📄 ওঝা বা তাবীজ ওয়ালাদের তেলেসমাতি
গণক বা বিশেষ করে যারা সাধারণত তাবিজ-কবজ দেন, তাদের একটা বৈশিষ্ট্য হলো তারা নিজেদের পান্ডিত্য জাহির করার জন্য রোগীদের কাছে এমন কিছু কথা বলেন, যাতে রোগীরা প্রভাবিত হয়, এবং দেখা যায় অনেক অনেক কথা পরবর্তিতে মিলেও যায়, যাতে রোগীদের তার প্রতি আস্থা বেড়ে যায় এবং বিশ্বাস স্থাপন করেন। কি সেই তেলেসমাতি? কি সেই কারবার? যার কারণে সে গণক বা তাবীজওয়ালা অদৃশ্যের খবর বলতে পারেন (!) যা অন্য সাধারণ মানুষ পারে না; আসুন তার কারণ জেনে নেয়া যাক; প্রিয় রাসুলের পাক জবানিতে-
হাদীস ৪- আয়িশা রাযি. বর্ণনা করেছেন- আয়িশা রাযি. বলেন, কয়েকজন লোক নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে গণকদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন ওরা কিছুই না। তারা আবার বললে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন ওরা কিছুই না। তারা আবার বললো "হে আল্লাহর রাসুল, তারা তো কোন সময় এমন কথা বলে দেয়, যা বাস্তবে ঘটে যায়। নাবি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কথাটি জিন থেকে পাওয়া। জিনেরা তা (আসমানের ফেরেশতাদের থেকে) ছোঁ মেরে নিয়ে এসে তাদের বন্ধু গণকদের কাছে তুলে দেয়, যেভাবে মুরগী তার বাচ্চাদের মুখে দানা তুলে দেয়। তারপর এ গণকরা এর সাথে আরো শতাধিক মিথ্যা কথা মিলিয়ে দেয়।
টিকাঃ
[১৩] সহিহুল বুখারী হাদীস নং ৬২১৩/সহিহ মুসলিম হাঃ নং২২২৮ মুসনাদে আহমদ হাঃনং ২৪৬২৪
قالت عائشة: سأل أناس رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الكهان، فقال لهم رسول الله صلى الله عليه وسلم: «ليسوا بشيء» قالوا: يا رسول الله، فإنهم يحدثون أحيانا بالشيء يكون حقا ؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «تلك الكلمة من الحق يخطفها الجني، فيقرها في أذن وليه قر الدجاجة، فيخلطون فيها أكثر من مائة كذبة
📄 একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা
যারা তাবীজ-কবজ জায়েজ হওয়ার পক্ষে কথা বলেন, তারা কুরআনের এই আয়াতটি উল্লেখ করেন, "আমি অবতীর্ণ করেছি কুরআন, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত, কিন্তু যালিমরা ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে।”
তাদের যুক্তি হলোঃ যেহেতু হাদিসে ঝাড়ফুঁককেও (রুকইয়াহ) শিরক বলা হয়েছে, সেহেতু যদি তাবিজ-কবজ শিরক হয় তবে রুকইয়াহ'ও শিরক। এই সূত্রেই তারা রুকইয়াহ'র সাথে তাবীজ-কবজকে কিয়াস করেন।
আর একটি যুক্তি হলো, যে ধরনের তাবিজে কুরআনের আয়াত বা আয়াতের অংশবিশেষ থাকে সেগুলোতে কোনো সমস্যা নেই; তা ব্যবহার করা জায়েজ। কেননা, কুরআনের তাসির (প্রভাব) অনস্বীকার্য। এখানেও তারা উপরোক্ত আয়াত দ্বারা কিয়াস করেন।
তাদের প্রথম যুক্তির উত্তর হলো এই যে, একথার সাথে আমাদের কোনই দ্বিমত থাকতো না যদি কর্মে এটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা হতো। কিন্তু এই আয়াত বা আয়াতাংশের সাথে যে তাবিজ ওয়ালারা শিরকি ও কুফরি কথা মিলিয়ে লেখা হয় সেটা কী করে জায়েজ হতে পারে? যদিও তা আরবী ভাষায় লেখা হয়? পরের কথা হলো, রুকইয়াহ'কে শিরক বলা হয়েছে অন্য কারণে তা হলো, রুকইয়াহ দুই প্রকার:
১. শিরকি রুকইয়াহ। ২. কুরআনের আয়াত দ্বারা রুকইয়াহ।
এখানে শিরকি রুকইয়াহ'র কথা বলা হয়েছে। কেননা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকইয়াহ'র বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছেন। আমল করেছেন, সাহাবীদেরকে করতে বলেছেন আবার তিনি কেন রুকইয়াহকে শিরক বলবেন? আসলে স্পষ্ট কথা হলো নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে বৈপরিত্যের লেশমাত্রও নেই। সমস্যা আমাদের গোঁড়ামি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতায়। কোন বুজুর্গানে দ্বীনের ব্যক্তি জীবনে অস্পষ্ট কোন বিষয়ের যদি কিছু আমাল থেকেও থাকে, তাই বলে সেটা শরিয়ত হয়ে যায় না। সেটা কেন উম্মাহর ঘাড়ে ইসলামত্ব বলে চাপিয়ে দেয়া হবে?
প্রিয় রাসুলের নবুয়তী জামানায়, যে জাহেলী যুগের তাবীজকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এ জামানায়ও তা নিষিদ্ধ; কেননা, ইসলাম সর্বকালের ধর্ম।
আমাদের দেশের মাজার পূজারীদের মধ্যে তাবীজের ব্যবহার প্রচলন ব্যাপকভারে করতে দেখা যায়। আর একটা কথা হলো, কুরআনের আয়াত বা আয়াতাংশ শুধু শরীরে বা বাড়িতে ঝুলানো বা লটকালেই ফায়দা হাসিল হয় না; যদি শুধু ঝুলানোর দ্বারা ফায়দা হতো; তবে আমাদের সমাজে অনেকের বাড়িতে, ঘরে দোকানে, কুরআনের হাজার হাজার নুসখা ধুলামলিন হয়ে বছরের পর বছর পরে আছে, তাহলে তো কুরআনের কপি সেখানে থাকার কারণে ঘরওয়ালাদের অনেক অনেক বেশি নেকী ও বরকত হতো।
কুরআন মাজীদ কী গলায় ঝুলিয়ে ব্যবহার করার জন্য নাজিল হয়েছে? নাকি; নাজিল হয়েছে তিলাওয়াত করার জন্য, আমল করার জন্য?
আলকুরআনের প্রথম নাযিলকৃত আয়াত "ইক্করা, অর্থ: পড়। পড়তে বলা হয়েছে। তিলাওয়াত করলে প্রতি হরফে দশ নেকী।
সূরা ফাতিহা পড়ার ফজিলত বয়ান করা হয়েছে। সূরা ফাতিহাকে শিফা বলা হয়েছে। কুরআন খতমে নেকীর ফজিলত বয়ান করা হয়েছে। কোথাও তাবীজ হিসেবে গলায়, হাতের বাজুতে বা কোমরে ঝুলিয়ে ব্যবহার করার কথা বলা হয়নি। বরকত তো হবে যেই স্থান বা ঘরে যেখানে কুরআনের তিলাওয়াত হবে আমাল হবে। এরপরও যারা পূর্বসুরী উলামা বা ব্যক্তিত্বশীল আকাবিরের অথবা বিশেষ কারও নাম ভাঙিয়ে শিরকী তাবিজের বৈধতা দিতে চায়; তারা যেন একরকমের, ভন্ড ওঝা, মাজার পূজারী, জ্যোতিষ-যাদুকরদের এহেন দুষ্কর্মে উৎসাহ দিতে চায়; এবং ওদের ভিত মজবুত করতে চায়। ইয়া আল্লাহ্ উম্মাহকে ফেতনা থেকে হিফাজত করুন, আমিন।
টিকাঃ
[১৪] সুরা ইসরা আয়াত ৮২
📄 শিরক এবং কুফরি তাবীজ কীভাবে চিনবেন
শিরকি এবং কুফরি তাবিজ হলো: যাতে অস্পষ্ট লিখা থাকে যা বুঝা যায় না। সেটা আরবী হরফেই লেখা হোক না কেন; যাতে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য চাওয়া হয় এবং কুরআনের আয়াতের সাথে স্পষ্ট বা অস্পষ্ট অক্ষরে শিরকী কথা লেখা থাকে। এবং যা দ্বারা মানুষের বা কোন কিছুর ক্ষতি সাধন করা হয় অথবা ভালোবাসা বা প্রেম লাগিয়ে দেয়া হয়। অনুরূপ যেসব তাবিজে বিভিন্ন চিত্র বা নকশা আঁকা থাকে যা স্বয়ং লেখকেরও বোধগম্য নয়বা তাতে কোন মন্ত্র ইত্যাদির নকশা লেখা থাকে। যাতে বিভিন্ন চিত্র বা নকশা একে মন্ত্র পাঠ করা হয়।
টিকাঃ
[১৫] ফাতহুল হাক্কিল মুবীন: ৪৩৫
📄 নকশা ও ছক লিখে তাবিজের ইতিহাস
ইতিহাসের পাতা থেকে যতটুকু পাওয়া যায়, তাবীজের নকশা লেখা শুরু হয় অনেক পূর্বযুগ থেকেই। বশীকরণ, পাগলকরণ, বিপদ থেকে আত্মরক্ষা ইত্যাদির কাজে খুব বেশি ব্যবহার হতো। তবে সেগুলো ছিল বাক্যের উপর নির্ভর। ১, ২ দিয়ে আবজাদী অক্ষরের নকশা ও ছক তৈরি করণ এটা শুরু হয়েছে আরব দেশে ইসমাঈল আ. এর বসবাসের পরে। বিশেষ করে ফেরআউনের যুগ থেকে এটাকে যাদুর ক্ষেত্রে খুব বেশি ব্যবহার করতে দেখা যায়। ইহুদীরা এটাকে খুব বেশি ব্যবহর করতো। হাদীসে বর্ণিত আছে, কাবে আহবার রহ. বলেন, আমি যদি এই কলেমাগুলো না পড়তাম, তাহলে আমাকে ইহুদীরা গাধা বানিয়ে ফেলতো। তাছাড়া ইহুদীরা যে রাসূল স. কে যাদু করেছিল তা তো প্রসিদ্ধ।
টিকাঃ
[১৬] মুয়াত্তা ইমাম মালেক রহ, হাদীস নং-৩৫০২ مَالِكٌ، عَنْ سُمّي مَوْلَى أَبِي بَكْرٍ، عَنِ الْقَعْقَاعِ بْنِ حَكِيمٍ: أَنَّ كَعْبَ الْأَحْبَارِ قَالَ: لَوْلَا كَلِمَاتٌ أَقُولُهُنَّ لَجَعَلَتْنِي يَهُودُ حِماراً، فَقِيلَ لَهُ: وَمَا هُنَّ ؟ فَقَالَ: أَعُوذُ بِوَجْهِ اللَّهِ الْعَظِيمِ الَّذِي لَيْسَ شَيْءٌ أَعْظَمَ مِنْهُ. وَبِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ الَّتِي لا يُجَاوِزُهُنَّ بَرِّ وَلا فَاجِرٌ. وَبِأَسْمَاءِ اللَّهِ الْحُسْنَى كُلِّهَا. مَا عَلِمْتُ مِنْهَا وَمَا لَمْ أَعْلَمُ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَبَرَأَ وَذَرَا