📘 রুকইয়াহ > 📄 জাদুর চিকিৎসা প্রসঙ্গে কিছু কথা

📄 জাদুর চিকিৎসা প্রসঙ্গে কিছু কথা


কিছু সতর্কতা

১. উল্লিখিত প্রথম কারণে কোনো কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করতে গেলে যদি আপনার কাপড় চায়, ভুলেও দেবেন না। বুঝে নিন, সে জাদুকর।
২. বাড়িতে মেহমান এসেছিল। কদিন পর খেয়াল করলেন, একটা কাপড়ের কোণাকাটা, অথবা চিরুনি হারিয়ে গেছে; সাথে চুল ছিল। সাথে সাথে সাবধান হয়ে যান। মাসনূন আমলের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিন। সমস্যার সন্দেহ হলে রুকইয়াহ করুন।
৩. উল্লিখিত দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কারণে সিহরের তথা জাদুর জন্য রুকইয়াহ করতে লাগলে কখনো রোগীর ওপর জিন চলে আসে। এজন্য রাক্বীর মানসিক প্রস্তুতিও থাকা জরুরি। (বিস্তারিত পরে বলা হবে ইনশাআল্লাহ)

জাদুর চিকিৎসা প্রসঙ্গে কিছু কথা

১. কারও ওপর একই সাথে একাধিক জাদু করা হতে পারে। তখন ধৈর্যের সাথে একটা একটা করে চিকিৎসা করতে হবে। যদি জাদু, জিন, বদনজর-এরকম একাধিক সমস্যা থাকে তাহলে প্রথমে বদনজরের রুকইয়াহ করবেন, এরপর জাদু এবং জিনের জন্য রুকইয়াহ করবেন। জাদুর নিয়াতে রুকইয়াহ করলেও ভেতরে জিন লুকিয়ে থাকতে পারে না, বাধ্য হয়েই বের হয়ে আসে।
২. রুকইয়ার কারণে বমি-বমিভাব, শরীর ব্যথা, মাথা ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে এসব থামাতে ওষুধ খাবেন না। অবস্থা বেশি খারাপের দিকে গেলে বা আশঙ্কা থাকলে তখন ভিন্ন কথা। আর এ ক্ষেত্রে প্রথম অধ্যায়ের রুকইয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো লেখাটি অবশ্যপাঠ্য।
৩. জাদুর জন্য রুকইয়াহ করে সুস্থ হলে এটা সবার সাথে আলোচনা করা উচিত নয়। হিংসুক ব্যক্তি জানলে আবার জাদু করতে পারে। সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন, সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমের আগের মাসনূন আমল গুরুত্বের সাথে পালন করুন। পরিশিষ্টে “কিভাবে বুঝব আমার রুকইয়াহ করা শেষ” অংশ দ্রষ্টব্য।
৪. 'কে আপনাকে জাদু করেছে'- এটা জানার জন্য অস্থির হওয়া উচিত নয়। আর এজন্য শরীয়ত সম্মত বিশেষ কোনো আমল আছে বলেও আমার জানা নেই। কোনো ওযীফার মাধ্যমে যদি স্বপ্নে জানার উপায় থাকে, তবে এটাও আপনার জানা উচিত-স্বপ্ন কোনো বিষয়ের প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট হতে পারে না। কারণ, শয়তানও স্বপ্ন দেখায়, সারাদিনের চিন্তাভাবনা থেকেও স্বপ্ন তৈরি হয়। আর ইসলামী শরীয়াতেও উম্মতের কারও স্বপ্ন কোনো বিষয়ের দলিল হয় না।
অনেক সময় রুকইয়াহ করতে গেলে জিন নিজেই বলে 'অমুক আপনাকে জাদু করেছে', এটা সাথে সাথে বিশ্বাস না করার দু আরও পিডিএফ বই ডাউনলোড করুন। ছ-প্রথমত: জিনটা কাফির, কমসে কম ফাসিক; আর ফাসিকের খবর গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত: খবিস জিন অনেক সময় এসব ব্যাপারে মিথ্যা বলে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য। সুতরাং অন্য কোনো প্রমাণ ছাড়াই তার কথা বিশ্বাস করা নিজেই নিজের ক্ষতি করার নামান্তর।
তবে একটা মজার বিষয় হচ্ছে, শরয়ী পন্থায় রুকইয়াহ করার পর অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয়, জাদু যে করেছে সমস্যাগুলো তার দিকে ফিরে যায়। হুবহু সব সমস্যায় না ভুগলেও দীর্ঘদিনের জন্য তার ঠিকানা হিসেবে বিছানা অথবা হাসপাতাল নির্ধারিত হয়ে যায়, কেউ-বা সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

৫. যদি বারবার জাদু করে...। কুফরী জাদু আমাদের দেশে এতটাই সহজলভ্য যে, এক বার সুস্থ হলে আবার জাদু করা, বারবার জিন পাঠিয়ে জাদু করা (জিন চালান দেওয়া) এসব ঘটনা হরহামেশা ঘটছে। এটা সমাজে নীরব মহামারির রূপ ধারণ করেছে। আচ্ছা, আপনি কী করবেন যদি কেউ এভাবে আপনার পেছনে লাগে?
যদিও মানুষকে অভিশাপ দেওয়া উচিত নয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষে এ ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এক্ষেত্রে কর্তব্য হচ্ছে, প্রথমে রুকইয়াহ করা, নিয়মিত দুআ-কালাম পড়ে নিজের হেফাজতের ব্যবস্থা করা। এরপরও যদি দেখেন কেউ পেছনে লেগেই আছে তখন আপনি শয়তান এবং তার অনুসারীদের কার্স (curse) করতে পারেন, তথা অভিশাপ দিতে পারেন। ১
অভিশাপ দেওয়ার একটি উত্তম পদ্ধতি বলা হচ্ছে, যেসব আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা অথবা কোনো নবী আলাইহিস সালাম জালিম বা কাফিরদের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন বলে উল্লেখ আছে, (যেমন: সূরা বাকারা: ৮৯-৯০, ১২১-২২, সূরা নিসা: ৪৭, সূরা আরাফ: ৩৮, সূরা হুদ: ৯৮-১০২, সূরা রাদ: ২৫, সূরা কাসাস: ৪০-৪৪, সূরা আহযাব: ৬৮, সূরা নূহ : ২৫-২৮, সূরা লাহাব) এ রকম কিছু আয়াত তিলাওয়াত করা।
এরপর তাহাজ্জুদ বা সাধারণ নফল সালাত আদায় করা, এরপর দুআর মাঝে তাদের অভিশাপ দেওয়া। অথবা সালাতে সূরা ফাতিহার পর এরকম কিছু আয়াত তিলাওয়াত করা এবং সালাত শেষে অভিশাপ দেওয়া। আল্লাহর কাছে দুআ করা-যেন জাদুকর, জাদুকরের সহায়তাকারী জিন এবং জাদুকরদের কাছে গমনকারী মানুষ শয়তানদের আল্লাহ পাকড়াও করেন, তাদের ধ্বংস করে দেন। এভাবে পরপর কয়েকদিন করতে থাকা। ২
সতর্কতা হচ্ছে, অভিশাপ একটি স্পর্শকাতর বিষয়। যদি এ পর্যন্ত না গিয়ে পারা যায়, তবে না যাওয়াই উত্তম।

৬. আক্রান্ত ব্যক্তি যদি স্বপ্নে অথবা বাস্তবে শয়তান জিনকে দেখতে পায়, তাহলে উচিত হবে ভয় না পেয়ে শয়তানকে ধাওয়া করা বা মারতে চেষ্টা করা। স্বপ্নে জাদুর জিনিস দেখতে পেলে তখনই নষ্ট করে ফেলা। কারণ স্বপ্নে জাদুর কাজে নিয়োজিত জিনকে হত্যা করলে বা জাদু নষ্ট করলে সাধারণত এটা বাস্তবে ঘটে যায়। আর শয়তানকে হাতের কাছে না পেলে, দূর থেকেই হত্যার নিয়তে আয়াতুল কুরসী পড়তে থাকুন।
৭. জিন দিয়ে করা জাদুতে আক্রান্ত হলে খবিস জিন অনেককে যৌন হয়রানি করে, এসব ক্ষেত্রে নিয়মমাফিক রুকইয়া করার পাশাপাশি ৩য় অধ্যায়ের "রাত্রীতে জিনের সমস্যা" লেখাটাও অনুসরণ করুন।
৮. সুস্থ হতে হতে অনেকদিন লেগে গেলে প্রতিদিন সূরা বাকারা তিলাওয়াতের অভ্যাস করুন, পুরাটা শেষ করতে না পারলেও প্রতিদিন কমপক্ষে আধাঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিট সূরা বাকারা থেকে তিলাওয়াত করার চেষ্টা করুন। আর তিলাওয়াটা দিনের শুরুতে করতে পারলে সবচেয়ে ভাল।
৯. এই গ্রন্থের শেষে “রুকইয়ার প্রসিদ্ধ আয়াত সমূহ” নামে যে আয়াতগুলো যুক্ত করা হয়েছে, সব ধরনের রুকইয়ার জন্যই সেগুলো পড়া যায়। সিহরের রুকইয়ার জন্যও সেগুলোই পড়বেন। তবে রুকইয়াহ করার সময় -সূরা বাকারা: ১০২, সূরা আরাফ: ১২০, সূরা ইউনুস: ৮১ আয়াত, সূরা ত্বহা: ৬৯ এবং সূরা ফালাক: ৪-এসব আয়াত বারবার পড়বেন। আর এ ক্ষেত্রে প্রতিবার বিসমিল্লাহ পড়ার দরকার নেই, বিসমিল্লাহ শুধু প্রথমবার পড়বেন।
এত সব আয়াত পড়া কষ্টকর হলে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস-এগুলো বারবার পড়ে দীর্ঘ সময় রুকইয়াহ করতে পারেন। এতেও আল্লাহর অনুগ্রহে যথেষ্ট উপকার হবে ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাতের মধ্যে শয়তান আক্রমণ করতে আসলে তিনি প্রথমে শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন, এরপর শয়তানকে অভিশাপ দিয়েছেন, বলেছেন, 'আমি তোকে আল্লাহর অভিশাপ দ্বারা অভিশাপ দিচ্ছি।' (মুসলিম: ৫৪২)। এর দ্বারা বুঝা যায়, আমাদেরও প্রথমে স্বাভাবিক দুআ অথবা রুকইয়াহ করা উচিত, এরপরও শয়তানের দল না থামলে অভিশাপ দেওয়া বৈধ। আর কাফির জাদুকরকে অভিশাপ দেওয়া যেতেই পারে। এর প্রমাণ হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদি কাফিরদের অনেকবার অনেক জায়গায় অভিশাপ দিয়েছেন। অধিকাংশ হাদীসগ্রন্থেই ঘটনা এবং প্রেক্ষাপটগুলোর বর্ণনা আছে।
২. বিষয়টি সহজার্থে সালাতের পর এই লিংকের দুআগুলো মুখস্ত করে অথবা দেখে দেখে পড়া যেতে পারে, অথবা অডিওতে দুআ শুনে সাথে সাথে "আমীন" বলা যেতে পারে।

📘 রুকইয়াহ > 📄 জাদুবিদ্যা অনুসরণকারী কবিরাজ চেনার কিছু লক্ষণ

📄 জাদুবিদ্যা অনুসরণকারী কবিরাজ চেনার কিছু লক্ষণ


জাদু দিয়ে জাদুর চিকিৎসা করা এবং অন্যের মাধ্যমে করানো—দুটোই গুনাহ। মন্ত্রে কোনো কুফরী বাক্য থাকলে তো নিশ্চিত কুফরী হবে; চাই সেটা ভালো কাজে ব্যবহার হোক অথবা খারাপ কাজে। বাস্তবতা হচ্ছে, যেসব কবিরাজ জাদু-টোনা করে, ওদের কাছে চিকিৎসা করিয়ে একটা সমস্যা ভালো হলে আরও নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হয়।
একজনের সাথে আমার কথা হয়েছিল। তার বিবরণ শুনে বুঝলাম, আগে সম্ভবত তার শুধু বদনজরের সমস্যা ছিল, এ ছাড়া আর কিছুই না। এরপর সে জিন দিয়ে কবীরাজি করে—এরকম একজনের তদবীর নিয়েছে। এখন তার মধ্যে জিন-আক্রান্ত হওয়ার প্রায় সব লক্ষণ বিদ্যমান।
আবার অনেক কবিরাজ আছে, যারা প্রথমবার চিকিৎসার নামে বেশ কিছু টাকা বাগিয়েছিল, এরপর সেই রোগী যেন আবার তার কাছে আসে এবং সে তার চিকিৎসার নামে আরও কিছু টাকা হাতিয়ে নিতে পারে, এজন্য সেই কবিরাজ নিজেই জাদু করে। যেহেতু কবিরাজের কাছে রোগীর সব তথ্যই আছে, অনেকের কাপড়-চোপড়ও থাকে, তাই তাকে জাদু করা খুবই সহজ। মানুষ ভাবে, অমুকের কাছে গিয়ে তো এক মাস ভালো ছিলাম! তাই তার কাছে আবার ধর্ণা দেয়।
কিছু কবিরাজ টাকা নেয় না, কিংবা নিলেও খুব সামান্য। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। আসলে টাকা নেওয়া-না নেওয়ার সাথে হালাল-হারামের সম্পর্ক তো অনেক দূরের। সে কুফরী করছে, শয়তানের সাহায্য নিচ্ছে, এরপর সে টাকা নিচ্ছে নাকি উল্টো আপনাকে টাকা দিচ্ছে—এসব হিসেবের কি সময় আছে? আপনার ঈমান যে বরবাদ হয়ে গেল, সেই খেয়াল আছে কী?
সার্বিক বিবেচনায় সবচেয়ে নিরাপদ এবং উপকারি হচ্ছে, শুধু কুরআনের আয়াত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত কোনো দুআ দিয়ে রুকইয়াহ করা। কবিরাজদের থেকে দূরে থাকা। এমনকি কোনো হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীর চিকিৎসা করলেও কুরআন বা মাসনূন দুআ দিয়েই করা। কুরআন সবার ওপরই চমৎকার প্রভাব ফেলে।
কোনো কোনো কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করতে গেলে, জোরে জোরে কুরআনের আয়াত পড়ে, আর আস্তে আস্তে মন্ত্র পড়ে। কুরআনের আয়াত লেখে, সাথে শয়তানের নামও লেখে। এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন করে।

এবার শয়তানের অনুসারী কবিরাজ (পড়ুন-জাদুকর) চেনার কিছু লক্ষণ বর্ণনা করা হচ্ছে।
১. রোগীর কোনো অংশ-যেমন: চুল, রুমাল, ওড়না বা অন্য কোনো ব্যবহৃত কাপড়- চায়। মায়ের নাম জানতে চায়।
২. একটা কাগজে সাহাবায়ে কিরামের নাম বা নবীদের নাম, দুআ বা কুরআনের আয়াত কিংবা তাবীজ লিখে পুড়াতে বলে।
৩. কিছু একটা লিখে মাটিতে পুঁতে কিংবা উচু কিছুতে বেধে রাখতে বলে।
৪. মনের মানুষ এনে দেওয়া, প্রেম-ভালোবাসা বা বশ করার তদবীর করে।
৫. কোন কোন শয়তান রোগিকে উলঙ্গ হতে এমনি যিনা করতেও বলে।
৬. জিন বোতলের মধ্যে ভরে ফেলেছে, অমুক দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে, জিন রক্তে মিশে গেছে-এধরণের কথাবার্তা বলে।
৭. অন্যের ওপর (যেমন তুলা রাশির লোকের ওপর) জিন হাজির করে কথা বলে।
৮. জ্যোতিষী বা গণকদের মত হাত দেখে।
৯. শুধু চেহারা দেখেই অতীত বর্তমানের বিভিন্ন সমস্যা বলতে শুরু করে।
১০. কবিরাজের কাছে কোনো প্রাণী অথবা মানুষের হাড্ডি থাকে, সেটা দিয়ে রোগীকে স্পর্শ করে বা টোকা দেয়।
১১. কোনো পাখি অথবা প্রাণী জবাই করতে বলে এবং তার রক্ত চায়। অথবা সে নিজেই (শয়তানের নামে) জবাই করবে। অথবা অন্য কিছু উৎসর্গ বা ভোগ দিতে বলে।
১২. কোনো নির্দিষ্ট সময়ে রোগীকে অন্ধকার ঘরে থাকতে বলে অথবা পানি স্পর্শ করতে বারণ করে।
১৩. মন্ত্রটন্ত্র পড়ে রোগীর পেটে হাতড়ে নাভি থেকে অদ্ভুত জিনিসপত্র বের করে দেখায়।
১৪. রহস্যময় তন্ত্রমন্ত্র আঁকায়, যা স্বাভাবিকভাবে বোধগম্য নয়। (এক্ষেত্রে অনেক সময় এমন হয়, কবিরাজের ওপর শয়তান এসে ভর করে এবং ওই শয়তানই তাবীজ লিখে দিয়ে যায়)।
১৫. দুআ-কালাম লেখে সাথে ফিরাউন, হামান বা শয়তানের নাম লেখে। কুরআনের আয়াত লেখে; আয়াতের মাঝেমাঝে সেরেশতাদের নাম লিখে তাদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে, শিরক করে। কিংবা তাবীজের মধ্যে অদ্ভুত নাম ধরে সাহায্য চায়। (এগুলো বিভিন্ন জিন বা শয়তানের নাম) যেমন: ইবলিস, আযাযিল, ওয়াহ, বাদ্দুহ।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বড় সমস্যা হচ্ছে, যারা কবিরাজি করে, তাদের অধিকাংশই জানে না, তারা কী করছে। তাই অনেক মাওলানা বা মুফতী সাহেব শয়তানের নামের তাবীজ লিখছেন, জাদুর সিম্বলের মধ্যে কুরআনের আয়াত লিখে বা আল্লাহর সাথে ফেরেশতাদের নামে শিরক করে ঈমান নষ্ট করে ফেলছেন। অথচ নিজেও টের পাচ্ছেন না। তাই প্রথমত কাউকে এসব করতে দেখলে হিকমাতের সাথে সতর্ক করা উচিত। সহীহ এবং নিরাপদ বিকল্প হিসেবে রুকইয়াহ শারইয়্যাহর কথা জানানো উচিত। এরপরও যদি সে শয়তানি থেকে বিরত না হয়, তবে তার ব্যাপারে নিজে সাবধান হয়ে যাওয়া এবং অন্যদেরও সাবধান করে দেওয়া উচিত।

📘 রুকইয়াহ > 📄 জাদুর জিনিসপত্র বা তাবিজ কীভাবে নষ্ট করবেন

📄 জাদুর জিনিসপত্র বা তাবিজ কীভাবে নষ্ট করবেন


যদি কি দিয়ে জাদু করেছে, তা পাওয়া যায় অথবা কোনো সন্দেহজনক তাবীজ পাওয়া যায়, তাহলে সেটা যত দ্রুত সম্ভব নষ্ট করে ফেলতে হবে।
তাবীজ বা জাদুর জিনিস নষ্ট করার নিয়ম সংক্ষেপে বললে এরকম—সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯, এরপর সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ে পানিতে ফুঁ দিন। তাবীজ বা জাদুর জিনিসগুলো ভেঙ্গে আলাদা আলাদা করুন। এরপর সেগুলো কিছুক্ষণ ওই পানিতে ডুবিয়ে রাখুন। সবশেষে পুড়িয়ে বা অন্য কোনোভাবে নষ্ট করে ফেলুন।

বিস্তারিত পদ্ধতি
আমাদের দরকার হবে—
১. একটি গামলা বা বালতি জাতীয় পাত্র। (জাদুর জিনিস বা তাবীজ ডোবানোর জন্য)
২. পর্যাপ্ত পানি।
৩. ব্লেড অথবা অ্যান্টি-কাটার (সুতা বা গেরো কাটার জন্য)
৪. প্লাস-pliers। (ঝালাই করা তাবীজ হলে ভাঙ্গার জন্য)
৫. তাবীজ ভাঙ্গা বা ছেড়ার পর আবর্জনাগুলো রাখার ব্যবস্থা।
৬. জিনিসগুলো পোড়ানোর ব্যবস্থা।
এসব কিছুর ব্যবস্থা হয়ে গেলে আমরা এবার কাজ শুরু করতে পারি।

ধাপ-১:
একটা পাত্রে পানি নিন। তারপর নিচের আয়াতগুলো পড়ুন-

সূরা আরাফ, আয়াত: ১১৭-১২২
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَأْفِكُونَ - فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ - فَغُلِبُوا هُنَالِكَ وَانْقَلَبُوا صَاغِرِيْنَ - وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ - سَاجِدِينَ - قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ - رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ

সূরা ইউনুস, আয়াত: ৮১-৮২
فَلَمَّا أَلْقَوْا قَالَ مُوسَى مَا جِئْتُمْ بِهِ السِّحْرُ إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ - وَيُحِقُّ اللَّهُ الْحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ

সূরা ত্বহা, আয়াত: ৬৯
وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى

এরপর সূরা ফালাক এবং সূরা নাস ৩ বার করে পড়ুন। এসব পড়ার মাঝে মাঝে পানিতে ফুঁ দিন। যদি সিহরের রুকইয়াহ বা ৭ দিনের ডিটক্সের জন্য রুকইয়ার পানি প্রস্তুত করা থাকে তাহলে সেটাও ব্যবহার করতে পারেন।
পরামর্শ: জাদু নষ্ট করার পুরো কাজ চলা অবস্থায় মনে মনে বারবার সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পড়তে থাকুন, যেন এর দ্বারা কোনো ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। সতর্কতা হিসেবে জাদুর কোনো জিনিস খালি হাতে ধরবেন না; গ্লোভস অথবা অন্য কিছু দিয়ে ধরুন। কিছুই না পেলে অন্তত হাতে রুকইয়াহ করা তেল মেখে নিন।

ধাপ-২:
প্রথমে তাবীজ ভেঙ্গে ভেতরের কাগজ বের করুন। জাদুর জিনিস যদি কোনো বক্স বা পলিথিন দিয়ে প্যাঁচানো থাকে তাহলে সেগুলো ছিঁড়ে বা ভেঙ্গে সব আলাদা আলাদা করে ফেলুন। জাদুর যত জিনিস আছে, সব একটা ট্রে বা এরকম কিছুর ওপর আলাদা আলাদাভাবে রাখুন।
তারপর সেগুলো রুকইয়ার পানিতে চুবিয়ে রাখুন। তাবীজের ক্ষেত্রে কাগজ, ঠোঙা, মোম, সুতা সবকিছু ডুবিয়ে ফেলুন। জাদুর কোনো আবর্জনা বাদ দেবেন না।
চুল বা সুতায় গিঁট দিয়ে জাদু করা হলে পানি থেকে তুলে ব্লেড বা অ্যান্টি-কাটার দিয়ে সবগুলো গিঁট বা বাঁধন একে একে কেটে ফেলুন। কোনো বাঁধন বা গিঁট অক্ষত রাখবেন না। কাগজ হলে পানির মধ্যেই সেটা ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলুন। আর রক্তমাখা কোনো কিছু হলে সেটা রুকইয়ার পানিতে ডুবিয়েই সাফ করে ফেলুন। যদি আংটি বা লোহার কিছুতে মন্ত্র অথবা তাবীজ অঙ্কন করা থাকে তাহলে পাথর, ড্রিল বা এমন কিছু দিয়ে ঘষে লেখাগুলো মুছে দিন এবং সেটা ভেঙ্গে ফেলুন। এরপর আবার পানিতে ডুবান।
এরপর পানি থেকে তুলে সেগুলো নষ্ট করে ফেলুন। আরও ভালো হয়, যদি জাদুর জিনিসগুলো (তাবীজ, কাপড় বা পুতুল ইত্যাদি) শুকানোর পর পুড়িয়ে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ এভাবে জাদু ধ্বংস হয়ে যাবে।
সবশেষে পানি, ছাই এবং অন্যান্য আবর্জনা মানুষ চলাচলের রাস্তা থেকে দূরে কোথাও ফেলে দিন। অথবা মানুষ চলাচল করে না-এমন কোনো জায়গায় পুঁতে ফেলুন, যেন কদিন পর এর অস্তিত্বও না থাকে।

আরও কিছু পরামর্শ
কবিরাজের দেওয়া তেল-পড়া বা আতর-পড়া হলে সেগুলো রুকইয়ার পানির মধ্যে ঢেলে গুলান। অথবা সিহরের আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দিন, এরপর সেগুলো কোথাও ফেলে দিয়ে আসুন।
যদি জাদুর জিনিসগুলো খুঁজে না পাওয়া যায়; কিন্তু জানা যায়, বাড়িতেই কোথাও পুঁতে রাখা আছে, অথবা বাড়ির পেছনে কোনো জায়গায় আছে বলে মোটামুটি জানা যায় তাহলে ওপরের আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে বাড়িতে বা সন্দেহজনক জায়গাগুলোতে ছিটিয়ে দিন। এভাবে তিনদিন করুন। ইনশাআল্লাহ জাদু নষ্ট হয়ে যাবে।
জাদুর জিনিস ধ্বংস করা হচ্ছে জাদু থেকে মুক্ত হওয়ার দ্রুততম উপায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, নিজ হাতে এসব নষ্ট না করলে জাদু ধ্বংস করা যায় না। যথাযথ নিয়মে ধৈর্য ধরে রুকইয়াহ করতে হবে, আর আল্লাহর কাছে দুআ করতে হবে। আল্লাহই জাদু ধ্বংস করে দেবেন; যেমনটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বেলায় হয়েছিল।

📘 রুকইয়াহ > 📄 জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ

📄 জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ


মানুষের ক্ষতি করার জন্য বিভিন্ন ধরণের জাদু করা হয়, আর সেগুলোতে আক্রান্ত হলে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। তবে কিছু লক্ষণ আছে, যেসব বেশিরভাগ জাদুর ক্ষেত্রেই মিলে যায়। যেমন:
১. হঠাৎ কারও বা কিছুর প্রতি তীব্র ভালবাসা অথবা ঘৃণা তৈরি হওয়া, যা আগে ছিল না।
২. বিশেষ কোন কারণ ছাড়াই জটিল-কঠিন রোগে ভোগা। চিকিৎসা করেও সুস্থ না হওয়া। কিংবা প্রচণ্ড অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কোন রোগ ধরা না পড়া।
৩. পরিবারে ঝগড়া লেগেই থাকা। কারও সাথে অকারণে বারবার ঝামেলা বাধা।
৪. খুব অল্প সময়ের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব কিংবা দ্বীনদারিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসা।
৫. অদ্ভুত আচরণ করা। যেমন, সাধারণ কোন কাজ একদমই করতে না চাওয়া, দিন-রাতের নির্দিষ্ট কোন সময়ে ঘরের বাইরে যেতে না চাওয়া।
৬. ব্যাক পেইন; বিশেষত মেরুদণ্ডের নিচের দিকে ব্যথা।
৭. সবসময় মানসিক অশান্তিতে থাকা; বিশেষত বিকেল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত।
৮. প্রায়সময় মাথাব্যথা কিংবা পেটব্যথা থাকা। ওষুধ খেয়েও তেমন ফায়দা না হওয়া।
৯. ঠিকমত ঘুমাতে না পারা, আর সামান্য ঘুম আসলেও বিভিন্ন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখা।
১০. নির্দিষ্ট ধরণের কোন যায়গা, কোন প্রাণী বা বস্তু বারবার স্বপ্নে দেখা। যেমন: পানি, আগুন, গাছ, সাপ, বাঘ, শেয়াল, কবরস্থান, পরিত্যক্ত বাড়ি, জঙ্গল। স্বপ্নে বিভিন্ন জিনিস খাওয়া।
অনেক জাদুতে সরাসরি জিন ব্যবহার করা হয়। তখন উল্লিখিত লক্ষণগুলোর পাশাপাশি জিন দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণও মিলে যেতে পারে। আর আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়লে, অথবা অডিও শুনলে বিভিন্ন প্রভাব দেখা যায়, সেগুলো দেখে জাদু আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।
আমরা প্রথমে জাদুর কমন চিকিৎসা পদ্ধতি আলোচনা করব, যাতে কোনরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া সবাই এটা অনুসরণ করতে পারে। এরপর নির্দিষ্ট কিছু জাদুর সমস্যা এবং প্রতিকার নিয়ে বলা হবে।

ক. জাদু আক্রান্ত ব্যক্তির রুকইয়ার নিয়ম
পরিস্থিতি-১: প্রথম অধ্যায়ে উল্লিখিত নিয়মানুযায়ী রুকইয়ার প্রস্তুতি নিয়ে আপনি রোগীর নিকটে বসে বলিষ্ঠ স্বরে রুকইয়ার আয়াত এবং দুআগুলো পড়তে থাকুন।
যদি রোগী বেহুঁশ হয়ে যায় এবং তার ওপর জিন চলে আসে, তখন জিনের রোগীর ওপর রুকইয়ার নিয়মানুসারে তাকে চিরদিনের জন্য চলে যেতে বাধ্য করবেন। অনেকের ক্ষেত্রে জাদুর কাজে নিয়োজিত জিন চলে গেলেই জাদু নষ্ট হয়ে যায়, তবুও এরপর কয়েকমাস নিজে নিজে রুকইয়াহ করা উচিত।
তবে যদি জিনের সাথে কথা বলার পরিস্থিতি থাকে, তবে জিজ্ঞেস করতে হবে, কেন জাদু করেছে, কি দিয়ে করেছে, যেসব জিনিস দিয়ে জাদু করেছে, সেগুলো কোথায় আছে। জিনেরা যদিও-বা খুব মিথ্যুক; তবুও যদি কোন যায়গার ব্যাপারে বলে কিংবা দেখিয়ে দেয় তাহলে কাউকে পাঠিয়ে সেটার খোঁজ করুন, সত্যি বলে থাকলে পাওয়া যাবে। মিথ্যা বললে পাবেন না। যদি স্বীকারোক্তি অনুযায়ী জাদুর জিনিস পাওয়া যায় তাহলে নিম্নলিখিত আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে জাদুর জিনিসগুলো কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখুন, তাহলে জাদু নষ্ট হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আয়াতগুলো হল-সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস।
যদি বলে কোন কিছু খাইয়ে জাদু করা হয়েছে বা জাদুর পানি রাস্তায় ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে তাহলে রোগীকে নিচের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করে এক মাস পরে আপডেট জানাতে বলে দিন।
যদি জিন বলে অমুক জায়গায় জাদুর জিনিস লুকানো আছে; কিন্তু আমি নির্দিষ্ট জায়গার কথা বলতে পারবো না, তাহলে ওপরের আয়াতগুলো পড়ে দম করা পানি ওই জায়গায় তিনদিন ছিটালে ইনশাআল্লাহ জাদু নষ্ট হয়ে যাবে। জিন কারও নাম বলতে পারে যে, অমুক ব্যক্তি জাদু করেছে-এসব কথা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ, এরা খুব বেশি মিথ্যা বলে আর এভাবে মানুষের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টির চেষ্টা করে।

পরিস্থিতি-২: আর যদি জিন না আসে, এমনিতে খুব অস্বস্তি বোধ করে, মাথা – ঘাড় কিংবা পিঠ ব্যথা করে, কান্না পায়, কেঁপে কেঁপে ওঠে অথবা বমি বমি লাগে তাহলে বুঝতে হবে, জাদুকর জিন দিয়ে জাদু করেনি; বরং অন্য কোন পন্থায় করেছে। তাহলে আরও দু- একবার রুকইয়াহ করে দেখুন। যদি লক্ষণগুলো বর্তমান থাকে; কিন্তু জিন না আসে তাহলে পূর্বোক্ত আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে রোগীকে খেতে বলুন। দেখুন-বমি হয় কি না। যদি বমির সাথে জাদুর জিনিসগুলো বের হয়ে যায়, অথবা লাল বা কালো বমি হয় তাহলে আশা করা যায়, জাদু নষ্ট হয়ে গেছে। যা-ই হোক না কেন, এরপর কিছুদিন নিচের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করলে ইনশাআল্লাহ আর সমস্যা থাকবে না।
এক মাস পর অবস্থা জানাতে বলুন, অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজনে এক মাস পর আবার রুকইয়াহ করে দেখুন। এরপর একই সাজেশন আরেকবার দিয়ে দিন অথবা নির্দিষ্ট জাদুর প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করতে বলুন।

খ. জাদুর সমস্যার জন্য সেলফ রুকইয়াহ
জাদুর সমস্যার জন্য নিজে নিজে রুকইয়াহ করতে চাইলে প্রথমে মানসিক প্রস্তুতি নিন। পাক্কা ইরাদা করে নিন-সমস্যার একটা বিহিত করে তবেই ক্ষান্ত হবো। নিজে নিজে রুকইয়াহ শুরু করে কয়েকদিন যেতে না যেতেই অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, অনেকে একটু উন্নতি দেখলেই বন্ধ করে দেয়। এমন করা যাবে না। রুকইয়াহ চলাকালীন রোগীর জরুরী বিষয়গুলো খেয়াল রাখা আর মানসিক সাপোর্ট দেওয়ার মতো কেউ সাথে থাকলে অনেক ভালো হয়।
প্রথমে ভালোভাবে পাক-পবিত্র হয়ে দুই রাকাত সালাত পড়ুন। সবচেয়ে উত্তম হল তাহাজ্জুদের সময়। নইলে অন্য যেকোনো জায়িয ওয়াক্তে দুই রাকাত নফল সালাত পড়ুন। এরপর দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে আপনার সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য এবং রোগ থেকে আরোগ্যের জন্য দুআ করে ইস্তিগফার এবং দরুদ শরীফ পড়ে চিকিৎসা শুরু করুন।
হাতের কাছে এক বোতল বা জগে পানি নিয়ে বসুন। প্রথমে কয়েকবার এই গ্রন্থে উল্লেখিত রুকইয়ার আয়াতগুলো তিলাওয়াত করুন অথবা কোন কারির সাধারণ রুকইয়াহ কয়েকবার শুনুন। এরপর পানির বোতলটি নিয়ে এই আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে কিছুটা খেয়ে নিন-

সূরা আরাফ, আয়াত: ১১৭-১২২
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَأْفِكُوْنَ - فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ مُنَالِكَ وَانْقَلَبُوا صَاغِرِينَ
وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ - قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ - رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ -

সূরা ইউনুস, আয়াত: ৮১-৮২
فَلَمَّا أَلْقَوْا قَالَ مُوسَى مَا جِئْتُمْ بِهِ السِّحْرُ إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ - وَيُحِقُّ اللهُ الْحَقِّ بِكَلِمَاتِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ

সূরা ত্বহা, আয়াত: ৬৯
وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرِ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى

যদি জাদুর সমস্যা থাকে তাহলে রুকইয়াহ তিলাওয়াত করা বা শোনার সময় এবং পানি খাওয়ার পর বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। যেমন: মাথা বা পেটে ব্যথা হতে পারে। ঘাড়ে, পিঠে বা মেরুদণ্ডে ব্যথা শুরু হতে পারে, ভেতরটা ছটফট করতে পারে, অকারণে কান্না আসতে পারে। এছাড়াও বমি বমি লাগতে পারে। বমি হয়ে গেলে ভালো, হয়তো-বা সাথে জাদুর জিনিস বের হয়ে যাবে। পেটে জাদু থাকলে লাল বা কালো বমি হতে পারে। এরপর নিচের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করতে থাকুন।
জাদুর জিনিসগুলো খুঁজে পাওয়ার আরেকটা উপায় হল-প্রতিদিন তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে দুআ করা, যেন জাদুর জিনিসগুলো কোথায় আছে, আল্লাহ তা জানিয়ে দেন। যদি সেটা পাওয়া যায় তাহলে তা নষ্ট করে ফেললে ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই জাদু থেকে মুক্ত হওয়া যাবে। নইলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যের সাথে রুকইয়াহ করে যেতে হবে।

গ. প্রেসক্রিপশন
সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯-এই আয়াতগুলো এবং সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস সব তিন বার করে পড়ে একটু বেশি পরিমাণ পানিতে ফুঁ দিন।
১. এই পানি প্রতিদিন দুই অথবা তিন বেলা আধা গ্লাস করে খেতে হবে।
২. আর প্রতিদিন গোসলের পানির সাথে কিছুটা মিশিয়ে গোসল করতে হবে।
রুকইয়ার পানি যদি শেষ হয়ে যায় তবে শুদ্ধ করে কোরআন পড়তে পারে; এমন যে কেউ উল্লিখিত আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে নিলেই হবে।
৩. প্রতিদিন এক নাগাড়ে কমপক্ষে ৪৫ মিনিট রুকইয়ার নিয়তে কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে।
এক্ষেত্রে গ্রন্থের শেষে উল্লেখিত রুকইয়ার আয়াত এবং দোয়াগুলো পড়া যেতে পারে, অথবা রুকইয়ার নিয়াতে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা যেতে পারে, অথবা পানিতে ফুঁ দেয়ার জন্য পড়া আয়াতগুলোই বারবার পড়ে নিজের ওপর রুকইয়াহ করা যেতে পারে। নিজে বেশিক্ষণ তিলাওয়াত করা সম্ভব না হলে যতটুকু সম্ভব তিলাওয়াত করবেন আর প্রতিদিন অন্তত দেড় ঘণ্টা কোন কারির রুকইয়ার অডিও শুনবেন।
৪. মুভি-মিউজিক এবং শরিয়তে নিষিদ্ধ এমন সব কিছু থেকে দূরে থাকতে হবে। মেয়ে হলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পর্দা করতে হবে।
৫. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ঠিকমত পড়তে হবে। কোন ওয়াজিব কিংবা ফরয ইবাদাত যেন ছুটে না যায়-সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
৬. শয়তান থেকে বাঁচতে সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমের আগের মাসনূন আমলগুলো গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে। অন্তত সুরা ইখলাস, ফালাক, নাসের আমল যেন কখনও বাদ না যায়।
৭. এই দুআটি প্রতিদিন সকালে ১০০ বার পড়া। কোন দিন সকালে না পড়তে পারলে সারাদিনের মধ্যে ১০০ বার পড়ে শেষ করবেন। একান্ত অপারগতা থাকলে সকাল-সন্ধ্যায় ১০ বার পড়বেন।
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ ، وَلَهُ الْحَمْدُ ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহ, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদ, ওয়াহুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর।
৮. ঘুমের আগে সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে হাত বুলিয়ে নিবেন। এভাবে তিনবার করবেন। আর আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমবেন।
৯. অজু, গোসলসহ পাক-নাপাকীর ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করবেন। বিশেষত করে ফরজ গোসলের ব্যাপারে। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে মাস'আলা জেনে নিন।
১০. বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরুদ শরীফ পাঠ করবেন। তাহাজ্জুদ আর নফল পড়ে আপনার সমস্যা এবং পেরেশানি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বেশি বেশি দু'আ করবেন।

ঘ. কিছু পরামর্শ
ক. কারও সমস্যা তুলনামূলক বেশি হলে অন্য নিয়মগুলো অনুসরণের পাশাপাশি গোসলের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ২-৩দিন বরই পাতার গোসল দিতে পারেন। এক্ষেত্রে নিয়ম হল: ৭টি বরই পাতা বেটে পানিতে গুলাতে হবে, আর আয়াতুল কুরসি এবং তিনকুল তিনবার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিতে হবে। এরপর এই পানি কিছুটা খাবে এবং বাকিটা দিয়ে গোসল করবে। এই পানির সাথে অন্য পানি মেশাবে না।
খ. জাদুর চিকিৎসা চলাকালীন সমস্যা কখনও বাড়তে পারে কখনও কমও হতে পারে। কারও একটু দেরি লাগতে পারে। এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত রুকইয়াহ থামিয়ে দেওয়া যাবে না; ধৈর্য ধরে স্বাভাবিক নিয়মেই চালিয়ে যেতে হবে। আস্তে আস্তে সমস্যা কমে আসবে ইনশাআল্লাহ।
কেউ বলেছিল, শয়তান আপনাকে দিয়ে গুনাহ করিয়েই জিতে যায় না; বরং আপনি যখন হতাশ হয়ে তাওবা করা ছেড়ে দেন তখন শয়তান জিতে যায়। অনুরূপভাবে শত্রু আপনাকে জাদু করলেই সফল হয়ে যায় না; বরং আপনি সমাধানের ব্যাপারে হাল ছেড়ে দিলেই সে সফল হতে থাকে। তাই সমস্যা বুঝতে পারলে এর সুরাহা না করে ছাড়বেন না।
গ. রুকইয়াহ শুনে বা তিলাওয়াত করে বেশি কষ্ট হলে রুকইয়ার গোসল করে নিতে পারেন, ইনশাআল্লাহ আরাম পাবেন। প্রথম অধ্যায়ের "রুকইয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো” অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।
ঘ. 'সমস্যা নাই' মনে হলেই সাথে সাথে রুকইয়াহ বাদ দিয়ে দেয়া যাবে না। একদম ভালো আছি মনে হওয়ার পরেও মাস খানেক স্বাভাবিকভাবে রুকইয়াহ করে যাওয়া উচিত। গ্রন্থের পরিশিষ্টে "কিভাবে বুঝব আমার রুকইয়াহ করা শেষ” অংশ দ্রষ্টব্য।
ঙ. ওপরের নিয়ম অনুযায়ী একবার এক মাস রুকইয়াহ করার পর আল্লাহ না করুন যদি বোঝা যায়, সমস্যা এখনো যায়নি, তবে শুরু থেকে সব কিছু ভালোভাবে খেয়াল করে আবার রুকইয়াহ শুরু করবেন। কেউ একাধিক জাদুতে আক্রান্ত হতে পারে, তখন সুস্থ হতে একটু বেশি সময় লাগতে পারে। এক্ষেত্রে সবগুলোর নিয়াতে একসাথে করার চেয়ে একটা একটা জাদুর নিয়াতে রুকইয়াহ করলে উপকার কিছুটা দ্রুত পাওয়ার আশা করা যায়।
চ. যিনি আপনাকে মানসিক সাপোর্ট দিচ্ছেন, প্রতি সপ্তাহ শেষে তার সাথে আপনার অবস্থা পর্যালোচনা করুন। প্রয়োজনে আপনার সমস্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট জাদুর জন্য পরামর্শ অনুসরণ করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00