📄 জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে করণীয়
খারাপ জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে নিচের বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত—
১। জামাআতে নামায আদায় করা। এটা আপনার আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং আপনাকে শয়তান থেকে হেফাজত করবে।
২। গান বাজনা, নাটক-সিনেমা এবং এই ধরনের যাবতীয় তথাকথিত ‘বিনোদন’ থেকে বিরত থাকা। পর্ণ বা অশ্লীলতার ধারেকাছেও না যাওয়া।
৩। যথাসম্ভব পাকপবিত্র থাকা, ঘুমের আগে ওযু করে বিছানায় যাওয়া।
৪। সব কাজে বিসমিল্লাহ বলা; বিশেষত ঘরে ঢুকতে এবং বের হতে, খাবারের সময় এবং অন্ধকারে কিছু করতে, উপর থেকে কিছু ফেলতে।
৫। অহেতুক কুকুর, বিড়াল, সাপ না মারা। কোনো কারণে মারতে হলে আগে তিন বার পর্যন্ত তাড়িয়ে দেওয়া, এরপরও তা না গেলে তখন মারা।
৬। সন্ধ্যাবেলায় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেওয়া, আর বাচ্চাদের বাইরে বের হতে না দেওয়া। রাত হয়ে যাওয়ার পর বাচ্চারা চাইলে বের হতে পারে আর দরজা-জানালাও খোলা যেতে পারে। ১২৯
৭। কোনো গর্তে প্রস্রাব না করা। এ ব্যাপারে পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা আছে।
৮। ঘরে প্রবেশের এবং বের হওয়ার দুআ পড়া। দুআ না জানলে অন্তত বিসমিল্লাহ বলা।
৯। বিসমিল্লাহ বলে দরজা-জানালা বন্ধ করা। রাতে ঘুমানোর সময় দরজা বন্ধ রাখা।
১০। স্ত্রী সহবাসের পূর্বে অবশ্যই দুআ পড়া।
১১। টয়লেটে ঢোকার সময় দুআ পড়া।
১২। প্রতিদিন সকালে
وَهُوَ عَلَى ، وَلَهُ الْحَمْدُ ، لَهُ الْمُلْكُ ، وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
একশ বার পড়া। কোনোদিন একশবার না হলে ফজর এবং আসরের পর দশ বার করে পড়া।
১৩। ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসী এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়া।
১৪। সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন আমলসহ প্রতিদিনের অন্যান্য যিকিরগুলো নিয়মিতভাবে করা। বিশেষত জাদু-সংক্রান্ত আলোচনার শেষে যেগুলো বলা হয়েছে।
১৫। সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস তথা তিনকুল'র এই দুটি আমল গুরুত্বসহকারে করা।
প্রথম আমল হলো, ঘুমানোর পূর্বে একবার সূরা ইখলাস, একবার সূরা ফালাক ও একবার সূরা নাস—এভাবে তিন সূরা তিনবার পড়া, তারপর দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সমস্ত শরীরে হাত বুলিয়ে নেয়া।
দ্বিতীয় আমল হলো, প্রতিদিন ফজর ও মাগরিবের নামাযের পর আগের মতই সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস—তিনবার করে পড়া। (এ সময়ে ফুঁ দেওয়া লাগবে না)
আর বাচ্চা অথবা অসুস্থ ব্যক্তি পড়তে না পারলে এই দুই সময়ে অন্য কেউ এসব পড়ার পর তাদের ফুঁ দিয়ে দেওয়া উচিত।
টিকাঃ
১২৯. জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত-
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا اسْتَجْنَحَ اللَّيْلُ أَوْ قَالَ جُنْحُ اللَّيْلِ فَكَفُوا صِبْيَانَكُمْ فَإِنَّ الشَّيَاطِينَ تَنْتَشِرُ حِينَئِذٍ فَإِذَا ذَهَبَ سَاعَةٌ مِنَ الْعِشَاءِ فَخَلُّوهُمْ وَأَغْلِقَ بَابَكَ وَاذْكُرُ اسْمَ اللهِ وَأَطْفِي مِصْبَاحَكَ وَاذْكُرْ اسْمَ اللَّهِ وَأَوْكِ سِقَاءَكَ وَاذْكُرْ اسْمَ اللهِ وَخَمِّرُ إِنَاءَكَ وَاذْكُرْ اسْمَ اللَّهِ وَلَوْ تَعْرُضُ عَلَيْهِ شَيْئًا
"নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (সুর্যাস্তের পর) যখন রাত নেমে আসে তখন তোমরা তোমাদের বাচ্চাদের আটকে রাখবে। কারণ, এ সময় শয়তানেরা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর রাতের কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলে তাদের ছেড়ে দিতে পারো। আর তোমার ঘরের দরজা বন্ধ করে আল্লাহর নাম নাও। তোমাদের ঘরের বাতি নিভিয়ে আল্লাহর নাম নাও। তোমার পান পাত্রের মুখ ঢেকে রাখো এবং আল্লাহর নাম নাও। তোমার বাসনপত্র ঢেকে রাখো এবং আল্লাহর নাম নাও। আর (ঢাকার কিছু না পেলে) সামান্য কিছু আড়াআড়িভাবে রেখে দাও।" [বুখারী: ৩১০৬]
📄 জিন-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ
মানুষ অনেকভাবে জিন দ্বারা আক্রান্ত হয়। আমাদের সমাজে পুরো শরীরে আসর না হলে, আর মুখ দিয়ে জিন কথা বলতে না লাগলে সচরাচর কেউ বিশ্বাস করে না যে, শরীরে জিন আছে। কিন্তু আসলেই এটা সম্ভব যে, কারও শরীরে জিন ঢুকে আছে আর দিনের পর দিন ক্রমাগত সে মানসিক এবং শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা জরুরি, আমরা যে লক্ষণগুলো আলোচনা করতে যাচ্ছি, এক- দুদিন এসব দেখলেই জিন দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন ভাববার কারণ নেই। এগুলো অন্যান্য স্বাভাবিক অসুখ-বিসুখের কারণেও হতে পারে, জিনের নজরের কারণেও হতে পারে। তবে এই লক্ষণগুলোর মাঝে অনেকগুলো যদি কারও মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকে তখন ধারণা করা যায় যে, জিনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য রুকইয়াহ করতে হবে।
আলোচনার সুবিধার্থে জিন-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি। নিদ্রাবস্থার লক্ষণ এবং জাগ্রত অবস্থার লক্ষণ।
ক. নিদ্রাবস্থার লক্ষণসমূহ
১. নিদ্রাহীনতা: সারারাত ঘুম হয়না, হলেও খুব কম।
২. উদ্বিগ্নতা: এজন্য রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়।
৩. ঘনঘন বোবায় ধরা: ঘুমের সময় কেউ চেপে ধরেছে এমন অনুভূত হওয়া, নড়াচড়া করতে না পারা। কারও কারও এই সমস্যা স্বপ্নের মধ্যেও হতে পারে।
৪. ঘুমের মাঝে প্রায়ই চিৎকার করা, গোঙানো, হাসি-কান্না করা।
৫. ঘুমের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করা বা দৌড় দেওয়া। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
৬. স্বপ্নে কোনো প্রাণীকে আক্রমণ বা ধাওয়া করতে দেখা। বিশেষত কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর, উট, গরু, মহিষ, বাঘ, সিংহ, শিয়াল, সাপ বা এই ধরনের হিংস্র প্রাণী। যদি স্বপ্নে সবসময় দুইটা বা তিনটা প্রাণী আক্রমণ করতে আসছে দেখে তাহলে বুঝতে হবে সাথে দুইটা বা তিনটা জিন আছে।
৭. স্বপ্নে নিজেকে অনেক উঁচু কোনো জায়গা থেকে পড়ে যেতে দেখা।
৮. স্বপ্নে কোনো গোরস্থান, পরিত্যক্ত জায়গা, নদী অথবা মরুভূমির সড়ক দেখা। এটি জিনের পাশাপাশি জাদু আক্রান্ত হওয়ারও ইঙ্গিত বহন করে। আর স্বপ্নে একই জায়গা বারবার দেখলে সেখানে জাদুর জিনিসগুলো থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
৯. বিশেষ আকৃতির মানুষ দেখা। যেমন: অনেক লম্বা, খুবই খাটো, বা খুব কালো কুচকুচে কাউকে দেখা। ১৩০
১০. স্বপ্নে জিন-ভূত দেখা অথবা অন্যান্য ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখা।
খ. জাগ্রত অবস্থার লক্ষণ
১. ইবাদাতবিমুখতা: নামায, তিলাওয়াত, যিকির-আযকার থেকে আগ্রহ উঠে যাওয়া। মোট কথা, দিন দিন আল্লাহর থেকে দূরে সরে যাওয়া।
২. দীর্ঘস্থায়ী মাথা ব্যথা। (চোখ, কান, দাঁত ইত্যাদির সমস্যার কারণে নয়; এমনিই মাথার এক পাশে অথবা উভয় দিকে ব্যথা করা, আর এজন্য ওষুধ খেয়েও তেমন ফায়দা না পাওয়া)
৩. মেজাজ বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকা, কিছুতেই মন না বসা।
৪. খুব সামান্য কোনো কারণেই যখন-তখন রেগে যাওয়া কিংবা কান্নাকাটি করা।
৫. বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া।
৬. হঠাৎ অজ্ঞান বা বেহুশ হয়ে যাওয়া, দাঁতে-দাঁত লেগে ফিট হয়ে যাওয়া। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
৭. মৃগীরোগ বা Epilepsy। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
৮. অস্বাভাবিক আচরণ করা। এরকম অনুভূত হওয়া যে, আমি খারাপ আচরণ করতে চাচ্ছি না, তবুও কথা বলতে গেলেই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছি।
৯. শরীরের কোনো অঙ্গে প্রায় সময় ব্যথা থাকা কিংবা একদম বিকল হয়ে যাওয়া। ডাক্তাররা যেখানে সমস্যা খুঁজে পেতে বা চিকিৎসা করতে অপারগ হচ্ছে। ১৩১
১০. ব্যাপক অলসতা; সবসময় অবসন্নতা ঘিরে রাখা, শরীর ভারী হয়ে থাকা।
১১. কুরআনুল কারীমের তিলাওয়াত বা আযান সহ্য না হওয়া। এটিও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
১২. নিজের সন্তানকে বুকের দুধ খেতে না দেওয়া। অথবা সন্তান দুধ খেতে না চাওয়া। বাচ্চার মা জিন-আক্রান্ত হলে এই দুটোর যেকোনো একটা হতে পারে।
১৩. হ্যালুসিনেশন বৃদ্ধি পাওয়া। ফলে রোগী জাগ্রত অবস্থাতেই স্বপ্নের মত বিভিন্ন কিছু দেখতে পায়, যা অন্যরা দেখছে না।
১৪. জিন দ্বারা আক্রান্ত হলে রোগীর মাঝে জিনের স্বভাব প্রকাশ পায়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ মুশরিক জিন দ্বারা আক্রান্ত হলে হিন্দুদের মত সাঁজগোজ, মন্দিরের আওয়াজ ইত্যাদির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হতে পারে।
১৫. এছাড়া জিনের রোগীর সাথে বিভিন্ন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। যেমন: রাতে কারও ব্যাপারে দুর্ঘটনার স্বপ্ন দেখা এবং পরের দিন সেটা সত্যি হয়ে যাওয়া, কারও ওপর রেগে গেলে বা অভিশাপ দিলে তার ক্ষতি হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বিশেষভাবে বেঁচে যাওয়া ইত্যাদি।
আবারও মনে করিয়ে দিই, এর মাঝে কিছু লক্ষণ শারীরিক বা মানসিক রোগের কারণেও প্রকাশ পেয়ে থাকে। তবে দীর্ঘদিন যাবৎ যখন এসবের কোনো সুরাহা না হয় তখন বুঝে নিতে হবে, আসলেই কোনো প্যারানরমাল সমস্যা আছে। এছাড়া নিশ্চিত হতে রুকইয়াহ করলেই মূল বিষয়টা বোঝা যাবে ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১৩০. যদি মানুষটাকে সর্বদা বিশেষ কোনো চিহ্নসহ দেখা যায়, যেমন: হিন্দুদের মত ধুতি পরা কিংবা পূজার মুর্তির মত কাউকে সবসময় দেখলে বুঝতে হবে জিনটা হিন্দু। যদি সবসময় পুরুষ কাউকে দেখা যায়, তবে বোঝা যাবে, আক্রমণকারী জিনটা পুরুষ।
১৩১. কোনো সমস্যা ধরতে না পারা এটা জিন, জাদু এবং বদনজর—সবগুলোর ক্ষেত্রেই বড় একটা লক্ষণ। তবে দীর্ঘদিনের ব্যথা বিশেষভাবে জিন-আক্রান্ত হওয়ার দিকে ইঙ্গিতও করে।
📄 জিন আছরের চিকিৎসা
কেউ জিন-আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা করার ইসলাম সম্মত উত্তম পদ্ধতি কী?
এই বিষয়টা আমরা দুভাবে আলোচনা করতে পারি। প্রথমে আমরা সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি জানব। এরপর ধাপে ধাপে সূক্ষ্ম বিষয়গুলোসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
এক নজরে জিন-আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য রুকইয়াহ
প্রথমে রাক্বী ওযু করে নেবেন এবং রোগীকেও ওযু করতে বলবেন। রুকইয়ার সময় সহায়তা করা এবং রোগীকে ধরে রাখার জন্য অন্তত একজন সহায়তাকারী রাখা উচিত। (রোগী মহিলা হলে সহায়তাকারী হিসেবে কোনো মাহরাম পুরুষ থাকা উচিত)।
এবার রোগীর কাছে বসে কানের কাছে উচ্চ আওয়াজে রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়তে থাকবেন। বিশেষভাবে আয়াতুল কুরসী, সূরা সফফাতের প্রথম ১০ আয়াত এবং সূরা জিনের প্রথম ৯ আয়াত-এসব পড়ার সময় প্রতিটা বাক্য কয়েকবার করে পুনরাবৃত্তি করবেন। সবগুলো রুকইয়ার আয়াত না পড়ে শুধু উল্লিখিত আয়াতগুলো বারবার পড়েও রুকইয়াহ করতে পারেন।
জিনের সমস্যা থাকলে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে পারে, বলতে পারে 'অনেক কষ্ট হচ্ছে, মরে যাচ্ছি' ইত্যাদি বলতে পারে। এতে প্রভাবিত হওয়া যাবে না, পড়া থামিয়ে দেওয়া যাবে না। বরং বুঝতে হবে এতে মূলত জিনের কষ্ট হচ্ছে। রোগী সুস্থ হলে এসব খেয়ালই থাকবে না ইনশাআল্লাহ। রাক্বীর কাজ হবে শুধু তিলাওয়াত করে যাওয়া।
কাছে একটা পাত্রে পানি রাখবেন, তিলাওয়াত করার মাঝেমাঝে রাক্বী সেই পানিতে ফুঁ দেবেন। এরপর মাঝেমধ্যে রোগীর চেহারায় এবং হাতে-পায়ে পানির ছিটা দেবেন, আর সম্ভব হলে কিছুটা পানি রোগীকে খাওয়াবেন।
জিনের কোনো গল্প শুনবেন না, অনর্থক প্রশ্ন করবেন না। রাক্বী পারতপক্ষে জিনকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া ছাড়া, পড়ার মাঝে অন্য কোনো কথাই বলবেন না। একান্ত কিছু বলতে হলে উপস্থিত অন্য কেউ বলবেন।
জিন যখন স্বীকার করবে, 'আমি চলে যাব' তখন রাক্কী বলবেন, 'আল্লাহর নামে বের হয়ে যা, ওয়াদা কর আর কখনো আসবি না।' একদিনের রুকইয়াতে যদি জিন চলে না যায় তাহলে এভাবে পরপর কয়েকদিন, আর প্রতিদিন অন্তত দুই - আড়াই ঘণ্টা বা এর বেশি সময় ধরে রুকইয়াহ করতে হবে।
এতে ধীরে ধীরে খবিস জিন রোগীর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাবে, দুর্বল হয়ে যাবে এবং ইনশাআল্লাহ এক পর্যায়ে পালাতে বাধ্য হবে。
📄 জিনের রোগীর জন্য রুকইয়াহ করার বিস্তারিত পদ্ধতি
প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখিত নিয়মে যথাযথ প্রস্তুতি নেয়ার পর রোগীর কানের কাছে উচ্চ আওয়াজে গ্রন্থের শেষে উল্লেখিত "রুকইয়ার প্রসিদ্ধ আয়াতসমূহ” তিলাওয়াত করুন।
রোগী যদি পুরুষ অথবা মাহরাম কেউ হয় তাহলে মাথায় হাত রেখে পড়বেন। গাইরে মাহরাম হলে শুধু কাছে বসে জোর আওয়াজে পড়বেন। কারণ, গাইরে মাহরামকে স্পর্শ করা হারাম। তবে এক্ষেত্রে মাঝেমাঝে একটা কাজ করতে পারেন, রোগীর সাথে থাকা পুরুষ মাহরামকে বলুন রোগীর মাথায় হাত রাখতে, তার হাতের ওপর আপনি হাত রাখুন। জিনে ধরা রোগী যদি শুয়ে থাকে, তখন রোগীর কপালে হাত রেখে কুরআন পড়তে পারেন। আর বেশি ঝামেলা করলে অন্য কাউকে বলুন রোগীকে ধরে রাখতে, আপনি শুধু কানের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকুন।
আর পুরোটা সময় রোগীর মাথায় হাত রাখা আবশ্যক নয়। রুকইয়ার মাঝেমাঝে হাত রাখতে পারেন, আবার সরিয়েও নিতে পারেন। সারকথা, রোগীকে স্পর্শ করে যদি আয়াতগুলো তিলাওয়াত করেন তাহলে রুকইয়ার প্রভাব বেশি হবে। না হলে অন্তত কাছে বসে রোগীর কানের কাছে জোর আওয়াজে পড়তে থাকবেন।
পড়ার মাঝেমাঝে রোগীর ওপর ফুঁ দিন, এমনভাবে ফুঁ দিন যেন সামান্য কিছু থুতুও ছিটিয়ে দেওয়া যায়। এছাড়াও হাতের কাছে রুকইয়ার পানি রাখুন, রুকইয়ার আয়াতগুলো এবং আয়াতুল হারক ১৩২ পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে এটা প্রস্তুত করতে পারেন। পড়ার মাঝেমাঝে রোগীর মুখে এবং হাতে-পায়ে এই পানি ছিটিয়ে দিবেন। সম্ভব হলে মাঝেমাঝে রোগীকে কয়েক চুমুক পানি খেতে বলবেন।
এই রুকইয়ার প্রভাবে হয়তো শরীর থেকে জিন চলে যাবে, অথবা শরীরে লুকিয়ে থাকলে সেটা প্রকাশ পেয়ে যাবে। যদি কোনো অঙ্গে লুকিয়ে থাকে তখনও এটা সহ্য করতে পারবে না, কথা বলে উঠবে। তবে রুকইয়াহ করার সময় আপনি নিয়ত করবেন, জিন যেন শরীর থেকে চলে যায় এবং রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।
কখনোই 'জিন আসুক, আমার সাথে গল্পগুজব করুক'—এ রকম ইচ্ছা রাখবেন না। এর কারণ হচ্ছে,
প্রথমত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শত্রুর সাথে সাক্ষাতের আশা করো না। ১৩৩ আর কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বারবার বলেছেন, শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। ১৩৪
দ্বিতীয়ত: আপনি কুরআন তিলাওয়াত করলে শয়তানের কষ্ট হয় বিধায় সে বিভিন্ন কথাবার্তা বলে আপনার পড়া বন্ধ রাখার চেষ্টা করবে। তাই আপনাকে সর্বপ্রকার কূটকৌশলের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। অনর্থক কথাকে পাত্তা না দিয়ে পড়ে যেতে হবে।
জিন বা জাদু আক্রান্ত রোগীর ওপর কতক্ষণ রুকইয়াহ করবেন, এটা রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমার মতে এর সর্বনিম্ন সময় ৪০-৪৫ মিনিট আর সর্বোচ্চ ২-৩ ঘন্টা বা আরও বেশি হতে পারে।
জিন আক্রান্তের ক্ষেত্রে রুকইয়ার প্রতিক্রিয়া
রুকইয়ার সময় নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে বুঝবেন রোগী জিন দ্বারা আক্রান্ত—
১. হাত দিয়ে চোখ-মুখ ঢাকতে চেষ্টা করা, বা অদ্ভুতভাবে এদিক-ওদিক তাকানো।
২. বারবার পুরো শরীর জোরে জোরে কেঁপে ওঠা।
৩. কোনো অঙ্গ অস্বাভাবিক নড়াচড়া করা, বা শরীরে কোনো জায়গার পেশির অস্বাভাবিক লাফানো।
৪. গোঙানো শুরু করা।
৫. চিৎকার দিয়ে ওঠা। বারবার থামতে বলা।
৬. কারও নাম ঠিকানা বলতে শুরু করা, বা গালিগালাজ করা।
৭. দাঁতে দাঁত লেগে নিথর হয়ে যাওয়া বা অচেতন হয়ে যাওয়া।
এ রকম কিছু হলে বোঝা যাবে, রোগীর সাথে জিন আছে। সেক্ষেত্রে রুকইয়াহ চালিয়ে যেতে হবে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই কথা বলবে অথবা এখান থেকে পালাবে। কথা বলুক অথবা চুপ থাকুক, আপনি পড়া থামিয়ে দেবেন না। মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন এবং কুরআন পড়তে থাকুন। যদি কখনো রোগী নিশ্চল হয়ে যায়, এক্ষেত্রেও আপনার কাজ হবে তিলাওয়াত করতে থাকা। একটু পরেই ইনশাআল্লাহ জ্ঞান ফিরবে, তবে চাইলে মুখে পানির ছিটা দিতে পারেন।
রোগীর মুখ দিয়ে জিন কথা বলে উঠলে, সংক্ষেপে কিছু প্রশ্ন করুন—
১. তার নাম কি? ধর্ম কি?
২. কেন রোগীর ওপর আসর করেছে?
৩. একাই আসর করেছে, নাকি সাথে আর কেউ আছে?
৪. কোনো জাদুকরের জন্য কাজ করে কি না?
উত্তর সত্যও দিতে পারে, আবার মিথ্যাও বলতে পারে। জিনরা খুব বেশি মিথ্যা বলে। এজন্য যা বলবে, সব বিশ্বাস করার দরকার নেই। আপনার কাজ হবে, জিনকে চলে যেতে নির্দেশ দেওয়া। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে বাধ্য করা।
প্রথমে তাকে বোঝানো উচিত যে, রোগীর কষ্ট হচ্ছে, আর কাউকে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। অথবা তাকে হিকমতের সাথে বোঝাতে চেষ্টা করুন, এভাবে মানুষের ওপর ভর করা অন্যায়, এই অধিকার তার নেই, সুতরাং সে যেন চলে যায়। যদি যেতে না চায়, তবে আপনি বারবার পড়তে থাকুন এবং পড়তে থাকুন। যতক্ষণ না সে মাফ চেয়ে পালাতে বাধ্য হয়।
আরও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা উচিত-
জিন যদি মুসলমান হয়, তাহলে প্রথমে তাকে তারগীব-তারহীবের মাধ্যমে বোঝাতে চেষ্টা করুন। অর্থাৎ আখিরাতের আযাবের কথা বলে সতর্ক করুন, জান্নাতের পুরস্কারের কথা মনে করিয়ে দিন। কোনো মুসলমানকে কষ্ট দিতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। ১৩৫ কাউকে অহেতুক কষ্ট দেওয়া উচিত নয়, রোগীকে ছেড়ে দিলে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দেবেন- এগুলো বোঝানোর চেষ্টা করুন।
জিন অমুসলিম হলে তাকে হিকমতের সাথে ইসলাম গ্রহণ করার প্রস্তাব দিন। যদি ইসলাম কবুল করে, আলহামদুলিল্লাহ। যদি ইসলাম গ্রহণ করতে না চায়, তবে চাপাচাপি করা যাবে না। আপনার কাজ হচ্ছে রোগীর চিকিৎসা করা, জিনদের মাঝে দাঈ বানিয়ে আপনাকে পাঠানো হয়নি। সুতরাং মূল কাজের দিকে মনোযোগ দিন, রুকইয়ার সময় অনর্থক বিষয় থেকে বেঁচে থাকুন। খুব বেশি হলে এতটুকু বলতে পারেন, সে যেন ইসলামের ব্যাপারে পরে আরও জানার চেষ্টা করে।
ইসলাম গ্রহণ করা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করার পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে, জিনেরা এমনিতেই ধোঁকাবাজ প্রকৃতির। সুতরাং অহেতুক সময় ক্ষেপণের জন্য তারা আপনার কাছে ইসলাম গ্রহণের নাটক করতে পারে। অথচ সে মিথ্যা বলেছে, মোটেও ঈমান আনেনি। বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটে, অথচ মানুষ মনে করে শয়তান কত সহজে ইসলাম কবুল করল। তাই খুব বেশি হলে বলুন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো, কিংবা বলুন, তুমি মুসলমান হয়ে যাও, আল্লাহ তোমাকে মাফ করে দেবেন। শুনলে ভালো। না হলে আপনি নিজের রুকইয়ায় মনোযোগ দিন।
এরপর তাকে ভালোভাবে বোঝান যে, রোগীর কষ্ট হচ্ছে, কোনো ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। আসর করার কোনো কারণ বললে সে অনুযায়ী পরামর্শ দিন, সামনে যেমনটা বলা হয়েছে। এরপর শরীর থেকে চলে যেতে আদেশ করুন।
যদি আসর করার কারণ বলে, তাহলে সেই অনুযায়ী উপদেশ দিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ: যদি বলে 'ওকে পছন্দ হয়েছে, তাই ভর করেছি' তাহলে বোঝাতে চেষ্টা করুন যে, এটা হারাম, ইসলাম এর অনুমতি দেয় না। সুতরাং তুমি একে ছেড়ে চলে যাও।
যদি কোনো কারণ ছাড়া অহেতুক আসর করে তাহলে বোঝান যে, এটা উচিত হচ্ছে না। এই লোক/মহিলা তো তোমাকে কখনো কষ্ট দেয়নি, তোমার কোনো ক্ষতি করেনি, তুমি কেন একে কষ্ট দিচ্ছ? এভাবে বুঝিয়ে চলে যাওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করতে হবে।
যদি ভুল কিছু করার জন্য (যেমন: জিনের গায়ে গরম পানি ফেলা, প্রস্রাব করা) আসর করে থাকে তাহলে বলুন যে, সে তোমাকে দেখতে পায় নি, অনিচ্ছাকৃতভাবে করেছে এই কাজ। বুঝতে পারলে কখনই এমন করত না। তোমার উচিত হবে তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে এরকম আর হবে না।
যাহোক, চলে যাওয়ার ব্যাপারে রাজি হলে এই কথার ওয়াদা নিন- 'আমি আল্লাহর নামে শপথ করছি, এখন এই শরীর থেকে চলে যাব। আর কখনো আসব না। এরপর আর কোনো মুসলমানের ওপর আসর করবনা। যদি করি তাহলে আমার ওপর আল্লাহর অভিশাপ।'
তবে জিন সবসময় এভাবে অক্ষরে অক্ষরে বলবে, এমনটা আশা করাও দুরূহ। তাই কমপক্ষে এ রকম ওয়াদা নিতে চেষ্টা করুন- 'আমি আল্লাহর নামে ওয়াদা করছি, এখন চলে যাব। আর কখনো আসব না।'
জিন বলতে পারে, এক অথবা দুই মাসের জন্য যাব, পাঁচ মাসের জন্য যাব। এসব ক্ষেত্রে আপনি নিজ অবস্থানে অটল থাকুন, বলুন 'হয়তো চিরদিনের জন্য চলে যাবি, নইলে শাস্তি চলতে থাকবে।'
এরপর জিজ্ঞেস করুন, কোন দিক দিয়ে বের হবে, অথবা সে নিজেই জিজ্ঞেস করতে পারে, কোন দিকে দিয়ে যাব। আপনি তাকে হাত অথবা পা দিয়ে বের হয়ে যেতে বলুন। মাথা, চোখ, পেট, বুকের দিক দিয়ে বের হতে বলা উচিত নয়। এতে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
জিন চলে যাওয়ার পর, আবার রোগীর ওপর রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়ে যাচাই করুন, অথবা রোগীকে আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়তে বলুন। রোগী বেশি দুর্বল হলে বলুন, যেন আপনার পড়া শুনে শুনে বলে। আপনি ৩-৪ শব্দ বা এক আয়াত করে পড়ুন, তাকেও পড়ান। জিন যদি না গিয়ে লুকিয়ে থাকে, এভাবে রোগীকে পড়তে দিলে বের হয়ে আসে।
যাহোক, আপনি আরও কিছুক্ষণ তিলাওয়াত করে এবং রোগীকে কুরআন পড়তে দিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন, আসলেই জিন চলে গিয়েছে কি না। আবারও স্মরণ করিয়ে দিই, জিনেরা খুব বেশি মিথ্যা বলে।
টিকাঃ
১৩২. জাহান্নাম এবং আজাব-গজব সংক্রান্ত আয়াত। কিছু আয়াতুল হারক উল্লেখ করা হয়েছে।
১৩৩. বুখারী: ২৮৬১
১৩৪. সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৫৩
১৩৫. সূরা আহযাব: ৫৮