📄 প্রথমত: যে ব্যক্তি সকল সাহাবীকে অথবা অধিকাংশকে কাফির, মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বা ফাসিক বলে গালি দিবে তার বিধান
যে ব্যক্তি সকল সাহাবীকে অথবা অধিকাংশকে কাফির, মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বা ফাসিক বলে গালি দিবে তার বিধান হলো, যে ব্যক্তি এমন কথা বলবে, সে ব্যক্তি কাফির হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, আর এ কাফির হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো:
১. এ কথার অর্থ হলো কুরআন ও সুন্নাহর সংকলনকারীগণ কাফির বা ফাসিক। আর এ কারণে আল-কুরআন ও হাদীসসমূহের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হবে। কারণ, সংকলনকারীদেরকে অপবাদ দেওয়ার অর্থ হলো তাদের দ্বারা সংকলিত বিষয়ে অপবাদ দেওয়া।
২. এর মধ্যে ঐ বিষয়টিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়, যে বিষয়ে কুরআন বক্তব্য পেশ করেছে। যেমন, তাদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্ট হওয়ার কথা এবং তাদের গুণগান করা। কারণ, 'আল-কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যসমূহ থেকে অর্জিত জ্ঞান অকাট্যভাবে তাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে।'৫৫ আর যে ব্যক্তি অকাট্য দলীলকে অস্বীকার করে, সে কাফির হয়ে যায়।
৩. এর মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপার রয়েছে। কারণ, তারা হলেন তার সঙ্গী-সাথী ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গ। সুতরাং তাঁর বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক গালি দেওয়া এবং তাদের প্রতি অপবাদ দেওয়াটা তাকে নিঃসন্দেহে কষ্ট দেয় আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়া কুফুরী যা সর্বজন স্বীকৃত।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রহ. এ প্রকার গালির বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনাপূর্বক বলেন: “আর যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে সীমা অতিক্রম করে বলবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পরে তাদের (সাহাবীগণের) অল্প সংখ্যক ব্যক্তি, যাদের সংখ্যা দশ জনের বেশি হবে না, এমন সংখ্যক ব্যক্তি ছাড়া সকলেই মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে গেছে অথবা তারা সকলেই ফাসিক হয়ে গিয়েছে, তবে এ ধরনের কথাও নিঃসন্দেহে তার কুফুরীর মধ্যে পড়ে। কারণ, সে আল-কুরআনের একাধিক জায়গায় প্রদত্ত বক্তব্যকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। যেমন, তাদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্ট হওয়ার কথা এবং তাদের গুণগান করা। বরং যে ব্যক্তি এ ধরনের কুফুরীর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করবে, তবে তা তার কুফুরী হিসেবে বিবেচিত হবে... তিনি বলেন: দীন ইসলামের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে যা জানা যায়, তা থেকেই এটা কুফুরী বলে গণ্য।"⁵⁶
হাইছামী রহ. বলেন: "অতঃপর আলোচনা বা সমালোচনা তথা বিতর্ক হলো শুধু তাদের কিছু সংখ্যককে গালি দেওয়ার ব্যাপারে, তবে তাদের সকলকে গালি দেওয়া যে নির্ভেজাল কুফুরী তাতে কোনো প্রকার সন্দেহ ও সংশয় নেই।"⁵⁷
আর পূর্ববর্তী পূর্ণাঙ্গ দলীলসমূহের সুস্পষ্টতা সত্ত্বেও কোনো কোনো আলেম আরও কিছু ব্যাখ্যামূলক দলীলের উল্লেখ করেন, তন্মধ্য থেকে কয়েকটি নিম্নরূপ:
প্রথমত: আমাদের নিকট আলেমদের পক্ষ থেকে সূরা আল-ফাতহ'র শেষ আয়াতের যে তাফসীর উপস্থাপিত হয়েছে: مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ وَ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ... لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ ... ﴾ [الفتح: ٢٩]
"মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর তার সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল... যাতে তিনি তাদের (মুমিনদের) সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জালা সৃষ্টি করেন...।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯]
ইমাম মালেক রহ, এ আয়াত থেকে মাসআলা উদ্ভাবন করেছেন, যে ব্যক্তি সাহাবীগণকে অবজ্ঞা করে, সে কাফির। কারণ, সাহাবীগণ তাদেরকে ক্রোধান্বিত করে। আর যে ব্যক্তিকে সাহাবীগণ রাগান্বিত করে, সে কাফির। আর ইমাম শাফে'ঈ রহ. ও অন্যান্যরাও তার মতো অভিমত ব্যক্ত করেন।⁵⁸
দ্বিতীয়ত: পূর্বে আলোচিত ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. কর্তৃক সংকলিত আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীস, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: آية الإيمان حب الأنصار، وآية النفاق بغض الأنصار».
"আনসারদেরকে ভালোবাসা ঈমানের লক্ষণ আর আনসারদেরকে ঘৃণা করা নিফাকীর লক্ষণ।"⁵⁹
অপর এক বর্ণনায় আছে: لا يحبهم إلا مؤمن، ولا يبغضهم إلا منافق ... ...
"তাদেরকে শুধু মুমিনরাই ভালোবাসে আর তাদেরকে শুধু মুনাফিকরাই ঘৃণা করে...।"⁶⁰
আর ইমাম মুসলিম রহ. কর্তৃক বিশুদ্ধ সনদসহ আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لا يُبْغِضُ الأَنْصَارَ رَجُلٌ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ».
"আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান স্থাপন করে এমন কোনো লোক আনসারদেরকে ঘৃণা বা অবজ্ঞা করবে না।"⁶¹
সুতরাং যে ব্যক্তি তাদেরক গালি দিবে সে তাদের প্রতি আরও বেশি অবজ্ঞা প্রদর্শন করল। সুতরাং তার মুনাফিক হওয়াটা আবশ্যক হয়ে যায়, যে আল্লাহ ও পরকাল বিশ্বাস করে না।⁶²
তৃতীয়ত: যা আমীরুল মুমিনীন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে সাব্যস্ত ও প্রমাণিত। তিনি ঐ ব্যক্তিকে দোররা দ্বারা আঘাত করেছেন, যে ব্যক্তি তাকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে। অতঃপর উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন:
«أبو بكر كان خير الناس بعد رسول الله صلى الله عليه وسلم في كذا وكذا»
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে এই এই ক্ষেত্রে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ।" অতঃপর উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন:
«من قال غير هذا أقمنا عليه ما نقيم على المفتري»
"যে ব্যক্তি এর ব্যতিক্রম বলবে, আমরা তার ওপর ঐ শাস্তি প্রয়োগ করব, যে শাস্তি আমরা অপবাদ দানকারীর ওপর প্রয়োগ করে থাকি। "⁶³
আর অনুরূপভাবে আমীরুল মুমিনীন আলী ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন:
«لا يفضلني أحد على أبي بكر وعمر إلا جلدته حد المفتري»
"যে কেউ আমাকে আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা'র ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করবে, আমি তাকে অপবাদ দানকারীর জন্য নির্ধারিত শাস্তির মতো বেত্রাঘাত করব।"⁶⁴
সুতরাং খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্যতম দু'জন খলিফা উমার ও আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা যখন ঐ ব্যক্তিকে অপবাদ দানকারীর জন্য নির্ধারিত শাস্তির মতো বেত্রাঘাত করতেন, যে ব্যক্তি আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা'র ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করত, অথবা যে ব্যক্তি উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু'র ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করত। অথচ শুধু একজনকে অন্যের ওপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করার মধ্যে কোনো প্রকার গালি ও দোষ নেই। সুতরাং জেনে রাখা দরকার, তাদের উভয়ের নিকট গালির শাস্তি এর চেয়ে আরও কত বেশি ভয়ানক হতে পারে!⁶⁵
টিকাঃ
৫৫ আর-রাদ্দু 'আলা আর-রাফেদা, পৃষ্ঠা ১৯
⁵⁶ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৮৬, ৫৮৭
⁵⁷ হাইছামী, আস-সাওয়ায়েক আল-মুহরিকা, পৃষ্ঠা ৩৭৯
⁵⁸ আস-সাওয়া'য়েক আল-মুহরিক্কা, পৃষ্ঠা ৩১৭; তাফসীরে ইবন কাছীর: ৪/২০৪; খাল্লালের 'আস-সুন্নাহ' এর মধ্যে খবরটি সনদসহ আছে, পৃষ্ঠা ৪৭৮, নং (৭৬০), বিশ্লেষণ: ড. 'আতিয়াতুয যাহরানী。
⁵⁹ সহীহ বুখারী: ৭/১১৩; সহীহ মুসলিম: ১/৮৫
⁶⁰ সহীহ বুখারী: ৭/১১৩; সহীহ মুসলিম: ১/৮৫ (হাদিসটি বারা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত)।
⁶¹ সহীহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: আনসার ও আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমকে ভালোবাসা ঈমান ও তার নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের অবজ্ঞা করাটা নিফাকীর লক্ষণের অন্তর্ভুক্ত
⁶² আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৮১
⁶³ ইমাম আহমদ, ফাযায়েলুস সাহাবা: ১/৩০০; ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা আস-সারিমুল মাসলুল এর মধ্যে হাদীসটি বা আছারটিকে সহীহ বলেছেন: পৃষ্ঠা ৫৮৫
⁶⁴ ইমাম আহমদ, ফাযায়েলুস সাহাবা: ১/৮৩; ইবনু আবি 'আসিম, 'আস-সুন্নাহ': ২/৫৮৫, হেকাম ইবন জাহলের সনদে বর্ণিত, তার সনদটি আবু 'ওবায়দা ইবনুল হেকামের দুর্বলতার কারণে দুর্বল। দেখুন: ফাযায়েলুস সাহাবা: ১/৮৩; কিন্তু তার কতিপয় প্রত্যয়নকারী (শাওয়াহেদ) সনদ রয়েছে, তন্মধ্যে ইবন আবি 'আসিমের মতে একটি হলো 'আলী থেকে 'আলকামা -এ সনদে, 'আস-সুন্নাহ': ২/৪৮, আলবানী তার সনদকে হাসান বলেছেন, আর আল-লালকায়ী'র (৭/১২৯৫) মতে- অপর সনদটি হলো: 'আলী থেকে সুওয়াঈদ ইবন গাফালা。
⁶⁵ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৮৬
📄 দ্বিতীয়ত: যে ব্যক্তি তাদের কাউকে গালি দেয়, সে তাদের দীনের ব্যাপারে অপবাদ দেয়
যেমন তাদেরকে কাফির বা ফাসিক বলে অপবাদ দেওয়া, যারা হচ্ছেন এমন সাহাবী, যাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে মুতাওয়াতির⁶⁶ পর্যায়ের নস বা বক্তব্য রয়েছে। যেমন, খলিফাগণ। এ জাতীয় কাউকে কাফির বা ফাসিক বলা বিশুদ্ধ মতে কুফরী। কারণ, এর মাধ্যমে মুতাওয়াতির পর্যায়ের বিষয়কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়।
আবু মুহাম্মদ ইবন আবু ইয়াযিদ রহ, সাহনূন রহ, থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "যে ব্যক্তি আবু বকর, উমার, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমের ব্যাপারে বলবে যে, তারা ভ্রষ্টতা ও কুফুরীর ওপর বিদ্যমান ছিল, সে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। আর যে ব্যক্তি তারা ব্যতীত অপরাপর সহাবীদেরকে অনুরূপ গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।"⁶⁷
হিশাম ইবন 'আম্মার রহ. বলেন, "আমি মালেক রহ.-কে বলতে শুনেছি "যে ব্যক্তি আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। আর যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকেও হত্যা করা হবে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা তাঁর ব্যাপারে বলেন:
﴿ يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [النور: ١٧]
"আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, 'তোমরা যদি মুমিন হও তবে কখনো যাতে অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর।" [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৭]
মর্যাদার ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহ'র নস বা বক্তব্য মুতাওয়াতির পর্যায়ে উন্নিত হয়েছে অথবা মুতাওয়াতির পর্যায়ে উন্নিত হয় নি, আর সম্ভবত তার পরিসংখ্যান খুবই কাছাকাছি, আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। আর অনুরূপভাবে কেউ কেউ খোলাফায়ে রাশেদীনের গালিদাতাকে কাফির বলে আখ্যায়িত করার বিষয়টিকে তাদের প্রতি কুফুরের অভিযোগ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন (অর্থাৎ তাদেরকে কাফির বললেই সে কাফির হবে); আর বাকি সাহাবীদের কাউকে গালি দিলে, তা হবে অপবাদ দেওয়ার শামিল। [অর্থাৎ তার উপর অপবাদের শাস্তি প্রয়োগ হবে] (দ্র. মুহাম্মদ ইবন আবদিল্লাহ আল-ওয়াহাইবী, 'ই'তিকাদু আহলে সুন্নাহ ফিস্ সাহাবা'।
সুতরাং যে ব্যক্তি তার প্রতি অপবাদ বা অভিযোগের বাণ নিক্ষেপ করবে, সে ব্যক্তি আল-কুরআনের বিপক্ষে অবস্থান নিবে, আর যে ব্যক্তি আল-কুরআনের বিপক্ষে অবস্থান নিবে, তাকে হত্যা করা হবে।"⁶⁸
অপর এক বর্ণনায় ইমাম মালেক রহ.-এর কথা (যে ব্যক্তি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে বেত্রাঘাত করা হবে। আর যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। তাকে প্রশ্ন করা হলো: কেন? তখন তিনি বললেন: যে ব্যক্তি তার প্রতি অপবাদ বা অভিযোগের বাণ নিক্ষেপ করবে, সে ব্যক্তি আল-কুরআনের বিপক্ষে অবস্থান নেবে। বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। আর আল্লাহই সবচেয়ে বেশি ভালো জানেন।
এখানে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি দেওয়ার বিধান প্রশ্নে ইমাম মালেক রহ.-এর উদ্দেশ্য হলো কুফুরীর চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের অপরাধ। আর 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা'র প্রসঙ্গে তার অবশিষ্ট কথাই তা সুষ্পষ্ট করে দেয়। যেমন, তিনি বলেছেন: (যে ব্যক্তি তার প্রতি অপবাদ বা অভিযোগের বাণ নিক্ষেপ করবে, সে ব্যক্তি আল-কুরআনের বিপক্ষে অবস্থান নেবে।) সুতরাং এটা নির্দিষ্ট গালি, যা প্রয়োগকারী কাফির হবে এবং তা সকল গালিকে অন্তর্ভুক্ত করবে না। আর এটা এ জন্য যে, মালেক রহ, থেকে হত্যা করার কথা বর্ণিত হয়েছে ঐ ব্যক্তির প্রসঙ্গে, যে ব্যক্তি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর চেয়ে কম মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিকে কাফির বলবে।"⁶⁹
হাইছামী রহ. আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি দেওয়ার বিধান সম্পর্কে বলেন: হানাফীদের মতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি দেওয়া কুফরী, আর শাফে'ঈদের মতে, দু'টি দৃষ্টিভঙ্গির কোনো একটিকে গ্রহণ করা। আর মালেক রহ.-এর প্রসিদ্ধ মাযহাব হলো, এর দ্বারা বেত্রাঘাত ওয়াজিব হবে। কারণ, তা কুফুরী নয়। তবে হ্যাঁ, কখনও কখনও তিনি তার এ মত থেকে বের হয়ে যান, যেমনটি তার থেকে বর্ণিত হয়েছে খারেজীদের ব্যাপারে, আর তা হলো সে কাফির হয়ে যাবে। সুতরাং তার নিকট মাসআলাটির দু'টি অবস্থা: "সে যদি কাফির না বলে শুধু গালির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তিনি তাকে কাফির বলেন নি, তার ব্যতিক্রম হলে, সে কাফির হয়ে যাবে।"⁷⁰
তিনি আরও বলেন: "আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু এবং তার মত যাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন, তাদেরকে কাফির বলার বিধান সম্পর্কে শাফে'ঈ মাযহাবের অনুসারীগণ কোনো কথা বলেন নি। আর তিনি এ ব্যাপারে অকাট্যভাবে কুফুরী বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। "⁷¹
আল-খুরাশী রহ. বলেন: "যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে অপবাদের বাণে বিদ্ধ করবে, যা থেকে আল্লাহ তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা দিয়েছেন..., অথবা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে সাহাবী বলে অস্বীকার করবে অথবা জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত বিশেষ দশ জনের ইসলাম গ্রহণকে অস্বীকার করবে অথবা সকল সাহাবীর ইসলাম গ্রহণকে অস্বীকার করবে অথবা প্রসিদ্ধ চারজনকে কাফির বলবে অথবা তাদের একজনকে কাফির বলবে, তবে সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে।"⁷²
বাগদাদী রহ. বলেন: "আর তারা এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে কাফির বলে আখ্যায়িত করেন, যে ব্যক্তি সে দশ জনের কোনো একজনকে কাফির বলে, যাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন, আবার তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল স্ত্রী'র পারস্পরিক বন্ধুত্বের কথা বলেন এবং তারা ঐ ব্যক্তিকে কাফির বলে আখ্যায়িত করেন যে ব্যক্তি তাদেরকে কাফির বলে অথবা তাদের ব্যক্তি বিশেষকে কাফির বলে।"⁷³
আর এ মাসআলাটির মধ্যে খোলামেলা বিতর্ক রয়েছে; সম্ভবত অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য বিধানটি পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। আর যারা এ পরিস্থিতিতে কাফির না হওয়ার কথা বলেন তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কবীরা গুনাহ করার কারণে সে ফাসিক। সাহাবীর মর্যাদা ও গালির ধরণ অনুযায়ী সে তিরস্কার ও শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত হবে।
এর বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ: হাইছামী রহ. বলেন: “যারা সাহাবীগণের গালিদাতাকে কাফির না হওয়ার কথা বলেন তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তারা ফাসিক।"⁷⁴
ইবনু তাইমিয়্যা রহ, বলেন: "ইবরাহীম নখ'ঈ রহ. বলেন: আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে গালি দেওয়াকে কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত বলা হতো। অনুরূপভাবে আবু ইসহাক আস-সাবি'ঈ বলেন: আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে গালি দেওয়াটাকে ঐসব কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত, যার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿إِن تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ﴾ [النساء: ٣١]
"যদি তোমরা ঐসব কবীরা গুনাহ থেকে দূরে থাক, যার থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩১]
আর তাদের গালি দেওয়ার পরিণতি যখন এ পর্যায়ের, তখন তার সর্বনিম্ন বিধান হলো তিরস্কার করা। কারণ, তার বিধান শরী'আত বিধিবদ্ধ করেছে এমন প্রতিটি অপরাধের জন্য, যার বিধানের মধ্যে হদ তথা শরী'আত নির্ধারিত শাস্তি ও কাফফারার ব্যবস্থা নেই... আর এটি (হদ ও কাফফারা) এমন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ও তাদের যথার্থ অনুসারী তাবে'ঈগণ থেকে শুরু করে ফিকাহবিদ ও বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মধ্যে কোনো বিতর্ক আছে বলে আমরা জানি না। সুতরাং তারা সকলেই এ কথার ওপর ঐক্যবদ্ধ যে, উম্মতের উপর আবশ্যক হলো সাহাবীগণের গুণাবলী আলোচনা করা, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা... এবং যে ব্যক্তি তাদের ব্যাপারে মন্দ কথা বলবে, তার শাস্তির ব্যবস্থা করা।⁷⁵
আর কাযী 'আইয়াদ্ব বলেন: "তাদের কাউকে গালি দেওয়া কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত, আর আমাদের মাযহাব ও অধিকাংশ আলেমের মাযহাব হলো তাকে তিরস্কার করা হবে, তবে হত্যা করা হবে না।"⁷⁶
আর আব্দুল মালেক ইবন হাবিব বলেন: "শিয়াদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে অবজ্ঞা করা ও তার থেকে মুক্ত থাকার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে, তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। আর যদি সে আরও বাড়িয়ে আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমাকেও অবজ্ঞা করে, তবে তার ওপর কঠোর শাস্তি প্রয়োগ হবে, বারবার তাকে প্রহার করা হবে এবং তাকে দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে বন্দী করে রাখা হবে, শেষ পর্যন্ত সে সেখানে মারা যাবে।"⁷⁷
সুতরাং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি দেওয়ার শাস্তি হিসেবে শুধু বেত্রাঘাতের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ, এ বেত্রাঘাত প্রযোজ্য হবে শুধু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহচর্য পাওয়ার অধিকারের জন্য। সুতরাং যখন সহচর্যের সাথে অন্য আরও এমন কোনো গুণাবলী যুক্ত হয়, যা অতিরিক্ত সম্মান পাওয়ার দাবি করে; যেমন, দীন ও মুসলিম ব্যক্তিবর্গকে সাহায্য করা, তার হাতে কোনো বিজয় অর্জন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিলাফত পাওয়া ইত্যাদি, তবে এসব বিষয়ের প্রত্যেকটি বিষয়ই তার ওপর কোনো ব্যক্তির স্পর্ধা দেখানোর সময় আবশ্যকীয়ভাবেই অতিরিক্ত শাস্তি দাবি করবে।⁷⁸
ইমাম আহমদ রহ. বলেন, "তাদের মন্দ দিকের কোনো কিছু আলোচনা-সমালোচনা করা এবং তাদের কাউকে দোষারোপ করা কোনো ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এ কাজ করবে, তাকে শাস্তি দেওয়া প্রশাসকের ওপর আবশ্যক হয়ে পড়বে, তাকে ক্ষমা করার অধিকার তার (প্রশাসকের) নেই; বরং তিনি তাকে শাস্তি দিবেন এবং তাকে তাওবা করতে বলবেন। অতঃপর সে যদি তাওবা করে, তবে তিনি তা গ্রহণ করবেন। আর যদি সে তার কথায় অটল থাকে, তবে তাকে পুনরায় শাস্তি দিবেন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিবেন, শেষ পর্যন্ত সে সেখানে মারা যাবে অথবা সংশোধন হয়ে ফিরে আসবে।"⁷⁹
সুতরাং মুসলিম ভাই আমার! যে ব্যক্তি তাদের কাউকে দোষারোপ করে অথবা কাউকে নিন্দা করে, সে ব্যক্তির ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামের কথার প্রতি লক্ষ্য করুন, আরও লক্ষ্য করুন আবশ্যকীয়ভাবে তার ওপর শাস্তির বিধানের প্রতি। আর যখন কোনো কোনো ইমামের নিকট তাদেরকে উল্লিখিত গালি দেওয়াটা কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে গালিদাতার হুকুম হবে কুফুরীর মতো অপরাধকে বৈধ বিবেচনাকারীর মতো কবীরা গুনাহ করা ব্যক্তির হুকুমের মতো।
ইমাম মুহাম্মদ ইবন 'আবদিল ওহহাব রহ, সাহাবীগণকে গালি দেওয়া বৈধ মনে করার বিধান স্পষ্ট করে বলেন: "আর যে ব্যক্তি তাদের কিছু সংখ্যককে গালির মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে অতঃপর তিনি যদি এমন সাহাবী হন, যার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে মুতাওয়াতির বর্ণনা রয়েছে। যেমন, খলিফাগণ। এমতাবস্থায় গালিদাতা যদি বিশ্বাস করে যে, তাকে গালি দেওয়ার অধিকার তার রয়েছে অথবা সে গালি দেওয়াটাকে বৈধ মনে করে, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত আছে তাকে (সাহাবীকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলে, মিথ্যা প্রতিপন্নকারী কাফির বলে গণ্য হবে। আর সে যদি তাকে গালি দেওয়ার অধিকার তার রয়েছে বলে মনে না করে তাকে গালি দেয় অথবা গালি দেওয়াটাকে বৈধ মনে না করে, তবে সে ফাসিক হয়ে যাবে। কারণ, মুসলিম ব্যক্তিকে গালি দেওয়াটা ফাসেকী বা অন্যায়। কোনো কোনো আলেম ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে কাফির বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে ব্যক্তি শায়খাইন তথা আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে সাধারণভাবে যে কোনো প্রকার গালি প্রদান করে। "⁸⁰
যে ব্যক্তি তাদের কাউকে গালি দেয়, তার ব্যাপারে পূর্ববর্তী আলোচনার সারকথা হলো, সে তার দীন ও ন্যায়পরায়ণতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করল, আর তিনি যদি এমন সাহাবী হন, যার মর্যাদার ব্যাপারে মুতাওয়াতির পর্যায়ের বর্ণনা রয়েছে, তবে সে (অভিযোগকারী) মুতাওয়াতির পর্যায়ের বিষয়কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কারণে গ্রহণযোগ্য ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতের ভিত্তিতে কাফির হয়ে যাবে। তবে যাকে আলেমগণ কাফির বলে আখ্যায়িত করেন নি, তার ব্যাপারে তাদের ঐক্যবদ্ধ মতো হলো - সে কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত একজন এবং সে তিরস্কার ও শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত হবে। আর ইমামের জন্য তাকে ক্ষমা করা বৈধ হবে না। আর সাহাবীর মর্যাদার অবস্থান অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি পাবে।
আর তাদের মতে, সে ততক্ষণ পর্যন্ত কাফির হবে না, যতক্ষণ না সে তাদেরকে গালি দেওয়াটাকে বৈধ মনে করবে। তবে যে ব্যক্তি গালি দেওয়াটাকে বৈধ মনে করার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করবে। যেমন, গালি দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত হবে মনে করবে, তাহলে সে এমন পর্যায়ের কাফির হবে, যে ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। এরূপ ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী আলেমদের বক্তব্য সুস্পষ্ট।
আল্লাহ চাহে তো এ প্রকারের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার পরবর্তী প্রত্যেকটি প্রকার খুব সহজেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। এ জন্যই আমরা এ প্রসঙ্গে আলোচনা দীর্ঘায়িত করেছি।
টিকাঃ
⁶⁶ কোনো কোনো আলেম এর দ্বারা খলিফাদেরকে নির্দিষ্ট করে থাকেন, আবার কেউ কেউ এর দ্বারা আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন। আর আলেমদের মধ্যে কেউ আছেন এমন, যিনি গালির বিধানের মধ্যে তারতম্য করেন এমন বিবেচনায়, যার
⁶⁷ কাযী 'আইয়াদ্ব, আশ-শিফা: বিশ্লেষণ: আলী-বাজাবী, ২/১১০৯
⁶⁸ আস-সাওয়া'য়েক আল-মুহরিক্কা, পৃষ্ঠা ৩৮৪
⁶⁹ কাযী 'আইয়াদ্ব, আশ-শিফা (الشفا), বিশ্লেষণ: আল-বাজাবী, ২/১১০৯
⁷⁰ আস-সাওয়ায়েক আল-মুহরিক্কা, পৃষ্ঠা ৩৮৬
⁷¹ আস-সাওয়া'য়েক আল-মুহরিক্কা, পৃষ্ঠা ৩৮৫
⁷² আল-খুরাশী 'আলা মুখতাসারিন খলীল: ৮/৭৪
⁷³ আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, বিশ্লেষণ: মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন আব্দুল হামিদ, পৃষ্ঠা ৩৬০
⁷⁴ আস-সাওয়া'য়েক আল-মুহরিক্কা, পৃষ্ঠা ৩৮৩
⁷⁵ আল-লালকায়ী, শরহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাত ৮/১২৬২, ১২৬৬; আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৭৮
⁷⁶ সহীহ মুসলিম, ইমাম নাওয়াওয়ীর ব্যাখ্যাসহ: ১২/৯৩
⁷⁷ কাযী 'আইয়াদ্ব, আশ-শিফা, বিশ্লেষণ: আলী আল-বাজাবী, ২/১১০৯; আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৬৯
⁷⁸ আস-সাওয়ায়েক আল-মুহরিক্কা, পৃষ্ঠা ৩৮-৭
⁷⁹ ত্ববকাতুল হানাবেলা, ১/২৪; আস-সারিমুল মাসলুল পৃষ্ঠা ৫৬৮
⁸⁰ আর-রাদ্দু 'আলার-রাফেদা, পৃষ্ঠা ১৯
📄 তৃতীয়ত: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে গালি দেওয়ার বিধান
যে ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে এমন বিষয় দ্বারা গালি দিবে যা থেকে আল্লাহ তা'আলা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন, সে ব্যক্তির ব্যাপারে বিজ্ঞজন তথা আলেমদের ঐক্যবদ্ধ মতামত হলো, সে কাফির হয়ে যাবে।
কাযী আবু ইয়া'লা রহ. বলেন: "যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে এমন বিষয়ে অপবাদ দিবে যা থেকে আল্লাহ তা'আলা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন, সে ব্যক্তি কোনো প্রকার বিতর্ক ছাড়াই কাফির হয়ে যাবে।” আর এ ব্যাপারে একাধিক ইজমা সংঘটিত হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। একাধিক ইমাম এ হুকুম বা বিধানটিকে সুস্পষ্ট করেছেন। ইমাম মালেক রহ. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: "যে ব্যক্তি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে বেত্রাঘাত করা হবে, আর যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। তাকে প্রশ্ন করা হলো, কেন? তখন তিনি বললেন: যে ব্যক্তি তার প্রতি অপবাদ বা অভিযোগের বাণ নিক্ষেপ করল, সে ব্যক্তি আল-কুরআনের বিরোধিতা করল।"⁸¹
আর ইবনু শা'বান রহ, তার এক বর্ণনায় বলেন, মালেক রহ. থেকে তা বর্ণিত আছে, কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
(يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [النور: ١٧]
"আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, 'তোমরা যদি মুমিন হও, তবে কখনো যাতে অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর।" [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৭] সুতরাং যে ব্যক্তি অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করবে, সে কাফির হয়ে যাবে।⁸²
যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে অপবাদ দিবে, সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রদত্ত দলীলসমূহ সুস্পষ্ট এবং পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত। তন্মধ্যে কয়েকটি:
১. প্রথমত: ইমাম মালেক রহ, যার দ্বারা দলীল পেশ করেছেন, তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এর মধ্যে আল-কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে, যে কুরআন তাঁর নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছে। আর আল-কুরআন যা নিয়ে এসেছে, তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা কুফুরী।
ইমাম ইবনু কাছীর রহ. বলেন: "আলেমগণ ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত পেশ করেছেন, যে ব্যক্তি এর পরেও তাকে গালি দিবে এবং এই আয়াতের মধ্যে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তার পরেও তাকে এর দ্বারা অপবাদ দিবে, যার দ্বারা তাকে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, সে আল-কুরআন বিরোধী।"⁸³
ইবন হাযম রহ. ইমাম মালেক রহ.-এর পূর্বের কথার ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন: "এখানে ইমাম মালেক রহ.-এর কথা সহীহ। আর তা হলো আয়াতকে পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা এবং আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাকে (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে) অকাট্যভাবে নির্দোষ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে আল্লাহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।"⁸⁴
২. দ্বিতীয়ত: এর মাধ্যমে বিভিন্ন কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়া ও তাঁর মানহানির বিষয় রয়েছে, যে ব্যাপারে আল-কুরআনুল কারীম প্রমাণ পেশ করেছে। আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُواْ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَدَةً أَبَدًا وَأُوْلَبِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴾ [النور: ٤]
“আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে না আসে, তাদেরকে তোমরা আশিটি কশাঘাত কর এবং তোমরা কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। এরাই তো ফাসিক।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৪]
এবং তাঁর বাণী:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾ [النور: ٢৩]
“যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-উদাস, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা তো দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩]-এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। সুতরাং তিনি দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যা করার সময় বলেন: এ আয়াতটি বিশেষ করে 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র স্ত্রীদের শানে অবতীর্ণ। আর তাতে তাওবার বিষয় নেই। আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিন নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য তার বক্তব্যের শেষের দিকে তাওবার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, সুতরাং ব্যক্তি আপেক্ষিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করবে, অতঃপর সর্বোত্তম ব্যাখ্যাটি মাথা পেতে গ্রহণ করবে।”⁸⁵
সুতরাং আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতটি ঐ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে, যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা ও মুমিন জননীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে। কারণ, তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অপবাদ ও দোষারোপের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কেননা, নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, যেমনিভাবে তা তার ছেলে-সন্তানকে কষ্ট দেয়। কারণ, তা তাকে দাইউছের⁸⁶ সাথে সম্পর্কিত করে এবং তার দাম্পত্য জীবনে বিশৃঙ্খলার প্রকাশ ঘটায়। আর নিশ্চয় তার স্ত্রীর ব্যভিচার তাকে ভীষন কষ্ট দেয়... এবং সম্ভবত কোনো কোনো মানুষের সাথে তার পরিবারের প্রতি অপবাদ আরোপের কারণে যে লজ্জা ও অসম্মান সম্পৃক্ত হয়, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবে অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার চেয়েও জঘন্য। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়া সর্বসম্মতিক্রমে কুফুরী।⁸⁷
ইমাম কুরতুবী রহ, আল্লাহ তা'আলার বাণী:
(يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا) [النور: ١٧]
"আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, কখনো যাতে অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৭]
প্রসঙ্গে বলেছেন: এ আয়াতটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। (অর্থাৎ তার ব্যাপারে যাতে তোমরা অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর) কারণ, অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি বলতে যার সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে, তার সম্পর্কে অবিকল সে কথার মতো পুনরায় কথা বলাকেই বুঝায় অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের মধ্য থেকে যিনি তার মর্যাদায় ছিলেন, তার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। কারণ, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মানসম্মান ও পরিবারকে নিয়ে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপার রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে, এটা তার পক্ষ থেকে কুফুরী বলে গণ্য হবে।⁸⁸
আর যা প্রমাণ করে যে, তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করাটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্টের কারণ, তা ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে ইফকের ঘটনা সংবলিত হাদীসে বর্ণনা করেছেন। 'আয়শা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
"... فَقَامَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى الْمِنْبَرِ فَاسْتَعْذَرَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أُبَيَّ ابْنِ سَلُولَ قَالَتْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَر: «يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ مَنْ يَعْذِرُنِي مِنْ رَجُلٍ قَدْ بَلَغَ أَذَاهُ فِي أَهْلِ بَيْتِي ...".
"...অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরের উপর দাঁড়ালেন, অতঃপর তিনি আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বললেন: 'হে মুসলিম সমাজ! আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে লোক আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে?..."⁸⁹
সুতরাং তার কথা: (مَنْ يَعْذِرُنِي) অর্থাৎ যখন আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে ব্যক্তি আমাকে জ্বালাতন করেছে, আর আমি তার থেকে প্রতিকার চাই, তখন কে আমার প্রতি ইনসাফ করবে এবং তার প্রতিকার করবে। আর আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন।
সুতরাং এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বারা খুবই কষ্ট পেয়েছেন এবং তার ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। আর যেসব মুমিন উত্তেজিত হয় নি, তারা বললেন: আপনি আমাদেরকে নির্দেশ দিন, আমরা তাদের গর্দান উড়িয়ে দিব। সুতরাং আমরা আপনাকে অপবাদ থেকে মুক্ত করব, যখন আপনি আমাদেরকে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিবেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা'দের কথার কোনো প্রতিবাদ করেন নি, যখন সে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ চেয়েছেন।⁹⁰
শাইখ মুহাম্মদ ইবন আবদিল ওহাব রহ. বলেন: “যে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে পবিত্রতমা (যা তার থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত) উম্মুল মুমিনীন জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, তবে সে হবে মুনাফিকদের প্রধান আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের কাতারের লোক। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলার ভাষা হলো: 'মুসলিম সমাজ! আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে লোক আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে?
আল-কুরআনের ভাষায়:
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا * وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا ) [الاحزاب: ٥٧، ٥٨]
"নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে লা'নত করেন এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, যা তারা করে নি তার জন্য। নিশ্চয় তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করল।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৭-৫৮]
সুতরাং কোথায় তাঁর দীনের সাহায্যকারীগণ, যারা তাকে লক্ষ্য করে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে অপবাদ থেকে মুক্ত করব।"⁹¹
যেমনিভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করার মধ্যে অপর দৃষ্টিকোণ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদাহানির বিষয় রয়েছে, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ...﴾ [النور: ٢٦]
"দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য ...।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৬]
ইবন কাছীর রহ, বলেন: "আল্লাহ তা'আলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে পবিত্র অবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী বানিয়েছেন। কারণ, তিনি হলেন পবিত্র মানুষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পবিত্রতম, আর তিনি (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা) যদি দুশ্চরিত্রা নারী হতেন (না'উযুবিল্লাহ), তবে তিনি শর'ঈ ও মর্যাদার দিক বিবেচনায় তাঁর (রাসূলের) জন্য উপযুক্ত হতেন না। আর এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿أُوْلَبِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ ﴾ [النور: ٢٦]
"লোকেরা যা বলে তার সাথে তারা সম্পর্কহীন।" [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৬]
অর্থাৎ মিথ্যাবাদী ও সীমালংঘনকারী গোষ্ঠী যা বলে, তারা তার থেকে সমপূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।"⁹²
টিকাঃ
⁸¹ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৬৫, ৫৬৬, আর খবরটি সনদসহ আল-মুহাল্লা (১৮১)-এর মধ্যে রয়েছে: ১১/৪১৪, ৪১৫
⁸² কাযী 'আইয়াদ্ব, আশ-শিফা, বিশ্লেষণ: আল-বাজাবী, ২/১১০৯
⁸³ দেখুন, তাফসীরু ইবন কাছীর: ৩/২৭৬; আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾ [النور: ২৩] "যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-উদাস, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা তো দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩]-এর ব্যাখ্যায়।
⁸⁴ আল-মুহাল্লা (المحلى): ১১/৪১৫
⁸⁵ দেখুন: ইবনু জারীর, ১৮/৮৩; আর তার থেকে ইবন কাছীর, ৩/২৭৭
⁸⁶ দাইউছ (দিউট) হল: স্ত্রীর ব্যভিচারে নির্লিপ্ত স্বামী।
⁸⁷ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪৫; কুরতুবী: ১২/১৩৯, মুদ্রণ: দারুল কুতুবিল 'ইলমিয়্যা।
⁸⁸ কুরতুবী: ২/১৩৬, ২৩৭; ইবনুল 'আরাবী থেকে বর্ণিত, আহকামুল কুরআন: ৩/১৩৫৫, ১৩৫৬, বিশ্লেষণ: বুখারী।
⁸⁹ সহীহ বুখারী, শাহাদাত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: এক মহিলা অপর মহিলার সততা সম্পর্কে সাক্ষ্য দান, হাদীস নং ২৫১৮; সহীহ মুসলিম, তাওবা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ইফকের ঘটনা ও অপবাদ দানকারীর তাওবা কবুল প্রসঙ্গে, হাদিস নং-৭১৯৬
⁹⁰ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪৭-৪৯ সংক্ষেপ করার মাধ্যমে উদ্ধৃত。
⁹¹ রিসালাতুন ফির রদ্দি 'আলার রাফিযা: ২৫, ২৬
⁹² ইবন কাছীর: ৩/২৭৮
📄 তৃতীয়ত: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে গালি দেওয়ার বিধান
যে ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে এমন বিষয় দ্বারা গালি দিবে যা থেকে আল্লাহ তা'আলা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন, সে ব্যক্তির ব্যাপারে বিজ্ঞজন তথা আলেমদের ঐক্যবদ্ধ মতামত হলো, সে কাফির হয়ে যাবে।
কাযী আবু ইয়া'লা রহ. বলেন: "যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে এমন বিষয়ে অপবাদ দিবে যা থেকে আল্লাহ তা'আলা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন, সে ব্যক্তি কোনো প্রকার বিতর্ক ছাড়াই কাফির হয়ে যাবে।” আর এ ব্যাপারে একাধিক ইজমা সংঘটিত হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। একাধিক ইমাম এ হুকুম বা বিধানটিকে সুস্পষ্ট করেছেন। ইমাম মালেক রহ. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: "যে ব্যক্তি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি দিবে, се ব্যক্তিকে বেত্রাঘাত করা হবে, আর যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে গালি দিবে, সে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে। তাকে প্রশ্ন করা হলো, কেন? তখন তিনি বললেন: যে ব্যক্তি তার প্রতি অপবাদ বা অভিযোগের বাণ নিক্ষেপ করল, সে ব্যক্তি আল-কুরআনের বিরোধিতা করল।"⁸¹
আর ইবনু শা'বান রহ, তার এক বর্ণনায় বলেন, মালেক রহ. থেকে তা বর্ণিত আছে, কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
(يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [النور: ١٧]
"আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, 'তোমরা যদি মুমিন হও, তবে কখনো যাতে অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর।" [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৭] সুতরাং যে ব্যক্তি অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করবে, সে কাফির হয়ে যাবে।⁸²
যে ব্যক্তি 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে অপবাদ দিবে, সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রদত্ত দলীলসমূহ সুস্পষ্ট এবং পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত। তন্মধ্যে কয়েকটি:
১. প্রথমত: ইমাম মালেক রহ, যার দ্বারা দলীল পেশ করেছেন, তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এর মধ্যে আল-কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে, যে কুরআন তাঁর নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছে। আর আল-কুরআন যা নিয়ে এসেছে, তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা কুফুরী।
ইমাম ইবনু কাছীর রহ. বলেন: "আলেমগণ ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত পেশ করেছেন, যে ব্যক্তি এর পরেও তাকে গালি দিবে এবং এই আয়াতের মধ্যে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তার পরেও তাকে এর দ্বারা অপবাদ দিবে, যার দ্বারা তাকে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ, সে আল-কুরআন বিরোধী।"⁸³
ইবন হাযম রহ. ইমাম মালেক রহ.-এর পূর্বের কথার ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন: "এখানে ইমাম মালেক রহ.-এর কথা সহীহ। আর তা হলো আয়াতকে পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা এবং আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাকে (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে) অকাট্যভাবে নির্দোষ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে আল্লাহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।"⁸⁴
২. দ্বিতীয়ত: এর মাধ্যমে বিভিন্ন কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়া ও তাঁর মানহানির বিষয় রয়েছে, যে ব্যাপারে আল-কুরআনুল কারীম প্রমাণ পেশ করেছে। আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُواْ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَدَةً أَبَدًا وَأُوْلَبِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ﴾ [النور: ٤]
“আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে না আসে, তাদেরকে তোমরা আশিটি কশাঘাত কর এবং তোমরা কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। এরাই তো ফাসিক।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৪]
এবং তাঁর বাণী:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾ [النور: ٢৩]
“যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-উদাস, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা তো দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩]-এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। সুতরাং তিনি দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যা করার সময় বলেন: এ আয়াতটি বিশেষ করে 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র স্ত্রীদের শানে অবতীর্ণ। আর তাতে তাওবার বিষয় নেই। আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিন নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য তার বক্তব্যের শেষের দিকে তাওবার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, সুতরাং ব্যক্তি আপেক্ষিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করবে, অতঃপর সর্বোত্তম ব্যাখ্যাটি মাথা পেতে গ্রহণ করবে।”⁸⁵
সুতরাং আব্দুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বর্ণনা করেছেন যে, এ আয়াতটি ঐ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে, যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা ও মুমিন জননীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে। কারণ, তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অপবাদ ও দোষারোপের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কেননা, নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, যেমনিভাবে তা তার ছেলে-সন্তানকে কষ্ট দেয়। কারণ, তা তাকে দাইউছের⁸⁶ সাথে সম্পর্কিত করে এবং তার দাম্পত্য জীবনে বিশৃঙ্খলার প্রকাশ ঘটায়। আর নিশ্চয় তার স্ত্রীর ব্যভিচার তাকে ভীষন কষ্ট দেয়... এবং সম্ভবত কোনো কোনো মানুষের সাথে তার পরিবারের প্রতি অপবাদ আরোপের কারণে যে লজ্জা ও অসম্মান সম্পৃক্ত হয়, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবে অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার চেয়েও জঘন্য। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়া সর্বসম্মতিক্রমে কুফুরী।⁸⁷
ইমাম কুরতুবী রহ, আল্লাহ তা'আলার বাণী:
(يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَن تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا) [النور: ١٧]
"আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, কখনো যাতে অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৭]
প্রসঙ্গে বলেছেন: এ আয়াতটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। (অর্থাৎ তার ব্যাপারে যাতে তোমরা অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি না কর) কারণ, অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি বলতে যার সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে, তার সম্পর্কে অবিকল সে কথার মতো পুনরায় কথা বলাকেই বুঝায় অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের মধ্য থেকে যিনি তার মর্যাদায় ছিলেন, তার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। কারণ, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মানসম্মান ও পরিবারকে নিয়ে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপার রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে, এটা তার পক্ষ থেকে কুফুরী বলে গণ্য হবে।⁸⁸
আর যা প্রমাণ করে যে, তাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করাটা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্টের কারণ, তা ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ. তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে ইফকের ঘটনা সংবলিত হাদীসে বর্ণনা করেছেন। 'আয়শা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
"... فَقَامَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى الْمِنْبَرِ فَاسْتَعْذَرَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أُبَيَّ ابْنِ سَلُولَ قَالَتْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَر: «يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ مَنْ يَعْذِرُنِي مِنْ رَجُلٍ قَدْ بَلَغَ أَذَاهُ فِي أَهْلِ بَيْتِي ...".
"...অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরের উপর দাঁড়ালেন, অতঃপর তিনি আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে বললেন: 'হে মুসলিম সমাজ! আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে লোক আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে?..."⁸⁹
সুতরাং তার কথা: (مَنْ يَعْذِرُنِي) অর্থাৎ যখন আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে ব্যক্তি আমাকে জ্বালাতন করেছে, আর আমি তার থেকে প্রতিকার চাই, তখন কে আমার প্রতি ইনসাফ করবে এবং তার প্রতিকার করবে। আর আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন।
সুতরাং এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বারা খুবই কষ্ট পেয়েছেন এবং তার ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচার উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। আর যেসব মুমিন উত্তেজিত হয় নি, তারা বললেন: আপনি আমাদেরকে নির্দেশ দিন, আমরা তাদের গর্দান উড়িয়ে দিব। সুতরাং আমরা আপনাকে অপবাদ থেকে মুক্ত করব, যখন আপনি আমাদেরকে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিবেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা'দের কথার কোনো প্রতিবাদ করেন নি, যখন সে তাদের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নির্দেশ চেয়েছেন।⁹⁰
শাইখ মুহাম্মদ ইবন আবদিল ওহাব রহ. বলেন: “যে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে পবিত্রতমা (যা তার থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত) উম্মুল মুমিনীন জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করবে, তবে সে হবে মুনাফিকদের প্রধান আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের কাতারের লোক। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলার ভাষা হলো: 'মুসলিম সমাজ! আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে লোক আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে?
আল-কুরআনের ভাষায়:
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا * وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا ) [الاحزاب: ٥٧، ٥٨]
"নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে লা'নত করেন এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, যা তারা করে নি তার জন্য। নিশ্চয় তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করল।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৭-৫৮]
সুতরাং কোথায় তাঁর দীনের সাহায্যকারীগণ, যারা তাকে লক্ষ্য করে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে অপবাদ থেকে মুক্ত করব।"⁹¹
যেমনিভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে অপবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করার মধ্যে অপর দৃষ্টিকোণ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদাহানির বিষয় রয়েছে, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ...﴾ [النور: ٢٦]
"দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য ...।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৬]
ইবন কাছীর রহ, বলেন: "আল্লাহ তা'আলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে পবিত্র অবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী বানিয়েছেন। কারণ, তিনি হলেন পবিত্র মানুষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পবিত্রতম, আর তিনি (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা) যদি দুশ্চরিত্রা নারী হতেন (না'উযুবিল্লাহ), তবে তিনি শর'ঈ ও মর্যাদার দিক বিবেচনায় তাঁর (রাসূলের) জন্য উপযুক্ত হতেন না। আর এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿أُوْلَبِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ ﴾ [النور: ٢٦]
"লোকেরা যা বলে তার সাথে তারা সম্পর্কহীন।" [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৬]
অর্থাৎ মিথ্যাবাদী ও সীমালংঘনকারী গোষ্ঠী যা বলে, তারা তার থেকে সমপূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।"⁹²
টিকাঃ
⁸¹ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৬৫, ৫৬৬, আর খবরটি সনদসহ আল-মুহাল্লা (১৮১)-এর মধ্যে রয়েছে: ১১/৪১৪, ৪১৫
⁸² কাযী 'আইয়াদ্ব, আশ-শিফা, বিশ্লেষণ: আল-বাজাবী, ২/১১০৯
⁸³ দেখুন, তাফসীরু ইবন কাছীর: ৩/২৭৬; আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ ﴾ [النور: ২৩] "যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা-উদাস, ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা তো দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩]-এর ব্যাখ্যায়।
⁸⁴ আল-মুহাল্লা (المحلى): ১১/৪১৫
⁸⁵ দেখুন: ইবনু জারীর, ১৮/৮৩; আর তার থেকে ইবন কাছীর, ৩/২৭৭
⁸⁶ দাইউছ (দিউট) হল: স্ত্রীর ব্যভিচারে নির্লিপ্ত স্বামী।
⁸⁷ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪৫; কুরতুবী: ১২/১৩৯, মুদ্রণ: দারুল কুতুবিল 'ইলমিয়্যা।
⁸⁸ কুরতুবী: ২/১৩৬, ২৩৭; ইবনুল 'আরাবী থেকে বর্ণিত, আহকামুল কুরআন: ৩/১৩৫৫, ১৩৫৬, বিশ্লেষণ: বুখারী।
⁸⁹ সহীহ বুখারী, শাহাদাত অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: এক মহিলা অপর মহিলার সততা সম্পর্কে সাক্ষ্য দান, হাদীস নং ২৫১৮; সহীহ মুসলিম, তাওবা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ইফকের ঘটনা ও অপবাদ দানকারীর তাওবা কবুল প্রসঙ্গে, হাদিস নং-৭১৯৬
⁹⁰ আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৪৭-৪৯ সংক্ষেপ করার মাধ্যমে উদ্ধৃত。
⁹¹ রিসালাতুন ফির রদ্দি 'আলার রাফিযা: ২৫, ২৬
⁹² ইবন কাছীর: ৩/২৭৮