📘 রুকইয়াহ > 📄 সালাফে সালেহীনের কিছু ঘটনা

📄 সালাফে সালেহীনের কিছু ঘটনা


সালাফে সালেহীনের থেকে জিনের চিকিৎসা-বিষয়ক অনেক ঘটনা বর্ণিত আছে।
একজন মৃগী রোগীকে আক্রান্ত অবস্থায় দেখে ইবনু মাসউদ রা. তার কানের কাছে গিয়ে اَفَحَسِبْتُمْ اَنَّمَا خَلَقْنٰكُمْ عَبَثًا-সূরা মুমিনুনের ১১৫ নম্বর আয়াত থেকে সেই সূরার শেষ পর্যন্ত পড়েন। ফলে সে সাথে সাথে সুস্থ হয়ে যায়। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনু মাসউদ রা.-কে ডেকে বললেন- তুমি ওর কানের কাছে গিয়ে কী পড়লে? ইবনু মাসউদ রা. আয়াতটি শোনালেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোনো যোগ্য ব্যাক্তি যদি পাহাড়ের ওপরে এটা (সূরা মুমিনুনের এই আয়াত/ আয়াতগুলো) পড়ে তাহলে পাহাড়ও সরে যাবে। ১২১
এবার ইমাম সুয়ূতী রহ.-এর লাকতুল মারজান ফী আহকামিল জান থেকে কয়েকটি ঘটনা সংক্ষেপে বলা যায়।
এক. শিয়াদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি হজ্জ করতে গিয়েছিলেন। তিনি যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ আমল করতে যাচ্ছিলেন তখনই মৃগী রোগে আক্রান্ত হচ্ছিলেন (আলিমগণের মতে, মৃগীরোগ জিনের আসরের কারণে হয়)। হুসাইন বিন আব্দুর রহমান রহ. মিনায় ওই লোকটিকে দেখতে পেয়ে জিনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'তুমি যদি ইহুদি হও তবে মুসা আ.-এর দোহাই, যদি খৃষ্টান হও তবে ঈসা আ.-এর দোহাই, আর মুসলমান হলে তোমাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোহাই দিয়ে বলছি, তুমি চলে যাও।
তখন জিন কথা বলে উঠল, আমি ইহুদিও না, খ্রিষ্টানও না, বরং মুসলমান। আমি এই হতভাগাকে দেখেছি, সে আবু বকর রা. এবং উমর রা.-কে গালিগালাজ করে। এজন্য আমি তাকে হজ্জ করতে দিই নি।
দুই. মুতাযিলা ফিরকার এক ব্যক্তিকে জিনে ধরেছিল। সকলেই ভীড় করে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। সাঈদ ইবনু ইয়াহইয়া রহ. তার কাছে গিয়ে বললেন, 'তুমি এর ওপর কেন আক্রমণ করেছ? আল্লাহ কি তোমাকে এই অধিকার দিয়েছে? না তুমিই বাড়াবাড়ি করছ?' তখন লোকটার মুখ দিয়ে জিন বলে উঠল, 'আপনি আমাকে ছেড়ে দিন। আমি একে খতম করে ফেলব। সে কিনা বলছে, কুরআন মাখলুক।' (এটা মুতাযিলা ফেরকার একটা আক্বীদা)
তিন. এবারের ঘটনাটি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর যুগের। তৎকালীন বাদশাহর মেয়েকে জিন আসর করেছিল। বাদশাহর এক মন্ত্রী ইমাম আহমাদ রহ.-এর কাছে ছুটে এলেন। ইমাম আহমাদ রহ. একটি জুতা বের করে ওযু করলেন। এরপর বললেন, জিনকে গিয়ে বলো, 'তুমি কি এই মেয়েকে ছেড়ে যাবে? নাকি ইমাম আহমাদের হাতে জুতার বাড়ি খাবে?' মন্ত্রী গিয়ে কথাগুলো জিনকে বলল। জিন বলল, 'আমি চলে যাব। ইমাম আহমাদ যদি বাগদাদ থেকে চলে যেতে বলেন তবে বাগদাদ থেকেও চলে যাব। ইমাম আহমাদ আল্লাহর অনুগত বান্দা। যে আল্লাহর অনুগত হয়, সব সৃষ্টি তার অনুগত হয়ে যায়।' এরপর জিন চলে গেল।
কিন্তু ইমাম আহমাদ রহ.-এর ইন্তিকালের পর সেই জিন আবার এসে বাদশাহর মেয়েকে আসর করল। এবার বাদশাহ এক ব্যক্তিকে ইমাম আহমাদ রহ.-এর ছাত্র আবূ বাকর মারওয়াবী রহ.-এর কাছে পাঠালেন। উনি একটা জুতা নিয়ে মেয়েটার কাছে আসলেন। তখন মেয়েটির মুখ দিয়ে জিন কথা বলে উঠল, এবার আর আমি যাচ্ছি না। ইমাম আহমাদ আল্লাহর আনুগত বান্দা ছিলেন, তাই তার কথা শুনে চলে গিয়েছিলাম। তোমাদের কথা তো শুনব না।
চার. ইবনু তাইমিয়া রহ. এক মেয়ে রোগীর ওপর সূরা মুমিনুনের ওই (১১৫নং) আয়াত পড়েন তখন জিন কথা বলে ওঠে।
ইবনু তাইমিয়া রহ. জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ওকে ধরেছ কেন? জিন বলল, আমি ওকে পছন্দ করি। ইবনু তাইমিয়া রহ. বললেন, সে তো তোমাকে পছন্দ করে না। জিন বলল, আমি ওকে নিয়ে হজ্জে যাব। ইবনু তাইমিয়া রহ. বললেন, সে তো তোমার সাথে হজে যেতে চায় না! তুমি কেন কষ্ট দিচ্ছ? জিনটা একরোখা ছিল। ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহ. তাকে আচ্ছামতো পিটুনি দিলেন। তখন জিন বলল, আপনি বলছেন তো? আপনার কথা মেনে আমি চলে যাচ্ছি! ইবনু তাইমিয়া রহ. বললেন, থাম থাম। আমার কথা নয়; বরং আল্লাহ এবং রাসূলের কথা মেনে চলে যা। এবার জিন চলে গেল। সে আর কখনো আসে নি।

টিকাঃ
১২১. মাজমাউয যাওয়ায়িদ: ১৩৩৬৩। কোনো কোনো মুহাদ্দিস এর সনদ হাসান বলেছেন, আর কেউ কেউ যঈফ বলেছেন。

📘 রুকইয়াহ > 📄 জিনের আছরের প্রকারভেদ

📄 জিনের আছরের প্রকারভেদ


একজন মানুষকে জিন কয়েকভাবে আসর করতে পারে। অন্য ভাষায় বললে, জিন দ্বারা মানুষ কয়েকভাবে আক্রান্ত হয়:

১। পুরো শরীর আক্রান্ত হওয়া (Jinn Possession)
স্বাভাবিকভাবে আমরা যেটাকে বলি, 'অমুককে জিনে ধরেছে'। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের শরীরের ওপর থেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারায়, জিন তার মুখ দিয়ে কথা বলে, সব অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। তাকে আঘাত করলে জিন ব্যথা পায়।

২। মস্তিস্ক আক্রান্ত হওয়া
এক্ষেত্রে জিন মস্তিস্কে অবস্থান করে এবং রোগীর স্নায়ুতন্ত্র (nervous system), পেশী, অনুভূতি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। সে রোগীর মুখ দিয়ে কথা বলতে পারে, কান দিয়ে শুনতে পারে, রাগিয়ে দিতে পারে, হাসাতে বা কাঁদাতে পারে, কোনো অঙ্গ অচল করে রাখতে পারে। আর কখনো এটা পুরো শরীর আক্রান্ত হওয়াতে রূপ নেয়।
জিনের সাহায্যে কেউ জাদু করলে সাধারণত এমনটা হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় রুকইয়াহ করলে জিন কথা বলে ওঠে। এছাড়া জিন শক্তিশালী হলে রোগীর ওপর বারবার রুকইয়াহ করার প্রয়োজন হয়। তখন আস্তে আস্তে তার ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে এই অবস্থায় আসতে পারে, যাতে রোগীর মুখ দিয়ে জিন কিছু বললে সেটা রোগীর স্মরণ থাকে। এরপরও রুকইয়াহ করতে থাকলে এক সময় শক্তিশালী জিনও রোগীকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।

৩। শরীরের কোনো অঙ্গ যেমন- হাত, পা অথবা মাথা আক্রান্ত হওয়া।
যাকে Partial Body Possession বলা যায়।
এক্ষেত্রে ওই অঙ্গে প্রচুর ব্যথা থাকে, অথবা একদম বিকল হয়ে যায়। এটাও সাধারণত জাদু আক্রান্ত হওয়ার কারণেই হয়ে থাকে।
যেমন: জিন মাথায় ঢুকে আছে, যার ফলে সবসময় মাথা ব্যথা করে। অথবা পায়ে ঢুকে আছে, ফলে ব্যথার কারণে দাঁড়াতেই পারছে না। আর এই অবস্থায় ডাক্তার দেখিয়ে সাধারণত কিছুই পাওয়া যায় না। তবে IV ইনজেকশন ব্যবহারের ফলে প্রদাহের কারণে কিছু সময়ের জন্য জিন সরে যেতে পারে।
আর এভাবে জিন দ্বারা যেমন একটি অঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে, তেমনি একাধিক অঙ্গও হতে পারে। একটা জিন যেমন মানুষের শরীরে ঢুকে থাকতে পারে, ঠিক একইভাবে একাধিক জিনও একজন মানুষের শরীরে থাকতে পারে। ১২২

৪। স্বল্প সময়ের জন্য আক্রমণ করা
জিন যেমন মানুষের শরীরের মাঝে ঢুকে দীর্ঘ সময় থাকতে পারে, তেমনি মানুষের ক্ষতি করে সাথে সাথে বের হয়ে যেতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পরপর আসর করে।
এটা সাধারণত জাদু আক্রান্তদের ক্ষেত্রে আর পুরোনো কোন শত্রুতার জেরে জিনের আসর হলে তখন হয়ে থাকে।
অভিজ্ঞ আলিমগণ এই প্রকারের মাঝে বোবা ধরা (Sleeping Paralysis)-কেও গণ্য করেছেন। অর্থাৎ জিনেরা ঘুম এবং জাগ্রত হওয়ার মাঝের সময়টাতে মানুষকে আক্রমণ বা বিরক্ত করে থাকে। এই সমস্যা থেকে বাঁচতে ঘুমের আগের মাসনূন আমলগুলো ঠিকঠাক মতো করে নিতে হবে।

৫। জিনের নজর
এটাকে আমাদের দেশে 'বাতাস লাগা' অথবা 'জিনের বাতাসলাগা' বলে। এটা নিয়ে বদনজর অধ্যায়ে বলা হয়েছে। জিনের নজরের কারণে বাচ্চারা অহেতুক ভয় পায়, অস্বাভাবিক কান্নাকাটি করে; বড়দেরও ভয়-ভয় লাগে, মনে হয় 'আশেপাশে কেউ আছে', ঘরে কেউ না থাকা সত্ত্বেও ছায়া চলাচল করতে দেখা, রাতে ঠিকমত ঘুম হয় না, ওয়াসওয়াসা বেড়ে যায় ইত্যাদি।
এর জন্য কিছুদিন বদনজরের রুকইয়াহ করলে ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। আর ঘনঘন এমন হওয়ার কারণ হতে পারে—কেউ একজন পিছে লেগে আছে, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না। অথবা আশেপাশের কেউ একজন জিনের রোগী, কিংবা বাড়িতে জিনের সমস্যা আছে; আর এজন্য এমন হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভালোভাবে রুকইয়াহ করতে হবে আর মাসনূন আমল এবং দুআর প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, মানসিক সমস্যা। অর্থাৎ কোনো কারণবশত কারও মাথায় ঢুকে গেছে—সে জিন-আক্রান্ত এবং সে এটা বিশ্বাস করে নিয়েছে। এরপর তার জানামতে জিন- আক্রান্ত হলে মানুষ যেগুলো করে, সেসব সে করার চেষ্টা করছে। পার্থক্য করার উপায় হচ্ছে রুকইয়াহ। রুকইয়াহ করলেই মূল বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যাবে। আর এক্ষেত্রে সমাধান হচ্ছে, মানসিক চিকিৎসা দেওয়া, পাশাপাশি ওয়াসওয়াসা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া।

টিকাঃ
১২২. ব্যাপারটা বুঝতে সহজভাবে ভাবুন, 'শয়তান মানুষের রগে রগে চলাচল করে'-এটা তো সুস্পষ্ট হাদীস। তাই না? এই শয়তানরাও জিন (সূরা কাহাফ, আয়াত ৫০) আচ্ছা, এখন আপনার পায়ে কতগুলো রগ আছে-ভেবে দেখুন তো। এবার এগুলোর মধ্যে কতগুলো জিন ঢুকে থাকতে পারবে হিসেব করুন।
একজন মিসরীয় শায়খের ঘটনা, তার কাছে একজন রোগী আসল। যার এক পা একদম অচল হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তাররা কোনো সমস্যা খুঁজে পাচ্ছিল না। তো শায়খ যখন ওই ব্যক্তির মাথায় হাত রেখে রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়লেন, তখন রোগীর মুখ দিয়ে জিন কথা বলে উঠল। সে মুসলমান ছিল, তাকে বুঝিয়ে চলে যেতে রাজি করানোর সময় জানা গেল, ওই লোকের শরীরে আরো দুইটা জিন আছে, যারা খ্রিষ্টান। তো কখনো এমনও হতে পারে।

📘 রুকইয়াহ > 📄 কেন মানুষের ওপর জিন আছর করে?

📄 কেন মানুষের ওপর জিন আছর করে?


সাধারণত নিচের সাতটি কারণের কোনো এক বা একাধিক কারণে মানুষের ওপর জিন আসর করে—
১. কোনো জাদুকর কিংবা কবিরাজ কারও ক্ষতি করার জন্য জাদু বা তাবীজের মাধ্যমে জিনকে পাঠাতে পারে। এটাকে আমাদের দেশে 'জিন চালান দেওয়া' বলে।
২. কোনো ছেলে বা মেয়ে জিন বিপরীত লিঙ্গের কোনো মানুষকে দেখে তার ওপর আকৃষ্ট হয়ে তাকে পাওয়ার জন্য আসর করতে পারে। এমন রোগীদের ক্ষেত্রে জিনের রুকইয়ার পাশাপাশি কিছুদিন আসক্ত করার জাদুর রুকইয়াহও করা উচিত।
৩. মানুষ যদি জিনের ক্ষতি করে তাহলে জিনেরা প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে আসর করতে পারে। যেমন: কেউ হয়তো তাদের ওপর গরম পানি ফেলেছে, অথবা এমন কোনো গাছ কেটে ফেলেছে, যেখানে জিনদের বসবাস ছিল, অথবা ভুলবশত সাপরূপী কোন জিনকে মেরে ফেলেছে। এসব কারণে জিনেরা রাগান্বিত হয়ে আসর করতে পারে।
৪. পুরোনো কোনো শত্রুতার জেরে আসর করতে পারে, বা অন্য ক্ষতি করতে পারে। যেমন: হয়তো বাবা অথবা দাদা কোনো জিনকে ইচ্ছাকৃত বা ভুলক্রমে হত্যা করেছিল। জিনেরা এর বদলা নিতে সন্তানদের ক্ষতি করতে পারে।
তবে এক্ষেত্রে সঠিক পন্থায় রুকইয়াহকারীদের হিসাব ভিন্ন। কারণ, প্রথমত এখানে দোষ হচ্ছে জিনের, সে জুলুম করে মানুষের ওপর ভর করেছে। দ্বিতীয়ত রুকইয়ার সময় জিনকে অনেকবার চলে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন সতর্কবাণী শোনানো হয়— 'যদি তুমি না যাও তবে কুরআন পড়ে শাস্তি দেওয়া হবে' ইত্যাদি। এরপরও যখন সে কোনো সতর্কবার্তাতেই কান দিলোনা তখন এর দায়ভার তো তার নিজের।
৫. কোনো কোনো জিন ভুলে মানুষের ক্ষতি করতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণত এমন হয়, জাদুকর কোনো বোকা জিনকে কারও ক্ষতি করার জন্য পাঠিয়েছে; কিন্তু সে ভুলে অন্য কাউকে লক্ষ্য বানিয়েছে।
৬. নোংরা, নাপাক বা খারাপ জায়গায় অবস্থান করলে বা দীর্ঘক্ষণ নাপাক থাকলে জিন ক্ষতি করতে পারে। এ কারনেই এ ধরনের সময়গুলোতে পড়ার জন্য হাদীসে নির্দেশিত দুআসমূহে 'শয়তান থেকে' আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। (উদাহরণস্বরূপ: টয়লেটে ঢোকার দুআ, স্ত্রী সহবাসের দুআ কিংবা নতুন জায়গায় যাওয়ার দুআ দেখা যেতে পারে)
৭. মাঝরাতে, সন্ধ্যাবেলায় বা ভরদুপুরে কাউকে কোনো জনমানবহীন প্রান্তরে, ফাঁকা রাস্তায় অথবা বাড়ির ছাঁদে হাঁটাচলা করতে দেখে, অথবা নির্জন জায়গা দিয়ে কাউকে যেতে দেখে কোনো কারণ ছাড়াই শয়তান আসর করতে পারে। যেমন: অনেক খারাপ মানুষ যেমন অন্যদের অহেতুক কষ্ট দিয়ে থাকে, দুষ্ট জিনরাও ঠিক একই কাজ করে। তাই নির্জন জায়গায় চলাচলের সময় কিংবা একাকী থাকাবস্থায় সকল কিছুর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া উচিত।
এই কারণ সাতটির মাঝে বেশিরভাগ মানুষ আক্রান্ত হয় প্রথম, দ্বিতীয় এবং শেষ কারণে। তবে জিনের রুকইয়াহ করার সময় জিনকে 'কেন আসর করেছে' জিজ্ঞেস করলে অনেক সময়ই মিথ্যা বলে। তাই জিন কোনো কারণ বললেই বিশ্বাস করার দরকার নাই। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এখানে একটা বিষয় জেনে রাখা উচিত, মানুষকে বিনা দোষে কষ্ট দেওয়া যেমন হারাম, তেমনি জিনদের কষ্ট দেওয়াও হারাম। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা দোষে কোনো জিনকে হত্যা করলে তার বদলা নেওয়া জায়িয হবে। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করলে বা হত্যা করলে কিসাস (বদলা) নেওয়া বৈধ হবে না।
এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটা সহজ মূলনীতি পাওয়া যায়, কোনো ক্ষতিকর বা সন্দেহজনক প্রাণী (উদাহরণস্বরূপ: সাপ) বাড়িতে দেখলে তিনদিন পর্যন্ত সেটাকে বের করে দিতে হবে বা সতর্ক করতে হবে—'এখান থেকে চলে যাও'। এরপরও যদি না যায় তাহলে তাকে হত্যা করা যাবে। ১২৩
জিন আসর করার ব্যাপারে ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেছেন, মানুষের ওপর জিনের হামলা হয় কামোত্তেজনা ও প্রেম-ভালোবাসার কারণে। কখনো-বা শত্রুতা কিংবা বদলা নেবার জন্যেও জিনেরা মানুষের ওপর আক্রমণ করে। এ ক্ষেত্রে মানুষের অপরাধ হতে পারে— জিনের গায়ে প্রস্রাব করা, তাদের গায়ে পানি ফেলা, কিংবা তাদের কাউকে হত্যা করা; যদিও এসব ক্ষেত্রে মানুষ জেনে শুনে জিনকে মারে না। আবার কখনো কখনো স্রেফ খেল-তামাশা বা কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যেও জিন মানুষকে ধরে; যেমনিভাবে কিছু কিছু মানুষও অনর্থক অন্যদের কষ্ট দিয়ে থাকে।
প্রথম (প্রেম-ভালোবাসা ও যৌন উত্তেজনা ঘটিত) ক্ষেত্রে জিন কথা বলে এবং জানা যায় যে, তা জিনের গুনাহের কারণে ঘটেছে। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, অর্থাৎ প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষেত্রে, মানুষ সাধারণত বিষয়টা জানতে পারে না। তবে যে মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে জিনদের কষ্ট দেয় না, সে জিনদের তরফ থেকে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয় না। এমন মানুষ তার নিজের ঘরবাড়ি ও জায়গা-জমির মধ্যে জিনদের জন্য কষ্টদায়ক কোনো কাজ করলেও জিনরা একথা-ই বলে—এ জায়গা তার মালিকানাধীন। এখানে সব রকম কাজের অধিকার তার আছে। তোমরা (জিনরা) মানুষের মালিকানাধীন এলাকায় তাদের অনুমতি ছাড়া থাকতে পারো না; বরং তোমাদের জন্য রয়েছে সেইসব জায়গা, যেখানে মানুষজন থাকে না, যেমন: পোড়াবাড়ি, জনমানবশূন্য এলাকা প্রভৃতি। ১২৪

টিকাঃ
১২৩. মুসলিম: ৪১৫০, পূর্ণ হাদীসের জন্য চলতি অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য
১২৪. মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৯/২৯

📘 রুকইয়াহ > 📄 কোন সময় মানুষ আক্রান্ত হয়?

📄 কোন সময় মানুষ আক্রান্ত হয়?


কোন অবস্থায় মানুষের শরীরে জিন ঢুকতে পারে?
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খারাপ জিন সর্বাবস্থায় আপনার ওপর আক্রমণ করতে পারে না। শয়তানের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার—সবসময় সে মানুষকে বশ করতে পারে না। তবে কোনোভাবে আক্রান্ত হয়ে গেলে এরপর আপনার শরীরে ঢোকা খারাপ জিনের জন্য সহজ হয়ে যায়। ব্যাপারটা কোনো সুরক্ষিত স্থাপনায় প্রবেশের জন্য সুড়ঙ্গ নির্মাণের মতো।
খবিস জিন ৪ অবস্থায় মানুষের ওপর আসর করতে পারে—
১. খুব ভীত অবস্থায় থাকলে;
২. খুব রাগান্বিত অবস্থায় থাকলে;
৩. খুব উদাসীন অবস্থায় থাকলে;
৪. অশ্লীল কোনো গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় (যেমন: ব্যভিচার করা, পর্ণ ভিডিও বা স্থিরচিত্র দেখা ইত্যাদি)
এই অবস্থাগুলোর কোনো একটায় মানুষকে পেলে খবিস জিন তার ওপর ভর করতে পারে। আর এর পেছনে কারণ হচ্ছে, এই অবস্থাগুলোতে মানুষ তার রবের স্মরণ থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন –
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضُ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ
“যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিযুক্ত করে দিই। এরপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। আর তারাই মানুষকে সৎপথে চলতে বাধা দেয়; কিন্তু মানুষ মনে করে সে হিদায়াতের পথে আছে।” ১২৫
প্রথমবার মানুষের শরীরের ঢোকার কাজটা জিনের জন্য বেশ কঠিন। কিন্তু কেউ একবার জিন দ্বারা আক্রান্ত হলে, এরপর অন্যদের তুলনায় তার জাদু, জিন, বদনজর, ওয়াসওয়াসা বিবিধ সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
প্রাসঙ্গিক হওয়ায় যুক্তরাজ্যের একটা ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। একজন জাদুগ্রস্ত রোগীর ওপর রুকইয়াহ করলে জিন কথা বলে ওঠে। এক পর্যায়ে জিন জানায়, ৫২ দিন যাবৎ সে এই ব্যক্তির চারপাশে ঘুরছে তার শরীরে ঢোকার জন্য। এরপর একদিন তাকে খুব রাগান্বিত অবস্থায় পেয়েছে এবং এই সুযোগে তার ওপর আসর করেছে। তাই কেউ যদি সতর্ক থাকে এবং দুআ-কালাম পড়ে, আর অপরদিকে জিনকে যদি কোনো জাদুকর জোর করে পাঠায় তখন জিন বেশ ঝামেলার মধ্যে পড়ে যায়। এদিকেও বিপদ, ওদিকেও বিপদ।
এসব ক্ষতি থেকে বাঁচতে কর্তব্য হলো, প্রতিদিনের মাসনূন আমলগুলো আদায় করা এবং এই অধ্যায়ে নির্দেশিত পরামর্শ অনুসরণ করা। আর সর্বোপরি গাফেল না হওয়া, আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করা। তাহলে ইনশাআল্লাহ খারাপ জিনের আক্রমণ থেকে সহজেই বাঁচা যাবে।

রুকইয়াহ করলে জিন কি ক্ষতি করবে?
এ ব্যাপারে ইবনু তাইমিয়া রহ.-এর একটি লেখা হুবহু উদ্ধৃত করছি- ১২৬
'অনেক তদবীরকারী তাবীজ-কবচ করে বা এক জিন দিয়ে অন্য জিনকে হত্যা করে কিংবা বন্দি করে রাখে। কিন্তু এভাবে অন্য জিনকে হত্যা করা বা বন্দি করে রাখা বৈধ নয়। পরিণতিতে জিন তাকে হত্যা করতে পারে, অথবা তার অপরাধে তার স্ত্রী-সন্তান বা গৃহপালিত পশুপাখি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পক্ষান্তরে যারা সঠিকভাবে রুকইয়াহ করে অর্থাৎ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অনুমোদিত পন্থায় জিন তাড়াবে, জিন তার কোনো ক্ষতি করবে না। কারণ, সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুগত থেকে মাজলুমকে সহায়তা করছে।
শরীয়াহ কর্তৃক অনুমোদিত রুকইয়াহতে কোনো শিরক থাকে না, আর কারও ওপর জুলুমও করা হয় না। তাই জিন এখানে পাল্টা কোনো ক্ষতি করতে পারে না। কারণ, হয়তো জিন বুঝতে পারে যে, এটি সঠিক পদ্ধতি, কিংবা ক্ষতি করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। যদি অনেক শক্তিশালী জিন আসর করে আর রাক্কী দুর্বল হয়ে থাকেন তাহলে জিন রাক্কীর ক্ষতি করতে পারে। তাই এক্ষেত্রে রাকীকে আয়াতুল কুরসী, তিন কুল (সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস), সালাত ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে। রাক্কীর উচিত হবে গুনাহ থেকে দূরে থাকা আর এমন সব কাজ বেশি বেশি করা, যা ঈমানকে পাকাপোক্ত করে। এই কাজটি জিহাদের একটি উত্তম রূপ। আর রাক্কী হচ্ছেন আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামরত একজন। ১২৭ তাই তাকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন নিজের গুনাহের কারণে জিন তার ওপর জয়ী হতে না পারে।
তবে যদি পরিস্থিতি রাক্বীর সাধ্যের বাইরে হয় তাহলে তার উচিত হবে না, সাধ্যাতীত কাজের ভার নিয়ে নিজেকে ফিতনাতে নিক্ষেপ করা। কেননা ‘আল্লাহ কাউকে সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না’ ১২৮

টিকাঃ
১২৫. সূরা যুখরুফ, আয়াত ৩৬-৩৭
১২৬. রিসালাতুল জিন, পৃষ্ঠা: ৬৪-৬৫
১২৭. এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য, ইবনু তাইমিয়া রহ. এই কথাটি বলেছেন রুকইয়ার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য। এর মানে এই নয় যে, রুকইয়াহ করলেই কিতালের ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে এবং রাকী মুজাহিদ বলে অভিহিত হবেন।
১২৮. সূরা বাকারা: ২৮৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00