📘 রুকইয়াহ > 📄 কোন সময় মানুষ আক্রান্ত হয়?

📄 কোন সময় মানুষ আক্রান্ত হয়?


কোন অবস্থায় মানুষের শরীরে জিন ঢুকতে পারে?
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খারাপ জিন সর্বাবস্থায় আপনার ওপর আক্রমণ করতে পারে না। শয়তানের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার—সবসময় সে মানুষকে বশ করতে পারে না। তবে কোনোভাবে আক্রান্ত হয়ে গেলে এরপর আপনার শরীরে ঢোকা খারাপ জিনের জন্য সহজ হয়ে যায়। ব্যাপারটা কোনো সুরক্ষিত স্থাপনায় প্রবেশের জন্য সুড়ঙ্গ নির্মাণের মতো।
খবিস জিন ৪ অবস্থায় মানুষের ওপর আসর করতে পারে—
১. খুব ভীত অবস্থায় থাকলে;
২. খুব রাগান্বিত অবস্থায় থাকলে;
৩. খুব উদাসীন অবস্থায় থাকলে;
৪. অশ্লীল কোনো গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় (যেমন: ব্যভিচার করা, পর্ণ ভিডিও বা স্থিরচিত্র দেখা ইত্যাদি)
এই অবস্থাগুলোর কোনো একটায় মানুষকে পেলে খবিস জিন তার ওপর ভর করতে পারে। আর এর পেছনে কারণ হচ্ছে, এই অবস্থাগুলোতে মানুষ তার রবের স্মরণ থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন –
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضُ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ
“যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিযুক্ত করে দিই। এরপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। আর তারাই মানুষকে সৎপথে চলতে বাধা দেয়; কিন্তু মানুষ মনে করে সে হিদায়াতের পথে আছে।” ১২৫
প্রথমবার মানুষের শরীরের ঢোকার কাজটা জিনের জন্য বেশ কঠিন। কিন্তু কেউ একবার জিন দ্বারা আক্রান্ত হলে, এরপর অন্যদের তুলনায় তার জাদু, জিন, বদনজর, ওয়াসওয়াসা বিবিধ সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
প্রাসঙ্গিক হওয়ায় যুক্তরাজ্যের একটা ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। একজন জাদুগ্রস্ত রোগীর ওপর রুকইয়াহ করলে জিন কথা বলে ওঠে। এক পর্যায়ে জিন জানায়, ৫২ দিন যাবৎ সে এই ব্যক্তির চারপাশে ঘুরছে তার শরীরে ঢোকার জন্য। এরপর একদিন তাকে খুব রাগান্বিত অবস্থায় পেয়েছে এবং এই সুযোগে তার ওপর আসর করেছে। তাই কেউ যদি সতর্ক থাকে এবং দুআ-কালাম পড়ে, আর অপরদিকে জিনকে যদি কোনো জাদুকর জোর করে পাঠায় তখন জিন বেশ ঝামেলার মধ্যে পড়ে যায়। এদিকেও বিপদ, ওদিকেও বিপদ।
এসব ক্ষতি থেকে বাঁচতে কর্তব্য হলো, প্রতিদিনের মাসনূন আমলগুলো আদায় করা এবং এই অধ্যায়ে নির্দেশিত পরামর্শ অনুসরণ করা। আর সর্বোপরি গাফেল না হওয়া, আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করা। তাহলে ইনশাআল্লাহ খারাপ জিনের আক্রমণ থেকে সহজেই বাঁচা যাবে।

রুকইয়াহ করলে জিন কি ক্ষতি করবে?
এ ব্যাপারে ইবনু তাইমিয়া রহ.-এর একটি লেখা হুবহু উদ্ধৃত করছি- ১২৬
'অনেক তদবীরকারী তাবীজ-কবচ করে বা এক জিন দিয়ে অন্য জিনকে হত্যা করে কিংবা বন্দি করে রাখে। কিন্তু এভাবে অন্য জিনকে হত্যা করা বা বন্দি করে রাখা বৈধ নয়। পরিণতিতে জিন তাকে হত্যা করতে পারে, অথবা তার অপরাধে তার স্ত্রী-সন্তান বা গৃহপালিত পশুপাখি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পক্ষান্তরে যারা সঠিকভাবে রুকইয়াহ করে অর্থাৎ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অনুমোদিত পন্থায় জিন তাড়াবে, জিন তার কোনো ক্ষতি করবে না। কারণ, সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুগত থেকে মাজলুমকে সহায়তা করছে।
শরীয়াহ কর্তৃক অনুমোদিত রুকইয়াহতে কোনো শিরক থাকে না, আর কারও ওপর জুলুমও করা হয় না। তাই জিন এখানে পাল্টা কোনো ক্ষতি করতে পারে না। কারণ, হয়তো জিন বুঝতে পারে যে, এটি সঠিক পদ্ধতি, কিংবা ক্ষতি করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। যদি অনেক শক্তিশালী জিন আসর করে আর রাক্কী দুর্বল হয়ে থাকেন তাহলে জিন রাক্কীর ক্ষতি করতে পারে। তাই এক্ষেত্রে রাকীকে আয়াতুল কুরসী, তিন কুল (সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস), সালাত ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে। রাক্কীর উচিত হবে গুনাহ থেকে দূরে থাকা আর এমন সব কাজ বেশি বেশি করা, যা ঈমানকে পাকাপোক্ত করে। এই কাজটি জিহাদের একটি উত্তম রূপ। আর রাক্কী হচ্ছেন আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামরত একজন। ১২৭ তাই তাকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন নিজের গুনাহের কারণে জিন তার ওপর জয়ী হতে না পারে।
তবে যদি পরিস্থিতি রাক্বীর সাধ্যের বাইরে হয় তাহলে তার উচিত হবে না, সাধ্যাতীত কাজের ভার নিয়ে নিজেকে ফিতনাতে নিক্ষেপ করা। কেননা ‘আল্লাহ কাউকে সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না’ ১২৮

টিকাঃ
১২৫. সূরা যুখরুফ, আয়াত ৩৬-৩৭
১২৬. রিসালাতুল জিন, পৃষ্ঠা: ৬৪-৬৫
১২৭. এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য, ইবনু তাইমিয়া রহ. এই কথাটি বলেছেন রুকইয়ার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য। এর মানে এই নয় যে, রুকইয়াহ করলেই কিতালের ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে এবং রাকী মুজাহিদ বলে অভিহিত হবেন।
১২৮. সূরা বাকারা: ২৮৬

📘 রুকইয়াহ > 📄 জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে করণীয়

📄 জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে করণীয়


খারাপ জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে নিচের বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত—
১। জামাআতে নামায আদায় করা। এটা আপনার আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং আপনাকে শয়তান থেকে হেফাজত করবে।
২। গান বাজনা, নাটক-সিনেমা এবং এই ধরনের যাবতীয় তথাকথিত ‘বিনোদন’ থেকে বিরত থাকা। পর্ণ বা অশ্লীলতার ধারেকাছেও না যাওয়া।
৩। যথাসম্ভব পাকপবিত্র থাকা, ঘুমের আগে ওযু করে বিছানায় যাওয়া।
৪। সব কাজে বিসমিল্লাহ বলা; বিশেষত ঘরে ঢুকতে এবং বের হতে, খাবারের সময় এবং অন্ধকারে কিছু করতে, উপর থেকে কিছু ফেলতে।
৫। অহেতুক কুকুর, বিড়াল, সাপ না মারা। কোনো কারণে মারতে হলে আগে তিন বার পর্যন্ত তাড়িয়ে দেওয়া, এরপরও তা না গেলে তখন মারা।
৬। সন্ধ্যাবেলায় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেওয়া, আর বাচ্চাদের বাইরে বের হতে না দেওয়া। রাত হয়ে যাওয়ার পর বাচ্চারা চাইলে বের হতে পারে আর দরজা-জানালাও খোলা যেতে পারে। ১২৯
৭। কোনো গর্তে প্রস্রাব না করা। এ ব্যাপারে পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা আছে।
৮। ঘরে প্রবেশের এবং বের হওয়ার দুআ পড়া। দুআ না জানলে অন্তত বিসমিল্লাহ বলা।
৯। বিসমিল্লাহ বলে দরজা-জানালা বন্ধ করা। রাতে ঘুমানোর সময় দরজা বন্ধ রাখা।
১০। স্ত্রী সহবাসের পূর্বে অবশ্যই দুআ পড়া।
১১। টয়লেটে ঢোকার সময় দুআ পড়া।
১২। প্রতিদিন সকালে
وَهُوَ عَلَى ، وَلَهُ الْحَمْدُ ، لَهُ الْمُلْكُ ، وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
একশ বার পড়া। কোনোদিন একশবার না হলে ফজর এবং আসরের পর দশ বার করে পড়া।
১৩। ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসী এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়া।
১৪। সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন আমলসহ প্রতিদিনের অন্যান্য যিকিরগুলো নিয়মিতভাবে করা। বিশেষত জাদু-সংক্রান্ত আলোচনার শেষে যেগুলো বলা হয়েছে।
১৫। সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস তথা তিনকুল'র এই দুটি আমল গুরুত্বসহকারে করা।
প্রথম আমল হলো, ঘুমানোর পূর্বে একবার সূরা ইখলাস, একবার সূরা ফালাক ও একবার সূরা নাস—এভাবে তিন সূরা তিনবার পড়া, তারপর দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সমস্ত শরীরে হাত বুলিয়ে নেয়া।
দ্বিতীয় আমল হলো, প্রতিদিন ফজর ও মাগরিবের নামাযের পর আগের মতই সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস—তিনবার করে পড়া। (এ সময়ে ফুঁ দেওয়া লাগবে না)
আর বাচ্চা অথবা অসুস্থ ব্যক্তি পড়তে না পারলে এই দুই সময়ে অন্য কেউ এসব পড়ার পর তাদের ফুঁ দিয়ে দেওয়া উচিত।

টিকাঃ
১২৯. জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত-
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا اسْتَجْنَحَ اللَّيْلُ أَوْ قَالَ جُنْحُ اللَّيْلِ فَكَفُوا صِبْيَانَكُمْ فَإِنَّ الشَّيَاطِينَ تَنْتَشِرُ حِينَئِذٍ فَإِذَا ذَهَبَ سَاعَةٌ مِنَ الْعِشَاءِ فَخَلُّوهُمْ وَأَغْلِقَ بَابَكَ وَاذْكُرُ اسْمَ اللهِ وَأَطْفِي مِصْبَاحَكَ وَاذْكُرْ اسْمَ اللَّهِ وَأَوْكِ سِقَاءَكَ وَاذْكُرْ اسْمَ اللهِ وَخَمِّرُ إِنَاءَكَ وَاذْكُرْ اسْمَ اللَّهِ وَلَوْ تَعْرُضُ عَلَيْهِ شَيْئًا
"নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (সুর্যাস্তের পর) যখন রাত নেমে আসে তখন তোমরা তোমাদের বাচ্চাদের আটকে রাখবে। কারণ, এ সময় শয়তানেরা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর রাতের কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলে তাদের ছেড়ে দিতে পারো। আর তোমার ঘরের দরজা বন্ধ করে আল্লাহর নাম নাও। তোমাদের ঘরের বাতি নিভিয়ে আল্লাহর নাম নাও। তোমার পান পাত্রের মুখ ঢেকে রাখো এবং আল্লাহর নাম নাও। তোমার বাসনপত্র ঢেকে রাখো এবং আল্লাহর নাম নাও। আর (ঢাকার কিছু না পেলে) সামান্য কিছু আড়াআড়িভাবে রেখে দাও।" [বুখারী: ৩১০৬]

📘 রুকইয়াহ > 📄 জিন-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ

📄 জিন-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ


মানুষ অনেকভাবে জিন দ্বারা আক্রান্ত হয়। আমাদের সমাজে পুরো শরীরে আসর না হলে, আর মুখ দিয়ে জিন কথা বলতে না লাগলে সচরাচর কেউ বিশ্বাস করে না যে, শরীরে জিন আছে। কিন্তু আসলেই এটা সম্ভব যে, কারও শরীরে জিন ঢুকে আছে আর দিনের পর দিন ক্রমাগত সে মানসিক এবং শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা জরুরি, আমরা যে লক্ষণগুলো আলোচনা করতে যাচ্ছি, এক- দুদিন এসব দেখলেই জিন দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন ভাববার কারণ নেই। এগুলো অন্যান্য স্বাভাবিক অসুখ-বিসুখের কারণেও হতে পারে, জিনের নজরের কারণেও হতে পারে। তবে এই লক্ষণগুলোর মাঝে অনেকগুলো যদি কারও মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকে তখন ধারণা করা যায় যে, জিনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য রুকইয়াহ করতে হবে।
আলোচনার সুবিধার্থে জিন-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি। নিদ্রাবস্থার লক্ষণ এবং জাগ্রত অবস্থার লক্ষণ।

ক. নিদ্রাবস্থার লক্ষণসমূহ
১. নিদ্রাহীনতা: সারারাত ঘুম হয়না, হলেও খুব কম।
২. উদ্বিগ্নতা: এজন্য রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়।
৩. ঘনঘন বোবায় ধরা: ঘুমের সময় কেউ চেপে ধরেছে এমন অনুভূত হওয়া, নড়াচড়া করতে না পারা। কারও কারও এই সমস্যা স্বপ্নের মধ্যেও হতে পারে।
৪. ঘুমের মাঝে প্রায়ই চিৎকার করা, গোঙানো, হাসি-কান্না করা।
৫. ঘুমের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করা বা দৌড় দেওয়া। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
৬. স্বপ্নে কোনো প্রাণীকে আক্রমণ বা ধাওয়া করতে দেখা। বিশেষত কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর, উট, গরু, মহিষ, বাঘ, সিংহ, শিয়াল, সাপ বা এই ধরনের হিংস্র প্রাণী। যদি স্বপ্নে সবসময় দুইটা বা তিনটা প্রাণী আক্রমণ করতে আসছে দেখে তাহলে বুঝতে হবে সাথে দুইটা বা তিনটা জিন আছে।
৭. স্বপ্নে নিজেকে অনেক উঁচু কোনো জায়গা থেকে পড়ে যেতে দেখা।
৮. স্বপ্নে কোনো গোরস্থান, পরিত্যক্ত জায়গা, নদী অথবা মরুভূমির সড়ক দেখা। এটি জিনের পাশাপাশি জাদু আক্রান্ত হওয়ারও ইঙ্গিত বহন করে। আর স্বপ্নে একই জায়গা বারবার দেখলে সেখানে জাদুর জিনিসগুলো থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
৯. বিশেষ আকৃতির মানুষ দেখা। যেমন: অনেক লম্বা, খুবই খাটো, বা খুব কালো কুচকুচে কাউকে দেখা। ১৩০
১০. স্বপ্নে জিন-ভূত দেখা অথবা অন্যান্য ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখা।

খ. জাগ্রত অবস্থার লক্ষণ
১. ইবাদাতবিমুখতা: নামায, তিলাওয়াত, যিকির-আযকার থেকে আগ্রহ উঠে যাওয়া। মোট কথা, দিন দিন আল্লাহর থেকে দূরে সরে যাওয়া।
২. দীর্ঘস্থায়ী মাথা ব্যথা। (চোখ, কান, দাঁত ইত্যাদির সমস্যার কারণে নয়; এমনিই মাথার এক পাশে অথবা উভয় দিকে ব্যথা করা, আর এজন্য ওষুধ খেয়েও তেমন ফায়দা না পাওয়া)
৩. মেজাজ বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকা, কিছুতেই মন না বসা।
৪. খুব সামান্য কোনো কারণেই যখন-তখন রেগে যাওয়া কিংবা কান্নাকাটি করা।
৫. বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া।
৬. হঠাৎ অজ্ঞান বা বেহুশ হয়ে যাওয়া, দাঁতে-দাঁত লেগে ফিট হয়ে যাওয়া। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
৭. মৃগীরোগ বা Epilepsy। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
৮. অস্বাভাবিক আচরণ করা। এরকম অনুভূত হওয়া যে, আমি খারাপ আচরণ করতে চাচ্ছি না, তবুও কথা বলতে গেলেই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছি।
৯. শরীরের কোনো অঙ্গে প্রায় সময় ব্যথা থাকা কিংবা একদম বিকল হয়ে যাওয়া। ডাক্তাররা যেখানে সমস্যা খুঁজে পেতে বা চিকিৎসা করতে অপারগ হচ্ছে। ১৩১
১০. ব্যাপক অলসতা; সবসময় অবসন্নতা ঘিরে রাখা, শরীর ভারী হয়ে থাকা।
১১. কুরআনুল কারীমের তিলাওয়াত বা আযান সহ্য না হওয়া। এটিও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
১২. নিজের সন্তানকে বুকের দুধ খেতে না দেওয়া। অথবা সন্তান দুধ খেতে না চাওয়া। বাচ্চার মা জিন-আক্রান্ত হলে এই দুটোর যেকোনো একটা হতে পারে।
১৩. হ্যালুসিনেশন বৃদ্ধি পাওয়া। ফলে রোগী জাগ্রত অবস্থাতেই স্বপ্নের মত বিভিন্ন কিছু দেখতে পায়, যা অন্যরা দেখছে না।
১৪. জিন দ্বারা আক্রান্ত হলে রোগীর মাঝে জিনের স্বভাব প্রকাশ পায়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ মুশরিক জিন দ্বারা আক্রান্ত হলে হিন্দুদের মত সাঁজগোজ, মন্দিরের আওয়াজ ইত্যাদির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হতে পারে।
১৫. এছাড়া জিনের রোগীর সাথে বিভিন্ন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। যেমন: রাতে কারও ব্যাপারে দুর্ঘটনার স্বপ্ন দেখা এবং পরের দিন সেটা সত্যি হয়ে যাওয়া, কারও ওপর রেগে গেলে বা অভিশাপ দিলে তার ক্ষতি হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বিশেষভাবে বেঁচে যাওয়া ইত্যাদি।
আবারও মনে করিয়ে দিই, এর মাঝে কিছু লক্ষণ শারীরিক বা মানসিক রোগের কারণেও প্রকাশ পেয়ে থাকে। তবে দীর্ঘদিন যাবৎ যখন এসবের কোনো সুরাহা না হয় তখন বুঝে নিতে হবে, আসলেই কোনো প্যারানরমাল সমস্যা আছে। এছাড়া নিশ্চিত হতে রুকইয়াহ করলেই মূল বিষয়টা বোঝা যাবে ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
১৩০. যদি মানুষটাকে সর্বদা বিশেষ কোনো চিহ্নসহ দেখা যায়, যেমন: হিন্দুদের মত ধুতি পরা কিংবা পূজার মুর্তির মত কাউকে সবসময় দেখলে বুঝতে হবে জিনটা হিন্দু। যদি সবসময় পুরুষ কাউকে দেখা যায়, তবে বোঝা যাবে, আক্রমণকারী জিনটা পুরুষ।
১৩১. কোনো সমস্যা ধরতে না পারা এটা জিন, জাদু এবং বদনজর—সবগুলোর ক্ষেত্রেই বড় একটা লক্ষণ। তবে দীর্ঘদিনের ব্যথা বিশেষভাবে জিন-আক্রান্ত হওয়ার দিকে ইঙ্গিতও করে।

📘 রুকইয়াহ > 📄 জিন আছরের চিকিৎসা

📄 জিন আছরের চিকিৎসা


কেউ জিন-আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা করার ইসলাম সম্মত উত্তম পদ্ধতি কী?
এই বিষয়টা আমরা দুভাবে আলোচনা করতে পারি। প্রথমে আমরা সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি জানব। এরপর ধাপে ধাপে সূক্ষ্ম বিষয়গুলোসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

এক নজরে জিন-আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য রুকইয়াহ
প্রথমে রাক্বী ওযু করে নেবেন এবং রোগীকেও ওযু করতে বলবেন। রুকইয়ার সময় সহায়তা করা এবং রোগীকে ধরে রাখার জন্য অন্তত একজন সহায়তাকারী রাখা উচিত। (রোগী মহিলা হলে সহায়তাকারী হিসেবে কোনো মাহরাম পুরুষ থাকা উচিত)।
এবার রোগীর কাছে বসে কানের কাছে উচ্চ আওয়াজে রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়তে থাকবেন। বিশেষভাবে আয়াতুল কুরসী, সূরা সফফাতের প্রথম ১০ আয়াত এবং সূরা জিনের প্রথম ৯ আয়াত-এসব পড়ার সময় প্রতিটা বাক্য কয়েকবার করে পুনরাবৃত্তি করবেন। সবগুলো রুকইয়ার আয়াত না পড়ে শুধু উল্লিখিত আয়াতগুলো বারবার পড়েও রুকইয়াহ করতে পারেন।
জিনের সমস্যা থাকলে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে পারে, বলতে পারে 'অনেক কষ্ট হচ্ছে, মরে যাচ্ছি' ইত্যাদি বলতে পারে। এতে প্রভাবিত হওয়া যাবে না, পড়া থামিয়ে দেওয়া যাবে না। বরং বুঝতে হবে এতে মূলত জিনের কষ্ট হচ্ছে। রোগী সুস্থ হলে এসব খেয়ালই থাকবে না ইনশাআল্লাহ। রাক্বীর কাজ হবে শুধু তিলাওয়াত করে যাওয়া।
কাছে একটা পাত্রে পানি রাখবেন, তিলাওয়াত করার মাঝেমাঝে রাক্বী সেই পানিতে ফুঁ দেবেন। এরপর মাঝেমধ্যে রোগীর চেহারায় এবং হাতে-পায়ে পানির ছিটা দেবেন, আর সম্ভব হলে কিছুটা পানি রোগীকে খাওয়াবেন।
জিনের কোনো গল্প শুনবেন না, অনর্থক প্রশ্ন করবেন না। রাক্বী পারতপক্ষে জিনকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া ছাড়া, পড়ার মাঝে অন্য কোনো কথাই বলবেন না। একান্ত কিছু বলতে হলে উপস্থিত অন্য কেউ বলবেন।
জিন যখন স্বীকার করবে, 'আমি চলে যাব' তখন রাক্কী বলবেন, 'আল্লাহর নামে বের হয়ে যা, ওয়াদা কর আর কখনো আসবি না।' একদিনের রুকইয়াতে যদি জিন চলে না যায় তাহলে এভাবে পরপর কয়েকদিন, আর প্রতিদিন অন্তত দুই - আড়াই ঘণ্টা বা এর বেশি সময় ধরে রুকইয়াহ করতে হবে।
এতে ধীরে ধীরে খবিস জিন রোগীর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাবে, দুর্বল হয়ে যাবে এবং ইনশাআল্লাহ এক পর্যায়ে পালাতে বাধ্য হবে。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00