📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: পূর্বে আলোচিত বিষয়ের সারসংক্ষেপ
পূর্ববর্তী আয়াত ও হাদীসসমূহের গভীরতা থেকে সাহাবীগণের গুণাবলীর ব্যাপারে আমরা নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি:
প্রথমত: নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দিকসমূহ পরিশুদ্ধ করেছেন।
১. যাদের বাহ্যিক দিকসমূহ পরিশুদ্ধ হয়েছে, তাদেরকে তিনি সর্বোচ্চ প্রশংসিত চারিত্রিক গুণাবলী দ্বারা বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্য থেকে যেমন:
১. ১. ﴿ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ﴾ [الفتح: ٢٩]
"আর তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯]
১. ২. ﴿ وَيَنصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُوْلَابِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ ﴾ [الحشر: ٨]
"আর তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। এরাই তো সত্যাশ্রয়ী।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৮]
১. ৩. ﴿ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُdُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ﴾ [الحشر: ٩]
"এবং তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোনো (না পাওয়া জনিত) হিংসা অনুভব করে না। আর তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৮]
২. আর তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার সাথেই নির্দিষ্ট। আর তিনিই একমাত্র মনের খবর জানেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাদের অভ্যন্তরীণ সততা ও বিশুদ্ধ নিয়তের সংবাদ দিয়েছেন। অতএব উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন:
২. ১. ﴿فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا ﴾ [الفتح: ١٨]
"অতঃপর তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি জেনে নিয়েছেন। ফলে তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয়ে পুরস্কৃত করলেন।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ১৮]
২. ২. ﴿يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ﴾ [الحشر: ٩]
"তারা তাদের কাছে যারা হিজরত করে এসেছে, তাদেরকে ভালোবাসে।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৯]
২.৩. ﴿يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا ﴾ [الحشر: ٨]
"তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির অন্বেষণ করে।" [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৮]
২.৪. ﴿لَقَد تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ﴾ [التوبة: ١١٧]
"আল্লাহ অবশ্যই নবী, মুহাজির ও আনসারদের তাওবা কবুল করলেন, যারা তার অনুসরণ করেছিল সংকটময় মুহূর্তে -তাদের এক দলের হৃদয় সত্যচ্যুত হওয়ার উপক্রম হবার পর।" [সুরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১৭]
সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের তাওবা কবুল করেছেন, যখন তিনি তাদের নিয়ত ও তাওবার সত্যতা সম্পর্কে জানতে পারলেন। আর তাওবা হলো শুধুমাত্র অন্তরের কাজ, যা সর্বজনবিদিত।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাদেরকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ভালো ও শ্রেষ্ঠ সময়কালের তাওফীক দানের কারণেই তিনি আমাদেরকে সংবাদ প্রদান করেছেন যে, তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তাদের তাওবা কবুল করেছেন এবং তাদেরকে কল্যাণ তথা জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তৃতীয়ত: আর পূর্বোক্ত সামষ্টিক কারণে আমাদেরকে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে সম্মান, তাদের অধিকার সংরক্ষণ ও তাদেরকে ভালোবাসার নির্দেশ দিয়েছেন। আর আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে তাদেরকে গালি দেওয়া এবং ঘৃণা বা শত্রুতা করা থেকে এমনকি তিনি তাদেরকে ভালোবাসা ঈমানের লক্ষণ এবং তাদেরকে ঘৃণা বা শত্রুতা করা মুনাফিকীর লক্ষণ বলে মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
চতুর্থত: এসব কিছুর পরেও স্বভাবতই তারা ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং এ জাতির নিরাপদ আশ্রয় আর সেখান থেকেই এ উম্মত কর্তৃক তাদের অনুসরণ করাটা আবশ্যক হয়ে পড়ে; বরং এটাই হলো জন্নাতের একমাত্র পথ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায়: عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي».
"আমার পরে তোমাদের ওপর আবশ্যক হলো আমার সুন্নাত ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতের অনুসরণ করা।"³⁹
টিকাঃ
³⁹ আহমদ, ৪/১২৬, ১২৭; তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবন মাজাহ ও দারেমী। আর এক দল মুহাদ্দিস হাদিসটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন। দেখুন: ইবন রজব, জামে'উল 'উলুম ওয়াল হিকাম, দারুল ফুরকান, প্রথম সংস্করণ, ১৪১১ হি., হাদীস নং ৩৮, পৃষ্ঠা ৩৮৭; আরও দেখুন: আল-ইরওয়াউ, নং (২৫৪৪) ৮/১০৭
📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: কোনো কিছুই সাহাবীগণের মর্যাদার সমান নয়
বিজ্ঞ আলেমদের মতে, সাহাবীগণকে সম্মান করা এবং তাদের মর্যাদা সম্পর্কে জানা একটি স্বীকৃত বিষয় যদিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ব্যক্তির (সাহাবীর) সাক্ষাতের সময়কাল কম হউক। আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন。
• হাফেয ইবন হাজার 'আসকালানী রহ. এ বিষয়টির ওপর প্রমাণ উল্লেখপূর্বক বলেন: “সুতরাং এ বিষয়ে প্রমাণ করে আমি লেখক মুহাম্মদ ইবন কুদামা আল-মাররুযীর লিখিত 'আখবারুল খাওয়ারিজ' নামক গ্রন্থে যা পাঠ করেছি। অতঃপর তিনি তার সনদ উল্লেখ করেছেন এ পর্যন্ত যে, তিনি বলেন: নুবাইজ আল-'আনাযী থেকে বর্ণিত, তিনি আবু সা'ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, আমরা তার নিকট ছিলাম এমতাবস্থায় যে, তিনি হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। অতঃপর আলী ও মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহ 'আনহুমা সম্পর্কে আলোচনা করলাম। অতঃপর মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহ 'আনহুর পক্ষের এক ব্যক্তি এসে আলোচনায় শামিল হলো। অতঃপর আবু সা'ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহ 'আনহু সোজা হয়ে বসে তার সেই কাহিনী বর্ণনা করলেন, যখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যে ছিলেন এবং সাথে ছিলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহ 'আনহু ও জনৈক আরব বেদুইন...। আবু সা'ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহ 'আনহু বলেন, অতঃপর আমি ঐ বেদুইনকে উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহ 'আনহুর নিকট নিয়ে আসতে দেখলাম এমতাবস্থায় যে, সে আনসারদেরকে তিরস্কার করল। তখন উমার রাদিয়াল্লাহ 'আনহু তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
لولا أن له صحبة من رسول الله صلى الله عليه وسلم لكفيتكموه ولكن له صحبة من «رسول الله صلى الله عليه وسلم».
"যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তার সহচর্য না থাকত, তবে আমি তোমাদেরকে তার জন্য যথেষ্ট মনে করতাম; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তার সহচর্য রয়েছে।"⁴⁰
হাফেয ইবন হাজার 'আসকালানী রহ. বলেন, এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত।
সুতরাং উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহ 'আনহু তাকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে শুধু তিরস্কার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন। কারণ, তিনি জানতে পেরেছেন যে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন আর এ কথার মধ্যে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, তারা বিশ্বাস করতেন-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহচর্যের মর্যাদার সমান আর কিছুই হতে পারে না。
• আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন ওকী' রহ,, তিনি বলেন: আমি সুফিয়ানকে আল্লাহ তা'আলার বাণী
﴿قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِينَ اصْطَفَى﴾ [النمل: ٥٩]
"বলুন, সকল প্রশংসা আল্লাহর এবং শান্তি তাঁর মনোনীত বান্দাদের প্রতি।”[সূর আন-নামল, আয়াত: ৫৯]-এর ব্যাপারে বলতে শুনেছি যে, তারা হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী। এ সূত্রের সংযুক্তি করা হয়েছে 'আল-ইসাবা' নামক গ্রন্থে।⁴¹
সুতরাং এ নির্বাচন ও বাছাইকরণটি একটি অকল্পনীয় বিষয়, যা অনুধাবন করা যায় না এবং বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা অনুমানও করা যায় না। আর সেখান থেকেই অন্যদের সাথে তাদের মর্যাদার তুলনা করার অবকাশ নেই, তাদের কর্মকাণ্ড যত উচ্চ মানেই পৌঁছায় না কেন।⁴²
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহ 'আনহুমা বলেন:
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمُقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةً مَعَ النَّبِيِّ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْرٌ مِنْ عَمَلٍ أَحَدِكُمْ أربعين سنة».
"তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে গালি দিও না। কারণ, তাদের কোনো একজনের একটু সময় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অবস্থান করার মূল্যমান তোমাদের কোনো একজনের চল্লিশ বছরের আমলের চেয়ে অনেক বেশি উত্তম।"⁴³
আর ওকী' রহ. এর এক বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহ 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمُقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةً خَيْرٌ مِنْ عبادة أَحَدِكُمْ عُمْرَهُ ».
“তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে গালি দিও না। কারণ, তাদের কোনো একজনের একটু সময় (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে) অবস্থান করার মূল্যমান তোমাদের কোনো একজনের গোটা জীবনের ইবাদতের চেয়েও অনেক বেশি উত্তম।”⁴⁴
আর অধিকাংশ আলেমের মতে, কোনো আমলই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহচর্যের সমতুল্য হতে পারে না। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রত্যক্ষদর্শী মানে হলো-যিনি তাকে রক্ষা করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন হিজরত অথবা সাহায্যের মাধ্যমে, তার দিকে এগিয়ে গিয়েছেন অথবা তার নিকট থেকে প্রাপ্ত শরী'আতকে আঁকড়ে ধরেছেন এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর পরে যাদের আগমন হয়েছে, তাদের কেউই তাঁর সমতুল্য হতে পারে না। কারণ, পূর্ববর্তী ব্যক্তির কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের ওপর তার পরবর্তী কোনো ব্যক্তি আমল করলে সে (পূর্ববর্তী ব্যক্তি) তার সমপরিমাণ প্রতিদান পাবে। অত্রএব, তাদের ফযীলতের বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেল।⁴⁵
ইমাম আহমদ রহ, তার আকীদা প্রসঙ্গে বলেন: "সাহাবীগণের মধ্য থেকে একজন নগণ্য সাহাবীর মর্যাদা ঐ যুগের সকল ব্যক্তির চেয়েও শ্রেষ্ঠ, যারা তাকে দেখে নি, যদিও তারা তাদের সকল আমল নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে।”⁴⁶
ইমাম নাওয়াওয়ী রহ. বলেন: "এক মুহূর্তের জন্য হলেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহচর্য পাওয়ার মর্যাদার সমতুল্য কোনো আমলই হতে পারে না আর কোনো কিছুর বিনিময়ে তার সমমর্যাদা অর্জন করা সম্ভব নয় এবং ফযীলত বা মর্যাদার বিষয়টি কিয়াসের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় না। এটি হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, যা তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন।"⁴⁷
আর তাদের অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধতাও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে হয়েছে, যিনি অন্তরের খবর জানেন। যেমন তাঁর বাণী:
﴿فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ﴾ [الفتح: ١٨]
"অতঃপর তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি জেনে নিয়েছেন।” [সূরা আল- ফাতহ, আয়াত: ১৮]
আবার তিনি তাদের তাওবা কবুলকারী:
﴿لَقَد تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ ...﴾ [التوبة: ١١٧]
"আল্লাহ অবশ্যই নবী, মুহাজির ও আনসারদের তাওবা কবুল করলেন ...]" [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১৭]
এবং তিনি তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন:
﴿لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا ﴾ [الفتح: ١٨]
"অবশ্যই আল্লাহ মুমিনগণের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাই'আত গ্রহণ করেছিল। অতঃপর তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি জেনে নিয়েছেন। ফলে তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয়ে পুরস্কৃত করলেন।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ১৮]
তাদের এ প্রতিটি ব্যাপারকে তাঁর সাথে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সুতরাং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এ ধরনের তাযকীয়া বা পরিশুদ্ধতা কীভাবে সম্ভব হবে? কিন্তু কোনো কোনো প্রবক্তা বলেন:⁴⁸ “কিছু কিছু বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে, আমি যা উল্লেখ করেছি, তার বিপরীত প্রমাণ করে। যেমন, আবু ছা'লাবা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
تأتي أيام للعامل فيهن مثل أجر خمسين، قيل يا رسول الله أجر خمسين منا أو منهم؟ قال: بل أجر خمسين منكم».
“এমন কতগুলো দিন আসবে, যেসব দিনে একজন (সৎ) আমলকারী ব্যক্তির জন্য পঞ্চাশ জনের সমপরিমাণ প্রতিদানের ব্যবস্থা করা হবে। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের থেকে পঞ্চাশ জনের সমপরিমাণ প্রতিদান পাবে, নাকি তাদের থেকে পঞ্চাশ জনের সমপরিমাণ প্রতিদান পাবে? জবাবে তিনি বললেন, বরং তোমাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশ জনের সমপরিমাণ প্রতিদান পাবে।”⁴⁹
আর অনুরূপভাবে আবু জাম'আ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
تغدينا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم ومعنا أبو عبيدة بن الجراح قال: فقال: يا رسول الله هل أحد خير منا؟ اسلمنا معك وجاهدنا معك؟ قال: نعم، قوم يكونون من بعدكم يؤمنون بي ولم يروني».
“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দুপুরের খাবার গ্রহণ করলাম আর আমাদের সাথে আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি (আবু ওবায়দা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের চেয়ে উত্তম কেউ আছে কি? আমরা আপনার সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং আপনার সাথে জিহাদ করেছি। জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, এমন এক সম্প্রদায় আছে, যারা তোমাদের পরবর্তীতে আসবে, তারা আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে অথচ তারা আমাকে দেখে নি।”⁵⁰
আর আলেমগণ এ হাদীসসমূহ ও পূর্বোক্ত হাদীসসমূহ একত্রিত বা সমন্বয় করেছেন কয়েকটি কারণে; তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
প্রথম কারণ : للعامل فيهن مثل أجر خمسين "তাতে একজন আমলকারী ব্যক্তির জন্য পঞ্চাশ জনের সমপরিমাণ প্রতিদানের ব্যবস্থা রয়েছে" -হাদীসটি শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে না। কারণ, শুধু কিছু আমলের সাওয়াব বৃদ্ধি করে দেওয়ার বিষয়টি সাধারণভাবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণকে আবশ্যক করে না।
দ্বিতীয় কারণ: কখনও কখনও শ্রেষ্ঠত্ব বা মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে যার ওপর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য ও ফযীলত পাওয়া যায়, যা মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তির মধ্যে নেই; কিন্তু সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যের বিবেচনায় সে মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তির সমান হতে পারে না。
তৃতীয় কারণ: অনুরূপভাবে বলা হয়: নিশ্চয় উভয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি শুধু ঐ ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যাতে উভয়ের অংশগ্রহণ সম্ভব। আর তা হলো সকল মুমিনের মধ্যে সাধারণ ও সমন্বিত আনুগত্যের বিষয়। সুতরাং তখন এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয়ে কোনো কোনো সাহাবীর ওপর মর্যাদার বিষয়টি বিদূরিত হয় না, তবে সহাবীগণ যা দ্বারা বিশেষিত হয়েছেন এবং সফলতা লাভ করেছেন। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে দৃশ্য অবলোকন এবং তাঁর পবিত্র সত্তাকে দেখা, তা হলো একটি যুক্তিসংগত বিষয়। কারণ, কারো পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে এমন কোনো মর্যাদাপূর্ণ কাজ করবে, যার দ্বারা সে তাঁর মতো হওয়ার কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছে যাবে।⁵¹
চতুর্থ কারণ: বর্ণনাকারীগণ আবু জাম'আ রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের শব্দের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ নন। কারণ, তাদের কেউ কেউ তা বর্ণনা করেছেন الخيرية )সর্বোত্তম) শব্দ দ্বারা, যেমনটি পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। আবার তাদের কেউ কেউ তা বর্ণনা করেছেন এরূপ শব্দ দ্বারা:
( قلنا يا رسول الله هل من قوم أعظم منا أجرا ؟ - أخرجه الطبراني )
"আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সাওয়াব অর্জনের দিক থেকে আমাদের চেয়ে মহান কোনো সম্প্রদায় আছে কি? -তাবরানী হাদীসটি বর্ণনা করেন।"⁵²
হাফেয ইবন হাজার 'আসকালানী রহ, 'আল-ফাতহ'-এর মধ্যে বলেন: এ বর্ণনার সনদ পূর্ববর্তী বর্ণনার সনদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর তা আবু ছা'লাবা'র হাদীসের সাথে সমাঞ্জস্যপূর্ণ। তার জওয়াব পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন。
পরিশেষে এ শেষ অনুচ্ছেদে দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত যে, এ প্রসঙ্গে অধিকাংশ আলেম ও অন্যান্যদের মধ্যকার বিরোধ খোলাফায়ে রাশেদীন ও বাকি 'আশারা মুবাশ্বারা এবং যাদের ব্যাপারে বিশেষ ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, তাদের মতো বড় বড় সাহাবীগণকে অন্তর্ভুক্ত করে না। যেমন, 'আকাবার শপথে অংশগ্রহণকারী এবং বদর, তাবুক... ইত্যাদির মতো যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ। আর বিতর্কের সূত্রপাত হয় ঐসব সাহাবীগণকে নিয়ে, যাদের শুধু আল্লাহর রাসূলকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আর এ জন্যই ইমাম ইবন 'আবদিল বার বদরের যুদ্ধে ও হুদায়বিয়ার সন্ধির অভিযানে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণকে পৃথক করেছেন।⁵³
টিকাঃ
⁴⁰ উমার রাদিয়াল্লাহ 'আনহুর বক্তব্য ব্যতীত ইমাম আহমদ রহ. হাদীসখানা বর্ণনা করেন, ৩/৫১; আর আলী ইবনুল জা'য়াদ হাদীসখানা অবিকল শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করেন, ২/৯৫৬; হাইছামী (৪/৯২) বলেন: হাদিসের বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত এবং ইবন হাজার ইয়াকুব ইবন শায়বার বর্ণনার কারণে হাদিসটিকে আযীয বলেছেন, যেমনটি তার থেকে বর্ণিত হাদিসের সনদের মধ্যে দেখা যায়, ১/২০; আর শাইখুল ইসলাম আবু যর আল-হারবীর বর্ণনার কারণে হাদিসটিকে আযীয বলেছেন, আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৫৯০
⁴¹ তাবারী, আসার, প্রকাশনা: দারুল মা'রেফা, ২০/৩; আরও দেখুন: ইবনু কাছীর, প্রকাশনা: দারুল মা'রেফা, ৩/৩৬৯
⁴² আল-ইসাবা, প্রকাশনা: দারুল কিতাবিল 'আরাবী, ইবন আবদিল বাররের 'আল-ইসতি'য়াব' নামক গ্রন্থের হাশিয়াসহ, ১/২০-২২
⁴³ শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা, শরহু লামিয়া, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১ (মাকতাবা শামেলা, দ্বিতীয় সংস্করণ)
⁴⁴ ইমাম আহমদ, ফাযায়েলুস সাহাবা: ১/৫৭; ইবন মাজাহ, ১/৩১ (আল-আ'যামী); ইবন আবি 'আসেম, ২/৪৮৪; আল-বৃসীরী 'যাওয়ায়েদু ইবনে মাজাহ' এর মধ্যে (১/২৪) খবরটিকে সহীহ বলেছেন; আল-মাতালেবুল 'আলীয়া, ৪/১৪৬
⁴⁵ ফতহুল বারী, ৭/৭
⁴⁶ আল-লালকায়ী, শরহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাত, ১/১৬০
⁴⁷ নাওয়াওয়ীর ব্যাখ্যাসহ সহীহ মুসলিম: ১৬/৯৩
⁴⁸ যারা এ উক্তি করেছেন, তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ হলেন ইমাম ইবন 'আব্দুল বার। আর উল্লেখিত দলীল তার দলীলসমূহ থেকে শক্তিশালী। আর অধিকাংশ আলেম তার বিপরীত মত পোষণ করেন, যেমন আমরা পূর্বে ইঙ্গিত দিয়েছি。
⁴⁹ আবু দাউদ: ৪৩৪১; তিরমিযী: ২/১৭৭; ইবন মাজাহ: ৪০১৪; ইবনু হিব্বান, (আল-ইহসান), ৩৮৫, আর ১৮৫০ মাওয়ারিদু যামআন। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন: হাদীসটি হাসান, গরীব; আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন。
⁵⁰ আহমদ, ৪/১০৬; দারেমী ও তাবারানী, ৪/২২-২৩; হাকেম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবীও তার মতো অভিমত ব্যক্ত করেছেন, ৪/৮ cinquième; ইবন হাজার বলেন: তার সনদ হাসান পর্যায়ের; আল-ফাতহ: ৭/৬; দেখুন: আল-ফাতহুর রাব্বানী, ১/১০৩-১০৪
⁵¹ হাইছামী, আস-সাওয়ায়েক আল-মুহারিকা, পৃষ্ঠা ৩২১
⁵² তাবারানী, ৪/২২/২৩
⁵³ ফতহুল বারী: ৭/৭