📄 চিন্তাশীলদের খিদমতে বিনীত নিবেদন
ঈমানওয়ালা দাবীদারদের জন্য তাওয়াক্কুল থাকা শর্ত। আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তাওয়াক্কুলকে, কোথাও ঈমানের সাথে কোথাও ইসলামের সাথে, কোথাও তাকওয়ার সাথে, কোথাও ইবাদতের সাথে, কোথাও হিদায়াতের সাথে, উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ্ ছাড়া মানুষ বা অন্যকিছুর উপরে তাওয়াক্কুল করা শিরক। আর শিরকী তাবীজ-কবজ ও তাওয়াক্কুলের বিপরীত আওতায় পড়ে, কেননা মানুষ তাবীজের উপর ভরসা করে। মুশরিক যাদুকররাও তাবীজের মাধ্যমে মানুষকে শিরকে লিপ্ত করে এবং তাদের অসৎ কর্মকান্ড দেদারছে চালিয়ে যায়।
ধরুন, তাবীজ ব্যবহারকারী কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়; ভাই এত রাতে অমুক জায়গার উপর দিয়ে চলাচল করেন, ভয়ডর লাগেনা, আপনার কোন সমস্যা হয় না? সে উত্তর দেয়, আমার সাথে তাবীজ আছে কেউ আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এটা এক ধরনের শিরক। যেন সে মনের অজান্তেই আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাবীজকেই সুরক্ষা দেয়ার রক্ষা-কবজ মনে করলো। এমন মন্তব্যের চিত্র আমাদের সমাজে অহরহ। এও প্রশ্ন করতে পারেন যে, তিনিতো তাবিজের উপর ভরসা করেননি ভরসা করেছেন তাতে লিখিত কুরআনের আয়াতের উপর এতে তো আল্লাহ্র উপরই ভরসা করা হয়। তাদের এই খোঁড়া অযুহাতের উত্তরে বলবো, এতে যে নির্ভেজাল কুরআনের আয়াত আছে তাতো আপনি নিশ্চিত না। কারণ যদি কিছু আয়াত থেকেও থাকে তার সাথে বিভিন্ন শিরকি কথা মিলিত থাকে যা আরো মস্তবড় গুনাহ। যদি কোন সমস্যা না থাকে তবে তো আপনারও সমস্যা নেই আমারও সমস্যা নেই। সবাই বেঁচে যাবে। আর সমস্যা আছে বা নেই এটা বুঝার আগ পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তাই প্রত্যেকের উচিত উম্মাহকে শিরক থেকে বাঁচাতে সন্দেহযুক্ত তাবীজ-কবজ বর্জন করা যা এখন সময়ের দাবী।
তবে কুরআনের আয়াত, আয়াতাংশ বা সুন্নাহ'য় বর্ণিত দুআ, যিকরসমূহ দ্বারা যদি কোন সম্মানিত মুহাক্কিক আলিম লিখিত চিকিৎসা দেন সেটা অবশ্যই জায়েজ।
আর এটা রুকইয়াহ তথা সুন্নাহ চিকিৎসার মধ্যেই শামিল। তবে সালাফদের এই ফতোয়াকে পুঁজি করে যদি কেউ শিরকী তাবীজ ব্যবহার করে, অথবা কোন আলিমও যদি কুরআনের আয়াতের সাথে অস্পষ্ট অন্য কিছু লিখে তাবিজ দেয়, যেখানে শিরক এবং কুফর মিশ্রিত কথাবার্তা থাকে, তবে সেটাও অস্পষ্ট তাবিজ হিসেবে গন্য হবে এবং তা বাতিল হিসেবে গন্য হবে তা ব্যবহার করা হারাম হবে।
অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, অনেকেই তাবিজ-কবজের বাছ বিচার, হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করেই এবং এর ইলম সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা না থাকলেও এসব অস্পষ্ট তাবীজের পক্ষে খুব উত্তেজিত হয়ে বলতে শোনা যায়, আরে এই তাবিজ তো চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয়; এতে সমস্যা কী?
তাদের কাছে প্রশ্ন হলো, ইসলাম কি তাহলে একটি অপরিপূর্ণ ধর্ম?
কুরআন-হাদীসে কী স্পষ্ট কোন শরয়ী চিকিৎসা পদ্ধতির কথা উল্লেখ নেই?
যেখানে হাদীসে তাবীজ-কবজ স্পষ্ট শিরক, উল্লেখ থাকার পরেও কেন এটাকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে এবং এটাকে দলিল-প্রমাণ দ্বারা জায়েজ করতে হবে? এসব তাবীজ-কবজের পেছনেই কেন আধাজল খেয়ে নামতে হবে?
কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী কী কোন চিকিৎসা পদ্ধতি নেই?
প্রত্যেক হাদীসের কিতাবে যে চিকিৎসা নামে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে সেখানে কী শিরকের কথা উল্লেখ নেই?
এত কিছু থাকার পরেও কেন এসব অস্পষ্ট তাবীজ-কবজকে বেছে নিতে হবে? আমাদের আকাবিরীনে দেওবন্দ এবং পূর্বসুরী আসলাফগণ কী, কুরআন সুন্নাহ'র পদ্ধতি বাদ দিয়ে এসব তাবীজ-কবজের উপর নির্ভরশীল ছিলেন?
আশা করি এর উত্তর সবারই জানা আছে। আমরা যদি সরাসরি সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত স্পষ্ট আমলগুলির প্রচার-প্রসার এবং প্রচলন ঘটাতাম! এবং এ বিষয়ে নিজেরা আমাল করতাম! তবে তাওহীদ ও শিরকের বিষয়ে আমাদের চোখে বিশেষ কোন সম্প্রদায় আঙ্গুল দিতে পারতো না! কারণ সাধারণ মানুষ আলিমদের বরাত দিয়েই চলে। তারা টুপি পাগড়ীওয়ালা হুজুরদের দিকেই অভিযোগের আঙ্গুল তাক করে। মনে রাখতে হবে, একরকম আমরাই এই শিরকী কর্মকান্ড সমাজে জিইয়ে রাখছি, ফলশ্রুতিতে এই ঈমান বিধ্বংসী বিষবাষ্প সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে করে উম্মাহ'র তো কোনো ফায়দা হচ্ছেই না, উল্টো দিকে বিভিন্ন ভন্ড বৈদ্য, জ্যোতিষ-যাদুকর ও শিরকের ফেরিওয়ালাদের উত্থান বাড়ছে এবং বিভিন্ন বিশেষ ফেরকা ও সম্প্রদায় এর থেকে ফায়দা লুটছে। হায় আফসোস! যা খটকা ছিলো তা চোখের সামনে বিদ্যমান। যদি গোটা কুরআন সার্চলাইট দিয়ে খুঁজে দেখি, একটি আয়াত বা লফজ ও তাবিজ-কবজের সুপক্ষে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সন্দেহ বা সংশয়পূর্ণ বাক্য বা শব্দ, যদিও সেটা আরবী হরফে লিখিত হোক না কেন, এটা যদি কুরআনের আয়াতের সাথে মিশিয়ে লিখে দেয়া হয়, তবে এসকল তাবিজ-কবজ মুমিনদের জন্য বর্জন করা খুব জরুরী, কেননা ইসলাম কখনোই কোন সন্দেহ পূর্ণ বিষয়কে সমর্থন করে না। অতএব এই ধরনের তাবীজ বর্জন করা তাকওয়ার দাবী বস্তুত ঈমানেরই দাবী। মূলকথা হলো, যদি কোন বিষয়ে ইখতেলাফ (মতানৈক্য) থাকে, তবে সে বিষয়ে তাকওয়াকে প্রাধান্য দেয়া জরুরী।
টিকাঃ
[১৭] মাজমাউল ফতোয়া ১৯/৬৪