📄 জিন আছর করার ব্যাপারে ইসলামী আকীদা
জিনের অস্তিত্বের প্রমাণ কুরআনুল কারীমের পাতায় পাতায় বিদ্যমান। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ “আমার ইবাদাত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।” ১০৯
যেহেতু আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'আমি জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছি', অতএব জিনের অস্তিত্ব সত্য। কেউ যদি এটা অস্বীকার করে, তবে কুরআন অস্বীকার করার দরুন সে 'কাফির' সাব্যস্ত হবে। জিন, মারিদ, ইফরিত, শয়তান-এসব শব্দগুলো পুরো কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৯০ বার এসেছে। ২৯ নম্বর পারায় আস্ত একটি সূরা রয়েছে 'জিন' নামে। এছাড়া বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে হাদীসেও জিনের কথা এসেছে।
তবে কুরআনেই যেহেতু জিন সম্পর্কে এত কথা এসেছে, তাই আমরা নতুন করে আবার ইসলামের আলোকে জিনের অস্তিত্বের প্রমাণ নিয়ে আলোচনা করব না। বাকি রইল বস্তুবাদী নাস্তিকদের কথা। এ ব্যাপারে আমার মত হচ্ছে, যারা বিশ্বজগতের স্রষ্টার অস্তিত্বেই বিশ্বাসী না, তাদেরকে জিন বিশ্বাস করানোর পেছনে সময় ক্ষেপণ করা অনর্থক।
এই অনুচ্ছেদে আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, জিন মানুষের শরীরে ঢুকতে পারে কি না, তাঁরা আমাদের ক্ষতি করতে পারে কি না, কিংবা করে কি না-এসব বিষয়ে কুরআন, হাদীস এবং সালাফের মত অনুযায়ী বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদা ব্যাখ্যা করা।
জিনের আসর প্রসঙ্গে সহীহ আক্বীদার সার কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা চাইলে জিন মানুষের ক্ষতি করতে পারে, মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে, বিভিন্নভাবে কষ্ট দিতে পারে, অসুস্থ করে দিতে পারে, মানুষের শরীর দখল (possession) করতে পারে, এমনকি জিনের আসরে মানুষ সম্পূর্ণ পাগলও হয়ে যেতে পারে। আর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কোনো গ্রহণযোগ্য আলিমই এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেননি।
টিকাঃ
১০৯. সূরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬
📄 কুরআনুল কারীম থেকে প্রমাণ
এ বিষয়ে কুরআনুল কারীম থেকেও কিছু আয়াত উল্লেখ করা যায়-
১. প্রথম আয়াত:
فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ
“তাতে থাকবে আনত নয়না রমণীগণ, কোনো জিন বা মানব পূর্বে যাদের স্পর্শ করেনি।”
لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ কোনো জিন বা মানব পূর্বে তাদের স্পর্শ করেনি (সূরা আর রহমান, আয়াত ৫৬ এবং ৭৪)।
আলিমদের মতে এই আয়াতের দুটো অর্থ হতে পারে-
১. মানুষের জন্য নির্ধারিত নারীদেরকে তাদের ইতিপূর্বে কোনো মানুষ এবং জিনদের জন্য নির্ধারিত নারীদেরকে তাদের ইতিপূর্বে কোনো জিন স্পর্শ করেনি।
২. দুনিয়াতে যেমন মাঝেমাঝে মানব নারীদের ওপর জিন ভর করে, জান্নাতে এরূপ অঘটন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ১১০ এমন অনেকেই আছেন, যাদের বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা হচ্ছে, স্ত্রীর ওপর জিনের আসর। বিয়ের আগে থেকেই কোনোভাবে জিনের আসর ছিল, বিয়ের পর থেকে সমস্যা শুরু করেছে। আল্লাহ তাআলা সূরা আর-রহমানের এই আয়াতে জান্নাতীদের হুরের সুসংবাদ দিচ্ছেন, আর সাথে সাথে এ-ও জানিয়ে দিচ্ছেন, 'তাদের এরকম জিনের সমস্যা নেই।'
দ্বিতীয়ত: অনেক মেয়ের অভিযোগ থাকে, রাতে তাদের এরকম অনুভূতি হয় যে, কেউ 'খারাপ কিছু' করছে বা করার চেষ্টা করছে। এবং সকালে উঠলে শরীর ব্যথাও হয়ে থাকে। তাঁরা নিঃসন্দেহে পবিত্র, মুহসিনা! তাঁরা কখনো কারও সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়নি। তবে জিন তাদের স্পর্শ করেছে। ১১১
জান্নাতের হুররা এ থেকেও পবিত্র থাকবে। তাদের না কোনো মানুষ স্পর্শ করেছে, আর না কোনো জিন।
২. উলামায়ে কিরাম যে আয়াতটি জিন আসর করার অকাট্য দলিল হিসেবে পেশ করে থাকেন, তা হচ্ছে-
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
"যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামাতে এমনভাবে দণ্ডায়মান হবে, যেন শয়তান তাদের আসর করে পাগল বানিয়ে দিয়েছে। (তাদের এই অবস্থার কারণ) এই যে, তারা বলেছিল, ক্রয়-বিক্রয়ও তো সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে বৈধ করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” ১১২
এই আয়াত থেকে সুদের কারবারিদের দুরাবস্থার পাশাপাশি অন্তত আরও দুটি বিষয় বোঝা যায়-
এক. খারাপ জিন মানুষের ওপর আসর করতে পারে।
দুই. জিনের আসরের কারণে মানুষ অসুস্থ হতে পারে, এমনকি পাগলও হয়ে যেতে পারে। রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এক ব্যক্তি পাগল হয়ে গিয়েছিল, সব রকম চেষ্টা আর চিকিৎসাতেও সুস্থ হচ্ছিল না। তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। একজন সাহাবী রা. সূরা ফাতিহা পড়ে কয়েকদিন রুকইয়াহ করলে সে সুস্থ হয়ে যায়, পরে ওই সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে ঘটনা শোনান। তখন কুরআন দ্বারা ঝাড়ফুঁক করার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত সাহাবীর প্রশংসা করেন। ১১৩
এ বিষয়ে এখন আমরা কয়েকটি হাদীস দেখে নেব।
টিকাঃ
১১০. তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন: ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৮-২৫৯
১১১. সামনে এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
১১২. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫
১১৩. আবূ দাউদ: ৩৪২০
📄 রাসূল ﷺ -এর হাদীস থেকে প্রমাণ
১. প্রথম হাদীস:
عَنْ أَنَسِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ... فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِي مِنْ الْإِنْسَانِ مَجْرَى الدَّمِ
"আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় শয়তান মানুষের রগেরগে চলাচল করে।” ১১৪
আর শয়তানরা তো জিনদেরই গোত্রভুক্ত। ১১৫ তাহলে জিনদেরও মানুষের শরীরে প্রবেশের শক্তি থাকবে-এটাই স্বাভাবিক।
এই হাদীসটি উম্মুল মুমিনিন সাফিয়্যাহ রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে। ১১৬
২. দ্বিতীয় হাদীস:
এই হাদীসটি রয়েছে ইবনু মাজাহ শরীফের কিতাবুত তিব্বে-
عَنْ عُثْمَانَ بْنِ أَبِي الْعَاصِ قَالَ لَمَّا اسْتَعْمَلَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الطَّائِفِ جَعَلَ يَعْرِضُ لِي شَيْءٌ فِي صَلَاتِي حَتَّى مَا أَدْرِي مَا أُصَلِّي فَلَمَّا رَأَيْتُ ذَلِكَ رَحَلْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ ابْنُ أَبِي الْعَاصِ قُلْتُ نَعَمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا جَاءَ بِكَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ عَرَضَ لِي شَيْءٌ فِي صَلَوَاتِي حَتَّى مَا أَدْرِي مَا أُصَلِّي قَالَ ذَاكَ الشَّيْطَانُ ادْنُهُ فَدَنَوْتُ مِنْهُ فَجَلَسْتُ عَلَى صُدُورٍ قَدَمَيَّ قَالَ فَضَرَبَ صَدْرِي بِيَدِهِ وَتَفَلَ فِي فَمِي وَقَالَ اخْرُجْ عَدُوَّ اللَّهِ فَفَعَلَ ذَلِكَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ثُمَّ قَالَ الْحَقِّ بِعَمَلِكَ قَالَ فَقَالَ عُثْمَانُ فَلَعَمْرِي مَا أَحْسِبُهُ خَالَطَنِي بَعْدُ
"উসমান ইবনু আবিল আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তায়েফের যাকাত উসুলকারী নিযুক্ত করেছিলেন। সেই সময় নামাযের মধ্যে আমার কী যেন হতে লাগল, যার ফলে আমার এটাই মনে থাকত না যে, আমি কী নামায পড়ছি। এই দুরাবস্থা লক্ষ করে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাত করার জন্য রওয়ানা হলাম। তিনি আমাকে দেখে বললেন, আবুল আসের পুত্র নাকি? আমি বললাম, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এসেছ? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, নামাযের মধ্যে আমার কী যেন হচ্ছে, যার ফলে আমার এটাই মনে থাকে না যে, আমি কী নামায পড়ছি। তিনি বলেন, এটা শয়তান। আমার নিকট এসো। আমি তাঁর নিকট এসে হাঁটু গেড়ে বসলাম। তিনি নিজ হাতে আমার বুকে মৃদু আঘাত করলেন এবং আমার মুখে লালা দিয়ে বললেন, 'আল্লাহর শত্রু, বের হয়ে যা।' এটা তিনি তিনবার করলেন। এরপর তিনি বলেন, যাও, নিজের কাজে যোগ দাও। উসমান রা. বলেন, আমার জীবনের শপথ, এরপর থেকে শয়তান আমার অন্তরে আর তালগোল পাকাতে পারে নি।” ১১৭
৩. তৃতীয় হাদীস:
এই হাদীসটি কয়েকজন মুহাদ্দিস থেকে বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি বেশ দীর্ঘ। তাই আমরা শুধু প্রয়োজনীয় অংশটুকু উল্লেখ করছি-
عَنْ يَعْلَى بْنِ مُرَّةَ ، عَنْ أَبِيهِ قَالَ : سَافَرْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ فَرَأَيْتُ مِنْهُ شَيْئًا عَجَبًا ... وفيه ... وَأَتَتْهُ امْرَأَةٌ فَقَالَتْ : إِنَّ ابْنِي هَذَا بِهِ لَمَمٌ مُنْذُ سَبْعِ سِنِينَ يَأْخُذُهُ كُلَّ يَوْمٍ مَرَّتَيْنِ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ : " ادْنِيهِ " فَأَدْنَتْهُ مِنْهُ فَتَفَلَ فِي فِيهِ وَقَالَ : " اخْرُجْ عَدُوَّ اللَّهِ أَنَا رَسُولُ اللَّهِ " ، ثُمَّ قَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ : " إِذَا رَجَعْنَا فَلَمَّا رَجَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ اسْتَقْبَلَتْهُ فَأَعْلِمِينَا مَا صَنَعَ وَمَعَهَا كَبْشَانِ وَأَقِطْ وَسَمْنٌ ، فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ : خُذْ هَذَا الْكَبْسَ فَاتَّخِذْ مِنْهُ مَا أَرَدْتَ " فَقَالَتْ : وَالَّذِي أَكْرَمَكَ مَا رَأَيْنَا بِهِ شَيْئًا مُنْذُ فَارَقْتَنَا ... إلخ
“ইয়ালা ইবনু মুররা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে একবার সফর করেছিলাম, যাতে অনেকগুলো আশ্চর্য বিষয় দেখেছি। তাঁর মাঝে একটি হচ্ছে... একজন মহিলা এলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। সে বলল, আমার এই ছেলে সাত বছর যাবৎ আক্রান্ত। তাকে প্রতিদিন দুইবার জিন ধরে (অন্য বর্ণনায় আছে, আমি জানি না তাকে প্রতিদিন কতবার জিনে ধরে)। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো। তাকে আনা হলো। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখে থুতু দিলেন এবং বললেন, “اُخْرُجُ عَدُوَّ اللَّهِ أَنَا رَسُولُ اللَّهِ.” (বের হয়ে যা আল্লাহর শত্রু। আমি আল্লাহর রাসূল। এরপর মহিলাকে বললেন, আমরা ফিরে আসার সময় জানাবে, তার কী অবস্থা হয়েছে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফর থেকে ফিরছিলেন তখন মহিলাটি দেখা করল। সে দুটি দুম্বা, কিছু চর্বি আর পনির রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপস্থাপন করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি এই দুম্বাটি ধরো এবং ওখান হতে যা ইচ্ছা নাও। এরপর মহিলাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, সেই আল্লাহর কসম, যিনি আপনাকে সম্মানিত করেছেন, আপনি চলে যাওয়ার পর আর কোনো সমস্যা দেখি নি।” ১১৮
৪. চতুর্থ হাদীস:
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِذَا تَغَوَّلَتْ . بِكُمُ الْغِيلَانُ فَنَادُوا بِالْأَذَانِ
“জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি গিলান (জাদুকর জিন) তোমাদের পথ ভুলিয়ে দেয়, তবে আযান দিয়ো।” ১১৯
কিছু জিন জাদু করার মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, কিছু কিছু জিন মানুষকে পথ ভুলিয়ে দেয়। সুতরাং অনেক সময় যে গল্প শোনা যায়, গভীর রাতে গাড়ি চালাতে গিয়ে রাস্তার মধ্যে জিন দেখেছে, রাস্তার মধ্যে লাশ পড়ে থাকতে দেখেছে, কিংবা অন্য কোন ভূতুড়ে ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে পথ হারিয়ে ফেলেছে বা একসিডেন্ট করেছে। এগুলো জিনদের দুষ্টুমি।
৫. পঞ্চম হাদীস:
أَخْبَرَنِي أَبُو السَّائِبِ مَوْلَى هِشَامِ بْنِ زُهْرَةَ أَنَّهُ دَخَلَ عَلَى أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ فِي بَيْتِهِ قَالَ فَوَجَدْتُهُ يُصَلِّي فَجَلَسْتُ أَنْتَظِرُهُ حَتَّى يَقْضِيَ صَلَاتَهُ فَسَمِعْتُ تَحْرِيكًا فِي عَرَاجِينَ فِي نَاحِيَةِ الْبَيْتِ فَالْتَفَتُ فَإِذَا حَيَّةٌ فَوَثَبْتُ لِأَقْتُلَهَا فَأَشَارَ إِلَيَّ أَنْ اجْلِسُ فَجَلَسْتُ فَلَمَّا انْصَرَفَ أَشَارَ إِلَى بَيْتٍ فِي الدَّارِ فَقَالَ أَتَرَى هَذَا الْبَيْتَ فَقُلْتُ نَعَمْ قَالَ كَانَ فِيهِ فَتَّى مِنَّا حَدِيثُ عَهْدٍ بِعُرْسٍ قَالَ فَخَرَجْنَا مَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْخَنْدَقِ فَكَانَ ذَلِكَ الْفَتَى يَسْتَأْذِنُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِأَنْصَافِ النَّهَارِ فَيَرْجِعُ إِلَى أَهْلِهِ فَاسْتَأْذَنَهُ يَوْمًا فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خُذْ عَلَيْكَ سِلَاحَكَ فَإِنِّي أَخْشَى عَلَيْكَ قُرَيْظَةَ. فَأَخَذَ الرَّجُلُ سِلَاحَهُ ثُمَّ رَجَعَ فَإِذَا امْرَأَتُهُ بَيْنَ الْبَابَيْنِ قَائِمَةً فَأَهْوَى إِلَيْهَا الرُّمْحَ لِيَطْعُنَهَا بِهِ وَأَصَابَتْهُ غَيْرَةٌ فَقَالَتْ لَهُ اكْفُفْ عَلَيْكَ رُمْحَكَ وَادْخُلْ الْبَيْتَ حَتَّى تَنْظُرَ مَا الَّذِي أَخْرَجَنِي فَدَخَلَ فَإِذَا بِحَيَّةٍ عَظِيمَةٍ مُنْطَوِيَةٍ عَلَى الْفِرَاشِ فَأَهْوَى إِلَيْهَا بِالرُّمْحِ فَانْتَظَمَهَا بِهِ ثُمَّ خَرَجَ فَرَكَزَهُ فِي الدَّارِ فَاضْطَرَبَتْ عَلَيْهِ فَمَا يُدْرَى أَيُّهُمَا كَانَ أَسْرَعَ مَوْتًا الْحَيَّةُ أَمْ الْفَتَى قَالَ فَجِئْنَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرْنَا ذَلِكَ لَهُ وَقُلْنَا ادْعُ اللَّهَ يُحْيِيهِ لَنَا فَقَالَ اسْتَغْفِرُوا لِصَاحِبِكُمْ ثُمَّ قَالَ إِنَّ بِالْمَدِينَةِ جِنَّا قَدْ أَسْلَمُوا فَإِذَا رَأَيْتُمْ مِنْهُمْ شَيْئًا فَآذِنُوهُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَإِنْ بَدَا لَكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ فَاقْتُلُوهُ فَإِنَّمَا هُوَ شَيْطَانٌ
"হিশাম ইবনু জুহরার মুক্ত গোলাম আবূ সায়িব রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি একদিন আবূ সাঈদ খুদরী রা.-এর ঘরে ঢুকলেন। তিনি বলেন, আমি তাকে নামাযরত অবস্থায় পেলাম এবং নামায শেষ করা পর্যন্ত তার অপেক্ষায় বসে থাকলাম। এমতাবস্থায় ঘরের কোণে রেখে দেওয়া খেজুর গাছের ডালের স্তুপের মাঝে কিছু নড়াচড়ার শব্দ শুনলাম। আমরা দেখতে পেলাম যে, সেটা একটা সাপ। তাই আমি সেটাকে হত্যা করতে এগিয়ে গেলাম। তখন তিনি (নামাযরত অবস্থাতেই) ইঙ্গিত করলেন যে, বসে থাকো। নামায সমাপ্ত করে বাড়ির অন্য একটি ঘরের দিকে ইশারা করে বললেন, এ ঘরটি কি তুমি দেখতে পাচ্ছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, সেখানে আমাদের এক নববিবাহিত যুবক থাকত।
তিনি বলতে থাকলেন, এক সময় আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে খন্দক যুদ্ধে বের হলাম। ওই যুবক দুপুরবেলায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চেয়ে নিত এবং তার পরিবারের নিকট ফিরে যেত। (যথারীতি) একদিন সে অনুমতি চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার যুদ্ধাস্ত্র সঙ্গে নিয়ে যাও। কারণ, আমি তোমার উপরে বানু কুরাইজার (আক্রমণের) আশঙ্কা করছি। যুবকটি তার অস্ত্র নিয়ে বাড়িতে ফিরল। এরপর সেখানে সে তার (সদ্য বিবাহিতা) স্ত্রীকে দু দরজার মাঝে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখতে পেয়ে তার আত্মমর্যাদাবোধ জেগে উঠল এবং এ কারণে সে তার স্ত্রীকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে তার দিকে বল্লম উঁচিয়ে ধরল। তখন তার স্ত্রী বলল, আপনার বল্লমটি নিজের নিকট সংযত রাখুন এবং ঘরে প্রবেশ করে দেখুন, কেন আমাকে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে।
সে ঘরে ঢুকেই দেখল, একটি বিশাল সাপ বিছানার ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে। সে সাপটির দিকে বল্লম তাক করে সেটা দিয়ে সাপকে গেঁথে ফেলল। এরপর ঘর থেকে বের হয়ে তা (বল্লমটি) বাড়ির মধ্যেই পুঁতে রাখল। সে সময় সাপটি নড়ে-চড়ে তাকে ছোবল মারল এবং (ক্ষণিকের মধ্যেই সাপ এবং যুবক উভয়ই মরে গেল।) সাপ এবং যুবক-এ দুজনের কে অধিক দ্রুত মৃত্যুবরণ করেছিল, তা জানা গেল না।
বর্ণনাকারী আবূ সাঈদ খুদরী রা. বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে ঘটনার বিবরণ দিয়ে বললাম, আপনি আল্লাহর নিকট দুআ করুন, যেন আমাদের যুবকটি বেঁচে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করো। (অর্থাৎ সে আসলেই মরে গেছে) তারপর বললেন, মদীনায় কিছু জিন রয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে। যদি তাদের কাউকে তোমরা দেখো, (সাপ বা অন্য কোনো রূপে) তবে তাকে তিন দিন সাবধান করে দেবে। এরপরও তোমরা তাকে দেখতে পেলে হত্যা করবে। কারণ, সেটা শয়তান।” ১২০
অর্থাৎ ভালো জিন বা মুসলিম জিন হলে তিনদিন বলার পর আর থাকবে না। আর যদি থাকে তাহলে বুঝতে হবে, সেটা শয়তান। তখন সেটাকে হত্যা করলে কোনো সমস্যা নেই।
টিকাঃ
১১৪. মুসলিম: ২১৭৪
১১৫. "যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সেজদা করো তখন সবাই সেজদা করল ইবলীস ব্যতীত। সে ছিল জিনদের একজন।” (সূরা কাহফ : ৫০)
১১৬. বুখারী: ১৯৩০
১১৭. ইবনু মাজাহ: ৩৫৪৮
১১৮. মুসতাদরাকে হাকিম: ৪২৯০, মুসনাদে আহমাদ। ইমাম হাকিম রহ. বলেন, এর সনদ ইমাম বুখারীর শর্ত অনুযায়ী সহীহ।
১১৯. মুসনাদে আহমাদ: ১৩৮৬৫
১২০. মুসলিম: ৪১৫০
📄 সালাফে সালেহীনের কিছু ঘটনা
সালাফে সালেহীনের থেকে জিনের চিকিৎসা-বিষয়ক অনেক ঘটনা বর্ণিত আছে।
একজন মৃগী রোগীকে আক্রান্ত অবস্থায় দেখে ইবনু মাসউদ রা. তার কানের কাছে গিয়ে اَفَحَسِبْتُمْ اَنَّمَا خَلَقْنٰكُمْ عَبَثًا-সূরা মুমিনুনের ১১৫ নম্বর আয়াত থেকে সেই সূরার শেষ পর্যন্ত পড়েন। ফলে সে সাথে সাথে সুস্থ হয়ে যায়। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনু মাসউদ রা.-কে ডেকে বললেন- তুমি ওর কানের কাছে গিয়ে কী পড়লে? ইবনু মাসউদ রা. আয়াতটি শোনালেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোনো যোগ্য ব্যাক্তি যদি পাহাড়ের ওপরে এটা (সূরা মুমিনুনের এই আয়াত/ আয়াতগুলো) পড়ে তাহলে পাহাড়ও সরে যাবে। ১২১
এবার ইমাম সুয়ূতী রহ.-এর লাকতুল মারজান ফী আহকামিল জান থেকে কয়েকটি ঘটনা সংক্ষেপে বলা যায়।
এক. শিয়াদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি হজ্জ করতে গিয়েছিলেন। তিনি যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ আমল করতে যাচ্ছিলেন তখনই মৃগী রোগে আক্রান্ত হচ্ছিলেন (আলিমগণের মতে, মৃগীরোগ জিনের আসরের কারণে হয়)। হুসাইন বিন আব্দুর রহমান রহ. মিনায় ওই লোকটিকে দেখতে পেয়ে জিনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'তুমি যদি ইহুদি হও তবে মুসা আ.-এর দোহাই, যদি খৃষ্টান হও তবে ঈসা আ.-এর দোহাই, আর মুসলমান হলে তোমাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোহাই দিয়ে বলছি, তুমি চলে যাও।
তখন জিন কথা বলে উঠল, আমি ইহুদিও না, খ্রিষ্টানও না, বরং মুসলমান। আমি এই হতভাগাকে দেখেছি, সে আবু বকর রা. এবং উমর রা.-কে গালিগালাজ করে। এজন্য আমি তাকে হজ্জ করতে দিই নি।
দুই. মুতাযিলা ফিরকার এক ব্যক্তিকে জিনে ধরেছিল। সকলেই ভীড় করে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। সাঈদ ইবনু ইয়াহইয়া রহ. তার কাছে গিয়ে বললেন, 'তুমি এর ওপর কেন আক্রমণ করেছ? আল্লাহ কি তোমাকে এই অধিকার দিয়েছে? না তুমিই বাড়াবাড়ি করছ?' তখন লোকটার মুখ দিয়ে জিন বলে উঠল, 'আপনি আমাকে ছেড়ে দিন। আমি একে খতম করে ফেলব। সে কিনা বলছে, কুরআন মাখলুক।' (এটা মুতাযিলা ফেরকার একটা আক্বীদা)
তিন. এবারের ঘটনাটি ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর যুগের। তৎকালীন বাদশাহর মেয়েকে জিন আসর করেছিল। বাদশাহর এক মন্ত্রী ইমাম আহমাদ রহ.-এর কাছে ছুটে এলেন। ইমাম আহমাদ রহ. একটি জুতা বের করে ওযু করলেন। এরপর বললেন, জিনকে গিয়ে বলো, 'তুমি কি এই মেয়েকে ছেড়ে যাবে? নাকি ইমাম আহমাদের হাতে জুতার বাড়ি খাবে?' মন্ত্রী গিয়ে কথাগুলো জিনকে বলল। জিন বলল, 'আমি চলে যাব। ইমাম আহমাদ যদি বাগদাদ থেকে চলে যেতে বলেন তবে বাগদাদ থেকেও চলে যাব। ইমাম আহমাদ আল্লাহর অনুগত বান্দা। যে আল্লাহর অনুগত হয়, সব সৃষ্টি তার অনুগত হয়ে যায়।' এরপর জিন চলে গেল।
কিন্তু ইমাম আহমাদ রহ.-এর ইন্তিকালের পর সেই জিন আবার এসে বাদশাহর মেয়েকে আসর করল। এবার বাদশাহ এক ব্যক্তিকে ইমাম আহমাদ রহ.-এর ছাত্র আবূ বাকর মারওয়াবী রহ.-এর কাছে পাঠালেন। উনি একটা জুতা নিয়ে মেয়েটার কাছে আসলেন। তখন মেয়েটির মুখ দিয়ে জিন কথা বলে উঠল, এবার আর আমি যাচ্ছি না। ইমাম আহমাদ আল্লাহর আনুগত বান্দা ছিলেন, তাই তার কথা শুনে চলে গিয়েছিলাম। তোমাদের কথা তো শুনব না।
চার. ইবনু তাইমিয়া রহ. এক মেয়ে রোগীর ওপর সূরা মুমিনুনের ওই (১১৫নং) আয়াত পড়েন তখন জিন কথা বলে ওঠে।
ইবনু তাইমিয়া রহ. জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ওকে ধরেছ কেন? জিন বলল, আমি ওকে পছন্দ করি। ইবনু তাইমিয়া রহ. বললেন, সে তো তোমাকে পছন্দ করে না। জিন বলল, আমি ওকে নিয়ে হজ্জে যাব। ইবনু তাইমিয়া রহ. বললেন, সে তো তোমার সাথে হজে যেতে চায় না! তুমি কেন কষ্ট দিচ্ছ? জিনটা একরোখা ছিল। ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহ. তাকে আচ্ছামতো পিটুনি দিলেন। তখন জিন বলল, আপনি বলছেন তো? আপনার কথা মেনে আমি চলে যাচ্ছি! ইবনু তাইমিয়া রহ. বললেন, থাম থাম। আমার কথা নয়; বরং আল্লাহ এবং রাসূলের কথা মেনে চলে যা। এবার জিন চলে গেল। সে আর কখনো আসে নি।
টিকাঃ
১২১. মাজমাউয যাওয়ায়িদ: ১৩৩৬৩। কোনো কোনো মুহাদ্দিস এর সনদ হাসান বলেছেন, আর কেউ কেউ যঈফ বলেছেন。