📄 বদনজরের চিকিৎসা
জিন বা জাদুর মতো নজরের চিকিৎসায় বিশেষ কোনো ঝামেলা নাই। এটা বেশ সহজ এবং নিজে নিজেই করা যায়, আর সুস্থ হতেও আলহামদুলিল্লাহ বেশি দিন লাগে না। এবার তাহলে বদনজরের চিকিৎসা জেনে নেওয়া যাক।
প্রথম পদ্ধতি:
যদি জানা যায়, কার নজর লেগেছে তাহলে সাহল ইবনু হুনাইফ রা.-এর হাদীস অনুসরণ করলেই যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ যার নজর লেগেছে তাকে ওযু করতে হবে এবং ওযুর পানি একটা পাত্রে জমা করতে হবে, এরপর পানিটুকু আক্রান্ত ব্যাক্তির গায়ে ঢেলে দিতে হবে। তাহলেই নজর কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ।
এই পদ্ধতি সাধারণত একবার অনুসরণ করলেই বদনজরের প্রভাব দূর হয়ে যায়। তবে প্রয়োজনে ২-৩ দিন করা যেতে পারে। আর লক্ষ কবার বিষয় হচ্ছে, অনেকের ক্ষেত্রে এই ওযুর পানি গায়ে ঢালার পর প্রচণ্ড পায়খানাবা প্রস্রাবের বেগ আসে, সেটা হয়ে গেলে এরপর সুস্থ হয়ে যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, কুলির পানিও কি জমা করতে হবে?
উত্তর হচ্ছে, যদিও এক বর্ণনায় কুলির পানির কথাও রয়েছে, তবে না নিলেও সমস্যা নেই। সাধারণত এক জনের হাত-মুখ ধোয়া পানি নিয়ে অপরজন হাত-মুখ ধুয়ে ফেললেই বদনজর নষ্ট হয়ে যায়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যদি নিজের নজর নিজেরই লাগে?
উত্তর হলো, তাহলে নিজেই ওযু করতে হবে এবং পানিগুলো একটা পাত্রে জমা করতে হবে, এরপর সেটা নিজের গায়ে ঢালতে হবে। এছাড়া নিচে বলা চতুর্থ পদ্ধতি অনুসরণ করলেও ইনশাআল্লাহ নিজের বদনজর দূর হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি:
রোগীর মাথায় হাত রেখে নিম্নলিখিত দুআ এবং সূরাগুলো পড়বেন। মাঝেমাঝে রোগীর গায়ে ফুঁ দেবেন, এভাবে কয়েকবার করবেন। নিজের সমস্যা থাকলে পড়ার পর হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে পুরা শরীরে হাত বুলিয়ে নেবেন।
১. أُعِيْذُكُمْ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উচ্চারণ: উ'ইযুকুম বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মাতি মিন কুল্লি শাইত-নিন- ওয়াহা-ম্মাহ। ওয়ামিন কুল্লি আঈ'নিন লা-ম্মাহ। ১০৩
২. بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ ، اللَّهُ يَشْفِيكَ ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
উচ্চারণ: বিসমিল্লা-হি আরকিক। মিন কুল্লি শাইয়িই ইউ'যিক। মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও 'আইনি হাসিদ। আল্লা-হু ইয়াশফিক। বিসমিল্লা-হি আরকিক। ১০৪
৩. بِاسْمِ اللَّهِ يُبْرِيكَ ، وَمِنْ كُلِّ دَاءٍ يَشْفِيكَ ، وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ ، وَشَرِّ كُلِّ ذِي عَيْنٍ
উচ্চারণ: বিসমিল্লা-হি ইউবরিক। ওয়ামিন কুল্লি দা-ইন ইয়াশফিক। ওয়ামিন শাররি হাসিদিন ইযা- হাসাদ। ওয়া শাররি কুল্লি যি 'আইন। ১০৫
৪. رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ اِشْفِ وَأَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
উচ্চারণ: রাব্বান না-স আযহিবিল বা'স। ইশফি ওয়াআনতাশ শা-ফি। লা-শিফাআ ইল্লা- শিফাউকা, শিফাআন লা-ইউগা-দিরু সাকামা-। ১০৬
৫. এরপর সূরা ফাতিহা এবং সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস ৩ বার করে পড়বেন। চাইলে সূরা ফালাক, নাস কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। ১০৭
৬. আবশ্যক নয়, তবে চাইলে এর সাথে আরও কিছু আয়াত পড়তে পারেন, যেমন:
১. أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ فَقَدْ آتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَآتَيْنَهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا ﴿النساء ۵۴﴾
২. وَقَالَ يُبَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ وَمَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ ﴿يوسف ۶۷﴾
৩. وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ إِنْ تَرَنِ أَنَا أَقَلَّ مِنْكَ مَالًا وَوَلَدًا ﴿الكهف ٣٩﴾
৪. الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمُوتٍ طِبَاقًا مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفُوتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِنْ فُطُورٍ ﴿٣﴾ ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنْقَلِبُ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ ﴿الملك ﴾
৫. وَإِنْ يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَ يَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ ﴿۵۱﴾ وَمَا هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِينَ ﴿القلم ۵۲﴾
সমস্যা বেশি হলে উল্লিখিত পদ্ধতিতে রুকইয়াহ করা শেষে এগুলো আরেকবার পড়ে পানিতে ফুঁ দেবেন। এই পানি সকাল-বিকালে খাবেন এবং গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করবেন। সমস্যা ভালো হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন এই দুটি কাজ করবেন। ইনশাআল্লাহ কিছুদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যাবেন।
আপনি বদনজর আক্রান্ত কারও কারও ওপর রুকইয়াহ করতে চাইলে এই পদ্ধতিটা অনুসরণ করতে পারেন। অনুরূপভাবে ছোট বাচ্চাদের বিবিধ সমস্যা বা রোগবালাইয়ের জন্য রুকইয়াহ করলেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়।
তৃতীয় পদ্ধতি:
যদি কোনো গাছ, খামার, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অথবা বাড়িতে নজর লাগে তাহলে প্রথমে এগুলোর মালিক নিজের জন্য বদনজরের রুকইয়াহ করবেন। আর এসব সম্পত্তির জন্য রুকইয়াহ করতে চাইলে ওপরে বলা দুআ - কালামগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দেবেন, এরপর ওই পানিটুকু গাছে, ঘরে অথবা দোকানে ছিটিয়ে দেবেন। গৃহপালিত পশুপাখির ওপর নজর লাগলে তাদের মাথায় হাত রেখে এসব পড়বেন, কিংবা কোনো খাদ্যের ওপর এসব পড়ে ফুঁ দিয়ে খাইয়ে দেবেন।
তাহলে বদনজর দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। প্রয়োজনে এভাবে পরপর কয়েকদিন রুকইয়াহ করবেন।
চতুর্থ পদ্ধতি:
যদি না জানা যায় আপনার ওপর কার নজর লেগেছে, অথবা সমস্যা যদি দীর্ঘদিনের হয়, কিংবা যদি অনেকজনের নজর লাগে তাহলে এই চতুর্থ পদ্ধতিটা অনুসরণ করা উচিত।
রুকইয়ার নিয়ম হচ্ছে—
১. সমস্যা ভালো হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন রুকইয়াহ শারইয়্যাহর আয়াতগুলো তিলাওয়াত করুন অথবা তিলাওয়াত শুনুন।
২. সম্ভব হলে প্রতিদিন আর নইলে অন্তত একদিন পরপর রুকইয়ার গোসল করবেন।
অডিও প্রসঙ্গে:
তিলাওয়াতের বিকল্প হিসেবে অডিও শুনলে প্রতিদিন অন্তত ৪৫ মিনিট অথবা এর বেশি সময় রুকইয়াহ শোনা উচিত। এ ক্ষেত্রে বদনজর 'Evil Eye' অথবা 'Eye Hasad' রুকইয়াহটি শুনুন। শাইখ লুহাইদানের রুকইয়াও শুনতে পারেন। অথবা নিজে নজরের রুকইয়ার আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে রেকর্ড করুন এবং সেটা প্রতিদিন শুনুন। জিনের বদনজরের সমস্যা প্রকট হলে এর সাথে অতিরিক্ত "সূরা ইয়াসীন, সফফাত, দুখান, জিন" এর রুকইয়াহ শুনুন।
রুকইয়ার গোসল:
এক বালতি পানি নিন, তারপর ওই পানিতে দুই হাত ডুবিয়ে পড়ুন— কোনো দরুদ শরীফ ৭ বার, ফাতিহা ১ বার, আয়াতুল কুরসী ৭ বার, সূরা কাফিরুন, ইখলাস, ফালাক, নাস প্রত্যেকটা ৭ বার, শেষে আবার দরুদ শরীফ ৭ বার'। এসব পড়ার পর হাত উঠাবেন এবং এই পানি দিয়ে গোসল করবেন।
আর যদি সময় কম থাকে তাহলে ৭ বারের জায়গায় ৩ বার পড়ুন, অথবা শুরুতে ৭ বার দরুদ পড়া বাদ দিন। হাত ডুবিয়ে বসে থাকা সম্ভব না হলে এসব পড়ে বালতির পানিতে ফুঁ দিয়ে গোসল করে নিন। তবে বেশি পড়লে বেশি উপকার হবে, আর কম পড়লে কম।
আরও কয়েকটি লক্ষণীয় বিষয়:
• যদি টয়লেট আর গোসলখানা একসাথে হয় তাহলে অবশ্যই বালতি বাইরে এনে এসব দুআ এবং সূরা পড়বেন।
• এই পানি দিয়ে গোসল করার পর চাইলে অন্য পানি দিয়ে ইচ্ছেমত গোসল করতে পারেন। কিন্তু এর সাথে পানি মিশালে প্রভাব কমে যায়।
• যার সমস্যা সে যদি পড়তে না পারে তাহলে অন্যজন পানিতে হাত রেখে এসব পড়বে, এরপর রোগী শুধু গোসল করবে।
• মেয়েদের পিরিয়ডের সময় যদি অন্য কেউ পানিতে হাত রেখে আয়াতগুলো পড়ে দেয়, তবে গোসল করতে সমস্যা নেই।
• আবশ্যক নয়, তবে উত্তম হচ্ছে, কিছুক্ষণ রুকইয়াহ শোনার পর গোসল করতে যাওয়া।
মোটকথা, প্রতিদিন রুকইয়াহ শুনবেন এবং ওপরের নিয়ম অনুযায়ী রুকইয়ার গোসল করবেন। সমস্যা ভালো হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন কম হলেও ঘণ্টাখানেক রুকইয়াহ শোনা উচিত। সমস্যা অনুপাতে সুস্থ হতে ৩ থেকে ৭ দিন লাগতে পারে। তবে সমস্যা খুব বেশি মনে হলে পরপর ২১ দিন রুকইয়াহ করুন।
সমস্যা যদি একদম ভালো হয়ে যায়, তবে রুকইয়াহ শুনলে দেখবেন, আর বিশেষ কিছু অনুভূত হচ্ছে না, সাধারণ কুরআন তিলাওয়াত মনে হচ্ছে। এর পাশাপাশি নজর আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোও চলে গেছে।
টিকাঃ
১০৩. বুখারী: ৩১৯১
১০৪. মুসলিম, তিরমিযী
১০৫. মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ
১০৬. বুখারী, মুসলিম, বাইহাকী
১০৭. বুখারী, আবূ দাউদ, তিরমিযী
📄 বদনজর-সংক্রান্ত কিছু ঘটনা
বদনজর সংক্রান্ত ঘটনার অভাব নেই। এতো ঘটনার মধ্যে সেরাগুলো বাছাই করাও দুষ্কর। তবুও আমরা বদনজরের ভয়াবহতা এবং এর জন্য রুকইয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সংক্ষেপে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি-
১. বাচ্চাদের খাওয়া-দাওয়া, কান্নাকাটি এবং অন্যান্য
আমাদের রুকইয়াহ সাপোর্ট গ্রুপের একজন এডমিন নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন। ঘটনাটি তার বয়ানেই শোনা যাক।
'কিছুদিন আগে পরিবার নিয়ে এক জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার সময়ই শঙ্কায় ছিলাম, বাচ্চার ওপর আবার কারও নজর লেগে যায় কিনা। এই আশঙ্কা থেকে বারবার দুআ পড়ে বাচ্চাকে ফুঁ দিই। যথারীতি সেখানে গিয়ে বাচ্চার দৌড়াদৌড়ি, আর আধো-আধো কথাবার্তায় সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। আমি মনে মনে যিকির-আযকার করতে লাগলাম। তার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় ক্লান্তও হয়ে গেলাম।
সেদিন বাসায় ফিরে তার আর খাওয়ার রুচি ছিল না। তবুও বাচ্চার মা জোর করে কিছু খাইয়ে দেয়। রাতে ঘুমের মধ্যে বাচ্চার অস্থিরতা দেখে আমি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ি। ফজরের পর বাচ্চা বুকের ওপর শুয়ে দুষ্টুমি করতে করতে হঠাৎ বমি করে দেয়। দেখে বুঝলাম, রাতের খাবার কিছুই হজম হয়নি। সেদিন অফিসে যাওয়ার পর বাসা থেকে খবর এলো, বাচ্চার পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা করছে। তখন আমি মোটামুটি নিশ্চিত হলাম, কারও নজর লেগেছে। চিকিৎসা করা দরকার।
যেহেতু কার নজর লেগেছে—জানি না, তাই আমি বদনজরের রুকইয়ার দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসরণ করলাম। মাথায় হাত দিয়ে দুআ পড়লাম, তারপর গায়ে ফুঁ দিলাম। কিন্তু বিশেষ কোনো উন্নতি চোখে পড়ল না। তার পরের দিন সকালে হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা, আমাদের কারও নজর লেগেছে কিনা—সেটা দেখা যাক। বাচ্চার গোসলের আগে আমি ওযু করলাম, বাচ্চার মা'ও করল। তারপর সেই পানি বাচ্চার গায়ে ঢালা হলো। এরপর একঘণ্টাও পার হয়নি। বাচ্চার পেটে মাসাস উঠল। টয়লেটে গেল। টয়লেটে সে কান্নাকাটি করলেও পায়খানা শেষে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বের হলো। আল্লাহ তাঁর কুদরত দেখালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস আবারও সত্য প্রমাণিত হলো। আলহামদুলিল্লাহ, বাচ্চা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ, স্বাভাবিক।'
আমার মন্তব্য হচ্ছে, এখানে বাবা-মা বাচ্চার ব্যাপারে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন, যেটা উচিত হয়নি। বেড়াতে যাওয়ার আগে-পরে দুআ করা হয়েছে। ব্যস, বাকিটুকু আল্লাহর ওপর ভরসা করে ছেড়ে দাও।
২. এই ঘটনা মুফতী জুনায়েদ সাহেবের একজন সহকর্মীর। উনি মুম্বাইয়ের এক মাদরাসার শিক্ষক। ওই মাদরাসার একজন ক্বারী সাহেবের তিন বছর যাবৎ সর্দি কাশির সমস্যা। সমস্যা তো খুব বড় কিছু না। তবুও সেটা অনেক চিকিৎসার পরও ভালো হচ্ছিল না। মুফতী সাহেব এ ব্যাপারে জানতে পেরে বললেন, ভাই, রুকইয়াহ শোনেন, গোসল করেন, পাশাপাশি ওষুধ খান। ক্বারী সাহেব বললেন, বহুদিন ধরে ওষুধ খেয়ে বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিয়েছি ভাই। উনি বললেন, এবার রুকইয়াহ করেন আর ওষুধ খান। ক্বারী সাহেব মাত্র একদিন রুকইয়াহ শুনলেন, রুকইয়ার গোসল করলেন, এরপর ওষুধ খেলেন। আল্লাহর রহমতে তিন বছরের কাশি একদিনে ভালো হয়ে গেল।
আরেকটা ঘটনা এরকম-একজনের কদিন পরপর জ্বর আসত, তার বোন এ ব্যাপারে জানালে আমি তাকে বদনজরের রুকইয়াহ করতে বলি, অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। এরপর ৭ দিনের ডিটক্স করলে আলহামদুলিল্লাহ সমস্যা দূর হয়ে যায়।
আমার নিজের স্বাভাবিক ঘটনা হচ্ছে, যখন অকারণে সারাদিন ক্লান্তি ঘিরে রাখে, সব কিছুতে অরুচি লাগে কিংবা মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে; অথবা যদি দেখি সাধারণ কোন অসুখ হয়েছে, কিন্তু ওষুধ খেয়েও তেমন উন্নতি হচ্ছে না তখন বদনজরের রুকইয়াহ করলে আল্লাহর রহমতে অনেকটাই ভালো বোধ করি।
৩. সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড করার পর কয়েকটি দুর্ঘটনার কথা কানে আসলেও সেগুলো বদনজরের কারণে হয়েছে এমনটা পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছিল না। সেদিন এক ভাইয়ের ঘটনা দেখার পর নিশ্চিত হলাম। ঘটনা তার মুখেই শুনি-
"সোশ্যাল মিডিয়াতে বাচ্চাদের ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা ঠিক না জানতাম। মনের খচখচানি উপেক্ষা করে তবুও আজ ছেলের একটি ভিডিও ফেসবুকে দিয়েছিলাম। ফলাফল পেলাম হাতেনাতে। সন্ধ্যা পর ছেলে অস্বাভাবিক আচরণ এবং চিৎকার করে কান্না শুরু করেছে। আমরা কোন কারণ খুজে পাচ্ছিলাম না। বিকেলেও হাসিখুশি ছিল; খাওয়া, ঘুম, টয়লেট সবকিছু স্বাভাবিক থাকার পরেও এই অবস্থার কি কারণ থাকতে পারে? কোনোকিছুতে কামড় দেয়নি, কোন ব্যথা পায় নি, ডায়পারও ঠিক আছে, তাহলে? একটু চিন্তা করতেই যা বোঝার বুঝতে ফেললাম। সাথে সাথে ফেসবুক থেকে ভিডিওটা ডিলিট করে দিলাম। তারপর সুরা ফালাক্ব ও নাস দিয়ে তাৎক্ষনিক রুকইয়াহ করে ফেললাম। এক মিনিটও হয়নি, ছেলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আলহামদুলিল্লাহ। এই ঘটনা থেকে আর কেউ শিক্ষা নিন বা না নিন, আমি যথেষ্ঠ শিক্ষা পেয়েছি।"
এরপর খোজ নিয়ে অন্তত সাত-আটজনকে পেয়েছি, যারা অনুরূপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন।
প্রথম ঘটনার কিছুদিন পরেই রুকইয়াহ সাপোর্ট বিডি গ্রুপে এক বোন সাহায্য চাইলেন যে, তিনি আগে বিভিন্ন পদের খানা রান্না করে সেসবের ছবি ফেসবুকে শেয়ার করতেন। বর্তমানে তিনি কিছুই ঠিকমত রান্না করতে পারেন না। এমনকি সামান্য ভাত অথবা ডিম রাঁধতে গেলেও নষ্ট করে ফেলেন।
তাকে পরামর্শ দিলাম যেন ফেসবুক থেকে সব ছবি ডিলিট করে দেন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে শো-অফের ব্যাপারে সতর্ক থাকেন। পাশাপাশি গুরুত্ব দিয়ে যেন বদনজরের রুকইয়াহ করেন।
৪. শাইখ আবদুল আযীয বিন বায রহ. একজন লোকের কথা বলেছিলেন। সে থাকত বর্তমান সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কাছেই একটা গ্রামে। একদিন গ্রামের অন্য একজনের ভেড়ার পালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভেড়াগুলোর ওপর তার বদনজর পড়ল, আর তাতেই ভেড়াগুলো সব মারা গেল। যখন ভেড়াগুলোর মালিক এসে দেখল, তার ভেড়াগুলো সব মরা, তার পুত্রকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, এর পাশ দিয়ে কে গেছে? ছেলেটা উত্তরে বলল অমুক এবং অমুকের পুত্র ছাড়া আর কেউ এদিক দিয়ে যায়নি। ভেড়ার মালিক তার কাছে গিয়ে দেখল, লোকটা তার নিজের বাড়ির ছাদে বসে আছে। সে ডেকে বলল, হে অমুক, তুমি কি আমার ভেড়াগুলোর পাশ দিয়ে গিয়েছ আর নজর দিয়েছ? এখন হয় তুমি আমাকে ভেড়ার দাম দাও, অথবা তোমার বাড়ি দাও। বাড়ির মালিক লোকটা বলল, আমি আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। যেই না লোকটা নেমে আসল, অমনি বাড়িটা ধ্বসে পড়ে গেল। ১০৮
আমরা আল্লাহর পরিপূর্ণ কল্যাণময় বাক্যাবলীর দ্বারা প্রতিটি শয়তান, প্রাণনাশকারী বিষাক্ত জীব এবং অনিষ্টকারী বদনজর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
টিকাঃ
১০৮. The Jinn and Human Sickness page-267