📄 সালাফদের মতামত
এবার আমরা কয়েকজন সালাফে সালেহীনদের মতামত দেখি।
১. ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, সমগ্র আহলুস সুন্নাত এ ব্যাপারে একমত যে, জাদু সত্য এবং এর প্রভাব রয়েছে। কিছু মুতাযিলা এটি অস্বীকার করে এবং তারা বলে, এটা শুধুই চোখের ভ্রম। এরপর ইমাম কুরতুবী রহ. মুতাযিলা ফিরকার আকীদা খণ্ডন করেছেন। ১
২. ইমাম নববী রহ. বলেন, বিশুদ্ধমত হচ্ছে জাদুর অস্তিত্ব রয়েছে, অধিকাংশ আলিমের মত এটাই। আর এ ব্যাপারে কুরআন-হাদীসেও সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ইবনু হাজার আসকালানি রহ. উক্তিটি উদ্ধৃত করেছেন এবং নিজেও বেশ কিছু স্থানে জাদুর চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২
৩. ইবনু কুদামাহ রহ. বলেন, জাদুর দ্বারা মানুষকে হত্যা করা হয়। জাদুর প্রভাবে মানুষ মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। জাদুর প্রভাবে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ইবনু কুদামাহ রহ. তাঁর কথার স্বপক্ষে কুরআন-হাদীস থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ৩
৪. ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, সূরা ফালাকের 'ওয়া মিন শাররিন নাফফাসাতি' আয়াত এবং আয়িশা রা.-এর হাদীস দ্বারা প্রমাণ হয়, জাদু নিঃসন্দেহে সত্য। ৪
৫. ইমাম রাযী রহ. জাদুর ৭ ভাগ উল্লেখ করে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইবনু কাসীর রহ. সেটা উদ্ধৃত করে পর্যালোচনা করেছেন। ৫ এছাড়া উল্লিখিত ১০২ নম্বর আয়াতের আলোচনায় তাফসীরে কাবীরে ইমাম রাজি রহ. জাদু বিষয়ে সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। আগ্রহীরা সেটি অধ্যয়ন করতে পারেন।
৬. ইমাম রাগেব ইস্পাহানী রহ. জadুকে ৪ ভাগে ভাগ করে ব্যাখ্যা করেছেন। ৬
৭. ইমাম খাত্তাবী রহ. জাদুর পক্ষে কিছু দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করার পর বলেন, 'জাদু বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এমন আরও অনেক বর্ণনা এসেছে, যা একমাত্র বাস্তবতা অস্বীকারকারী ব্যতীত কেউ অস্বীকার করে না। আর ইসলামী ফিকাহবিদগণও জাদুকরের শাস্তির ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন। যে বিধানের ভিত্তি নেই, তা এরূপ চর্চিত হওয়া এবং তা এতটা প্রসিদ্ধ হওয়ার কথা নয়। সুতরাং জাদুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা একটি অজ্ঞতা, আর জাদু অস্বীকারকারীদের আপত্তি একটি অনর্থক বিষয়। ৭
টিকাঃ
১. তাফসীরে কুরতুবী: ২/৪৭ দ্রষ্টব্য
২. ফাতহুল বারী: ১০/২২২
৩. আল-মুগনী: ১০/১০৬
৪. বাদাইউল ফাওয়ায়েদ: ২/২২৭
৫. তাফসীরে ইবনু কাসীর, সূরা বাকারা: ১০২-৩ নম্বর আয়াতের আলোচনা দ্রষ্টব্য।
৬. আল-মুফরাদাত, 'সিহর' মাদ্দাহ দ্রষ্টব্য।
৭. শারহুস সুন্নাহ: ১২/১৮৮
📄 জাদুর প্রকারভেদ
নানা ধরনের জাদু রয়েছে। সালাফে সালেহীনের মাঝে অনেকে জাদুর প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। সালাফের অনেক মুহাদ্দিস এবং মুফাসসির বিভিন্ন প্রকার জাদুর স্বরূপ বর্ণনা করে সাথে চিকিৎসাও বাতলে দিয়েছেন। আমরা এ বিষয়ে আলোচনার আগে একটি সতর্কবার্তা দিতে চাই, জাদু কীভাবে করা হয়, জাদুর রকমফের ইত্যাদি এখানে আলোচনা করা হচ্ছে—শুধুই জাদু থেকে বাঁচার জন্য, মানুষের চিকিৎসার জন্য, সমাজকে কুফরের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নেওয়ার জন্য। কেউ যদি এর অপব্যবহার করেন, তবে এর দায় সম্পূর্ণ তার নিজের।
প্রাথমিকভাবে সমাজে প্রচলিত জাদুকে আমরা তিনভাগে ভাগ করব-
১. যেসব জাদুতে পরোক্ষভাবে শয়তানের সহায়তা নেওয়া হয়।
এসব জাদু মূলত আল্লাহর সৃষ্টির কিছু গোপন রহস্যের অপব্যবহার। অন্য কথায় প্রকৃতির নিয়মের মাঝে ওলটপালট করে এই জাদু করা হয়। মানুষেরা এসবের অধিকাংশই শিখেছে শয়তানদের থেকে। আর কিছু পেয়েছে বিভিন্ন যুগের মানুষদের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে। এই জাদুগুলোতে সাধারণত সরাসরি জিনের সহায়তা নেওয়া আবশ্যক হয় না।
উদাহরস্বরুপ, জাদুর পানীয় বা Magical Potion এর কথা বলা যায়। বিভিন্ন অদ্ভুত বস্তুর সমন্বয়ে এসব পানীয় তৈরি করা হয় (যেমন: ইঁদুরের পা, দাঁড়কাকের পাখা, বাচ্চা শিশুর কবরের মাটি, বজ্রের আঘাতে নিহত ব্যক্তির হাড্ডি, বিশেষ কোনো গাছের শেকড় ইত্যাদি)। কখনো এগুলোর সাথে বিশেষ মন্ত্রও পড়া হয়।
২. যেসব জাদুর সাথে জিন-শয়তান সরাসরি জড়িত থাকে।
এক্ষেত্রে কখনো জিনের ওপর জাদু করে তাকে ভিকটিমের মাঝে বন্দি করে দেওয়া হয়। আবার কখনও জিনকে হত্যা করার ভয় দেখিয়ে বা জিনের পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি দিয়ে জাদুকরের নির্দেশ মানতে বাধ্য করা হয়।
সাধারণত জাদুকররা কোনো শক্তিশালী জিন বা শয়তানের পূজা করে। তার সন্তুষ্টির জন্য বড় বড় গুনাহ করে। যেমন: কুরআন অবমাননা করা, কোনো মাহরামের সাথে যিনা করা, বিশেষ কোনো প্রাণীর রক্ত পান করা, নিজের মলমূত্র ভক্ষণ করা ইত্যাদি। তারা শয়তানের নামে কোরবানি করে, শয়তানকে সেজদা করে, দীর্ঘদিন ময়লা আবর্জনার মধ্যে বাস করে, গোসল করা থেকে বিরত থাকে। এভাবে শয়তানকে সন্তুষ্ট করে জাদুকরের খাতায় নাম লেখায়, যাকে বাংলা সাহিত্যে 'মন্ত্রসাধন করা' বলা হতো। এরপর যখন প্রয়োজনে জাদুকর সাহায্য প্রার্থনা করে তখন শয়তান তার কোনো সঙ্গী বা দুর্বল কোনো জিনকে পাঠায় জাদুকরের কাজ করতে। এক্ষেত্রে কিছু জিনকে পরিবারের ক্ষতি করার ব্যাপারে ভয় দেখানো হয়, কাউকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে কাজ করানো হয়।
এ কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিকে যদি জিনের মাধ্যমে জাদু করা হয় তখন জিন সহজে যেতে চায় না। সে ভয় পায় যে, রোগীকে ছেড়ে দিলে জাদুকর বা বড় শয়তান তার ক্ষতি করবে। এসব ক্ষেত্রে তাকে অভয় দিতে হয়। মুসলিম জিন হলে আয়াতুল কুরসী অথবা সূরা ইখলাস, ফালাক, নাসের ফজিলত সম্পর্কে জানাতে হয়।
৩. হাতের কারসাজি, কোনো যন্ত্র বা রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যে ভেল্কি দেখানো।
এগুলো আক্ষরিক অর্থে জাদু। যদিও-বা এসব আসল জাদু নয়; তবুও এটা অবৈধ। এর কারণ হচ্ছে—প্রথমত: এটা ধোঁকাবাজি হেতু হারাম। দ্বিতীয়ত: যারা এগুলোর চর্চা করে, তাদের অধিকাংশই আস্তে আস্তে শয়তানী জাদুচর্চায় জড়িয়ে যায়। আর আল্লাহ বলেছেন— 'হে ঈমানদারগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।' ১ এজন্য সবধরনের জাদু থেকে দূরে থাকতে হবে—আসল হোক বা নকল।
কর্মপদ্ধতির দিক থেকে জাদুকে ৭ ভাগে ভাগ করা যায়:
১. যাকে জাদু করা হবে, তার ব্যবহৃত কোনো কাপড় অথবা শরীরের কোনো অংশ (যেমন: চুল, নখ ইত্যাদি) কোনো গাছের ডাল, পুতুল বা এরকম কিছুতে রেখে জাদু করা হয়।
২. কখনো শুধু মন্ত্র পড়ে বা বিশেষ পদ্ধতিতে ধ্যান করে জাদু করা হয়।
৩. কখনো খাদ্যদ্রব্য অথবা পানীয়তে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেওয়া হয় কিংবা বিশেষ পদ্ধতিতে জাদুর পানীয় তৈরি করা হয়। সেটা কেউ খেলে বা পান করলে জাদু-আক্রান্ত হয়ে যায়।
৪. কোনো ব্যবহারের জিনিস না পেলে বা কিছু খাওয়ানো সম্ভব না হলে, মন্ত্র পড়া পানি বাড়ির সামনে ফেলে যায়। যাকে উদ্দেশ্য করে জাদু করা হয়েছে, সে ওই পানির ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে জাদুতে আক্রান্ত হয়ে যায়।
৫. কখনো জাদুকর নিজে পারে না, এজন্য জিন-শয়তানের সাহায্য চায়, তখন শয়তান জাদু করে। আবার অনেক সময় জিনের মাধ্যমে ভিকটিমের কাপড় বা ব্যবহারের কিছু চুরি করিয়ে জাদু করা হয়।
৬. মানুষ এবং জিনের ওপর জাদু করা হয়, এরপর জাদুর মাধ্যমে মানুষের শরীরে জিনকে বন্দি করে দেওয়া হয়। জাদু নষ্ট হওয়া পর্যন্ত জিন চাইলেও বের হতে পারে না।
৭. কখনো একজন ব্যক্তিকে উল্লিখিত একাধিক পদ্ধতিতে একাধিক জাদু করা হয়।
প্রসঙ্গক্রমে একটা বিষয় উল্লেখ করা যায়, জাদু করার পর জাদুর জিনিসগুলো লুকিয়ে রাখা হয়, যেন সহজে খুঁজে না পাওয়া যায় আর ধ্বংস করা না যায়। এক্ষেত্রে জাদুকররা সাধারণত যাকে জাদু করা হবে, তার নাম এবং তার মায়ের নাম জেনে নেয়। এরপর এই নামকে বিশেষ পদ্ধতিতে নকশায় লিখে নামের সাথে বাতাস, মাটি, পানি, আগুন— এসবের মাঝে যেটার মিল পায়, সেটার মধ্যে জাদুর জিনিস লুকিয়ে বা ঝুলিয়ে রাখে। (আগুনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো জাদুর জিনিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়)।
যেমন: আমাদের নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাম মুহাম্মাদ। তাঁর মাতার নাম আমীনা। এটার সাথে পানি (৪০)-এর মিল রয়েছে। তাই ইহুদি লাবিদ ইবনুল আসাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জাদু করার পর ওই জিনিসগুলো কূপের পানিতে ফেলেছিল। অনুরূভাবে কারও নামের সাথে হাওয়া বা বাতাসের মিল পেলে জাদুর তাবীজ পাখির সাথে বা কোনো গাছের উঁচু ডালে বেঁধে রাখে। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
তবে জাদু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা হচ্ছে, এটা আলাদিনের চেরাগের মতো কিছু; ঘষা দিলেই যা খুশি পাওয়া যায়। বিভিন্ন সিনেমা, নাটক আর মিথ্যা গল্পের পিঠে চড়ে সমাজে এই ধারণা বিস্তার লাভ করেছে। এজন্য বস্তুবাদী সমাজের অনেক বাসিন্দা জাদুর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসে। এই ধারণা অনেক বড় ভুল।
বাস্তবতা হচ্ছে, জাদুর জন্য কাফির জাদুকরকে অনেক চেষ্টা-সাধনা করতে হয়, অনেক নোংরা এবং জঘন্য কাজ করতে হয়। গল্পের মতো চাইলেই পাওয়া যায়—বিষয়টা মোটেই এমন নয়। জাদুর অনেক সীমাবদ্ধতাও আছে। সব মিলিয়ে জাদু করার বিষয়টা এতটা সহজও নয়, নিরাপদও নয়। জাদুকর চাইলেই যে-কাউকে জাদু করতে পারে না। যাকে জাদু করা হবে, তার শরীরের অংশ লাগবে, মন্ত্রপড়া কিছু খাইয়ে দিতে হবে। এরপর জাদু কাজ করবে। সাথে সাথে জাদুকরকে শয়তানের কথামতো বলিদান বা অন্য কোনো উৎসর্গমূলক কাজ করতে হবে। বড় কাউকে জাদু করতে চাইলে তখন শয়তানের দাবিও থাকে অনেক বড়। এরপর শয়তান সন্তুষ্ট হলে কিছু কাজ করবে, না হলে করবে না। অথবা শয়তান ধোঁকাও দিতে পারে, এমন হলো যে, তখন সে কোনো কাজই আর করে দিলো না।
হ্যাঁ, কোনো বস্তু বা সিম্বল না নিয়ে, জিনের সাহায্য ছাড়া শুধু মন্ত্র পড়েও জাদু করা যায়। তবে সাধারণত সেগুলো তেমন শক্তিশালী হয় না।
টিকাঃ
১. সূরা নুর, আয়াত: ২১
📄 জাদুর চিকিৎসা প্রসঙ্গে কিছু কথা
কিছু সতর্কতা
১. উল্লিখিত প্রথম কারণে কোনো কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করতে গেলে যদি আপনার কাপড় চায়, ভুলেও দেবেন না। বুঝে নিন, সে জাদুকর।
২. বাড়িতে মেহমান এসেছিল। কদিন পর খেয়াল করলেন, একটা কাপড়ের কোণাকাটা, অথবা চিরুনি হারিয়ে গেছে; সাথে চুল ছিল। সাথে সাথে সাবধান হয়ে যান। মাসনূন আমলের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিন। সমস্যার সন্দেহ হলে রুকইয়াহ করুন।
৩. উল্লিখিত দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কারণে সিহরের তথা জাদুর জন্য রুকইয়াহ করতে লাগলে কখনো রোগীর ওপর জিন চলে আসে। এজন্য রাক্বীর মানসিক প্রস্তুতিও থাকা জরুরি। (বিস্তারিত পরে বলা হবে ইনশাআল্লাহ)
জাদুর চিকিৎসা প্রসঙ্গে কিছু কথা
১. কারও ওপর একই সাথে একাধিক জাদু করা হতে পারে। তখন ধৈর্যের সাথে একটা একটা করে চিকিৎসা করতে হবে। যদি জাদু, জিন, বদনজর-এরকম একাধিক সমস্যা থাকে তাহলে প্রথমে বদনজরের রুকইয়াহ করবেন, এরপর জাদু এবং জিনের জন্য রুকইয়াহ করবেন। জাদুর নিয়াতে রুকইয়াহ করলেও ভেতরে জিন লুকিয়ে থাকতে পারে না, বাধ্য হয়েই বের হয়ে আসে।
২. রুকইয়ার কারণে বমি-বমিভাব, শরীর ব্যথা, মাথা ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে এসব থামাতে ওষুধ খাবেন না। অবস্থা বেশি খারাপের দিকে গেলে বা আশঙ্কা থাকলে তখন ভিন্ন কথা। আর এ ক্ষেত্রে প্রথম অধ্যায়ের রুকইয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো লেখাটি অবশ্যপাঠ্য।
৩. জাদুর জন্য রুকইয়াহ করে সুস্থ হলে এটা সবার সাথে আলোচনা করা উচিত নয়। হিংসুক ব্যক্তি জানলে আবার জাদু করতে পারে। সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন, সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমের আগের মাসনূন আমল গুরুত্বের সাথে পালন করুন। পরিশিষ্টে “কিভাবে বুঝব আমার রুকইয়াহ করা শেষ” অংশ দ্রষ্টব্য।
৪. 'কে আপনাকে জাদু করেছে'- এটা জানার জন্য অস্থির হওয়া উচিত নয়। আর এজন্য শরীয়ত সম্মত বিশেষ কোনো আমল আছে বলেও আমার জানা নেই। কোনো ওযীফার মাধ্যমে যদি স্বপ্নে জানার উপায় থাকে, তবে এটাও আপনার জানা উচিত-স্বপ্ন কোনো বিষয়ের প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট হতে পারে না। কারণ, শয়তানও স্বপ্ন দেখায়, সারাদিনের চিন্তাভাবনা থেকেও স্বপ্ন তৈরি হয়। আর ইসলামী শরীয়াতেও উম্মতের কারও স্বপ্ন কোনো বিষয়ের দলিল হয় না।
অনেক সময় রুকইয়াহ করতে গেলে জিন নিজেই বলে 'অমুক আপনাকে জাদু করেছে', এটা সাথে সাথে বিশ্বাস না করার দু আরও পিডিএফ বই ডাউনলোড করুন। ছ-প্রথমত: জিনটা কাফির, কমসে কম ফাসিক; আর ফাসিকের খবর গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত: খবিস জিন অনেক সময় এসব ব্যাপারে মিথ্যা বলে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য। সুতরাং অন্য কোনো প্রমাণ ছাড়াই তার কথা বিশ্বাস করা নিজেই নিজের ক্ষতি করার নামান্তর।
তবে একটা মজার বিষয় হচ্ছে, শরয়ী পন্থায় রুকইয়াহ করার পর অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয়, জাদু যে করেছে সমস্যাগুলো তার দিকে ফিরে যায়। হুবহু সব সমস্যায় না ভুগলেও দীর্ঘদিনের জন্য তার ঠিকানা হিসেবে বিছানা অথবা হাসপাতাল নির্ধারিত হয়ে যায়, কেউ-বা সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
৫. যদি বারবার জাদু করে...। কুফরী জাদু আমাদের দেশে এতটাই সহজলভ্য যে, এক বার সুস্থ হলে আবার জাদু করা, বারবার জিন পাঠিয়ে জাদু করা (জিন চালান দেওয়া) এসব ঘটনা হরহামেশা ঘটছে। এটা সমাজে নীরব মহামারির রূপ ধারণ করেছে। আচ্ছা, আপনি কী করবেন যদি কেউ এভাবে আপনার পেছনে লাগে?
যদিও মানুষকে অভিশাপ দেওয়া উচিত নয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষে এ ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এক্ষেত্রে কর্তব্য হচ্ছে, প্রথমে রুকইয়াহ করা, নিয়মিত দুআ-কালাম পড়ে নিজের হেফাজতের ব্যবস্থা করা। এরপরও যদি দেখেন কেউ পেছনে লেগেই আছে তখন আপনি শয়তান এবং তার অনুসারীদের কার্স (curse) করতে পারেন, তথা অভিশাপ দিতে পারেন। ১
অভিশাপ দেওয়ার একটি উত্তম পদ্ধতি বলা হচ্ছে, যেসব আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা অথবা কোনো নবী আলাইহিস সালাম জালিম বা কাফিরদের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন বলে উল্লেখ আছে, (যেমন: সূরা বাকারা: ৮৯-৯০, ১২১-২২, সূরা নিসা: ৪৭, সূরা আরাফ: ৩৮, সূরা হুদ: ৯৮-১০২, সূরা রাদ: ২৫, সূরা কাসাস: ৪০-৪৪, সূরা আহযাব: ৬৮, সূরা নূহ : ২৫-২৮, সূরা লাহাব) এ রকম কিছু আয়াত তিলাওয়াত করা।
এরপর তাহাজ্জুদ বা সাধারণ নফল সালাত আদায় করা, এরপর দুআর মাঝে তাদের অভিশাপ দেওয়া। অথবা সালাতে সূরা ফাতিহার পর এরকম কিছু আয়াত তিলাওয়াত করা এবং সালাত শেষে অভিশাপ দেওয়া। আল্লাহর কাছে দুআ করা-যেন জাদুকর, জাদুকরের সহায়তাকারী জিন এবং জাদুকরদের কাছে গমনকারী মানুষ শয়তানদের আল্লাহ পাকড়াও করেন, তাদের ধ্বংস করে দেন। এভাবে পরপর কয়েকদিন করতে থাকা। ২
সতর্কতা হচ্ছে, অভিশাপ একটি স্পর্শকাতর বিষয়। যদি এ পর্যন্ত না গিয়ে পারা যায়, তবে না যাওয়াই উত্তম।
৬. আক্রান্ত ব্যক্তি যদি স্বপ্নে অথবা বাস্তবে শয়তান জিনকে দেখতে পায়, তাহলে উচিত হবে ভয় না পেয়ে শয়তানকে ধাওয়া করা বা মারতে চেষ্টা করা। স্বপ্নে জাদুর জিনিস দেখতে পেলে তখনই নষ্ট করে ফেলা। কারণ স্বপ্নে জাদুর কাজে নিয়োজিত জিনকে হত্যা করলে বা জাদু নষ্ট করলে সাধারণত এটা বাস্তবে ঘটে যায়। আর শয়তানকে হাতের কাছে না পেলে, দূর থেকেই হত্যার নিয়তে আয়াতুল কুরসী পড়তে থাকুন।
৭. জিন দিয়ে করা জাদুতে আক্রান্ত হলে খবিস জিন অনেককে যৌন হয়রানি করে, এসব ক্ষেত্রে নিয়মমাফিক রুকইয়া করার পাশাপাশি ৩য় অধ্যায়ের "রাত্রীতে জিনের সমস্যা" লেখাটাও অনুসরণ করুন।
৮. সুস্থ হতে হতে অনেকদিন লেগে গেলে প্রতিদিন সূরা বাকারা তিলাওয়াতের অভ্যাস করুন, পুরাটা শেষ করতে না পারলেও প্রতিদিন কমপক্ষে আধাঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিট সূরা বাকারা থেকে তিলাওয়াত করার চেষ্টা করুন। আর তিলাওয়াটা দিনের শুরুতে করতে পারলে সবচেয়ে ভাল।
৯. এই গ্রন্থের শেষে “রুকইয়ার প্রসিদ্ধ আয়াত সমূহ” নামে যে আয়াতগুলো যুক্ত করা হয়েছে, সব ধরনের রুকইয়ার জন্যই সেগুলো পড়া যায়। সিহরের রুকইয়ার জন্যও সেগুলোই পড়বেন। তবে রুকইয়াহ করার সময় -সূরা বাকারা: ১০২, সূরা আরাফ: ১২০, সূরা ইউনুস: ৮১ আয়াত, সূরা ত্বহা: ৬৯ এবং সূরা ফালাক: ৪-এসব আয়াত বারবার পড়বেন। আর এ ক্ষেত্রে প্রতিবার বিসমিল্লাহ পড়ার দরকার নেই, বিসমিল্লাহ শুধু প্রথমবার পড়বেন।
এত সব আয়াত পড়া কষ্টকর হলে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস-এগুলো বারবার পড়ে দীর্ঘ সময় রুকইয়াহ করতে পারেন। এতেও আল্লাহর অনুগ্রহে যথেষ্ট উপকার হবে ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাতের মধ্যে শয়তান আক্রমণ করতে আসলে তিনি প্রথমে শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন, এরপর শয়তানকে অভিশাপ দিয়েছেন, বলেছেন, 'আমি তোকে আল্লাহর অভিশাপ দ্বারা অভিশাপ দিচ্ছি।' (মুসলিম: ৫৪২)। এর দ্বারা বুঝা যায়, আমাদেরও প্রথমে স্বাভাবিক দুআ অথবা রুকইয়াহ করা উচিত, এরপরও শয়তানের দল না থামলে অভিশাপ দেওয়া বৈধ। আর কাফির জাদুকরকে অভিশাপ দেওয়া যেতেই পারে। এর প্রমাণ হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদি কাফিরদের অনেকবার অনেক জায়গায় অভিশাপ দিয়েছেন। অধিকাংশ হাদীসগ্রন্থেই ঘটনা এবং প্রেক্ষাপটগুলোর বর্ণনা আছে।
২. বিষয়টি সহজার্থে সালাতের পর এই লিংকের দুআগুলো মুখস্ত করে অথবা দেখে দেখে পড়া যেতে পারে, অথবা অডিওতে দুআ শুনে সাথে সাথে "আমীন" বলা যেতে পারে।
📄 জাদুবিদ্যা অনুসরণকারী কবিরাজ চেনার কিছু লক্ষণ
জাদু দিয়ে জাদুর চিকিৎসা করা এবং অন্যের মাধ্যমে করানো—দুটোই গুনাহ। মন্ত্রে কোনো কুফরী বাক্য থাকলে তো নিশ্চিত কুফরী হবে; চাই সেটা ভালো কাজে ব্যবহার হোক অথবা খারাপ কাজে। বাস্তবতা হচ্ছে, যেসব কবিরাজ জাদু-টোনা করে, ওদের কাছে চিকিৎসা করিয়ে একটা সমস্যা ভালো হলে আরও নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হয়।
একজনের সাথে আমার কথা হয়েছিল। তার বিবরণ শুনে বুঝলাম, আগে সম্ভবত তার শুধু বদনজরের সমস্যা ছিল, এ ছাড়া আর কিছুই না। এরপর সে জিন দিয়ে কবীরাজি করে—এরকম একজনের তদবীর নিয়েছে। এখন তার মধ্যে জিন-আক্রান্ত হওয়ার প্রায় সব লক্ষণ বিদ্যমান।
আবার অনেক কবিরাজ আছে, যারা প্রথমবার চিকিৎসার নামে বেশ কিছু টাকা বাগিয়েছিল, এরপর সেই রোগী যেন আবার তার কাছে আসে এবং সে তার চিকিৎসার নামে আরও কিছু টাকা হাতিয়ে নিতে পারে, এজন্য সেই কবিরাজ নিজেই জাদু করে। যেহেতু কবিরাজের কাছে রোগীর সব তথ্যই আছে, অনেকের কাপড়-চোপড়ও থাকে, তাই তাকে জাদু করা খুবই সহজ। মানুষ ভাবে, অমুকের কাছে গিয়ে তো এক মাস ভালো ছিলাম! তাই তার কাছে আবার ধর্ণা দেয়।
কিছু কবিরাজ টাকা নেয় না, কিংবা নিলেও খুব সামান্য। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। আসলে টাকা নেওয়া-না নেওয়ার সাথে হালাল-হারামের সম্পর্ক তো অনেক দূরের। সে কুফরী করছে, শয়তানের সাহায্য নিচ্ছে, এরপর সে টাকা নিচ্ছে নাকি উল্টো আপনাকে টাকা দিচ্ছে—এসব হিসেবের কি সময় আছে? আপনার ঈমান যে বরবাদ হয়ে গেল, সেই খেয়াল আছে কী?
সার্বিক বিবেচনায় সবচেয়ে নিরাপদ এবং উপকারি হচ্ছে, শুধু কুরআনের আয়াত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত কোনো দুআ দিয়ে রুকইয়াহ করা। কবিরাজদের থেকে দূরে থাকা। এমনকি কোনো হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীর চিকিৎসা করলেও কুরআন বা মাসনূন দুআ দিয়েই করা। কুরআন সবার ওপরই চমৎকার প্রভাব ফেলে।
কোনো কোনো কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করতে গেলে, জোরে জোরে কুরআনের আয়াত পড়ে, আর আস্তে আস্তে মন্ত্র পড়ে। কুরআনের আয়াত লেখে, সাথে শয়তানের নামও লেখে। এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন করে।
এবার শয়তানের অনুসারী কবিরাজ (পড়ুন-জাদুকর) চেনার কিছু লক্ষণ বর্ণনা করা হচ্ছে।
১. রোগীর কোনো অংশ-যেমন: চুল, রুমাল, ওড়না বা অন্য কোনো ব্যবহৃত কাপড়- চায়। মায়ের নাম জানতে চায়।
২. একটা কাগজে সাহাবায়ে কিরামের নাম বা নবীদের নাম, দুআ বা কুরআনের আয়াত কিংবা তাবীজ লিখে পুড়াতে বলে।
৩. কিছু একটা লিখে মাটিতে পুঁতে কিংবা উচু কিছুতে বেধে রাখতে বলে।
৪. মনের মানুষ এনে দেওয়া, প্রেম-ভালোবাসা বা বশ করার তদবীর করে।
৫. কোন কোন শয়তান রোগিকে উলঙ্গ হতে এমনি যিনা করতেও বলে।
৬. জিন বোতলের মধ্যে ভরে ফেলেছে, অমুক দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে, জিন রক্তে মিশে গেছে-এধরণের কথাবার্তা বলে।
৭. অন্যের ওপর (যেমন তুলা রাশির লোকের ওপর) জিন হাজির করে কথা বলে।
৮. জ্যোতিষী বা গণকদের মত হাত দেখে।
৯. শুধু চেহারা দেখেই অতীত বর্তমানের বিভিন্ন সমস্যা বলতে শুরু করে।
১০. কবিরাজের কাছে কোনো প্রাণী অথবা মানুষের হাড্ডি থাকে, সেটা দিয়ে রোগীকে স্পর্শ করে বা টোকা দেয়।
১১. কোনো পাখি অথবা প্রাণী জবাই করতে বলে এবং তার রক্ত চায়। অথবা সে নিজেই (শয়তানের নামে) জবাই করবে। অথবা অন্য কিছু উৎসর্গ বা ভোগ দিতে বলে।
১২. কোনো নির্দিষ্ট সময়ে রোগীকে অন্ধকার ঘরে থাকতে বলে অথবা পানি স্পর্শ করতে বারণ করে।
১৩. মন্ত্রটন্ত্র পড়ে রোগীর পেটে হাতড়ে নাভি থেকে অদ্ভুত জিনিসপত্র বের করে দেখায়।
১৪. রহস্যময় তন্ত্রমন্ত্র আঁকায়, যা স্বাভাবিকভাবে বোধগম্য নয়। (এক্ষেত্রে অনেক সময় এমন হয়, কবিরাজের ওপর শয়তান এসে ভর করে এবং ওই শয়তানই তাবীজ লিখে দিয়ে যায়)।
১৫. দুআ-কালাম লেখে সাথে ফিরাউন, হামান বা শয়তানের নাম লেখে। কুরআনের আয়াত লেখে; আয়াতের মাঝেমাঝে সেরেশতাদের নাম লিখে তাদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে, শিরক করে। কিংবা তাবীজের মধ্যে অদ্ভুত নাম ধরে সাহায্য চায়। (এগুলো বিভিন্ন জিন বা শয়তানের নাম) যেমন: ইবলিস, আযাযিল, ওয়াহ, বাদ্দুহ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বড় সমস্যা হচ্ছে, যারা কবিরাজি করে, তাদের অধিকাংশই জানে না, তারা কী করছে। তাই অনেক মাওলানা বা মুফতী সাহেব শয়তানের নামের তাবীজ লিখছেন, জাদুর সিম্বলের মধ্যে কুরআনের আয়াত লিখে বা আল্লাহর সাথে ফেরেশতাদের নামে শিরক করে ঈমান নষ্ট করে ফেলছেন। অথচ নিজেও টের পাচ্ছেন না। তাই প্রথমত কাউকে এসব করতে দেখলে হিকমাতের সাথে সতর্ক করা উচিত। সহীহ এবং নিরাপদ বিকল্প হিসেবে রুকইয়াহ শারইয়্যাহর কথা জানানো উচিত। এরপরও যদি সে শয়তানি থেকে বিরত না হয়, তবে তার ব্যাপারে নিজে সাবধান হয়ে যাওয়া এবং অন্যদেরও সাবধান করে দেওয়া উচিত।