📄 জ্বিন সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য
আল্লাহ মানুষকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, একই উদ্দেশ্যে জিন সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ও তা'আলা'র ইবাদাত করার জন্য।
পবিত্র কুরআনে এর প্রমাণ রয়েছে যেমন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ﴿٥٦﴾ “আর আমি জিন ও মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদাতের জন্য。
এমনকি জিনদের কাছে আল্লাহ তা'আলা নাবি-রাসুল ও প্রেরণ করেছেন অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন- يُمَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَقُضُونَ عَلَيْكُمْ ايْتِي وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هُذَا قَالُوا شَهِدْنَا عَلَى أَنْفُسِنَا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيُوةُ الدُّنْيَا وَشَهِدُوا عَلَى انْفُسِهِمْ أَنَّهُمْ كَانُوا كَفِرِينَ ﴿١٠﴾
"হে জিন ও মানব সম্প্রদায়, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য হতে পয়গম্বরগন আগমন করেনি, যারা তোমাদের কে আমার বিধানাবলী বর্ণনা করতেন? এবং তোমাদেরকে আজকের এদিনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন? তারা বলবে, আমরাই আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিচ্ছি। পার্থিব জীবন তাদেরকে প্রতারিত করেছে। তারা নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে যে তারা কাফের ছিল।"
কাজি সানাউল্লাহ পানিপথি রহিমাহুল্লাহ স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে এ অভিমত গ্রহণ করে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। যার সারমর্ম হলো,
“এ আয়াত থেকে প্রমানিত হয় যে আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বে জিনদের রাসুল জিনদের মধ্য হতে আবির্ভূত হতো। এবং মানুষ আগমনের হাজার বছর পুর্বে জিন জাতি বসবাস করত। এবং তারাও মানুষের মত আল্লাহ তায়ালার বিধি-বিধান পালন করতে আদিষ্ট ছিলো। শরিয়ত ও যুক্তির মানদণ্ডে জিনদের মধ্যে আল্লাহর বিধান পৌঁছানোর জন্য পয়গম্বর হওয়া অপরিহার্য।
টিকাঃ
[৭০] সুরা জারিয়াত আয়াত নং৫৬
[৭১] সুরা আনআম আয়াত নং ১৩০
📄 জ্বিনের প্রকারভেদ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জিন তিন প্রকার-
১) যারা বাতাসে উড়ে বেড়ায়। ২) কিছু সাপ ও কুকুর। ৩) যারা মানুষের কাছে আসা-যাওয়া করে।
সাধারণত জিনেরা বিভিন্ন প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারে, তবে তাদের একটি দল সাপ ও কুকুরের রূপ ধারণ করে মানব সমাজে চলাচল করে。
টিকাঃ
[৭২] জামেউস সগীর হাদীস নং ৩১১৪
📄 যেসব কারণে জ্বিন আছর করে
এমন কিছু কারণ রয়েছে যে কারণে সাধারণত জিনেরা মানুষের উপর আছর করে। সেগুলো হলো যথাক্রমে:
১) যদি কোন মানুষ জিনকে কষ্ট দেয়। (অর্থাৎ, বেখেয়াল বশত জিনের গায়ে আঘাত করে, তার খাবার নষ্ট করে, তার গায়ে গরম পানি নিক্ষেপ করে, যেটা গর্তে প্রসাব করার মাধ্যমেও হতে পারে, কেননা কতেক জিন গর্তে বাস করে।)
২) প্রেমাসক্তি। সেটা কোন পুরুষ জিন কোনো নারীর প্রেমে পড়ে, অথবা কোনো নারী জিন কোনো পুরুষের প্রেমে পড়ে, তখন জিনটি তার প্রিয় ব্যক্তির উপর আছর করে।
৩) যদি কোনো গণক বা মুশরিক জাদুকর জিনকে চালান দেয়। সেটা দুইভাবে হতে পারে, প্রথমত: জাদুকর নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে পাকড়াও করার জন্য জিনকে প্রেরণ করে। দ্বিতীয়ত: জাদুকর নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে পাকড়াও করতে জিন চালান দিয়েছে, কিন্তু জিন চলাচলের পথে এমন কাউকে পেয়ে যায়, যাকে তখন সে আছর করে।
৪) অতিরিক্ত রাগ। অর্থাৎ মানুষ যখন অতিরিক্ত রাগের কারণে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তখন জিন তাকে আছর করে।
৫) অতিরিক্ত ভয়। সেটা হলো মানুষ যখন অন্ধকার রাতে কোনো জনমানবহীন বন-জঙ্গল, বাগান বা কোনো মাঠঘাট দিয়ে যাতায়াত করে তখন যদি কোনো ছায়া বা কোনও বস্তু দেখে প্রচণ্ড ভয় পায় তখন জিন তাকে আছর করে।
৬) অতিরিক্ত উদাসীনতা। অর্থাৎ ভরদুপুরে বা সন্ধ্যায় বাড়ির ছাদে, বা কোনো বাগান বা মাঠে একাকী উদাসীন অবস্থায় যদি কেউ বসে থাকে, তখন সেখান থেকে জিন অতিক্রম কালে তাকে আছর করে।
৭) অপবিত্র অবস্থায়। এটা হলো অনেক মানুষ এমন রয়েছে যারা নোংরা এবং অপবিত্র অবস্থায় থাকতে পছন্দ করে। যেহেতু শয়তান জিন অপবিত্রতা ও নোংরা পছন্দ করে, সেহেতু যদি সে এ অবস্থায় কাউকে পেয়ে যায়, তখন তাকে আছর করার সুযোগ গ্রহণ করে থাকে।
📄 জ্বিনের আছর কীভাবে বুঝবেন
সাধারণত জিন যাকে আছর করে তার মাঝে একাধিক ধরনের লক্ষণপাওয়া যায়, তবে সবগুলো লক্ষণএকসাথে পাওয়া জরুরী নয় কোনো কোনো সময় দু একটি লক্ষণপ্রকাশ পেয়ে থাকে। তবে একটি জরুরী বিষয় হলো, বদনজর জাদু, এবং জিনের প্রেসেন্টের লক্ষণসমূহ প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ তবে কিছু কিছু বিষয় ব্যতিক্রম।
লক্ষণসমূহ:
✓ ঘুমন্ত অবস্থায় হঠাৎ করে কেঁদে উঠা, উচ্চস্বরে কথা বলা, জোরে নিঃশ্বাস ফেলা এবং ঘুম হতে আতংকিত অবস্থায় বসে পড়া বা দাঁড়িয়ে যাওয়া।
✓ জাগ্রত অবস্থায় এমন কিছু দেখা, যা তার স্বপ্ন বলে মনে হয়।
✓ কখনো কিছুক্ষণের জন্য বেহুঁশ হয়ে যায়।
✓ কখনো মুখ থেকে ফেনা বের হয় দাঁতে খিল লেগে যায়।
✓ সবসময় ভীতু ভীতু ভাব থাকে।
✓ কখনো কখনো ভিন্ন ভাষায়, এবং বিভিন্ন ভঙ্গিতে কথা বলে।
✓ অনেক সময় তার থেকে আশ্চর্যজনক বিষয় প্রকাশ হয়ে থাকে। যেমন অল্প সময়ে সে বহুদূরে চলে যায় ইত্যাদি।
✓ অনেক সময় মেয়েদের কাছে স্বামী ঘর-সংসার সন্তানদের ভালো লাগে না।
✓ সে ইবাদাত তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদি পছন্দ করে না, বরং এগুলো তার অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়।
✓ আক্রমণাত্বক ও ভয়ংকর স্বপ্ন দেখা। যেমন: কালো কুকুর, কালো সাপ, কালো বিড়াল, অথবা পাহাড় বা উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া অথবা পানিতে পড়ে যাওয়া।
✓ এককানে বা উভয় কানে শো শো আওয়াজ শোনা বা শরীরের ভারসাম্য না থাকার অনুভব হওয়া।
✓ সামান্য কারণে ভীষণ রেগে যাওয়া।
✓ সর্বদা ঘুমের ভাব লেগে থাকা এবং গভীর ঘুম থেকে জেগে কষ্ট অনুভব হওয়া।
✓ কোন কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করা।
✓ কেউ কথা বললে বিরক্ত মনে করা।
✓ একাকী ও নির্জনে থাকতে পছন্দ করা।
✓ এমন কোনো আশ্চর্য ধরনের দুর্গন্ধ পাওয়া যা আশেপাশে কেউ পায় না।
✓ এমন কাজ করেছে মনে হওয়া যা সে করেনি।
✓ কাজ-কর্মে বেশি বেশি ভুল হওয়া।
✓ সর্বদা মনের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় জাগ্রত হওয়া।
✓ দীর্ঘসময় টয়লেটে অবস্থান করা এবং কারো সঙ্গে কথা বলা।
✓ স্পষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত রেগে যাওয়া ও কান্না করা।
✓ আরো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন লক্ষণ রয়েছে, যেমন- বিবাহ চেষ্টায় সফল না হওয়া বা বিবাহ আটকে থাকা ইত্যাদি।
এখানে একটি জরুরী কথা এই যে, পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া ব্যতীত দু একটি সিকনেস দেখলেই তাকে জিনে ধরেছে বলা যাবে না।