📄 সাধারণ অসুস্থতার জন্য রুকইয়াহ
সাধারণ অসুস্থতা বলতে এখানে এমন সব অসুস্থতা বোঝানো হচ্ছে, যেগুলোর পেছনে বদনজর, জিন বা জাদুর কোনো যোগসূত্র নেই; বরং সাধারণ শারীরবৃত্তীয় বা মানসিক কোনো অসুস্থতা, যেগুলোর কার্যকারণ সম্পর্কে প্রচলিত চিকিৎসা বিজ্ঞান পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে আলোচনার শুরুতেই কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে-
১. কুরআনুল কারীম যেমন আত্মিক ব্যাধিসমূহের (গুনাহ, ভ্রান্তি) জন্য আরোগ্য, তেমনি শারীরিক-মানসিক, প্রাকৃতিক-অতিপ্রাকৃতিক সব রোগের জন্যই আরোগ্য। আপনি হাদীসের গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কিরামের এমন অনেক ঘটনা পাবেন, যেখানে শারীরিক বা মানসিক সমস্যার জন্য বিভিন্ন দুআ, রুকইয়াহ ইত্যাদির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়েছে। এই গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে আমরা সহীহ হাদীস থেকে এমন অনেকগুলো ঘটনা উল্লেখ করেছি।
২. প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে বোঝা যাবে, রোগের সাথে অতিপ্রাকৃতিক কিছু জড়িত কি না? এটা দুইভাবে যাচাই করা যেতে পারে। এক: পূর্বের জাদু, জিন ইত্যাদি অধ্যায়সমূহে বিভিন্ন সমস্যার লক্ষণ বলা হয়েছে, সেসব মিলিয়ে দেখতে হবে। অনেকগুলো মিলে গেলে তখন নিশ্চয় এটাকে কাকতালীয় বলা যাবে না। দুই: রুকইয়াহ করতে হবে। নিজে রুকইয়ার আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে, অথবা অন্য কারও তিলাওয়াত শুনে সমস্যার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তবে এটা কোথাকার সমস্যা, কিসের সমস্যা, জিনভূত, বদনজর নাকি সাধারণ পেটব্যথা- এত কিছু চিন্তা করে সময়ক্ষেপণের পূর্বেই কিছু রুকইয়াহ করে ফেলা উচিত। হয়তো সূরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিলেই সমস্যার সলিল সমাধি হয়ে যাবে, অথচ আপনি চিন্তা করে অস্থির হয় পড়েছেন। একদম ভালো না হলেও কিছু তো উপকার হবে। তাহলে দেরি কেন?
৩. খেয়াল রাখার বিষয় হচ্ছে, রোগব্যাধির জন্য চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়া বা ওষুধ সেবন করার পাশাপাশি রুকইয়াহ করা উচিত। এটা যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত, তেমনি সালাফের কর্মপন্থা। তাই এটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। শুধু রুকইয়াহ করে বসে থাকা উচিত হবে না, প্রয়োজন অনুযায়ী দুটোই করতে হবে।
উসামা ইবনু শারীক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, গ্রামের কিছু লোকেরা জিজ্ঞেস করেছিল 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি চিকিৎসা করাব না?' তিনি বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা কর, আল্লাহ তা'আলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার নিরাময়ের সৃষ্টি করেননি। অথবা তিনি বলেছেন, আল্লাহ এমন কোন রোগ দেননি যার ঔষধ দেননি। শুধু একটি রোগ ব্যাতিত! সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেটি কি? তিনি বললেনঃ বার্ধক্য। ১
টিকাঃ
১. তিরমিযী: ২০৩৮, বুখারী: ৫৩৫৪
📄 ব্যথার জন্য রুকইয়াহ
ব্যথা বিবিধ রকমের হতে পারে, তবে এক্ষেত্রে হাদীসে বর্ণিত এই রুকইয়াটি করলে ইনশাআল্লাহ উপকার পাওয়া যাবে।
উসমান ইবনু আবিল আস রা. থেকে বর্ণিত, একবার আমার শরীরে ব্যথা অনুভব করছিলাম, তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ ব্যাপারে অনুযোগ করলাম।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার হাতটি ব্যথার জায়গায় রাখো। এরপর তিন বার বলো- "بِاسْمِ الله"
তারপর ৭ বার বলো-
أَعُوْذُ بِعِزَّةِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ
আ'উযু বি'ইযযাতিল্লা-হি ওয়াকুদরাতিহি, মিন শাররি মা-আজিদু ওয়া উহা-যির।
অর্থ: আমি আল্লাহর সম্মান এবং তার ক্ষমতার আশ্রয় নিচ্ছি, যা আমি অনুভব করি এবং যা আশঙ্কা করি—তার অকল্যাণ থেকে।
বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন, আমি এমনটাই করলাম, এতে আমার ব্যথা ভালো হয়ে গেল। ১
উল্লেখ্য, এই দুআটি অনেকগুলো সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হচ্ছে উল্লিখিত রূপটি।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আপনি চাইলে একই নিয়মে কয়েকবার রুকইয়াহ করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত: যদি এমন কারও ওপর এই রুকইয়াহ করেন, যাকে স্পর্শ করা হারাম। এক্ষেত্রে এগুলো পড়বেন এবং পড়া শেষে ফুঁ দেবেন। ইনশাআল্লাহ এতটুকুই যথেষ্ট হবে।
একটি অভিজ্ঞতা: প্রসঙ্গক্রমে এক ভাইয়ের ঘটনা উল্লেখ করা যায়। তার ঘাড়ে বেশ ব্যথা ছিল। কদিন পরপরই এটা হতো। আমরা এই হাদীসটা নিয়ে একদিন রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপে আলোচনা করি। সেটা দেখে তিনি এভাবে রুকইয়াহ করার পর মন্তব্য করলেন, ভাই আমি রুকইয়াহ করলাম। ভালো হলো নাতো। আমার ব্যথা তো আছেই। একজন উত্তর দিয়েছিলো, আল্লাহ চায়নি তাই ভালো হয় নি। সবর করেন আর আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকেন।
এর কয়েকদিন পর তিনি জানালেন, তখন সাথেসাথে ব্যথা যায়নি বটে; কিন্তু ওইদিন ঘুমানোর পর যে ব্যথা ভালো হয়েছে এরপর আর সমস্যা হয়নি।
আলহামদুলিল্লাহ, এজন্য দুআ বা রুকইয়াহ করে তৎক্ষণাৎ ফলাফল দেখতে না পেলে হতাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ এর বদলায় হয়তো আরও ভালো কিছু প্রস্তুত রেখেছেন, যা এখন আমাদের কল্পনাতেও নেই।
টিকাঃ
১. মুসলিম: ৪০৮৯, তিরমিযী: ২০০৬
📄 মানসিক সমস্যার জন্য রুকইয়াহ
মানসিক সমস্যার জন্য কুরআন তিলাওয়াত এবং আল্লাহর নামের যিকির খুব উপকারি। সেটা যে ধরনের মানসিক সমস্যাই হোক না কেন। আল্লাহ বলেছেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
“জেনে রাখো, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়।” ১
মানসিক চাপ, হতাশা (Depression)-জাতীয় সমস্যায় বিশেষভাবে সূরা ইউসুফ এবং সূরা আর-রাহমান তিলাওয়াত করা বেশ ফলদায়ক। এছাড়া বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় সূরা ইয়াসিন, সফফাত, দুখান এবং জিনের সম্মিলিত রুকইয়াহ বেশ উপকারি।
হয়তো বলবেন কুরআন তিলাওয়াত তো আগেও অনেক করেছি বা শুনেছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এমনি তিলাওয়াত করা আর রুকইয়াহ বা চিকিৎসার নিয়ত করে তিলাওয়াত করার মাঝে বিস্তর ফারাক আছে।
নিজের সমস্যায় নিজে তিলাওয়াত করলে সবচেয়ে ভালো, বিকল্প হিসেবে কারও তিলাওয়াত শোনা যেতে পারে। এর পাশাপাশি একটু পরে উল্লিখিত পদ্ধতিতে রুকইয়ার পানি খাওয়া, গোসল করা যেতে পারে। আর ঘুমের আগে রোগীর মাথায় রুকইয়ার তেল ব্যবহার করা অনেক উপকারি হবে ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১. সূরা রা'দ, আয়াত: ২৮
📄 অনিদ্রা (insomnia)
অনিদ্রা (insomnia) সমস্যার চিকিৎসাতেও সূরা ইয়াসীন, সফফাত, দুখান এবং জিনের রুকইয়াহ শোনা আলহামদুলিল্লাহ খুব বেশি উপকারি (যা ৮ সূরার রুকইয়াহ বলে প্রসিদ্ধ)। অনিদ্রা থেকে মুক্তির জন্য পাশাপাশি এই দুআটি পড়া যেতে পারে-
اللَّهُمَّ غَارَتِ النُّجُومُ ، وَهَدَأَتِ الْعُيُونُ ، وَأَنْتَ حَيُّ قَيُّومٌ ، لَا تَأْخُذُكَ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ ، يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ ، أَهْدِئْ لِيَلِي ، وَأَنِمْ عَيْنِي
“হে আল্লাহ, আকাশের তারাগুলো নিভে যাচ্ছে; কিন্তু আমার চোখ এখনও জাগ্রত। আর আপনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী, ঘুম বা তন্দ্রা আপনাকে পরাভূত করতে পারে না। হে চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী, আমার রাতকে প্রশান্তিময় করুন এবং আমার চোখে ঘুম এনে দিন।”
যায়দ ইবনু সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু অনিদ্রা সমস্যার কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালে তিনি এটা পড়তে বলেন। যায়দ রা. এটা পড়লে তাঁর সমস্যা ভালো হয়ে যায়। ১
মোট কথা, ওযু করে বিছানায় যাওয়া, ঘুমের আগের অন্যান্য মাসনূন আমল করা, দুআ পড়া, আর ৮ সূরার রুকইয়াহ শোনা-এগুলো ঠিকমত করলে ইনশাআল্লাহ অনিদ্রার সমস্যা দূর হয়ে যাবে। তবে যদি জিনের সমস্যার কারণে এটা হয়, তবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে বা রুকইয়াহ করতে হবে।
টিকাঃ
১. তাবারানী। বর্ণনাটির সনদ যয়ীফ। তবে দুয়াটা চিকিৎসা হিসেবে আমল করা যেতেই পারে।