📄 আল-আশফিয়া: ৭ দিনের রুকইয়াহ ডিটক্স প্রোগ্রাম
আশফিয়া-'শিফাউন'-এর বহুবচন। শিফা অর্থ আরোগ্য বা cure। কুরআনুল কারীম এবং হাদীসে যেসব মেডিসিন এবং ঔষধি গাছ-গাছড়াকে বিশেষভাবে শিফা বা বরকতময় বলা হয়েছে, ৭ দিনের এই ডিটক্স প্রোগ্রামটি হচ্ছে সেগুলোর একটি সম্মিলিত প্রয়োগ। এজন্যই এটার নাম রাখা হয়েছে 'আল-আশফিয়া'; আরোগ্যসমগ্র অথবা The (Collection of) Cures!
আমাদের আলোচ্য প্রেসক্রিপশনটি শাইখ আদিল বিন তাহির মুকবিল (হাফিযাহুল্লাহু)-এর দেওয়া। জাদু, জিন, বদনজর তো বটেই; এর পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক রোগব্যাধির চিকিৎসাতেও এটা খুব উপকারি।
কারও যদি অনেক ধরনের সমস্যা একইসাথে হয়, কিংবা এক ধরনের সমস্যাই অনেক বেশি হয়, তখন সেটাকে একটা সহনীয় মাত্রায় আনার জন্য প্রাথমিকভাবে আমরা ডিটক্স রুকইয়াহ করার পরামর্শ দিয়ে থাকি। এছাড়া এই ডিটক্স প্ল্যান উস্তায মুহাম্মাদ তিম হাম্বলের সার্বজনীন পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রাম-এরও অন্তর্ভুক্ত, যা এই গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে।
ক. আমাদের যা যা দরকার হবে-
১. পানি (সাড়ে তিন বা চার লিটার)
-যমযমের পানি হলে সবচেয়ে ভালো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এর মাঝে শিফা আছে। ১
-নইলে বৃষ্টির পানি। আল্লাহ তাআলা এটাকে বরকতময় বলেছেন। ২
-এসব না পেলে সাধারণ পানি হলেও চলবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ পানিও চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করেছেন। ৩
যমযম বা বৃষ্টির পানি অল্প পরিমাণে থাকলে বরকতের জন্য সাধারণ পানির সাথে মিক্স করা যেতে পারে। আর একসাথে এত পানি রাখতে না পারলে প্রথমে ২ লিটার পানি প্রস্তুত করুন। এটা ব্যবহার শেষে আবার প্রস্তুত করবেন। তবে এই পানির সাথে নতুন পানি মেশানো উচিত হবে না।
২. অলিভ অয়েল (১০০ মিলি লিটার)
কুরআনুল কারীমে যাইতুনের তেলকে বরকতময় বলা হয়েছে। ৪
-সবচেয়ে ভালো হয় ফিলিস্তিনের এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল হলে।
-নইলে শরীরে ব্যবহারের উপযোগী ভালো মানের যেকোনো অলিভ অয়েল।
৩. মধু (২৫০ গ্রাম)
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, মধুর মধ্যে মানুষের জন্য আরোগ্য রয়েছে। ৫ যথাসম্ভব খাঁটি মধু। এক্ষেত্রে পরিচিত কারও মাধ্যমে সংগ্রহ করতে পারেন। নির্ভরযোগ্য কোনো অনলাইন শপের সহায়তা নিতে পারেন। অথবা যেকোনো ভালো ব্র্যান্ডের মধু হতে পারে।
৪. কালোজিরা (৫০ গ্রাম)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কালোজিরা মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের আরোগ্য। ৬
এটাও ভালো মানের হওয়া উচিত, আর সম্ভব হলে ব্যবহারের আগে কালোজিরার ময়লা ঝেড়ে ফেলা উত্তম।
৫. তিলাওয়াতের জন্য কুরআন শরীফ
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, বিশ্বাসীদের জন্য কুরআনের মধ্যে রয়েছে শিফা এবং রহমত। ৭ এসব সংগ্রহ করা হয়ে গেলে আমরা কাজ শুরু করতে পারি।
খ. প্রস্তুতকরণ
উপকরণগুলো হাতের কাছে রেখে নিচের আয়াতগুলো পড়ুন এবং সেগুলোতে ফুঁ দিন-
১. সূরা ফাতিহা-৭বার অথবা ৩ বার
২. আয়াতুল কুরসী-৭বার অথবা ৩ বার
৩. সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস-সব তিন বার করে
৪. সূরা বাকারা সম্পূর্ণ
-এক বসাতেই পুরোটা পড়ে শেষ করতে হবে-এমন বাধ্যবাধকতা নেই। একবারে যতটুকু পারবেন, পড়বেন। কোনো কাজ থাকলে প্রয়োজনে উঠে যাবেন। সেটা শেষ করে এসে বাকিটা পড়বেন। প্রয়োজনে দুই দিন সময় নিয়ে প্রস্তুত করবেন। এরপর ডিটক্স শুরু করবেন।
-এই সূরাগুলো পড়ুন, আর মাঝে মাঝে পানি, অলিভ অয়েল, মধু এবং কালোজিরাতে ফুঁ দিন।
৫. শেষে কিছু দুআ এবং আয়াতে শিফা পড়ুন, যেগুলো শারীরিক অসুস্থতার রুকইয়ায় বলা হয়েছে। এছাড়া গ্রন্থের শেষে রুকইয়ার আয়াতের সাথে কিছু দুআ রয়েছে, সম্ভব হলে সেগুলোও দেখা যেতে পারে।
উল্লখ্য, সূরা বাকারা পড়ার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্ব দিয়েছেন-
حَدَّثَنِي أَبُو أُمَامَةَ الْبَاهِلِيُّ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ اقْرَءُوا سُورَةَ الْبَقَرَةِ فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةٌ وَتَرَكَهَا حَسْرَةٌ وَلَا تَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَةُ قَالَ مُعَاوِيَةُ بَلَغَنِي أَنَّ الْبَطَلَةَ السَّحَرَةُ
“আবু উমামা বাহিলি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা সূরা বাকারা তিলাওয়াত করো। কেননা, তা গ্রহণ করা বরকতের এবং ছেড়ে দেওয়া আফসোসের। আর জাদুকররা তার সাথে পেরে ওঠে না। বর্ণনাকারী মুয়াবিয়া বলেন, আমার নিকট পৌঁছেছে, এখানে বাতিল অর্থ জাদুকর।” ৮
আর উল্লিখিত অন্য সূরাগুলোর ব্যাপারে পূর্বেও আলোচনা হয়েছে, যেমন: সূরা ফাতিহাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সত্য রুকইয়াহ। (আবু দাউদ) অন্য একজন সাহাবীকে বলেছেন, তুমি কীভাবে জানলে, এটা রুকইয়াহ। (বুখারী) আয়াতুল কুরসী কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত (মুসলিম) এবং এটা শয়তান থেকে হেফাজতের মাধ্যম (বুখারী)। সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্য রুকইয়াহ করেছেন, অন্যদের ওপরও করেছেন। (বুখারী)
এই ধাপগুলো ঠিকঠাক শেষ করে থাকলে বলা যায় যে, আপনি ৭ দিনের ডিটক্স প্রোগ্রাম শুরু করার জন্য প্রস্তুত।
গ. কীভাবে ব্যবহার করবেন?
প্রথম তিনদিন
১. ঘুমের আগে মাথার তালু থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত, অর্থাৎ পুরো শরীরে রুকইয়ার অলিভ অয়েল মেখে নিন।
২. এরপর সাতটা কালোজিরা চিবিয়ে খান। আধা গ্লাস (১২০-১২৫ মিলি) রুকইয়ার পানিতে এক চা চামচ মধু নিন, এরপর এটা গুলিয়ে খেয়ে ফেলুন।
৩. যথাসম্ভব সকাল-সকাল গোসল করবেন। গোসলের পানিতে প্রথমে এক গ্লাস (২২০ মিলি বা ১ পোয়া) রুকইয়ার পানি মিশিয়ে নিন। এরপর সাবান দিয়ে ভালোভাবে গোসল করুন।
৪. গোসলের পর আবার সাতটা কালোজিরা চিবিয়ে খান। তারপর আধ গ্লাস রুকইয়ার পানিতে এক চা চামচ মধু গুলিয়ে খেয়ে ফেলুন।
৫. সুস্থতা লাভের নিয়তে দিনের অন্য যেকোনো সময়ে কিছুক্ষণ রুকইয়াহ শুনুন, অথবা অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নিয়ে আপনার সমস্যা অনুযায়ী কোনো রুকইয়াহ শুনুন।
পরের ৪ দিন মধু, পানি ও কালোজিরা খাওয়া এবং গোসলের ক্ষেত্রে একই নিয়ম অনুসরণ করুন। তবে ঘুমের আগে শরীরের যেসব জায়গায় সমস্যা কিংবা ব্যথা আছে, শুধু সে জায়গাগুলোতে অলিভ অয়েল মাখবেন।
ঘ. এই কয়দিনে কী আশা করা যায়?
প্রথম দিন হয়তো তেমন কিছু অনুভব করবেন না। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিন সমস্যা বাড়তে পারে। যেমন: প্রচণ্ড দুর্বল লাগা, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা করা, মেজাজ খারাপ হয়ে থাকা ইত্যাদি। তবে ব্যতিক্রম হতে পারে। এসব প্রতিক্রিয়া প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে ৫ম দিন পর্যন্তও থাকতে পারে। তবে আশা করা যায় যে ৪র্থ বা ৫ম দিন থেকে সমস্যা কমতে শুরু হবে এবং ৭ দিনের প্রোগ্রাম শেষ হলে আল্লাহ চাইলে আপনি অনেকটাই সুস্থ হয়ে যাবেন। সপ্তাহ শেষে আপনার অনেক সমস্যা অতীত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। যদি ৭ দিন পরেও আপনার যথেষ্ট উন্নতি দেখা না যায় তাহলে আপনার উচিত হবে, লাগাতার কয়েক মাস সার্বজনীন পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রাম অনুসরণ করা। কিংবা অভিজ্ঞ কারও সাথে পরামর্শ করে নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য রুকইয়াহ করা।
ঙ. আরও কিছু কথা
১. কালোজিরা চিবিয়ে খেতে সমস্যা হলে মধু এবং পানির সিরাপের সাথে গুলিয়ে খাবেন। অথবা গুড়া করেও খেতে পারেন।
২. একদম ছোট বাচ্চাকে ডিটক্স করালে মধু বাদ দেবেন, অথবা খুবই সামান্য দেবেন। পানি বেশি না খেতে চাইলে অর্ধেক কমিয়ে দেবেন। আর কালোজিরা গুড়া করে একসাথে গুলিয়ে খাওয়াবেন।
৩. ডিটক্সের সাথে প্রতিদিন রুকইয়াহ শোনা আবশ্যক না, তবে শুনতে পারলে উপকার বেশি হবে।
৪. সাওম রেখে রুকইয়াহ ডিটক্স করতে চাইলে সকালের মধু-পানি-কালোজিরা সাহরির সময়ের শেষের দিকে খাবেন, দিনের বেলায় গোসল করবেন। আর রাতের রুটিন স্বাভাবিক নিয়মেই পালন করবেন।
৫. শীতকালে সকাল-সকাল গোসল করতে কষ্ট হলে হালকা গরম পানি ব্যবহার করতে পারেন, একান্ত অপারগ হলে একটু দেরিতে গোসল করতে পারেন; এতে সমস্যা নেই।
৬. অন্য কেউ উপাদানগুলো প্রস্তুত করে দিলে বা আগে থেকেই প্রস্তুত করা থাকলে মেয়েরা তাদের পিরিয়ডের সময়ও ডিটক্স রুকইয়াহ করতে পারবে। এতে কোনো সমস্যা নেই।
৭. সপ্তাহ শেষে বেঁচে যাওয়া উপাদান দিয়ে চাইলে পরে আবার ডিটক্স করতে পারবেন। অথবা অন্যান্য স্বাভাবিক কাজেও ব্যবহার করতে পারবেন।
৮. এই রুটিন অনুসরণের পাশাপাশি আপনার উচিত হবে, পুরো সপ্তাহ বেশি বেশি ইস্তিগফার করতে থাকা এবং প্রতিদিনের মাসনূন আমলগুলো করা। আর সমস্যা থেকে মুক্তি এবং সুস্থতা চেয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করা।
৯. এই ৭ দিন হাতের কাছে একটি ডায়েরি বা খাতা রাখুন। খুব সংক্ষেপে আপনার অবস্থা নোট করুন, যেন সপ্তাহ শেষে অভিজ্ঞ কারও সাথে সেটা শেয়ার করতে পারেন।
১০. ৭ দিনের এই প্রোগ্রাম প্রথম রাত থেকে শুরু করে ৭ম দিন গোসলের মাধ্যমে শেষ করা উচিত।
টিকাঃ
১. আল-মুজামুল আওসাত
২. সূরা কাফ, আয়াত: ৯
৩. আবূ দাউদ: ৩৮৮৫
৪. সূরা নূর, আয়াত: ৩৫
৫. সূরা নাহল, আয়াত: ৬৯
৬. তিরমিযী: ২০৪১
৭. সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৮৬
৮. মুসলিম: ১৩৩৭
📄 সার্বজনীন পূর্ণ রুকইয়াহ প্রোগ্রাম
এবার আমরা যে বিষয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি, এটাকে "Common Full Ruqyah Program" বলা যায়, যা উস্তায মুহাম্মাদ তিমের প্রবন্ধ থেকে আমি নিজের ভাষায় বর্ণনা করছি।
একটু খোলাসা করে বললে, এটি একটি সার্বজনীন রুকইয়াহ গাইড, যা জাদু জিন বদনজর অথবা অন্যান্য যেসব সমস্যার জন্য সচরাচর রুকইয়াহ করা হয়, তার সবগুলোতে আক্রান্তদের জন্য অনুসরণযোগ্য। তাই যাদের সমস্যা অনেক প্রকারের, আর বুঝতে পারছেন না যে, কী করা উচিত, তারা প্রতিটা সমস্যার জন্য বিশেষ বিশেষ রুকইয়ার নিয়ম অনুসরণ না করে এককভাবে এই পরামর্শ অনুসরণ করে দেখুন। ইনশাআল্লাহ যথেষ্ট উপকার হবে।
ক. যিনি রুকইয়াহ করবেন
১. আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার ওপর তাকে পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে।
২. অবশ্যই প্রতিদিনের ফরয-ওয়াজিব ইবাদাতগুলো করতে হবে, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের প্রতি যথাসম্ভব যত্নবান হতে হবে।
৩. প্রতিদিনের মাসনূন আমলগুলো গুরুত্বের সাথে করতে হবে। শুধু তাই না, এগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।
৪. সাথে কোনো তাবীজ রাখা যাবে না। আগে ব্যবহার করেছে-এ রকম কোনো তাবীজ থাকলে জাদু বিষয়ক অধ্যায়ে বলা নিয়মে নষ্ট করে ফেলতে হবে।
৫. বাড়ির পরিবেশ যতদূর সম্ভব পবিত্র রাখতে হবে। কোনো প্রাণীর ছবি, ভাস্কর্য, কুকুর বা এমন কিছু রাখা যাবে না, যা রহমতের ফেরেশতা প্রবেশে বাধা হয় আর শয়তান প্রবেশের কারণ হয়।
৬. সমস্যা একদম দূর হওয়া পর্যন্ত ভরসা করে সবরের সাথে রুকইয়াহ চালিয়ে যেতে হবে।
৭. যথাসম্ভব গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে, আর সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করতে হবে।
খ. প্রতিদিন যা করবেন
১. প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমের আগের মাসনূন আমল সঠিকভাবে করা।
মেয়েদের অনেকে পিরিয়ডের সময় মাসনূন আমলগুলো করেন না। এটা মোটেও ঠিক না। সেসময় শয়তানের ক্ষতি থেকে বাঁচার আমলগুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে করা উচিত। পিরিয়ডের সময় কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া অন্য দুআ পড়তে মানা নেই।
২. রুকইয়াহ করার নিয়তে প্রতিদিন কমপক্ষে পৌনে এক ঘণ্টা কুরআন তিলাওয়াত করা। সম্ভব হলে আরও বেশি পড়া।
বিভিন্ন রুকইয়ার আয়াত রাখুন আপনার তিলাওয়াত লিস্টে। সম্ভব হলে সূরা বাকারা পড়ুন, অথবা কুরআনের যেখান থেকে ইচ্ছা, তিলাওয়াত করুন। আর সময় কম পেলে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, ইখলাস, ফালাক এবং নাস বারবার পড়ে উল্লিখিত সময় পূরণ করবেন। একান্ত অপারগ হলে বা সুযোগ না থাকলে অডিও শুনবেন। তবে এ ক্ষেত্রে দ্বিগুণ সময় শোনা উচিত। চাইলে কিছুক্ষণ নিজে পড়ে বাকি কিছুক্ষণ অডিও শোনা যেতে পারে।
৩. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা। প্রতিদিন কমপক্ষে ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তিগফার করা উচিত।
৪. সুস্থতার জন্য প্রতিদিনই আল্লাহর কাছে দুআ করা।
গ. প্রতি সপ্তাহে যা করবেন
বাড়িতে প্রতি সপ্তাহ অন্তত ১ দিন সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা। উত্তম হচ্ছে, প্রতি তিন দিনে একবার পড়া। আর এই তিলাওয়াতটা সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি করলে সবচেয়ে ভালো। নইলে অন্য কেউ তিলাওয়াত করার সময় সে শুনলেও চলবে।
তবে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে যদি পড়তে না পারে আর সহায়তা করার মতো কাউকে পাওয়াও না যায়, তাহলে অপারগতা হেতু অডিও শোনা যেতে পারে। কিন্তু তিলাওয়াত করা সম্ভব হলে অবশ্যই তিলাওয়াত করা উচিত।
ঘ. প্রতি মাসে যা করবেন
রোগীকে প্রতিমাসে কমপক্ষে ১ বার, আর সমস্যা বেশি হলে মাসে ২ বার আশফিয়া: ৭ দিনের ডিটক্স প্রোগ্রাম অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ করার পর এক-দেড় সপ্তাহ বাদ দিয়ে তারপর আরেকবার করা ভালো। বিরতিহীনভাবে লাগাতার রুকইয়াহ ডিটক্স করতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
ঙ. যে কাজ মাঝেমধ্যে করা উচিত
১. হিজামা করা। রুকইয়াহ থেকে সর্বোত্তম ফল পেতে হিজামা করানো উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বলেছিলেন, 'তোমরা যেসব চিকিৎসা করো, তার মধ্যে হিজামা হলো সবচেয়ে সেরা।' ১ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও বিভিন্ন রোগের জন্য হিজামা করিয়েছেন। এমনকি যখন জাদুতে আক্রান্ত হয়েছেন, জাদু কেটে যাওয়ার পর ভালোভাবে সুস্থতার জন্যও হিজামা করিয়েছেন। অনেকের ক্ষেত্রে রুকইয়ার সাথে হিজামা করানোর পরই কেবল পরিপূর্ণ সুস্থতা পাওয়া যায়। আর এজন্য জাদু-জিন ইত্যাদি সংক্রান্ত সমস্যার জন্য হিজামা থেরাপিতে অভিজ্ঞ দ্বীনদার কারও সহায়তা নিন।
২. নিয়মিত আপডেট জানানো। যারা এই দীর্ঘ রুটিন অনুসরণ করবেন, তাদের উচিত হবে, একটি খাতা বা ডায়েরি হাতের কাছে রাখা। সেখানে প্রতিদিনের অবস্থা এক-দুই লাইনে লিখে রাখা। কিছুদিন পরপর যিনি আপনাকে রুকইয়ার ব্যাপারে গাইড করবেন, তাকে অথবা রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপে আপনার অবস্থার আপডেট জানানো।
মোট কথা, আপনার সার্বিক অবস্থা নিয়ে অভিজ্ঞ কারও সাথে নিয়মিত পরামর্শ করে সে অনুযায়ী রুকইয়াহ চালিয়ে যাওয়া কিংবা বন্ধ করা অথবা প্ল্যান পরিবর্তন করা উচিত। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে হেফাজত করে এবং রোগ থেকে সুস্থতা দান করেন। আমীন।
টিকাঃ
১. বুখারী: ৫৩৭১
📄 সুস্থ হতে আমার এত দেরি লাগছে কেন?
অনেকে দীর্ঘদিন ধরে রুকইয়াহ করেন, সব নির্দেশনা ঠিকমতোই অনুসরণ করেন। এরপরও দেখা যায় সুস্থ হতে দেরি লাগছে। কেউ আবার কয়েকদিন বা সারা সপ্তাহে কয়েক মিনিট রুকইয়াহ করেই জিজ্ঞেস করেন, আমার এত দেরি লাগছে কেন?
এখানে অনেকেই যে ভুলটা করে থাকেন, সেটার ব্যাখ্যা দিচ্ছি। তারা ভাবেন, যেহেতু আমি সঠিক পদ্ধতিতেই রুকইয়াহ করছি, সুতরাং দুই দিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এটা আর কিছুই না, আশা আর বাস্তবতার ফারাক। যদি ডাক্তার কাউকে বলে, আপনার ক্যান্সার হয়েছে, কেমোথেরাপি দরকার। তখন কি সে একবার থেরাপি দিয়েই সুস্থ হয়ে যাওয়ার আশা করবে? নাকি ডাক্তারকে এক সপ্তাহ পরেই বলবে যে, আমি কেন সুস্থ হচ্ছি না? না, সে এমনটা করবে না। কারণ, সে ধরেই নিয়েছে, তাকে পুরো এক বা দুই বছর চিকিৎসা নিতে হবে। আর এরপর সে সুস্থ হবে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমি মাত্র তিনদিন রুকইয়াহ করে জাদু-আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ হতে দেখেছি, আবার এমনও দেখেছি দুই বছর ধরে রুকইয়াহ করছে; কিন্তু এখনও সব সমস্যা ভালো হয়নি। আধঘণ্টার রুকইয়াতে যেমন শরীর থেকে জিন চলে যেতে দেখেছি, তেমনি এটাও দেখেছি, প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা করে এক সপ্তাহ রুকইয়াহ করার পর জিন সরেছে; এরপরও সব লক্ষণ দূর হয়নি। এমন রোগীও দেখেছি প্রায় বছরখানেক ধরে নিয়মিত রুকইয়াহ করেছে, জাদুকর বারবার জাদু করেছে, জিন পাঠিয়েছে, একের পর এক জিন এসেছে আর তাওবাহ করে বিদায় হয়েছে, কোনো জিন কয়েক ঘন্টার মধ্যে চলে গেছে, আর কোনো জিনের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহও লেগেছে! আর কোন যেতে অস্বীকার করেছে, রুকইয়াহ করতে করতে একপর্যায়ে মরে গেছে। (আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন)
সুতরাং আপনার বিশ্বাস করা উচিত, সমস্যার বিস্তৃতি এবং গভীরতা অনুযায়ী সুস্থ হতে কম-বেশি সময় লাগতে পারে। তাই কদিন রুকইয়াহ করার পরই আশা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অতি আশা ছেড়ে আপনাকে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত: এই চিকিৎসা আপনার ও শয়তানের বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ। এই যুদ্ধে অনেকগুলো ছোট ছোট লড়াই আছে, সে লড়াইয়ে কখনো আপনি জিতবেন, কখনো আপনি হারবেন। এই সব কিছুর পেছনে আল্লাহর হিকমাহ লুকিয়ে আছে। আপনার কাজ হবে চেষ্টা করে যাওয়া। ফায়সালা আল্লাহর হাতে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এমন ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের দিক থেকে পরিপূর্ণ, যার দুআ কবুল করা হতো, যিনি কবীরা গুনাহ থেকে মুক্ত, যার ভবিষ্যত ও অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে; এতকিছুর পরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ বছরেরও বেশি সময় তার শত্রুর বিরুদ্ধে মেহনত এবং যুদ্ধ করেছেন। দুনিয়ার বুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে নিখুঁত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাঁকে এবং তার সঙ্গীদের বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরীক্ষা করেছেন। এরপরই মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। আল্লাহ এ সম্পর্কে কুরআনে বলেছেন-
إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاءَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
"যদি তোমরা আহত হয়ে থাকো, তেমনি তো তারাও আহত হয়েছে। এবং এই (জয়- পরাজয়ের) দিনগুলোকে আমরা মানুষের মধ্যে পালাক্রমে বদল করি, যেন আল্লাহ জেনে নিতে পারেন, কারা ঈমান এনেছে। আর তিনি তোমাদের মধ্যে থেকে কাউকে শহিদ হিসেবে গ্রহণ করতে চান। আর আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না।” ১
এই আয়াতে আল্লাহ ব্যাখ্যা করেছেন, কেন উহুদের যুদ্ধে কাফিররা সীমিতভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছিল। এভাবে আল্লাহ তাআলা মাঝেমধ্যে তাঁর শত্রুদের অবকাশ দেন, যাতে তিনি মুসলিমদের ঈমানকে পরীক্ষা করতে পারেন আর কতককে শহিদ হিসেবে কবুল করে নিতে পারেন। এটাই আল্লাহর হিকমাহ।
তাই একজন রোগীকে এই ব্যাপারে ধৈর্য ধরতে হবে, সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে যেতে হবে, আর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। আল্লাহ যখন চাইবেন, সুস্থতা দেবেন, অথবা চাইলে পরীক্ষা করবেন। ফলে আক্রান্ত অবস্থাতেই মৃত্যু হবে। এর প্রতিদান আল্লাহ আখিরাতে দেবেন।
আবূ সাঈদ খুদরী এবং আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে সকল কষ্ট, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা এবং পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি যদি তার দেহে একটি কাঁটাও বিদ্ধ হয়, এসব প্রতিটি বিপদে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন। ২
আতা ইবনু আবী রাবাহ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস রা. আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতি মহিলা দেখাব? আমি বললাম, অবশ্যই। তখন তিনি বললেন, এই কৃষ্ণ বর্ণের মহিলাটিকে দেখো, সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আবেদন করেছিল, তার মৃগী রোগ আছে। তাই তার সুস্থতার জন্য যেন দুআ করা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যদি সবর করতে চাও, করতে পারো। বিনিময়ে তোমার জন্য থাকবে জান্নাত। আর তুমি চাইলে আমি আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারি, যেন তোমাকে সুস্থতা দেন। মহিলা বলল, আমি ধৈর্যধারণ করব। ৩
সুতরাং আপনি যদি সবর করতে পারেন তাহলে অবশ্যই আল্লাহর কাছে এর বড় প্রতিদান পাবেন। আমি এমন বেশ কয়েকজন মানুষকে দেখেছি, যারা দীর্ঘ সময় রুকইয়াহ করে সম্পূর্ণ সুস্থতা পায়নি বটে, কিন্তু এর মাঝে তারা আল্লাহর অনেক নিকটবর্তী হয়েছেন, ঈমান-আমলে অনেক উন্নতি লাভ করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
"আল্লাহ বলেন, তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমরা জান্নাতে চলে যাবে অথচ এখনো তোমাদের ওপর তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের মতো পরিস্থিতি আপতিত হয়নি! বিভিন্ন বিপদ ও কষ্ট তাদের স্পর্শ করেছিল। আর তাদের এমনভাবে প্রকম্পিত করা হয়েছিল যে, নবী ও তার সাথের ঈমানদাররা পর্যন্ত বলে উঠেছিল, 'কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য!' জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে।” ৪
তৃতীয়ত: রুকইয়ার ক্ষেত্রে কুরআন আপনার হাতিয়ার। আচ্ছা, তাহলে ব্যাপারটা এমনও হতে পারে, আপনার অস্ত্র ঠিকই আছে; কিন্তু যে হাত অস্ত্র ধরে আছে, সেটা দুর্বল। কিংবা এমনও হতে পারে, আপনার হাতটি শক্তিশালী; কিন্তু লক্ষ্য দুর্বল। তাই আপনার নিজেকে যাচাই করতে হবে। বারবার মিলিয়ে দেখতে হবে—কিছু বাদ যাচ্ছে কি? রুকইয়ার পদ্ধতি ঠিক আছে তো? নিয়ত ঠিক আছে কি? রুকইয়াহ করা কম হচ্ছে না তো? কিংবা পেছনে কোনো বড় গুনাহ রয়ে গেছে কি, যা থেকে তাওবাহ করা হয়নি, ফলে আল্লাহর সাহায্য আসতে দেরি হচ্ছে?
এরকম অবস্থায় আপনার উচিত, নিজের আত্মোন্নয়নের দিকে মনোযোগী হওয়া।
আত্মসমালোচনা বা নিজ কাজের পর্যালোচনা সবসময়ই সফলতার একটি পন্থা। কিন্তু এটাও খেয়াল রাখতে হবে, নিজের সমালোচনা যেন এমন পর্যায়ে না পৌঁছায়, যাতে আপনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হন। যেমন ইয়াকুব আ. বলেছিলেন, 'হে আমার সন্তানেরা, যাও, ইউসুফ ও তার ভাইকে খুঁজে বের করো, আর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই কাফিররা ছাড়া আল্লাহর রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না।' ৫
শেষ কথা হচ্ছে, যদি দেখেন, রুকইয়ার কারণে সমস্যা কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে তাহলে ভয়ের কিছু নেই। আপনার উচিত, শুকরিয়া আদায় করা। কারণ, রুকইয়াহ কাজ করছে। আপনার চিন্তিত হওয়া উচিত দুটো অবস্থায়-
১. যদি দেখেন কয়েক মাস সব কিছু ঠিকমত করার পরও সামগ্রিক অবস্থার কোনো উন্নতি নেই।
২. যদি রুকইয়াতে কোনোই ইফেক্ট না হয়। না উন্নতি, আর না অবনতি। সমস্যা এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে।
আমি এরকম পরিস্থিতিতে কাউকে দেখলে একদম শুরু থেকে আবার খোঁজ নেই- পেছনের সবকিছু ঠিক আছে কি না, ফরয গোসল ঠিকমত করে কি না, রোগীর সাথে বা বাসায় কোনো তাবীজ আছে কি না, কোনো ছবি ঝুলানো আছে কি না। আকীদা, নিয়ত কিংবা রোগীর চরিত্রে কোনো সমস্যা আছে কি না, আয়-রোজগার হালাল কি না, কোনো বিশেষ গুনাহে আসক্ত কি না। এরপর জিজ্ঞেস করি, কীভাবে রুকইয়াহ করতে বলা হয়েছিল আর তিনি কীভাবে করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আমি দুটি কাজ করি- প্রথমত: রুকইয়াহ একদম কমিয়ে দিই, যেন কাজ অল্প হলেও নিয়মিত করে। যেমন বলি, আপনার কিচ্ছু করা লাগবে না। আপনি শুধু সূরা ফাতিহা এবং তিন কুল পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে খাবেন, আর যতটুকু পারবেন, রুকইয়াহ শুনবেন। অবস্থার উন্নতি হলে পরে এটা বাড়িয়ে দিই।
দ্বিতীয়ত: সামগ্রিক অবস্থার উন্নয়নে মনোযোগী হই। বলি, পেছনে বিশেষ কোনো গুনাহ থাকলে তার প্রতিকার করবেন। মাহরাম-গাইরে মাহরাম মেনে চলবেন। ঠিকমত সালাত আদায় করবেন। গান-বাজনা থেকে দূরে থাকবেন। যথাসম্ভব চোখের হেফাজত করবেন। সাথে আরেকটা জিনিস দিই-ইস্তিগফার। প্রতিদিন অবশ্যই ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তিগফার করবেন। সালাতের ব্যপারে কাউকে উদাসীন মনে হলে বলি, আপনি প্রতি সালাতের পর ২০ বার করে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়বেন, যেন সারাদিনে ১০০ বার হয় আর নামাজও আদায় হয়ে যায়। আর প্রাথমিক দ্বীনদারি ঠিক থাকলে তাহাজ্জুদের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে বলি। আল্লাহর রহমতে এভাবে স্থির অবস্থা থেকে নাজাত পাওয়া যায়।
উপসংহারে বলব, সবর করুন, নিজেকে যাচাই করুন, আর আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থেকে চেষ্টা এবং দোয়া করতে থাকুন।
টিকাঃ
১. সূরা আলে-ইমরান: ১৪০
২. বুখারী: ৫৩১৮
৩. বুখারী: ৫৩২৮
৪. সূরা বাকারা: ২১৪
৫. সূরা ইউসুফ: ৮৭
📄 কীভাবে বুঝব আমার রুকইয়াহ করা শেষ?
রুকইয়াহ করতে করতে যদি রোগের লক্ষণগুলো একদমই আর দেখা না যায় অথবা রোগী তার অসুস্থতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি লাভ করে তাহলেই সাধারণত বলা যায়, তার রুকইয়াহ করা এখন সম্পন্ন হয়েছে। এই সুস্থতা একেবারে পাওয়া যায় না; বরং এটা ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে বোঝা যায়। আর প্রতিটা ধাপে রোগীকে বিভিন্ন ধরণের সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। (This is something which usually happens in phases, and each phase has its own unique challenges) বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী যখন একটু সুস্থ বোধ করতে থাকে, তখনই রুকইয়ার পদ্ধতিতে ভুল করে বসে।
রুকইয়ার ক্ষেত্রে একেক রোগী একেক ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। সবাই-ই যে ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে এগিয়ে যাবে—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয় যে, জিনের লক্ষণগুলো খুব প্রকট হয়ে গেছে; কিন্তু এর একটু পরই জিনটা শরীর থেকে চলে যায়। তাই ট্রিটমেন্ট সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাক বা শেষ হওয়ার কাছাকাছি চলে যাক, এই সময়গুলোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে—
১. রোগীরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটা করেন, তা হচ্ছে, রুকইয়াহ করা থামিয়ে দেন। যখনই জিন চলে যায় বা রোগী একটু ভালো বোধ করে তখন আর রুকইয়াহ করে না। কোনো অবস্থাতেই রুকইয়াহ করা থামাবেন না। জিন চলে যাওয়ার পরও কমপক্ষে এক মাস আগের মতোই স্বাভাবিক মাত্রাতেই রুকইয়াহ চালিয়ে যাবেন। যতক্ষণ আপনি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে বলতে পারেন যে, আমি এবার আসলেই সুস্থ। এইভাবে পরবর্তী এক মাসে আপনি বড় কিছু ভুল থেকে রক্ষা পাবেন। কারণ, অনেক সময় জিন চলে যাওয়ার কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে। আবার অনেক সময় একটা জিন চলে যায়; কিন্তু অন্য জিন শরীরে প্রবেশ করে। এমন অনেক কেস আছে, যেখানে জিন আবার ফেরত এসেছে। জাদুর সমস্যা ছিল, একটু সুস্থ হতে দেখে রুকইয়াহ বন্ধ করে দিয়েছে, সমস্যা আবার বেড়ে গেছে। কিংবা বদনজরে আক্রান্ত ছিলো, সেই গর্ত থেকে জিনের আসর হয়েছে। রুকইয়াহ করার পর জিন চলে গেলেও সাধারণত জিনের নজরের লক্ষণগুলো অনেকদিন বিদ্যমান থাকে। তাই সুস্থ হওয়ার পরও কিছুদিন রুকইয়াহ করে যেতে হবে। এই সময়টাতে একজন রাকীকেই তিলাওয়াত করতে হবে-সেটা জরুরি নয়। রোগী নিজে বা তার কোনো আত্মীয়ও তার ওপর পড়তে পারে।
২. প্রায় সুস্থ হয়ে গেছি, রুকইয়াহ বন্ধ করে দিই? উহুঁ, এটাও আগের কথার সাথে সম্পর্কিত। আপনাকে ১০০ ভাগ নিশ্চিত হতে হবে যে, আপনি সুস্থ হয়েছেন। মোটামুটি নিশ্চিত বা ৮০ ভাগ নিশ্চিত হলে চলবে না। এমনকি এক্ষেত্রে ৯০ ভাগ নিশ্চয়তাও যথেষ্ট নয়। আপনাকে অবশ্যই ১০০ ভাগ নিশ্চিত হতে হবে যে, জিন চলে গেছে বা জাদুর সব লক্ষণগুলো সম্পূর্ণ দূর হয়েছে। কারণ, ১০ ভাগ সমস্যাও যদি রয়ে যায় তাহলে সেখান থেকে আবার বাড়তে পারে। আর সচরাচর এমনটাই হয়ে থাকে। যদি কারও ক্যান্সার হয় তাহলে সে নিশ্চয়ই ৯০ ভাগ ক্যান্সারের জীবাণু ধ্বংস করে চিকিৎসা বন্ধ করে দেবে না। আমরা ভালোভাবেই জানি, অবশিষ্ট ১০ ভাগ থেকেই আবার ক্যান্সার পূর্ণরূপ ধারণ করতে পারে। তাই ১০০ ভাগ নিশ্চয়তা অর্জন করার চেষ্টা করুন; ৯০ ভাগ না।
৩. আগেও বলা হয়েছে, সুস্থতা ধাপে ধাপে (by stage) অর্জিত হয়। এই প্রতিটি ধাপে বা পর্যায়ে শয়তান বিভিন্ন কৌশলে আক্রমণ করে। শয়তানের সামনে যখন একটি রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, তখন সে আরেকটি রাস্তা খুঁজে নেয়। যেমন হতে পারে যে, শরীরের ঝাঁকুনি বা বেহুঁশ হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে; কিন্তু এর সাথে সাথে আবার ওয়াসওয়াসা বা সংশয় শুরু হয়েছে। এরপর দেখা গেল, ওয়াসওয়াসা বন্ধ হয়ে গেছে; কিন্তু ইবাদাতের প্রতি আলস্য ধরে গেছে। আরও স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন জাদুর রোগী কিছুদিন রুকইয়াহ করার পর দ্বিতীয় ধাপে এসে এমন কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে, যেগুলো প্রথমে ছিল না। আরও কয়েকদিন রুকইয়াহ করলে তৃতীয় ধাপে গিয়ে আবার সেগুলো চলে যাবে। তাই শয়তানের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে এই প্রতিটি পর্যায়েই ধৈর্য ধরে রেখে সমানভাবে রুকইয়াহ চালিয়ে যেতে হবে। এজন্য দরকার ধারাবাহিকতা। কোনোভাবেই রুকইয়াহ বন্ধ করা যাবে না; পরিস্থিতি ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন। প্রয়োজনে পাশাপাশি আরও কিছু বাড়তি রুকইয়াহ যোগ করতে হবে। যেমন: এক্ষেত্রে জাদুর জন্য রুকইয়াহ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আপনার কিছুদিন ওয়াসওয়াসার রুকইয়াহ করার প্রয়োজন হতে পারে।
৪. রোগী সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও সে ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। এটা অনেকটা মেজর কোনো সার্জারির মতো। কারও শরীরে যদি বড় ধরনের অপারেশন করা হয় তাহলে সার্জারি পরবর্তী সময়ে রোগী ইনফেকশনের ঝুঁকিতে থাকে। বাস্তবতা হচ্ছে, এরকমভাবেই রুকইয়াহ করার পর রোগীরা আবারও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই এ সময়টা রোগীকে খুব সতর্কতার সাথে পার করতে হয়, প্রতিদিন আমলগুলো যত্নের সাথে পালন করতে হয়, যেন তিনি আবার কোনোভাবে আক্রান্ত না হন।
৫. কোনো কারণে যদি আবার সমস্যা শুরু হয়েছে বলে মনে হয়, তখন দেরি না করে আবার পুরোদমে গুরুত্বের সাথে রুকইয়াহ শুরু করে দিতে হবে। এত কষ্ট-মেহনতে পাওয়া আরোগ্যকে অবহেলার কারণে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়。