📄 সুস্থ হতে আমার এত দেরি লাগছে কেন?
অনেকে দীর্ঘদিন ধরে রুকইয়াহ করেন, সব নির্দেশনা ঠিকমতোই অনুসরণ করেন। এরপরও দেখা যায় সুস্থ হতে দেরি লাগছে। কেউ আবার কয়েকদিন বা সারা সপ্তাহে কয়েক মিনিট রুকইয়াহ করেই জিজ্ঞেস করেন, আমার এত দেরি লাগছে কেন?
এখানে অনেকেই যে ভুলটা করে থাকেন, সেটার ব্যাখ্যা দিচ্ছি। তারা ভাবেন, যেহেতু আমি সঠিক পদ্ধতিতেই রুকইয়াহ করছি, সুতরাং দুই দিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এটা আর কিছুই না, আশা আর বাস্তবতার ফারাক। যদি ডাক্তার কাউকে বলে, আপনার ক্যান্সার হয়েছে, কেমোথেরাপি দরকার। তখন কি সে একবার থেরাপি দিয়েই সুস্থ হয়ে যাওয়ার আশা করবে? নাকি ডাক্তারকে এক সপ্তাহ পরেই বলবে যে, আমি কেন সুস্থ হচ্ছি না? না, সে এমনটা করবে না। কারণ, সে ধরেই নিয়েছে, তাকে পুরো এক বা দুই বছর চিকিৎসা নিতে হবে। আর এরপর সে সুস্থ হবে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমি মাত্র তিনদিন রুকইয়াহ করে জাদু-আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ হতে দেখেছি, আবার এমনও দেখেছি দুই বছর ধরে রুকইয়াহ করছে; কিন্তু এখনও সব সমস্যা ভালো হয়নি। আধঘণ্টার রুকইয়াতে যেমন শরীর থেকে জিন চলে যেতে দেখেছি, তেমনি এটাও দেখেছি, প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা করে এক সপ্তাহ রুকইয়াহ করার পর জিন সরেছে; এরপরও সব লক্ষণ দূর হয়নি। এমন রোগীও দেখেছি প্রায় বছরখানেক ধরে নিয়মিত রুকইয়াহ করেছে, জাদুকর বারবার জাদু করেছে, জিন পাঠিয়েছে, একের পর এক জিন এসেছে আর তাওবাহ করে বিদায় হয়েছে, কোনো জিন কয়েক ঘন্টার মধ্যে চলে গেছে, আর কোনো জিনের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহও লেগেছে! আর কোন যেতে অস্বীকার করেছে, রুকইয়াহ করতে করতে একপর্যায়ে মরে গেছে। (আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন)
সুতরাং আপনার বিশ্বাস করা উচিত, সমস্যার বিস্তৃতি এবং গভীরতা অনুযায়ী সুস্থ হতে কম-বেশি সময় লাগতে পারে। তাই কদিন রুকইয়াহ করার পরই আশা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অতি আশা ছেড়ে আপনাকে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত: এই চিকিৎসা আপনার ও শয়তানের বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ। এই যুদ্ধে অনেকগুলো ছোট ছোট লড়াই আছে, সে লড়াইয়ে কখনো আপনি জিতবেন, কখনো আপনি হারবেন। এই সব কিছুর পেছনে আল্লাহর হিকমাহ লুকিয়ে আছে। আপনার কাজ হবে চেষ্টা করে যাওয়া। ফায়সালা আল্লাহর হাতে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এমন ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের দিক থেকে পরিপূর্ণ, যার দুআ কবুল করা হতো, যিনি কবীরা গুনাহ থেকে মুক্ত, যার ভবিষ্যত ও অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে; এতকিছুর পরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ বছরেরও বেশি সময় তার শত্রুর বিরুদ্ধে মেহনত এবং যুদ্ধ করেছেন। দুনিয়ার বুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে নিখুঁত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাঁকে এবং তার সঙ্গীদের বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরীক্ষা করেছেন। এরপরই মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। আল্লাহ এ সম্পর্কে কুরআনে বলেছেন-
إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاءَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
"যদি তোমরা আহত হয়ে থাকো, তেমনি তো তারাও আহত হয়েছে। এবং এই (জয়- পরাজয়ের) দিনগুলোকে আমরা মানুষের মধ্যে পালাক্রমে বদল করি, যেন আল্লাহ জেনে নিতে পারেন, কারা ঈমান এনেছে। আর তিনি তোমাদের মধ্যে থেকে কাউকে শহিদ হিসেবে গ্রহণ করতে চান। আর আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না।” ১
এই আয়াতে আল্লাহ ব্যাখ্যা করেছেন, কেন উহুদের যুদ্ধে কাফিররা সীমিতভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছিল। এভাবে আল্লাহ তাআলা মাঝেমধ্যে তাঁর শত্রুদের অবকাশ দেন, যাতে তিনি মুসলিমদের ঈমানকে পরীক্ষা করতে পারেন আর কতককে শহিদ হিসেবে কবুল করে নিতে পারেন। এটাই আল্লাহর হিকমাহ।
তাই একজন রোগীকে এই ব্যাপারে ধৈর্য ধরতে হবে, সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে যেতে হবে, আর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। আল্লাহ যখন চাইবেন, সুস্থতা দেবেন, অথবা চাইলে পরীক্ষা করবেন। ফলে আক্রান্ত অবস্থাতেই মৃত্যু হবে। এর প্রতিদান আল্লাহ আখিরাতে দেবেন।
আবূ সাঈদ খুদরী এবং আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে সকল কষ্ট, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা এবং পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি যদি তার দেহে একটি কাঁটাও বিদ্ধ হয়, এসব প্রতিটি বিপদে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন। ২
আতা ইবনু আবী রাবাহ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস রা. আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি মহিলা দেখাব? আমি বললাম, অবশ্যই। তখন তিনি বললেন, এই কৃষ্ণ বর্ণের মহিলাটিকে দেখো, সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আবেদন করেছিল, তার মৃগী রোগ আছে। তাই তার সুস্থতার জন্য যেন দুআ করা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যদি সবর করতে চাও, করতে পারো। বিনিময়ে তোমার জন্য থাকবে জান্নাত। আর তুমি চাইলে আমি আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, যেন তোমাকে সুস্থতা দেন। মহিলা বলল, আমি ধৈর্যধারণ করব। ৩
সুতরাং আপনি যদি সবর করতে পারেন তাহলে অবশ্যই আল্লাহর কাছে এর বড় প্রতিদান পাবেন। আমি এমন বেশ কয়েকজন মানুষকে দেখেছি, যারা দীর্ঘ সময় রুকইয়াহ করে সম্পূর্ণ সুস্থতা পায়নি বটে, কিন্তু এর মাঝে তারা আল্লাহর অনেক নিকটবর্তী হয়েছেন, ঈমান-আমলে অনেক উন্নতি লাভ করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
"আল্লাহ বলেন, তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমরা জান্নাতে চলে যাবে অথচ এখনো তোমাদের ওপর তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের মতো পরিস্থিতি আপতিত হয়নি! বিভিন্ন বিপদ ও কষ্ট তাদের স্পর্শ করেছিল। আর তাদের এমনভাবে প্রকম্পিত করা হয়েছিল যে, নবী ও তার সাথের ঈমানদাররা পর্যন্ত বলে উঠেছিল, 'কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য!' জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে।” ৪
তৃতীয়ত: রুকইয়ার ক্ষেত্রে কুরআন আপনার হাতিয়ার। আচ্ছা, তাহলে ব্যাপারটা এমনও হতে পারে, আপনার অস্ত্র ঠিকই আছে; কিন্তু যে হাত অস্ত্র ধরে আছে, সেটা দুর্বল। কিংবা এমনও হতে পারে, আপনার হাতটি শক্তিশালী; কিন্তু লক্ষ্য দুর্বল। তাই আপনার নিজেকে যাচাই করতে হবে। বারবার মিলিয়ে দেখতে হবে—কিছু বাদ যাচ্ছে কি? রুকইয়ার পদ্ধতি ঠিক আছে তো? নিয়ত ঠিক আছে কি? রুকইয়াহ করা কম হচ্ছে না তো? কিংবা পেছনে কোনো বড় গুনাহ রয়ে গেছে কি, যা থেকে তাওবাহ করা হয়নি, ফলে আল্লাহর সাহায্য আসতে দেরি হচ্ছে?
এরকম অবস্থায় আপনার উচিত, নিজের আত্মোন্নয়নের দিকে মনোযোগী হওয়া।
আত্মসমালোচনা বা নিজ কাজের পর্যালোচনা সবসময়ই সফলতার একটি পন্থা। কিন্তু এটাও খেয়াল রাখতে হবে, নিজের সমালোচনা যেন এমন পর্যায়ে না পৌঁছায়, যাতে আপনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হন। যেমন ইয়াকুব আ. বলেছিলেন, 'হে আমার সন্তানেরা, যাও, ইউসুফ ও তার ভাইকে খুঁজে বের করো, আর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই কাফিররা ছাড়া আল্লাহর রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না।' ৫
শেষ কথা হচ্ছে, যদি দেখেন, রুকইয়ার কারণে সমস্যা কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে তাহলে ভয়ের কিছু নেই। আপনার উচিত, শুকরিয়া আদায় করা। কারণ, রুকইয়াহ কাজ করছে। আপনার চিন্তিত হওয়া উচিত দুটো অবস্থায়-
১. যদি দেখেন কয়েক মাস সব কিছু ঠিকমত করার পরও সামগ্রিক অবস্থার কোনো উন্নতি নেই।
২. যদি রুকইয়াতে কোনোই ইফেক্ট না হয়। না উন্নতি, আর না অবনতি। সমস্যা এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে।
আমি এরকম পরিস্থিতিতে কাউকে দেখলে একদম শুরু থেকে আবার খোঁজ নেই- পেছনের সবকিছু ঠিক আছে কি না, ফরয গোসল ঠিকমত করে কি না, রোগীর সাথে বা বাসায় কোনো তাবীজ আছে কি না, কোনো ছবি ঝুলানো আছে কি না। আকীদা, নিয়ত কিংবা রোগীর চরিত্রে কোনো সমস্যা আছে কি না, আয়-রোজগার হালাল কি না, কোনো বিশেষ গুনাহে আসক্ত কি না। এরপর জিজ্ঞেস করি, কীভাবে রুকইয়াহ করতে বলা হয়েছিল আর তিনি কীভাবে করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আমি দুটি কাজ করি- প্রথমত: রুকইয়াহ একদম কমিয়ে দিই, যেন কাজ অল্প হলেও নিয়মিত করে। যেমন বলি, আপনার কিচ্ছু করা লাগবে না। আপনি শুধু সূরা ফাতিহা এবং তিন কুল পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে খাবেন, আর যতটুকু পারবেন, রুকইয়াহ শুনবেন। অবস্থার উন্নতি হলে পরে এটা বাড়িয়ে দিই।
দ্বিতীয়ত: সামগ্রিক অবস্থার উন্নয়নে মনোযোগী হই। বলি, পেছনে বিশেষ কোনো গুনাহ থাকলে তার প্রতিকার করবেন। মাহরাম-গাইরে মাহরাম মেনে চলবেন। ঠিকমত সালাত আদায় করবেন। গান-বাজনা থেকে দূরে থাকবেন। যথাসম্ভব চোখের হেফাজত করবেন। সাথে আরেকটা জিনিস দিই-ইস্তিগফার। প্রতিদিন অবশ্যই ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তিগফার করবেন। সালাতের ব্যপারে কাউকে উদাসীন মনে হলে বলি, আপনি প্রতি সালাতের পর ২০ বার করে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়বেন, যেন সারাদিনে ১০০ বার হয় আর নামাজও আদায় হয়ে যায়। আর প্রাথমিক দ্বীনদারি ঠিক থাকলে তাহাজ্জুদের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে বলি। আল্লাহর রহমতে এভাবে স্থির অবস্থা থেকে নাজাত পাওয়া যায়।
উপসংহারে বলব, সবর করুন, নিজেকে যাচাই করুন, আর আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থেকে চেষ্টা এবং দোয়া করতে থাকুন।
টিকাঃ
১. সূরা আলে-ইমরান: ১৪০
২. বুখারী: ৫৩১৮
৩. বুখারী: ৫৩২৮
৪. সূরা বাকারা: ২১৪
৫. সূরা ইউসুফ: ৮৭
📄 কীভাবে বুঝব আমার রুকইয়াহ করা শেষ?
রুকইয়াহ করতে করতে যদি রোগের লক্ষণগুলো একদমই আর দেখা না যায় অথবা রোগী তার অসুস্থতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি লাভ করে তাহলেই সাধারণত বলা যায়, তার রুকইয়াহ করা এখন সম্পন্ন হয়েছে। এই সুস্থতা একেবারে পাওয়া যায় না; বরং এটা ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে বোঝা যায়। আর প্রতিটা ধাপে রোগীকে বিভিন্ন ধরণের সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। (This is something which usually happens in phases, and each phase has its own unique challenges) বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী যখন একটু সুস্থ বোধ করতে থাকে, তখনই রুকইয়ার পদ্ধতিতে ভুল করে বসে।
রুকইয়ার ক্ষেত্রে একেক রোগী একেক ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। সবাই-ই যে ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে এগিয়ে যাবে—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয় যে, জিনের লক্ষণগুলো খুব প্রকট হয়ে গেছে; কিন্তু এর একটু পরই জিনটা শরীর থেকে চলে যায়। তাই ট্রিটমেন্ট সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাক বা শেষ হওয়ার কাছাকাছি চলে যাক, এই সময়গুলোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে—
১. রোগীরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটা করেন, তা হচ্ছে, রুকইয়াহ করা থামিয়ে দেন। যখনই জিন চলে যায় বা রোগী একটু ভালো বোধ করে তখন আর রুকইয়াহ করে না। কোনো অবস্থাতেই রুকইয়াহ করা থামাবেন না। জিন চলে যাওয়ার পরও কমপক্ষে এক মাস আগের মতোই স্বাভাবিক মাত্রাতেই রুকইয়াহ চালিয়ে যাবেন। যতক্ষণ আপনি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে বলতে পারেন যে, আমি এবার আসলেই সুস্থ। এইভাবে পরবর্তী এক মাসে আপনি বড় কিছু ভুল থেকে রক্ষা পাবেন। কারণ, অনেক সময় জিন চলে যাওয়ার কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে। আবার অনেক সময় একটা জিন চলে যায়; কিন্তু অন্য জিন শরীরে প্রবেশ করে। এমন অনেক কেস আছে, যেখানে জিন আবার ফেরত এসেছে। জাদুর সমস্যা ছিল, একটু সুস্থ হতে দেখে রুকইয়াহ বন্ধ করে দিয়েছে, সমস্যা আবার বেড়ে গেছে। কিংবা বদনজরে আক্রান্ত ছিলো, সেই গর্ত থেকে জিনের আসর হয়েছে। রুকইয়াহ করার পর জিন চলে গেলেও সাধারণত জিনের নজরের লক্ষণগুলো অনেকদিন বিদ্যমান থাকে। তাই সুস্থ হওয়ার পরও কিছুদিন রুকইয়াহ করে যেতে হবে। এই সময়টাতে একজন রাকীকেই তিলাওয়াত করতে হবে-সেটা জরুরি নয়। রোগী নিজে বা তার কোনো আত্মীয়ও তার ওপর পড়তে পারে।
২. প্রায় সুস্থ হয়ে গেছি, রুকইয়াহ বন্ধ করে দিই? উহুঁ, এটাও আগের কথার সাথে সম্পর্কিত। আপনাকে ১০০ ভাগ নিশ্চিত হতে হবে যে, আপনি সুস্থ হয়েছেন। মোটামুটি নিশ্চিত বা ৮০ ভাগ নিশ্চিত হলে চলবে না। এমনকি এক্ষেত্রে ৯০ ভাগ নিশ্চয়তাও যথেষ্ট নয়। আপনাকে অবশ্যই ১০০ ভাগ নিশ্চিত হতে হবে যে, জিন চলে গেছে বা জাদুর সব লক্ষণগুলো সম্পূর্ণ দূর হয়েছে। কারণ, ১০ ভাগ সমস্যাও যদি রয়ে যায় তাহলে সেখান থেকে আবার বাড়তে পারে। আর সচরাচর এমনটাই হয়ে থাকে। যদি কারও ক্যান্সার হয় তাহলে সে নিশ্চয়ই ৯০ ভাগ ক্যান্সারের জীবাণু ধ্বংস করে চিকিৎসা বন্ধ করে দেবে না। আমরা ভালোভাবেই জানি, অবশিষ্ট ১০ ভাগ থেকেই আবার ক্যান্সার পূর্ণরূপ ধারণ করতে পারে। তাই ১০০ ভাগ নিশ্চয়তা অর্জন করার চেষ্টা করুন; ৯০ ভাগ না।
৩. আগেও বলা হয়েছে, সুস্থতা ধাপে ধাপে (by stage) অর্জিত হয়। এই প্রতিটি ধাপে বা পর্যায়ে শয়তান বিভিন্ন কৌশলে আক্রমণ করে। শয়তানের সামনে যখন একটি রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সে আরেকটি রাস্তা খুঁজে নেয়। যেমন হতে পারে যে, শরীরের ঝাঁকুনি বা বেহুঁশ হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে; কিন্তু এর সাথে সাথে আবার ওয়াসওয়াসা বা সংশয় শুরু হয়েছে। এরপর দেখা গেল, ওয়াসওয়াসা বন্ধ হয়ে গেছে; কিন্তু ইবাদাতের প্রতি আলস্য ধরে গেছে। আরও স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন জাদুর রোগী কিছুদিন রুকইয়াহ করার পর দ্বিতীয় ধাপে এসে এমন কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে, যেগুলো প্রথমে ছিল না। আরও কয়েকদিন রুকইয়াহ করলে তৃতীয় ধাপে গিয়ে আবার সেগুলো চলে যাবে। তাই শয়তানের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে এই প্রতিটি পর্যায়েই ধৈর্য ধরে রেখে সমানভাবে রুকইয়াহ চালিয়ে যেতে হবে। এজন্য দরকার ধারাবাহিকতা। কোনোভাবেই রুকইয়াহ বন্ধ করা যাবে না; পরিস্থিতি ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন। প্রয়োজনে পাশাপাশি আরও কিছু বাড়তি রুকইয়াহ যোগ করতে হবে। যেমন: এক্ষেত্রে জাদুর জন্য রুকইয়াহ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আপনার কিছুদিন ওয়াসওয়াসার রুকইয়াহ করার প্রয়োজন হতে পারে।
৪. রোগী সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও সে ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। এটা অনেকটা মেজর কোনো সার্জারির মতো। কারও শরীরে যদি বড় ধরনের অপারেশন করা হয় তাহলে সার্জারি পরবর্তী সময়ে রোগী ইনফেকশনের ঝুঁকিতে থাকে। বাস্তবতা হচ্ছে, এরকমভাবেই রুকইয়াহ করার পর রোগীরা আবারও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই এ সময়টা রোগীকে খুব সতর্কতার সাথে পার করতে হয়, প্রতিদিন আমলগুলো যত্নের সাথে পালন করতে হয়, যেন তিনি আবার কোনোভাবে আক্রান্ত না হন।
৫. কোনো কারণে যদি আবার সমস্যা শুরু হয়েছে বলে মনে হয়, তখন দেরি না করে আবার পুরোদমে গুরুত্বের সাথে রুকইয়াহ শুরু করে দিতে হবে। এত কষ্ট-মেহনতে পাওয়া আরোগ্যকে অবহেলার কারণে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়。
📄 কিছু প্রাসঙ্গিক বই-পুস্তক
আপনি যদি রুকইয়াহ শারইয়্যাহ বিষয়ে আরও পড়াশোনা করতে আগ্রহী হন তাহলে নিচের বইগুলো পড়তে পারেন। তবে হ্যাঁ, আপনি আলিম না হলে আপনার উচিত হবে এগুলো কোনো আলিমের দিকনির্দেশনায় পড়া।
১. তাফসীরে ইবনু কাসীর এবং মাআরিফুল কুরআন (পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ) থেকে সূরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতের তাফসীর পড়া।
২. বুখারীর 'সৃষ্টির সূচনা' অধ্যায় দেখা যেতে পারে, সাথে যদি ফাতহুল বারী থাকে তাহলে আরও ভালো হয়।
৩. কোনো ব্যাখ্যাগ্রন্থ সাথে রেখে বা বিজ্ঞ কোনো আলিমের সাহায্য নিয়ে মুসলিম শরীফের কিতাবুস সালাম, বুখারী এবং আবূ দাউদের কিতাবুত তিব্ব পড়া।
৪. ইমাম সুয়ূতী রহ.-এর লাকতুল মারজান ফী আহকামিল জান (এটার বাংলা অনুবাদ জিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস নামে মদীনা পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-তথ্যসূত্র ইত্যাদি সংযোজন এবং সম্পাদনার কারণে আমার কাছে মূল গ্রন্থের চেয়ে অনুবাদ অধিক সমৃদ্ধ মনে হয়েছে)।
৫. রিসালাতুল জিন। লেখক: ইবনু তাইমিয়া রহ.।
৬. তালবীসে ইবলীস। লেখক: ইবনুল জাওযী রহ.।
৭. ওয়াবিলুস সায়্যিব ফী কালিমিত তায়্যিব। লেখক: ইবনুল কায়্যিম রহ.।
৮. ইগাসাতুল লাহফান মিন মাসাইদিশ শাইতান। লেখক: ইবনুল কায়্যিম রহ.।
৯. ওয়াকিয়াতুল ইনসান মিনাল জিন্নি ওয়াশ শাইতান। লেখক: শাইখ ওয়াহিদ বিন আব্দুস সালাম বালী।
১০. আস-সরিমুল বাত্তার ফিত তাসাদ্দি লিস-সাহারাতিল আশরার। লেখক: শাইখ ওয়াহিদ বিন আব্দুস সালাম বালী।
এছাড়া আমাদের রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডির ব্লগে এবিষয়ে অনেক প্রবন্ধ রয়েছে। ১
সবশেষে বলব, এই জ্ঞান নিজের মধ্যে চেপে রাখবেন না। কুফরী জাদুর ফিতনা প্রতিরোধে এটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিন। নিজেও রুকইয়াহ বিষয়ে জানুন, অন্যকেও জানান। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
مَّن يَشْفَعُ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُن لَّهُ نَصِيبٌ مِّنْهَا وَمَن يَشْفَعُ شَفَاعَةً سَيِّئَةٌ يَكُن لَّهُ كِفْلٌ مِّنْهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ مُّقِيتًا
“যে সৎকাজের জন্য সুপারিশ করবে, তা থেকে সে-ও একটি অংশ পাবে। আর যে মন্দ কাজের সুপারিশ করবে, সে-ও তার পাপের বোঝার একটি অংশ পাবে। বস্তুত আল্লাহ সব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।” ২ আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
১. লিংক - http://ruqyahbd.org/blog
২. সূরা নিসা: ৮৫
📄 রুকইয়াহর আয়াত
এখানে শুরুতে উল্লিখিত আয়াতগুলো রুকইয়াহর জন্য প্রসিদ্ধ আয়াত। এগুলোকে কমন রুকইয়ার আয়াত, সাধারণ রুকইয়ার আয়াত, Standard Ruqyah Verses ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে। এই আয়াতগুলো জাদু, জিন, বদনজর, শারীরিক অসুস্থতা সব রুকইয়াহর ক্ষেত্রেই পড়া যাবে। সবধরণের রুকইয়াহর আয়াতই এর মাঝে রয়েছে। আপনি চাইলে এর সাথে রুকইয়ার উপযোগী আরও অন্যান্য সূরা বা আয়াত তিলাওয়াত করতে পারেন। সাধারণ আয়াতগুলো হচ্ছে:
১. সূরা ফাতিহা
২. সূরা বাকারা ১-৫
৩. সূরা বাকারা ১০২
৪. সূরা বাকারা ১৬৩-১৬৪
৫. সূরা বাকারা ২৫৫
৬. সূরা বাকারা ২৮৫-২৮৬
৭. সূরা আলে-ইমরান ১৮-১৯
৮. সূরা আরাফ ৫৪-৫৬
৯. সূরা আরাফ ১১৭-১২২
১০. সূরা ইউনুস ৮১-৮২
১১. সূরা ত্বহা ৬৯
১২. সূরা মুমিনুন ১১৫-১১৮
১৩. সূরা সফফাত ১-১০
১৪. সূরা আহকাফ ২৯-৩২
১৫. সূরা আর-রাহমান ৩৩-৩৬
১৬. সূরা হাশর ২১-২৪
১৭. সূরা জিন ১-৯
১৮. সূরা ইখলাস
১৯. সূরা ফালাক
২০. সূরা নাস
এই আয়াতগুলোর পরে কিছু আয়াতুল হারক এবং আয়াতে শিফা রয়েছে, পূর্বে বিভিন্ন অধ্যায়ে এসবের কথা এসেছিল। আর সবশেষে কিছু প্রসিদ্ধ দুআ সংযুক্ত করা হয়েছে, যেসব রুকইয়ার আয়াতের আগে অথবা পরে রুকইয়াহ হিসেবে পড়া যাবে।
তবে এখানে সব আয়াতুল হারক কিংবা রুকইয়ার উপযোগী সব দুআ উল্লেখ করা সম্ভব না। তাই এগুলোর তুলনামূলক দীর্ঘ/পূর্ণ সংস্করণের পিডিএফ ই-বুক ডাউনলোড করতে চাইলে রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডির ওয়েবসাইট www.ruqyahbd.org ভিজিট করতে পারেন। এছাড়া এই গ্রন্থে উল্লিখিত বিভিন্ন রুকইয়ার অডিও সমূহও এই ওয়েবসাইটে রয়েছে।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, রুকইয়ার আয়াত বা দুআর মাঝে যেসব অংশ বেশি কার্যকরী, সেগুলো বারবার পুনরাবৃত্তি করা উচিত। তিলাওয়াতের সুবিধার্থে এরকম কিছু স্থানে আন্ডারলাইন করে দেওয়া হয়েছে।