা এসেছে, তার সবগুলোর ব্যাপারে এ কথা প্রযোজ্য।
চতুর্থত: আর তাদের মাঝে সংঘটিত বিষয়ে বিশেষভাবে যা বর্ণিত হয়েছে এবং বিশুদ্ধতা যাছাইয়ের মানদণ্ডে যা সহীহ বলে প্রমাণিত হয়েছে, সে ক্ষেত্রে তারা ছিলেন মুজতাহিদ তথা গবেষক আর এটা তখন হয়, যখন সমস্যাগুলো সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ হয়। সুতরাং যখন সমস্যাগুলোর সন্দেহ ও সংশয়ের ব্যাপারটি প্রকট আকার ধারণ করে, তখন তাদের ইজতিহাদ বা গবেষণা বিরোধপূর্ণ হয়ে উঠে এবং তারা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়েন:¹²¹
১. প্রথম শ্রেণী: ইজতিহাদের মাধ্যমে তাদের নিকট স্পষ্ট হয় যে, এ পক্ষের মধ্যেই হক বা সত্য বিষয়টি বিদ্যমান আর তার বিরোধিতাকারী হলো বিদ্রোহী। সুতরাং তাদের ওপর আবশ্যক হয়ে যায় তাকে সাহায্য করা এবং তার বিরোধিতাকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করা যা তারা বিশ্বাস করেছে। অতঃপর এ কাজ করেছে আর এমন গুণসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য তার বিশ্বাস অনুযায়ী বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের মুকাবিলায় ন্যায়পরায়ণ ইমামকে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকাটা বৈধ ছিল না।
২. দ্বিতীয় শ্রেণী: আর দ্বিতীয় শ্রেণীর সাহাবীরা হলেন তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত, ইজতিহাদের মাধ্যমে তাদের নিকট স্পষ্ট হয় যে, হক বা সত্য বিষয়টি অপর পক্ষের সাথেই রয়েছে। সুতরাং তাদের ওপর আবশ্যক হলো তাকে সাহায্য করা এবং তার বিরোধিতাকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করা।
৩. তৃতীয় শ্রেণী: এ শ্রেণীর সাহাবীগণের উপর সমস্যাটি সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ হয়ে উঠে এবং তারা সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেন; কিন্তু তাদের নিকট উভয় পক্ষের কোনো এক পক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো বিষয়টি স্পষ্ট হয় নি। ফলে তারা উভয় দলকে পরিত্যাগ করে। আর এ পরিত্যাগ করাটাই তাদের পক্ষে ওয়াজিব (আবশ্যক) ছিল। কারণ, মুসলিমের সাথে লড়াই করতে পদক্ষেপ নেওয়া বৈধ নয়, যতক্ষণ না এর যথার্থতা ও উপযুক্ততা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
অতএব, এ যুদ্ধের ব্যাপারে তারা ব্যাখ্যা দানকারী প্রত্যেক দলেরই একটা সংশয় ছিল, সে সংশয়ের কারণে তারা বিশ্বাস করত যে, তারা সঠিক পথে আছে। আর এ ধরনের সিদ্ধান্ত তাদেরকে 'আদালত তথা ন্যায়পরায়ণতা থেকে বের করে দেয় না; বরং তারা ফিকহের মাসআলার ক্ষেত্রে মুজতাহিদ তথা গবেষকদের বিধানের মধ্যে শামিল। সুতরাং এটা তাদের কারও ত্রুটি হওয়াকে অপরিহার্য করে না; বরং তাদের অবস্থান ছিল একটি এবং দু'টি পুরস্কার অর্জনের মধ্যে।¹²²
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা জানি যে, সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমের মাঝে সংঘটিত যুদ্ধ নেতৃত্ব লাভের উদ্দেশ্যে ছিল না, উষ্ট্রের যুদ্ধে ও সিফফীনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ব্যতীত অন্য কোনো ইমাম বা নেতাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যুদ্ধ করেন নি। আর মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহুও বলতেন না যে, আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে বাদ দিয়ে তিনিই ইমাম বা নেতা আর তালহা ও যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমাও এ ধরনের কথা বলেন নি; বরং অধিকাংশ আলেমের মতে যুদ্ধটি ছিল (উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর হত্যাকারীদের থেকে কিসাস তথা প্রতিশোধ গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে তাদের ইজতিহাদ বা গবেষণার কারণে ঘটে যাওয়া) একটা ফিতনা বা বিপর্যয়। আর তা ন্যায়পন্থী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের মতো একটা যুদ্ধ। আর তা হলো ইমাম ব্যতীত অন্য ব্যক্তির আনুগত্যের প্রশ্নে বিধিসম্মত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সংঘটিত যুদ্ধ, দীনী বিধি-বিধান ও নিয়ম-কানুনের জন্য যুদ্ধ নয়। অর্থাৎ দীনের মূলনীতির প্রশ্নে বিরোধের কারণে যুদ্ধ নয়।¹²³
উমার ইবন শাব্বাহ বলেন, “কোনো একজনও বর্ণনা করেন নি যে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা ও তার সাথে যারা ছিলেন, তারা আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর সাথে খিলাফত প্রশ্নে বিরোধ করেছেন, আর তারা কাউকে আহ্বানও করেন নি যাতে তারা তাকে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন; বরং তারা শুধু আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর হত্যাকারীদের সাথে যুদ্ধ করতে নিষেধ করা এবং তাদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের বিষয়টি উপেক্ষা করার কারণে তার নিকট প্রতিবাদ জানিয়েছেন।”¹²⁴
আর এটাকে সমর্থন করে ইমাম যাহাবী রহ. যা উল্লেখ করেছেন: “আবু মুসলিম আল-খাওলানী ও তার সাথে আরও কিছু মানুষ মিলে তারা মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর নিকট আগমন করে বলল: আপনি কি আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর সাথে বিবাদ করছেন, নাকি আপনি তার মতো? জবাবে তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! না, নিশ্চয় আমি জানি তিনি আমার চেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন এবং আমার চেয়ে শাসন ক্ষমতার বেশি হকদার; কিন্তু তোমরা কি জান না যে, উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু মাযলুম (নির্যাতিত) অবস্থায় নিহত হয়েছেন, আর আমি তার চাচাত ভাই এবং আমি তার রক্তের বদলা দাবি করছি। সুতরাং তোমরা তার নিকট যাও এবং তাকে বল, তিনি যেন উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর হত্যাকারীদেরকে আমার নিকট পাঠিয়ে দেন। অতঃপর তারা আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর নিকট আসল এবং তার সাথে এ প্রসঙ্গে কথা বলল; কিন্তু তিনি তাদেরকে (হত্যাকারীদেরকে) তার নিকট সোপর্দ করেন নি।”¹²⁵
ইবন কাছীরের এক বর্ণনায় আছে: “ঐ সময়ে শাম তথা সিরিয়াবাসী মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর সাথে যুদ্ধ করার জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।"¹²⁶
তাছাড়া অধিকাংশ সাহাবী এবং অধিক মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবীগণের মধ্য থেকেও অধিকাংশই ফিতনায় অংশগ্রহণ করেন নি। আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমদ রহ. বলেন,
حدثني أبي، قال: حدثنا إسماعيل بن علية، قال: حدثنا أيوب السختياني، عن محمد بن سيرين، قال : هاجت الفتنة وأصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم عشرة آلاف، فما حضرها منهم مئة، بل لم يبلغوا ثلاثين.
"আমার নিকট আমার পিতা হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেন ইসমা'ঈল ইবন 'উলাইয়া, তিনি বলেন: আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেন আইয়ুব আস-সাখতিয়ানী, তিনি হাদীস বর্ণনা করেন মুহাম্মদ ইবন সীরীন থেকে, তিনি বলেন: ফিতনার উৎপত্তি হলো এমতাবস্থায় যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ছিলেন দশ হাজারের মতো। অতঃপর তাদের মধ্য থেকে একশত জনও তাতে উপস্থিত হয় নি; বরং তাদের সংখ্যা ত্রিশ জনেও পৌঁছে নি।"¹²⁷
ইমাম ইবন তাইমিয়্যা রহ. বলেন: “এ সনদটি জমিনের উপরে সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদের অন্তর্ভুক্ত। আর মুহাম্মদ ইবন সীরীন তার কথা বলার ক্ষেত্রে বেশি আল্লাহ ভীরু মানুষ, আর তার মুরসাল বর্ণনাসমূহ সবচেয়ে বিশুদ্ধ মুরসাল বর্ণনাসমূহের অন্তর্ভুক্ত।"¹²⁸
সুতরাং কোথায় ন্যায়পরায়ণ গবেষকগণ, তারা এ ধরনের বিশুদ্ধ বক্তব্যসমূহ অধ্যয়ন করবে, যাতে তা তাদের জন্য শুভসূচনা হবে, তারা তাদের মেধা বা স্মৃতিকে ঐতিহাসিকদের তালগোল পাকানো ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ কথাবার্তা দ্বারা কলুষিত করবে না। অতঃপর তারা তাদের নিকট যে মধুময় মুলধন বা পুঁজি রয়েছে, সে অনুযায়ী বিশুদ্ধ নস বা বক্তব্যসমূহকে ব্যাখ্যা করবে।
পঞ্চমত: সাহাবীগণের ইজতিহাদ (গবেষণা) ও তাদের ব্যাখ্যাদান সত্ত্বেও তাদের মধ্যে সংঘটিত ফিতনা বা বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে মুসলিম ব্যক্তির যে বিষয়টি জেনে রাখা খুবই জরুরি তা হলো, সাহাবায়ে কিরামের মনে এ বিষয়ে ভীষণভাবে দুঃখ পাওয়া এবং চলমান ঘটনায় তাদের লজ্জিত হওয়া প্রমাণ করে যে তাদের নেক নিয়তের কোনো ঘাটতি ছিল না। এমনকি তাদের মনে কখনও এ কথা উদয় হয় নি যে, বিষয়টি অচিরেই এত দূর পর্যন্ত পৌঁছাবে যে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, বরং তাদের কেউ কেউ প্রচণ্ডভাবে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যখন তার নিকট তার অপর সাহাবী ভাইয়ের নিহত হওয়ার সংবাদ পৌঁছল; বরং তাদের কেউ কেউ কল্পনাও করতে পারে নি যে, বিষয়টি খুব দ্রুত যুদ্ধে রূপ নিবে। আপনার উদ্দেশ্যে এ নস বা বক্তব্যসমূহ থেকে কিছু সংখ্যক উপস্থাপন করা হল:
এ তো 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা বলেন, যা যুহুরী রহ. তার থেকে বর্ণনা করেন:
إنما أريد أن يحجز بين الناس مكاني، ولم أحسب أن يكون بين الناس قتال، ولو علمت ذلك لم أقف ذلك الموقف أبداً».
"আমি তো শুধু মানুষের মাঝে আমার অবস্থানকে সংরক্ষণ করতে চেয়েছি মাত্র। আর ভাবতেই পারি নি যে, মানুষের মাঝে যুদ্ধ লেগে যাবে আর আমি যদি এটা জানতে পারতাম, তবে আমি কখনও এ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতাম না।"¹²⁹
আর তিনি যখন পাঠ করতেন: وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ [الاحزاب: ٣٣] "আর তোমরা তোমাদের ঘরের মধ্যে অবস্থান কর।" [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৩] তখন তিনি কাঁদতেন, এমনকি চোখের পানিতে তার উড়না ভিজে যেত। "¹³⁰
আর এ আমীরুল মুমিনীন আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে শা'বী রহ. বলেন: “যখন তালহা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু নিহত হন এবং আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাকে নিহত অবস্থায় দেখলেন তখন তিনি তার চেহারা থেকে ধুলোবালি মুছতে শুরু করলেন এবং বলেন, আলীর বন্ধু হে আবু মুহাম্মদ! আমি তোমাকে আকাশের নক্ষত্রের নিচে অত্যাধিক ঝগড়ার মাঝে দেখতাম। অতঃপর তিনি বললেন, আমি আল্লাহর নিকট আমার অপারগতা ও কষ্টের কথা ব্যক্ত করব এবং তিনি ও তার সঙ্গীগণ তার ব্যাপারে কাঁদলেন।
আর তিনি বললেন,
يا ليتني مت قبل هذا اليوم بعشرين سنة».
"হায়! আমি যদি এ দিনের বিশ বছর পূর্বে মারা যেতাম, তাহলে কতইনা ভালো হত।"¹³¹
আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু আরও বলেন:
يا حسن, يا حسن ما ظن أبوك أن الأمر يبلغ إلى هذا, ود أبوك : لو مات قبل هذا بعشرين سنة.
“হে হাসান! হে হাসান! তোমার পিতা ধারণা করতে পারে নি যে, বিষয়টি এ পর্যায়ে পৌঁছাবে। তোমার পিতা কামনা করে, সে যদি এ ঘটনার বিশ বছর পূর্বে মারা যেত, তাহলে কতইনা ভালো হত।”¹³²
আর তিনি সিফফীনের রাত্রিসমূহে বলতেন:
لله در مقام قامه عبد الله بن عمر وسعد ابن مالك ( وهما ممن اعتزل الفتنة) إن كان برا إن أجره لعظيم وإن كان إثما إن خطره ليسير.
"আল্লাহর কসম! সাফল্যজনক স্থানে অবস্থান করেছে আবদুল্লাহ ইবন উমার ও সা'দ ইবন মালেক (আর তারা উভয়ে ফিতনা থেকে দূরে অবস্থান করেছিলেন); যদি তা পুণ্যের কাজ হয়, তবে তার প্রতিদান মহান; আর যদি তা পাপজনক সিদ্ধান্ত হয়, তবে তার শঙ্কা খুবই সামান্য। "¹³³
সুতরাং এ হলো আমীরুল মুমিনীনের কথা; যদিও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের কথা হল: নিশ্চয়ই আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু এবং তাঁর সাথে যারা ছিলেন, তারা সত্যের কাছাকাছি ছিল। "¹³⁴
আর এ তো যুবায়ের ইবনুল 'আওয়াম রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন:
إن هذه لهي الفتنة التي كنا نحدث عنها فقال له مولاه أتسميها فتنة وتقاتل فيها قال ويحك إنا نبصر ولا نبصر ما كان أمر قط إلا علمت موضع قدمي فيه غير هذا الأمر فإن لا أدري أمقبل أنا فيه أم مدبر».
"নিশ্চয় এটি সেই ফিতনা, যার সম্পর্কে আমরা আলোচনা করতাম। (আর তিনি হলেন ঐ ব্যক্তি, যিনি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন)। সুতরাং তার মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) তাকে উদ্দেশ্য করে বলল: আপনি এটাকে ফিতনা বলে আখ্যায়িত করছেন এবং তাতে আবার যুদ্ধও করছেন? জবাবে তিনি বললেন: তোমার জন্য আফসোস! আমরা তো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করব এবং শুধু তাকিয়ে দেখব না। এ ব্যাপারে আমার অবস্থান স্থল নিশ্চিতভাবে না জেনে আমি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব না। কারণ, আমি জানি না, এ ক্ষেত্রে আমি কি সামনে অগ্রসর হব, নাকি পিছনে যাব।"¹³⁵
আর এ তো মু'আবিয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, যখন তার নিকট আলী ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু'র মৃত্যুর সংবাদ আসল তখন তিনি বসে পড়লেন এ কথা বলতে থাকলেন:
إنا لله وإنا إليه راجعون، وجعل يبكي فقالت له فاختة: أنت بالامس تطعن عليه واليوم تبكي عليه، فقال: ويحك إنما أبكي لما فقد الناس من حلمه وعلمه وفضله وسوابقه وخيره، وفي رواية: ويحك إنك لا تدرين ما فقد الناس من الفضل والفقه والعلم.
"নিশ্চয় আমরা আল্লাহর আর আমাদেরকে তার নিকট ফিরে যেতে হবে (إنا لله وإنا إليه راجعون)। আর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। অতঃপর তার স্ত্রী বললেন, তুমি গতদিন তার সাথে যুদ্ধ করেছ আর আজ কাঁদছ? জবাবে তিনি বললেন: তোমার জন্য আফসোস! আমি তো শুধু কাঁদছি এ জন্য যে, তার মৃত্যুতে জনগণ তার বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, অবদান, অভিজ্ঞতা ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অন্য বর্ণনায় আছে: তোমার জন্য আফসোস! নিশ্চয় তুমি জান না, তার মৃত্যুতে জনগণ অবদান, ফিকহ বা বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান থেকে কী পরিমাণ বঞ্চিত হয়েছে।"¹³⁶
আর এত সব বর্ণনার পরেও কীভাবে তাদেরকে এমন সব বিষয়ের মাধ্যমে তিরস্কার করা হবে, যেসব বিষয় তাদের নিকট সংশয়পূর্ণ ছিল। অতঃপর তারা সে বিষয়ে ইজতিহাদ বা গবেষণা করেছেন, তাদের কেউ কেউ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন এবং বাকিরা ভুল করেছেন। আর তাদের সকলেই একটি প্রতিদান বা দু'টি প্রতিদানের প্রাপক। আর এর পরেও তারা সংঘটিত অনাকাঙ্খিত ঘটনার কারণে লজ্জিত আর তারা এর থেকে তাওবা করেছেন। আর তারা যে বিপদ-আপদের শিকার হয়েছিলেন, তার বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন এবং তার বদলে তাদের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«ما يزال البلاء بالمؤمن والمؤمنة في نفسه وولده وماله حتى يلقى الله وما عليه خطيئة».
"মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর জীবন, সন্তান-সন্ততি ও সম্পদে সার্বক্ষণিক বালা-মুসিবত লেগে থাকে, শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর দরবারে হাযির হয় এমতাবস্থায় যে, তার কোনো গুনাহ থাকে না।"¹³⁷
আর ন্যূনতম পক্ষে এ ব্যাপারে তাদের কারও কারও যদি বাস্তবে গুনাহ হয়েও থাকে, তবে আল্লাহ তা'আলা অনেক কারণে তার গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। তন্মধ্যে প্রধান কারণ হলো তাদের অভিজ্ঞতা বা অগ্রগামীতা, মহৎকার্যাবলী, জিহাদ লড়াই সংগ্রাম, গুনাহ ক্ষমাকারী বিপদ-আপদ, ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা ও তাওবা করার মতো অতীত সৎকর্ম, যার বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা তাদের পাপকে পূণ্যে পরিবর্তন করেন। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। আর আল্লাহ হলেন মহান অনুগ্রহ দানকারী।¹³⁸
ষষ্ঠত: সর্বশেষ আমরা বলব যে, নিশ্চয় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত এ আকীদা বা বিশ্বাস পোষণ করেন না যে, সাহাবীগণের প্রত্যেকেই কবীরা ও সগীরা গুনাহ থেকে মুক্ত (নিষ্পাপ); বরং এক কথায় তাদের পক্ষ থেকে গুনাহ হওয়াটা স্বাভাবিক। আর যদি তাদের থেকে কোনো গুনাহ সংঘটিত হয় তবে তাদের জন্য যে সব অগ্রাধিকার ও মর্যাদার বিষয় রয়েছে, তা তাদের ক্ষমাকে ত্বরান্বিত করে। অতঃপর যখন তাদের কারও পক্ষ থেকে কোনো গুনাহ সংঘটিত হত, তখন হয় তিনি তার থেকে তাওবা করতেন অথবা তাকে এমন সাওয়াব দেওয়া হত, যা সে গুনাহকে মিটিয়ে দিত অথবা তার অগ্রবর্তীতার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হত অথবা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশের কারণে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, আর তারা হলেন মানুষের মধ্যে রাসূলের শাফা'আত বা সুপারিশ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার অথবা তাকে দুনিয়াতে বালা-মুসিবত দ্বারা পরীক্ষা করে তার দ্বারা ক্ষমার ব্যবস্থা করা হয়। সুতরাং বাস্তবিক পাপের ক্ষেত্রে যখন এ নিয়ম, তখন কীভাবে এমন বিষয়ে তাদের গুনাহ হবে বা তাদেরকে তিরস্কার করা হবে, যে বিষয়ে তারা ছিলেন মুজতাহিদ বা গবেষক। যদি তারা তাতে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তবে তাদের জন্য রয়েছে দু'টি সাওয়াব এবং যদি তারা তাতে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তবে তাদের জন্য রয়েছে একটি সাওয়াব। আর ভুলটিকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।¹³⁹
অতঃপর মর্যাদা এমন বিষয়, যা তাদের কারও পক্ষ থেকে তুচ্ছ কাজকেও অপছন্দ করে। তবে জাতির মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব, আর ঈমান, জিহাদ, হিজরত, সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা, উপকারী ইলম (জ্ঞান) এবং ভালো কাজের দিক থেকে তাদের সৌন্দর্যের বিবেচনায় সে তুচ্ছ অপরাধ ক্ষমার যোগ্য।¹⁴⁰
ইমাম যাহাবী রহ. বলেন: “তারা এমন সম্প্রদায়, যাদের রয়েছে ইসলাম গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা আর আছে তাদের মাঝে সংঘটিত অনকাঙ্খিত ত্রুটি মিটিয়ে দেওয়ার মতো আমল, অপরাধ নিশ্চিহ্নকারী জিহাদ এবং পরিশুদ্ধকারী ইবাদত। আর আমরা এমন ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হব না, যে ব্যক্তি তাদের কোনো একজনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে এবং আমরা তাদেরকে নিষ্পাপ বলেও দাবি করব না।”¹⁴¹
অতএব, সাহাবীগণের ন্যায়পরায়ণতার প্রতি আমাদের আকীদা বা বিশ্বাস তাদের নিষ্পাপ হওয়াকে আবশ্যক করে না। কারণ, ন্যায়পরায়ণতা হলো চরিত্র ও দীনের দৃঢ়তা। আর এ গুণ অর্জনকারী ব্যক্তি ধাবিত হয় আত্মাকে মজবুতভাবে গঠনের দিকে, যা নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন তাকওয়া ও ব্যক্তিত্বকে ধারণ করার ওপর। ফলে সে তার সততা দ্বারা তার আত্মার মজবুতি অর্জন করবে... অতঃপর 'ন্যায়পরায়ণতার জন্য সামগ্রিকভাবে পাপমুক্ত হওয়া শর্ত নয়' এ ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই।
আর তা সত্ত্বেও সাধারণভাবে তাদের দোষ-ত্রুটি ও মন্দ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা থেকে বিরত থাকাটা ওয়াজিব হবে, যে আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। আর যদি সাহাবীর ত্রুটি-বিচ্যুতি অথবা ভুল-ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করাটা জরুরি হয়ে পড়ে, তবে আবশ্যক হলো ঐ আলোচনার সাথে এ সাহাবীর মর্যাদা ও তার অবস্থান পরিষ্কার করা। যেমন, তার তাওবা, জিহাদ করা এবং তার অবদানসমূহের উল্লেখ করা। সুতরাং উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, আমরা যদি হাতেব ইবন আবি বোলতা'আহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু'র তাওবার কথা আলোচনা না করে শুধু তার পদস্খলনের কথা আলোচনা করি, তবে তা পরিষ্কার যুলুমের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ, কোনো অপরাধী তাওবা করলে, তার তাওবা কবুল করা হয়।¹⁴²
সুতরাং কোনো ব্যক্তির জীবনকালের কোনো এক সময়ে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে এবং তা থেকে সে তাওবা করলে, তবে সে কারণে তাকে দোষারোপ করা যাবে না। কারণ, চূড়ান্তভাবে পরিপূর্ণতার বিষয়টিকে বিবেচনা করা হবে, সূচনা লগ্নের অসম্পূর্ণ কোনো বিষয়কে (সিদ্ধান্তের জন্য) বিবেচনা করা হবে না। বিশেষ করে কারও যদি পূণ্যরাশি ও মহৎ কার্যাবলী থাকে এবং কেউ যদি তার প্রশংসা না করে, তবে তার ব্যাপারে কেমন সিদ্ধান্ত হতে পারে, যখন তার স্রষ্টা অন্তর্যামী আল্লাহ স্বয়ং তার প্রশংসা করেন।
পরিশেষে আল-কুরআনের ভাষায়: ﴿رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ ءَامَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ﴾ [الحشر: ١٠]
"হে আমাদের রব! আমাদেরকে ও ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]
টিকাঃ
¹¹³ ফতহুল বারী: ১/১৯৯; সহীহুল বুখারী: ১/৪১, ইলম অধ্যায়, বাব নং ৪৯ (মুদ্রণ: তুর্কী)।
¹¹⁴ ইমাম বুখারী র. তাঁর সহীহ গ্রন্থের ইলম অধ্যায়ের, ৪৯ নং পরিচ্ছেদে এ হাদীসখানা বর্ণনা করেন।
¹¹⁵ সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দামাতুস সহীহ, ১/১১; আর দেখুন: তার তাখরীজসহ, 'জামে'উল উসুল, ৮/১৭
¹¹⁶ ফতহুল বারী: ১/১৯৯-২০০; আরও চমৎকার আলোচনা দেখুন, আস-সুলামী, মানহজু কিতাবাতিত তারিখিল ইসলামী: পৃষ্ঠা ২২৮
¹¹⁷ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৫/৭২ এবং তার পরবর্তী পৃষ্ঠা ৮১; আরও দেখুন সমালোচনামূলক পর্যালোচনা: ইয়াহইয়া আল-ইয়াহইয়া রচিত, মারবিয়াতু আবি মিখনাফ ফিত তারিখিত তাবারী-রাশেদীনের যুগ, মুদ্রণ: দারুল 'আসিমা, ১৪১০ হি.
¹¹⁸ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৬/৩০৫ (শব্দের রূপ পরিবর্তন করে)।
¹¹⁹ মুকাদ্দামাতু রিসালাতি ইবনে আবি যায়েদ আল-কায়রাওয়ানী: ৮; আরও দেখুন: আত-তাতানী (মৃ. ৯৪২ খ্রি.), তানবীরুল মাকালা ফী হাল্লি আলফাযির রিসালাত, বিশ্লেষণ: ড. মুহাম্মদ ইবন 'আয়াশ, ১/৩৬৭ এবং তার পরবর্তী পৃষ্ঠা।
¹²⁰ আবদুল আযীয আল-'আজলান, আসহাবু রাসূলিল্লাহ ওয়া মাযাহিবুন্নাস ফী হিম, পৃষ্ঠা ৩৬০
¹²¹ মুসলিম, ইমাম নববীর ব্যাখ্যাসহ: ১৫/১৪৯, ১৮/১১; আরও দেখুন, আল-ইসাবা: ২/৫০১, ৫০২; ফতহুল বারী: ১/১৯৯; এহইয়াউ 'উলুমিদ দীন: ১/১০২
¹²² মুজতাহিদ ভুল করলে একটি পুরস্কার এবং সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলে দু'টি পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে।
¹²³ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৬/৩০৫ (শব্দের রূপ পরিবর্তন করে); তার পরবর্তী আলোচনার জন্য দেখুন, পৃষ্ঠা ৩৪০
¹²⁴ উমার ইবন শাব্বাহ, আখবারুল বসরা, ফতহুল বারী থেকে উদ্ধৃত: ১৩/৫৬
¹²⁵ যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৩/১৪০; বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীদের সনদে তা বর্ণনা করা হয়, যেমনটি বলেছেন আরনাউত।
¹²⁶ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৮/১৩২; আরও দেখুন ইমামুল হারামাইনের বক্তব্য এবং তার ওপর আত-তাবানী'র ব্যাখ্যা; ইতহাফু যবিউন নাজাবা, পৃষ্ঠা ১৫২, ১৫৩
¹²⁷ মাওসু'আতু আকওয়ালিল ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল ফিল জারহে ওয়াত তা'ন্দীল, ক্রমিক নং ৪৩১৮
¹²⁸ মিনহাজুস সুন্নাহ: ৬/২৩৬, ২৩৭; একই জায়গায় অন্যান্য বক্তব্যসমূহ দেখুন, যা ফিতনা তথা বিপর্যয়ের মধ্যে স্বল্প সংখ্যক সাহাবীর উপস্থিতির প্রমাণ করে।
¹²⁹ যুহুরীর মাগাযী, পৃষ্ঠা ১৫৪
¹³⁰ যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ২/১৭৭
¹³¹ ইবনুল আছীর, উসুদুল গাবা: ৩/৮৮, ৮৯
¹³² মিনহাজুস সুন্নাহ: ৬/২০৯
¹³³ প্রাগুক্ত: ৬/২০৯
¹³⁴ ফতহুল বারী: ১২/৬৭
¹³⁵ তারিখুত তাবারী: ৪/৪৭৬
¹³⁶ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৮/১৫, ১২৩
¹³⁷ তিরমিযী (আল-মাকতাবা আশ-শামেলা), হাদীস নং ২৩৯৯; তিনি বলেন, হাদিসটি হাসান সহীহ; ইবনু হিব্বান হাদিসটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন; হাকেম হাদিসটি বর্ণনা করেন, তিনি এবং যাহাবী তার সম্পর্কে চুপ থাকেন: ১/৪১; আর আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন; মিশকাত, ১/৪৯২, সা'দের হাদিস থেকে, তিনি (আলবানী) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, আস-সহীহা (الصحيحة), হাদীস নং ১৪৪; দেখুন: শাওয়াহেদ (شواهد), ৫/১৪৩, ১৪৫; আরও দেখুন: আল-ফাতহ (الفتح) : ১০/১১১, ১১২
¹³⁸ বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: মিনহাজুস সুন্নাহ: ৬/২০৫-২৩৯; তিনি তাতে গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়ার দশটি কারণ উল্লেখ করেছেন।
¹³⁹ দেখুন: শরহু খলিল হাররাস 'আলাল 'আকিদাতিল ওয়াসিতিয়্যা, পৃষ্ঠা ১৬৪-১৬৭
¹⁴⁰ যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১০/৯৩
¹⁴¹ আল-গাজালী, আল-মুসতাছফা: ১/১৫৭; আরও অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুন: আল-আ'জামী, মানহাজুন নকদ 'ইনদাল মুহাদ্দিসীন, পৃষ্ঠা ২৩-২৯
¹⁴² আবু না'য়ীম, আল-ইমামা, পৃষ্ঠা ২৪০-২৪১; মিনহাজুস সুন্নাহ: ৬/২০৭
📄 ষষ্ঠ অধ্যায়: সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের সম্মান ও মর্যাদা
সাহাবীগণ হলেন আল্লাহর তা'আলার নবী ও রাসূলগণের পরে দুনিয়ার সকল মানুষের মধ্য সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যদাবান মানুষ। আর ঈমানের দিক থেকে তারা হলেন নবী-রাসূলগণের পর অগ্রগামী পূর্বপুরুষ এবং দয়াময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকারী ব্যক্তিবর্গ। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ) [آل عمران: ١١٠]
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানব জাতির কল্যাণের জন্য যাদের আগমন হয়েছে।" [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০]
তিনি আরও বলেন;
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شهِيدًا ﴾ [البقرة: ١٤٣]
"আর এভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী (সর্বোত্তম) জাতিতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির ওপর স্বাক্ষী হও এবং রাসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হতে পারেন"। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৪৩]
এ আয়াত দু'টি সকল সাহাবীর মর্যাদার ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণাপত্র। কেননা, এ বক্তব্যের দ্বারা সরাসরি সম্বোধিত ব্যক্তিবর্গ হলেন সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু 'আনহুম। তাছাড়া আল্লাহ তা'আলা সাহাবীগণের উপমা পেশ করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জীলের মতো প্রসিদ্ধ আসমানী কিতাবে, যে কথা তিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন এভাবে:
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَبُهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَنَةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْهُ فَازَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ، يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا [الفتح: ٢٩]
"মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু' ও সাজদায় অবনত দেখবেন। তাদের লক্ষণ তাদের মুখমণ্ডল সাজদাহ'র প্রভাবে পরিস্ফুট। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইঞ্জীলে তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একটি চারাগাছ, যা থেকে নির্গত হয় কচিপাতা, তারপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯]
তাছাড়া আল-কুরআনের আরও কতগুলো আয়াত রয়েছে যেগুলোতে সাহাবীগণের প্রশংসা, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বিবরণ রয়েছে, রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি ক্ষমা ও সন্তুষ্টির সুস্পষ্ট ঘোষণা, যে আয়াতগুলো আমরা এ গ্রন্থের শুরুর দিকে বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ আলোচনা করেছি।
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তার সাহাবীগণের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে বলেছেন,
لَا تَسُبُّوا أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِي، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ لَوْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ».
"তোমরা আমার সাহাবীগণের কাউকে গালি দিবে না; কারণ, তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ স্বর্ণও দান করে, তবে সে তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেক পরিমাণ দানের সাওয়াবও অর্জন করতে পারবে না।"¹⁴³
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
«خير أمتي قرني ثم الذين يلونهم ثم الذين يلونهم. قال عمران: فلا أدري أذكر بعد قرنه قرنين أو ثلاثا».
"আমার যুগের উম্মত হলো আমার শ্রেষ্ঠ উম্মত, অতঃপর তাদের সাথে যারা সম্পৃক্ত হবে তারা শ্রেষ্ঠ, তারপর তাদের সাথে যারা সম্পৃক্ত হবে তারা শ্রেষ্ঠ। 'ইমরান বলেন: আমি জানি না, তিনি তাঁর যুগের পরে দু'টি যুগের কথা উল্লেখ করেছেন, নাকি তিনটি যুগের উল্লেখ করেছেন।"¹⁴⁴
আর সাহাবায়ে কেরামের সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য ছাড়াও বিশেষ ব্যক্তিবর্গের পক্ষ থেকে আরও অনেক বক্তব্য পাওয়া যায়, তন্মধ্যে কিছু বক্তব্য নিম্নরূপ:
১. আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহ 'আনহুমা বলেন,
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمُقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةٌ مَعَ النَّبِيِّ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْرٌ مِنْ عَمَلٍ أَحَدِكُمْ أربعين سنة».
"তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে গালি দিও না; কারণ, তাদের কোনো একজনের এক ঘন্টা সময় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অবস্থান করার মূল্যবান তোমাদের কোনো একজনের চল্লিশ বছরের আমলের চেয়ে অনেক বেশি উত্তম।"¹⁴⁵
২. আর ওকী' রহ.-এর অপর এক বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহ 'আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمُقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةً خَيْرٌ مِنْ عبادة أَحَدِكُمْ عُمْرَهُ ».
"তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে গালি দিও না; কারণ, তাদের কোনো একজনের এক ঘন্টা সময় (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে) অবস্থান করার মূল্যবান তোমাদের কোনো একজনের গোটা জীবনের ইবাদতের চেয়েও অনেক বেশি উত্তম।"¹⁴⁶
৩. মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
لا تسبوا أصحاب محمد إن الله قد أمر بالاستغفار لهم وقد علم أنهم سيقتتلون».
"তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহাবীগণকে গালি দিও না। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি জানেন যে, তারা অচিরেই নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে।"¹⁴⁷
৪. ইমাম আহমদ রহ. তার আকীদা প্রসঙ্গে বলেন, "সাহাবীগণের মধ্য থেকে একজন নগণ্য সাহাবীর মর্যাদা ঐ যুগের সকল ব্যক্তির চেয়েও শ্রেষ্ঠ, যারা তাকে দেখে নি, যদিও তারা তাদের সকল আমল নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে।"¹⁴⁸
৫. ইমাম নাওয়াওয়ী রহ. বলেন, "এক মুহূর্তের জন্য হলেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহচর্য পাওয়ার মর্যাদার সমতুল্য কোনো আমলই হতে পারে না; আর কোনো কিছুর বিনিময়ে তার সমমর্যাদা অর্জন করা সম্ভব নয়। আর ফযীলত বা মর্যাদার বিষয়টি কিয়াসের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় না। এটা হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, যা তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন।"¹⁴⁹
৬. আর আবু উমার ইবন আবদিল বার রহ 'আল-ইস্তি'য়াব' গ্রন্থে বলেন,
قد كفينا البحث عن أحوالهم، لإجماع أهل الحق من المسلمين، وهم أهل السنة والجماعة؛ على أنهم كلهم عدول».
"তারা সকলেই ন্যায়পরায়ণ -এ কথার ওপর মুসলিমগণের মধ্য থেকে হকপন্থীগণের ইজমা'র কারণে আমাদেরকে তাদের অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধানীয় আলোচনা-পর্যালোচনা করতে নিষেধ করা হয়েছে আর হকপন্থীগণ হলেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত।"¹⁵⁰
৭. মুহাম্মাদ ইবনুল ওযীর আল-ইয়ামানী সাহাবীগণের ন্যায়পরায়ণতার প্রশ্নে সংঘটিত 'ইজমা'-এর বর্ণনা নকল করেছেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের পক্ষ থেকে এবং শী'আয়ে যায়েদিয়া ও মু'তাযিলাদের পক্ষ থেকেও। আর অনুরূপ বক্তব্য আস-সানা'য়ানী রহ.-এরও।¹⁵¹
টিকাঃ
¹⁴³ সহীহ বুখারী, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: আমি যদি অন্তরঙ্গ বন্ধু গ্রহণকারী হতাম, হাদীস নং ৩৪৭০; মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত, পরিচ্ছেদ: সাহাবা রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমকে গালি দেওয়া হারাম, হাদীস নং ৬৬৫২
¹⁴⁴ সহীহ বুখারী, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের ফযীলত, হাদীস নং ৩৪৫০; মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবীদের ফযীলত, পরিচ্ছেদ: সাহাবী, তৎপরবর্তী ও তৎপরবর্তীদের ফযীলত, হাদীস নং ৬৬৩৮
¹⁴⁵ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা, শরহু লামিয়া ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১ (মাকতাবা শামেলা, আল-ইসদার আস-সানী)
¹⁴⁶ ইমাম আহমদ, ফাযায়েলুস সাহাবা: ১/৫৭; ইবনু মাজাহ, ১/৩১ (আল-আ'যামী); ইবনু আবি 'আসেম, ২/৪৮৪; আল-বুসাইরী 'যাওয়ায়েদু ইবন মাজাহ' এর মধ্যে (১/২৪) খবরটিকে সহীহ বলেছেন; আল-মাতালেবুল 'আলীয়া, ৪/১৪৬
¹⁴⁷ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৭৪; আরও দেখুন: মিনহাজুস সুন্নাহ, ২/১৪; আছার, ইমাম আহমদ তা ফাযায়েল অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন, হাদীস নং ১৮৭, ১৭৪১; তার সনদকে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা, ইবন বাত্তার মিনহাজুস সুন্নাহতে হাদীসটি সংযোজন করেছেন: ২/২২
¹⁴⁸ আল-লালকায়ী, শরহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাত ১/১৬০
¹⁴⁹ নাওয়াওয়ীর ব্যাখ্যাসহ মুসলিম: ১৬/৯৩
¹⁵⁰ উদ্ধৃত: ড. নূর উদ্দিন 'আতর, 'মানহাজুন্ নাকদ ফী 'উলুমিল হাদীস', পৃষ্ঠা ১২২
¹⁵¹ প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১২২
📄 উপসংহার
উপসংহারে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলব যে, সাহাবীগণ হলেন আল্লাহর সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথী এবং নবী ও রাসূলগণের পরে আল্লাহর সবচেয়ে পছন্দনীয় ও প্রিয় মানুষ। আর ঈমানের দিক থেকে তারা হলেন অগ্রগামী পূর্বপুরুষ এবং রাহমানের সন্তুষ্টি অর্জনকারী ব্যক্তিবর্গ। তাদেরকে মহব্বত করাটা আনুগত্য ও ঈমান এবং তাদেরকে ঘৃণা করাটা নিফাকী ও সীমালংঘন। তারা হলেন এ উম্মতের মধ্যে মনের দিক থেকে সবচেয়ে সুহৃদ ও সৎ মানসিকতাসম্পন্ন, ঈমানের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী, জ্ঞানের দিক থেকে সবচেয়ে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন, সবচেয়ে কম আনুষ্ঠানিকতা প্রিয়, (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের) সাহচর্য ও সহযোগিতার দিক থেকে তারা অনেক দূর এগিয়ে এবং তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রত্যয়ন ও প্রশংসার দ্বারা তাঁর মহান মর্যাদায় উপনীত হয়েছেন।
তাদের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে, পুরস্কারের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি এবং পরিমাপকের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হলেন সিদ্দীকে আকবর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, তারপর হলেন 'ফারুক' নামে প্রসিদ্ধ উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু; আর এ ব্যাপারে সাহাবী ও তাবে'ঈন মুমিনগণের পক্ষ থেকে 'ইজমা' সংঘটিত হয়েছে। অতঃপর যুন-নূরাইন উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, তারপর আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, যিনি বালকদের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম ঈমান গ্রহণ করেছেন। আর তারা হলেন খোলাফায়ে রাশেদীনের চারজন এবং সুপথপ্রাপ্ত ইমাম। আর তাদের পরবর্তী পর্যায়ের হলেন 'আশারায়ে মুবাশশিরীনের (জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জনের) অবশিষ্ট ছয়জন। আর তাদের পেছনে রয়েছেন পুণ্যবান মুহাজিরগণের একেবারে প্রথম ধাপের অগ্রগামী দল। তারপর আছেন প্রথম শ্রেণির আনসারগণ। তার পরবর্তী স্তরে রয়েছেন বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, অতঃপর উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ, তার পরবর্তী স্তরে রয়েছেন বাই'আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারীগণ। তাদের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে রহমত ও সন্তুষ্টি বর্ষিত হউক।
আর যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করবে এবং তাদের জন্য রহমতের দো‘আ করবে, সে ব্যক্তি নিফাকী থেকে মুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা বিশ্বাস করি যে, তাদের মাঝে যা কিছু সংঘটিত হয়েছে, তারা তাতে ব্যাখ্যা দানকারী হিসেবে প্রতিদান পাবে। কারণ, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের প্রতি ক্ষমা ও সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা রয়েছে এবং তারা হলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী, যার ব্যাপারে অন্য কোনো বর্ণনা দ্বারা সন্দেহ পোষণ করা বৈধ হবে না। সুতরাং তাদের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ বা অনাকাঙ্খিত বিষয়ে আলোচনা ও সমালোচনা থেকে বিরত থাকা এবং এ বিষয়টিকে তাদের ব্যাখ্যা ও গবেষণার দিকে ফিরিয়ে দেওয়াটা ওয়াজিব বা আবশ্যক। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُم مَّا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْـَٔلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴾ [البقرة: ١٣٤]
“সে সম্প্রদায় অতীত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে, তা তাদের। আর তোমরা যা অর্জন করেছ, তা তোমাদের। আর তারা যা করত, সে সম্পর্কে তোমাদেরকে প্রশ্ন করা হবে না।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩৪]
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إذا ذكر أصحابي فامسكوا».
“যখন আমার সাহাবীগণের ব্যাপারে আলোচনা হবে তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাক।”
সুতরাং আবশ্যক হলো এ বিষয়ে নিরবতা পালন করা এবং তাদের কোনো একজনকে সম্মানহানী হতে পারে এমন কোনো বিষয় থেকে দূরে থাকা। কারণ, তাদের কোনো একজনের মর্যাদাহানি করার মধ্যে সকল সাহাবীর মর্যাদাহানি করার বিষয়টি আবশ্যক হয়ে পড়ে। যখন তাদের কোনো একজনকে অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সকলেই অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে পড়ে। কারণ, যদি বলা হয় যে তাদের মধ্য থেকে কোনো একজন সাহাবী ভালো নন, তখন যে কেউ বলতে পারে যে, তাদের মধ্য থেকে কোনো একজনও ভালো নন।
আর আবশ্যক হলো তাদেরকে ভালোবাসা, তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা, তাদের জন্য রহমতের দু‘আ করা এবং তাদের গুণাবলী আলোচনা করা। সুতরাং শুধু তাদের ভালো ও সুন্দর বিষয়গুলোই আলোচনা করা যাবে, আর যে ব্যক্তি তাদের মন্দ সমালোচনা করবে, সে পথভ্রষ্ট বলে গণ্য হবে এবং কঠিন শাস্তির মুখোমুখী হবে।
পরিশেষে আমাদের আবেদন আল-কুরআনের শিখানো ভাষায়:
﴿ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ ءَامَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴾ [الحشر: ١٠]
“হে আমাদের রব! আমাদেরকে ও ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ঐ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত করুন, যে ব্যক্তি আপনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে ভালোবাসে, তাদেরকে (অপবাদের অভিযোগ থেকে) রক্ষা করে, তাদের প্রশংসা ও গুণগান করে এবং তাদের জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করে।
وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله و صحبه وسلم.
সমাপ্ত