📄 রুকইয়াহ শারইয়াহ কি?
আত-তিব্ব الطب শব্দটি ১ এর যেরের সাথে প্রসিদ্ধ। আল্লামা সুয়ূতী রহ. বলেন, যে ৬ এর মধ্যে যবর যের সবটিই জায়েজ। যার অর্থ হলো রোগসমূহের চিকিৎসা করা। আর এর অর্থ যাদু করাও এসে থাকে। এজন্য مطبوب যাদুকৃত ব্যক্তিকেও বলা হয়ে থাকে। আর এ হচ্ছে দুই প্রকার। ১। শারীরিক। ২। আধ্যাত্মিক।
নাবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতে আগমনের মূল উদ্দেশ্য হলো আধ্যাত্মিক চিকিৎসা করা। আর এ বিষয়কে কুরআনে কারীমের মধ্যে يزكيم এবং নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আত্মশুদ্ধি করবেন এ বাক্য দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শারীরিক চিকিৎসা সম্পর্কেও বর্ণনা করেছেন। তাহলে যেন রাসুলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনিত শরীয়ত পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং কোন দিকে অসম্পূর্ণ থাকে না।
📄 রুকইয়াহ’র শরয়ী হুকুম কী?
الرقى হচ্ছে رقية এর বহুবচন। যার অর্থ হচ্ছে ঝাড়ফুঁক। জরাক্রান্ত, ব্যথাগ্রস্ত এবং জিনে ধরা ব্যক্তির উপর যা পাঠ করা হয়ে থাকে।
[এক] এখন যদি এ রুকইয়াহ رقية কুরআনের আয়াত এবং হাদীসে বর্ণিত দুআ দ্বারা হয়ে থাকে তাহলে তা সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ এবং উত্তম।
[দুই] আর যদি অনারবদের ভাষার এমন মন্ত্র বা শব্দসমূহের মাধ্যমে হয়; যেসব শব্দের অর্থ জানা নেই তাহলে এটা হারাম। কারণ, এতে কুফরী শব্দের সম্ভাবনা রয়েছে।
[তিন] আর যদি এমন শব্দসমূহের দ্বারা হয় যার অর্থ জানা আছে। আর তা যদি শরীয়ত সম্মত হয়, তাহলে তা জায়েজ।
[চার] আর কোন কোন রেওয়ায়েতের মধ্যে মন্ত্র থেকে কঠিনভাবে নিষেধ করা রয়েছে। সে রেওয়ায়েত হয়ত রহিত হয়ে গেছে অথবা এমন মন্ত্রের ক্ষেত্রে যার অর্থ জানা নেই। অথবা এ মন্ত্রকে স্বয়ং প্রতিক্রিয়াশীল বলে মনে করা হয়ে থাকে। যেমন বর্বর যুগে এমন ধারনা করা হতো। সমস্ত উম্মতের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সবাই চিকিৎসা করাকে মুস্তাহাব বলেছেন।
হাদীসঃ হযরত জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে,
অর্থাৎ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, প্রত্যেক রোগের জন্য ঔষধ রয়েছে। সুতরাং সঠিক ঔষধ যখন রোগের জন্য ব্যবহৃত হয় তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে রোগমুক্ত হয়।২
কিন্তু চিকিৎসক কখনো রোগ নির্ণয় করতে পারে না। বরং ধারণার উপর ঔষধ করে থাকে। বিধায় হাজারও বার রোগমুক্তি হয় না। যদি চিহ্নিত রোগের উপর সঠিক ঔষধ পড়ে তাহলে রোগমুক্ত হয়ে যায়। এ কথাটিকেই হাদীসের মধ্যে أصيب দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে। এমনিভাবে মুসনাদে আহমদের হাদীসে রয়েছে, অর্থাৎ, তোমরা চিকিৎসা করো হে আল্লাহর বান্দাগণ, কেননা, আল্লাহ তাআলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেন নি যার ঔষধ সৃষ্টি করেন নি। শুধুমাত্র একটি রোগ ব্যতীত। আর তা হচ্ছে, বয়োবৃদ্ধতা।
টিকাঃ
[২] মুসলিম, হাদীস নং-২২০৪ عَنْ جَابِرٍ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءُ الدَّاءِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلٌ
[৩] মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং-১৮৪৫৪ تَدَاوَوْا، فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعُ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءٌ غَيْرَ دَاءٍ وَاحِدِ الْهَرَمُ
📄 রুকইয়াহ’র প্রকারসমূহ
ইসলামী শরীয়তসম্মত ঝাড়-ফুঁক করাকে আরবীতে রুকইয়াহ বলা হয়। অর্থাৎ, যে আয়াত ও যিকরসমূহ দ্বারা আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা হয়, এবং আরোগ্যের জন্য রোগীকে তার দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করা হয়। রুকইয়াহ চার প্রকারঃ
এক- পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ এবং আল্লাহর সুন্দর নাম ও সুমহান গুণাবলী দ্বারা ঝাড়-ফুঁক। এটা জায়েজ এবং উত্তম।
দুই- সহীহ হাদীস দ্বারা সুসাব্যস্ত যিকর আযকার দ্বারা ঝাড়ফুক। এটাও জায়েজ।
তিন- এমন যিকর আযকার ও দুআসমূহ, যার দ্বারা এমন ঝাড়-ফুঁক, যা কোন সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়; তবে কুরআন-সুন্নাহর বিপরীতও নয়। এটাও জায়েজ।
চার- এটা হলো এমন মন্ত্র, যা কুফর এবং শিরক মিশ্রিত এবং যার অর্থও বোঝা যায় না। যার প্রচলন জাহেলী যুগেও ছিল। এ প্রকার মন্ত্র দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করা হারাম। এর থেকে মুসলিমদের বেঁচে থাকা ওয়াজিব।
যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ۚ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا ﴿۳۸﴾
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল।
টিকাঃ
[৪] সূরা নিসা: ৪৮
📄 রুকইয়াহ হাদীস থেকে প্রমাণ
বুকইয়াহ হাদীস থেকে প্রমাণ।
হাদীসে বর্ণিত আছে, আব্দুল আযিয রহ. বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি ও সাবিত একবার আনাস ইবনে মালিক রাযি. এর নিকট গেলাম। সাবিত বললেন, হে আবু হামযা, আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। তখন আনাস রাযি. বললেন, আমি কি তোমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দিয়ে রুকইয়াহ করেছেন তা দিয়ে বুকইয়াহ করে দিবো? তিনি বললেন, হাঁ। তখন আনাস রাযি. পড়লেন, اللهم رب الناس، أذهب الباس، اشف أنت الشافي، لا شافي إلا أنت، شفاء لا يغادر سقما
হে আল্লাহ! তুমি মানুষের রব। রোগ নিরাময়কারী। আরোগ্য দান করো। তুমি আরোগ্য দানকারী। তুমি ব্যতীত আর কেউ আরোগ্যদানকারী নেই। এমন আরোগ্য দাও যা কোন রোগ অবশিষ্ট রাখে না।
হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকইয়াহ করতেন আর এ দুআ পাঠ করতেন: ব্যাথা দূর করে দাও হে মানুষের পালনকর্তা! আরোগ্য দানের ক্ষমতা কেবল তোমারই হাতে। এ ব্যাথা তুমি ছাড়া আর কেউ দূর করতে পারবে না।
হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, জ্বর ও ব্রণ-ফুসকুড়ি ইত্যাদির ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকইয়াহ করতে সম্মতি দিয়েছেন।'
উবাইদ ইবনু রিফায়া আয-যুরাকী রহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন,
আসমা বিনতে উমাইস রাযি. বলেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, জাফরের সন্তানের তাড়াতাড়ি বদনজর লেগে যায়। আমি কী তাদেরকে রুকইয়াহ করতে পারি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। কেননা কোন জিনিষ যদি ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারতো তাহলে বদনজরই তা অতিক্রম করতে পারত।
রুকইয়াহ দ্বারা বিনিময় গ্রহণ করা কি বৈধ?
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সামরিক অভিযানে পাঠান। আমরা একটি জনপথে আসার পর তাদের কাছে মেহমানদারী প্রার্থনা করলাম। কিন্তু তারা আমাদেরকে আপ্যায়ণ করল না। এরকম পরিস্থিতিতে তাদের গোত্রের প্রধানকে বিচ্ছু দংশন করলো।
তারা আমাদের নিকট এসে বললো, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যে বিচ্ছু দংশনকারীকে ঝাড়-ফুঁক করতে পারে? আমি বললাম, "হ্যাঁ, আমি নিজেই। কিন্তু তোমরা যদি আমাদেরকে একপাল বকরী প্রদান না করো তাহলে আমি ঝাড়-ফুঁক করতে সম্মত নই।
তারা বললো, আমরা তোমাদের ৩০টি বকরী প্রদান করবো। আমরা এ প্রস্তাবে রাজি হলাম। আমি সাতবার সূরা ফাতেহা পাঠ করে তাকে ঝাড়-ফুঁক করলাম। ফলে সে রোগমুক্ত হলো এবং আমরা বকরীগুলো হস্তগত করলাম। বর্ণনাকারী বলেন, এ বিষয়ে আমাদের মনে সন্দেহের উদ্ভব হলো।
আমরা বললাম, তোমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে হাজির হওয়ার আগ পর্যন্ত তাড়াহুড়ো করবে না। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা তার নিকট উপস্থিত হওয়ার পর আমি যা করেছি তা তাকে অবহিত করলাম। তিনি বললেন, কীভাবে তুমি জানতে পারলে এটা দিয়ে রুকইয়াহ করা যায়? বকরীগুলো হস্তগত করো এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটি অংশ রাখো।
টিকাঃ
[৫] সহীহুল বুখারী, হাদীস নং-৫৭৪২, ই: ফা: ৫২১৮ عن عبد العزيز، قال: دخلت أنا وثابت على أنس بن مالك فقال ثابت يا أبا حمزة، اشتكيت. فقال أنس: ألا أرقيك برقية رسول الله صلى الله عليه وسلم؟ قال: بلى، قال: «اللهم رب الناس، مذهب الباس اشف أنت الشافي، لا شافي إلا أنت، شفاء لا يغادر سقما
[৬] সহীহুল বুখারী, হাদীস নং-৫৭৪৪, ই: ফা: ৫২২০ عن عائشة رضي الله عنها: أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعوذ بعض أهله، يمسح بيده اليمنى ويقول: اللهم رب الناس أذهب الباس اشفه وأنت الشافي، لا شفاء إلا شفاؤك، شفاء لا يغادر سقماء
[৬] জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২০৫৬ [৭] عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَخْصَ فِي الرُّقْيَةِ مِنَ الْحُمَةِ وَالْعَيْنِ وَالنَّمْلَةِ
[৮] জামে আত-তিরমিজি হাদীস নং ২০৫৯
[৯] জামে তিরমিযী, হাদীস নং-২০৬৩
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: بَعَثَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَرِيَّةٍ فَنَزَلْنَا بِقَوْمٍ. فَسَأَلْنَاهُمُ الْقِرَى فَلَمْ يَقْرُونَا، فَلُدِغَ سَيِّدُهُمْ فَأَتَوْنَا فَقَالُوا: هَلْ فِيكُمْ مَنْ يَرْقِي مِنَ العَقْرَبِ؟ قُلْتُ: نَعَمْ أَنَا، وَلَكِنْ لَا أَرْقِيهِ حَتَّى تُعْطُونَا غَنَمًا، قَالُوا: فَإِنَّا نُعْطِيكُمْ ثَلَاثِينَ شَاةً، فَقَبِلْنَا فَقَرَأْتُ عَلَيْهِ: الحَمْدُ لِلَّهِ سَبْعَ مَرَّاتٍ، فَبَرَأَ وَقَبَضْنَا الغَنَمَ، قَالَ: فَعَرَضَ فِي أَنْفُسِنَا مِنْهَا شَيْءٌ فَقُلْنَا: لَا تَعْجَلُوا حَتَّى تَأْتُوا رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: فَلَمَّا قَدِمْنَا عَلَيْهِ ذَكَرْتُ لَهُ الَّذِي صَنَعْتُ، قَالَ: «وَمَا عَلِمْتَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ؟ اقْبِضُوا الغَنَمَ وَاضْرِبُوا لِي مَعَكُمْ بِسَهْمٍ»