📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: সাহাবায়ে কেরামের পরিচয়
সাহাবা শব্দটি বহুবচন, একবচনে সাহাবী, আক্ষরিক অর্থ সহচর, সঙ্গী, সাথী ইত্যাদি। আর পরিভাষায় সাহাবীর পরিচয় দিতে গিয়ে হাফেয ইবন হাজার 'আসকালানী রহ. বলেন,
«الصحابي من لقي النبي صلى الله عليه وسلّم مؤمنا به, ومات على الإسلام».
"সাহাবী হলেন তিনি, যিনি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমানদার হয়ে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ পেয়েছেন এবং ইসলামের ওপর মারা গেছেন।"²
ইমাম বুখারী রহ. বলেন,
من صحب النبي صلى الله عليه وسلم, أو رآه من المسلمين فهو من أصحابه.
"মুসলিমগণের মধ্য থেকে যিনি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহচর্য লাভ করেছেন অথবা তাকে দেখেছেন, তিনি তাঁর সাহাবীগণের অন্তর্ভুক্ত।”³
মুহাদ্দিসগণের মতে:
هو كل مسلم رأى رسول الله صلى الله عليه وسلم.
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন-এমন প্রত্যেক মুসলিম সাহাবী বলে গণ্য।”⁴
ড. আবু আমীনাহ বিলাল ফিলিপস বলেন, "যিনি মুসলিম অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন এবং মুসলিম হিসেবে মারা গেছেন।"⁵
মোটকথা: মুসলিম অবস্থায় যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন বা তাঁর সাহচর্য পেয়েছেন এবং মুসলিম হিসেবে মারা গেছেন, তিনিই সাহাবী বলে পরিচিত, চাই তিনি کم বয়সের হউন অথবা পূর্ণবয়স্ক হউন, চাই তাঁর সাহচর্য লাভের বিষয়টি কম সময়ের হউক অথবা বেশি সময় ধরে হউক।
টিকাঃ
² উদ্ধৃতি: ড. নূর উদ্দিন 'আতর, 'মানহাজুন্ নাকদ ফী 'উলুমিল হাদীস', দারুল ফিকর, প্রথম মুদ্রণ: ১৯৭২, পৃষ্ঠা ১১৬; সম্পাদনা পরিষদ, আল-মু'জাম আল-ওয়াসীত, হোসাইনিয়া কুতুবখানা, দেওবন্দ (তা.বি), পৃষ্ঠা ৫০৭।
³ সহীহ বুখারী, সাহাবায়ে কেরামের ফযীলত অধ্যায়।
⁴ ড. 'আজ্জাজ আল-খতীব, 'উসূলুল হাদিস', দারুল ফিকর, চতুর্থ সংস্করণ: ১৯৮১, পৃষ্ঠা ৩৮৫
⁵ ড. আবু আমীনাহ বিলাল ফিলিপস, মাযহাব: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, সিয়ান পাবলিকেশন, প্রথম বংলা সংস্করণ: এপ্রিল ২০১৪, পৃষ্ঠা ২২৭
📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ; সাহাবীগণের স্তর ও শ্রেণিবিন্যাস
হাকেম নীশাপুরী রহ. তার 'মা'রেফাতু 'উলুমিল হাদীস' নামক গ্রন্থে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমের ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তিতা এবং মর্যাদাপূর্ণ স্থানসমূহে তাদের উপস্থিতির দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টি দানের মাধ্যমে তাদেরকে বারোটি স্তর ও শ্রেণীতে বিন্যাস করেছেন। সুতরাং তিনি বলেন,⁶
১. প্রথম স্তরের সাহাবীগণ হলেন যারা মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যেমন, আবু বকর, উমার, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুম।
২. দ্বিতীয় স্তরের সাহাবীগণ হলেন দারুন নদওয়ায় উপস্থিত সদস্যবৃন্দ। আর এটা হলো উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন, তখন তাকে দারুন নদওয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। অতঃপর তিনিসহ মক্কাবাসীর মধ্য থেকে একদল সাহাবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট শপথ গ্রহণ করেন।
৩. আর তৃতীয় স্তরের সাহাবীগণ হলেন ঐসব মুহাজির সাহাবী, যারা হাবশায় হিজরত করেছেন।
৪. আর চতুর্থ স্তরের সাহাবীগণ হলেন যারা 'আকাবা নামক স্থানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট শপথ গ্রহণ করেছেন।
৫. আর পঞ্চম স্তরের সাহাবীগণ হলেন যারা 'আকাবার দ্বিতীয় শপথ অনুষ্ঠানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে শপথ গ্রহণ করেছেন এবং তাদের অধিকংশ ছিলেন আনসার সাহাবী।
৬. আর ষষ্ঠ স্তরের সাহাবীগণ হলেন সেসব মুহাজির, যারা মদীনায় প্রবেশ ও মসজিদ বানানোর পূর্বে 'কুবা' নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পৌঁছেছেন।
৭. আর সপ্তম স্তরের সাহাবী হলেন বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ, যাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَعَلَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ اطَّلَعَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ فَقَالَ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ ».
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন এবং তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, তোমরা যা ইচ্ছা করতে পার। নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।”⁷
৮. আর অষ্টম স্তরের সাহাবী হলেন ঐসব মুহাজির সাহাবীগণ, যারা বদর যুদ্ধ ও হুদায়বিয়ার সন্ধির মধ্যবর্তী সময়ে মদীনায় হিজরত করেছেন।
৯. আর নবম স্তরের সাহাবীগণ হলেন যারা বায়'আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেছেন, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেছেন:
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا ﴾ [الفتح: ١٨]
"অবশ্যই আল্লাহ মুমিনগণের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাই'আত গ্রহণ করেছিল, অতঃপর তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি জেনে নিয়েছেন। ফলে তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয়ে পুরস্কৃত করলেন।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ১৮] আর বায়'আতে রিদওয়ান অনুষ্ঠিত হয়েছিল হুদায়বিয়া নামক স্থানে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার কাফির কর্তৃক ওমরা পালনে বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন।
১০. আর দশম স্তরের সাহাবী হলেন ঐসব মুহাজির সাহাবীগণ, যারা হুদায়বিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের মধ্যবর্তী সময়ে মদীনায় হিজরত করেছেন। তাদের মাঝে অন্যতম হলেন খালিদ ইবন ওয়ালিদ, 'আমর ইবনুল 'আস, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহুম প্রমুখ এবং এ স্তরের সাহাবীগণের সংখ্যা অনেক।
১১. আর একাদশ স্তরের সাহাবীগণ হলেন যারা মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তারা হলেন কুরাইশ গোত্রের একটি দল।
১২. আর দ্বাদশ স্তরের সাহাবীগণ হলেন ছোট্ট শিশু-কিশোর কম বয়সীদের মধ্য থেকে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন মক্কা বিজয়ের দিন, বিদায় হজের দিনসহ বিভিন্ন সময়ে এবং তাদেরকে সাহাবীগণের মধ্যে গণ্য করা হয়।
আবার মোটামুটিভাবে সাহাবীগণের স্তরকে তিনটি শ্রেণীতে বিন্যাসের বিষয়টিও প্রসিদ্ধ:⁸
প্রথম স্তর: বড় বড় সাহাবীগণের স্তর। যেমন, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জন এবং প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবীগণ।
দ্বিতীয় স্তর: মধ্যম স্তরের সাহাবীগণ।
তৃতীয় স্তর: ছোট স্তরের সাহাবীগণ, যারা বিলম্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন অথবা যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে ছোট ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে এবং তাদের মান-মর্যাদার মাঝেও তারতম্য রয়েছে, যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত; কিন্তু তারা সকলেই যে ন্যায়পরায়ণ এবং নবীগণের পরেই তারা যে দুনিয়ার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাদের সকলের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে উত্তম ও কল্যাণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾ [التوبة: ١٠٠]
"আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন।" [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০০]
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন,
لَا يَسْتَوِى مِنكُم مَّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَتَلَ أُوْلَابِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِينَ أَنفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى [الحديد: ١٠]
"তোমাদের মধ্যে যারা বিজয়ের আগে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে, তারা (এবং পরবর্তীরা) সমান নয়। তারা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ তাদের চেয়ে, যারা পরবর্তী কালে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়ের জন্যই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ১০]
সুতরাং সততাও ন্যায়পরয়ণতার প্রশ্নে সাহাবীগণের সকলেই সমান।
সাহাবীগণের সংখ্যা: আর সাহাবীগণের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় এক লক্ষের অধিক হিসেবে। আর আবু যুর'আ আর-রাযী তাদের সংখ্যা নির্ণয় করেন এক লক্ষ চৌদ্দ হাজার বলে।⁹
টিকাঃ
⁶ উদ্ধৃত: ড. নূর উদ্দিন 'আতর, 'মানহাজুন্ নাকদ ফী 'উলুমিল হাদীস' পৃষ্ঠা ১১৯-১২০
⁷ সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৪৬০৮
⁸ উদ্ধৃত: ড. নূর উদ্দিন 'আতর, 'মানহাজুন্ নাকদ ফী 'উলুমিল হাদীস', পৃষ্ঠা ১২০
⁹ উদ্ধৃত: ড. নূর উদ্দিন 'আতর, 'মানহাজুন্ নাকদ ফী 'উলুমিল হাদীস', পৃষ্ঠা ১২০।