📘 রুকইয়াহ শারইয়াহ > 📄 কুরআন ও হাদীসে বদনজর

📄 কুরআন ও হাদীসে বদনজর


যখন কোন ব্যক্তি বা কোন মানুষ অথবা কোন বস্তুর প্রতি আশ্চর্য হয়ে হিংসা মিশ্রিত বিস্ময় নিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকে বদ নজর বলা হয়।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহিমাহুল্লাহ বলেন, “বদনজর মানে হল, হিংসা নিয়ে মন্দ লোকের দৃষ্টিপাত এর প্রভাবে ব্যক্তির ক্ষতি হওয়া।”
বদনজর এতই মন্দ প্রভাব, যার দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হয়ে যায় এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে。
যখন কেউ কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি আশ্চর্য হয়ে অথবা হিংসা মিশ্রিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তখন আল্লাহর যিকর না করে, ব্যক্তি বা বস্তুর গুণাবলী বা প্রশংসা করার দ্বারা ব্যক্তি বা বস্তুর যে ক্ষতি হয় তাকেই বদনজর বলা হয়।
কুরআন থেকে প্রমাণ- وَقَالَ يُبَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ وَمَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ ﴿۷﴾
আর (ইয়াকুব) বললেন, হে আমার পুত্রগণ, তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না। তোমরা পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো। আর আল্লাহর মোকাবেলায় আমি তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারবো না। আর হুকুমতো একমাত্র আল্লাহরই। আমি তাঁর উপরেই ভরসা করেছি, আর ভরসাকারীরা যেন তাঁর উপরেই ভরসা করে।
ঘটনা হল- ইয়াকুব (আ.) এর পুত্ররা খুবই সুদর্শন ছিলো। তাই তিনি আশংকা করছিলেন যে তারা যদি মিশরের প্রবেশ পথ দিয়ে একসাথে একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তাহলে তাদের উপর সেখানকার লোকের (বদনজর) লেগে যেতে পারে। তাই তিনি তাঁর পুত্রদের সতর্ক করছিলেন যেন তাঁরা পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। বস্তুতু সে ঘটনাই আল্লাহতা'আলা কুর'আনুল কারীমের মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন।
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, إِن يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْ لِقُوْنَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ وَاهُ وَمَا هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَلَمِينَ ﴿۵﴾
“আর কাফিররা যখন কুর'আন শুনে তখন শুনার সময় ভীষণ ক্রোধের দৃষ্টিতে তাকিয়ে তোমাকে নড়বড়ে করে ফেলার নিকটবর্তী হয় এবং বলে অবশ্যই এ এক পাগল।
কতিপয় মুফাসসিরে আলেম لَيُزْ لِقُوْنَكَ بِأَبْصَارِهِمْ এর তাফসীর করেছেন এই যে, কাফেররা কুখ্যাত কুদৃষ্টি সম্পন্ন কিছু লোককে নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর কুদৃষ্টি দিতে প্ররোচিত করে। ঘটনা হলো- পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে একদিন এক লোক এসে নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুদৃষ্টি দেয়। তখন নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুর'আন তেলাওয়াত করছিলেন। লোকটিকে দেখেই তিনি উঁচু স্বরে বললেন (لا حول ولا قوة الا بالله) লোকটি তখন ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়।
পবিত্র কুর'আন ও তাফসীর গ্রন্থ অনুসন্ধান করলে এ রকম আরো অসংখ্য আয়াতের দেখা মিলবে। তবে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি সংক্ষেপ করার তাগিদে আমরা দু একটি আয়াতের আলোচনা করে ক্ষান্ত থেকেছি। এবারে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসগ্রন্থ থেকে বদনজরের বাস্তবতা সম্পর্কে আলোকপাত করবো ইনশাআল্লাহ্।

টিকাঃ
[১৮] ফাতহুল বারি ১০/২০০।
[১৯] লিছানুল আরব ১৩/৩০১।
[২০] সূরা ইউসুফ ১২/৬৭
[২১] সূরা ক্বলাম ৬৮/৫১-৫২
[২২] তাফসীরে উসমানী, খ: ৩, পৃ: ৭৫৩ সূরা কলামের ৫২নং আয়াত দ্রষ্টব্য।

📘 রুকইয়াহ শারইয়াহ > 📄 হাদীস থেকে প্রমাণ

📄 হাদীস থেকে প্রমাণ


বদনজর সম্পর্কে নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একাধিক হাদিস রয়েছে।
১। আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “বদনজর সত্য।
২। আবু হুরাইরা রাযি. নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, "তিনি বলেছেন বদনজর সত্য। আর তিনি উল্কি অংকন করতে নিষেধ করেছেন।”
৩। নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "হাম্ম বলতে কিছু নেই এবং বদনজর সত্য।”
৪। "ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "ভাগ্যকে কোন জিনিস অতিক্রম করতে সক্ষম হলে বদনজরই অতিক্রম করতে পারতো।”
৫। আয়িশাহ রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা আল্লাহর নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কেননা, বদনজর সত্য বা বাস্তব ব্যাপার।”
৬। নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরের পরে আমার উম্মাতের সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাবে বদনজরের কারণে।”
৭। নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “বদনজর মানুষকে কবরে এবং উটকে পাতিলে প্রবেশ করিয়ে ছাড়ে।”
৮। ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ তাঁর হাদিস গ্রন্থে বদনজর সম্পর্কে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
আমির ইবনে রাবিয়াহ সাহল ইবনু হুনাইফকে গোসল করতে দেখে বললেন, আজ আমি যেই সুন্দর মানুষ দেখলাম এই রকম কাউকেও দেখিনি। এমনকি সুন্দরী যুবতীও এত সুন্দর দেহবিশিষ্ট দেখিনি। আমিরের এই কথা বলার সাথে সাথে সাহল সেখানে লুটিয়ে পড়লো。
এক ব্যক্তি নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়ে আরয করল, "ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি সাহল ইবনে হুনাইফ এর কিছু খবর রাখেন কি? আল্লাহর কসম, সে মস্তক উত্তোলন করতে পারছে না।
"তখন নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি কি মনে করছ কেউ তাকে বদনজর দিয়েছে?, লোকটি বললো, "হ্যাঁ। ইবনে রাবিয়াহ (বদনজর দিয়েছে)। অতঃপর নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমির ইবনে রাবিয়াহকে ডেকে ক্রোধান্বিন হয়ে তাকে বললেন, “তোমাদের কেউ নিজের মুসলমান ভাইকে কেন হত্যা করছ? তুমি বারাক আল্লাহ কেন বললেন না?
এই বার তুমি তাঁর জন্য গোসল করো।” অতঃপর আমির হাত মুখ, হাতের কনুই, হাঁটু, পায়ের আশেপাশের স্থান এবং লুঙ্গির নিচের আবৃত দেহাংশ ধৌত করে। ওই পানি একটি পাত্রে জমা করলো। সেই পানি সাহলের দেহে ঢেলে দেওয়া হলো। অতঃপর সাহল সুস্থ হয়ে গেলো।

টিকাঃ
[২৩] সুনানে আবু দাউদ ৩৮৩৯
عن همام بن منبه قال: هذا ما حدثنا أبو هريرة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: العين حق
[২৪] সহীহুল বুখারী ৫৭৪০, সহীহুল মুসলিম ২১৮৭, মুসনাদে আহমাদ ৮২৫২ عن أبي هريرة ، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «العين حق ونهى عن الوشم
[২৫] জামে' আত তিরমিজি ২০৬১ حَيَّةُ بْنُ حَابِسٍ التَّمِيمِي قَالَ: حَدَّثَنِي أَبِي، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: لا شَيْءٌ في الهَامِ، وَالعَيْنُ حَقٌّ
[২৬] জামে' আত তিরমিজি ২০৬২ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابَقَ القَدَرَ لَسَبَقَتْهُ العَيْنُ
[২৭] সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৫08
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم "اسْتَعِيذُوا بِاللهِ، فَإِنَّ الْعَيْنَ حَقٌّ"
[২৮] সহীহুল জামে ১২০৬। ত্বায়ালিসী, হাদীস নং-১৮৬৮ أكثر من يموت من أمتي بعد قضاء الله وقدره بالعين
[২৯] সহীহুল জামে ৪১৪৪ العين تدخل الرجل القبر وتدخل الجمل القدر
[৩০] সহিহ ইবনু মাজাহ ৩৫০৯, আহমাদ ১৬০২৩, মিশকাত ৪৫৬২
عَنْ أَبِي أَمَامَةَ بْنِ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ، قَالَ: مَرَّ عَامِرُ بْنُ رَبِيعَةَ بِسَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ وَهُوَ يَغْتَسِلُ. فَقَالَ: لَمْ أَرَ كَالْيَوْمِ، وَلَا جِلْدَ مُخَبَّأَةٍ فَمَا لَبِثَ أَنْ لُبِطَ بِهِ، فَأْتِيَ بِهِ النَّبِيِّ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .. فَقِيلَ لَهُ: أَدْرِكْ سَهْلًا صَرِيعًا. قَالَ: "مَنْ تَتَّهِمُونَ بِهِ ؟ " قَالُوا: عَامِرَ ابْنَ رَبِيعَةً. قَالَ: عَلَامَ يَقْتُلُ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ؟ إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مِنْ أَخِيهِ مَا يُعْجِبُهُ، فَلْيَدْعُ لَهُ بِالْبَرَكَةِ ثُمَّ دَعَا بِمَاءٍ فَأَمَرَ عَامِرًا أَنْ يَتَوَضَّأُ، فَيَغْسِلْ وَجْهَهُ وَيَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ وَرُكْبَتَيْهِ وَدَاخِلَةَ إِزَارِهِ، وَأَمَرَهُ أَنْ يَصُبُّ عَلَيْهِ.

📘 রুকইয়াহ শারইয়াহ > 📄 বদনজরের কারণে যে সকল রোগ হতে পারে!

📄 বদনজরের কারণে যে সকল রোগ হতে পারে!


জ্বরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাথা, একাধিক প্রকারের ক্যান্সার, হার্ট অ্যাটাক, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অবশ হওয়া, বন্ধ্যাত্ব, সুগার, ব্লাড প্রেশার, এমনকি বোবা হয়ে যাওয়াসহ মহিলাদের মাসিক ঋতুর অনিয়ম ও কিছু গোপন রোগ এবং কিছু মানসিক রোগ ইত্যাদি।

📘 রুকইয়াহ শারইয়াহ > 📄 কীভাবে বদনজর থেকে বেঁচে থাকবেন

📄 কীভাবে বদনজর থেকে বেঁচে থাকবেন


বদনজরে আক্রান্ত হওয়ার পর এর চিকিৎসা করার চেয়ে, আক্রান্ত হওয়ার পূর্বের সতর্কতা অবলম্বন করা অপেক্ষাকৃত সহজ। কারো প্রশংসা করার সময় আল্লাহর জিকর করা। অর্থাৎ, আল্লাহর নাম নিয়ে কারো প্রশংসা করলে বদনজর লাগে না, যেমন মাশা-আল্লাহ, বারাকাআল্লাহ বললে বদনজরে পতিত হওয়ার আশংকা থাকে না। পবিত্র কুর'আনে আল্লাহ যেমন বলেছেন-
وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ إِنْ تَرَنِ أَنَا أَقَلَّ مِنْكَ مَالًا وَوَلَدًا
অর্থ: “যখন তুমি বাগানে প্রবেশ করলে তখন তুমি মাশাআল্লাহ (আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন), লা- কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ (আল্লাহ্ ছাড়া কারো কোনো শক্তি সামর্থ নেই) বললে না কেন; যদিও তুমি আমাকে সন্তানে ও সম্পদে তোমার চেয়ে কম দেখো。
এখানে লক্ষণীয় যে, যদি কেউ আপনার বা আপনার কোন জিনিষের প্রশংসা করে, আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা ছাড়াই, তখন কি করণীয়? যদি এই ঘটনা আপনার উপস্থিতিতে ঘটে থাকে বা আপনি পরে জানতে পারেন তখন আপনি (لا حول و لا قوة الا بالله) বলবেন। নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের অথবা নিজের কিংবা তার সম্পদের কিছু দেখে আশংকা বোধ করে, তখন সে যেন তার বরকতের দু'আ করে। কেননা নজর সত্য বিষয়।"

টিকাঃ
[৩৩] সূরাতুল কাহফ ১৮/৩৯
[৩৪] মুসনাদে আহমাদ ১৫৭০০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00