📄 তৃতীয়ত: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে গালি দেওয়ার বিধান
যে ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে এমন বিষয় দ্বারা গালি দিবে যা থেকে আল্লাহ তা'আলা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন, সে ব্যক্তির ব্যাপারে বিজ্ঞজন তথা আলেমদের ঐক্যবদ্ধ মতামত হলো, সে কাফির হয়ে যাবে।
কাযী আবু ইয়া'লা রহ. বলেন: "যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে এমন বিষয়ে অপবাদ দিবে যা থেকে আল্লাহ তা'আলা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন, সে ব্যক্তি কোনো প্রকার বিতর্ক ছাড়াই কাফির হয়ে যাবে।” আর এ ব্যাপারে একাধিক ইজমা সংঘটিত হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। একাধিক ইমাম এ হুকুম বা বিধানটিকে সুস্পষ্ট করেছেন। ইমাম মালেক রহ. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: "যে ব্যক্তি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে বেত্রাঘাত করা হবে, আর যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। তাকে প্রশ্ন করা হলো, কেন? তখন তিনি বললেন: যে ব্যক্তি তার প্রতি অপবাদ বা অভিযোগের বাণ নিক্ষেপ করল, সে ব্যক্তি আল-কুরআনের বিরোধিতা করল।"⁸¹
আর ইবনু শা'বান রহ, তার এক বর্ণনায় বলেন, মালেক রহ. থেকে তা বর্ণিত আছে, কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
(يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [النور: ١٧]
"আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, 'তোমরা যদি মুমিন হও, তবে কখনো যাতে অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর।" [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৭] সুতরাং যে ব্যক্তি অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করবে, সে কাফির হয়ে যাবে।⁸²
যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে অপবাদ দিবে, সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রদত্ত দলীলসমূহ সুস্পষ্ট এবং পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত। তন্মধ্যে কয়েকটি:
১. প্রথমত: ইমাম মালেক রহ, যার দ্বারা দলীল পেশ করেছেন, তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এর মধ্যে আল-কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে, যে কুরআন তাঁর নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছে। আর আল-কুরআন যা নিয়ে এসেছে, তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা কুফুরী।
ইমাম ইবনু কাছীর রহ. বলেন: "আলেমগণ ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত পেশ করেছেন, যে ব্যক্তি এর পরেও তাকে গালি দিবে এবং এই আয়াতের মধ্যে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তার পরেও তাকে এর দ্বারা অপবাদ দিবে, যার দ্বারা তাকে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, সে আল-কুরআন বিরোধী।"⁸³
ইবন হাযম রহ. ইমাম মালেক রহ.-এর পূর্বের কথার ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন: "এখানে ইমাম মালেক রহ.-এর কথা সহীহ। আর তা হলো আয়াতকে পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা এবং আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাকে (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে) অকাট্যভাবে নির্দোষ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে আল্লাহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।"⁸⁴
২. দ্বিতীয়ত: এর মাধ্যমে বিভিন্ন কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়া ও তাঁর মানহানির বিষয় রয়েছে, যে ব্যাপারে আল-কুরআনুল কারীম প্রমাণ পেশ করেছে। আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُواْ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَدَةً أَبَدًا وَأُوْلَبِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴾ [النور: ٤]
“আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে না আসে, তাদেরকে তোমরা আশিটি কশাঘাত কর এবং তোমরা কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। এরাই তো ফাসিক।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৪]
এবং তাঁর বাণী:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾ [النور: ٢৩]
“যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-উদাস, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা তো দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩]-এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। সুতরাং তিনি দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যা করার সময় বলেন: এ আয়াতটি বিশেষ করে 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র স্ত্রীদের শানে অবতীর্ণ। আর তাতে তাওবার বিষয় নেই। আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিন নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য তার বক্তব্যের শেষের দিকে তাওবার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, সুতরাং ব্যক্তি আপেক্ষিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করবে, অতঃপর সর্বোত্তম ব্যাখ্যাটি মাথা পেতে গ্রহণ করবে।”⁸⁵
সুতরাং আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতটি ঐ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে, যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা ও মুমিন জননীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে। কারণ, তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অপবাদ ও দোষারোপের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কেননা, নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, যেমনিভাবে তা তার ছেলে-সন্তানকে কষ্ট দেয়। কারণ, তা তাকে দাইউছের⁸⁶ সাথে সম্পর্কিত করে এবং তার দাম্পত্য জীবনে বিশৃঙ্খলার প্রকাশ ঘটায়। আর নিশ্চয় তার স্ত্রীর ব্যভিচার তাকে ভীষন কষ্ট দেয়... এবং সম্ভবত কোনো কোনো মানুষের সাথে তার পরিবারের প্রতি অপবাদ আরোপের কারণে যে লজ্জা ও অসম্মান সম্পৃক্ত হয়, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবে অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার চেয়েও জঘন্য। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়া সর্বসম্মতিক্রমে কুফুরী।⁸⁷
ইমাম কুরতুবী রহ, আল্লাহ তা'আলার বাণী:
(يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا) [النور: ١٧]
"আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, কখনো যাতে অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৭]
প্রসঙ্গে বলেছেন: এ আয়াতটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। (অর্থাৎ তার ব্যাপারে যাতে তোমরা অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর) কারণ, অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি বলতে যার সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে, তার সম্পর্কে অবিকল সে কথার মতো পুনরায় কথা বলাকেই বুঝায় অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের মধ্য থেকে যিনি তার মর্যাদায় ছিলেন, তার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। কারণ, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মানসম্মান ও পরিবারকে নিয়ে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপার রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে, এটা তার পক্ষ থেকে কুফুরী বলে গণ্য হবে।⁸⁸
আর যা প্রমাণ করে যে, তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করাটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্টের কারণ, তা ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে ইফকের ঘটনা সংবলিত হাদীসে বর্ণনা করেছেন। 'আয়শা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
"... فَقَامَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى الْمِنْبَرِ فَاسْتَعْذَرَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أُبَيَّ ابْنِ سَلُولَ قَالَتْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَر: «يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ مَنْ يَعْذِرُنِي مِنْ رَجُلٍ قَدْ بَلَغَ أَذَاهُ فِي أَهْلِ بَيْتِي ...".
"...অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরের উপর দাঁড়ালেন, অতঃপর তিনি আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বললেন: 'হে মুসলিম সমাজ! আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে লোক আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে?..."⁸⁹
সুতরাং তার কথা: (مَنْ يَعْذِرُنِي) অর্থাৎ যখন আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে ব্যক্তি আমাকে জ্বালাতন করেছে, আর আমি তার থেকে প্রতিকার চাই, তখন কে আমার প্রতি ইনসাফ করবে এবং তার প্রতিকার করবে। আর আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন।
সুতরাং এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বারা খুবই কষ্ট পেয়েছেন এবং তার ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। আর যেসব মুমিন উত্তেজিত হয় নি, তারা বললেন: আপনি আমাদেরকে নির্দেশ দিন, আমরা তাদের গর্দান উড়িয়ে দিব। সুতরাং আমরা আপনাকে অপবাদ থেকে মুক্ত করব, যখন আপনি আমাদেরকে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিবেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা'দের কথার কোনো প্রতিবাদ করেন নি, যখন সে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ চেয়েছেন।⁹⁰
শাইখ মুহাম্মদ ইবন আবদিল ওহাব রহ. বলেন: “যে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে পবিত্রতমা (যা তার থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত) উম্মুল মুমিনীন জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, তবে সে হবে মুনাফিকদের প্রধান আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের কাতারের লোক। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলার ভাষা হলো: 'মুসলিম সমাজ! আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে লোক আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে?
আল-কুরআনের ভাষায়:
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا * وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا ) [الاحزاب: ٥٧، ٥٨]
"নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে লা'নত করেন এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, যা তারা করে নি তার জন্য। নিশ্চয় তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করল।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৭-৫৮]
সুতরাং কোথায় তাঁর দীনের সাহায্যকারীগণ, যারা তাকে লক্ষ্য করে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে অপবাদ থেকে মুক্ত করব।"⁹¹
যেমনিভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করার মধ্যে অপর দৃষ্টিকোণ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদাহানির বিষয় রয়েছে, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ...﴾ [النور: ٢٦]
"দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য ...।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৬]
ইবন কাছীর রহ, বলেন: "আল্লাহ তা'আলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে পবিত্র অবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী বানিয়েছেন। কারণ, তিনি হলেন পবিত্র মানুষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পবিত্রতম, আর তিনি (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা) যদি দুশ্চরিত্রা নারী হতেন (না'উযুবিল্লাহ), তবে তিনি শর'ঈ ও মর্যাদার দিক বিবেচনায় তাঁর (রাসূলের) জন্য উপযুক্ত হতেন না। আর এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿أُوْلَبِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ ﴾ [النور: ٢٦]
"লোকেরা যা বলে তার সাথে তারা সম্পর্কহীন।" [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৬]
অর্থাৎ মিথ্যাবাদী ও সীমালংঘনকারী গোষ্ঠী যা বলে, তারা তার থেকে সমপূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।"⁹²
টিকাঃ
⁸¹ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৬৫, ৫৬৬, আর খবরটি সনদসহ আল-মুহাল্লা (১৮১)-এর মধ্যে রয়েছে: ১১/৪১৪, ৪১৫
⁸² কাযী 'আইয়াদ্ব, আশ-শিফা, বিশ্লেষণ: আল-বাজাবী, ২/১১০৯
⁸³ দেখুন, তাফসীরু ইবন কাছীর: ৩/২৭৬; আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾ [النور: ২৩] "যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-উদাস, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা তো দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩]-এর ব্যাখ্যায়।
⁸⁴ আল-মুহাল্লা (المحلى): ১১/৪১৫
⁸⁵ দেখুন: ইবনু জারীর, ১৮/৮৩; আর তার থেকে ইবন কাছীর, ৩/২৭৭
⁸⁶ দাইউছ (দিউট) হল: স্ত্রীর ব্যভিচারে নির্লিপ্ত স্বামী।
⁸⁷ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪৫; কুরতুবী: ১২/১৩৯, মুদ্রণ: দারুল কুতুবিল 'ইলমিয়্যা।
⁸⁸ কুরতুবী: ২/১৩৬, ২৩৭; ইবনুল 'আরাবী থেকে বর্ণিত, আহকামুল কুরআন: ৩/১৩৫৫, ১৩৫৬, বিশ্লেষণ: বুখারী।
⁸⁹ সহীহ বুখারী, শাহাদাত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: এক মহিলা অপর মহিলার সততা সম্পর্কে সাক্ষ্য দান, হাদীস নং ২৫১৮; সহীহ মুসলিম, তাওবা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ইফকের ঘটনা ও অপবাদ দানকারীর তাওবা কবুল প্রসঙ্গে, হাদিস নং-৭১৯৬
⁹⁰ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪৭-৪৯ সংক্ষেপ করার মাধ্যমে উদ্ধৃত。
⁹¹ রিসালাতুন ফির রদ্দি 'আলার রাফিযা: ২৫, ২৬
⁹² ইবন কাছীর: ৩/২৭৮
📄 তৃতীয়ত: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে গালি দেওয়ার বিধান
যে ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে এমন বিষয় দ্বারা গালি দিবে যা থেকে আল্লাহ তা'আলা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন, সে ব্যক্তির ব্যাপারে বিজ্ঞজন তথা আলেমদের ঐক্যবদ্ধ মতামত হলো, সে কাফির হয়ে যাবে।
কাযী আবু ইয়া'লা রহ. বলেন: "যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে এমন বিষয়ে অপবাদ দিবে যা থেকে আল্লাহ তা'আলা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন, সে ব্যক্তি কোনো প্রকার বিতর্ক ছাড়াই কাফির হয়ে যাবে।” আর এ ব্যাপারে একাধিক ইজমা সংঘটিত হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। একাধিক ইমাম এ হুকুম বা বিধানটিকে সুস্পষ্ট করেছেন। ইমাম মালেক রহ. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: "যে ব্যক্তি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি দিবে, се ব্যক্তিকে বেত্রাঘাত করা হবে, আর যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। তাকে প্রশ্ন করা হলো, কেন? তখন তিনি বললেন: যে ব্যক্তি তার প্রতি অপবাদ বা অভিযোগের বাণ নিক্ষেপ করল, সে ব্যক্তি আল-কুরআনের বিরোধিতা করল।"⁸¹
আর ইবনু শা'বান রহ, তার এক বর্ণনায় বলেন, মালেক রহ. থেকে তা বর্ণিত আছে, কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
(يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [النور: ١٧]
"আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, 'তোমরা যদি মুমিন হও, তবে কখনো যাতে অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর।" [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৭] সুতরাং যে ব্যক্তি অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করবে, সে কাফির হয়ে যাবে।⁸²
যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে অপবাদ দিবে, সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রদত্ত দলীলসমূহ সুস্পষ্ট এবং পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত। তন্মধ্যে কয়েকটি:
১. প্রথমত: ইমাম মালেক রহ, যার দ্বারা দলীল পেশ করেছেন, তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এর মধ্যে আল-কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে, যে কুরআন তাঁর নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছে। আর আল-কুরআন যা নিয়ে এসেছে, তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা কুফুরী।
ইমাম ইবনু কাছীর রহ. বলেন: "আলেমগণ ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত পেশ করেছেন, যে ব্যক্তি এর পরেও তাকে গালি দিবে এবং এই আয়াতের মধ্যে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তার পরেও তাকে এর দ্বারা অপবাদ দিবে, যার দ্বারা তাকে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, সে আল-কুরআন বিরোধী।"⁸³
ইবন হাযম রহ. ইমাম মালেক রহ.-এর পূর্বের কথার ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন: "এখানে ইমাম মালেক রহ.-এর কথা সহীহ। আর তা হলো আয়াতকে পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা এবং আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাকে (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে) অকাট্যভাবে নির্দোষ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে আল্লাহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।"⁸⁴
২. দ্বিতীয়ত: এর মাধ্যমে বিভিন্ন কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়া ও তাঁর মানহানির বিষয় রয়েছে, যে ব্যাপারে আল-কুরআনুল কারীম প্রমাণ পেশ করেছে। আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُواْ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَدَةً أَبَدًا وَأُوْلَبِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴾ [النور: ٤]
“আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে না আসে, তাদেরকে তোমরা আশিটি কশাঘাত কর এবং তোমরা কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। এরাই তো ফাসিক।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৪]
এবং তাঁর বাণী:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾ [النور: ٢৩]
“যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-উদাস, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা তো দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩]-এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। সুতরাং তিনি দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যা করার সময় বলেন: এ আয়াতটি বিশেষ করে 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র স্ত্রীদের শানে অবতীর্ণ। আর তাতে তাওবার বিষয় নেই। আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিন নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য তার বক্তব্যের শেষের দিকে তাওবার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, সুতরাং ব্যক্তি আপেক্ষিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করবে, অতঃপর সর্বোত্তম ব্যাখ্যাটি মাথা পেতে গ্রহণ করবে।”⁸⁵
সুতরাং আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতটি ঐ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে, যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা ও মুমিন জননীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে। কারণ, তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অপবাদ ও দোষারোপের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কেননা, নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, যেমনিভাবে তা তার ছেলে-সন্তানকে কষ্ট দেয়। কারণ, তা তাকে দাইউছের⁸⁶ সাথে সম্পর্কিত করে এবং তার দাম্পত্য জীবনে বিশৃঙ্খলার প্রকাশ ঘটায়। আর নিশ্চয় তার স্ত্রীর ব্যভিচার তাকে ভীষন কষ্ট দেয়... এবং সম্ভবত কোনো কোনো মানুষের সাথে তার পরিবারের প্রতি অপবাদ আরোপের কারণে যে লজ্জা ও অসম্মান সম্পৃক্ত হয়, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবে অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার চেয়েও জঘন্য। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়া সর্বসম্মতিক্রমে কুফুরী।⁸⁷
ইমাম কুরতুবী রহ, আল্লাহ তা'আলার বাণী:
(يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا) [النور: ١٧]
"আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, কখনো যাতে অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৭]
প্রসঙ্গে বলেছেন: এ আয়াতটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। (অর্থাৎ তার ব্যাপারে যাতে তোমরা অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর) কারণ, অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি বলতে যার সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে, তার সম্পর্কে অবিকল সে কথার মতো পুনরায় কথা বলাকেই বুঝায় অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের মধ্য থেকে যিনি তার মর্যাদায় ছিলেন, তার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। কারণ, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মানসম্মান ও পরিবারকে নিয়ে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপার রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে, এটা তার পক্ষ থেকে কুফুরী বলে গণ্য হবে।⁸⁸
আর যা প্রমাণ করে যে, তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করাটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্টের কারণ, তা ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে ইফকের ঘটনা সংবলিত হাদীসে বর্ণনা করেছেন। 'আয়শা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
"... فَقَامَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى الْمِنْبَرِ فَاسْتَعْذَرَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أُبَيَّ ابْنِ سَلُولَ قَالَتْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَر: «يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ مَنْ يَعْذِرُنِي مِنْ رَجُلٍ قَدْ بَلَغَ أَذَاهُ فِي أَهْلِ بَيْتِي ...".
"...অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরের উপর দাঁড়ালেন, অতঃপর তিনি আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বললেন: 'হে মুসলিম সমাজ! আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে লোক আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে?..."⁸⁹
সুতরাং তার কথা: (مَنْ يَعْذِرُنِي) অর্থাৎ যখন আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে ব্যক্তি আমাকে জ্বালাতন করেছে, আর আমি তার থেকে প্রতিকার চাই, তখন কে আমার প্রতি ইনসাফ করবে এবং তার প্রতিকার করবে। আর আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন।
সুতরাং এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বারা খুবই কষ্ট পেয়েছেন এবং তার ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। আর যেসব মুমিন উত্তেজিত হয় নি, তারা বললেন: আপনি আমাদেরকে নির্দেশ দিন, আমরা তাদের গর্দান উড়িয়ে দিব। সুতরাং আমরা আপনাকে অপবাদ থেকে মুক্ত করব, যখন আপনি আমাদেরকে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিবেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা'দের কথার কোনো প্রতিবাদ করেন নি, যখন সে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ চেয়েছেন।⁹⁰
শাইখ মুহাম্মদ ইবন আবদিল ওহাব রহ. বলেন: “যে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে পবিত্রতমা (যা তার থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত) উম্মুল মুমিনীন জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, তবে সে হবে মুনাফিকদের প্রধান আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের কাতারের লোক। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলার ভাষা হলো: 'মুসলিম সমাজ! আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে লোক আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে?
আল-কুরআনের ভাষায়:
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا * وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا ) [الاحزاب: ٥٧، ٥٨]
"নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে লা'নত করেন এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, যা তারা করে নি তার জন্য। নিশ্চয় তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করল।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৭-৫৮]
সুতরাং কোথায় তাঁর দীনের সাহায্যকারীগণ, যারা তাকে লক্ষ্য করে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে অপবাদ থেকে মুক্ত করব।"⁹¹
যেমনিভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করার মধ্যে অপর দৃষ্টিকোণ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদাহানির বিষয় রয়েছে, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ...﴾ [النور: ٢٦]
"দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য ...।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৬]
ইবন কাছীর রহ, বলেন: "আল্লাহ তা'আলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে পবিত্র অবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী বানিয়েছেন। কারণ, তিনি হলেন পবিত্র মানুষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পবিত্রতম, আর তিনি (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা) যদি দুশ্চরিত্রা নারী হতেন (না'উযুবিল্লাহ), তবে তিনি শর'ঈ ও মর্যাদার দিক বিবেচনায় তাঁর (রাসূলের) জন্য উপযুক্ত হতেন না। আর এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿أُوْلَبِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ ﴾ [النور: ٢٦]
"লোকেরা যা বলে তার সাথে তারা সম্পর্কহীন।" [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৬]
অর্থাৎ মিথ্যাবাদী ও সীমালংঘনকারী গোষ্ঠী যা বলে, তারা তার থেকে সমপূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।"⁹²
টিকাঃ
⁸¹ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৬৫, ৫৬৬, আর খবরটি সনদসহ আল-মুহাল্লা (১৮১)-এর মধ্যে রয়েছে: ১১/৪১৪, ৪১৫
⁸² কাযী 'আইয়াদ্ব, আশ-শিফা, বিশ্লেষণ: আল-বাজাবী, ২/১১০৯
⁸³ দেখুন, তাফসীরু ইবন কাছীর: ৩/২৭৬; আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾ [النور: ২৩] "যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-উদাস, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা তো দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩]-এর ব্যাখ্যায়।
⁸⁴ আল-মুহাল্লা (المحلى): ১১/৪১৫
⁸⁵ দেখুন: ইবনু জারীর, ১৮/৮৩; আর তার থেকে ইবন কাছীর, ৩/২৭৭
⁸⁶ দাইউছ (দিউট) হল: স্ত্রীর ব্যভিচারে নির্লিপ্ত স্বামী।
⁸⁷ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪৫; কুরতুবী: ১২/১৩৯, মুদ্রণ: দারুল কুতুবিল 'ইলমিয়্যা।
⁸⁸ কুরতুবী: ২/১৩৬, ২৩৭; ইবনুল 'আরাবী থেকে বর্ণিত, আহকামুল কুরআন: ৩/১৩৫৫, ১৩৫৬, বিশ্লেষণ: বুখারী।
⁸⁹ সহীহ বুখারী, শাহাদাত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: এক মহিলা অপর মহিলার সততা সম্পর্কে সাক্ষ্য দান, হাদীস নং ২৫১৮; সহীহ মুসলিম, তাওবা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ইফকের ঘটনা ও অপবাদ দানকারীর তাওবা কবুল প্রসঙ্গে, হাদিস নং-৭১৯৬
⁹⁰ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪৭-৪৯ সংক্ষেপ করার মাধ্যমে উদ্ধৃত。
⁹¹ রিসালাতুন ফির রদ্দি 'আলার রাফিযা: ২৫, ২৬
⁹² ইবন কাছীর: ৩/২৭৮
📄 চতুর্থত: অবশিষ্ট মুমিন জননীদেরকে গালি দেওয়ার বিধান
অবশিষ্ট মুমিন জননীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করার বিধানের ক্ষেত্র আলেমগণ মতভেদ করেছেন। তবে অধিকাংশের নিকট অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত হলো এ ধরনের আচরণকারী কাফির। কারণ, অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আর আল্লাহ তা'আলা তার (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা) জন্য রাগান্বিত হয়েছেন। কেননা তিনি ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী। সুতরাং তিনি (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা) এবং তাঁর অন্যান্য স্ত্রীগণ সকলেই আইনের চোখে সমান।⁹³
অনুরূপভাবে আরেকটি কারণ হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মধ্যে তাঁর জন্য মর্যাদাহানি ও কষ্টের কারণ নিহিত রয়েছে। যার বর্ণনা আমরা করেছি 'যে ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, তার বিধান আলোচনা করার সময়।' তবে এ অপবাদ ব্যতীত মুমিন জননীদেরকে গালি দিলে, তখন তাদের বিধান হবে অপরাপর সাহাবীগণকে গালি দেওয়ার বিধানের মতো, যার বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে।⁹⁴
টিকাঃ
⁹³ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৮/৯৫
⁹⁴ কাযী 'আইয়াদ্ব, আশ-শিফা, বিশ্লেষণ: আল-বাজাবী, ২/১১০৯; আরও দেখুন: আস-সাওয়ায়েক আল-মুহরিক্কা, পৃষ্ঠা ৩৮৭; আল-মুহাল্লা: ১১/৪১৫
📄 পঞ্চমত: যে সাহাবীর মর্যাদা মুতাওয়াতির বর্ণনার দ্বারা সাব্যস্ত হয় নি, তাকে এমন গালি দেওয়া, যা তার দীনে আঘাত করে
যে ব্যক্তি এমন কোনো সাহাবীকে গালি দেয়, দীনী দৃষ্টিকোণ থেকে যার মর্যাদার ব্যাপারে মুতাওয়াতির পর্যায়ের বর্ণনা রয়েছে, সে গালিদাতাকে কাফির বলে আখ্যায়িত করার অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতামতটি আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করেছি।
তবে যার মর্যাদার ব্যাপারে মুতাওয়াতির পর্যায়ের বর্ণনা আসে নি, তাকে যে ব্যক্তি গালি দিবে, অধিকাংশ আলেমের মতে সে কাফির হবে না। আর এটা এ জন্য যে, তার দ্বারা দীনের আবশ্যকীয়ভাবে জ্ঞাত কোনো বিষয়কে অস্বীকার করা হয় না, তবে তাকে যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তথা সহচর্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গালি দেওয়া হয়, তবে গালিদাতা কাফির হয়ে যাবে।
ইমাম মুহাম্মদ ইবন 'আবদিল ওহাব রহ, বলেছেন: "যদি তিনি এমন সাহাবীর অন্তর্ভুক্ত হন, যার মর্যাদা ব্যাপারে মুতাওয়াতির পর্যায়ের বর্ণনা আসে নি, তাহলে পরিষ্কাভাবে ঐ সাহাবীকে গালিদাতা ফাসিক বলে গণ্য হবে, তবে তাকে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাঁর সহচর্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গালি দেওয়া হয়, তবে গালিদাতা কাফির হয়ে যাবে।"⁹⁵
ষষ্ঠত: তাদের কাউকে এমন গালি দেওয়া, যা তাদের দীন ও ন্যায়পরায়ণতায় আঘাত করে না:
কোনো সন্দেহ নেই যে, এমন কাজ যে করবে, সে তিরস্কার ও শাস্তির অধিকারী হবে। কিন্তু আমরা অধ্যয়ন বা অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, উল্লিখিত তথ্যপঞ্জিতে আলেমদের উক্তিসমূহতে আমরা তাদের মধ্য থেকে একজনকেও এরূপ গালিদাতাকে কাফির বলে আখ্যায়িত করতে দেখি নি আর এ ব্যাপারে তাদের মতে সাহাবীগণের মধ্যে বড় বা ছোট বলে কোনো পার্থক্য নেই।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা রহ. বলেন: “তবে যদি সে তাদেরকে এমন গালি দেয়, যা তাদের ন্যায়পরায়ণতা ও দীনকে কলুষিত করে না। যেমন, তাদের কাউকে কৃপণ বলা অথবা কাপুরুষ বলা অথবা অল্প বিদ্যান বলে আখ্যায়িত করা অথবা দুনিয়াদার বলে সম্বোধন করা ইত্যাদি, তবে সে তিরস্কার ও শাস্তির অধিকারী হবে। আর শুধু এ কারণে আমরা তাকে কাফির বলে ফতোয়া দিব না। আর এ যুক্তির ওপর নির্ভর করছে ঐ ব্যক্তির কথা, আলেমদের মধ্য থেকে যিনি তাকে (এ কারণে) কাফির বলে আখ্যায়িত করেন না।"⁹⁶
আবু ই'য়ালা রহ, কতিপয় দৃষ্টান্তের উল্লেখ করেছেন, যাতে রাজনৈতিক কারণে তাদেরকে স্বল্প জ্ঞানের দোষে দোষারোপ করা হয়েছে।⁹⁷
আর অনুরূপ বিধানই প্রযোজ্য হবে তার প্রতি যে তাদেরকে দুর্বল সিদ্ধান্ত, দুর্বল ব্যক্তিত্ব, অলসতা, দুনিয়ালোভী ইত্যাদি দোষে দোষারোপ করবে। বস্তুত এ প্রকারের অপবাদ দ্বারা ইতিহাসের কিতাবগুলো পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে আহলে সুন্নাতের সাথে সম্পর্কিত সাম্প্রতিক শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীলতা ও পাঠ পদ্ধতির নামে এসব অপবাদে ভরপুর হয়ে আছে। মূলত এ প্রকারের অধিকাংশ শিক্ষায় প্রাচ্যবিদদের একটা প্রভাব রয়েছে।
টিকাঃ
⁹⁵ আর-রাদ্দু 'আলা আর-রাফেদা, পৃষ্ঠা ১৯
⁹⁶ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৮৬
⁹⁷ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৭১