📄 আসক্ত বা বশ করার জাদু
এই সমাজে প্রচলিত সবচেয়ে জঘন্য জাদুগুলোর একটি হচ্ছে 'আসক্ত বা বশ করার জাদু'। অর্থাৎ জাদুর মাধ্যমে কাউকে নিজের প্রতি আসক্ত বা অনুগত বানিয়ে নেওয়া। এটা সাধারণত পরিচিতজনদের মধ্যে কেউ করে থাকে।
কখনো সন্দেহপ্রবণ স্ত্রী জাদু করে। কখনো-বা সম্পদের লোভে পুত্র বা রক্ত সম্পর্কের কেউ করে। এই জাদুর সবচেয়ে জঘন্য ব্যবহার হচ্ছে, কাউকে জোর করে বিয়ে করার জন্য এই জাদু করা হয়। কখনো তাবীজের নামে, কখনো তদবীরের নামে, কখনো-বা দুআ-কালামের নামে ভণ্ড কবিরাজরা সামান্য টাকার লোভে এই জাদু করে থাকে। সাধারণ মানুষ ইসলামী ওযীফা ভেবে গ্রহণ করে, দুনিয়া এবং আখিরাতে সর্বনাশ করে।
তবে এই জাদু সবচেয়ে বেশি করে 'হিংসুক স্ত্রী এবং শাশুড়িরা'। স্ত্রী জাদু করে এজন্য যে, স্বামী যেন শুধু তার কথাই শোনে অন্য কারও কথা না শোনে, আর শাশুড়ি নিজ ছেলেকে জাদু করে, যেন ছেলে স্ত্রীর কথা না শুনে শুধু মায়ের কথা শুনে। ১
প্রিয় পাঠক, খেয়াল রাখা উচিত, এটা অনেক বড় গুনাহ। শুধু গুনাহই নয়; বরং ঈমান বিধ্বংসী একটি কাজ। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, নিশ্চয় মন্ত্রপাঠ, তাবীজ-কবচ এবং বশ করার জাদু শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ২
সুতরাং আমাদের সাবধান হওয়া উচিত।
তবে এই আলোচনাতেও আমরা স্বামী-স্ত্রীর কথা উল্লেখ করে বলব। পাঠক সে অনুযায়ী অন্যদের সাথে মিলিয়ে নেবেন।
ক. বশ করার জাদুর লক্ষণ
১. সবসময় স্ত্রীর চিন্তা মাথায় ঘোরা, অন্যকিছুতে মন দিতে না পারা।
২. সবসময় স্ত্রীকে দেখতে ইচ্ছা হওয়া, বাড়ির বাইরে থাকতে না পারা। বাড়িতে থাকলে সারাদিন স্ত্রীর পিছুপিছু ঘোরা।
৩. যখন-তখন স্ত্রীর সঙ্গে শুধু সঙ্গম করতে ইচ্ছে হওয়া। সারাদিনে এই চিন্তা মাথায় ঘোরা। সহবাসের ব্যাপারে অধৈর্য হয়ে যাওয়া।
৪. বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই কারও প্রতি অতিরিক্ত অনুরক্ত হয়ে যাওয়া।
৫. যাকে পছন্দ করতেন না বা পাত্তা দিত না, হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই তার প্রতি তীব্র ভালোলাগা শুরু হয়ে যাওয়া।
৬. কোনো বাছ-বিচার ছাড়াই স্ত্রীর কথা অন্ধের মতো মানতে শুরু করা। পরে যদিও-বা কখনো এটা বুঝতে পারে, তারপরও অজানা কারণে তার প্রতি নিজেকে বাধ্য মনে হওয়া।
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, প্রচলিত জাদুগুলোর মধ্যে এই জাদুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উল্টাপাল্টা প্রভাব হয়। কারণ, জাদুর পানীয় বা 'পোশন' তৈরি বেশ কঠিন কাজ আর এই জাদুতে বেশি পরিমাণে পোশন ব্যবহার হয়। ফলে বেশিরভাগই এখানে ভুল করে আর বিভিন্ন ক্ষতি হয়ে যায়। যেমন:
১. কখনো আসক্ত হওয়ার বদলে বিরক্তিকর মনোভাব বেড়ে যায়। এমনকি অনেক সময় সকল মেয়ে মানুষের প্রতি ঘৃণা চলে আসে।
২. এই বিপরীত প্রভাবের জন্য কেউ হুট করে বউকে তালাকও দিয়ে দেয়।
৩. কখনো স্ত্রী বাদে বাকি সবাই—যেমন: ভাই-বোন, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনদের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে যায়।
৪. এর প্রভাবে মানুষ কখনো একদম পাগল হয়ে যায়। কেউ একদম পাগল না হলেও প্রায় পাগলের মতো আচরণ করে।
৫. এর প্রভাবে কখনো মারাত্মক অসুস্থ হয়ে যায়। তখন কাজকর্ম তো দূরের কথা, বিছানা থেকেই উঠতে পারে না। আর এজন্য ডাক্তারের চিকিৎসা করেও তেমন কোনো উপকার হয় না।
এই জঘন্য জাদুর কারণে এমন অনেক উল্টাপাল্টা সমস্যা হয়ে থাকে।
এই জাদুর ক্ষেত্রে সাধারণত জাদুর পানীয় বা মিষ্টি কোনো দ্রব্যের ওপর মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিয়ে সেটা খাওয়ানো হয়। হাঁটাচলার রাস্তায় জাদুর পানীয় ঢেলে দেওয়া হয়, যা অতিক্রম করলে জাদু-আক্রান্ত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আশা করা যায়, সেলফ রুকইয়াহ খুব ভালোভাবেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। কখনো ব্যবহৃত জামা কাপড়ের অংশ দিয়ে জাদু করা হয়। সেক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে দুআ করতে হবে, আর রুকইয়ার সময় নিয়ত করতে হবে, যেন জাদু নষ্ট হয়ে যায়। এই জাদুর একটা জঘন্য দিক হচ্ছে, স্ত্রীর শরীরের ময়লা বা হায়েযের রক্ত দিয়ে জাদু করা হয়। এরপর স্ত্রীকে বলা হয়, এই নোংরা বস্তুটা কোনো খাবারের সাথে মিশিয়ে স্বামীকে খাইয়ে দিতে।
এই জাদুতে কেউ আক্রান্ত হলে সাধারণত এমনিতেই বোঝা যায়। সমস্যা কম থাকলে নিজের মানসিকতায় অদ্ভুত পরিবর্তন দেখে নিজেই টের পায় অথবা আশেপাশের অন্যরা হঠাৎ অদ্ভুত পরিবর্তন দেখে আঁচ করতে পারে। তবে সচরাচর এই জাদু যেহেতু স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই করা হয়, তাই পাপিষ্ঠ ব্যক্তি চাইবে তাড়াতাড়ি উদ্দেশ্য সাধন করে ফেলতে। তাই যদি কেউ অতিমাত্রায় আক্রান্ত হয়ে যায় তাহলে অন্যদের উচিত হবে, যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার পদক্ষেপ নেওয়া।
এখানে একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, সাধারণত পরিচিত আত্মীয়স্বজন বা নিজের ঘরের মানুষই জাদুটা করে। তাই আপনি চিকিৎসা করছেন, এটা যেন অন্যরা জানতে না পারে। জানলে আবার জাদু করার সম্ভাবনা আছে। এজন্য সতর্ক থাকতে হবে। এটা নিয়ে গল্পগুজব করা যাবে না। এমনকি সুস্থ হওয়ার পরেও না।
এই বিষয়টা নিজের জন্য রুকইয়াহ করলে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। আর অন্য কারও ওপর রুকইয়াহ করলে তাকেও সতর্ক করে দেবেন।
খ. আসক্ত করার জাদুর জন্য রুকইয়াহ
জাদুর রুকইয়ার স্বাভাবিক নিয়মেই করবেন, তবে রুকইয়ার অন্য আয়াতগুলোর সাথে এই আয়াতগুলোও পড়তে পারেন-
১. সূরা বাকারা: ১৬৫, ১৬৬
دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَ وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ إِيا
الَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْ يَرَوْنَ الْعَذَابَ أَنَّ الْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ )
إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتَّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ )
২. সূরা ইউসুফ: ৩০
وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي الْمَدِينَةِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ تُرَاوِدُ فَتْهَا عَنْ نَّفْسِهِ قَدْ شَغَفَهَا حُبًّا إِنَّا لَنَرَاهَا فِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ)
৩. সূরা তাগাবুন: ১৪, ১৫, ১৬
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَ إِنْ تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَ أَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللَّهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَ اسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنْفِقُوا خَيْرًا لِأَنْفُسِكُمْ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ )
রুকইয়াহ শেষে নিচের পরামর্শ অনুসরণ করতে বলুন আর ৩ সপ্তাহ পর আপডেট জানাতে বলুন, প্রয়োজনে আবার একই প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিন। ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।
গ. প্রেসক্রিপশন
একটা বোতলে পানি নিয়ে আয়াতুল কুরসী, সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১- ৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯, সূরা তাগাবুন: ১৪-১৬ আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দিন। এরপর চাইলে উপরের আয়াতগুলোও পড়তে পারেন।
১. তিন সপ্তাহ সকাল-বিকাল এই পানি খাবেন। মাঝেমাঝে গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করবেন।
২. প্রতিদিন অন্তত একঘণ্টা রুকইয়াহ শুনবেন। এক্ষেত্রে কোনো সাধারণ রুকইয়াহ এবং সূরা তাগাবুন কয়েকবার শুনতে পারেন। সম্ভব হলে নিজে তিলাওয়াত করুন। সময় কম থাকলে শুধু সূরা তাগাবুন কয়েকবার পড়তে বা শুনতে পারেন।
৩. এছাড়া “রুকইয়াহ যিনা” নামক রুকইয়ার অডিওটি, সূরা ইউসুফ এবং সূরা নূর এক্ষেত্রে বেশ উপকারি। জাদুর সমস্যা প্রকট অথবা বেশিদিনের পুরোনো হলে কিংবা সাথে জিনের সমস্যাও আছে মনে হলে এই রুকইয়াগুলোও শুনবেন। সম্ভব হলে নিজে কিছুটা তিলাওয়াত করবেন।
৪. এছাড়া সিহরের কমন রুকইয়ায় বলা বাকি পরামর্শগুলো অনুসরণ করবেন।
ঘ. বশ করার জাদুর কিছু ঘটনা
ঘটনা-১: প্রথম ঘটনা মিসরের। আমরা বলেছিলাম, এই জাদুতে সবচেয়ে বেশি উল্টাপাল্টা হয়। এক মহিলা তার স্বামীকে বশ করার জাদু করতে কবিরাজের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু জাদু উল্টা কাজ করেছিল, ফলে তার স্বামী হঠাৎ করেই প্রচণ্ড রাগারাগি শুরু করে দেয়। এমনকি সব মেয়ে লোকদের ঘৃণার চোখে দেখা শুরু করে এবং কয়েকদিন না যেতেই ওই মহিলাকে তালাক দিয়ে দেয়।
ঘটনা-২: এক মাদরাসা সুপারের ঘটনা। কোনোভাবে এক মাজারভক্ত লোকের সাথে তার পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। চলা-ফেরা, খাওয়া-দাওয়া একসাথে হতে থাকে। আর পরিবারের লোকদের সাথে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। ওই লোকের সাথে যেদিন দেখা হতো, সেদিন তিনি বাসায় ফিরে অন্যদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন। বাড়ির সবাই নিষেধ করলেও তিনি কারও কথাই শোনেন না। এরই মধ্যে বিদআতি লোক তার পরিবারের নামে আজেবাজে কথা ছড়ানো শুরু করলে পরিবারের বড় ছেলে সালিশ ডাকে। সেদিন সুপার সাহেবকে অদ্ভুত বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। সালিশে ওই লোক সবার কাছে মাফ চায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে না বলে ওয়াদা করে। কিন্তু এক মাস না যেতেই দেখা গেল তাদের মধ্যে আবারও যোগাযোগ হচ্ছে। তখন পরিবারের সবার জেরার মুখে মাদরাসা সুপার সাহেব ব্যাপারটা স্বীকার করেন। কান্নাকাটি করে বলেন যে, ওই লোকের সঙ্গে কথা না বললে তার শান্তি লাগে না, রাতে স্বপ্নে দেখেন যোগাযোগ করার জন্য... ইত্যাদি। এ-ও বলেন যে, ঘরের কারও জন্য তার কোনো রকম ভালোবাসা বা টান অনুভব হয় না। তাদের দেখলে বরং মেজাজ খারাপ হয়।
এরপর রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপ থেকে পরামর্শ নিয়ে তাকে রুকইয়াহ শোনানো হলে বুক ধড়ফড় করে, প্রচুর ক্লান্তি আর ঘুম অবশ লাগে। তখন ধারাবাহিকভাবে সাত দিন রুকইয়াহ শোনা এবং গোসল করার পর আলহামদুলিল্লাহ তার অবস্থার উন্নতি হয়। ওই লোকের প্রতি আসক্তি চলে যায়। পরিবারের লোকদের সঙ্গে ঝামেলা থেমে যায়। এরপর সমস্যা একদম দূর হওয়ার জন্য তাকে আরও একসপ্তাহ রুকইয়াহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়, আর বলা হয়, যেন প্রতিদিনের মাসনূন আমল গুরুত্বের সাথে করে।
বিদআতিরা এমন বহুভাবে সমাজ কলুষিত করে থাকে। সত্যি বলতে, এদের মধ্যেই কুফরী জাদুর চর্চা সবচেয়ে বেশি। এদের দ্বারাই মুসলমানদের মধ্যে কুফরী তাবীজ-কবচের চর্চা বিস্তার লাভ করেছে। এমনকি অনেক ভণ্ডপীর শিন্নির মধ্যে বশ করার মন্ত্র পড়ে রাখে, ফলে সেটা খেলে মানুষ ওই পীরের ভক্ত হয়ে যায়। এজন্য বিদআতিদের অনুষ্ঠানে যাওয়া অথবা তাদের মিষ্টান্ন গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্নরুপে বিরত থাকা উচিত। আল্লাহ যেন উম্মতকে এদের ফিতনা থেকে হেফাজত করেন, আমীন।
টিকাঃ
১. 'তিওয়ালা' শব্দের অর্থ 'আসক্ত বা বশ করার জাদু, বশ করার জাদুর পানীয় বা Love potion'। মুহাদ্দিসীনে কিরাম এরকমই বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ: ইবনুল আসীর রহ.-এর বক্তব্য দেখা যেতে পারে-নিহায়া: ১/২২২। এছাড়া মোল্লা আলী কারী রহ. এবং ইমাম খাত্তাবী রহ.-ও অনুরূপ অর্থ করেছেন।
২. আবূ দাউদ: ৩৮৮৩
📄 পাগল বানানো বা মস্তিষ্ক বিকৃতির জাদু
পড়ালেখা নষ্ট করা এবং পাগল বানানোর জন্য মূলত একই জাদু করা হয়। এই জাদুর ক্ষেত্রে প্রায়ই জিনের সাহায্য নেওয়া হয়। তাই এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে অন্য কেউ রুকইয়াহ করলে সবচেয়ে ভালো হয়। এরপর প্রয়োজন হলে পরিবারের লোকদের তত্ত্বাবধানে রুকইয়াহ করার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। তবে সহায়তা করার মত কাউকে না পেলে নিজেই শুরু করে দেয়া উচিত। মানুষের ওপর এই জাদুর প্রভাব সাধারণত ধীরে ধীরে পড়ে। ধাপে ধাপে এর লক্ষণগুলো প্রকট হয় এবং এক পর্যায়ে জাদুগ্রস্ত ব্যক্তি পাগল হয়ে যায়। তাই যত দ্রুত চিকিৎসা করা যায়, ততই ভালো।
ক. পাগল বানানোর জাদুতে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ
১. পড়ালেখায় আগে ভালো থাকলেও হুট করে সবকিছুতে ধ্বস নামা। পরীক্ষা আসলেই অসুস্থ হয়ে যাওয়া।
২. এক জায়গায় অল্পক্ষণ থাকলেই অধৈর্য হয়ে যাওয়া। কোনো কাজ ধীরস্থিরভাবে করতে না পারা।
৩. কাজকর্মে, কথাবার্তায় ভুলভ্রান্তি বেড়ে যাওয়া। ওয়াসওয়াসা বেড়ে যাওয়া।
৪. নিজের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অতিরিক্ত উদাসীন থাকা। অকারণে ময়লা বা ছেঁড়া জামাকাপড় পরতে ইচ্ছা হওয়া।
৫. চোখের অবস্থা অস্বাভাবিক বা অসুন্দর হয়ে যাওয়া।
৬. কোনো কারণ ছাড়াই হাঁটতে থাকা। হঠাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া। অথবা কার্যত না করলেও বারবার এমন ইচ্ছা জাগা।
৭. মাঝেমধ্যে একদম পাগলের মতো আচরণ করা। বিশেষত প্রতিদিন বিকেলের পর, পূর্ণিমা কিংবা অমাবস্যার রাতে।
৮. ঠিকমত ঘুমাতে না পারা, সারারাত ঘুম না আসা।
৯. সামান্য ঘুমালেও ভীতিকর স্বপ্ন দেখা। যেমন: কেউ তাকে ধাওয়া করছে, অথবা অদৃশ্য থেকে কেউ ডাকছে।
১০. স্বপ্নে যা দেখে, এটা জাগ্রত অবস্থায়ও ঘটতে পারে। উদাহরণস্বরূপ: এরকম মনে হওয়া যে, কেউ তাকে ডাকছে, অথচ অন্যরা কিছুই শুনতে পায়নি। এগুলোর পাশাপাশি জিন-আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণ, ওয়াসওয়াসা রোগ এবং জাদুর সাধারণ লক্ষণগুলোর সাথেও অবস্থার মিল পাওয়া যেতে পারে।
খ. পাগল বানানোর জাদুর জন্য রুকইয়াহ
সাধারণ নিয়মে রুকইয়াহ করবেন। তবে এই জাদুর রোগীর ওপর রুকইয়ার সময় প্রচণ্ড ব্যাথার কারণে অনেক চিৎকার বা কান্নাকাটি করতে পারে, অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, এব্যাপারে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন। আর সেলফ রুকইয়াহ করার সময়েও কাউকে পাশে রাখা উচিত, যেন প্রয়োজনে তার সহযোগিতা পাওয়া যায়। আর এই জাদুতে আক্রান্ত রোগীর অবস্থা অনেক সময় খুব খারাপ হয়ে যায়। তাই এমনিতেই বাইরের কারও সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে পরামর্শ হচ্ছে, একা একা রুকইয়াহ না করা। অন্তত অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য বা রোগীকে ধরে রাখার জন্য হলেও কোনো একজনকে সাথে রাখা।
সাথে সুরা কলামের শেষ দুই আয়াতও পড়তে পারেন-
وَإِنْ يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ )
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
রুকইয়ার পর রোগীকে নিচের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করতে বলুন। আর এক মাস অথবা দেড়মাস পর অবস্থা জানাতে বলুন, প্রয়োজনে আবার ভালোভাবে রুকইয়াহ করে একই সাজেশন দিয়ে দিন।
গ. প্রেসক্রিপশন
১. এক থেকে দেড় মাস প্রতিদিন বেশি বেশি রুকইয়াহ শুনবেন। বিশেষত ৮ সূরা (সূরা ইয়াসিন, সফফাত, দুখান, জিন, যিলযাল, ইখলাস, ফালাক, নাস)-এর রুকইয়াহ করবেন। পাশাপাশি সূরা বাকারা, হিজর, হা-মীম সাজদা, ফাতাহ, কাফ, আর-রহমান, মুলক এবং আলা পড়বেন। সব মিলিয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩-৪ ঘণ্টা রুকইয়াহ শুনবেন। যদি আরও বেশি শুনতে পারেন, তবে আরও ভালো।
২. পাশাপাশি সূরা ফাতিহা, সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯, ইখলাস, ফালাক এবং নাস-তিনবার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে দিন। এই পানি প্রতিদিন দুই বেলা খাবেন। আর গোসলের পানিতে কিছুটা মিশিয়ে গোসল করবেন।
৩. আয়াতগুলো পড়ে অলিভ অয়েলে ফুঁ দিন। প্রতিদিন ঘুমের পূর্বে পুরো মাথায় ওপরে ব্যবহার করবেন। (মেয়েদের পুরো চুলে দেয়া আবশ্যক না)
ঘ. লক্ষণীয় কিছু বিষয়
১। যদি ইতিমধ্যেই ব্রেইনের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়, তবে অবশ্যই রুকইয়ার পাশাপাশি দ্বীনদার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করাবেন। চাইলে অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে মাথায় হিজামা করাতে পারেন। ইনশাআল্লাহ উপকার হবে।
২। এই জাদুর জন্য রুকইয়াহ চলাকালীন দিনগুলোতে কোনো পেইন কিলার বা ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। এতে ক্ষতি হতে পারে।
৩। রুকইয়াহ শোনার সময় কষ্ট হতে পারে; প্রচণ্ড মাথা ব্যথা হতে পারে, তবুও রুকইয়াহ বাদ দেওয়া যাবে না, সবরের সাথে চিকিৎসা করে যেতে হবে। কিছুদিন ঠিকভাবে রুকইয়াহ করা হলেই আস্তে আস্তে কষ্ট কমে আসবে ইনশাআল্লাহ। বেশি খারাপ লাগলে রুকইয়ার পানি দিয়ে গোসল করলে অথবা মাথায় পানি ঢাললে আরাম পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
৪। এই জাদুর চিকিৎসা চলাকালীন রুকইয়াহ শুনতে শুনতে অনেক রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়, জিন ভর করে আবোল তাবোল বকতে থাকে। এ ক্ষেত্রে রুকইয়াহ বন্ধ করা যাবেনা, শুনিয়ে যেতে হবে। আর জিন কথা বললে তাকে চলে যেতে নির্দেশ দিতে হবে।
৫। অনেকে রোগীই রুকইয়াহ শুনতে চায় না, এক্ষেত্রে কৌশলে বা জোর করে হলেও শোনাতে হবে। সমস্যা কমে আসলে নিজ ইচ্ছাতেই শুনবে ইনশাআল্লাহ।
৬। সমস্যা সম্পূর্ণ ভাল হতে ৩-৪ মাসও লাগতে পারে। এক্ষেত্রে সবরের সাথে রুকইয়াহ করে যেতে হবে। আর সমস্যা ভালো হওয়ার পরও অন্তত দুই-তিন সপ্তাহ রুকইয়াহ শুনে যেতে হবে। এবং আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করতে হবে।
৭। এই জাদুতে আক্রান্ত অনেক রোগী হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে যায়, ভাঙচুর করে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের লোকদের কর্তব্য হবে ভয় না পেয়ে রোগীকে সামলানো। আর সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, আয়াতে শিফা ইত্যাদি পড়া। সম্ভব হলে মাথায় হাত রেখে পড়া অথবা পড়া শেষে ফুঁ দেওয়া। চোখে মুখে রুকইয়ার পানি ছিটানো, রুকইয়ার পানি দিয়ে মাথা ধৌত করা, ওযু করিয়ে দেওয়া।
লক্ষণীয়: কিছু জাদুতে আক্রান্ত হলে মানুষ একদম একা বা অন্তর্মুখী হয়ে যায়। কারও সাথে কথা বলে না, কোনো প্রয়োজন বা সমস্যায় পড়লেও কাউকে জানায় না। আস্তে আস্তে পাগল হয়ে যায় বা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এসব ক্ষেত্রেও একই চিকিৎসা দেওয়া উচিত।
ঙ. পাগল বানানোর/পড়ালেখা নষ্টের জাদুর কিছু ঘটনা
ঘটনা-১: আমার একজন নিকটাত্মীয়া এই জাদুতে আক্রান্ত ছিল। দিন দিন তার অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। বহু রকম শারীরিক এবং মানসিক রোগের ডাক্তার দেখিয়েও কোনো লাভ হচ্ছিল না। দেশ-বিদেশের অনেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা করা হয়েছিল। এতে অবস্থার সাময়িক উন্নতি হলেও বিশেষ কোনো ফায়দা হচ্ছিল না। সার্বিক বিবেচনায় অবনতিই দেখা যাচ্ছিল। এমনকি ডাক্তার ৬ মাসের জন্য তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হতেও পরামর্শ দিয়েছিল। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, অন্যান্য সময় ওষুধ খেয়ে কিছুটা ভালো থাকলেও যখনই তার পরীক্ষা আসত তখন যেন সারা দুনিয়ার সব সমস্যা এসে তার ওপর ভর করত। নিচের ক্লাসগুলোতে বৃত্তি পেলেও কলেজে তার জন্য পরীক্ষায় পাশ করাটাই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। প্রায় প্রতিটা পরীক্ষাতেই একাধিক বিষয়ের মানোন্নয়ন পরীক্ষা দেওয়া লাগত। এসব কারণে হতাশ হয়ে সে কত বার যে সুইসাইডের চেষ্টা করেছে—আল্লাহই ভালো জানেন।
কবিরাজদের কাছেও কম দৌড়ানো হয়নি। তবে ফলাফলের ঘরে ক্ষতি আর অবনতি ছাড়া কিছুই জমছিল না। আল্লাহর রহমতে সে এক পর্যায়ে রুকইয়াহ শারইয়্যাহ বিষয়ে জানতে পারে। শুরুতে কিছুদিন বদনজরের রুকইয়াহ করায় অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, কেউ জাদু-আক্রান্ত হলে সহজেই তার নজর লেগে যায়; তাই হয়তো এমনটা হয়েছে। এরপর জাদুর জন্য কয়েকমাস রুকইয়াহ করার পর আল্লাহর রহমতে সে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছে।
আল্লাহ যেন তাকে সবগুলো সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করেন। আমীন।
ঘটনা-২: এই ঘটনা মিসরের। এক যুবক বিয়ের রাতে হঠাৎ করেই যৌন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং এর কিছুদিন পরই সে পাগল হয়ে যায়। সমস্যা মূলত ছিল, তার স্ত্রী তাকে বশ করার উদ্দেশ্যে কবিরাজের কাছে গিয়েছিল—যাতে বিয়ের পর সেই স্ত্রী ব্যতীত আর অন্য কারও প্রতি তার কোনো ধরনের আকর্ষণ না থাকে। কিন্তু এখানেও উল্টা ইফেক্ট হয়। বিয়ের রাতে তার স্বামীকে বশ করার পোশন খাওয়ানোর সাথে সাথে সে যৌন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, এর কদিন পর সে পাগল হয়ে যায়। তখন মেয়েটি আবার ওই কবিরাজের কাছে গিয়ে দেখে, সে ইতিমধ্যে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে।
এরপর তার স্বামীকে নিয়ে শাইখ ওয়াহিদ বিন আব্দুস সালামের কাছে গেলে তার নির্দেশে বরই পাতা বেটে গোসলের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। পানি খাওয়া এবং গোসল করার পরপরই জাদু নষ্ট হয়ে যায় আর যুবকটি সুস্থ হয়ে ওঠে।
📄 অসুস্থ বানানো বা হত্যা করার জাদু
আমাদের আলোচনায় ৫ম প্রকার জাদু হচ্ছে কাউকে রোগাক্রান্ত বা অসুস্থ বানিয়ে দেওয়ার জাদু। এটা বিভিন্ন রকমের হয়। কখনো শরীরের কোনো অঙ্গ একেবারে বিকল হয়ে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়। কখনো চিকিৎসা করলে আবার সুস্থ হয়। এরকমও হয় যে, কোনো অঙ্গ মাঝেমধ্যে নাড়াচাড়া করতে পারে আবার মাঝেমধ্যে অচল হয়ে যায়। কারও পুরো শরীর আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইসিসের মতো হয়ে যায়। আবার অনেকে খুব ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ে, যার ফলে কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায়।
আমাদের সমাজে এই জাদু বান মারা বলে পরিচিত। কাউকে হত্যা করার জন্য এই জাদুই প্রয়োগ করা হয়।
ক. অসুস্থ বানানোর জাদুতে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ
১. শরীরের কোনো অঙ্গে সবসময় ব্যথা থাকা।
২. কোনো অঙ্গ একেবারে অচল হয়ে যাওয়া।
৩. পুরো শরীর নিশ্চল হয়ে যাওয়া।
৪. মাঝেমধ্যেই শরীর ঝাঁকুনি বা খিচুনি দিয়ে বেহুঁশ হয়ে যাওয়া।
৫. কোনো ইন্দ্রিয়শক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া। (যেমন: স্বাদ বা গন্ধ বুঝতে না পারা)
৬. প্রচণ্ড অসুস্থতায় ভোগা, অন্যদিকে আবার মেডিকেলের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কিছু ধরা না পড়া।
৭. কিছুই খেতে না পারা। আর খেলেও দিন দিন অস্বাভাবিক স্বাস্থ্যহানি ঘটা।
এগুলোর পাশাপাশি জিন-আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণ এবং জাদুর সাধারণ লক্ষণগুলোর সাথেও মিল পাওয়া যেতে পারে।
এখানে একটা প্রশ্ন আসতে পারে, সমস্যা তো শারীরিক অসুখ-বিসুখের কারণেও হতে পারে। তাহলে কেউ জাদু করেছে নাকি এমনি অসুখের কারণে এমনটা হচ্ছে—তা বোঝার উপায় কী?
উত্তর হল, প্রথমত: জাদুটোনা বা জিনের কারণে এসব হলে সাধারণত ডাক্তারের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য কোনো উপকার হয় না। ল্যাব টেস্ট, এক্স-রে, সিটি স্ক্যানে বিশেষ কোনো রোগ ধরা পড়েনা। তবে অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন জাদু-আক্রান্ত থাকতে থাকতে শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়, যেমনিভাবে এক রোগ থেকে একাধিক রোগ হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে ডায়াগনোস্টিক টেস্টে কিছু ধরা পড়লেও পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত: রুকইয়াহ করলে বিষয়টা বোঝা যাবে। সাধারণ রোগব্যাধি হলে রুকইয়ার সময় জাদুর কোনো লক্ষণ প্রকাশ পাবে না। তাই ‘সমস্যা কিসের’—এটা নিশ্চিত হওয়ার সহজ উপায় হচ্ছে, রুকইয়াহ করা। যদি রুকইয়াহ করার সময় জিন বা জাদুতে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায় তাহলে বুঝতে হবে যে কেউ জাদু করেছে। আর যদি সেরকম কোনো লক্ষণ না দেখা যায়, রুকইয়াহ শুনতে বরং ভালো লাগে, আরাম পায় তাহলে আরও কয়েকবার রুকইয়াহ করে দেখতে হবে। এরপরও কিছু প্রকাশ না পেলে বুঝতে হবে যে, জাদুর সমস্যা নেই। তখন ভালোভাবে ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে হবে।
খ. বান মারার জাদুর জন্য রুকইয়াহ
সাধারণ নিয়মে রুকইয়াহ করুন, এই জাদুর জন্য রুকইয়ায় আয়াতে শিফাগুলো একটু বেশি সংখ্যক বার পড়তে পারেন। এরপর নিচের প্রেসক্রিপশন নিজে অনুসরণ করুন অথবা রোগীকে করতে বলুন। প্রতিমাসে নিয়মিত অবস্থার আপডেট জানাতে বলুন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ডাক্তারী চিকিৎসা বা পরামর্শ গ্রহণ করতে বলুন।
একমাস পর অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনে আবার রুকইয়াহ করে সাজেশন দিয়ে দিন। এভাবে সমস্যা সম্পূর্ণ দূর হওয়া পর্যন্ত রুকইয়াহ করতে থাকুন।
যদি সমস্যা বেশ জটিল হয় তাহলে অন্য পরামর্শগুলো অনুসরণ করার পাশাপাশি শুধু গোসলের ক্ষেত্রে শুরুতে তিনদিন বরই পাতার গোসলটা দিতে পারেন। নিয়ম হচ্ছে, ৭টি বরই পাতা পিষে পানিতে গোলাবেন। আর আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস এবং সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২ এবং সূরা ত্বহা: ৬৯-আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দেবেন। এরপর এই পানি থেকে তিন চুমুক খাবেন, বাকিটা দিয়ে গোসল করবেন।
গ. প্রেসক্রিপশন
নিচের আয়াতগুলো পড়ে পানি, কালোজিরা, কালোজিরার তেল এবং মধুতে ফুঁ দিন। কালোজিরার তেল না পেলে অলিভ অয়েল ব্যবহার করা যেতে পারে।
১. সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস, সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯-সবগুলো তিন বার করে।
২. সূরা বনী ইসরাঈল ৮২ নম্বর আয়াতের প্রথমাংশ সাত বার-
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ
৩. অন্যান্য আয়াতে শিফা (সূরা তাওবাহ: ১৪, সূরা ইউনুস: ৫৭, নাহল: ৬৯, শুআরা: ৮০, হা-মীম সাজদা: ৪৪) তিন বার করে পড়ুন।
وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ .۱
.২ وَشِفَاءُ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ
.۳ يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ
.٤ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ
.٥ قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاء
৪. এরপর এই দুআগুলো তিন বার পড়ুন
١. اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبْ الْبَاسَ ، اِشْفِهِ وَأَنْتَ الشَّافِيْ لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
٢. بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيْكَ ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيْكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيْكَ ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيْكَ
পড়ার মাঝে মাঝে পানি, মধু, তেল এবং কালোজিরাতে ফুঁ দিন।
৫. শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট অথবা হাড়ে ব্যাথা থাকলে এর পাশাপাশি হাড় ক্ষয়ের রুকইয়াহয় বলা আয়াতগুলো পড়তে পারেন, যা সাধারণ অসুস্থতার জন্য রুকইয়াহ অধ্যায়ে বলা হয়েছে।
নির্দেশনা:
১. প্রতিদিন সকালে এবং রাতে এক চিমটি কালোজিরা খাবেন। এরপর এক চা চামচ মধু সামান্য রুকইয়ার পানিতে গুলিয়ে পান করবেন।
২. গোসলের পানিতে কিছুটা রুকইয়ার পানি মিশিয়ে গোসল করবেন।
৩. প্রতিদিন সকালে এবং রাতে কপালে এবং আক্রান্ত অঙ্গে (যে অঙ্গে ব্যথা আছে) কালোজিরার তেল মালিশ করবেন। এটা অত্যন্ত গুরুত্বে সাথে করবেন। এমনকি কোনোদিন গোসল বাদ গেলেও এটা যেন বাদ না যায়।
৪. প্রতিদিন আয়াতুল কুরসীর রুকইয়াহ আধঘণ্টা, সূরা ইয়াসিন, সফফাত, দুখান, জিন-এর রুকইয়াহ একবার, আর সূরা বায়্যিনাহ থেকে নাস পর্যন্ত সূরাগুলো তিনবার শুনবেন। সম্ভব হলে আরও বেশি শুনবেন। পাশাপাশি নিজে যতক্ষণ সম্ভব হয় রুকইয়ার আয়াতগুলো অথবা সুরা বাকারা তিলাওয়াত করবেন।
৫. খাবার পূর্বে অবশ্যই বিসমিল্লাহ বলবেন।
৬. আর সুস্থতার লাভের জন্য আল্লাহর কাছে অবিরত দুআ করতে থাকবেন।
৭. এছাড়া সিহরের কমন রুকইয়ার বাকি সব পরামর্শ অনুসরণ করবেন।
ঘ. লক্ষণীয় বিষয়
আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়া শারীরিক ক্ষতির জন্য ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা নেবেন। পাশাপাশি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত অবশ্যই রুকইয়াহ চালিয়ে যাবেন।
সমস্যা বেশি হলে গোসলের ক্ষেত্রে প্রথমে তিন দিন এবং প্রতি সপ্তাহে এক-দুইদিন বরই পাতার গোসল করবেন, পাশাপাশি ওপরের অন্যান্য পরামর্শ একই নিয়মে অনুসরণ করবেন। ইনশাআল্লাহ দ্রুত জাদু নষ্ট হয়ে যাবে।
আর হ্যাঁ, রুকইয়ার পাশাপাশি অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে হিজামা করাতে পারেন। ইনশাআল্লাহ অনেক উপকার পাবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাদুতে আক্রান্ত হওয়ার পর হিজামা করিয়েছিলেন। এছাড়া সুস্থতার নিয়তে অল্প হলেও নিয়মিত কিছু দান-সাদকাহ করতে পারেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের রোগের চিকিৎসা করো সাদকার মাধ্যমে, আর বিপদ দূর করো দুআর মাধ্যমে। ১
ঙ. অসুস্থ বানানোর জাদুর কিছু ঘটনা
ঘটনা-১: এই ঘটনা বরিশালের। আমি যখন রোগীর কাছে এটা শুনেছিলাম, আমার মোটেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। পরে পরিচিতদের কাছে খোঁজ নিলে ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে দুজন আমাকে নিশ্চিত করেছে।
যাহোক ঘটনাটি এরকম—দুই বোনকে জিন দিয়ে জাদু করা হয়েছিল। প্রায় ৫ বছর ধরে তারা অসুস্থ—বিয়ে করতে চাইত না, সবার সাথে রাগারাগি করত, স্বাস্থ্যও ভেঙে গিয়েছিল। এছাড়াও আরও অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। অসংখ্য কবিরাজ দেখানোর পরও বিশেষ কোনো ফায়দা হয়নি।
তাদের বাবা একজন সামরিক কর্মকর্তা। তিনি মাওলানা ইমরান ভাইয়ের খোঁজ পেয়ে তার সাথে যোগাযোগ করে এবং তাকে দিয়ে কয়েকদিন রুকইয়াহ করায়। এরপর ইমরান ভাইয়ের পরামর্শে দুজনার একজন আমাকে মেসেজ দিয়ে তাদের সমস্যার ব্যাপারে বলে; কিন্তু কোনো কারণে আমি বিরক্ত হয়ে সংক্ষেপে দু-চার কথা বলেই বিদায় করি। তবে সে ওই কথাটুকুকেই গুরুত্বের সাথে নিয়েছিল। ফলে তারা দুই বোন মিলে রুকইয়াহ শোনা শুরু করে, সাথে সম্ভবত রুকইয়ার গোসলও করছিল। তারা প্রচুর রুকইয়াহ শুনত। তার মতে কিছুদিন নাকি ১৮ ঘণ্টা করেও শুনেছে। শুরুতেই তাদের অবস্থা খুব কাহিল হয়ে গিয়েছিল। যে আমার সাথে যোগাযোগ করেছিল অর্থাৎ দু'বোনের বড়জনের বেশ কয়েকবার রক্তবমি হয়েছিল। আর ছোট বোনের ওপর বারবার জিন আসছিল। জিন যেতে পারছিল না। তখন সে সালাত পড়ে আল্লাহর কাছে বদদুআ করে, যে আমাকে জাদু করছে, তার যেন আমার চেয়ে দ্বিগুণ কষ্ট হয়, আমার দ্বিগুণ রক্ত বমি হয়। পাগলের মতো আরও কিছু বদদুআ করেছিল। ফলে দেখা গেল, যে জাদুকরের কাছে গিয়ে জাদু করা হয়েছিল, সে ওই বাড়িতে এসে মাফ চেয়ে জাদুর জিনিসগুলো তুলে নিয়ে গেল। সাথে এ-ও বলে গেল যে, আমি জিনকেও নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু জিন এরপরও বারবার আসছিল। তারাও রুকইয়া শোনার ধারা অব্যাহত রেখেছিল। এক পর্যায়ে ছোট বোন অজ্ঞান হয়ে যায়। এরপর সে নাকি কয়েকদিন অজ্ঞান অবস্থায় ছিল। আর বড় বোনের বারবার রক্ত বমি হচ্ছিল। ফলে তাদের বাবা ডাক্তারের শরণাপন্ন হন এবং সামান্য চিকিৎসা নেওয়ার পরই তারা দুজন একদম সুস্থ হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে তারা তিন মাস রুকইয়াহ করেছিল। আলহামদুলিল্লাহ এতে পাঁচ বছরের সমস্যা সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায়।
ঘটনা-২: মিসরের শাইখ ওয়াহিদের কাছে এক মহিলাকে আনা হয়েছিল, যার পা প্রচণ্ড ব্যথার কারণে অচল হয়ে গিয়েছিল। শাইখ ধারণা করেছিলেন, কোনো বিশেষ রোগ হবে হয়তো। শাইখ রুকইয়াহ করা শুরু করলে সূরা ফাতিহা শেষ না হতেই জিন কথা বলে ওঠে। জিনটা মহিলার পায়ে ঢুকেছিল। শাইখ তাকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং কিছুক্ষণ রুকইয়াহ করেন। ফলে মহিলা একদম সুস্থ হয়ে যায়।
ঘটনা-৩: সৌদি আরবের ঘটনা। একটা ছোট্ট মেয়ে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। এরপর থেকে তার পুরো শরীর একদম নিশ্চল হয়ে যায়। কোনো কথা বলতে বা খেতে পারে না। কিছু করতে পারে না। তাকে উন্নত হাসপাতালে নিয়ে সব ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর কোনো সমস্যাই ধরা পড়ে না। অথচ সে খেতে পারছিল না, প্রচণ্ড দুর্বল অবস্থায় বিছানায় পড়ে ছিল। পাইপের মাধ্যমে কেবল খাবার পেটে পৌঁছানো হচ্ছিল।
এক বন্ধুর অনুরোধে মিসর থেকে শাইখ ওয়াহিদ মেয়েটিকে দেখতে যান। হাসপাতালে গিয়ে তিনি মেয়েটিকে কিছু প্রশ্ন করেন। সে ইশারায় হ্যাঁ/না করে উত্তর দেয়। শাইখ বুঝতে পারছিলেন না যে, সমস্যা কোথায়। পরে সালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেলে তিনি মসজিদে যান এবং সালাত শেষে ওই মেয়েটার জন্য খুব করে দুআ করেন। এরপর ফিরে এসে মেয়েটার মাথায় হাত রেখে পড়েন—
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ إِشْفِ وَأَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
মেয়েটা কেঁপে ওঠে এবং আল্লাহর রহমতে সাথে সাথেই কথা বলে ওঠে। উপস্থিত সবাই আনন্দে কেঁদে দেয়। এরপর আর কিছুক্ষণ রুকইয়ার পরই সে বাসায় ফিরে যাওয়ার মতো অবস্থায় চলে আসে, আলহামদুলিল্লাহ।
ঘটনা-৪: এই ঘটনাও সৌদি আরবের। ঘটনাটি হুবহু আমার মনে নেই। যতটুকু স্মরণ আছে, তার আলোকে লিখছি।
একটি পরিবার জাদুতে আক্রান্ত ছিল; কিন্তু কোনো কারণবশত তাদের রুকইয়াহ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। পরিবারের একজন শাইখ আদিল বিন তাহির মুকবিলের সাথে দেখা করে তার পরামর্শ চায়। তিনি বলেন, তোমাকে তিনটা কাজ দিচ্ছি। যদি এতে ফায়দা না হয় তাহলে দুনিয়াতে আর এমন কিছু নেই, যা তোমাকে আরোগ্য দেবে। প্রথম কাজ হচ্ছে, কবীরা গুনাহ থেকে তাওবাহ করা, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা। দ্বিতীয় কথাটি আমি ভুলে গেছি, সম্ভবত প্রতিদিনের ইবাদাত ঠিকমত আদায় করা কিংবা সাদকা বা এ জাতীয় কোনো কিছু করা...। তৃতীয়টি ছিল, প্রতিদিন রাতে তাহাজ্জুদ পড়তে হবে এবং আল্লাহর কাছে সুস্থতার জন্য এবং সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য দুআ করতে হবে।
সে শাইখের কথা অনুযায়ী কাজ শুরু করে। সে প্রতিদিন তাওবাহ-ইস্তিগফার করছিল, তাহাজ্জুদ পড়ে দুআ করে যাচ্ছিল। মাসখানেক পর একদিন মাঝরাতে অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসে, তাকে বলা হয় তোমাদের বাড়ির ওই দেওয়ালের ওপাশে অমুক জায়গায় তাবিজ আছে। সে গিয়ে জায়গাটা খুঁড়ে অনেকগুলো তাবিজ পায়। এরপর সে দুআ বন্ধ করেনি, আগের নিয়মেই চলছিল, কদিন পর মাঝরাতে আবার ফোন কল পায়। আরেক জায়গার সন্ধান দেওয়া হয়। এভাবে কিছুদিন পরপর সবমিলিয়ে ৩-৪ জায়গা থেকে তাবিজ এবং জাদুর বিভিন্ন জিনিস উদ্ধার হয়।
সে কয়েকমাস পর শাইখ আদিলের কাছে যায়। গিয়ে তাবীজগুলো তার সামনে রাখে। শাইখ ভেবেছিলেন, সে কবিরাজের কাছে গিয়ে তাবীজ নিয়েছে। শাইখ তাকে ধমক দেন, তিরস্কার করেন। সে বলে, না না, ইয়া শাইখ! এসব হলো তাবীজ আর এই হচ্ছে জাদুর অন্যান্য জিনিস—আমার পরিবারের ওপর এগুলো দিয়েই জাদু করেছিল। শাইখ সেগুলো নিয়ে নষ্ট করে ফেলেন। ফলে তার পরিবার সুস্থ হয়ে যায়।
টিকাঃ
১. বাইহাকী: ৩২৭৪
📄 ইস্তিহাযা বা অনিয়মিত স্রাবের সমস্যা
মাসিক স্রাব বা পিরিয়ড প্রতিটি নারীর জীবনে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। স্বাভাবিকভাবে প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৩ থেকে সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত স্রাব হতে পারে। কিন্তু যদি ৩ দিনের কম অথবা ১০ দিনের বেশি হয়, তবে তাকে ইস্তিহাযা বা অনিয়মিত স্রাব, জরায়ু স্রাব ইত্যাদি বলা হয়। মূলত ইস্তিহাযা হলো ঋতুস্রাবের নির্ধারিত সময়ের বাইরে কম বা বেশিদিন রক্ত প্রবাহিত হওয়া। খেয়াল করুন—
عَنْ أَنَسٍ ... فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ
“আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় শয়তান মানুষের রগেরগে চলাচল করে।” ১
হামনা বিনতে জাহাশ রা. নিজের ইস্তিহাযার সমস্যার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললে তিনি বলেছিলেন—
إِنَّمَا هِيَ رَكْضَةٌ مِنْ الشَّيْطَانِ
“এটা তো শয়তানের আঘাতের ফল।” ২
সুতরাং কোনো নারীর শরীরে জিন প্রবেশ করলেও সে রগের ভিতর দিয়ে চলাচল করতে পারে। আর এই জিন যখন জরায়ুর কোনো রগে আঘাত করে তখন ইস্তিহাযার সমস্যা হয়। এছাড়া ইস্তিহাযার সমস্যা কেউ এজন্য জাদু করলে হতে পারে। তবে যদি এজন্য জাদু না-ও করা হয়, বরং জিন দিয়ে অন্য কোনো জাদু করে কিংবা জিনের আসরের সমস্যা থাকে তাহলে এরকম হতে পারে। এমনকি শুধুমাত্র জিনের নজরের জন্যও এমন সমস্যা হতে পারে।
তাই যদি অন্যান্য সমস্যার জন্য রুকইয়াহ করার পর, সেগুলোর সাথে এটাও দূর না হয় তাহলে নির্দিষ্টভাবে নিম্নলিখিত রুকইয়াহ করতে পারেন। অথবা জিন-জাদু ছাড়া শারীরিক অন্য সমস্যার কারণে যদি অনিয়মিত স্রাবের কোন সমস্যা থাকে তাহলেও এই রুকইয়াহ করতে পারেন। আল্লাহ চান তো যথেষ্ট উপকার হবে।
ক. ইস্তিহাযার জাদুর লক্ষণ
১। মাসিক স্রাব ৩ দিনের কম বা ১০ দিনের বেশি হওয়া। আর এরকম সমস্যা কয়েক মাস হওয়া।
২। সর্বদা স্রাব প্রবাহিত হওয়া।
৩। স্রাব একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়া। (বয়সের কারণে নয়)
৪। সাদাস্রাব (Leucorrhoea)
৫। স্রাবের সময় অতিরিক্ত ব্যথা-বেদনা থাকা।
৬। ঠিকমত ঘুম না হওয়া। ঘনঘন বোবায় ধরা বা বাজে স্বপ্ন দেখা।
৭। অতিরিক্ত পরিমাণে রক্তস্রাব হওয়া।
৮। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা হওয়া। বিশেষতঃ ব্যাকপেইন, কিংবা লজ্জাস্থানে ব্যথা। অধিকাংশ সময়েই মাথাব্যথা করা।
এগুলোর পাশাপাশি জিন-আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণ এবং জাদুর সাধারণ লক্ষণগুলোর সাথেও মিল পাওয়া যেতে পারে।
আরেকটা বিষয় হল, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রসাবের ইনফেকশন হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে।
খ. ইস্তিহাযার জন্য রুকইয়াহ
সাধারণ নিয়মে রুকইয়াহ করুন এরপর নিচের প্রেসক্রিপশন নিজে অনুসরণ করুন অথবা রোগীকে অনুসরণ করতে বলুন। এক মাস পর অবস্থা জানাতে বলুন, ইনশাআল্লাহ সমস্যা ভালো হয়ে যাবে, প্রয়োজনে আবার রুকইয়াহ করে অন্যান্য পরামর্শগুলো অনুসরণ করতে বলুন।
গ. প্রেসক্রিপশন
প্রথমে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯, ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে পানিতে (সম্ভব হলে সাথে মধুতে) ফুঁ দিন। এরপর ৬টি আয়াতে শিফা তিনবার করে পড়ে ফুঁ দিন—সূরা তাওবাহ: ১৪, সূরা ইউনুস: ৫৭, নাহল: ৬৯, বনী ইসরাঈল: ৮২, শুআরা: ৮০, হা-মীম সাজদা: ৪৪। (আয়াতগুলো আগের অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে)
১. এই পানি প্রতিদিন দুইবেলা খাবেন। (মধু থাকলে ১ চামচ মধু মিশিয়ে নিবেন)
২. গোসলের পানিতে মিশিয়ে প্রতিদিন অথবা একদিন পরপর গোসল করবেন।
৩. পাশাপাশি কোনো ক্বারীর সাধারণ রুকইয়াহ একবার অথবা আধাঘন্টা আয়াতুল কুরসীর রুকইয়াহ শুনবেন। এছাড়া রুকইয়াহ যিনা-ও এই সমস্যায় বেশ উপকারী।
৪. যদি তিন-চার সপ্তাহ এভাবে রুকইয়াহ করার পরও সম্পূর্ণ সমস্যা ভালো না হয়, তবে ৭ দিনের ডিটক্স রুকইয়াহ করুন। অথবা আরেকটি কাজ করতে পারেন, সূরা আনআমের ৬৭ নম্বর আয়াতের প্রথমাংশ—
لِكُلِّ نَبَا مُسْتَقَرٌّ
হালাল ফুডগ্রেড কালি দিয়ে কাগজে বা পাত্রে লিখে সেটা পানিতে গুলিয়ে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সেবন করলে ইনশাআল্লাহ সমস্যা ভালো হয়ে যাবে। আর এটাও রুকইয়ার জায়িয পদ্ধতি।
যেমন: ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেছেন—
يَجُوزُ أَنْ يَكتُبَ لِلْمُصَابِ وَغَيْرِهِ مِنْ الْمَرْضَى شَيْئًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ وَذِكْرُهُ بِالْمِدَادِ الْمُبَاحِ وَيُغْسَلُ وَيُسْقَى كَمَا نَصَّ عَلَى ذَلِكَ أَحْمَد وَغَيْرُهُ
...অসুস্থ ব্যক্তি বা অন্যদের জন্য আল্লাহর কালাম অথবা আল্লাহর যিকির থেকে সাধারণ কালি দ্বারা কিছু লেখার বৈধতা রয়েছে। এরপর সেটা ধুয়ে পান করাবে। যেমনটা এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ রহ.-সহ অন্যরা স্পষ্ট বলেছেন। ৩
পরামর্শ: এক্ষেত্রে খাবার উপযোগী কালি না পেলে কোন ফুল বা ফলের রস, অথবা ভিটামিন সিরাপ ব্যবহার করে লেখা যেতে পারে।
ঘ. লক্ষণীয়
ক. একটি বিষয় লক্ষণীয়ঃ যদি কয়েকসপ্তাহ রুকইয়াহ করার পরও উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি দেখতে না পান, তবে অবশ্যই এর পাশাপাশি কোনো দ্বীনদার ডাক্তারের চিকিৎসা নেবেন। কেননা হঠাৎ করে ওজনের হ্রাস-বৃদ্ধি, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল গ্রহণ ইত্যাদি বিভিন্ন কারণেও এমন কিছু সমস্যা হতে পারে। তাই উদ্বিগ্ন না হয়ে সমস্যার পেছনের কারণ চিহ্নিত করুন, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সহায়তা নিন।
খ. আর অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে হিজামা করাতে পারেন। ইস্তিহাযার সমস্যায় হিজামা থেরাপি (cupping) খুবই উপকারি।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ইস্তিহাযা-সংক্রান্ত ফিকহি বিধিবিধান বেশ দীর্ঘ। সেগুলো এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিকও নয়। এর জন্য আহকামে নিসা, ফিকহুন নিসা, আহকামে যিন্দেগী বা এ ধরনের কোনো গ্রন্থ দেখুন অথবা পরিচিত ভালো আলেমের থেকে বিস্তারিত জেনে নিন।
ঙ. এ বিষয়ক কিছু ঘটনা
ঘটনা-১: ইস্তিহাযার সমস্যা নিয়ে আমার একজন নিকটাত্মীয়ার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করছি। কথাগুলো তার মুখেই শোনা যাক-
'আমি বেশ কয়েকবছর ধরে ইস্তিহাযার সমস্যায় ভুগছিলাম। প্রায় সর্বদা স্রাব ঝরত, কখনো সাদা স্রাব হতো। আর এই ব্যাপারে বিশেষ কোনো জ্ঞান না থাকায় সমস্যার সমাধান মিলেনি। হয়তো-বা রাব্বুল আলামিনের কাছে চাইতেও পারিনি ঠিকমত। তো গত বছর রুকইয়াহ করেছিলাম; যদিও ইস্তিহাযার জন্য রুকইয়াহ করিনি, জিনের সমস্যার জন্য করেছিলাম। তারপরও আল্লাহ রব্বুল আলামিনের ইচ্ছায় এই সমস্যা অনেকটাই কমে এসেছিল। এরপর পুরোপুরি সমাধানের জন্য সাত দিনের ডিটক্স করেছিলাম। তারপর আর অনেকদিন সমস্যা হয়নি আলহামদুলিল্লাহ।
এর বেশ কিছুদিন পর কয়েকটি শারীরিক সমস্যার কারণে পিরিয়ড অনিয়মিত হচ্ছিল। অনেক ডাক্তারের চিকিৎসা নিয়েও তেমন কোনো ফায়দা পাইনি। পরে হিজামা করালাম। আলহামদুলিল্লাহ, এরপর কয়েকমাস হয়ে গেল, আমার পিরিয়ড একদম স্বাভাবিক।
ঘটনা-২: গত বছর চট্টগ্রামে কয়েকজন রোগী দেখেছিলাম। তাদের মধ্যে একজন তার অবস্থা জানালেন, তার সমস্যা ছিল, স্রাব অনিয়মিতভাবে হতো—কখনো দশ দিন পর, কখনো পনেরো দিন পর, আবার কখনো লাগাতার অনেকদিন থাকত, আর ওই সময়ে প্রচুর ব্যথা হতো। তিনি ফেইসবুকে আমার লেখা পড়ে রুকইয়ার পানি খান এবং গোসল করেন। এক সপ্তাহ পর সমস্যা ভালো হতে দেখে তিনি রুকইয়াহ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুই মাস পর সমস্যাটা এখন আবার ফিরে আসছে। আমি তাকে লাগাতার তিন সপ্তাহ বা এক মাস রুকইয়াহ করার পরামর্শ দিলাম। আর বললাম, প্রয়োজন হলে যেন হিজামা করিয়ে নেয়।
টিকাঃ
১. মুসলিম:২ ১৯৭৪
২. তিরমিযী: ১২৮
৩. মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়া: ১০/৩৭