📄 জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ
মানুষের ক্ষতি করার জন্য বিভিন্ন ধরণের জাদু করা হয়, আর সেগুলোতে আক্রান্ত হলে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। তবে কিছু লক্ষণ আছে, যেসব বেশিরভাগ জাদুর ক্ষেত্রেই মিলে যায়। যেমন:
১. হঠাৎ কারও বা কিছুর প্রতি তীব্র ভালবাসা অথবা ঘৃণা তৈরি হওয়া, যা আগে ছিল না।
২. বিশেষ কোন কারণ ছাড়াই জটিল-কঠিন রোগে ভোগা। চিকিৎসা করেও সুস্থ না হওয়া। কিংবা প্রচণ্ড অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কোন রোগ ধরা না পড়া।
৩. পরিবারে ঝগড়া লেগেই থাকা। কারও সাথে অকারণে বারবার ঝামেলা বাধা।
৪. খুব অল্প সময়ের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব কিংবা দ্বীনদারিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসা।
৫. অদ্ভুত আচরণ করা। যেমন, সাধারণ কোন কাজ একদমই করতে না চাওয়া, দিন-রাতের নির্দিষ্ট কোন সময়ে ঘরের বাইরে যেতে না চাওয়া।
৬. ব্যাক পেইন; বিশেষত মেরুদণ্ডের নিচের দিকে ব্যথা।
৭. সবসময় মানসিক অশান্তিতে থাকা; বিশেষত বিকেল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত।
৮. প্রায়সময় মাথাব্যথা কিংবা পেটব্যথা থাকা। ওষুধ খেয়েও তেমন ফায়দা না হওয়া।
৯. ঠিকমত ঘুমাতে না পারা, আর সামান্য ঘুম আসলেও বিভিন্ন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখা।
১০. নির্দিষ্ট ধরণের কোন যায়গা, কোন প্রাণী বা বস্তু বারবার স্বপ্নে দেখা। যেমন: পানি, আগুন, গাছ, সাপ, বাঘ, শেয়াল, কবরস্থান, পরিত্যক্ত বাড়ি, জঙ্গল। স্বপ্নে বিভিন্ন জিনিস খাওয়া।
অনেক জাদুতে সরাসরি জিন ব্যবহার করা হয়। তখন উল্লিখিত লক্ষণগুলোর পাশাপাশি জিন দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণও মিলে যেতে পারে। আর আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়লে, অথবা অডিও শুনলে বিভিন্ন প্রভাব দেখা যায়, সেগুলো দেখে জাদু আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।
আমরা প্রথমে জাদুর কমন চিকিৎসা পদ্ধতি আলোচনা করব, যাতে কোনরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া সবাই এটা অনুসরণ করতে পারে। এরপর নির্দিষ্ট কিছু জাদুর সমস্যা এবং প্রতিকার নিয়ে বলা হবে।
ক. জাদু আক্রান্ত ব্যক্তির রুকইয়ার নিয়ম
পরিস্থিতি-১: প্রথম অধ্যায়ে উল্লিখিত নিয়মানুযায়ী রুকইয়ার প্রস্তুতি নিয়ে আপনি রোগীর নিকটে বসে বলিষ্ঠ স্বরে রুকইয়ার আয়াত এবং দুআগুলো পড়তে থাকুন।
যদি রোগী বেহুঁশ হয়ে যায় এবং তার ওপর জিন চলে আসে, তখন জিনের রোগীর ওপর রুকইয়ার নিয়মানুসারে তাকে চিরদিনের জন্য চলে যেতে বাধ্য করবেন। অনেকের ক্ষেত্রে জাদুর কাজে নিয়োজিত জিন চলে গেলেই জাদু নষ্ট হয়ে যায়, তবুও এরপর কয়েকমাস নিজে নিজে রুকইয়াহ করা উচিত।
তবে যদি জিনের সাথে কথা বলার পরিস্থিতি থাকে, তবে জিজ্ঞেস করতে হবে, কেন জাদু করেছে, কি দিয়ে করেছে, যেসব জিনিস দিয়ে জাদু করেছে, সেগুলো কোথায় আছে। জিনেরা যদিও-বা খুব মিথ্যুক; তবুও যদি কোন যায়গার ব্যাপারে বলে কিংবা দেখিয়ে দেয় তাহলে কাউকে পাঠিয়ে সেটার খোঁজ করুন, সত্যি বলে থাকলে পাওয়া যাবে। মিথ্যা বললে পাবেন না। যদি স্বীকারোক্তি অনুযায়ী জাদুর জিনিস পাওয়া যায় তাহলে নিম্নলিখিত আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে জাদুর জিনিসগুলো কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখুন, তাহলে জাদু নষ্ট হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আয়াতগুলো হল-সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস।
যদি বলে কোন কিছু খাইয়ে জাদু করা হয়েছে বা জাদুর পানি রাস্তায় ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে তাহলে রোগীকে নিচের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করে এক মাস পরে আপডেট জানাতে বলে দিন।
যদি জিন বলে অমুক জায়গায় জাদুর জিনিস লুকানো আছে; কিন্তু আমি নির্দিষ্ট জায়গার কথা বলতে পারবো না, তাহলে ওপরের আয়াতগুলো পড়ে দম করা পানি ওই জায়গায় তিনদিন ছিটালে ইনশাআল্লাহ জাদু নষ্ট হয়ে যাবে। জিন কারও নাম বলতে পারে যে, অমুক ব্যক্তি জাদু করেছে-এসব কথা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ, এরা খুব বেশি মিথ্যা বলে আর এভাবে মানুষের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টির চেষ্টা করে।
পরিস্থিতি-২: আর যদি জিন না আসে, এমনিতে খুব অস্বস্তি বোধ করে, মাথা – ঘাড় কিংবা পিঠ ব্যথা করে, কান্না পায়, কেঁপে কেঁপে ওঠে অথবা বমি বমি লাগে তাহলে বুঝতে হবে, জাদুকর জিন দিয়ে জাদু করেনি; বরং অন্য কোন পন্থায় করেছে। তাহলে আরও দু- একবার রুকইয়াহ করে দেখুন। যদি লক্ষণগুলো বর্তমান থাকে; কিন্তু জিন না আসে তাহলে পূর্বোক্ত আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে রোগীকে খেতে বলুন। দেখুন-বমি হয় কি না। যদি বমির সাথে জাদুর জিনিসগুলো বের হয়ে যায়, অথবা লাল বা কালো বমি হয় তাহলে আশা করা যায়, জাদু নষ্ট হয়ে গেছে। যা-ই হোক না কেন, এরপর কিছুদিন নিচের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করলে ইনশাআল্লাহ আর সমস্যা থাকবে না।
এক মাস পর অবস্থা জানাতে বলুন, অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনে এক মাস পর আবার রুকইয়াহ করে দেখুন। এরপর একই সাজেশন আরেকবার দিয়ে দিন অথবা নির্দিষ্ট জাদুর প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করতে বলুন।
খ. জাদুর সমস্যার জন্য সেলফ রুকইয়াহ
জাদুর সমস্যার জন্য নিজে নিজে রুকইয়াহ করতে চাইলে প্রথমে মানসিক প্রস্তুতি নিন। পাক্কা ইরাদা করে নিন-সমস্যার একটা বিহিত করে তবেই ক্ষান্ত হবো। নিজে নিজে রুকইয়াহ শুরু করে কয়েকদিন যেতে না যেতেই অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, অনেকে একটু উন্নতি দেখলেই বন্ধ করে দেয়। এমন করা যাবে না। রুকইয়াহ চলাকালীন রোগীর জরুরী বিষয়গুলো খেয়াল রাখা আর মানসিক সাপোর্ট দেওয়ার মতো কেউ সাথে থাকলে অনেক ভালো হয়।
প্রথমে ভালোভাবে পাক-পবিত্র হয়ে দুই রাকাত সালাত পড়ুন। সবচেয়ে উত্তম হল তাহাজ্জুদের সময়। নইলে অন্য যেকোনো জায়িয ওয়াক্তে দুই রাকাত নফল সালাত পড়ুন। এরপর দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে আপনার সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য এবং রোগ থেকে আরোগ্যের জন্য দুআ করে ইস্তিগফার এবং দরুদ শরীফ পড়ে চিকিৎসা শুরু করুন।
হাতের কাছে এক বোতল বা জগে পানি নিয়ে বসুন। প্রথমে কয়েকবার এই গ্রন্থে উল্লেখিত রুকইয়ার আয়াতগুলো তিলাওয়াত করুন অথবা কোন কারির সাধারণ রুকইয়াহ কয়েকবার শুনুন। এরপর পানির বোতলটি নিয়ে এই আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে কিছুটা খেয়ে নিন-
সূরা আরাফ, আয়াত: ১১৭-১২২
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَأْفِكُوْنَ - فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ مُنَالِكَ وَانْقَلَبُوا صَاغِرِينَ
وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ - قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ - رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ -
সূরা ইউনুস, আয়াত: ৮১-৮২
فَلَمَّا أَلْقَوْا قَالَ مُوسَى مَا جِئْتُمْ بِهِ السِّحْرُ إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ - وَيُحِقُّ اللهُ الْحَقِّ بِكَلِمَاتِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ
সূরা ত্বহা, আয়াত: ৬৯
وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرِ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى
যদি জাদুর সমস্যা থাকে তাহলে রুকইয়াহ তিলাওয়াত করা বা শোনার সময় এবং পানি খাওয়ার পর বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। যেমন: মাথা বা পেটে ব্যথা হতে পারে। ঘাড়ে, পিঠে বা মেরুদণ্ডে ব্যথা শুরু হতে পারে, ভেতরটা ছটফট করতে পারে, অকারণে কান্না আসতে পারে। এছাড়াও বমি বমি লাগতে পারে। বমি হয়ে গেলে ভালো, হয়তো-বা সাথে জাদুর জিনিস বের হয়ে যাবে। পেটে জাদু থাকলে লাল বা কালো বমি হতে পারে। এরপর নিচের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করতে থাকুন।
জাদুর জিনিসগুলো খুঁজে পাওয়ার আরেকটা উপায় হল-প্রতিদিন তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে দুআ করা, যেন জাদুর জিনিসগুলো কোথায় আছে, আল্লাহ তা জানিয়ে দেন। যদি সেটা পাওয়া যায় তাহলে তা নষ্ট করে ফেললে ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই জাদু থেকে মুক্ত হওয়া যাবে। নইলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যের সাথে রুকইয়াহ করে যেতে হবে।
গ. প্রেসক্রিপশন
সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯-এই আয়াতগুলো এবং সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস সব তিন বার করে পড়ে একটু বেশি পরিমাণ পানিতে ফুঁ দিন।
১. এই পানি প্রতিদিন দুই অথবা তিন বেলা আধা গ্লাস করে খেতে হবে।
২. আর প্রতিদিন গোসলের পানির সাথে কিছুটা মিশিয়ে গোসল করতে হবে।
রুকইয়ার পানি যদি শেষ হয়ে যায় তবে শুদ্ধ করে কোরআন পড়তে পারে; এমন যে কেউ উল্লিখিত আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে নিলেই হবে।
৩. প্রতিদিন এক নাগাড়ে কমপক্ষে ৪৫ মিনিট রুকইয়ার নিয়তে কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে।
এক্ষেত্রে গ্রন্থের শেষে উল্লেখিত রুকইয়ার আয়াত এবং দোয়াগুলো পড়া যেতে পারে, অথবা রুকইয়ার নিয়াতে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা যেতে পারে, অথবা পানিতে ফুঁ দেয়ার জন্য পড়া আয়াতগুলোই বারবার পড়ে নিজের ওপর রুকইয়াহ করা যেতে পারে। নিজে বেশিক্ষণ তিলাওয়াত করা সম্ভব না হলে যতটুকু সম্ভব তিলাওয়াত করবেন আর প্রতিদিন অন্তত দেড় ঘণ্টা কোন কারির রুকইয়ার অডিও শুনবেন।
৪. মুভি-মিউজিক এবং শরিয়তে নিষিদ্ধ এমন সব কিছু থেকে দূরে থাকতে হবে। মেয়ে হলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পর্দা করতে হবে।
৫. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ঠিকমত পড়তে হবে। কোন ওয়াজিব কিংবা ফরয ইবাদাত যেন ছুটে না যায়-সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
৬. শয়তান থেকে বাঁচতে সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমের আগের মাসনূন আমলগুলো গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে। অন্তত সুরা ইখলাস, ফালাক, নাসের আমল যেন কখনও বাদ না যায়।
৭. এই দুআটি প্রতিদিন সকালে ১০০ বার পড়া। কোন দিন সকালে না পড়তে পারলে সারাদিনের মধ্যে ১০০ বার পড়ে শেষ করবেন। একান্ত অপারগতা থাকলে সকাল-সন্ধ্যায় ১০ বার পড়বেন।
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ ، وَلَهُ الْحَمْدُ ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহ, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদ, ওয়াহুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর।
৮. ঘুমের আগে সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে হাত বুলিয়ে নিবেন। এভাবে তিনবার করবেন। আর আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমবেন।
৯. অজু, গোসলসহ পাক-নাপাকীর ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করবেন। বিশেষত করে ফরজ গোসলের ব্যাপারে। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে মাস'আলা জেনে নিন।
১০. বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরুদ শরীফ পাঠ করবেন। তাহাজ্জুদ আর নফল পড়ে আপনার সমস্যা এবং পেরেশানি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বেশি বেশি দু'আ করবেন।
ঘ. কিছু পরামর্শ
ক. কারও সমস্যা তুলনামূলক বেশি হলে অন্য নিয়মগুলো অনুসরণের পাশাপাশি গোসলের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ২-৩দিন বরই পাতার গোসল দিতে পারেন। এক্ষেত্রে নিয়ম হল: ৭টি বরই পাতা বেটে পানিতে গুলাতে হবে, আর আয়াতুল কুরসি এবং তিনকুল তিনবার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিতে হবে। এরপর এই পানি কিছুটা খাবে এবং বাকিটা দিয়ে গোসল করবে। এই পানির সাথে অন্য পানি মেশাবে না।
খ. জাদুর চিকিৎসা চলাকালীন সমস্যা কখনও বাড়তে পারে কখনও কমও হতে পারে। কারও একটু দেরি লাগতে পারে। এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত রুকইয়াহ থামিয়ে দেওয়া যাবে না; ধৈর্য ধরে স্বাভাবিক নিয়মেই চালিয়ে যেতে হবে। আস্তে আস্তে সমস্যা কমে আসবে ইনশাআল্লাহ।
কেউ বলেছিল, শয়তান আপনাকে দিয়ে গুনাহ করিয়েই জিতে যায় না; বরং আপনি যখন হতাশ হয়ে তাওবা করা ছেড়ে দেন তখন শয়তান জিতে যায়। অনুরূপভাবে শত্রু আপনাকে জাদু করলেই সফল হয়ে যায় না; বরং আপনি সমাধানের ব্যাপারে হাল ছেড়ে দিলেই সে সফল হতে থাকে। তাই সমস্যা বুঝতে পারলে এর সুরাহা না করে ছাড়বেন না।
গ. রুকইয়াহ শুনে বা তিলাওয়াত করে বেশি কষ্ট হলে রুকইয়ার গোসল করে নিতে পারেন, ইনশাআল্লাহ আরাম পাবেন। প্রথম অধ্যায়ের "রুকইয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো” অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।
ঘ. 'সমস্যা নাই' মনে হলেই সাথে সাথে রুকইয়াহ বাদ দিয়ে দেয়া যাবে না। একদম ভালো আছি মনে হওয়ার পরেও মাস খানেক স্বাভাবিকভাবে রুকইয়াহ করে যাওয়া উচিত। গ্রন্থের পরিশিষ্টে "কিভাবে বুঝব আমার রুকইয়াহ করা শেষ” অংশ দ্রষ্টব্য।
ঙ. ওপরের নিয়ম অনুযায়ী একবার এক মাস রুকইয়াহ করার পর আল্লাহ না করুন যদি বোঝা যায়, সমস্যা এখনো যায়নি, তবে শুরু থেকে সব কিছু ভালোভাবে খেয়াল করে আবার রুকইয়াহ শুরু করবেন। কেউ একাধিক জাদুতে আক্রান্ত হতে পারে, তখন সুস্থ হতে একটু বেশি সময় লাগতে পারে। এক্ষেত্রে সবগুলোর নিয়াতে একসাথে করার চেয়ে একটা একটা জাদুর নিয়াতে রুকইয়াহ করলে উপকার কিছুটা দ্রুত পাওয়ার আশা করা যায়।
চ. যিনি আপনাকে মানসিক সাপোর্ট দিচ্ছেন, প্রতি সপ্তাহ শেষে তার সাথে আপনার অবস্থা পর্যালোচনা করুন। প্রয়োজনে আপনার সমস্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট জাদুর জন্য পরামর্শ অনুসরণ করুন।
📄 বিয়ে ভাঙার জাদু
কাউকে বিয়ে ভাঙা বা আটকে রাখার জন্য তাবিজ বা জাদু করলে সাধারণত এরকম দেখা যায়—বিয়ের প্রস্তাব আসে ঠিকই, সবকিছু ঠিক থাকলেও পছন্দ হয় না। সব কথা পাকা হওয়ার পর হয়তো ছেলে বেঁকে বসে, নয়তো মেয়ে। কিংবা কোনো পরিবারের একজন অভিভাবক অনর্থক কোনো কারণ দেখিয়ে বিয়ে ভেঙে দেয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক গুণবতী হওয়া সত্ত্বেও কোনো প্রস্তাব আসছে না, কেউ প্রস্তাব দিলেও পছন্দ হওয়ার বদলে তাকে খারাপ লাগতে থাকে। ছেলে যতই ভালো হোক, বিয়ের প্রস্তাব শোনার পর থেকেই তাকে বিরক্তিকর মনে হয়। অনেক সময় এমন হয়, বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য যেই আসে, তার অস্থির লাগে, দম বন্ধ হয়ে আসে বা অকারণে খুব খারাপ লাগে, যার ফলে কথাবার্তা পাকা না করেই সে ফিরে যায়।
আমার একজন আত্মীয়ার এই সমস্যা ছিল। বিয়ের আলোচনা উঠলেই সে সপ্তাহ-খানেকের জন্য অসুস্থ হয়ে যেত। রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপে একজন জানিয়েছিল, সে এমনিতে দেখতে-শুনতে ভালো, কিন্তু বিয়ের কথা উঠলেই চেহারা বিবর্ণ (নীল-কালোর মতো) হয়ে যায়।
আবার এমন বেশ কজনের অবস্থা শুনেছি যে, বিয়ের ব্যাপারে অনেকের সাথেই কথা হয়; কিন্তু কথা একটু আগানোর পরে অপরপক্ষ একদম যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। মোট কথা, যেকোনোভাবে ব্যাপারটা আর বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই শয়তানি জাদুর প্রচলন আমাদের দেশে অনেক বেশি। আল্লাহ হেফাজত করুন।
ক. বিয়ে ভাঙ্গার জাদুর কিছু লক্ষণ-
১. মাথাব্যথা। ওষুধ খেয়েও তেমন ফায়দা না হওয়া।
২. প্রায়সময়ই মানসিক অশান্তিতে থাকা; বিশেষত বিকেল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত।
৩. একটুতেই রেগে যাওয়া।
৪. ঘুমের মধ্যে শান্তি না পাওয়া, ঠিকমত ঘুমোতে না পারা, আর ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকক্ষণ কষ্ট হওয়া।
৫. প্রায়সময় পেটব্যথা থাকা।
৬. ব্যাকপেইন; বিশেষত মেরুদণ্ডের নিচের দিকে ব্যথা হওয়া।
৭. বিয়ের কথাবার্তা শুরু হলে অসুস্থ হয়ে যাওয়া।
৮. বিয়ের প্রস্তাবদাতাকে খারাপ মনে হওয়া। তার ব্যাপারে অনর্থক সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া।
৯. বিশেষ কোনো সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও বিয়ের ব্যাপারে একদমই আগ্রহ না থাকা।
১০. বিয়ে আটকে রাখার জাদু করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরাসরি জিনের সাহায্য নেওয়া হয়। এজন্য উল্লিখিত লক্ষণগুলোর পাশাপাশি জিন দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণও মিলে যেতে পারে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এই লক্ষণগুলোর কয়েকটি যদি বিবাহিত কারও মাঝে দেখা যায়, তবে এটা সম্পর্ক বিচ্ছেদের জাদু হিসেবে কাজ করতে পারে। সুতরাং অবহেলা না করে রুকইয়াহ করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই শয়তানি জাদুর প্রচলন আমাদের দেশে অনেক বেশি। আল্লাহ হেফাজত করুন।
খ. বিয়ে সমস্যার জন্য রুকইয়াহ:
সাধারণ নিয়মে রুকইয়াহ করুন এরপর নিচের প্রেসক্রিপশন (নিজের জন্য রুকইয়াহ করলে) নিজে অনুসরণ করুন অথবা (অন্যের ওপর রুকইয়াহ করলে) রোগীকে করতে বলুন। এক মাস পর অবস্থা জানাতে বলুন, প্রয়োজনে আবার রুকইয়াহ করে একই সাজেশন আরেকবার দিয়ে দিন।
গ. প্রেসক্রিপশন
সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯—এই আয়াতগুলো এবং সূরা ফাতিহা, সূরা ফালাক, সূরা নাস তিন বার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিন—
১. এই পানি প্রতিদিন দু'বেলা করে খেতে হবে।
২. আর প্রতিদিন গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করতে হবে। এই কাজগুলো সাত দিন করবেন। আর রুকইয়ার পানি যদি শেষ হয়ে যায় তবে এক বোতল পানিতে উল্লিখিত আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দিয়ে নিলেই হবে।
৩. প্রতিদিন অন্তত ২ ঘণ্টা রুকইয়াহ শুনতে হবে। আয়াতুল কুরসীর রুকইয়াহ ১ঘণ্টা। সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস-এর রুকইয়াহ ১ঘণ্টা। এটা এক মাস করবেন। জিনের সমস্যা একটু বেশি অনুভব করলে এর সাথে সুরা ইয়াসিন, সফফাত, দুখান জিনের রুকইয়াহ অন্তত একবার শুনবেন। যতটুকু সম্ভব নিজেও তিলাওয়াত করবেন।
৪. এছাড়া সিহরের কমন রুকইয়ার বাকি সব পরামর্শ অনুসরণ করবেন।
ঘ. কিছু পরামর্শ
ক. এই জাদুর চিকিৎসা চলাকালীন দিন কয়েক যেতেই অনেকের অসুস্থতা বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে থামিয়ে দেওয়া যাবে না; বরং ধৈর্য ধরে স্বাভাবিক নিয়মেই চালিয়ে যেতে হবে। আস্তে আস্তে সমস্যা কমে আসবে ইনশাআল্লাহ। বেশি কষ্ট হলে যেকোন সময় রুকইয়ার পানি দিয়ে গোসল করে নিন।
খ. ওপরের নিয়ম অনুযায়ী একবার এক মাস রুকইয়াহ করার পর আল্লাহ না করুন যদি বোঝা যায় যে, সমস্যা এখনো যায়নি, তবে আবার ভালোভাবে রুকইয়াহ করবেন। চাইলে মাসে একবার ৭দিনের ডিটক্স করতে পারেন।
গ. রুকইয়ার ব্যাপারে যিনি আপনাকে সাপোর্ট দিচ্ছেন, প্রতি সপ্তাহ শেষে তার সাথে আপনার অবস্থা পর্যালোচনা করুন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম সপ্তাহেই উন্নতি টের পাওয়া যায়। কিন্তু একটু ভালো বোধ করলেই রুকইয়াহ বাদ দিয়ে দেবেন না। সমস্যা একদম দূর হওয়া পর্যন্ত রুকইয়াহ করে যাবেন।
ঘ. শুধু রুকইয়াহ করে বিয়ের আশায় বসে থাকলে চলবে না; বরং এর পাশাপাশি পাত্র বা পাত্রীর সন্ধান করতে হবে। বিয়ের জন্য চেষ্টা করতে হবে। আর আল্লাহর কাছে উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য দুআ করতে হবে।
ঙ. বিয়ের জাদু-সংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনা
১. প্রথম ঘটনা বরিশালের এক ভাইয়ের। তার বিয়ে হচ্ছিল না। তিনি সন্দেহ করছিলেন, কেউ হয়তো তাকে কিছু করেছে। পরে রুকইয়ার পরামর্শে তিনি রুকইয়ার গোসল করা আর রুকইয়াহ শোনা শুরু করেন। পানিতে হাত রেখে ৭ বার করে পড়া; অর্থাৎ বদনজরের জন্য বলা রুকইয়ার গোসলটা তিনি প্রতিদিন করতেন। আর মাঝেমধ্যে রুকইয়াহ শুনতেন। দুই সপ্তাহের মধ্যে আলহামদুলিল্লাহ জাদু নষ্ট হয়ে যায় এবং তার বিয়েও হয়ে যায়।
২. এই ঘটনা মিশরের। এক মেয়ের সমস্যা ছিল, সে এমনিতে সম্মতই থাকে; কিন্তু বিয়ে আসলেই মাথা খারাপ হয়ে যায় এবং এমনিই ভেঙ্গে যায় অথবা সে-ই না করে দেয়। পরে আবার বিশেষ কোনো কারণ খুঁজে পায়না-কেন সে বিয়ে ভাঙল! এরপর সে এক শাইখের কাছে গেলে তিনি তার রুকইয়াহ করেন এবং এতে করে জিন চলে আসে। জিনটা মুসলিম ছিল। সাধারণ দাওয়াতেই সে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে চলে যায়। পরে সব ঠিক হয়ে যায়। সুতরাং কেউ জাদু আক্রান্ত না, কিন্তু অন্য কোন কারণে যদি জিনের আসর থাকে, তখনও বিয়েতে এধরণের সমস্যা হতে পারে।
৩. ঘটনাটি চট্টগ্রামের এক বোনের। তার আকদ হবার দুদিন আগে উল্লেখযোগ্য কোনো কারণ ছাড়াই বিয়ে ভেঙ্গে যায়। এরপর যত পাত্রের সাথে বিয়ের ব্যাপারে কথা হয়, তারা বলে তাদের পছন্দ হচ্ছে; কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। শেষে আর বিয়ে হয় না। তিনি প্রথমে এক সপ্তাহ বদনজরের রুকইয়াহ করেন। এরপর সাপোর্ট গ্রুপ থেকে তাকে বিয়ের জাদুর রুকইয়াহ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে একবার আমি সরাসরি তার রুকইয়াহ করেছিলাম। সমস্যা ধীরে ধীরে কমছিল। সৌভাগ্যবশত তিনি ধৈর্যহারা না হয়ে রুকইয়াহ করে যাচ্ছিলেন। পরে তাকে সাত দিনের ডিটক্স করতে বলেছিলাম। এর কিছুদিন পর পুনরায় তার বিয়ের কথা-বার্তা শুরু হয়। কিন্তু এবারও চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যাচ্ছিল না। তিনি সাপোর্ট গ্রুপে আপডেট জানান এবং নিজে নিজে রুকইয়াহ করতে থাকেন। অবশেষে প্রায় দুই মাস সবরের সাথে বিভিন্ন প্রকার রুকইয়ার পর আল্লাহর রহমতে তার বিয়ে হয়ে যায়।
📄 সম্পর্ক বিচ্ছেদ ঘটানোর জাদু
দুজন মানুষের মাঝে বা কোনো পরিবারে বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্য জাদু করলে দেখা যায়- সব ভালোই ছিল, হঠাৎ একজন অপরজনকে সহ্য করতে পারছে না। এই জাদু যেমন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল ধরানোর তেমনি পরিবারের অন্যান্য সদস্য- যেমন: পিতা-মাতা, ভাই-বোন ইত্যাদি—এর সম্পর্কে ফাটল ধরাতেও করা হয়। দুই বন্ধু বা ব্যবসার পার্টনারদের মধ্যে ঝামেলা বাঁধাতেও করা হয়। আর কখনো এমনও হয় যে, বিয়ের আগে কেউ জাদু করে রেখেছে, তাই বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনোভাবেই বনিবনা হয় না। ফলে সম্পর্ক খুব দ্রুতই বিচ্ছেদের দিকে গড়ায়।
এই কুফরী জাদুর পরিধি যেমন ব্যাপক, প্রাচীনকাল থেকে এর চর্চাও তেমনি অনেক বেশি। এমনকি স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে এই জাদুর কথা উল্লেখ করেছেন—
وَمَا يُعَلِّمِنِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ
“...তারা উভয়ে একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরীক্ষার জন্য; কাজেই তুমি কাফের হয়ে যেয়ো না। এরপর তারা তাদের কাছে এমন জাদু শিখে নিত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত...।” ১
আলোচনার সুবিধার্থে আমরা স্বামী-স্ত্রীর প্রসঙ্গ নিয়েই আলোচনা করছি। পাঠকরা অন্যান্য সম্পর্কগুলোকে এর সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন।
ক. সম্পর্ক বিচ্ছেদ ঘটানোর জাদুর লক্ষণ—
১. স্বামী বাইরে থাকলে ভালো থাকে; কিন্তু বাড়িতে প্রবেশ করলেই দুজনের মাঝে কারও মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।
২. খুব বেশি সন্দেহপ্রবণ হয়ে যায়।
৩. ছোট ছোট বিষয়েও ছাড় দিতে চায় না; একটুতেই ঝগড়া বেধে যায়।
৪. স্ত্রী দেখতে যতই সুন্দর হোক, স্বামীর কাছে খারাপ লাগে। স্ত্রী সাজগোজ করলে বিরক্ত লাগে।
৫. স্বামীর ভালো কথাবার্তা বা সুন্দর আচরণও স্ত্রীর কাছে বিরক্তিকর মনে হয়।
৬. স্বামীর ব্যবহৃত জিনিস বা বসার জায়গা স্ত্রী অপছন্দ করে।
৭. অন্যদের সাথে আচরণ স্বাভাবিক থাকলেও স্বামী-স্ত্রী কথা বলতে গেলেই ঝামেলা বাধে।
এরকম ঘটনা যদি সচরাচর ঘটতেই থাকে, তবে বুঝতে হবে, কোনো একটা সমস্যা আছে। আর হ্যাঁ, প্রত্যেকের সাথে সব লক্ষণই মিলবে—ব্যাপারটা এমন নয়। তবে অন্তত ২-৩ টা মিলে যাওয়ার কথা। আর সাথে জিন-আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণও মিলতে পারে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য রুকইয়াহ করে দেখতে হবে।
খ. বিচ্ছেদ ঘটানোর জাদুর জন্য রুকইয়াহ
লক্ষণগুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন করে নিশ্চিত হয়ে এরপর সাধারণ নিয়মে রুকইয়াহ করুন, তবে এই জাদুর রুকইয়াহয় সুরা বাকারার ১০২নং আয়াত অধিক পরিমাণে পড়া ভালো। রুকইয়ার পর এক মাস নিচের প্রেসক্রিপশন নিজে অনুসরণ করুন অথবা রোগীকে অনুসরণ করতে বলুন। আর এক মাস পর অবস্থা জানাতে বলুন, প্রয়োজনে তখন আবার রুকইয়াহ করে একই পরামর্শ আরেকবার দিয়ে দিন।
গ. প্রেসক্রিপশন
একটা বোতলে পানি নিয়ে সূরা বাকারা: ১০২, সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯ আয়াতগুলো এবং সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ে ফুঁ দিন।
১. এই পানি প্রতিদিন দু'বেলা খাবেন।
২. আর প্রতিদিন গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করবেন। (প্রতিদিন গোসল করতে না পারলে ২-৩ দিনে অন্তত ১ দিন করুন)
৩. সূরা ইয়াসিন, সফফাত, দুখান, জিন (অথবা ৮ সূরার রুকইয়াহ) প্রতিদিন তিন বার তিলাওয়াত করবেন অথবা শুনবেন। কোনো দিন সময় কম থাকলে একবার হলেও শুনবেন। যতটুকু সম্ভব নিজেও তিলাওয়াত করবেন।
৪. আয়াতুল কুরসীর রুকইয়াহ (আয়াতুল কুরসী বারবার তিলাওয়াত করা অডিও) প্রতিদিন আধঘণ্টা বা এর বেশি শুনবেন।
৫. প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তিগফার এবং 'লা-হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহ' পড়বেন। আরও বেশি পড়লে আরও ভালো।
৬. এছাড়া সিহরের কমন রুকইয়ার বাকি সব পরামর্শ অনুসরণ করবেন।
লক্ষণীয়: এখানে সূরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতও পড়তে হয়েছে, যা আগের অনুচ্ছেদে ছিল না।
ঘ. গুরুত্বপূর্ণ নোট
ক. এই সমস্যা একদম ভালো হতে কয়েক মাসও লাগতে পারে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে প্রথম ১০-১৫ দিন সমস্যা বাড়ে। তারপর ধীরে ধীরে কমতে কমতে মাসের শেষে সমস্যা একদম ভালো হয়ে যায়।
সবার ক্ষেত্রেই সমস্যা প্রথমে বাড়বে—এমন নয়। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে থাকে। এজন্য আগেই বিষয়টির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত—সমস্যা বাড়তে দেখলে যেন কোনোভাবেই রুকইয়াহ ছেড়ে না দেওয়া হয়।
অন্য কারও ওপর রুকইয়াহ করলে প্রেসক্রিপশন দেওয়ার সময় এটা গুরুত্বের সাথে বলে দেবেন, সমস্যা বাড়লে যেন রুকইয়াহ বন্ধ করে না দেয়; বরং রুকইয়াহ যেন আগের নিয়মেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে করতে থাকে।
খ. কখনো দেখা যায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের জাদু করা হয়েছে, আর উভয়েই জাদুতে আক্রান্ত। এরপর যেকোনো একজন সমস্যা বুঝতে পেরে চিকিৎসা করতে চাচ্ছে, অথচ দুজন দুই জায়গায় অবস্থান করছে। এক্ষেত্রে দু'ভাবে রুকইয়াহ করা যেতে পারে—
প্রথম পদ্ধতি হচ্ছে, রুকইয়ার সময় সাধারণ নিয়ত রাখা— 'আমাদের পরিবারে বিচ্ছেদের জাদুর জন্য রুকইয়াহ করছি।' অর্থাৎ দুজনের জন্যই নিয়ত করা। দুজনেরই সমস্যা থাকলে আর এভাবে রুকইয়াহ করলে সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে। কারণ, নির্দিষ্ট নিয়তে রুকইয়াহ করলে উপকার বেশি হয়।
আর দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, প্রথমে নিজের নিয়তে রুকইয়াহ করা। নিজের ওপর থেকে জাদুর লক্ষণগুলো দূর হয়ে গেলে এরপর স্বামীর নিয়তে করা। স্বামীর জন্য রুকইয়ার সময়ও হুবহু সেই কাজগুলোই করতে হবে, যা নিজের জন্য রুকইয়াতে করা হয়েছে। তবে তিলাওয়াত একটু বেশি শোনা উচিত।
আর সর্বোপরি আল্লাহর কাছে দুআ করতে হবে, যেন সকল জাদু ধ্বংস হয়ে যায়। পরিবারের সবার মধ্যে আবার পূর্বের মতো স্বাভাবিক সম্পর্ক ফিরে আসে।
ঙ. বিচ্ছেদের জাদু বিষয়ক কিছু ঘটনা
ঘটনা-১: প্রবাসী এক বোনের কথা। রুকইয়ার আয়াত পড়লেই তিনি মুখে তেঁতো ভাব অনুভব করতেন। আমাদের পরামর্শ অনুসারে তিনি এক সপ্তাহ জাদুর জন্য রুকইয়াহ করেন। এতে তার সমস্যাগুলো সাময়িকভাবে দূর হয়েছিল। কিন্তু তিনি এরপর আর রুকইয়াহ করেননি, সকাল-সন্ধ্যার এবং ঘুমের আগের মাসনূন আমলগুলোও করেননি।
ফলে কিছু সমস্যা প্রকট হতে থাকে। তিনি নিজের এবং স্বামীর আচরণের দিকে লক্ষ করে বুঝতে পারেন, তাদের বিচ্ছেদের জাদু করা হয়েছে। একই সাথে তার ইস্তিহাযার সমস্যাও দেখা দেয়। তার স্বামীও স্বপ্নে নানা ধরনের প্রাণীর সাথে মারামারি করতে দেখতেন। তিনি আবারও সিহরের রুকইয়াহ শুরু করেন। এ সময় তার বমি বমি ভাব হতো; কিন্তু বমি হতো না। পাঁচ-ছয় দিন সিহরের রুকইয়াহ করার পর তিনি ৭ দিনের ডিটক্স করেন। তৃতীয় দিনের মাথায় তার পিঠের নিচের দিকে এবং তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা ওঠে এবং তিনি বমি করতে থাকেন। বমি হয়ে যাবার পর তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেন। তার স্বামীও ডিটক্স করেছিলেন, এরপর থেকে তার স্বপ্ন দেখাও বন্ধ হয়ে যায়। আলহামদুলিল্লাহ, এখন তারা সুখী সংসার যাপন করছেন।
ঘটনা-২: এক বোনের ঘটনা। তিনি এবং তার স্বামী বিচ্ছেদের জাদুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কেউ তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখে হিংসা করে জাদু করেছিল। তার স্বামী আয়-রোজগারের জন্য প্রবাসে থাকতেন। একবার বাড়ি এসেছিলেন। তখনই তিনি এই জাদুতে আক্রান্ত হন। ছুটির শেষের দিকেই বারবার দুজনের মধ্যে ঝামেলা হচ্ছিল। ফিরে গিয়ে স্ত্রীর সাথে প্রায় যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। তখন ওই বোন ধারণা করেছিলেন, শুধু তার স্বামীকেই জাদু করা হয়েছে। কিন্তু রুকইয়াহ করতে গিয়ে দেখা গেল, তার মধ্যেও জাদু-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। এরপর আমি তাকে নিজের জন্য রুকইয়াহ করতে বলি। দুই-তিন সপ্তাহ পর তার মধ্য থেকে জাদুর লক্ষণগুলো চলে যায়। এরপর চল্লিশ দিন তার স্বামীর নিয়তে রুকইয়াহ করেন। আল্লাহর অনুগ্রহে তাদের সম্পর্ক প্রায় স্বাভাবিক হয়ে আসে। আমি তাকে সমস্যা সম্পূর্ণ দূর হওয়া পর্যন্ত রুকইয়াহ করার পরামর্শ দিই, আর বলি, তার স্বামীকে যেন সমস্যার ব্যাপারে বুঝিয়ে রুকইয়াহ করতে রাজি করেন।
ঘটনা-৩: প্রায় কাছাকাছি ঘটনা আছে আরেকজনের। এক ভাই কর্মসূত্রে বিদেশে থাকতেন। তিনি হঠাৎ স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। তিনি তার স্ত্রীকে প্রচুর সন্দেহ করতেন। তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি প্রচণ্ডভাবে রাগারাগি শুরু করতেন। তার স্ত্রীও তাকে সহ্য করতে পারছিলেন না। বারবার ডিভোর্সের কথা উঠছিল। এভাবে ৩ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর তার স্ত্রী রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপের পরামর্শে রুকইয়াহ শুরু করেন। শুরুতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে তিনি ধারাবাহিকতার সাথে রুকইয়াহ করেন। করে যাচ্ছিলেন। কয়েকদিন পর কিছুটা সুস্থ হলেও রুকইয়াহ শুনতে গেলে অনেক কষ্ট হতো, স্বপ্নে ভয় দেখাত, ধমক দিত। এছাড়াও আরও অনেক সমস্যা হতো। এরপরও তার স্ত্রী থেমে না গিয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই রুকইয়াহ করতে থাকেন। তিন সপ্তাহ পর তিনি স্ত্রীকে ফোন দেন। এরপর তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়, আলহামদুলিল্লাহ।
টিকাঃ
১. সূরা বাকারা : ১০২
📄 আসক্ত বা বশ করার জাদু
এই সমাজে প্রচলিত সবচেয়ে জঘন্য জাদুগুলোর একটি হচ্ছে 'আসক্ত বা বশ করার জাদু'। অর্থাৎ জাদুর মাধ্যমে কাউকে নিজের প্রতি আসক্ত বা অনুগত বানিয়ে নেওয়া। এটা সাধারণত পরিচিতজনদের মধ্যে কেউ করে থাকে।
কখনো সন্দেহপ্রবণ স্ত্রী জাদু করে। কখনো-বা সম্পদের লোভে পুত্র বা রক্ত সম্পর্কের কেউ করে। এই জাদুর সবচেয়ে জঘন্য ব্যবহার হচ্ছে, কাউকে জোর করে বিয়ে করার জন্য এই জাদু করা হয়। কখনো তাবীজের নামে, কখনো তদবীরের নামে, কখনো-বা দুআ-কালামের নামে ভণ্ড কবিরাজরা সামান্য টাকার লোভে এই জাদু করে থাকে। সাধারণ মানুষ ইসলামী ওযীফা ভেবে গ্রহণ করে, দুনিয়া এবং আখিরাতে সর্বনাশ করে।
তবে এই জাদু সবচেয়ে বেশি করে 'হিংসুক স্ত্রী এবং শাশুড়িরা'। স্ত্রী জাদু করে এজন্য যে, স্বামী যেন শুধু তার কথাই শোনে অন্য কারও কথা না শোনে, আর শাশুড়ি নিজ ছেলেকে জাদু করে, যেন ছেলে স্ত্রীর কথা না শুনে শুধু মায়ের কথা শুনে। ১
প্রিয় পাঠক, খেয়াল রাখা উচিত, এটা অনেক বড় গুনাহ। শুধু গুনাহই নয়; বরং ঈমান বিধ্বংসী একটি কাজ। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, নিশ্চয় মন্ত্রপাঠ, তাবীজ-কবচ এবং বশ করার জাদু শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ২
সুতরাং আমাদের সাবধান হওয়া উচিত।
তবে এই আলোচনাতেও আমরা স্বামী-স্ত্রীর কথা উল্লেখ করে বলব। পাঠক সে অনুযায়ী অন্যদের সাথে মিলিয়ে নেবেন।
ক. বশ করার জাদুর লক্ষণ
১. সবসময় স্ত্রীর চিন্তা মাথায় ঘোরা, অন্যকিছুতে মন দিতে না পারা।
২. সবসময় স্ত্রীকে দেখতে ইচ্ছা হওয়া, বাড়ির বাইরে থাকতে না পারা। বাড়িতে থাকলে সারাদিন স্ত্রীর পিছুপিছু ঘোরা।
৩. যখন-তখন স্ত্রীর সঙ্গে শুধু সঙ্গম করতে ইচ্ছে হওয়া। সারাদিনে এই চিন্তা মাথায় ঘোরা। সহবাসের ব্যাপারে অধৈর্য হয়ে যাওয়া।
৪. বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই কারও প্রতি অতিরিক্ত অনুরক্ত হয়ে যাওয়া।
৫. যাকে পছন্দ করতেন না বা পাত্তা দিত না, হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই তার প্রতি তীব্র ভালোলাগা শুরু হয়ে যাওয়া।
৬. কোনো বাছ-বিচার ছাড়াই স্ত্রীর কথা অন্ধের মতো মানতে শুরু করা। পরে যদিও-বা কখনো এটা বুঝতে পারে, তারপরও অজানা কারণে তার প্রতি নিজেকে বাধ্য মনে হওয়া।
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, প্রচলিত জাদুগুলোর মধ্যে এই জাদুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উল্টাপাল্টা প্রভাব হয়। কারণ, জাদুর পানীয় বা 'পোশন' তৈরি বেশ কঠিন কাজ আর এই জাদুতে বেশি পরিমাণে পোশন ব্যবহার হয়। ফলে বেশিরভাগই এখানে ভুল করে আর বিভিন্ন ক্ষতি হয়ে যায়। যেমন:
১. কখনো আসক্ত হওয়ার বদলে বিরক্তিকর মনোভাব বেড়ে যায়। এমনকি অনেক সময় সকল মেয়ে মানুষের প্রতি ঘৃণা চলে আসে।
২. এই বিপরীত প্রভাবের জন্য কেউ হুট করে বউকে তালাকও দিয়ে দেয়।
৩. কখনো স্ত্রী বাদে বাকি সবাই—যেমন: ভাই-বোন, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনদের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে যায়।
৪. এর প্রভাবে মানুষ কখনো একদম পাগল হয়ে যায়। কেউ একদম পাগল না হলেও প্রায় পাগলের মতো আচরণ করে।
৫. এর প্রভাবে কখনো মারাত্মক অসুস্থ হয়ে যায়। তখন কাজকর্ম তো দূরের কথা, বিছানা থেকেই উঠতে পারে না। আর এজন্য ডাক্তারের চিকিৎসা করেও তেমন কোনো উপকার হয় না।
এই জঘন্য জাদুর কারণে এমন অনেক উল্টাপাল্টা সমস্যা হয়ে থাকে।
এই জাদুর ক্ষেত্রে সাধারণত জাদুর পানীয় বা মিষ্টি কোনো দ্রব্যের ওপর মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিয়ে সেটা খাওয়ানো হয়। হাঁটাচলার রাস্তায় জাদুর পানীয় ঢেলে দেওয়া হয়, যা অতিক্রম করলে জাদু-আক্রান্ত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আশা করা যায়, সেলফ রুকইয়াহ খুব ভালোভাবেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। কখনো ব্যবহৃত জামা কাপড়ের অংশ দিয়ে জাদু করা হয়। সেক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে দুআ করতে হবে, আর রুকইয়ার সময় নিয়ত করতে হবে, যেন জাদু নষ্ট হয়ে যায়। এই জাদুর একটা জঘন্য দিক হচ্ছে, স্ত্রীর শরীরের ময়লা বা হায়েযের রক্ত দিয়ে জাদু করা হয়। এরপর স্ত্রীকে বলা হয়, এই নোংরা বস্তুটা কোনো খাবারের সাথে মিশিয়ে স্বামীকে খাইয়ে দিতে।
এই জাদুতে কেউ আক্রান্ত হলে সাধারণত এমনিতেই বোঝা যায়। সমস্যা কম থাকলে নিজের মানসিকতায় অদ্ভুত পরিবর্তন দেখে নিজেই টের পায় অথবা আশেপাশের অন্যরা হঠাৎ অদ্ভুত পরিবর্তন দেখে আঁচ করতে পারে। তবে সচরাচর এই জাদু যেহেতু স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই করা হয়, তাই পাপিষ্ঠ ব্যক্তি চাইবে তাড়াতাড়ি উদ্দেশ্য সাধন করে ফেলতে। তাই যদি কেউ অতিমাত্রায় আক্রান্ত হয়ে যায় তাহলে অন্যদের উচিত হবে, যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার পদক্ষেপ নেওয়া।
এখানে একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, সাধারণত পরিচিত আত্মীয়স্বজন বা নিজের ঘরের মানুষই জাদুটা করে। তাই আপনি চিকিৎসা করছেন, এটা যেন অন্যরা জানতে না পারে। জানলে আবার জাদু করার সম্ভাবনা আছে। এজন্য সতর্ক থাকতে হবে। এটা নিয়ে গল্পগুজব করা যাবে না। এমনকি সুস্থ হওয়ার পরেও না।
এই বিষয়টা নিজের জন্য রুকইয়াহ করলে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। আর অন্য কারও ওপর রুকইয়াহ করলে তাকেও সতর্ক করে দেবেন।
খ. আসক্ত করার জাদুর জন্য রুকইয়াহ
জাদুর রুকইয়ার স্বাভাবিক নিয়মেই করবেন, তবে রুকইয়ার অন্য আয়াতগুলোর সাথে এই আয়াতগুলোও পড়তে পারেন-
১. সূরা বাকারা: ১৬৫, ১৬৬
دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَ وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ إِيا
الَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْ يَرَوْنَ الْعَذَابَ أَنَّ الْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ )
إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتَّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ )
২. সূরা ইউসুফ: ৩০
وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي الْمَدِينَةِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ تُرَاوِدُ فَتْهَا عَنْ نَّفْسِهِ قَدْ شَغَفَهَا حُبًّا إِنَّا لَنَرَاهَا فِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ)
৩. সূরা তাগাবুন: ১৪, ১৫, ১৬
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَ إِنْ تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَ أَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللَّهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَ اسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنْفِقُوا خَيْرًا لِأَنْفُسِكُمْ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ )
রুকইয়াহ শেষে নিচের পরামর্শ অনুসরণ করতে বলুন আর ৩ সপ্তাহ পর আপডেট জানাতে বলুন, প্রয়োজনে আবার একই প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিন। ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।
গ. প্রেসক্রিপশন
একটা বোতলে পানি নিয়ে আয়াতুল কুরসী, সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১- ৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯, সূরা তাগাবুন: ১৪-১৬ আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দিন। এরপর চাইলে উপরের আয়াতগুলোও পড়তে পারেন।
১. তিন সপ্তাহ সকাল-বিকাল এই পানি খাবেন। মাঝেমাঝে গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করবেন।
২. প্রতিদিন অন্তত একঘণ্টা রুকইয়াহ শুনবেন। এক্ষেত্রে কোনো সাধারণ রুকইয়াহ এবং সূরা তাগাবুন কয়েকবার শুনতে পারেন। সম্ভব হলে নিজে তিলাওয়াত করুন। সময় কম থাকলে শুধু সূরা তাগাবুন কয়েকবার পড়তে বা শুনতে পারেন।
৩. এছাড়া “রুকইয়াহ যিনা” নামক রুকইয়ার অডিওটি, সূরা ইউসুফ এবং সূরা নূর এক্ষেত্রে বেশ উপকারি। জাদুর সমস্যা প্রকট অথবা বেশিদিনের পুরোনো হলে কিংবা সাথে জিনের সমস্যাও আছে মনে হলে এই রুকইয়াগুলোও শুনবেন। সম্ভব হলে নিজে কিছুটা তিলাওয়াত করবেন।
৪. এছাড়া সিহরের কমন রুকইয়ায় বলা বাকি পরামর্শগুলো অনুসরণ করবেন।
ঘ. বশ করার জাদুর কিছু ঘটনা
ঘটনা-১: প্রথম ঘটনা মিসরের। আমরা বলেছিলাম, এই জাদুতে সবচেয়ে বেশি উল্টাপাল্টা হয়। এক মহিলা তার স্বামীকে বশ করার জাদু করতে কবিরাজের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু জাদু উল্টা কাজ করেছিল, ফলে তার স্বামী হঠাৎ করেই প্রচণ্ড রাগারাগি শুরু করে দেয়। এমনকি সব মেয়ে লোকদের ঘৃণার চোখে দেখা শুরু করে এবং কয়েকদিন না যেতেই ওই মহিলাকে তালাক দিয়ে দেয়।
ঘটনা-২: এক মাদরাসা সুপারের ঘটনা। কোনোভাবে এক মাজারভক্ত লোকের সাথে তার পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। চলা-ফেরা, খাওয়া-দাওয়া একসাথে হতে থাকে। আর পরিবারের লোকদের সাথে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। ওই লোকের সাথে যেদিন দেখা হতো, সেদিন তিনি বাসায় ফিরে অন্যদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন। বাড়ির সবাই নিষেধ করলেও তিনি কারও কথাই শোনেন না। এরই মধ্যে বিদআতি লোক তার পরিবারের নামে আজেবাজে কথা ছড়ানো শুরু করলে পরিবারের বড় ছেলে সালিশ ডাকে। সেদিন সুপার সাহেবকে অদ্ভুত বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। সালিশে ওই লোক সবার কাছে মাফ চায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে না বলে ওয়াদা করে। কিন্তু এক মাস না যেতেই দেখা গেল তাদের মধ্যে আবারও যোগাযোগ হচ্ছে। তখন পরিবারের সবার জেরার মুখে মাদরাসা সুপার সাহেব ব্যাপারটা স্বীকার করেন। কান্নাকাটি করে বলেন যে, ওই লোকের সঙ্গে কথা না বললে তার শান্তি লাগে না, রাতে স্বপ্নে দেখেন যোগাযোগ করার জন্য... ইত্যাদি। এ-ও বলেন যে, ঘরের কারও জন্য তার কোনো রকম ভালোবাসা বা টান অনুভব হয় না। তাদের দেখলে বরং মেজাজ খারাপ হয়।
এরপর রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপ থেকে পরামর্শ নিয়ে তাকে রুকইয়াহ শোনানো হলে বুক ধড়ফড় করে, প্রচুর ক্লান্তি আর ঘুম অবশ লাগে। তখন ধারাবাহিকভাবে সাত দিন রুকইয়াহ শোনা এবং গোসল করার পর আলহামদুলিল্লাহ তার অবস্থার উন্নতি হয়। ওই লোকের প্রতি আসক্তি চলে যায়। পরিবারের লোকদের সঙ্গে ঝামেলা থেমে যায়। এরপর সমস্যা একদম দূর হওয়ার জন্য তাকে আরও একসপ্তাহ রুকইয়াহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়, আর বলা হয়, যেন প্রতিদিনের মাসনূন আমল গুরুত্বের সাথে করে।
বিদআতিরা এমন বহুভাবে সমাজ কলুষিত করে থাকে। সত্যি বলতে, এদের মধ্যেই কুফরী জাদুর চর্চা সবচেয়ে বেশি। এদের দ্বারাই মুসলমানদের মধ্যে কুফরী তাবীজ-কবচের চর্চা বিস্তার লাভ করেছে। এমনকি অনেক ভণ্ডপীর শিন্নির মধ্যে বশ করার মন্ত্র পড়ে রাখে, ফলে সেটা খেলে মানুষ ওই পীরের ভক্ত হয়ে যায়। এজন্য বিদআতিদের অনুষ্ঠানে যাওয়া অথবা তাদের মিষ্টান্ন গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্নরুপে বিরত থাকা উচিত। আল্লাহ যেন উম্মতকে এদের ফিতনা থেকে হেফাজত করেন, আমীন।
টিকাঃ
১. 'তিওয়ালা' শব্দের অর্থ 'আসক্ত বা বশ করার জাদু, বশ করার জাদুর পানীয় বা Love potion'। মুহাদ্দিসীনে কিরাম এরকমই বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ: ইবনুল আসীর রহ.-এর বক্তব্য দেখা যেতে পারে-নিহায়া: ১/২২২। এছাড়া মোল্লা আলী কারী রহ. এবং ইমাম খাত্তাবী রহ.-ও অনুরূপ অর্থ করেছেন।
২. আবূ দাউদ: ৩৮৮৩