📄 রাত্রিতে জিনের সমস্যা
জিনের অথবা জাদুর সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে খবিস জিন দ্বারা যৌন নিপীড়নের স্বীকার হন। এই বিষয় তারা লজ্জায় কাউকে বলতেও পারেন না, আর এই যন্ত্রণা থেকে কিভাবে মুক্তি পাবেন তাও জানেন না। সাধারণত এই সমস্যা রাতে ঘুমের সময়ে হয়ে থাকে, তবে কেউ কেউ জাগ্রত অবস্থাতেও এধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন। আর এই সমস্যা মহিলা রোগীদের মাঝে তুলনামূলক বেশি হলেও পুরুষদের মাঝে এর সংখ্যা কম না!
অন্যান্য প্যারানরমাল সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চেয়ে এই ধরনের রোগীরা অনেক বেশি মানসিক পীড়ার শিকার হন এবং মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েন। তাই পরিবারের কেউ এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে তাকে রুকইয়ার পাশাপাশি মানসিক সাপোর্ট দেয়া খুবই জরুরি।
রোগীর পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য একটা বিষয় এখানেই পরিষ্কার করা জরুরি মনে করছি, রোগীর সাথে এরকম সমস্যা হওয়ার মানেই এই না যে, ছেলে বা মেয়েটি সত্যিই কারও সাথে যৌনক্রিয়া করেছে। বাস্তবে শারীরিকভাবে রেপ হওয়ার আর এই অশরীরীর আক্রমণের মাঝে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। সুতরাং তাঁর ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা করা মোটেই উচিৎ না। আপনার দেয়া সামান্য সাপোর্ট যেমন এই সমস্যা থেকে মুক্তির ওসীলা হতে পারে, তেমনি আপনার মিথ্যা তিরস্কারের জন্য সে জীবনের আশাও ছেড়ে দিতে পারে। তাই সহযোগী হন, প্রতিপক্ষ হবেন না।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এমন ঘটনা হতেই পারে, ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। ঠিকমত রুকইয়াহ করলে আল্লাহর অনুগ্রহে দ্রুত এই সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়া যায়। তাই দেরি না করে জলদি ব্যবস্থা নিন আর অবশ্যই খুব বেশি বেশি দোয়া করতে থাকুন।
লক্ষণীয়, যাদের স্বপ্নে শুধু এমন অভিজ্ঞতা হয় কিন্তু শারীরিকভাবে অন্য কোন সমস্যা অনুভব করেন না, অর্থাৎ খুব ঘনঘন বা প্রতিদিনই স্বপ্নদোষ হয়, ইনশাআল্লাহ তারাও এই পরামর্শগুলো অনুসরণ করে উপকৃত হবেন।
১। প্রথমেই ঘরকে আল্লাহর অবাধ্যতার সরঞ্জাম থেকে মুক্ত করুন। যেন ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করতে পারে।
২। সালাত এবং দোয়ায় কোনরকম অবহেলা করবেন না। পুরুষ হলে মসজিদের জামাতে আর নারী হলে সুবিধামত স্থানে যথাসময়ে নামাজ আদায় করে নেবেন।
৩। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের মাসনুন আমলগুলো অবশ্যই করবেন। মেয়েদের পিরিয়ডের সময়েও যেন এসব আমল বাদ না যায়। গ্রন্থের চলতি অধ্যায়ে “জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে করণীয়” এবং পরের অধ্যায়ে “মাসনুন আমল” অংশ দ্রষ্টব্য।
৪। ঘুমানোর আগে সম্ভব হলে রুকইয়ার গোসল করে নিন। নইলে অবশ্যই ওযু করুন। এক্ষেত্রে ওযুর পানিতে কিছু আয়াত পড়ে ফু দিয়ে নিলে আরও ভাল, যেমন আয়াতুল কুরসি এবং তিনকুল।
৫। এক-দেড়মাস প্রতিদিন কয়েকবার "রুকইয়াহ যিনা” শুনুন অথবা যিনা এবং ফাহিশার আয়াতগুলো তিলাওয়াত করুন। ১৩৮ বিশেষত ঘুমের আগে অথবা রাতে যেকোনো সময়। এটা আল্লাহর রহমতে অনেক উপকারী।
৬। গ্রন্থের শেষে উল্লেখিত রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়ে অলিভ অয়েলে ফুঁ দিন। রাতে ঘুমের আগে মাথার তালুতে এবং সারা গায়ে মালিশ করুন। (৭দিনের ডিটক্সের মত)
৭। যখন এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটার সম্ভাবনা থাকে যেমন ঘুমের সময়, রাতে হুট করে ঘুমে ভেঙ্গে গেলে অথবা জাগ্রত অবস্থায় যখন অনুভূত হচ্ছে 'শয়তান আক্রমণ করতে পারে' তখন বিভিন্ন ক্ষতি আশ্রয় চাওয়ার দোয়াগুলো মনোযোগের সাথে বার বার পড়া। যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ যদি ঘুমের মাঝে ভয় পায়, তখন এই দুআ পড়লে তার কোন ক্ষতি হবে না।
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ ، وَشَرِّ عِبَادِهِ ، وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ
উচ্চারণ: আ'ঊযু বিকালিমা-তিল্লাহিত্তা-ম্মাতি মিন গাদ্বাবিহি ওয়া 'ইক্কা-বিহি ওয়া শাররি 'ইবা-দিহ, ওয়ামিন হামাযা-তিশশায়া-তিনি ওয়া আই-ইয়াহদুরুন। অর্থ: আমি আশ্রয় চাই, আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামসমূহের দ্বারা তাঁর ক্রোধ থেকে, তাঁর শাস্তি থেকে এবং তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট থেকে, আর শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে এবং তাদের উপস্থিতি থেকে। ১৩৯
এরকম আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দোয়া রয়েছে, যেমন:
اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্না নাজ 'আলুকা ফী নুহুরিহিম ওয়া না'উযু বিকা মিন শুরূরিহিম। অর্থ: হে আল্লাহ! আমরা আপনাকে তাদের গলদেশে রাখছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। ১৪০
اللَّهُمَّ مُنْزِلَ الْكِتَابِ ، سَرِيعَ الْحِسَابِ ، اهْزِمِ الأَحْزَابَ ، اللَّهُمَّ اهْزِمُهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা মুনযিলাল কিতা-বি সারী'আল হিসা-বি ইহযিমিল আহযা-ব। আল্লা- হুম্মাহযিমহুম ওয়া যালযিলহুম। অর্থ: হে আল্লাহ, কিতাব নাযিলকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী! আপনি শত্রুবাহিনীকে পরাভূত করুন। হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে পরাজিত করুন এবং তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করে দিন। ১৪১
৮। নফল বা তাহাজ্জুদের সালাতে দাঁড়িয়ে যান। এধরণের সমস্যায় যখনই আক্রান্ত হবেন, সাথে সাথে আপনার উচিত হবে সেখান থেকে উঠে দোয়া অথবা নামাযের জন্য প্রস্তুত হওয়া।
৯। সম্ভব হলে রাতে একা না ঘুমানো। সাথে কেউ থাকলে সাধারণত এই ধরনের সমস্যা কম হয়।
১০। আর এধরণের ঘটনায় ফরজ গোসলের ব্যাপারে গুরুত্ব দিন। অবহেলা করবেন না। প্রয়োজনে কোন আলেম অথবা নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ থেকে গোসলের বিস্তারিত মাসআলা জেনে নেবেন।
মোটকথা হল, এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় সব দিক দিয়ে চেষ্টা করা। ইনশাআল্লাহ খবিস শয়তান খুব দ্রুতই পরাজিত হবে। আল্লাহ সহজ করুন। আমিন!
টিকাঃ
১৩৮. অডিও ruqyahbd.org/download#zina এবং পিডিএফ ruqyahbd.org/ayat#zina
১৩৯. তিরমিযী: ৩৫২৮
১৪০. আবু দাউদ: ১৫৩৭
১৪১. তিরমিযী: ১৬৭৮
📄 জিনের রোগীর রুকইয়াহ প্রসঙ্গে কয়েকটি বাস্তব ঘটনা
শুরুর অধ্যায়গুলোতে জিন আক্রান্তের চিকিৎসা প্রসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা বলা হয়েছে। যার মধ্যে ছিলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘটনা, সাহাবায়ে কিরাম এবং অন্যান্য সালাফদের ঘটনা। বাস্তব জীবনে কাজ করার সুবিধার্থে এবার আমরা এ বিষয়ক আরও কিছু ঘটনা উল্লেখ করব।
ঘটনা-১: প্রথম তিনটি ঘটনা মাওলানা ইমরান ভাইয়ের। আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। একটি ঘটনা তাঁর মুখেই শোনা যাক-
'আমার রুকইয়ার জগতে পদার্পণ হয়েছিল একজন আরব নাগরিকের হাত ধরে। দাওরায়ে হাদীস শেষ করার পর আমি তাবলিগের জামাতে কিছুদিন সময় লাগাচ্ছিলাম। তখন এক আরব জামাতের সাথে আমি এবং সিলেটের একটা ছেলে মুতারজিম (দোভাষী) হিসেবে ছিলাম। সাথের ছেলেটা একটুতেই অস্বাভাবিক রেগে যেত। এছাড়া আরও কিছু লক্ষণ ছিল, যা দেখে একদিন এশার পর ওই জামাতের একজন ফিলিস্তিনি ভাই আমাকে বললেন, "ওর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ওর সাথে জিন আছে! আগামীকাল ফজরের পর তাকে মসজিদের ছাদে নিয়ে আসবেন, আমি একটু দেখব।”
তার পরদিন সকালে আমি আর সেই ছেলেটা ছাদে গেলাম, সাথে ফিলিস্তিনি সাথি ভাইটিও ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, “আমি কুরআন তিলাওয়াত করব। আপনি শুধু তাকে শক্ত করে ধরে রাখবেন।"
তিনি পড়া শুরু করলেন। একটু পরই ছেলেটার চোখ লাল হয়ে গেল। একবার পেট, একবার বুক ফুলে উঠছিল। ফিলিস্তিনি ভাই প্রথমে আরবীতেই জিজ্ঞেস করলেন, “তোর নাম কী? এই ছেলেটাকে কেন ধরেছিস?” কিন্তু জিন কোনো উত্তর দিচ্ছিল না। তিনি আমাকে বললেন বাংলায় জিজ্ঞেস করতে। আমি ওই কথাগুলোই বাংলায় জিজ্ঞেস করলাম; কিন্তু এবারও কোনো সাড়াশব্দ নেই। শুধু ছেলেটা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল, আর বারবার পেট-বুক ফুলে উঠছিল।
তখন তিনি আবার পড়া শুরু করলেন। তিনি বিশেষভাবে আয়াতুল কুরসী এবং সূরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াত পুনরাবৃত্তি করছিলেন। অনেকক্ষণ তিলাওয়াত করার পর হঠাৎ বড় করে নিঃশ্বাস ছেড়ে ছেলেটা জ্ঞান হারাল। তার মুখে পানির ছিটা দিলে জ্ঞান ফিরল। এরপর ছেলেটা বলল, আমার অনেক হালকা লাগছে। তার মানে জিন চলে গেছে, আলহামদুলিল্লাহ। এই ঘটনার পর আরও কিছুদিন আমি ওই জামাতের সাথে ছিলাম, ছেলেটাও ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ছেলেটার আর কোনো সমস্যা হয়নি।'
ঘটনা-২: একটা মেয়ের কিছু সমস্যা ছিল। তার পরিবার ধারণা করছিল যে, তাকে জাদু করা হয়েছে। এ কারণে ইমরান ভাইকে দিয়ে তারা রুকইয়াহ করায়। ইমরান ভাই যখন তার রুকইয়াহ করছিলেন, তখন তার বড় বোন সেই ঘরেই বসে ছিল। সে বলছিল, 'আমার কেমন কেমন যেন লাগছে।' ইমরান ভাই একটু পর ছোট বোনের রুকইয়াহ থামিয়ে বললেন, আচ্ছা আপনি এদিকে আসেন, আপনার ওপর একটু রুকইয়াহ করে দেখি। বড় বোনের উপর রুকইয়াহ শুরু করলেই সে চিৎকার করে ওঠে। সে বলছিল, তুই এটা আপনিই করুন। কি করলি! আমিতো তাকে কোন কষ্ট দিচ্ছিলাম না। ওকে আমার ভালো লাগছিল। তাই আমি চাচ্ছিলাম, ওর সাথেই থাকব, কাউকে কিছু জানাব না। ইমরান ভাই এরপর দীর্ঘক্ষণ বড় বোনের রুকইয়াহ করেন। এমনি কোনো ঝামেলা করে নি; কিন্তু বেচারা তাকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছিল না। অনেকক্ষণ পর জিনটা চলে যায়। এরপর ছোট বোনের জন্য রুকইয়াহ করা হয়।
ঘটনা-৩: শেষ ঘটনাটি বরিশালের। একটা হিন্দু ছেলের জিনের সমস্যা ছিল। অনেক কবিরাজ-বৈদ্য দেখিয়েও কোনো লাভ হচ্ছিল না। পরে তার পরিবার ইমরান ভাইকে রুকইয়ার জন্য অনুরোধ করে। ইমরান ভাই তাদের বাসায় গিয়ে দেখেন, সব ঘর মূর্তি-দেবদেবী ইত্যাদির ছবি দিয়ে ভর্তি। তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, কী করবেন।
যাহোক, আল্লাহর ওপর ভরসা করে ওখানেই রুকইয়াহ শুরু করেন। এরপর জিন চলে আসে। কিছু কথাবার্তা হয়। স্বাভাবিকভাবে সে যেতে চায় না। অবশেষে দুদিন রুকইয়াহ করার পর তৃতীয় দিন সে চলে যায়।
যেহেতু জিন চলে যাওয়ার পরও আরও কিছুদিন রুকইয়াহ না করলে জিন আবারও ফিরে আসতে পারে, তাই পরের দিন ইমরান ভাই রুকইয়াহ করার জন্য যথারীতি তাদের বাসায় যান। সেদিন ছেলেটা সুস্থই ছিল। তখন তার বাবা বলে উঠল, আমি চাই না, আমার ছেলে কুরআনের কোনো প্রভাবের কথা মনে রাখুক। আরও স্পষ্ট করে বলি, আমার ছেলে কুরআনের মাধ্যমে সুস্থ হয়েছে—আমি কোনোভাবেই চাচ্ছি না, এটা তার মনে থাকুক। সুতরাং আপনি যেতে পারেন। ইমরান ভাই কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। পরে জানতে পারেন, ওই পরিবারের লোকেরা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ইসকন'র সদস্য। এরপর যখনই ছেলেটার বাবার সাথে দেখা হয়েছে, সে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। ছেলেটা কেমন আছে জিজ্ঞেস করলে, হ্যাঁ, ভালো আছে—জাতীয় দায়সারা কথা বলে দ্রুত সরে গেছে।
ঘটনা-৪: এই ঘটনার শুরু একটি সাপ মারার মধ্য দিয়ে। মুন্সিগঞ্জে। একটি মেয়ে প্রায়ই স্বপ্ন দেখত, সে গর্ভে থাকাকালে তার মা একটি সাপ মারছে। তার মাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিশেষ কিছু মনে করতে পারেন না। কারণ, সাপ মারায় উনার স্বাভাবিক আগ্রহ ছিল। পরে বুঝতে পারেন, উনি এমন একটি সাপ মেরেছেন, যেটা ছিল আসলে জিন। তখন থেকেই উনি বিভিন্ন অসুখে ভুগছেন। জন্মের পর থেকেই উনার মেয়ের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা দানা বাঁধতে থাকে। তার রাগ ছিল খুব বেশি কাউকে সহ্য করতে পারত না, খাওয়া-দাওয়ায় রুচি ছিল না, একের পর এক রোগ লেগেই থাকত। দুদিন পরপরই ডাক্তারের কাছে দৌড়াতে হতো।
হাইস্কুলে পড়া অবস্থায় সমস্যা নতুন দিকে মোড় নেয়, সে প্রতিদিন স্বপ্নে সাপ দেখত। এছাড়াও কুকুর, পেঁচা, কবুতরও দেখত। এতে তার ভয় লাগত না; বরং ভালই লাগত। সাপগুলোও তাকে ভয় দেখাত না; নতুন নতুন জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেত। এক সময় সে সাপদের পরিবারের লোকদের চেয়েও বেশি ভালবাসতে শুরু করে। পরীক্ষার হলে দেখত, কলমের মাথায় সাপ বসে আছে। তখন সব পড়া ভুলে যেত। আস্তে আস্তে অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল। দিন দিন সে মানুষজন থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। কারও সাথে মিশত না, কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিয়ে, হৈচৈ ভালো লাগত না। রাস্তাঘাটে চলতে পারত না, গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগত। সে রাস্তার মাঝে, পুকুরে বিভিন্ন জায়গায় সাপ দেখতে পেত, যা অন্য কেউ দেখত না। বাড়িতে গরুর গোশত আনলেই রাগারাগি করে বাড়ি মাথায় তুলত।
বাড়ির লোকেরা এ সময় তার চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়। বিভিন্ন হুজুর, ফকির, পীরের কাছে তদবীর নেয়। কেউ তাবীজ দেয়, ফলে কিছুদিন ভালো থাকে। তারপর হঠাৎ তাবীজ হারিয়ে যায়, আবার সমস্যা শুরু হয়। কেউ পানি পড়া, মধু পড়া দেয়, নানা ধরনের বিধিনিষেধ দেয়। দিনশেষে ফায়দার ঘরে শূন্য। তার আত্মীয়রা যেখানেই একটু আশার আলো দেখেছে, দৌড়ে গেছে।
এক কবিরাজ তাকে চিকিৎসা দেয়, এক মাস ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না, সবকিছু ঘরেই করতে হবে এবং তার দেওয়া হাড়ি ভেঙে পানি খেতে হবে। সব করেও লাভ হয় না। কবিরাজের সাথে যোগাযোগ করলে বলে, তার পক্ষে সম্ভব না। ওই জিনেরা তাকে পিটিয়ে অসুস্থ করে দিয়েছে। এমন আরও অনেকের কাছে যাওয়া হয়, কেউ দূর থেকে জিন দ্বারা চিকিৎসা করবে বলে, কেউ সাত ঘাটের পানি চায়। কেউ হাত দেখে সমাধান বলে, কেউ মোমবাতি জ্বালিয়ে আরবী লেখা কাগজ পুড়িয়ে সেই ধোয়া নিতে বলে, কিছুতেই কাজ হয় না। একজন জানায়, মেয়েটার ওপর যে ভর করে ওটা তান্ত্রিক জিন! তাই কবিরাজদের থেকে কিছু আনলে সে মন্ত্র পড়ে নষ্ট করে ফেলে।
এক পর্যায়ে মেয়েটিকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘুমের ওষুধ এবং অনেক ব্যয়বহুল কাউন্সেলিং চলে কিছুদিন। দিনের অর্ধেক সময় তার ঘুমিয়ে কাটত। বেফায়দা কাজ হচ্ছে বুঝতে পেরে দুই মাস পর এসব বন্ধ করা হয়।
সবশেষে এক কবিরাজের কাছে যাওয়া হয়। তোর কথাবার্তায় মেয়েটির স্বজনেরা আশ্বস্ত হয়। সে মেয়েটিকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে, মেয়েটি উত্তর দেয়। এক পর্যায়ে সে মিথ্যে বলার অপবাদ দিতে থাকে এবং খুব ধমকায়। এক সময় বলে মেয়েটির সাথে থাকা জিনকে সে আটকে ফেলেছে এবং একটা পরী এসে জিনকে খেয়ে ফেলেছে। শেষে বলে, সে কোনো পারিশ্রমিক নেবে না। তবে তার ভক্তদের জন্য কিছু দিতে হবে। আর বলে, মেয়েটির জানের সাদকা দিতে হবে এবং তার গুরুকে খুশি করতে হবে। মেয়েটির মামা ওই কবিরাজকে দশ হাজার টাকা পরিশোধ করে বাড়ি ফিরে। সাথে চিকিৎসা হিসেবে কয়েকপদের পাতা, চিনি পড়া, মেশিনে ভাঙানো প্রথম সরিষার তেল, তাবীজ, তালের আঁটি আরও অনেক হাবিজাবি নিয়ে আসে। সেই রাতটা ভালো কাটলেও পরের দিন অবস্থা মারাত্মক আকার ধারণ করে। মেয়েটি ওড়নার ফাঁস দিয়ে নিজেকে মেরে ফেলতে চাচ্ছিল। কেউ তাকে ধরে রাখতে পারছিল না। চোখ-মুখ লাল হয়ে অনেকক্ষণ দাঁতে দাঁত লেগে থাকে। কয়েকঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে মাঝের কোনো ঘটনা তার মনে ছিল না।
তখন আমাদের রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপের কার্যক্রম কেবল শুরু হয়েছে। প্রথম ব্যাচের এডমিনদের মাঝে মেয়েটার মামাত ভাই ছিল। তার অনুরোধে মাওলানা ইমরান ভাই আর আমি রুকইয়াহ করি। সাথে মেয়েটির দুই ভাই ছিল; তারা উভয়ে হাফেজ। তারাও যথেষ্ট সহায়তা করেছে। রুকইয়ার শুরুতে সে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক অজ্ঞান হয়ে একদম স্থির বসেছিল। আস্তে আস্তে বিভিন্ন ইফেক্ট শুরু হয়। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছিল আর সে শোয়ার জন্য চেষ্টা করছিল, সাথে আবার গোঙাচ্ছিল। শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল প্রচুর। এছাড়াও আরও বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় তখন। মাঝে মাঝে শয়তানটা লাফ দিয়ে ধ্যানে বসতে চাচ্ছিল, ওড়না গলায় পেঁচিয়ে ফাঁস দিতে চাচ্ছিল, নিজেকে আঘাত করছিল। তার ভাইয়েরা বারবার সামলিয়েছে। মাঝেমধ্যে শয়তানটা চলেও যাচ্ছিল, কিন্তু মেয়েটিকে কোনো দুআ বা আয়াত পড়তে দিলেই আবার ফিরে আসছিল। সব মিলিয়ে প্রথম দিন আমরা টানা ৬-৭ ঘণ্টা রুকইয়াহ করলাম। বাকি দিনগুলোতে তার ভাইয়েরা রুকইয়াহ করে।
দ্বিতীয় দিন সকালে তার কিছুই খেয়াল ছিল না। রুকইয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে তাকে কালিমা পড়তে বলা হয়। সে চেষ্টা করতেই শয়তানটা এসে ভর করে। তখন আবার রুকইয়াহ শুরু করা হয়। এভাবে এক সপ্তাহ প্রতিদিন ৩-৪ ঘণ্টা করে রুকইয়াহ করা হয়। তার সমস্যা আস্তে আস্তে কমে আসে। এমনকি সে নিজে নিজেই রুকইয়ার সবগুলো আয়াত পড়তে পারে। আবার গরুর গোশত খাওয়া শুরু করে, নিয়মিত নামায পড়ে। কিছু কিছু প্রভাব এরপরও ছিল, এজন্য তাকে নিজে নিজে রুকইয়াহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। আর বলা হয়, দুআ করতে। আমরাও তার জন্য দুআ করি। আল্লাহ তাআলা তাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। আমীন।
ঘটনা-৫: এটা ঢাকায় রুকইয়াহ সেন্টার চালু হওয়ার কয়েকদিন পরের ঘটনা। এক দম্পতি এসেছিল রুকইয়াহ করার জন্য। স্ত্রী লোকটির সমস্যা। তিনি একজন শিক্ষিকা। তার সমস্যা ছিল-সে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখত, আত্মহত্যা করতে চাইত, ক্লাস নিতে লাগলে ঘুম আসত, সারা শরীরে পিন ফুটার অনুভূতি হত, ওয়াসওয়াসাও হতো খুব, স্বামী-সন্তানদের সহ্য করতে পারত না, বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইত... ইত্যাদি বেশ কিছু সমস্যা ছিল।
তো একজন তার রুকইয়াহ করল। আমি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রথমে ধারণা করেছিলাম, হয়তো বদনজরের সমস্যা; কিন্তু রুকইয়াহ শুরুর পরেই তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন। তার একটু পর জিন কথা বলতে লাগল।
জিন বলছিল-আমি যাব না, গেলে আমাকে মেরে ফেলবে। জিজ্ঞেস করলাম, কে মারবে তোকে? জিন বলল, 'ম্যাজিশিয়ান।' আমি বললাম, ভয়ের কিছু নেই। তোকে একটা জিনিস শিখিয়ে দিচ্ছি। এতে করে আর তোর কিছু হবে না। সে জিজ্ঞেস করল, কী? আমি বললাম, আয়াতুল কুরসী জানিস? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, কেউ ক্ষতি করতে আসলে আয়াতুল কুরসী পড়বি তাহলে আর কিছু হবে না।
সে বলছিল, আমি একা না। আরও কয়েকজন আছে। (কয়জনের কথা বলেছিল সংখ্যাটা আমার মনে নেই) আমি বললাম, যতজন আছিস সব একসাথে মরবি, যদি না যাস। এরপরও যাচ্ছিল না। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, জাদুর জিনিসপত্র কোথায় আছে, যেগুলো দিয়ে জাদু করছে? জিন বলল, সাগরে আছে। আমি বললাম, আচ্ছা। আসমানে থাকুক আর জমিনে থাকুক; তুই এখন ভাগ। এরপরও সে 'আমি যেতে পারছি না, যেতে পারব না, গেলে আমাকে মেরে ফেলবে'- জাতীয় কথাবার্তা বলছিল। হঠাৎ তাবীজের কথা মনে হলো আমার। তার হাজব্যান্ডকে জিজ্ঞেস করলাম, উনার সাথে কি কোনো তাবীজ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, ৪-৫টা। আমি বললাম, সব তাবীজ খুলে ফেলেন। আমরা অন্যদিকে ফিরলাম। তিনি যেই না তাবীজ খুলে নিলেন, তার স্ত্রী আবার অজ্ঞান হয়ে গেল। সাথে সাথে জিনটাও চলে গেল।
মুখে পানির ছিটা দিলে তার জ্ঞান ফিরল। জিন আসলেই গেছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়তে দিলাম। তিনি নিজেই অনেকক্ষণ তিলাওয়াত করলেন। আর কোনো সমস্যা দেখা গেলনা মালহামদুলিল্লাহ। তারপর তাকে কিছুদিন কয়েকটা সেলফ রুকইয়ার পরামর্শ দিলাম, যেন বাকি সমস্যাগুলোও চলে যায়। এর মাসখানেক পর সেই দম্পতির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তখন তারা জানিয়েছিলেন, জিন আর কোনো ঝামেলা করেনি। তবে ছোট ছোট কিছু সমস্যা রয়ে গেছে এখনও। আমি সেগুলো দূর হওয়া পর্যন্ত সেলফ রুকইয়াহ করে যেতে বললাম।
📄 বাড়িতে জিনের সমস্যা থাকলে করণীয়
অনেক বাড়িতে অস্বাভাবিক কিছু সমস্যা দেখা যায়। যেমন: ১. বিভিন্ন ছায়া বা আকৃতি দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা; ২. রাতে অথবা কেউ যখন বাড়িতে থাকে না, তখন রান্নাঘর, অন্যান্য কামরা বা ছাদ থেকে আওয়াজ আসা; ৩. ফাঁকা ঘর বা ছাদ থেকে বাড়ির লোকদের নাম ধরে ডাকছে-এমনটা শোনা; ৪. বাহিরে বা অন্য জায়গায় অবস্থান করছে-এমন কাউকে বাড়িতে দেখতে পাওয়া; ৫. অকারণে টয়লেটের ট্যাপ-ঝর্ণা চালু হওয়া, লাইট-ফ্যান অন-অফ হওয়া, দরজা-জানালা বারবার খোলা বন্ধ হওয়া ৬. নিজেরা না করলেও জিনিসপত্র বারবার লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া, এক জায়গার জিনিস অন্য জায়গায় পাওয়া; ৭. অকারণে গ্লাস বা আয়না ভেঙ্গে যাওয়া; ৮. অদ্ভুতভাবে জিনিসপত্র হারিয়ে যাওয়া; ৯. ঘুমের সময় কাঁথা-কম্বল টান দিয়ে বিরক্ত করা; ১০. রাতে বাড়ির আশেপাশের কুকুরগুলো অতিরিক্ত ঘেউ ঘেউ করা ইত্যাদি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে মহান সাহাবীগণের সাথেও এ ধরণের অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। বাড়িতে সাপ দেখার ঘটনা এই অধ্যায়ের শুরুতে বলা হয়েছে। আগ্রহীরা এ বিষয়ে আরও ঘটনা জানতে জিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস বইটি দেখতে পারেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাড়িতে কেন জিনের সমস্যা হয়?
সাধারণত তিনটি কারণে এমন হয়ে থাকে-
প্রথমত: এই জায়গাটা দীর্ঘদিন বিরান ছিল বা বন-জঙ্গল ছিল। তাই এখানে জিনেরা আবাস গড়েছিল। বিরান জায়গায় কেউ বাড়ি বানালে জিনরা সমস্যা করতে পারে। এরকম সমস্যার জন্য নিচে উল্লিখিত প্রথম তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করলেই হবে ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয়ত: এই জায়গায় বা বাড়িতে পূর্বে যারা বাস করেছে, তাদের কেউ যদি শয়তানী জাদু চর্চা করে থাকে তাহলে এরপর সেখানে বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রথম তিনটির সাথে চতুর্থ পদ্ধতিও দ্রষ্টব্য।
তৃতীয়ত: বাড়ির কাউকে জিন দ্বারা জাদু করা হলে অথবা কেউ জিন-আক্রান্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি জিন অন্যদেরও বিরক্ত করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথমে তার চিকিৎসা করতে হবে। সে সুস্থ হয়ে গেলে আশা করা যায়, আর সমস্যা হবে না। এরপর যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে অবস্থা বিবেচনায় নিম্নলিখিত যেকোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রথম পদ্ধতি
আপনি সাথে দুজন মানুষকে সাথে নিয়ে ওই বাড়িতে যান। তারপর উঁচু আওয়াজে কয়েকবার নিচের কথাগুলো বলুন। বাংলা এবং আরবী উভয়টিই বলবেন-
أَنَاشِدُكُمْ بِالْعَهْدِ الَّذِي أَخَذَهُ عَلَيْكُمْ سُلَيْمَانُ أَنْ تَرْحَلُوْا وَتَخْرُجُوا مِنْ بَيْتِنَا أَنَاشِدُكُمُ اللَّهَ أَنْ تَخْرُجُوا وَلَا تُؤْذُوا أَحَدًا
অর্থাৎ আমি তোমাদের সেই অঙ্গীকারের দোহাই দিচ্ছি, সুলাইমান আ. তোমাদের থেকে আল্লাহর নামে যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। আমি তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছি, আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। আমি আল্লাহর নামে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছি, তোমরা চলে যাও এবং আর কাউকে কষ্ট দিয়ো না।
এই কথাগুলো বাড়ির মালিক বললে সবচেয়ে ভালো হয়। পরপর তিনদিন এভাবে ঘোষণা করবেন। ইনশাআল্লাহ জিনেরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। এরপরও যদি বাড়িতে কোনো সমস্যা টের পান তাহলে দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
দ্বিতীয় পদ্ধতি
শুরুতেই বাড়িকে আল্লাহর অবাধ্যতার সব সরঞ্জাম থেকে পবিত্র করুন। যেমন: বাড়িতে যেন কোনো প্রাণীর ছবি, ভাস্কর্য তাগড়া কোনো শয়তানী তাবীজ ঝুলানো না থাকে- প্রথমে তা নিশ্চিত করুন।
এরপর একটা বালতিতে অথবা বড় পাত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিন। তারপর পানির কাছে মুখ নিয়ে নিচের দুআটি পড়ুন-
بِسْمِ اللَّهِ ، أَمْسَيْنَا بِاللَّهِ الَّذِي لَيْسَ مِنْهُ شَيْءٌ مُّمْتَنِعُ ، وَبِعِزَّةِ اللَّهِ الَّتِي لَا تُرَامُ وَلَا تُضَامُ ، وَبِسُلْطَانِ اللهِ الْمَنِيْعِ نَحْتَجِبُ ، وَبِأَسْمَائِهِ الْحُسْنَى كُلِّهَا عَائِذٌ مِّنَ الْأَبَالِسَةِ ، وَمِنْ شَرِّ شَيَاطِيْنِ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ مُعْلِنٍ أَوْ مُسِرٍ ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَخْرُجُ بِاللَّيْلِ وَيَكْمُنُ بِالنَّهَارِ ، وَيَكْمُنُ بِاللَّيْلِ وَ يَخْرُجُ بِالنَّهَارِ ، وَمِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَذَرَأَ وَبَرَأَ ، وَمِنْ شَرِّ إِبْلِيْسِ وَجُنُودِهِ ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ دَابَّةٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ، أَعُوذُ بِمَا اسْتَعَاذَ بِهِ مُوسَى ، وَعِيسَى ، وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى ، وَمِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَذَرَأَ وَبَرَأَ ، وَمِنْ شَرِّ إِبْلِيْسَ ، وَجُنُودِهِ ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَنْبَغِيْ
অর্থ: পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার নামে। আমরা আল্লাহ তাআলার হেফাজতে আছি, যার কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়, এবং আল্লাহর মহত্বের কারণে-যা কখনো পরাভূত করা সম্ভব নয়, এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কারণে আমরা তাঁর কাছে সুরক্ষা প্রার্থনা করি। আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের কসম, আমি শয়তানের হাত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষ ও জিনদের অনিষ্ট থেকে। আরও আশ্রয় প্রার্থনা করছি ওই সব শয়তান থেকে, যারা দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান, যারা রাতে আবির্ভূত হয় এবং দিনে মিলিয়ে যায়, আবার যারা রাতে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং দিনে আবির্ভূত হয়। আশ্রয় প্রার্থনা করছি ওইসব শয়তান থেকে, যাদের তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং আরও আশ্রয় প্রার্থনা করছি ইবলিস ও তার বাহিনীর সকল ধরনের অনিষ্ট থেকে। আর আশ্রয় প্রার্থনা করছি সেই সব জন্তুর অনিষ্ট থেকে, যারা আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন। আমি আল্লাহর কাছে ওইসব বিষয় থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন মুসা, ঈসা এবং ইবরাহীম আ.। আর ওই সকল অনিষ্ট থেকেও আশ্রয় চাচ্ছি, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন। শয়তান ও তার বাহিনীর অনিষ্ট এবং অন্য সব অশুভ বিষয় বা ক্ষতিকর বস্তু থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
এটা পড়া শেষে পানিতে ফুঁ দিন। এরপর আউযুবিল্লাহ বিসমিল্লাহসহ ২৩ নম্বর পারার সূরা সফফাতের প্রথম ১০ আয়াত পড়ুন-
أعوذ بالله السميع العليم من الشيطان الرجيم ، بسم الله الرحمن الرحيم وَالصَّفَّتِ صَفًّا فَالزَّجِرْتِ زَجْرًا فَالتَّلِتِ ذِكْرًا إِنَّ إِلَهَكُمْ لَوَاحِدٌ ) رَبُّ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ وَ مَا بَيْنَهُمَا وَ رَبُّ الْمَشَارِقِ إِنَّا زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِزِينَةِ الْكَوَاكِبِ وَحِفْظًا مِنْ كُلِّ شَيْطَنٍ مَّارِدٍ لَا يَسْمَعُوْنَ إِلَى الْمَلَا الْأَعْلَى وَ يُقْذَفُوْنَ مِنْ كُلِّ جَانِبِ ) دُحُورًا وَلَهُمْ عَذَابٌ وَّاصِبٌ إِلَّا مَنْ خَطِفَ الْخَطْفَة فَأَتْبَعَهُ شِهَابٌ ثَاقِبٌ )
এসব পড়ে পানিতে ফুঁ দিন। এরপর সেই পানি দরজা-জানালা, ঘরের ভেতর বাহির সহ পুরো বাড়িতে ছিটিয়ে দিন। ইনশাআল্লাহ আর কোনো সমস্যা থাকবে না। বাড়িতে দুষ্ট জিন থাকলে চলে যাবে। চাইলে এটাও কয়েকদিন করতে পারেন।
উপরিউক্ত পদ্ধতি ইবনুল কায়্যিম রহ. তাঁর 'আল-ওয়াবিলুস সয়্যিব ফি কালিমিত তায়্যিব' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। বিন বায রহ. থেকেও এ বিষয়ে আলোচনা পাওয়া যায়। আর শাইখ ওয়াহিদ বিন আব্দুস সালাম 'ওয়াকাইয়াতুল ইনসান মিনাল জিন্নি ওয়াশ শাইতান' গ্রন্থে এটা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন।
আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, সূরা সফফাতের আয়াতগুলোর সাথে আয়াতুল কুরসী পড়া এবং পানি ছিটানোর পর বাড়িতে উচ্চঃস্বরে আযান দেওয়া উচিত। একদল আলিমের মত হচ্ছে, প্রথম দুআর মতো এগুলোও একা পড়ার চেয়ে দুই বা তিনজন একত্রে পড়ে পানিতে ফুঁ দেওয়া বেশি উপকারী।
তৃতীয় পদ্ধতি
কোনো বাড়িতে জিনের উৎপাত থাকলে সেই বাড়িতে পরপর তিন দিন সূরা বাকারা তিলাওয়াত করলে ইনশাআল্লাহ সমস্যা দূর হয়ে যাবে। নতুন বাড়ি করার পর যদি পরপর তিনদিন সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয় তাহলে আগে থেকে কোনো জিন বা অন্য ক্ষতিকর মাখলুক সেখানে থাকলে চলে যাবে।
তবে সমস্যা সমাধান হওয়ার পরও মাঝেমধ্যে (প্রতি সপ্তাহে অথবা মাসে কয়েকবার) সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা উচিত। প্রতি সপ্তাহে তিলাওয়াত করা কষ্টসাধ্য মনে হলে সূরা বাকারার রেকর্ড প্লে করা যেতে পারে। তবে তিলাওয়াত করা সর্বোত্তম।
চতুর্থ পদ্ধতি
বাড়িতে সমস্যা হওয়ার কারণ যদি হয় সেখানে থাকা তাবীজ-কবচ, নকশা বা কবিরাজদের দেওয়া বাড়ি বন্ধ করার সরঞ্জাম। অথবা এই বাড়ির পর্বের বাসিন্দা যদি কোনো কুফরী জাদু চর্চা করে থাকে, তাহলে সর্বপ্রথম পুরো বাড়ি এবং বাড়ির চারপাশ তন্ন তন্ন করে খুঁজে জাদু- কবিরাজির সব সরঞ্জাম একত্র করতে হবে। এরপর জাদুর অধ্যায়ে বলা নিয়মে সেগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে।
এরপর একটা বালতি বা বড় পাত্রে পানি নিয়ে পূর্বে উল্লিখিত দুআ (বিসমিল্লাহ, আমসাইনা বিল্লাহিল্লাযি...) এবং আয়াতুল কুরসী, সূরা সফফাতের প্রথম ১০ আয়াত এবং সিহরের আয়াতগুলো (সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯) সবশেষে সূরা ফালাক, সূরা নাস কয়েকবার পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে পুরা বাড়িতে ছিটিয়ে দিন। এই কাজটা পরপর তিনদিন করবেন। তাহলে ইনশাআল্লাহ সমস্যাগুলো দূর হয়ে যাবে।
পঞ্চম পদ্ধতি
যদি সমস্যা তেমন জটিল না হয়, এমনি বাড়ির ছাদে জিনেরা আওয়াজ করে বা রাতে রান্নাঘর থেকে বিভিন্ন আওয়াজ আসে তাহলে পরপর তিনদিন উচ্চ আওয়াজে বাড়িতে আযান দিলে আর বাড়ির লোকেরা প্রতিদিনের মাসনূন আমল ঠিকমত করলে ইনশাআল্লাহ সমস্যা দূর হয়ে যাবে। এছাড়াও চাইলে উল্লিখিত প্রথম আমলটি করা যেতে পারে।
তো এই হচ্ছে বাড়ি থেকে জিনের সমস্যা দূর করার কয়েকটি শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি। তবে এসব করার পর যেন আবার শয়তান এখানে বাসা না করে-এর প্রতি খেয়াল রাখবেন। এজন্য বাড়িতে ইসলামী পরিবেশ চালু রাখার চেষ্টা করবেন, গান-বাজনা থেকে বাড়িকে পবিত্র রাখবেন। বিশেষত কোনো প্রাণীর ভাষ্কর্য বা ছবি যেন ঘরে টাঙানো না থাকে-এর প্রতি খেয়াল রাখবেন। কারণ, যে ঘরে কুকুর বা জীবজন্তুর ছবি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না। ১৪২ আর নফল-সুন্নাত নামায সম্ভব হলে ঘরে পড়বেন। তাহাজ্জুদ মাঝেমাঝে বাড়ির অন্যান্য ঘরেও পড়বেন। স্ত্রী থাকলে বলবেন, সাধারণত যে ঘরে নামায পড়ে, সেটা বাদে অন্যান্য ঘরেও যেন মাঝেমধ্যে নামায পড়ে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন।
টিকাঃ
১৪২. বুখারী: ৫৬১০