📘 রুকইয়াহ > 📄 জিন আপোষে না গেলে করণীয়

📄 জিন আপোষে না গেলে করণীয়


আপোষে গেলে তো ভালো, আলহামদুলিল্লাহ! কিন্তু যদি যেতে অস্বীকার করে, অথবা কিছুই না বলে, তাহলে দীর্ঘ রুকইয়ার মাধ্যমে চলে যেতে বাধ্য করতে হবে।
এখানে লক্ষণীয় হচ্ছে, জিনের রোগীকে মারধর করা থেকে বিরত থাকবেন, এর কোনো আবশ্যকতা নেই। বিশেষত রোগী শিশু হলে কখনোই আঘাত করবেন না। একটু পর এর কারণ উল্লেখ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
আপনি প্রথমে তাকে এই বলে সতর্ক করুন যে, তুমি চলে যাও; নয়তো তোমাকে কুরআনের আয়াত দিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে, আর আখিরাতেও তুমি জাহান্নামের আগুনে শাস্তি পাবে। সতর্ক করার পাশাপাশি রুকইয়াহ করতে থাকুন। এরপরও যদি যেতে না চায় তখন কঠোর হোন।
এবার তৃতীয় মাত্রায় যেসব আয়াত জিনদের শাস্তি দেয় সেসব তিলাওয়াত করতে থাকুন। যেমন: আয়াতুল হারক (অর্থাৎ কুরআনের যেসব আয়াতে কবরের বা জাহান্নামের আযাব এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর গজবের কথা রয়েছে) এবং যেসব আয়াতে জিন-শয়তানের আলোচনা রয়েছে, জিনকে শাস্তি দেওয়ার নিয়তে সেসব তিলাওয়াত করুন। এছাড়া সূরা তাওবাহ এবং আনফালের কিতাল সংক্রান্ত কিছু আয়াত, সূরা ইয়াসীন, সূরা সফফাত, সূরা দুখান, সূরা জিন - এসবের শুরুর কিছু আয়াত, সূরা হাশরের শেষ ৪ আয়াত, সূরা আলা, সূরা হুমাযাহ, সূরা ফীল; এসবও পড়তে পারেন।। এসকল আয়াত এবং সূরা পড়লে খবিস জিন তুলনামূলক বেশি কষ্ট পায়। এসব কানের কাছে পড়ুন, পড়ার পর হালকা থুতু ছিটিয়ে দিন, পানিতে ফুঁ দিয়ে খাইয়ে দিন, তেলের ওপর ফুঁ দিয়ে সেটা হাতে-পায়ে, মাথায় মালিশ করতে বলুন। এতে জিন অনেক কষ্ট পাবে। এভাবে চাপ প্রয়োগ করুন, আর তাকে চলে যেতে নির্দেশ দিন।
যদি রুকইয়ার সময় শরীরের কোন জায়গা লাফালাফি করে, অথবা এক স্থানে ব্যথা জমা হয় তাহলে ওই জায়গা চেপে ধরে তিলাওয়াত করুন। গাইরে মাহরামের ক্ষেত্রে সাথে থাকা আত্মীয়কে বলুন আয়াতুল কুরসী বা কিছু পড়তে আর ওই জায়গায় চাপ দিতে। মুরব্বিদের হাত-পা টিপে দেওয়ার মতো হালকা চাপ দিতে হবে; কিন্তু এতেই জিনের অনেক কষ্ট হবে। আর যদি জিন চলে যাওয়ার ব্যাপারে রাজি হয়, তবে পড়া বন্ধ করুন এবং ওয়াদা নিয়ে তাকে যেতে সুযোগ দিন।
আবারও সতর্ক করছি, রোগী গাইরে মাহরাম হলে তাকে স্পর্শ করবেন না। আর রোগীকে আঘাত করার ব্যাপারে আমি সর্বাবস্থায় নিরুৎসাহিত করব। এর পেছনে অনেকগুলো কারণে রয়েছে। প্রথমত: মারার সময় জিনের গায়ে লাগছে সত্য; কিন্তু জিন চলে গেলে শরীরের ব্যথাটা থেকে যাবে। দ্বিতীয়ত: অনেক জিন আছে, মারার আগেই বের হয়ে যায়, মারা শেষে আবার আসে। অর্থাৎ পুরোটা মার রোগীর ওপর পড়ে। তৃতীয়ত: ঘটনাক্রমে রোগীর কোনো ক্ষতি হলে এর দায় অবশ্যই আপনাকে নিতে হবে।
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রা. সূত্রে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ تَطَبَّبَ وَلَا يُعْلَمُ مِنْهُ طِبٌ فَهُوَ ضَامِنٌ
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোন ব্যক্তি যদি চিকিৎসা সম্পর্কে না জেনে চিকিৎসা করে, তবে (কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে) সে দায়ী হবে।” ১৩৬
সুতরাং জিনের রোগীকে আঘাত করার ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকবেন। পূর্ণ ঈমানের সাথে পাহাড়ের ওপর কুরআন পড়লে পাহাড় সরে যাবে, কিন্তু আপনি সারাজীবন বেত পিটিয়েও এক ইঞ্চি সরাতে পারবেন না। সুতরাং মারধর না করে ধৈর্যের সাথে কুরআন পড়তে থাকুন। প্রয়োজনে উল্লিখিত পরামর্শগুলো অনুসরণ করুন। আর আপনার যদি ধৈর্যে ঘাটতি থাকে তাহলে অনুগ্রহ করে মানুষের ওপর রুকইয়াহ করতে যাবেন না। এই কাজ আপনার জন্য নয়।
খেয়াল রাখবেন, মানুষকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া যেমন হারাম, তেমনি জিনকেও অহেতুক কষ্ট দেওয়া হারাম। অতএব কোনো প্রকার জুলুম যেন না হয়-সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। নয়তো পরে আপনি বিপদে পড়লে কিছু করার থাকবে না।
যাহোক, সংক্ষেপে এই হচ্ছে জিন তাড়ানোর পদ্ধতি। মূল কথা হচ্ছে, আপনি জিনের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাবিত বা উত্তেজিত না হয়ে যদি শান্তভাবে তিলাওয়াত করতে থাকেন আর যদি জিনকে সহজেই চলে যেতে রাজি করতে পারেন তাহলে আশা করা যায় ব্যাপারটা খুব সহজেই সমাধা করতে পারবেন। হ্যাঁ, কখনো ব্যতিক্রম কিছু অবস্থা এবং পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে—তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। পরের অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে বলা হবে ইনশাআল্লাহ।

তৃতীয় ধাপ: চিকিৎসা-পরবর্তী পরামর্শ
জিন চলে যাওয়ার পর, চিকিৎসা শেষে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে বলতে হবে—
১. প্রতিদিন কমপক্ষে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা কুরআন তিলাওয়াত শোনা। এ ক্ষেত্রে সূরা বাকারা, সূরা ইয়াসীন, সফফাত, দুখান, জিনের রুকইয়াহ, তিন কুলের রুকইয়াহ এবং আয়াতুল হারক বেশি বেশি শোনা অথবা নিজেই কিছুক্ষণ তিলাওয়াত করা।
২. প্রতি সপ্তাহে কয়েকদিন রুকইয়ার গোসল করা। এক্ষেত্রে বদ নজরের গোসলের মত অথবা অন্য যেকোনো নিয়মে রুকইয়াহ গোসল করা যেতে পারে।
৩. এই দুআটা ফজরের পর ১০০ বার পড়া।
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ ، وَلَهُ الْحَمْدُ ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারিকালাহ, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদ, ওয়াহুওয়া 'আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।'
এই কাজগুলো অন্তত দেড় মাস চালু রাখা।
৪. সকালে সূরা ইয়াসীন এবং রাতে সূরা মুলক পড়া। যদি পড়তে না জানে তাহলে তিলাওয়াত শোনা। ঘুমের সমস্যা থাকলে রাতে ঘুমের আগে ৮ সূরার রুকইয়াহ শোনা।
৫. পুনরায় শয়তানের আক্রমণ থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমের আগের মাসনূন আমলগুলো খুব গুরুত্বের সাথে করা। অল্প হলেও প্রতিদিনই করা, বাদ না দেয়া। যেমন, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস-এর আমল করা, ওযু করে ঘুমানো, ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসী পড়া ইত্যাদি।
৬. রাতে একা একা না ঘুমানো। বিয়ের উপযুক্ত হলে যতদ্রুত সম্ভব, বিয়ে করে ফেলা।
৭. বাড়িতে প্রতি ৩ দিনে একবার সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা। নিজে তিলাওয়াত করতে না পারলে অন্য কাউকে দিয়ে করানো, একান্ত অপারগ হলে অডিও প্লে করা। কয়েকমাস পর্যন্ত নিয়মিত এই আমলটা অব্যাহত রাখা।
৮. রোগী মেয়ে হলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পর্দা করা। আর পুরুষ হলে সবসময় জামাতে নামায পড়া।
৯. গানবাজনা, নাটক-সিনেমা ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকা। ভালো লোকদের সাথে ওঠাবসা করা, মন্দ লোকদের সঙ্গ ত্যাগ করা।
১০. সকল ভালো কাজে বিসমিল্লাহ বলার অভ্যাস গড়ে তোলা।

টিকাঃ
১৩৬. আবূ দাউদ: ৪৫৮৬

📘 রুকইয়াহ > 📄 জিনের চিকিৎসায় রাকীর জরুরি জ্ঞাতব্য বিষয়

📄 জিনের চিকিৎসায় রাকীর জরুরি জ্ঞাতব্য বিষয়


ইতিমধ্যে আমরা জিন-আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার শরীয়ত-সম্মত পদ্ধতি বর্ণনা করেছি। এবার জাদুগ্রস্ত রোগীর প্রাথমিক রুকইয়াহসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আলোচনা করা হবে। বিশেষত জিন তাড়ানোর সময় আপনি যেসব পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা এখানে সম্ভাব্য বিশেষ কিছু অবস্থার আলোচনা করব। কখনো এর বাইরের কোনো পরিস্থিতিও দেখা দিতে পারে, সেক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে আপনার উপস্থিত বুদ্ধি দ্বারা সমাধান করতে হবে।

১. লক্ষণ মিলে যাওয়ার পর জিন তাড়ানোর জন্য প্রথমে রুকইয়াহ করার পর যদি রোগীর মাথা ঘুরতে শুরু করে, দম বন্ধ হয়ে আসে, ঝটকা দিয়ে কেঁপে ওঠে কিন্তু কোনো জিন কথা না বলে তাহলে আরও দুই-তিনবার রুকইয়াহ করে দেখুন। তারপর তাকে ওপরে বলা 'চিকিৎসা-পরবর্তী পরামর্শ' দিয়ে দিন। এর সাথে আরও তিনটি কাজ করতে বলুন-
এক. প্রথমে ৭দিন ডিটক্স রুকইয়াহ করা (এই গ্রন্থের পরিশিষ্টে যা আলোচনা করা হয়েছে)।
দুই. সুস্থতার লাভের নিয়তে অন্তত এক মাস যত বেশি সম্ভব রুকইয়াহ শোনা। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ ঘন্টা। যার মাঝে থাকবে-“সূরা বাকারা এবং ৮ সূরার রুকইয়াহ (সূরা ইয়াসীন, সফফাত, দুখান, জিন, যিলযাল, ইখলাস, ফালাক এবং নাস), সূরা আলে- ইমরান, তাওবাহ, কাহাফ, হা মীম সাজদা (ফুসসিলাত), আর-রহমান, মুলক, তাকউইর, ইনফিতার, বুরুজ, ত্বরিক, আ'লা এবং শেষ ১৫টি সূরা।”
লাভার জিনের সমস্যা হলে বা জিন সেক্সুয়ালি টর্চার করলে সেক্ষেত্রে এই সূরাগুলোর আগে "রুকইয়াহ যিনা, সূরা ইউসুফ এবং সূরা নূর” শোনা উচিত। আর কিছুদিন "আসক্ত বা বশ করার জাদু” এর রুকইয়াহ করা উচিত।
তিন. সম্ভব হলে সূরা বাকারার ৫০টি থেকে ১০০টি আয়াত (সাধ্যে থাকলে আরও বেশি) কিংবা অন্য যায়গার একপারা কুরআন তিলাওয়াত করা।
এসব কিছু করার পর আবশ্যিকভাবে নিয়মিত অবস্থার আপডেট জানাতে বলুন। এক মাস পর যাচাই করে দেখুন-এই কয়দিনে জিন চলে গেছে নাকি এখনো আছে। আল্লাহর ইচ্ছায় যদি জিন চলে যায় তাহলে আর জিন-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলো তার মাঝে পাওয়া যাবে না। আর যদি সমস্যা কিছু বাকি থাকে তাহলে রুকইয়াহ করে দেখুন। যেহেতু এত দিনে জিন অনেক দুর্বল হয়ে গেছে, তাই আশা করা যায় এবার সে চলে যেতে সম্মত হবে। তবুও যদি যেতে না চায় তাহলে আবার পূর্বের মতই প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিন। আর গুরুত্বের সাথে এক মাস এগুলো করার পর আবার দেখা করতে বলুন।
উল্লেখ্য, একবার রুকইয়াহ করার পর কোনো কারণবশত যদি জিনের রোগীর জন্য লাগাতার কয়েকদিন সরাসরি রুকইয়াহ করা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রেও এই পরামর্শগুলোই দেবেন। এরপর সুবিধামত সময় বলে দেবেন, যেন এতদিন পর দেখা করে অবস্থার আপডেট জানায়।

২. রুকইয়াহ করার সময় জিন কখনো অতিরিক্ত চিৎকার-চেঁচামেচি করতে পারে কিংবা হুমকি-ধমকি দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। জেনে রাখুন, সে বিপদে আছে দেখেই এমন চেঁচাচ্ছে। এরকম অবস্থায় আপনি শান্ত থাকুন। আর কানের কাছে সূরা নিসার ৭৬ নং আয়াত পড়ুন-
الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ ۖ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا
“আর যারা ঈমান এনেছে, তাঁরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। আর যারা কাফির, তারা লড়াই করে তাগুতের পক্ষে। সুতরাং তোমরা যুদ্ধ করতে থাকো শয়তানের দোসরদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত নিতান্তই দুর্বল।” ১৩৭
কানের কাছে এই আয়াত কয়েকবার পড়ুন এবং ফুঁ দিন, পানিতে ফুঁ দিয়ে ছিটিয়ে দিন। ইনশাআল্লাহ খবিস জিন দুর্বল হয়ে যাবে।

৩. কখনো কখনো জিন আপনাকে রাগাতে চেষ্টা করবে, গালিগালাজ করবে। তখন আপনাকে শান্ত থাকতে হবে, রাগান্বিত হওয়া যাবে না। আপনি আপনার মতো রুকইয়াহ করতে থাকুন।
কখনো হয়তো আপনাকে বলবে, 'আপনি অনেক ভালো মানুষ, বিরাট বুজুর্গ। আপনার কথা মেনে চলে যাচ্ছি'। এসব শুনে আহ্লাদিত হওয়া বা আত্মশ্লাঘা অনুভব করা যাবে না; বরং বলুন যে, আমি আল্লাহর সাধারণ একজন বান্দা। তুমি আল্লাহর বিধান মেনে এখান থেকে চলে যাও।
কখনও আপনাকে বিভ্রান্ত করার জন্য জিন হা হা করে হেসে উঠবে, বলবে 'এসবে আমার কিছুই হবে না, আমার কিছু করতে পারবি না, ইত্যাদি...।' যেন আপনি হতাশ হয়ে রুকইয়াহ বন্ধ করে দেন। সুতরাং এসব কথায় পাত্তা দিবেন না, উল্টা ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিন আর নিজের মত তিলাওয়াত করতে থাকুন।

৪. জিনের রোগীর ওপর রুকইয়াহ চলাকালীন কখনো অন্য জিন এসে আপনাকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিতে পারে। সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করুন। বলুন, তোমরা যা খুশি করতে পারো। তবে আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।
কখনো ঘুমের মাঝে শয়তান এসে আপনাকে সম্পদ বা গুপ্তধনের লোভ দেখাতে পারে। ভুলেও শয়তানের ফাঁদে পা দেবেন না। বহু মানুষ এই ফাঁদে পড়ে নিজের এবং পরিবারের সর্বনাশ ডেকে এনেছে।

৫. জিনের রোগীর রুকইয়ার ক্ষেত্রে বড় একটা সমস্যা হচ্ছে, রুকইয়াহ চলাকালীন ভেতরের জিন রোগীর শারীরিক ক্ষতি করতে চেষ্টা করে, যেন জিন চলে গেলেও একটা ক্ষতি থেকে যায়। যেমন: গলা টিপে ধরে, মুখে খামচি মারে, আঘাত করে ইত্যাদি। এজন্য উপস্থিত অন্যদের সতর্ক থাকতে বলবেন। প্রয়োজনে কাউকে বলবেন হাত ধরে রাখতে। আর আশেপাশে এমন কিছু রাখবেন না, যা দ্বারা রোগী নিজেকে আঘাত করতে পারে।

৬. জিনের রুকইয়াহ করার সময় যদি শুধু রোগীর কাঁধ ব পিঠ ব্যথা করে, বমি বমি লাগে অথবা কোনো কারণ ছাড়াই কাঁদতে থাকে, তাকে কান্না থামাতে বলুন। যদি সে বলে, 'আমি নিজেকে সামলাতে পারছি না, এমনিতেই কান্না পাচ্ছে' তাহলে সম্ভবত তাকে জাদু করা হয়েছে। তখন রোগীর কানের কাছে সিহরের অর্থাৎ জাদু সংক্রান্ত আয়াতগুলো (সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯) কয়েকবার করে পড়ুন। এরপর যদি দেখেন কান্না বাড়ছে, বমি বমি লাগছে কিংবা এখনও শরীরের কোথাও ব্যথা অনুভব করছে তাহলে বুঝতে হবে, সত্যিই যে জাদু আক্রান্ত। সেক্ষেত্রে জাদুর জন্য রুকইয়াহ করতে হবে।
এক্ষেত্রে দুই-তিন সপ্তাহ সিহরের সাধারণ রুকইয়াহ করে আপডেট জানাতে বলুন। এরপরও যদি সমস্যা থাকে তাহলে তখন সমস্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট জাদুর চিকিৎসা দিন, এসব বিষয়ে পরের অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

৭. বাচ্চাদের রুকইয়ার ক্ষেত্রে সর্বদা বাচ্চার নিরাপত্তা এবং স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে খেয়াল রাখবেন। যেহেতু বাচ্চার আচরণ ও মানসিকতা পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো না, তাই বাচ্চার সাথে পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো আচরণ করা যাবে না। এক জায়গায়, একইভাবে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে বাধ্য করা যাবে না। একটু পরপর খেয়াল করতে হবে, কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না।
বাচ্চার কাছে আপনি অপরিচিত কেউ হয়ে থাকলে রুকইয়াহ করার আগে ও পরে তার সাথে কিছু সময় কাটান, গল্প করুন অথবা হালকা খেলাধুলাও করতে পারেন। রুকইয়ার মাঝে তাকে বলতে পারেন, 'আমার সাথে সাথে পড়ো'; যাতে করে সে আপনাকে সহজভাবে নেয়। যেহেতু বাচ্চাদের গুনাহ থাকে না, তাই তাদের রুকইয়াতে আল্লাহর রহমতে বেশ দ্রুত ফল পাওয়া যায়।
বিশেষ সতর্কতা: রুকইয়ার সময় কখনোই বাচ্চাদের প্রহার করবেন না।

৮. কখনো জিন কিছু শর্ত দেয়। বলে যে, এই করতে হবে, সেই করতে হবে, তাহলে আমি চলে যাব। এ ক্ষেত্রে যদি সেটা ইসলাম-সমর্থিত হয়- যেমন: নামায-কালাম পড়তে হবে, পর্দা করতে হবে-এরকম কিছু হলে বলুন, আল্লাহর বিধান হিসেবে মানতে রাজি আছি। কিন্তু শরীয়ত পরিপন্থী কিছু হলে, বিষয়টা কোনো পাপের কাজ হলে বা কোনো কিছু উৎসর্গ করতে বললে মানবেন না; বরং এসব থেকে শাক্তি দিন।

৯. অনেক সময় জিন বোঝাবে, সে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ছেড়ে চলে গেছে। অথচ তখনও সে ওই শরীরের মধ্যে আছে। এমনকি যখন কথা বলবে তখন আক্রান্ত ব্যক্তির মতোই বলবে। এই অবস্থায় কীভাবে বুঝবেন যে, জিন চলে গেছে নাকি এখনো আছে? এমতাবস্থায় আপনি যদি রোগীর মাথায় হাত রাখেন তাহলে অস্বাভাবিক কাঁপুনি বুঝতে পারবেন। এছাড়াও হৃদস্পন্দন পরীক্ষা করলে অস্বাভাবিক হারে হৃদস্পন্দন টের পাবেন। শরীরের কোন অঙ্গ অবশ হয়ে থাকবে অথবা ব্লাড প্রেশার অনেক বেশি দেখতে পাবেন। তখন আবার রুকইয়াহ করলে দেখবেন, জিন কথা বলতে শুরু করছে।

১০. মাঝে মাঝে জিনের কাছে ওয়াদা নেওয়ার সময় পালিয়ে যায়। অর্থাৎ যখন চলে যাবার জন্য ওয়াদাবদ্ধ হবে ঠিক তখনই পালিয়ে যায়। এমন হলে সূরা আর-রাহমানের ৩৩ থেকে ৩৬ এই চার আয়াত বারবার পড়ুন।

১১. কখনো এমন হয় যে, জিন চলে যেতে রাজি হয়; কিন্তু অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে শরীর থেকে বের হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আপনার উচিত হবে তাকে সহায়তা করা। আপনি তার কানে আযান দিন, এরপর সূরা ইয়াসীন পুরোটা পড়ুন, তারপর আবার আযান দিন। এতে করে ইনশাআল্লাহ সে চলে যাবে। যদি রোগীকে জাদু করা হয় আর এজন্য জিন আটকে থাকে তাহলে কিছুদিন সিহরের তথা জাদুর রুকইয়াহ করার পরামর্শ দিন, সম্ভব হলে তিন দিন পর্যন্ত 'বরই পাতা বেটে গোসল' করার নিয়ম অনুসরণ করতে বলুন। এরপর আবার রুকইয়াহ করুন। ইনশাআল্লাহ এবার জিন বের হতে পারবে।

১২. অনেক সময় আপনাকে ভয় দেখানো বা ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য জিন বলবে, 'এখানে আমি একা না। আমার সাথে আরও দুইজন আছে, চারজন আছে, ৪০ জন আছে।' এ ক্ষেত্রে তার কথাকে পাত্তা দেওয়া যাবে না। উল্টো তাকে ধমক দিয়ে বলতে হবে, যতজন আছিস সব ভাগ, নইলে সব একসাথে মরবি। সে যা-ই বলুক না কেন, চলে যাওয়ার পর আবার রুকইয়াহ করলেই বোঝা যাবে, অন্য কেউ আছে কি না।

১৩. সবসময় একদিনের রুকইয়াতে জিন চলে নাও যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিদিন এক নাগাড়ে কয়েকঘন্টা করে রুকইয়াহ করতে হবে। এতে হয়তো জিন মারা পড়বে অথবা যখন একদম মৃতপ্রায় হয়ে যাবে, তখন কোনো রকম জান নিয়ে পালাতে বাধ্য হবে।
ক্ষেত্র বিশেষে জিনের রোগীর জন্য এক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েকমাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এমতাবস্থায় প্রতিদিন রুকইয়াহ করা সম্ভব হলে ভালো, নইলে প্রথম পয়েন্টে বলা পরামর্শ অনুসরণ পাশাপাশি রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়ে পানি খাওয়া, রুকইয়ার গোসল করা, প্রতিমাসে এক-দুই বার এই গ্রন্থের শেষে আলোচিত ডিটক্স রুকইয়াহ করা বেশ উপকারি ভূমিকা পালন করবে ইনশাআল্লাহ।

১৪. জিন চলে গেলেও সব লক্ষণ দূর হওয়া পর্যন্ত রুকইয়াহ চালিয়ে যেতে হবে, যেন আপদ আর ফিরে না আসে। এজন্য জিন চলে যাওয়ার পর তৃতীয় ধাপ: চিকিৎসা পরবর্তী পরামর্শ যেন কমপক্ষে এক থেকে দেড় মাস গুরুত্বের সাথে অনুসরণ করে, এটা ভালোভাবে বলে দিতে হবে। প্রয়োজনে আরও বেশি সময় নিতে হবে।

১৫. খেয়াল রাখার বিষয় হচ্ছে, রুকইয়াহ করার সময় প্রথম প্রথম কিছুদিন সমস্যা বাড়তে পারে। এতে ঘাবড়ে গিয়ে রুকইয়াহ বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। কিছুদিনের মধ্যে সমস্যা ক্রমশ কমে আসবে। এভাবে আস্তে আস্তে জিন-আক্রান্ত হওয়ার যত লক্ষণ আছে, সবগুলো দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
শেষ কথা হচ্ছে, রুকইয়াহ চালিয়ে যান, পাশাপাশি দুআ এবং সাদকা করুন। সকাল-সন্ধ্যার অন্যান্য সুন্নাত আমলগুলো গুরুত্বের সাথে পালন করুন। আল্লাহ চাইলে সমস্যাগুলো একদম ভালো হয়ে যাবে।
যদি আল্লাহ আপনার হাতে রোগীকে সুস্থ করেন তাহলে তাকে বলুন, যেন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। আর আপনিও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

টিকাঃ
১৩৭. সূরা নিসা: ৭৬

📘 রুকইয়াহ > 📄 রাত্রিতে জিনের সমস্যা

📄 রাত্রিতে জিনের সমস্যা


জিনের অথবা জাদুর সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে খবিস জিন দ্বারা যৌন নিপীড়নের স্বীকার হন। এই বিষয় তারা লজ্জায় কাউকে বলতেও পারেন না, আর এই যন্ত্রণা থেকে কিভাবে মুক্তি পাবেন তাও জানেন না। সাধারণত এই সমস্যা রাতে ঘুমের সময়ে হয়ে থাকে, তবে কেউ কেউ জাগ্রত অবস্থাতেও এধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন। আর এই সমস্যা মহিলা রোগীদের মাঝে তুলনামূলক বেশি হলেও পুরুষদের মাঝে এর সংখ্যা কম না!
অন্যান্য প্যারানরমাল সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চেয়ে এই ধরনের রোগীরা অনেক বেশি মানসিক পীড়ার শিকার হন এবং মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েন। তাই পরিবারের কেউ এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে তাকে রুকইয়ার পাশাপাশি মানসিক সাপোর্ট দেয়া খুবই জরুরি।
রোগীর পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য একটা বিষয় এখানেই পরিষ্কার করা জরুরি মনে করছি, রোগীর সাথে এরকম সমস্যা হওয়ার মানেই এই না যে, ছেলে বা মেয়েটি সত্যিই কারও সাথে যৌনক্রিয়া করেছে। বাস্তবে শারীরিকভাবে রেপ হওয়ার আর এই অশরীরীর আক্রমণের মাঝে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। সুতরাং তাঁর ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা করা মোটেই উচিৎ না। আপনার দেয়া সামান্য সাপোর্ট যেমন এই সমস্যা থেকে মুক্তির ওসীলা হতে পারে, তেমনি আপনার মিথ্যা তিরস্কারের জন্য সে জীবনের আশাও ছেড়ে দিতে পারে। তাই সহযোগী হন, প্রতিপক্ষ হবেন না।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এমন ঘটনা হতেই পারে, ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। ঠিকমত রুকইয়াহ করলে আল্লাহর অনুগ্রহে দ্রুত এই সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়া যায়। তাই দেরি না করে জলদি ব্যবস্থা নিন আর অবশ্যই খুব বেশি বেশি দোয়া করতে থাকুন।
লক্ষণীয়, যাদের স্বপ্নে শুধু এমন অভিজ্ঞতা হয় কিন্তু শারীরিকভাবে অন্য কোন সমস্যা অনুভব করেন না, অর্থাৎ খুব ঘনঘন বা প্রতিদিনই স্বপ্নদোষ হয়, ইনশাআল্লাহ তারাও এই পরামর্শগুলো অনুসরণ করে উপকৃত হবেন।
১। প্রথমেই ঘরকে আল্লাহর অবাধ্যতার সরঞ্জাম থেকে মুক্ত করুন। যেন ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করতে পারে।
২। সালাত এবং দোয়ায় কোনরকম অবহেলা করবেন না। পুরুষ হলে মসজিদের জামাতে আর নারী হলে সুবিধামত স্থানে যথাসময়ে নামাজ আদায় করে নেবেন।
৩। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমের আগের মাসনুন আমলগুলো অবশ্যই করবেন। মেয়েদের পিরিয়ডের সময়েও যেন এসব আমল বাদ না যায়। গ্রন্থের চলতি অধ্যায়ে “জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে করণীয়” এবং পরের অধ্যায়ে “মাসনুন আমল” অংশ দ্রষ্টব্য।
৪। ঘুমানোর আগে সম্ভব হলে রুকইয়ার গোসল করে নিন। নইলে অবশ্যই ওযু করুন। এক্ষেত্রে ওযুর পানিতে কিছু আয়াত পড়ে ফু দিয়ে নিলে আরও ভাল, যেমন আয়াতুল কুরসি এবং তিনকুল।
৫। এক-দেড়মাস প্রতিদিন কয়েকবার "রুকইয়াহ যিনা” শুনুন অথবা যিনা এবং ফাহিশার আয়াতগুলো তিলাওয়াত করুন। ১৩৮ বিশেষত ঘুমের আগে অথবা রাতে যেকোনো সময়। এটা আল্লাহর রহমতে অনেক উপকারী।
৬। গ্রন্থের শেষে উল্লেখিত রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়ে অলিভ অয়েলে ফুঁ দিন। রাতে ঘুমের আগে মাথার তালুতে এবং সারা গায়ে মালিশ করুন। (৭দিনের ডিটক্সের মত)
৭। যখন এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটার সম্ভাবনা থাকে যেমন ঘুমের সময়, রাতে হুট করে ঘুমে ভেঙ্গে গেলে অথবা জাগ্রত অবস্থায় যখন অনুভূত হচ্ছে 'শয়তান আক্রমণ করতে পারে' তখন বিভিন্ন ক্ষতি আশ্রয় চাওয়ার দোয়াগুলো মনোযোগের সাথে বার বার পড়া। যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ যদি ঘুমের মাঝে ভয় পায়, তখন এই দুআ পড়লে তার কোন ক্ষতি হবে না।
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ ، وَشَرِّ عِبَادِهِ ، وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ
উচ্চারণ: আ'ঊযু বিকালিমা-তিল্লাহিত্তা-ম্মাতি মিন গাদ্বাবিহি ওয়া 'ইক্কা-বিহি ওয়া শাররি 'ইবা-দিহ, ওয়ামিন হামাযা-তিশশায়া-তিনি ওয়া আই-ইয়াহদুরুন। অর্থ: আমি আশ্রয় চাই, আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামসমূহের দ্বারা তাঁর ক্রোধ থেকে, তাঁর শাস্তি থেকে এবং তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট থেকে, আর শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে এবং তাদের উপস্থিতি থেকে। ১৩৯
এরকম আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দোয়া রয়েছে, যেমন:
اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্না নাজ 'আলুকা ফী নুহুরিহিম ওয়া না'উযু বিকা মিন শুরূরিহিম। অর্থ: হে আল্লাহ! আমরা আপনাকে তাদের গলদেশে রাখছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। ১৪০
اللَّهُمَّ مُنْزِلَ الْكِتَابِ ، سَرِيعَ الْحِسَابِ ، اهْزِمِ الأَحْزَابَ ، اللَّهُمَّ اهْزِمُهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা মুনযিলাল কিতা-বি সারী'আল হিসা-বি ইহযিমিল আহযা-ব। আল্লা- হুম্মাহযিমহুম ওয়া যালযিলহুম। অর্থ: হে আল্লাহ, কিতাব নাযিলকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী! আপনি শত্রুবাহিনীকে পরাভূত করুন। হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে পরাজিত করুন এবং তাদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করে দিন। ১৪১
৮। নফল বা তাহাজ্জুদের সালাতে দাঁড়িয়ে যান। এধরণের সমস্যায় যখনই আক্রান্ত হবেন, সাথে সাথে আপনার উচিত হবে সেখান থেকে উঠে দোয়া অথবা নামাযের জন্য প্রস্তুত হওয়া।
৯। সম্ভব হলে রাতে একা না ঘুমানো। সাথে কেউ থাকলে সাধারণত এই ধরনের সমস্যা কম হয়।
১০। আর এধরণের ঘটনায় ফরজ গোসলের ব্যাপারে গুরুত্ব দিন। অবহেলা করবেন না। প্রয়োজনে কোন আলেম অথবা নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ থেকে গোসলের বিস্তারিত মাসআলা জেনে নেবেন।
মোটকথা হল, এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় সব দিক দিয়ে চেষ্টা করা। ইনশাআল্লাহ খবিস শয়তান খুব দ্রুতই পরাজিত হবে। আল্লাহ সহজ করুন। আমিন!

টিকাঃ
১৩৮. অডিও ruqyahbd.org/download#zina এবং পিডিএফ ruqyahbd.org/ayat#zina
১৩৯. তিরমিযী: ৩৫২৮
১৪০. আবু দাউদ: ১৫৩৭
১৪১. তিরমিযী: ১৬৭৮

📘 রুকইয়াহ > 📄 জিনের রোগীর রুকইয়াহ প্রসঙ্গে কয়েকটি বাস্তব ঘটনা

📄 জিনের রোগীর রুকইয়াহ প্রসঙ্গে কয়েকটি বাস্তব ঘটনা


শুরুর অধ্যায়গুলোতে জিন আক্রান্তের চিকিৎসা প্রসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা বলা হয়েছে। যার মধ্যে ছিলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘটনা, সাহাবায়ে কিরাম এবং অন্যান্য সালাফদের ঘটনা। বাস্তব জীবনে কাজ করার সুবিধার্থে এবার আমরা এ বিষয়ক আরও কিছু ঘটনা উল্লেখ করব।

ঘটনা-১: প্রথম তিনটি ঘটনা মাওলানা ইমরান ভাইয়ের। আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। একটি ঘটনা তাঁর মুখেই শোনা যাক-
'আমার রুকইয়ার জগতে পদার্পণ হয়েছিল একজন আরব নাগরিকের হাত ধরে। দাওরায়ে হাদীস শেষ করার পর আমি তাবলিগের জামাতে কিছুদিন সময় লাগাচ্ছিলাম। তখন এক আরব জামাতের সাথে আমি এবং সিলেটের একটা ছেলে মুতারজিম (দোভাষী) হিসেবে ছিলাম। সাথের ছেলেটা একটুতেই অস্বাভাবিক রেগে যেত। এছাড়া আরও কিছু লক্ষণ ছিল, যা দেখে একদিন এশার পর ওই জামাতের একজন ফিলিস্তিনি ভাই আমাকে বললেন, "ওর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ওর সাথে জিন আছে! আগামীকাল ফজরের পর তাকে মসজিদের ছাদে নিয়ে আসবেন, আমি একটু দেখব।”
তার পরদিন সকালে আমি আর সেই ছেলেটা ছাদে গেলাম, সাথে ফিলিস্তিনি সাথি ভাইটিও ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, “আমি কুরআন তিলাওয়াত করব। আপনি শুধু তাকে শক্ত করে ধরে রাখবেন।"
তিনি পড়া শুরু করলেন। একটু পরই ছেলেটার চোখ লাল হয়ে গেল। একবার পেট, একবার বুক ফুলে উঠছিল। ফিলিস্তিনি ভাই প্রথমে আরবীতেই জিজ্ঞেস করলেন, “তোর নাম কী? এই ছেলেটাকে কেন ধরেছিস?” কিন্তু জিন কোনো উত্তর দিচ্ছিল না। তিনি আমাকে বললেন বাংলায় জিজ্ঞেস করতে। আমি ওই কথাগুলোই বাংলায় জিজ্ঞেস করলাম; কিন্তু এবারও কোনো সাড়াশব্দ নেই। শুধু ছেলেটা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল, আর বারবার পেট-বুক ফুলে উঠছিল।
তখন তিনি আবার পড়া শুরু করলেন। তিনি বিশেষভাবে আয়াতুল কুরসী এবং সূরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াত পুনরাবৃত্তি করছিলেন। অনেকক্ষণ তিলাওয়াত করার পর হঠাৎ বড় করে নিঃশ্বাস ছেড়ে ছেলেটা জ্ঞান হারাল। তার মুখে পানির ছিটা দিলে জ্ঞান ফিরল। এরপর ছেলেটা বলল, আমার অনেক হালকা লাগছে। তার মানে জিন চলে গেছে, আলহামদুলিল্লাহ। এই ঘটনার পর আরও কিছুদিন আমি ওই জামাতের সাথে ছিলাম, ছেলেটাও ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ছেলেটার আর কোনো সমস্যা হয়নি।'

ঘটনা-২: একটা মেয়ের কিছু সমস্যা ছিল। তার পরিবার ধারণা করছিল যে, তাকে জাদু করা হয়েছে। এ কারণে ইমরান ভাইকে দিয়ে তারা রুকইয়াহ করায়। ইমরান ভাই যখন তার রুকইয়াহ করছিলেন, তখন তার বড় বোন সেই ঘরেই বসে ছিল। সে বলছিল, 'আমার কেমন কেমন যেন লাগছে।' ইমরান ভাই একটু পর ছোট বোনের রুকইয়াহ থামিয়ে বললেন, আচ্ছা আপনি এদিকে আসেন, আপনার ওপর একটু রুকইয়াহ করে দেখি। বড় বোনের উপর রুকইয়াহ শুরু করলেই সে চিৎকার করে ওঠে। সে বলছিল, তুই এটা আপনিই করুন। কি করলি! আমিতো তাকে কোন কষ্ট দিচ্ছিলাম না। ওকে আমার ভালো লাগছিল। তাই আমি চাচ্ছিলাম, ওর সাথেই থাকব, কাউকে কিছু জানাব না। ইমরান ভাই এরপর দীর্ঘক্ষণ বড় বোনের রুকইয়াহ করেন। এমনি কোনো ঝামেলা করে নি; কিন্তু বেচারা তাকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছিল না। অনেকক্ষণ পর জিনটা চলে যায়। এরপর ছোট বোনের জন্য রুকইয়াহ করা হয়।

ঘটনা-৩: শেষ ঘটনাটি বরিশালের। একটা হিন্দু ছেলের জিনের সমস্যা ছিল। অনেক কবিরাজ-বৈদ্য দেখিয়েও কোনো লাভ হচ্ছিল না। পরে তার পরিবার ইমরান ভাইকে রুকইয়ার জন্য অনুরোধ করে। ইমরান ভাই তাদের বাসায় গিয়ে দেখেন, সব ঘর মূর্তি-দেবদেবী ইত্যাদির ছবি দিয়ে ভর্তি। তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, কী করবেন।
যাহোক, আল্লাহর ওপর ভরসা করে ওখানেই রুকইয়াহ শুরু করেন। এরপর জিন চলে আসে। কিছু কথাবার্তা হয়। স্বাভাবিকভাবে সে যেতে চায় না। অবশেষে দুদিন রুকইয়াহ করার পর তৃতীয় দিন সে চলে যায়।
যেহেতু জিন চলে যাওয়ার পরও আরও কিছুদিন রুকইয়াহ না করলে জিন আবারও ফিরে আসতে পারে, তাই পরের দিন ইমরান ভাই রুকইয়াহ করার জন্য যথারীতি তাদের বাসায় যান। সেদিন ছেলেটা সুস্থই ছিল। তখন তার বাবা বলে উঠল, আমি চাই না, আমার ছেলে কুরআনের কোনো প্রভাবের কথা মনে রাখুক। আরও স্পষ্ট করে বলি, আমার ছেলে কুরআনের মাধ্যমে সুস্থ হয়েছে—আমি কোনোভাবেই চাচ্ছি না, এটা তার মনে থাকুক। সুতরাং আপনি যেতে পারেন। ইমরান ভাই কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। পরে জানতে পারেন, ওই পরিবারের লোকেরা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ইসকন'র সদস্য। এরপর যখনই ছেলেটার বাবার সাথে দেখা হয়েছে, সে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। ছেলেটা কেমন আছে জিজ্ঞেস করলে, হ্যাঁ, ভালো আছে—জাতীয় দায়সারা কথা বলে দ্রুত সরে গেছে।

ঘটনা-৪: এই ঘটনার শুরু একটি সাপ মারার মধ্য দিয়ে। মুন্সিগঞ্জে। একটি মেয়ে প্রায়ই স্বপ্ন দেখত, সে গর্ভে থাকাকালে তার মা একটি সাপ মারছে। তার মাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিশেষ কিছু মনে করতে পারেন না। কারণ, সাপ মারায় উনার স্বাভাবিক আগ্রহ ছিল। পরে বুঝতে পারেন, উনি এমন একটি সাপ মেরেছেন, যেটা ছিল আসলে জিন। তখন থেকেই উনি বিভিন্ন অসুখে ভুগছেন। জন্মের পর থেকেই উনার মেয়ের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা দানা বাঁধতে থাকে। তার রাগ ছিল খুব বেশি কাউকে সহ্য করতে পারত না, খাওয়া-দাওয়ায় রুচি ছিল না, একের পর এক রোগ লেগেই থাকত। দুদিন পরপরই ডাক্তারের কাছে দৌড়াতে হতো।
হাইস্কুলে পড়া অবস্থায় সমস্যা নতুন দিকে মোড় নেয়, সে প্রতিদিন স্বপ্নে সাপ দেখত। এছাড়াও কুকুর, পেঁচা, কবুতরও দেখত। এতে তার ভয় লাগত না; বরং ভালই লাগত। সাপগুলোও তাকে ভয় দেখাত না; নতুন নতুন জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেত। এক সময় সে সাপদের পরিবারের লোকদের চেয়েও বেশি ভালবাসতে শুরু করে। পরীক্ষার হলে দেখত, কলমের মাথায় সাপ বসে আছে। তখন সব পড়া ভুলে যেত। আস্তে আস্তে অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল। দিন দিন সে মানুষজন থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। কারও সাথে মিশত না, কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিয়ে, হৈচৈ ভালো লাগত না। রাস্তাঘাটে চলতে পারত না, গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগত। সে রাস্তার মাঝে, পুকুরে বিভিন্ন জায়গায় সাপ দেখতে পেত, যা অন্য কেউ দেখত না। বাড়িতে গরুর গোশত আনলেই রাগারাগি করে বাড়ি মাথায় তুলত।
বাড়ির লোকেরা এ সময় তার চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়। বিভিন্ন হুজুর, ফকির, পীরের কাছে তদবীর নেয়। কেউ তাবীজ দেয়, ফলে কিছুদিন ভালো থাকে। তারপর হঠাৎ তাবীজ হারিয়ে যায়, আবার সমস্যা শুরু হয়। কেউ পানি পড়া, মধু পড়া দেয়, নানা ধরনের বিধিনিষেধ দেয়। দিনশেষে ফায়দার ঘরে শূন্য। তার আত্মীয়রা যেখানেই একটু আশার আলো দেখেছে, দৌড়ে গেছে।
এক কবিরাজ তাকে চিকিৎসা দেয়, এক মাস ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না, সবকিছু ঘরেই করতে হবে এবং তার দেওয়া হাড়ি ভেঙে পানি খেতে হবে। সব করেও লাভ হয় না। কবিরাজের সাথে যোগাযোগ করলে বলে, তার পক্ষে সম্ভব না। ওই জিনেরা তাকে পিটিয়ে অসুস্থ করে দিয়েছে। এমন আরও অনেকের কাছে যাওয়া হয়, কেউ দূর থেকে জিন দ্বারা চিকিৎসা করবে বলে, কেউ সাত ঘাটের পানি চায়। কেউ হাত দেখে সমাধান বলে, কেউ মোমবাতি জ্বালিয়ে আরবী লেখা কাগজ পুড়িয়ে সেই ধোয়া নিতে বলে, কিছুতেই কাজ হয় না। একজন জানায়, মেয়েটার ওপর যে ভর করে ওটা তান্ত্রিক জিন! তাই কবিরাজদের থেকে কিছু আনলে সে মন্ত্র পড়ে নষ্ট করে ফেলে।
এক পর্যায়ে মেয়েটিকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘুমের ওষুধ এবং অনেক ব্যয়বহুল কাউন্সেলিং চলে কিছুদিন। দিনের অর্ধেক সময় তার ঘুমিয়ে কাটত। বেফায়দা কাজ হচ্ছে বুঝতে পেরে দুই মাস পর এসব বন্ধ করা হয়।
সবশেষে এক কবিরাজের কাছে যাওয়া হয়। তোর কথাবার্তায় মেয়েটির স্বজনেরা আশ্বস্ত হয়। সে মেয়েটিকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে, মেয়েটি উত্তর দেয়। এক পর্যায়ে সে মিথ্যে বলার অপবাদ দিতে থাকে এবং খুব ধমকায়। এক সময় বলে মেয়েটির সাথে থাকা জিনকে সে আটকে ফেলেছে এবং একটা পরী এসে জিনকে খেয়ে ফেলেছে। শেষে বলে, সে কোনো পারিশ্রমিক নেবে না। তবে তার ভক্তদের জন্য কিছু দিতে হবে। আর বলে, মেয়েটির জানের সাদকা দিতে হবে এবং তার গুরুকে খুশি করতে হবে। মেয়েটির মামা ওই কবিরাজকে দশ হাজার টাকা পরিশোধ করে বাড়ি ফিরে। সাথে চিকিৎসা হিসেবে কয়েকপদের পাতা, চিনি পড়া, মেশিনে ভাঙানো প্রথম সরিষার তেল, তাবীজ, তালের আঁটি আরও অনেক হাবিজাবি নিয়ে আসে। সেই রাতটা ভালো কাটলেও পরের দিন অবস্থা মারাত্মক আকার ধারণ করে। মেয়েটি ওড়নার ফাঁস দিয়ে নিজেকে মেরে ফেলতে চাচ্ছিল। কেউ তাকে ধরে রাখতে পারছিল না। চোখ-মুখ লাল হয়ে অনেকক্ষণ দাঁতে দাঁত লেগে থাকে। কয়েকঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে মাঝের কোনো ঘটনা তার মনে ছিল না।
তখন আমাদের রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপের কার্যক্রম কেবল শুরু হয়েছে। প্রথম ব্যাচের এডমিনদের মাঝে মেয়েটার মামাত ভাই ছিল। তার অনুরোধে মাওলানা ইমরান ভাই আর আমি রুকইয়াহ করি। সাথে মেয়েটির দুই ভাই ছিল; তারা উভয়ে হাফেজ। তারাও যথেষ্ট সহায়তা করেছে। রুকইয়ার শুরুতে সে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক অজ্ঞান হয়ে একদম স্থির বসেছিল। আস্তে আস্তে বিভিন্ন ইফেক্ট শুরু হয়। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছিল আর সে শোয়ার জন্য চেষ্টা করছিল, সাথে আবার গোঙাচ্ছিল। শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল প্রচুর। এছাড়াও আরও বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় তখন। মাঝে মাঝে শয়তানটা লাফ দিয়ে ধ্যানে বসতে চাচ্ছিল, ওড়না গলায় পেঁচিয়ে ফাঁস দিতে চাচ্ছিল, নিজেকে আঘাত করছিল। তার ভাইয়েরা বারবার সামলিয়েছে। মাঝেমধ্যে শয়তানটা চলেও যাচ্ছিল, কিন্তু মেয়েটিকে কোনো দুআ বা আয়াত পড়তে দিলেই আবার ফিরে আসছিল। সব মিলিয়ে প্রথম দিন আমরা টানা ৬-৭ ঘণ্টা রুকইয়াহ করলাম। বাকি দিনগুলোতে তার ভাইয়েরা রুকইয়াহ করে।
দ্বিতীয় দিন সকালে তার কিছুই খেয়াল ছিল না। রুকইয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে তাকে কালিমা পড়তে বলা হয়। সে চেষ্টা করতেই শয়তানটা এসে ভর করে। তখন আবার রুকইয়াহ শুরু করা হয়। এভাবে এক সপ্তাহ প্রতিদিন ৩-৪ ঘণ্টা করে রুকইয়াহ করা হয়। তার সমস্যা আস্তে আস্তে কমে আসে। এমনকি সে নিজে নিজেই রুকইয়ার সবগুলো আয়াত পড়তে পারে। আবার গরুর গোশত খাওয়া শুরু করে, নিয়মিত নামায পড়ে। কিছু কিছু প্রভাব এরপরও ছিল, এজন্য তাকে নিজে নিজে রুকইয়াহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। আর বলা হয়, দুআ করতে। আমরাও তার জন্য দুআ করি। আল্লাহ তাআলা তাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। আমীন।

ঘটনা-৫: এটা ঢাকায় রুকইয়াহ সেন্টার চালু হওয়ার কয়েকদিন পরের ঘটনা। এক দম্পতি এসেছিল রুকইয়াহ করার জন্য। স্ত্রী লোকটির সমস্যা। তিনি একজন শিক্ষিকা। তার সমস্যা ছিল-সে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখত, আত্মহত্যা করতে চাইত, ক্লাস নিতে লাগলে ঘুম আসত, সারা শরীরে পিন ফুটার অনুভূতি হত, ওয়াসওয়াসাও হতো খুব, স্বামী-সন্তানদের সহ্য করতে পারত না, বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইত... ইত্যাদি বেশ কিছু সমস্যা ছিল।
তো একজন তার রুকইয়াহ করল। আমি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রথমে ধারণা করেছিলাম, হয়তো বদনজরের সমস্যা; কিন্তু রুকইয়াহ শুরুর পরেই তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন। তার একটু পর জিন কথা বলতে লাগল।
জিন বলছিল-আমি যাব না, গেলে আমাকে মেরে ফেলবে। জিজ্ঞেস করলাম, কে মারবে তোকে? জিন বলল, 'ম্যাজিশিয়ান।' আমি বললাম, ভয়ের কিছু নেই। তোকে একটা জিনিস শিখিয়ে দিচ্ছি। এতে করে আর তোর কিছু হবে না। সে জিজ্ঞেস করল, কী? আমি বললাম, আয়াতুল কুরসী জানিস? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, কেউ ক্ষতি করতে আসলে আয়াতুল কুরসী পড়বি তাহলে আর কিছু হবে না।
সে বলছিল, আমি একা না। আরও কয়েকজন আছে। (কয়জনের কথা বলেছিল সংখ্যাটা আমার মনে নেই) আমি বললাম, যতজন আছিস সব একসাথে মরবি, যদি না যাস। এরপরও যাচ্ছিল না। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, জাদুর জিনিসপত্র কোথায় আছে, যেগুলো দিয়ে জাদু করছে? জিন বলল, সাগরে আছে। আমি বললাম, আচ্ছা। আসমানে থাকুক আর জমিনে থাকুক; তুই এখন ভাগ। এরপরও সে 'আমি যেতে পারছি না, যেতে পারব না, গেলে আমাকে মেরে ফেলবে'- জাতীয় কথাবার্তা বলছিল। হঠাৎ তাবীজের কথা মনে হলো আমার। তার হাজব্যান্ডকে জিজ্ঞেস করলাম, উনার সাথে কি কোনো তাবীজ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, ৪-৫টা। আমি বললাম, সব তাবীজ খুলে ফেলেন। আমরা অন্যদিকে ফিরলাম। তিনি যেই না তাবীজ খুলে নিলেন, তার স্ত্রী আবার অজ্ঞান হয়ে গেল। সাথে সাথে জিনটাও চলে গেল।
মুখে পানির ছিটা দিলে তার জ্ঞান ফিরল। জিন আসলেই গেছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়তে দিলাম। তিনি নিজেই অনেকক্ষণ তিলাওয়াত করলেন। আর কোনো সমস্যা দেখা গেলনা মালহামদুলিল্লাহ। তারপর তাকে কিছুদিন কয়েকটা সেলফ রুকইয়ার পরামর্শ দিলাম, যেন বাকি সমস্যাগুলোও চলে যায়। এর মাসখানেক পর সেই দম্পতির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তখন তারা জানিয়েছিলেন, জিন আর কোনো ঝামেলা করেনি। তবে ছোট ছোট কিছু সমস্যা রয়ে গেছে এখনও। আমি সেগুলো দূর হওয়া পর্যন্ত সেলফ রুকইয়াহ করে যেতে বললাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00