📄 নকশার মাধ্যমে তাবিজ লেখা ও তা ব্যবহার করা
নকশার দ্বারা আসলে শুধু ইঙ্গিত বুঝায়। বাস্তবে নকশার কোন অর্থ নেই। আমরা যেমন দিক বুঝানোর জন্য তীর চিহ্ন ব্যবহার করি কিন্তু এর কোন অর্থ নেই। ঠিক তেমনিভাবে .....। অক্ষরগুলোকে ।৮.৮.৫ এর মাধ্যমে প্রকাশ করার কোন অর্থ নেই। কিন্তু যত তাবিজ-তুমার লেখা হয় তার অধিকাংশেই এই সংখ্যার ব্যবহার খুব বেশি। সংখ্যার যদি নিজস্ব কোন অর্থ না থাকে, তাহলে সেটা দ্বারা কোরআনের আয়াতের নকশা বানানো বা পবিত্র কোরআনের সূরাসমূহের নকশা বানানো কতটুকুট বৈধ তা আমরা বলতে পারবো না।
কতগুলো আঁকিবুকি করে যদি বলা হয় এগুলো কোরআনের আয়াতের সারাংশ বা মান তাহলে সেটা কতটুকু সঠিক হতে পারে তা সহজেই বোধগম্য।
থানাবি রহ. তাবিজ সম্পর্কে দুইটি কিতাব লিখেছেন। একটি হলো আমালে কোরআনী। অন্য আরেকটি লিখেছেন। অনেক আগে কিতাবটি পড়ার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই কিতাবটির নাম মনে নেই। উক্ত কিতাবে তিনি বলেছেন, কোন নকশার অর্থ জানা না থাকলে তা দিয়ে তাবিজ লেখা বৈধ নয়। আমাদের বাজারে প্রচলিত যতগুলো তাবিজের বই আছে তাতে প্রায় সবগুলোতেই পবিত্র কোরআনের সূরাগুলোর নকশা দেওয়া আছে। প্রশ্ন হলো, কে এই নকশাগুলো তৈরি করলো?
আর কীভাবেই বা তৈরি করা হলো?
কোন সংখ্যার জন্য কোরআনের কোন কোন আয়াত নির্ধারিত করা হলো?
এই সংখ্যা দিয়ে কোরআনের আয়াতের মান লিখার কি মূলনীতি রয়েছে?
নকশার মাধ্যমে কোরআনের আয়াতগুলোর প্রতীকি তাবিজ লেখার কেন প্রয়োজন হলো?
এসব প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। তাই আমরা বলি নকশার মাধ্যমে কোন তাবিজ লেখা বৈধ নয়। কিন্তু আমাদের দেশে বড় বড় শায়খ ও অনেক উলামায়ে কেরাম এই তাবিজ দেদারছে লিখে যাচ্ছেন আর এটাকে বৈধ বলেও ফতোয়া দিচ্ছেন। জানিনা এর বৈধতা কোরআন-সুন্নাহর কোন উৎস থেকে নির্গত! আল্লাহ আমাদের সবধরনের ভ্রান্তি থেকে হেফাজত করুন।
📄 কিছু বাস্তব নমুনা
নিচের চিত্রে আটটি তাবীজের চিত্র দেয়া আছে। যে তাবীজগুলো আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে যা বান মারা, গর্ভের সন্তান নষ্ট করা, ছেলে বা মেয়েকে বশ করা, মানুষকে অসুস্থ করে রেখে মেরে ফেলাসহ বিভিন্ন কুফরি এবং শিরকী তাবিজ যা বিভিন্ন ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আমরা কোনো তাবিজের জন্য সাথে কোন ক্যাপশন দেইনি; যাতে এগুলোর দ্বারা কেউ উৎসাহিত হয়ে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করতে না পারে।
📄 শিরক এবং কুফরি তাবীজ থেকে কীভাবে বেঁচে থাকবেন?
> সর্বপ্রথম আপনাকে তাওহীদের ভিত্তিতে ঈমান আকিদাহ্ ও বিশ্বাস বিশুদ্ধ করতে হবে।
> আহলে সুন্নাহ ওয়াল-জামায়াহ্'র পূর্ণ অনুসারী হতে হবে।
> যদি আপনার কোন সমস্যা দেখা দেয় তবে সমস্যা উত্তরণের উপায় অভিজ্ঞ মুহাক্কিক আলিমদের কাছ থেকে জেনে নিবেন।
> চমকপ্রদ সুন্দর লেবাস পোশাক, বড় পাগড়ীওয়ালা বেশভূষায় বুযুর্গ বা বিশাল টাইটেল বা নামধারী মাওলানা হলেই তাকে মুহাক্কিক মনে করা যাবে না। এ ব্যাপারে ভালো করে খোঁজ নিতে হবে। খেয়াল রাখবেন আপনি কোনো ভণ্ড বা বাটপারের পাল্লায় পড়ছেন না তো!
> কোন ওঝা, বৈদ্য, দরবেশ বা সাধুদের কাছ থেকে কখনোই কোনো তাবীজ নেয়া যাবে না।
> তারপরও যদি কেউ তাবীজ দিতে চান! তাহলে তার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে নিন এ তাবিজের কোনো শরয়ী প্রমাণ তার কাছে আছে কিনা?
চিকিৎসা তার কাছ থেকেই নিবেন যিনি কুরআন সুন্নাহ'য় বর্ণিত তদবীর দিবেন, প্রচলিত শিরকী তাবিজ-কবজ নয়!
> যদি কারো সাথে কোনো তাবিজ পাওয়া যায়, তবে সেটা খুলে দেখতে হবে, তাতে কুফরি কিছু আছে কিনা? যদি আপত্তিকর কিছু পাওয়া যায় তবে সূরা ফালাক্ক নাছ পড়ে ফুঁক দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ফিতনার আশংকা থাকলে প্রয়োজনে মুহাক্কিক আলিমদের শরণাপন্ন হতে হবে।
> দ্বীনদার ব্যক্তি হলেও অনেকে এইসব বিষয়ে জ্ঞান রাখেন না। এজন্য তালগোল না পাকিয়ে এ বিষয়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নিতে হবে, যার তার পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে না।
> মনে রাখবেন, আপনার ঈমান আপনার আমানত, আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো আপনাকে সতর্ক করার, অতএব পরবর্তী পদক্ষেপ আপনাকেই নিতে হবে।
📄 চিন্তাশীলদের খিদমতে বিনীত নিবেদন
ঈমানওয়ালা দাবীদারদের জন্য তাওয়াক্কুল থাকা শর্ত। আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তাওয়াক্কুলকে, কোথাও ঈমানের সাথে কোথাও ইসলামের সাথে, কোথাও তাকওয়ার সাথে, কোথাও ইবাদতের সাথে, কোথাও হিদায়াতের সাথে, উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ্ ছাড়া মানুষ বা অন্যকিছুর উপরে তাওয়াক্কুল করা শিরক। আর শিরকী তাবীজ-কবজ ও তাওয়াক্কুলের বিপরীত আওতায় পড়ে, কেননা মানুষ তাবীজের উপর ভরসা করে। মুশরিক যাদুকররাও তাবীজের মাধ্যমে মানুষকে শিরকে লিপ্ত করে এবং তাদের অসৎ কর্মকান্ড দেদারছে চালিয়ে যায়।
ধরুন, তাবীজ ব্যবহারকারী কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়; ভাই এত রাতে অমুক জায়গার উপর দিয়ে চলাচল করেন, ভয়ডর লাগেনা, আপনার কোন সমস্যা হয় না? সে উত্তর দেয়, আমার সাথে তাবীজ আছে কেউ আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এটা এক ধরনের শিরক। যেন সে মনের অজান্তেই আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাবীজকেই সুরক্ষা দেয়ার রক্ষা-কবজ মনে করলো। এমন মন্তব্যের চিত্র আমাদের সমাজে অহরহ। এও প্রশ্ন করতে পারেন যে, তিনিতো তাবিজের উপর ভরসা করেননি ভরসা করেছেন তাতে লিখিত কুরআনের আয়াতের উপর এতে তো আল্লাহ্র উপরই ভরসা করা হয়। তাদের এই খোঁড়া অযুহাতের উত্তরে বলবো, এতে যে নির্ভেজাল কুরআনের আয়াত আছে তাতো আপনি নিশ্চিত না। কারণ যদি কিছু আয়াত থেকেও থাকে তার সাথে বিভিন্ন শিরকি কথা মিলিত থাকে যা আরো মস্তবড় গুনাহ। যদি কোন সমস্যা না থাকে তবে তো আপনারও সমস্যা নেই আমারও সমস্যা নেই। সবাই বেঁচে যাবে। আর সমস্যা আছে বা নেই এটা বুঝার আগ পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তাই প্রত্যেকের উচিত উম্মাহকে শিরক থেকে বাঁচাতে সন্দেহযুক্ত তাবীজ-কবজ বর্জন করা যা এখন সময়ের দাবী।
তবে কুরআনের আয়াত, আয়াতাংশ বা সুন্নাহ'য় বর্ণিত দুআ, যিকরসমূহ দ্বারা যদি কোন সম্মানিত মুহাক্কিক আলিম লিখিত চিকিৎসা দেন সেটা অবশ্যই জায়েজ।
আর এটা রুকইয়াহ তথা সুন্নাহ চিকিৎসার মধ্যেই শামিল। তবে সালাফদের এই ফতোয়াকে পুঁজি করে যদি কেউ শিরকী তাবীজ ব্যবহার করে, অথবা কোন আলিমও যদি কুরআনের আয়াতের সাথে অস্পষ্ট অন্য কিছু লিখে তাবিজ দেয়, যেখানে শিরক এবং কুফর মিশ্রিত কথাবার্তা থাকে, তবে সেটাও অস্পষ্ট তাবিজ হিসেবে গন্য হবে এবং তা বাতিল হিসেবে গন্য হবে তা ব্যবহার করা হারাম হবে।
অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, অনেকেই তাবিজ-কবজের বাছ বিচার, হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করেই এবং এর ইলম সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা না থাকলেও এসব অস্পষ্ট তাবীজের পক্ষে খুব উত্তেজিত হয়ে বলতে শোনা যায়, আরে এই তাবিজ তো চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয়; এতে সমস্যা কী?
তাদের কাছে প্রশ্ন হলো, ইসলাম কি তাহলে একটি অপরিপূর্ণ ধর্ম?
কুরআন-হাদীসে কী স্পষ্ট কোন শরয়ী চিকিৎসা পদ্ধতির কথা উল্লেখ নেই?
যেখানে হাদীসে তাবীজ-কবজ স্পষ্ট শিরক, উল্লেখ থাকার পরেও কেন এটাকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে এবং এটাকে দলিল-প্রমাণ দ্বারা জায়েজ করতে হবে? এসব তাবীজ-কবজের পেছনেই কেন আধাজল খেয়ে নামতে হবে?
কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী কী কোন চিকিৎসা পদ্ধতি নেই?
প্রত্যেক হাদীসের কিতাবে যে চিকিৎসা নামে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে সেখানে কী শিরকের কথা উল্লেখ নেই?
এত কিছু থাকার পরেও কেন এসব অস্পষ্ট তাবীজ-কবজকে বেছে নিতে হবে? আমাদের আকাবিরীনে দেওবন্দ এবং পূর্বসুরী আসলাফগণ কী, কুরআন সুন্নাহ'র পদ্ধতি বাদ দিয়ে এসব তাবীজ-কবজের উপর নির্ভরশীল ছিলেন?
আশা করি এর উত্তর সবারই জানা আছে। আমরা যদি সরাসরি সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত স্পষ্ট আমলগুলির প্রচার-প্রসার এবং প্রচলন ঘটাতাম! এবং এ বিষয়ে নিজেরা আমাল করতাম! তবে তাওহীদ ও শিরকের বিষয়ে আমাদের চোখে বিশেষ কোন সম্প্রদায় আঙ্গুল দিতে পারতো না! কারণ সাধারণ মানুষ আলিমদের বরাত দিয়েই চলে। তারা টুপি পাগড়ীওয়ালা হুজুরদের দিকেই অভিযোগের আঙ্গুল তাক করে। মনে রাখতে হবে, একরকম আমরাই এই শিরকী কর্মকান্ড সমাজে জিইয়ে রাখছি, ফলশ্রুতিতে এই ঈমান বিধ্বংসী বিষবাষ্প সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে করে উম্মাহ'র তো কোনো ফায়দা হচ্ছেই না, উল্টো দিকে বিভিন্ন ভন্ড বৈদ্য, জ্যোতিষ-যাদুকর ও শিরকের ফেরিওয়ালাদের উত্থান বাড়ছে এবং বিভিন্ন বিশেষ ফেরকা ও সম্প্রদায় এর থেকে ফায়দা লুটছে। হায় আফসোস! যা খটকা ছিলো তা চোখের সামনে বিদ্যমান। যদি গোটা কুরআন সার্চলাইট দিয়ে খুঁজে দেখি, একটি আয়াত বা লফজ ও তাবিজ-কবজের সুপক্ষে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সন্দেহ বা সংশয়পূর্ণ বাক্য বা শব্দ, যদিও সেটা আরবী হরফে লিখিত হোক না কেন, এটা যদি কুরআনের আয়াতের সাথে মিশিয়ে লিখে দেয়া হয়, তবে এসকল তাবিজ-কবজ মুমিনদের জন্য বর্জন করা খুব জরুরী, কেননা ইসলাম কখনোই কোন সন্দেহ পূর্ণ বিষয়কে সমর্থন করে না। অতএব এই ধরনের তাবীজ বর্জন করা তাকওয়ার দাবী বস্তুত ঈমানেরই দাবী। মূলকথা হলো, যদি কোন বিষয়ে ইখতেলাফ (মতানৈক্য) থাকে, তবে সে বিষয়ে তাকওয়াকে প্রাধান্য দেয়া জরুরী।
টিকাঃ
[১৭] মাজমাউল ফতোয়া ১৯/৬৪