📘 রুকইয়াহ > 📄 বাড়িতে জিনের সমস্যা থাকলে করণীয়

📄 বাড়িতে জিনের সমস্যা থাকলে করণীয়


অনেক বাড়িতে অস্বাভাবিক কিছু সমস্যা দেখা যায়। যেমন: ১. বিভিন্ন ছায়া বা আকৃতি দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা; ২. রাতে অথবা কেউ যখন বাড়িতে থাকে না, তখন রান্নাঘর, অন্যান্য কামরা বা ছাদ থেকে আওয়াজ আসা; ৩. ফাঁকা ঘর বা ছাদ থেকে বাড়ির লোকদের নাম ধরে ডাকছে-এমনটা শোনা; ৪. বাহিরে বা অন্য জায়গায় অবস্থান করছে-এমন কাউকে বাড়িতে দেখতে পাওয়া; ৫. অকারণে টয়লেটের ট্যাপ-ঝর্ণা চালু হওয়া, লাইট-ফ্যান অন-অফ হওয়া, দরজা-জানালা বারবার খোলা বন্ধ হওয়া ৬. নিজেরা না করলেও জিনিসপত্র বারবার লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া, এক জায়গার জিনিস অন্য জায়গায় পাওয়া; ৭. অকারণে গ্লাস বা আয়না ভেঙ্গে যাওয়া; ৮. অদ্ভুতভাবে জিনিসপত্র হারিয়ে যাওয়া; ৯. ঘুমের সময় কাঁথা-কম্বল টান দিয়ে বিরক্ত করা; ১০. রাতে বাড়ির আশেপাশের কুকুরগুলো অতিরিক্ত ঘেউ ঘেউ করা ইত্যাদি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে মহান সাহাবীগণের সাথেও এ ধরণের অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। বাড়িতে সাপ দেখার ঘটনা এই অধ্যায়ের শুরুতে বলা হয়েছে। আগ্রহীরা এ বিষয়ে আরও ঘটনা জানতে জিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস বইটি দেখতে পারেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাড়িতে কেন জিনের সমস্যা হয়?
সাধারণত তিনটি কারণে এমন হয়ে থাকে-
প্রথমত: এই জায়গাটা দীর্ঘদিন বিরান ছিল বা বন-জঙ্গল ছিল। তাই এখানে জিনেরা আবাস গড়েছিল। বিরান জায়গায় কেউ বাড়ি বানালে জিনরা সমস্যা করতে পারে। এরকম সমস্যার জন্য নিচে উল্লিখিত প্রথম তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করলেই হবে ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয়ত: এই জায়গায় বা বাড়িতে পূর্বে যারা বাস করেছে, তাদের কেউ যদি শয়তানী জাদু চর্চা করে থাকে তাহলে এরপর সেখানে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রথম তিনটির সাথে চতুর্থ পদ্ধতিও দ্রষ্টব্য।
তৃতীয়ত: বাড়ির কাউকে জিন দ্বারা জাদু করা হলে অথবা কেউ জিন-আক্রান্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি জিন অন্যদেরও বিরক্ত করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথমে তার চিকিৎসা করতে হবে। সে সুস্থ হয়ে গেলে আশা করা যায়, আর সমস্যা হবে না। এরপর যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে অবস্থা বিবেচনায় নিম্নলিখিত যেকোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রথম পদ্ধতি
আপনি সাথে দুজন মানুষকে সাথে নিয়ে ওই বাড়িতে যান। তারপর উঁচু আওয়াজে কয়েকবার নিচের কথাগুলো বলুন। বাংলা এবং আরবী উভয়টিই বলবেন-
أَنَاشِدُكُمْ بِالْعَهْدِ الَّذِي أَخَذَهُ عَلَيْكُمْ سُلَيْمَانُ أَنْ تَرْحَلُوْا وَتَخْرُجُوا مِنْ بَيْتِنَا أَنَاشِدُكُمُ اللَّهَ أَنْ تَخْرُجُوا وَلَا تُؤْذُوا أَحَدًا
অর্থাৎ আমি তোমাদের সেই অঙ্গীকারের দোহাই দিচ্ছি, সুলাইমান আ. তোমাদের থেকে আল্লাহর নামে যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। আমি তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছি, আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। আমি আল্লাহর নামে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছি, তোমরা চলে যাও এবং আর কাউকে কষ্ট দিয়ো না।
এই কথাগুলো বাড়ির মালিক বললে সবচেয়ে ভালো হয়। পরপর তিনদিন এভাবে ঘোষণা করবেন। ইনশাআল্লাহ জিনেরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। এরপরও যদি বাড়িতে কোনো সমস্যা টের পান তাহলে দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসরণ করুন।

দ্বিতীয় পদ্ধতি
শুরুতেই বাড়িকে আল্লাহর অবাধ্যতার সব সরঞ্জাম থেকে পবিত্র করুন। যেমন: বাড়িতে যেন কোনো প্রাণীর ছবি, ভাস্কর্য তাগড়া কোনো শয়তানী তাবীজ ঝুলানো না থাকে- প্রথমে তা নিশ্চিত করুন।
এরপর একটা বালতিতে অথবা বড় পাত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিন। তারপর পানির কাছে মুখ নিয়ে নিচের দুআটি পড়ুন-
بِسْمِ اللَّهِ ، أَمْسَيْنَا بِاللَّهِ الَّذِي لَيْسَ مِنْهُ شَيْءٌ مُّمْتَنِعُ ، وَبِعِزَّةِ اللَّهِ الَّتِي لَا تُرَامُ وَلَا تُضَامُ ، وَبِسُلْطَانِ اللهِ الْمَنِيْعِ نَحْتَجِبُ ، وَبِأَسْمَائِهِ الْحُسْنَى كُلِّهَا عَائِذٌ مِّنَ الْأَبَالِسَةِ ، وَمِنْ شَرِّ شَيَاطِيْنِ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ مُعْلِنٍ أَوْ مُسِرٍ ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَخْرُجُ بِاللَّيْلِ وَيَكْمُنُ بِالنَّهَارِ ، وَيَكْمُنُ بِاللَّيْلِ وَ يَخْرُجُ بِالنَّهَارِ ، وَمِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَذَرَأَ وَبَرَأَ ، وَمِنْ شَرِّ إِبْلِيْسِ وَجُنُودِهِ ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ دَابَّةٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ، أَعُوذُ بِمَا اسْتَعَاذَ بِهِ مُوسَى ، وَعِيسَى ، وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى ، وَمِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَذَرَأَ وَبَرَأَ ، وَمِنْ شَرِّ إِبْلِيْسَ ، وَجُنُودِهِ ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَنْبَغِيْ
অর্থ: পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার নামে। আমরা আল্লাহ তাআলার হেফাজতে আছি, যার কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়, এবং আল্লাহর মহত্বের কারণে-যা কখনো পরাভূত করা সম্ভব নয়, এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কারণে আমরা তাঁর কাছে সুরক্ষা প্রার্থনা করি। আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের কসম, আমি শয়তানের হাত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষ ও জিনদের অনিষ্ট থেকে। আরও আশ্রয় প্রার্থনা করছি ওই সব শয়তান থেকে, যারা দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান, যারা রাতে আবির্ভূত হয় এবং দিনে মিলিয়ে যায়, আবার যারা রাতে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং দিনে আবির্ভূত হয়। আশ্রয় প্রার্থনা করছি ওইসব শয়তান থেকে, যাদের তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং আরও আশ্রয় প্রার্থনা করছি ইবলিস ও তার বাহিনীর সকল ধরনের অনিষ্ট থেকে। আর আশ্রয় প্রার্থনা করছি সেই সব জন্তুর অনিষ্ট থেকে, যারা আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন। আমি আল্লাহর কাছে ওইসব বিষয় থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন মুসা, ঈসা এবং ইবরাহীম আ.। আর ওই সকল অনিষ্ট থেকেও আশ্রয় চাচ্ছি, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন। শয়তান ও তার বাহিনীর অনিষ্ট এবং অন্য সব অশুভ বিষয় বা ক্ষতিকর বস্তু থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
এটা পড়া শেষে পানিতে ফুঁ দিন। এরপর আউযুবিল্লাহ বিসমিল্লাহসহ ২৩ নম্বর পারার সূরা সফফাতের প্রথম ১০ আয়াত পড়ুন-
أعوذ بالله السميع العليم من الشيطان الرجيم ، بسم الله الرحمن الرحيم وَالصَّفَّتِ صَفًّا فَالزَّجِرْتِ زَجْرًا فَالتَّلِتِ ذِكْرًا إِنَّ إِلَهَكُمْ لَوَاحِدٌ ) رَبُّ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ وَ مَا بَيْنَهُمَا وَ رَبُّ الْمَشَارِقِ إِنَّا زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِزِينَةِ الْكَوَاكِبِ وَحِفْظًا مِنْ كُلِّ شَيْطَنٍ مَّارِدٍ لَا يَسْمَعُوْنَ إِلَى الْمَلَا الْأَعْلَى وَ يُقْذَفُوْنَ مِنْ كُلِّ جَانِبِ ) دُحُورًا وَلَهُمْ عَذَابٌ وَّاصِبٌ إِلَّا مَنْ خَطِفَ الْخَطْفَة فَأَتْبَعَهُ شِهَابٌ ثَاقِبٌ )
এসব পড়ে পানিতে ফুঁ দিন। এরপর সেই পানি দরজা-জানালা, ঘরের ভেতর বাহির সহ পুরো বাড়িতে ছিটিয়ে দিন। ইনশাআল্লাহ আর কোনো সমস্যা থাকবে না। বাড়িতে দুষ্ট জিন থাকলে চলে যাবে। চাইলে এটাও কয়েকদিন করতে পারেন।
উপরিউক্ত পদ্ধতি ইবনুল কায়্যিম রহ. তাঁর 'আল-ওয়াবিলুস সয়্যিব ফি কালিমিত তায়্যিব' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। বিন বায রহ. থেকেও এ বিষয়ে আলোচনা পাওয়া যায়। আর শাইখ ওয়াহিদ বিন আব্দুস সালাম 'ওয়াকাইয়াতুল ইনসান মিনাল জিন্নি ওয়াশ শাইতান' গ্রন্থে এটা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন।
আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, সূরা সফফাতের আয়াতগুলোর সাথে আয়াতুল কুরসী পড়া এবং পানি ছিটানোর পর বাড়িতে উচ্চঃস্বরে আযান দেওয়া উচিত। একদল আলিমের মত হচ্ছে, প্রথম দুআর মতো এগুলোও একা পড়ার চেয়ে দুই বা তিনজন একত্রে পড়ে পানিতে ফুঁ দেওয়া বেশি উপকারী।

তৃতীয় পদ্ধতি
কোনো বাড়িতে জিনের উৎপাত থাকলে সেই বাড়িতে পরপর তিন দিন সূরা বাকারা তিলাওয়াত করলে ইনশাআল্লাহ সমস্যা দূর হয়ে যাবে। নতুন বাড়ি করার পর যদি পরপর তিনদিন সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয় তাহলে আগে থেকে কোনো জিন বা অন্য ক্ষতিকর মাখলুক সেখানে থাকলে চলে যাবে।
তবে সমস্যা সমাধান হওয়ার পরও মাঝেমধ্যে (প্রতি সপ্তাহে অথবা মাসে কয়েকবার) সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা উচিত। প্রতি সপ্তাহে তিলাওয়াত করা কষ্টসাধ্য মনে হলে সূরা বাকারার রেকর্ড প্লে করা যেতে পারে। তবে তিলাওয়াত করা সর্বোত্তম।

চতুর্থ পদ্ধতি
বাড়িতে সমস্যা হওয়ার কারণ যদি হয় সেখানে থাকা তাবীজ-কবচ, নকশা বা কবিরাজদের দেওয়া বাড়ি বন্ধ করার সরঞ্জাম। অথবা এই বাড়ির পর্বের বাসিন্দা যদি কোনো কুফরী জাদু চর্চা করে থাকে, তাহলে সর্বপ্রথম পুরো বাড়ি এবং বাড়ির চারপাশ তন্ন তন্ন করে খুঁজে জাদু- কবিরাজির সব সরঞ্জাম একত্র করতে হবে। এরপর জাদুর অধ্যায়ে বলা নিয়মে সেগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে।
এরপর একটা বালতি বা বড় পাত্রে পানি নিয়ে পূর্বে উল্লিখিত দুআ (বিসমিল্লাহ, আমসাইনা বিল্লাহিল্লাযি...) এবং আয়াতুল কুরসী, সূরা সফফাতের প্রথম ১০ আয়াত এবং সিহরের আয়াতগুলো (সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯) সবশেষে সূরা ফালাক, সূরা নাস কয়েকবার পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে পুরা বাড়িতে ছিটিয়ে দিন। এই কাজটা পরপর তিনদিন করবেন। তাহলে ইনশাআল্লাহ সমস্যাগুলো দূর হয়ে যাবে।

পঞ্চম পদ্ধতি
যদি সমস্যা তেমন জটিল না হয়, এমনি বাড়ির ছাদে জিনেরা আওয়াজ করে বা রাতে রান্নাঘর থেকে বিভিন্ন আওয়াজ আসে তাহলে পরপর তিনদিন উচ্চ আওয়াজে বাড়িতে আযান দিলে আর বাড়ির লোকেরা প্রতিদিনের মাসনূন আমল ঠিকমত করলে ইনশাআল্লাহ সমস্যা দূর হয়ে যাবে। এছাড়াও চাইলে উল্লিখিত প্রথম আমলটি করা যেতে পারে।
তো এই হচ্ছে বাড়ি থেকে জিনের সমস্যা দূর করার কয়েকটি শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি। তবে এসব করার পর যেন আবার শয়তান এখানে বাসা না করে-এর প্রতি খেয়াল রাখবেন। এজন্য বাড়িতে ইসলামী পরিবেশ চালু রাখার চেষ্টা করবেন, গান-বাজনা থেকে বাড়িকে পবিত্র রাখবেন। বিশেষত কোনো প্রাণীর ভাষ্কর্য বা ছবি যেন ঘরে টাঙানো না থাকে-এর প্রতি খেয়াল রাখবেন। কারণ, যে ঘরে কুকুর বা জীবজন্তুর ছবি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না। ১৪২ আর নফল-সুন্নাত নামায সম্ভব হলে ঘরে পড়বেন। তাহাজ্জুদ মাঝেমাঝে বাড়ির অন্যান্য ঘরেও পড়বেন। স্ত্রী থাকলে বলবেন, সাধারণত যে ঘরে নামায পড়ে, সেটা বাদে অন্যান্য ঘরেও যেন মাঝেমধ্যে নামায পড়ে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন।

টিকাঃ
১৪২. বুখারী: ৫৬১০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00