📘 রুকইয়াহ > 📄 ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আরও কিছু পরামর্শ

📄 ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আরও কিছু পরামর্শ


ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্ত হতে একেকজনের জন্য একেক পন্থা কার্যকর হয়। তাই আমরা ওয়াসওয়াসা রোগ থেকে বাচার কিংবা কেউ ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়ে গেলে তা থেকে মুক্ত হওয়ার বেশ কিছু উপায় নিয়ে আলোচনা করব, বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে এবং যথাযথভাবে অনুসরণ করলে সমস্যা যত বেশিই হোক না কেন, ইনশাআল্লাহ সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা যাবে।

নিজের পক্ষ থেকে যথাসম্ভব গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা
একজন মানুষ হিসেবে যদিও পুরোপুরি গুনাহমুক্ত থাকা সম্ভব নয়, তবুও যতটুকু পারা যায় বেঁচে থাকতে হবে। প্রথমত কবীরা গুনাহ থেকে বাঁচতে হবে, আর আল্লাহর কাছে গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য সাহায্য চাইতে হবে। আল্লাহ বলেছেন-
إِن تَجْتَنِبُوا كَبَابِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلًا كريما
"তোমরা যদি বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো (যা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে), তবে তোমাদের ছোট দোষ ত্রুটি আমি মাফ করে দেবো। আর তোমাদের প্রবেশ করাব এক সম্মানিত প্রবেশদ্বারে।” ১

আল্লাহ আরও বলেছেন-
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِأَنفُسِكُمْ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"অতএব আল্লাহকে ভয় করো, যতটুকু তোমাদের সাধ্য আছে, আর শোনো এবং পালন করো আর (আল্লাহর জন্য) খরচ করো। এটা তোমাদের নিজেদের জন্যই কল্যাণকর।” ২

পুরুষ হলে জামাতে সালাত আদায় করা
"মুআয ইবনু জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ছাগলের জন্য যেমন বাঘ রয়েছে, তেমনি মানুষের বাঘ হলো শয়তান। বকরির পাল হতে বিচ্যুত ও বিচ্ছিন্নটিকেই বাঘ আক্রমণ করে। তাই সাবধান, বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে বিরত থাকো। তোমরা সাধারণ মুসলমানদের সাথে জামাতবদ্ধ থাকো, আর মসজিদের সাথে যুক্ত থাকো।” ৩

তাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার বড় একটি উপায় হচ্ছে, জামাতে সালাত পড়া। জিনের রোগীর ক্ষেত্রেও এই পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ, জামাতে সালাত পড়লে আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায়, জিন-শয়তানরা সহজে আক্রমণ করতে পারে না। আপনাকে জামাতে অংশ নিতে দেবে না-এমন কোনো কাজ সামনে চলে আসলে পারতপক্ষে তা থেকে দূরে থাকা এবং সালাতের পর সেই কাজে হাত দেওয়াটাই হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।

প্রতিদিনের মাসনুন যিকরগুলো করা
প্রতিদিনের মাসনূন আমলগুলো ঠিকঠাক পালন করা, যেমন: শৌচাগারে প্রবেশের দুআ পড়া, স্ত্রী সহবাসের দুআ পড়া। সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমের আগের দুআগুলো গুরুত্বের সাথে পড়া। যেমনঃ সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস ৩বার করে পড়া। অন্যান্য মাসনূন আমলের সম্পর্কে জানতে এই গ্রন্থের ৪র্থ অধ্যায়ে 'মাসনুন আমল' অংশ দ্রষ্টব্য।

ওয়াসওয়াসার অনুভূতিকে পাত্তা না দেওয়া
সব ধরনের ওয়াসওয়াসার ক্ষেত্রেই এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওয়াসওয়াসা ব্যাপারটা চোরাবালির মতো, বেশি নড়াচড়া করলে আরও দেবে যাবেন। কিংবা স্কুলের দুষ্ট সহপাঠীদের মত, যারা আপনাকে বিরক্ত করছে, আপনি পাত্তা দিলে বা রাগ করলে আরও বেশি বিরক্ত করবে। একইভাবে ওয়াসওয়াসা নিয়ে যত বেশি ভাববেন, সমস্যা তত বেড়ে যাবে।
ওয়াসওয়াসার সমস্যা স্থায়ী হওয়ার বড় কারণ হচ্ছে, এটা নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করা। আপনি যখন বুঝবেন আপনি ওয়াসওয়াসা আক্রান্ত, তখন থেকে ১০০% নিশ্চিত না হয়ে ওয়াসওয়াসা আক্রান্ত কোন অনুভূতিকেই পাত্তা দিবেন না, আস্তে আস্তে শয়তান সরে যাবে ইনশাআল্লাহ। যখনই মনে অহেতুক চিন্তা আসবে, আপনার মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলবেন। অন্য কোন কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবেন।
সম্ভব হলে কোনো প্রতিক্রিয়াও না দেখানো উচিত। শয়তান আমাদের চারপাশেই থাকে, আমাদের গতিবিধি লক্ষ করে। তার ওয়াসওয়াসা কতটুকু কাজে লাগছে, আমরা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি—শয়তান এসব দেখে দূর থেকে। আর সে এসব কিছু দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করে। তাই কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া না দেখালে শয়তান যখন দেখবে যে, ওয়াসওয়াসা দিয়ে তার কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না তখন সে হতাশ হয়ে অন্য পথ ধরবে।
“আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কারও কাছে শয়তান এসে বলে, এটা এটা কে সৃষ্টি করেছে? এক পর্যায়ে বলে, তোমার প্রতিপালককে কে সৃষ্টি করেছে? যদি কারও প্রশ্ন এ পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয়প্রার্থনা করে এবং এ প্রসঙ্গ বাদ দেয়।” ৪

নিজের কাছে পরিষ্কার হওয়া
আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ প্রশ্ন করতেই থাকবে, এমনকি একপর্যায়ে বলবে, এ সৃষ্টিগুলোকে তো আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? যে ব্যক্তি এমন কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হবে, সে যেন বলে, آمَنْتُ بِالله অর্থাৎ আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম। ৫ পরের হাদীসে রয়েছে, “...সে যেন বলে, (آمَنْتُ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ) আমানতু বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি। অর্থাৎ আমি আল্লাহ্ এবং তার রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনলাম।” অন্য এক বর্ণনায়, সূরা ইখলাস পড়ার কথা রয়েছে।
আপনার মনে যদি ইসলাম নিয়ে ওয়াসওয়াসা আসে, আল্লাহ-রাসূল নিয়ে অবান্তর চিন্তা আসে। মনে হয়, আপনি কুফরির দিকে চলে যাচ্ছেন। তখন আপনি বলুন 'আমি আল্লাহর ওপর ঈমান আনলাম'। আপনি নিশ্চিত যে আপনি ঈমানদার, ব্যাস! ঘটনা শেষ।
এছাড়া ঈমান নিয়ে ওয়াসওয়াসা আসলে এটা পড়তে পারেন—
هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
"তিনিই আদি ও অন্ত এবং প্রকাশ্য ও গুপ্ত। কারণ, তিনিই সবকিছু সম্বন্ধে সর্বজ্ঞাতা।” ৬
এক লোক এসে ইবনু আব্বাস রা.-কে তার সমস্যার কথা বললে তিনি প্রতিকার হিসেবে ওয়াসওয়াসার সময় এই আয়াতটি পড়ার পরামর্শ দেন।

রিয়ার আশঙ্কা হলে...
ওয়াসওয়াসার একটি প্রকার হচ্ছে, ভালো কিছু করতে গেলেই মনে হয়, এটা লোক দেখানো কাজ হচ্ছে। অর্থাৎ বারবার রিয়ার আশঙ্কা হয়, ফলে মানুষ সওয়াবের কাজ থেকে পেছনে হটে যায়।
সবসময়ই যদি এমন দেখা যায় তাহলে এর চিকিৎসা হচ্ছে, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা। অর্থাৎ এভাবে ধরে নেওয়া “আল্লাহ আমল করতে বলেছেন, আমাকে করতে হবে। লোকে দেখলেও করতে হবে, না দেখলেও করতে হবে। লোকে শয়তান বললেও করতে হবে, বুজুর্গ বললেও করতে হবে। আমার কাজ—ঠিকভাবে আমল করা। আমি তা করে যাব।”
হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কী রহ. বলতেন, স্থায়ী নেক কাজ প্রথমে রিয়ার সুরতে আসে। এরপর মানুষ আমল ছেড়ে না দিয়ে করতে থাকলে কদিন পর সেটা অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন কাজটা না করলেই তার খারাপ লাগে। আরও কিছুদিন যদি সে এর ওপর অটল থাকতে পারে তাহলে সে ইবাদাতের স্বাদ পাওয়া শুরু করে...।

বিজ্ঞ আলিমদের সাথে সম্পর্ক রাখা
শুধু ওয়াসওয়াসা বিষয়ে নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও এটা আপনার পাথেয় হবে। এছাড়া এই রোগের কাউন্সেলিং হিসেবে বিজ্ঞ আলিমদের সাথে পরামর্শ করা উচিত। তাদের মজলিসে উপস্থিত হওয়া আর হক্কানী রব্বানী শাইখের সাথে সম্পর্ক রাখা উচিত। সম্ভব না হলে অন্তত আত্মশুদ্ধির নিয়তে তাদের লেখা প্রবন্ধ অধ্যয়ন করা অথবা সংরক্ষিত বয়ান শোনা উচিত।
ওয়াসওয়াসার প্রতিকার নিয়ে মাসিক আলকাউসার-এর ফেব্রুয়ারি/২০০৯ সংখ্যায় মুফতী তাকি উসমানী হাফিযাহুল্লাহ-এর একটি চমৎকার লেখা অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে, সেটা পড়া যেতে পারে। ৭

ওয়াসওয়াসার বিরুদ্ধে কোনো ভালো কাজ নির্ধারণ করে নেওয়া।
এটা ওয়াসওয়াসা প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী পন্থা, বিশেষত কোনো গুনাহের ব্যাপারে বারবার কুমন্ত্রণা আসলে এটা কার্যকরি।
মনে করুন, নামাজের মাঝে মনে অশ্লীল চিন্তাভাবনা আসে। তাহলে আপনি এমন নিয়ত করে নিন যে, কোন নামাজে এমন হলে আপনি ২ রাকাত সালাত পড়বেন অথবা ১০ বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়বেন, আর সে কাজটা শীঘ্রই করে ফেলুন। শয়তান যখন দেখবে, তার ওয়াসওয়াসার বিপরীতে বান্দা আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হচ্ছে, তখন সে বাধ্য হয়ে আপনাকে ছেড়ে দেবে। প্রাসঙ্গিক একটি হাদীস উল্লেখ করছি—
“আবূ মালিহ একজন (সাহাবী রা.) থেকে বর্ণনা করেন, আমি নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে একই উটের পিঠে সাওয়ার ছিলাম। এমন সময় উটটি লাফালাফি করতে থাকলে আমি বলি, শয়তানের সর্বনাশ হোক! তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি এরূপ বলো না যে, শয়তানের সর্বনাশ হোক! কারণ, তুমি যখন এরূপ বলবে, তখন শয়তান অহংকারে ঘরের মতো ফুলে যায়। আর বলে, আমি খুবই শক্তিমান। বরং তুমি বিসমিল্লাহ বলো। যখন তুমি এরকম বলবে, তখন শয়তান ছোট মাছির মতো (দুর্বল) হয়ে যায়।” ৮

ঘৃণার সাথে শয়তানের উদ্দেশ্যে থুতু ফেলা।
“উসমান ইবনু আবিল আস রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, শয়তান আমার এবং আমার সালাত ও কিরাতের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে তা আমার জন্য এলোমেলো করে দেয়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওটা এক (প্রকারের) শয়তান যার নাম 'খিনজিব'। যখন তুমি তার উপস্থিতি অনুভব করবে তখন (আউযুবিল্লাহ পড়ে) তার কবল থেকে আল্লাহর নামে আশ্রয় নিয়ে তিনবার তোমার বাম দিকে থুতু নিক্ষেপ করবে। তিনি বলেন, পরে আমি তা করলে আল্লাহ আমার থেকে সেটা দূর করে দিলেন।” ৯
মনে ওয়াসওয়াসা অনুভূত হলে আউযুবিল্লাহ পড়ে আপনার বাম দিকে ৩ বার থুতু ফেলুন। এটা শুধু সালাতেই না, ঘুম কিংবা অন্য সময়ে কুমন্ত্রণা আসলেও করতে পারেন। তবে মুখ ভর্তি করে থুতু ফেলার প্রয়োজন নেই, সামান্য থুতুর ছিটা বের হলেই যথেষ্ট।

পবিত্রতা নিয়ে ওয়াসওয়াসা আসলে
আবূ দাউদ শরীফের একটি হাদীস আছে— 'প্রস্রাবের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অধিকাংশ কবরে এ কারণে আযাব হয়।' ১০
অপর হাদীসে এসেছে— 'আব্দুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন গোসলখানায় প্রস্রাব না করে। কারণ, মনের অধিকাংশ ওয়াসওয়াসা এখান থেকেই সৃষ্টি হয়।” ১১
এখানে গোসলখানা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ওযু-গোসলের স্থান। অর্থাৎ যেখানে ওযু-গোসল করা হয়, সেখানে প্রস্রাব করা যাবে না। তবে বর্তমানকালের বাসাবাড়িগুলোতে যেভাবে গোসলখানা আর টয়লেট একসাথে নির্মাণ করা হয়, এসব টয়লেট ব্যবহার করা যাবে; এটা হাদীসে নিষিদ্ধ সুরতের আওতায় পড়বে না। এমনিতে সর্বদা যথাসম্ভব পাকসাফ থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা শয়তানকে আপনার থেকে দূরে রাখবে।

ওযু-গোসল নিয়ে ওয়াসওয়াসার ক্ষেত্রে করণীয়
এতো গেল পবিত্রতা প্রসঙ্গ। ওযু গোসল নিয়ে একটু ওয়াসওয়াসা আসতেই পারে, পাত্তা দেয়া যাবে না। আর যদি সমস্যা পেছনে লেগেই থাকে, তবে এক্ষেত্রে দুই ধরণের পরিস্থিতি দেখা যায়, এক. যদি আপনার সবসময় ওযুর শেষে মনে হয়, আমি সম্ভবত হাত ধুইনি বা পা ধুইনি! এক্ষেত্রে কয়েকদিন একটু খেয়াল করে ওযু করবেন। অর্থাৎ প্রথম নিশ্চিত হয়ে নিবেন যে আপনার ওযু বা গোসল ঠিকভাবে হচ্ছে কি না। তাড়াহুড়া না করে, একটু স্থিরতার সাথে খেয়াল করে ওযু করবেন "এই যে আমি হাত ধুয়েছি, এই যে আমি মুখ ধুয়েছি, এই যে পা ধুয়েছি।” এভাবে কয়েকদিন ওযু করলে ইনশাআল্লাহ ওয়াসওয়াসা চলে যাবে। দুই. এভাবে খেয়াল করে ওযু করার পরেও যদি মনে হয় 'হাত মনে হয় ভালভাবে ধোয়া হল না, মুখে মনে হয় একটু যায়গা ফাঁকা আছে' তাহলে আপনি সর্বনিম্ন একবার এবং সর্বোচ্চ তিনবার কোন অঙ্গ ধৌত করবেন। এর বেশি আর না। তিনবার ধোয়া শেষ , এরপর আপনি চিন্তা করবেন 'ব্যাস! আমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট, বাকিটা আল্লাহর হাতে। আল্লাহ সাধ্যের বেশি কাউকে চাপিয়ে দেন না।' তাই মনে চাইলেও এথেকে বিরত থাকবেন।

এই দুআটি বেশি বেশি পড়া-
أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ ، مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ وَشَرِّ عِبَادِهِ ، وَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِيْنِ ، وَأَنْ يَحْضُرُونِ
উচ্চারণ: আ'উযু বিকালিমা-তিল্লাহিত্তা-ম্মাতি মিন গাদ্বাবিহি ওয়া 'ইক্কা-বিহি ওয়া শাররি 'ইবা-দিহ, ওয়ামিন হামাযা-তিশশায়া-তিনি ওয়া আই-ইয়াহদুরূন।
অর্থ: আমি আশ্রয় চাই, আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামসমূহের দ্বারা তাঁর ক্রোধ থেকে, তাঁর শাস্তি থেকে এবং তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট থেকে, আর শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে এবং তাদের উপস্থিতি থেকে।
খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুআটি শিখিয়েছিলেন। ১২ এছাড়াও অনেক সাহাবী থেকে এই দুআটি বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সময়ে শয়তান থেকে বাঁচতে তাদের এই দুআটি পড়তে বলেছেন।
শাইখ ওয়াহিদ আব্দুস সালাম পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিভিন্ন প্রকার শয়তানি থেকে নিরাপত্তা চেয়ে উল্লেখিত দুয়াটি যেন সকাল-সন্ধ্যায় ৩বার করে পড়া হয়।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা প্রায় কাছাকাছি শব্দে দুআ করতে শিখিয়েছেন-
وَقُل رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ
"বলো, হে আমার প্রভু, শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই, আর আমার প্রভু, তোমার কাছে আশ্রয় চাই তাদের উপস্থিতি থেকেও।” ১৩
একজন আলিম বলছিলেন, সকাল-সন্ধ্যায় সূরা মুমিনুনের এই দুটি আয়াত (রব্বি থেকে ইয়াহদুরূন পর্যন্ত) ৩ বার পড়া ওয়াসওয়াসা রোগ থেকে মুক্তিতে সহায়ক।

শয়তানের ওয়াসওয়াসা অনুভব করলে আপনি হাদীসের দুআ অথবা কুরআনের আয়াতটি পড়ুন, গুনাহের ব্যাপারে কুমন্ত্রণা আসলেও এটি পড়ুন। সালাতের মধ্যে বা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে ওয়াসওয়াসার সমস্যা হলে সেই সময়ে বা নিকটবর্তী সালাতের পর পড়ুন। শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার আরও একটি দুআ হচ্ছে-
أَعُوذُ بِاللَّهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنْ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْثِهِ
“আমি আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান থেকে পানাহ চাই; তার কুমন্ত্রণা থেকে, তার অহংকার এবং তার খারাপ অনুভূতি থেকে।” ১৪

আয়াতুল হারক তিলাওয়াত করা
আয়াতুল হারক অর্থাৎ জাহান্নাম, আযাব এবং শাস্তি-সংক্রান্ত কুরআনের আয়াতগুলো তিলাওয়াত করা এবং শোনা। শোনার চেয়ে তিলাওয়াত করায় অনেক বেশি প্রভাব পড়ে। একাধিক অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে, আয়াতুল হারক গুনাহের ওয়াসওয়াসায় ভোগা রোগীদের জন্য, ইবাদাত নিয়ে ওয়াসওয়াসায় ভোগা রোগীদের জন্য বিশেষ উপকারি। কাজেই আয়াতুল হারক তিলাওয়াত করা এবং তার তিলাওয়াত শোনা নিয়মতান্ত্রিকভাবে অব্যাহত রাখা অনেক ফলপ্রসূ হবে ইনশাআল্লাহ। এছাড়াও আপনি কোনো ওয়াসওয়াসা রোগীর ওপর রুকইয়াহ করতে চাইলে আয়াতুল হারক দিয়ে করতে পারেন।

রুকইয়ার পানি খাওয়া, তেল ব্যবহার করা
পানিতে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস, সূরা মুমিনুন: ৯৬- ৯৭, কিছু আয়াতুল হারক এবং কিছু দুআ (ওপরের পয়েন্টগুলো দ্রষ্টব্য) তিন বার অথবা সাত বার পড়ুন এবং পানিতে ফুঁ দিয়ে সকাল-বিকাল ওয়াসওয়াসা রোগ থেকে মুক্তির নিয়তে পান করুন। অলিভ অয়েল বা অন্য কোন তেলে ফুঁ দিয়ে বুকে মালিশ করুন।

হিজামা করানো
শুধু হিজামা করানোর কথা বলা হচ্ছে না; বরং ওয়াসওয়াসা রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার নিয়তে হিজামা করানো। অর্থাৎ হিজামা করার সময় এই নিয়ত করতে হবে যে, আমি ওয়াসওয়াসা রোগের জন্য হিজামা করাচ্ছি। এক্ষেত্রে যিনি আপনার হিজামা করবেন, তাকে জানিয়ে রাখবেন, আমি ওয়াসওয়াসা রোগের জন্য হিজামা করতে চাচ্ছি। আপনি এবং তিনি হিজামার সময় এটাই নিয়ত করে নেবেন।

জিনের সমস্যা আছে কি না যাচাই করা
যদি কেউ জিন দ্বারা কোনোভাবে আক্রান্ত হয় তাহলে তার ওয়াসওয়াসা বেড়ে যায়। শুধু জিন আসর করলে অথবা জিন দিয়ে জাদু করলেই এমনটা হয় তা নয়; বরং জিনের নজর লাগলেও এই সমস্যা হয়। বরং জিনের নজরের কারণেই বেশি হয়। এমনকি পরিবারের কারও জিনের সমস্যা থাকলে অন্যদের ওয়াসওয়াসা বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রয়োজনে আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ কোনোভাবে জিন দ্বারা আক্রান্ত কি না, যাচাই করে দেখা উচিত। যদি সমস্যা থাকে তাহলে সঠিকভাবে রুকইয়াহ করলে জিনের সাথে ওয়াসওয়াসার সমস্যাও চলে যাবে ইনশাআল্লাহ।

অন্যান্য আমল
ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার জন্য আরও কিছু আমলের কথা আলিমরা বলে থাকেন। যেমন: প্রতিদিন সাজদার আয়াত রয়েছে- এরকম কোনো সূরা তিলাওয়াত করা এবং সাজদার আয়াত পড়া হলে সাজদা করা। তিলাওয়াতের সেজদা আদায় করা শয়তানকে দুর্বল করে দেবে এবং আপনার থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। সেজদার আয়াত সম্বলিত কিছু ছোট বা মাঝারি আকারের সূরা হচ্ছে: সূরা সাজদা (২১পারা), সূরা সোয়াদ (২৩পারা), সূরা হা-মীম সাজদা (২৪পারা), সূরা নাজম (২৭পারা), সূরা ইনশিকাক এবং সূরা আলাক (৩০পারা)
“আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন আদম সন্তান সাজদার আয়াত পড়ে সাজদা করে, তখন শয়তান কাঁদতে কাঁদতে দূরে সরে যায় এবং বলে, আমার দুর্ভোগ, আদম সন্তানকে সাজদা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর সে সাজদা করছে, ফলে তার জন্য রয়েছে জান্নাত। আর আমাকে সাজদা করার নির্দেশ করা হয়েছে, আমি তা অমান্য করছি, ফলে আমার জন্য রয়েছে জাহান্নাম।” ১৫
এছাড়া স্বাভাবিকভাবেই সালাতের সাজদা দীর্ঘায়িত করা ওয়াসওয়াসা দূর করতে উপকারি।

আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা
সব ধরনের চেষ্টার পরও একান্ত যদি চিন্তার উৎপাত বন্ধ না হয় তাহলে এই কষ্টের ওপরই সন্তুষ্ট থাকুন এবং সবর করুন। কারণ, আপনার সম্পর্কে এটাই আল্লাহর ফায়সালা। এটাই আপনার তাকদীর।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, অমুকের তো এই সমস্যা নেই। সে কত শান্তিতে আছে! আর আমি সব অনাহূত ভাবনায় আক্রান্ত। এই হালতের জন্য কি আমিই উপযুক্ত ছিলাম? এই অস্থিরতার অনলে আমাকেই কেন দগ্ধ হতে হবে?
প্রিয় পাঠক, মনে রাখতে হবে, এটা অস্থিরতা ও ধৈর্য্যহীনতা। আপনার সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে সেটাই আপনার জন্য উপযোগী, আর অন্যের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা অন্যের জন্য উপযোগী। তাই আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর ধৈর্যধারণ করুন। আর এ কারণে যে কষ্ট হয়, সে ব্যাপারে ভাবুন, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হচ্ছে। এর ফলাফল হবে এরকম-এসব চিন্তা আপনার কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না; বরং কষ্টের ওপর সবর করার কারণে সওয়াব পাবেন এবং আল্লাহর কাছে আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি হবে।
عَنْ صُهَيْبٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
“সুহাইব রাযিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “মুমিনের ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি কাজে তার জন্য কল্যাণ রয়েছে। এটা মু'মিন ব্যতীত অন্য কারও জন্য নয়। যদি তার সুখের সময় আসে, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে এটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তার প্রতি দুঃখ-কষ্ট পৌঁছায়, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” ১৬

শেষ কথা: ওয়াসওয়াসা রোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে নিজের পক্ষ থেকে সার্বিকভাবে চেষ্টা করা এবং আল্লাহর কাছে দুআ করতে থাকা উচিত। এটা শুধু ওয়াসওয়াসার বিষয়েই নয়; বরং সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কিছু ভাই সালাতের রাকাত ভুলে যান এবং তারা এটা নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা করেন। অথচ তাদের উচিত ছিল, সালাত শেষ করে দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে নিজ সমস্যার জন্য দুআ করা।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
“আর শয়তান যদি তোমাকে খোঁচা (ওয়াসওয়াসা) দেয় তাহলে তুমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও। নিঃসন্দেহ তিনি স্বয়ং সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” ১৭
তাই আমাদের উচিত আল্লাহর কাছে ক্রমাগত দুআ করতে থাকা। নিজের জন্যও দুআ করা, অন্যদের জন্যও দুআ করা। অন্য মুসলমান ভাইদের জন্য দুআ করলে ফেরেশতারা আপনার জন্য দুআ করবে।
আল্লাহ যেন আমাদেরকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করেন। আমীন।

টিকাঃ
১. সূরা নিসা, আয়াত: ৩১
২. সূরা তাগাবুন, আয়াত: ১৬
৩. মুসনাদে আহমাদ: ২১৫২৪
৪. মুসলিম: ১৯৫
৫. মুসলিম: ১৯৪
৬. সূরা হাদীদ, আয়াত: ৩
৭. অনলাইনে লেখাটি পড়তে এই লিংকে প্রবেশ করুন: t.ly/waswasal
৮. আবূ দাউদ: ৪৯৮২
৯. মুসলিম: ৪০৮৩
১০. মুসতাদরাকে হাকিম: ৬৭৯
১১. নাসাঈ : ২৭
১২. মুয়াত্তা মালিক: ১৭৭২
১৩. সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৯৬-৯৭
১৪. তিরমিযী: ২৪২
১৫. মুসলিম: ৮১
১৬. মুসলিম: ৫৩১
১৭. সূরা হা-মীম সাজদা, আয়াত: ৩৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00