📄 বদনজর-সংক্রান্ত কিছু ঘটনা
বদনজর সংক্রান্ত ঘটনার অভাব নেই। এতো ঘটনার মধ্যে সেরাগুলো বাছাই করাও দুষ্কর। তবুও আমরা বদনজরের ভয়াবহতা এবং এর জন্য রুকইয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সংক্ষেপে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি-
১. বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়া, কান্নাকাটি এবং অন্যান্য
আমাদের রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপের একজন এডমিন নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন। ঘটনাটি তার বয়ানেই শোনা যাক।
'কিছুদিন আগে পরিবার নিয়ে এক জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার সময়ই শঙ্কায় ছিলাম, বাচ্চার ওপর আবার কারও নজর লেগে যায় কিনা। এই আশঙ্কা থেকে বারবার দুআ পড়ে বাচ্চাকে ফুঁ দিই। যথারীতি সেখানে গিয়ে বাচ্চার দৌড়াদৌড়ি, আর আধো-আধো কথাবার্তায় সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। আমি মনে মনে যিকির-আযকার করতে লাগলাম। তার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় ক্লান্তও হয়ে গেলাম।
সেদিন বাসায় ফিরে তার আর খাওয়ার রুচি ছিল না। তবুও বাচ্চার মা জোর করে কিছু খাইয়ে দেয়। রাতে ঘুমের মধ্যে বাচ্চার অস্থিরতা দেখে আমি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ি। ফজরের পর বাচ্চা বুকের ওপর শুয়ে দুষ্টুমি করতে করতে হঠাৎ বমি করে দেয়। দেখে বুঝলাম, রাতের খাবার কিছুই হজম হয়নি। সেদিন অফিসে যাওয়ার পর বাসা থেকে খবর এলো, বাচ্চার পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা করছে। তখন আমি মোটামুটি নিশ্চিত হলাম, কারও নজর লেগেছে। চিকিৎসা করা দরকার।
যেহেতু কার নজর লেগেছে—জানি না, তাই আমি বদনজরের রুকইয়ার দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসরণ করলাম। মাথায় হাত দিয়ে দুআ পড়লাম, তারপর গায়ে ফুঁ দিলাম। কিন্তু বিশেষ কোনো উন্নতি চোখে পড়ল না। তার পরের দিন সকালে হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা, আমাদের কারও নজর লেগেছে কিনা—সেটা দেখা যাক। বাচ্চার গোসলের আগে আমি ওযু করলাম, বাচ্চার মা'ও করল। তারপর সেই পানি বাচ্চার গায়ে ঢালা হলো। এরপর একঘণ্টাও পার হয়নি। বাচ্চার পেটে মাসাস উঠল। টয়লেটে গেল। টয়লেটে সে কান্নাকাটি করলেও পায়খানা শেষে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বের হলো। আল্লাহ তাঁর কুদরত দেখালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস আবারও সত্য প্রমাণিত হলো। আলহামদুলিল্লাহ, বাচ্চা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ, স্বাভাবিক।'
আমার মন্তব্য হচ্ছে, এখানে বাবা-মা বাচ্চার ব্যাপারে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন, যেটা উচিত হয়নি। বেড়াতে যাওয়ার আগে-পরে দুআ করা হয়েছে। ব্যস, বাকিটুকু আল্লাহর ওপর ভরসা করে ছেড়ে দাও।
২. এই ঘটনা মুফতী জুনায়েদ সাহেবের একজন সহকর্মীর। উনি মুম্বাইয়ের এক মাদরাসার শিক্ষক। ওই মাদরাসার একজন ক্বারী সাহেবের তিন বছর যাবৎ সর্দি কাশির সমস্যা। সমস্যা তো খুব বড় কিছু না। তবুও সেটা অনেক চিকিৎসার পরও ভালো হচ্ছিল না। মুফতী সাহেব এ ব্যাপারে জানতে পেরে বললেন, ভাই, রুকইয়াহ শোনেন, গোসল করেন, পাশাপাশি ওষুধ খান। ক্বারী সাহেব বললেন, বহুদিন ধরে ওষুধ খেয়ে বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিয়েছি ভাই। উনি বললেন, এবার রুকইয়াহ করেন আর ওষুধ খান। ক্বারী সাহেব মাত্র একদিন রুকইয়াহ শুনলেন, রুকইয়ার গোসল করলেন, এরপর ওষুধ খেলেন। আল্লাহর রহমতে তিন বছরের কাশি একদিনে ভালো হয়ে গেল।
আরেকটা ঘটনা এরকম-একজনের কদিন পরপর জ্বর আসত, তার বোন এ ব্যাপারে জানালে আমি তাকে বদনজরের রুকইয়াহ করতে বলি, অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। এরপর ৭ দিনের ডিটক্স করলে আলহামদুলিল্লাহ সমস্যা দূর হয়ে যায়।
আমার নিজের স্বাভাবিক ঘটনা হচ্ছে, যখন অকারণে সারাদিন ক্লান্তি ঘিরে রাখে, সব কিছুতে অরুচি লাগে কিংবা মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে; অথবা যদি দেখি সাধারণ কোন অসুখ হয়েছে, কিন্তু ওষুধ খেয়েও তেমন উন্নতি হচ্ছে না তখন বদনজরের রুকইয়াহ করলে আল্লাহর রহমতে অনেকটাই ভালো বোধ করি।
৩. সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড করার পর কয়েকটি দুর্ঘটনার কথা কানে আসলেও সেগুলো বদনজরের কারণে হয়েছে এমনটা পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছিল না। সেদিন এক ভাইয়ের ঘটনা দেখার পর নিশ্চিত হলাম। ঘটনা তার মুখেই শুনি-
"সোশ্যাল মিডিয়াতে বাচ্চাদের ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা ঠিক না জানতাম। মনের খচখচানি উপেক্ষা করে তবুও আজ ছেলের একটি ভিডিও ফেসবুকে দিয়েছিলাম। ফলাফল পেলাম হাতেনাতে। সন্ধ্যা পর ছেলে অস্বাভাবিক আচরণ এবং চিৎকার করে কান্না শুরু করেছে। আমরা কোন কারণ খুজে পাচ্ছিলাম না। বিকেলেও হাসিখুশি ছিল; খাওয়া, ঘুম, টয়লেট সবকিছু স্বাভাবিক থাকার পরেও এই অবস্থার কি কারণ থাকতে পারে? কোনোকিছুতে কামড় দেয়নি, কোন ব্যথা পায় নি, ডায়পারও ঠিক আছে, তাহলে? একটু চিন্তা করতেই যা বোঝার বুঝতে ফেললাম। সাথে সাথে ফেসবুক থেকে ভিডিওটা ডিলিট করে দিলাম। তারপর সুরা ফালাক্ব ও নাস দিয়ে তাৎক্ষনিক রুকইয়াহ করে ফেললাম। এক মিনিটও হয়নি, ছেলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আলহামদুলিল্লাহ। এই ঘটনা থেকে আর কেউ শিক্ষা নিন বা না নিন, আমি যথেষ্ঠ শিক্ষা পেয়েছি।"
এরপর খোজ নিয়ে অন্তত সাত-আটজনকে পেয়েছি, যারা অনুরূপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন।
প্রথম ঘটনার কিছুদিন পরেই রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি গ্রুপে এক বোন সাহায্য চাইলেন যে, তিনি আগে বিভিন্ন পদের খানা রান্না করে সেসবের ছবি ফেসবুকে শেয়ার করতেন। বর্তমানে তিনি কিছুই ঠিকমত রান্না করতে পারেন না। এমনকি সামান্য ভাত অথবা ডিম রাঁধতে গেলেও নষ্ট করে ফেলেন।
তাকে পরামর্শ দিলাম যেন ফেসবুক থেকে সব ছবি ডিলিট করে দেন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে শো-অফের ব্যাপারে সতর্ক থাকেন। পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়ে যেন বদনজরের রুকইয়াহ করেন।
৪. শাইখ আবদুল আযীয বিন বায রহ. একজন লোকের কথা বলেছিলেন। সে থাকত বর্তমান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কাছেই একটা গ্রামে। একদিন গ্রামের অন্য একজনের ভেড়ার পালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভেড়াগুলোর ওপর তার বদনজর পড়ল, আর তাতেই ভেড়াগুলো সব মারা গেল। যখন ভেড়াগুলোর মালিক এসে দেখল, তার ভেড়াগুলো সব মরা, তার পুত্রকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, এর পাশ দিয়ে কে গেছে? ছেলেটা উত্তরে বলল অমুক এবং অমুকের পুত্র ছাড়া আর কেউ এদিক দিয়ে যায়নি। ভেড়ার মালিক তার কাছে গিয়ে দেখল, লোকটা তার নিজের বাড়ির ছাদে বসে আছে। সে ডেকে বলল, হে অমুক, তুমি কি আমার ভেড়াগুলোর পাশ দিয়ে গিয়েছ আর নজর দিয়েছ? এখন হয় তুমি আমাকে ভেড়ার দাম দাও, অথবা তোমার বাড়ি দাও। বাড়ির মালিক লোকটা বলল, আমি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। যেই না লোকটা নেমে আসল, অমনি বাড়িটা ধ্বসে পড়ে গেল। ১০৮
আমরা আল্লাহর পরিপূর্ণ কল্যাণময় বাক্যাবলীর দ্বারা প্রতিটি শয়তান, প্রাণনাশকারী বিষাক্ত জীব এবং অনিষ্টকারী বদনজর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
টিকাঃ
১০৮. The Jinn and Human Sickness page-267