📄 নজর কখন লাগে এবং কখন লাগে না
কুদৃষ্টির উদাহরণ সেই বিষাক্ত তীরের মতো, যা একসাথে অনেকগুলো ছোড়া হয়; কিন্তু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে তার অধিকাংশই ব্যর্থ হয়। হিংসুকদের প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি ঈর্ষাকাতর চাহনি কিংরা অতিমাত্রার মুগ্ধতা, যেখানে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না-এসবই বদনজরের উৎস। তবে কেউ মাসনূন দুআ-যিকির ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা করলে এসবে সহজে আক্রান্ত হয় না।
তবে সাধারণত নজর লাগে বিরল এবং অপ্রসিদ্ধ বস্তুতে। উদাহরণস্বরূপ: কেউ একজন ভালো কণ্ঠের জন্য বিখ্যাত, এই অবস্থায় তার কণ্ঠে নজর লাগবে না-এটাই স্বাভাবিক। কোনো এলাকায় সবারই ২-৪ তলা বাড়ি, এখানে কেউ ৫ তলা করলে তা স্বাভাবিক ব্যাপার; এখানে নজর লাগার কথা নয়। কিন্তু আপনি এমন এলাকায় গিয়ে বিলাসবহুল ৩ তলা বাড়ি বানালেন, যেখানে ভালো কোনো একতলা বাড়িই দুর্লভ। খুবই সম্ভাবনা আছে, আপনার বাড়িতে নজর লাগবে, সেখানে আপনি শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন না, আর পরিবারে ঝগড়া লেগেই থাকবে।
বদনজর কীভাবে আমাদের ক্ষতি করে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার বদনজরের সাথে ভাগ্যের তুলনা করেছেন। যেমন: 'আল্লাহর ফায়সালা এবং ভাগ্যের পরে আমার উম্মাত সবচেয়ে বেশি মারা যাবে বদনজরের কারণে।' ৯৫ অথবা 'ভাগ্যের চেয়েও আগে বেড়ে যায় এমন কিছু যদি থাকে তবে তা হলো বদনজর। '৯৬
তাই আমরা বলতে পারি, নজরের ব্যাপারটা কিছুটা ভাগ্যের মতোই। অর্থাৎ ভাগ্য যেমন রোগ-ব্যাধি থেকে শুরু করে মৃত্যুর কারণ হয়, তেমনি নজর প্রথমে হয়তো মারাত্মক কোনো উপসর্গের কারণ হয়, তারপর সেখান থেকে প্রাণঘাতী জটিল কোনো রোগ হয়, আর তারপর কবর। এছাড়াও নজরের কারণে মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগে, যার ফলে কেউ কেউ আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে।
কীভাবে 'বদনজর উটকে ডেকচিতে, আর মানুষকে কবরে পৌঁছে দেয়'- আশা করছি, তা এখন অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে।
টিকাঃ
৯৫. মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ১৮৫৮
৯৬. মুসলিম: ৪০৬৫
📄 বদনজর থেকে বাঁচার উপায়
১। কথার মাঝে আল্লাহর যিকির করা (এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা একটু পর আসছে)
২। মেয়ে হলে অবশ্যই শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পর্দা করা।
৩। হাদীসে বর্ণিত সকাল সন্ধ্যার দুআগুলো পড়া, বিশেষত:
بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
বিসমিল্লা-হিল্লাযি লা-ইয়াদুররু মা'আসমিহি শাইউং ফিলআরদি ওয়ালা-ফিসসামা-ই, ওয়াহুওয়াস সামি 'উল 'আলিম।
সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া। ৯৭
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ .
আ'উযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মা-তি, মিং-শাররি মা-খলাক।
সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া। ৯৮
• সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া। ৯৯
৪। আর বাচ্চাদের সুরক্ষার জন্য কর্তব্য হচ্ছে, মাঝেমধ্যেই সূরা ফালাক, নাস পড়ে বাচ্চাদের গায়ে ফুঁ দেওয়া, যেমনটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও করেছেন।
৫। নজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার একটা দুআ আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা পড়ে হাসান এবং হুসাইন রা.-কে ফুঁ দিয়ে দিতেন। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই একই দুআ মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম আ. নিজের ছেলেদের (অর্থাৎ ইসমাইল এবং ইসহাক আ.) জন্য পড়তেন। দুআটি হচ্ছে—
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উচ্চারণ: আউযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মাহ। মিং কুল্লি শাইত্বা-নিন-ওয়াহা-ম্মাহ। ওয়ামিং কুল্লি আইনিন লা-ম্মাহ। ১০০
এই দুআ সকাল-সন্ধ্যায় কয়েকবার পড়ে বাচ্চাদের ফুঁ দিয়ে দেবেন, নিজের জন্যও পড়বেন। ইনশাআল্লাহ বদনজর থেকে বাঁচতে তাবীজ-কবচ অথবা নজর টিপের দরকার হবেনা। আল্লাহই হেফাজত করবেন।
দ্রষ্টব্য: অন্যের জন্য পড়লে أَعُوذُ (আউযু) এর জায়গায় أُعِيدُكَ (উয়ীযু) বলা ভালো, দু'জনের ক্ষেত্রে أَعِيذُكُمَا আর অনেকজনের জন্য পড়লে أَعِيْذُكُمْ বলা ভালো। তবে সাধারণভাবে 'আউযুবিকালিমাতিল্লাহ...' বললেও সমস্যা নেই, এক্ষেত্রে নিয়ত করে নিতে হবে, কার জন্য পড়ছেন।
৬। ফেসবুক বা এরকম সোশ্যাল মিডিয়ায় অনর্থক শো-অফ না করা। অহেতুক ছবি বা ঘটনা পোস্ট দিয়ে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ছবি মানুষকে দেখিয়ে না বেড়ানো।
৭। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিজের প্রয়োজন পূরণ হওয়ার ক্ষেত্রে 'সেটা গোপন এবং লুকায়িত রাখার' মাধ্যমে সাহায্য লাভ করো। কেননা, প্রতিটা নিয়ামত লাভকারী হিংসার স্বীকার হয়ে থাকে। ১০১
মূলত এটা সফলতার একটা গোপন চাবিকাঠি। নিয়ামত গোপন রাখার মানে হলো, অন্যের সামনে অহেতুক নিজের বাণিজ্যের সম্পদের প্রশংসা না করা, সন্তানের প্রশংসা না করা, মেয়েরা নিজ স্বামীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা, ছেলেরা নিজ স্ত্রীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা। নিজের প্রজেক্ট বা ব্যবসার গোপন আলোচনা অন্যদের সামনে প্রকাশ না করা। অনেকে অহেতুক অন্যদের সামনে গল্প করেন, দৈনিক এত এত বিক্রি হচ্ছে, অমুক চালানে এত টাকা লাভ হলো। এমন আলোচনাও নজরের উৎস হতে পারে।
আমি একজন বোনের রুকইয়াহ করেছিলাম, যে তার বান্ধবীদের সামনে নিজের স্বামীর অনেক প্রশংসা করত। ইত্যবসরে তার একজন বান্ধবীর ডিভোর্স হয়ে যায়, এরপর এই হিংসুক বান্ধবী তাকে এবং তার স্বামীকে জাদু করে, যেন তাদের সংসার ভেঙ্গে যায় এবং তার স্বামীকে উক্ত বান্ধবী বিয়ে করতে পারে। আল্লাহ হেফাজত করুন।
মোদ্দাকথা, অহেতুক অন্যের সামনে নিজের কোনো নিয়ামতের আলোচনা না করাই উত্তম। প্রসঙ্গক্রমে করলেও কথার মাঝে যিকর করতে হবে। যেমন: 'আলহামদুলিল্লাহ, এ বছর ব্যবসায় কোনো লস যায়নি', 'আল্লাহর রহমতে আমার ছেলে বেশ ভালো রেজাল্ট করেছে', 'মা-শা-আল্লাহ! ভাবি, আপনি তো অনেক ভালো পিঠা বানান!' ইত্যাদি। আর অন্য কেউ যদি আপনার কিছুর প্রশংসা করে, তাহলে তিনি যিকর না করলে আপনার উচিত হবে যিকর করা। উদাহরণস্বরুপ: কেউ বলল, আপনার ছেলেটা তো অনেক কিউট!' আপনি বলুন, 'আলহামদুলিল্লাহ।'
আর অধিক পরিমাণে সালামের প্রচলন করুন, ইনশাআল্লাহ হিংসা দূর হয়ে যাবে।
সর্বোপরি আল্লাহর কাছে দুআ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। কেননা বদনজর সত্য। '১০২
টিকাঃ
৯৭. তিরমিযী: ৩৩৩৫
৯৮. তিরমিযী: ৩৫৫৯
৯৯. তিরমিযী: ৩৫৭৫
১০০. বুখারী: ৩১৯১
১০১. আল-মুজামুল আওসাত: ২৫২৯
১০২. ইবনু মাজাহ: ৩৫০৮
📄 বদনজর আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ
১. শরীরে জ্বর থাকা, কিন্তু থার্মোমিটারে না ওঠা। এ ধরনের অন্য কোনো অসুখ থাকা, কিন্তু মেডিকেল টেস্টে ধরা না পড়া।
২. একের পর এক রকমারি সব অসুখ লেগে থাকা। একটা অসুখ ভালো হতে না হতেই আরেকটা শুরু হওয়া।
৩. সাধারণ রোগব্যাধি (সর্দিকাশি, জ্বর, ডায়রিয়া ইত্যাদি) দেখা দিয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করেও তা ভালো না হওয়া, ওষুধ কাজ না করা।
৪. পড়াশোনা বা কাজে মন না বসা। নামায-যিকরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা। কিছুতেই মনোযোগ দিতে না পারা।
৫. প্রায়শই শরীর দুর্বল থাকা। বমি বমি ভাব লাগা।
৬. সবসময় ঘুমঘুম ভাব, সারাদিন হাই ওঠা।
৭. চেহারা মলিন, ফ্যাকাসে বা হলুদ হয়ে যাওয়া। চেহারায় লাল ছোপ-ছোপ দাগ হয়ে থাকা।
৮. ক্ষুধামন্দা, খাবারে রুচি না পাওয়া।
৯. অহেতুক মেজাজ বিগড়ে থাকা।
১০. বুক ধড়ফড় করা, দম বন্ধ বা অস্বস্তি লাগা।
১১. কাঁধ ভারি হয়ে থাকা। অহেতুক মাথা ঝিম ধরে থাকা।
১২. পেটে প্রচুর গ্যাস হওয়া। এজন্য ওষুধ খেয়ে তেমন ফায়দা না হওয়া।
১৩. অতিরিক্ত চুল পড়া। এজন্য ওষুধ বা শ্যাম্পু ব্যবহারে তেমন ফায়দা না হওয়া।
১৪. হাত-পায়ে মাঝেমধ্যেই ব্যথা করা। কিংবা পুরো শরীরে ব্যথা দৌড়ে বেড়ানো।
১৫. শরীরের বিভিন্ন জায়গার গোশতে গুটলির মতো অনুভব করা।
১৬. কোনো কারণ ছাড়াই কান্না আসা।
১৭. আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের সাথে দেখা করতে ভালো না লাগা।
১৮. ব্যবসা, চাকুরী, আয়-রোজগারে ঝামেলা লেগে থাকা। কোনোভাবেই উন্নতি না হওয়া।
১৯. যে কাজে ভাল দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেটা করতে গেলেই ঝামেলা বাধা, কিংবা অসুস্থ হয়ে যাওয়া।
২০. স্বপ্নের মাঝে বোরখা পরা কাউকে দেখা, যার শুধু চোখ খোলা থাকে কিংবা লাল চোখওয়ালা মানুষ দেখা।
২১. স্বপ্নে মরা মানুষ দেখা, অথবা নিজেকে মৃত অবস্থায় দেখা।
কয়েকটি লক্ষণীয় বিষয়:
১. উল্লিখিত বিষয়গুলো এমন না যে, শুধু বদনজরের কারণেই এসব হয়। অন্য কারণেও হতে পারে। যেমন এর কয়েকটা 'জিন-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণের' মাঝেও পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা বা অন্যান্য সমস্যা কোথায়।
২. এই লক্ষণগুলোর মাঝে সবগুলোই মিলতে পারে। এমন না। যদি অল্প কয়েকটা মিলে তবে কম, আর যদি অনেকগুলো মিলে যায়, তাহলে বুঝে নিতে হবে যে নজরের সমস্যা অনেক বেশি আছে। আর স্বপ্নের বিষয়গুলো যদি মাঝেমধ্যেই দেখা যায় তাহলে বদনজরের সমস্যা আছে বলে ধরে নেওয়া যাবে। অন্যথায় আউযুবিল্লাহ পড়ুন এবং এই চিন্তা বাদ দিন।
৩. কারও যদি বদনজরের অল্প কিছু লক্ষণ মিলে যায়, আর পাশাপাশি জিন-আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণও মিলে যায় তাহলে সম্ভবত তার ওপর জিনের নজর লেগেছে। এটাকে আমাদের দেশে ‘বাতাসলাগা’ বলে। এই জিনের নজরের ক্ষেত্রে আরও কিছু সমস্যা হয়, যেমন: বাচ্চাদের অহেতুক খুব ভয় পাওয়া, অস্বাভাবিক কান্নাকাটি করা, বড়দের ক্ষেত্রে এমনটা মনে হওয়া যে, ‘আশেপাশে কেউ আছে’ কিংবা ঘরে কেউ না থাকা সত্ত্বেও ছায়া চলাচল করতে দেখা রাতে ঠিক মতো ঘুম না হওয়া, ওয়াসওয়াসা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।
তো যাই হোক, এজন্য লাগাতার কিছু দিন বদনজরের রুকইয়াহ করলেই সুস্থ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। আর বদনজরের সমস্যা সাধারণত লক্ষণ শুনেই বুঝা যায়, এরপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য চাইলে রুকইয়াহ করে দেখতে পারেন।
বদ নজর আক্রান্ত হলে রুকইয়াহয় যেসব প্রতিক্রিয়া হতে পারে...
বদনজর আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করলে অথবা রুকইয়ার অডিও শুনলে বিভিন্ন প্রভাব দেখা যায়, যেমন: প্রচুর ঘুম আসা বা ক্লান্তি লাগা, বারবার হাই ওঠা, হাত-পা শিরশির করা, শরীর চুলকানো বা ঘেমে যাওয়া, রুকইয়ার পর প্রস্রাব হলুদ হওয়া ইত্যাদি। এর সবগুলোই হবে এরকম না, কিছু কিছু মিলতে পারে। বিশেষত রুকইয়ার সময় প্রচুর ঘুম আসা আর পরে প্রস্রাব হলুদ হওয়া—এগুলো সাধারণত বদনজর আক্রান্ত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বদনজর, জিন, জাদু এসবে আক্রান্ত হওয়ার আগেই যদি প্রতিরোধ করা যায় তাহলে সবচেয়ে ভালো। প্রতিকারের চেয়ে যে প্রতিরোধ উত্তম, তা তো আমরা সবাই জানি। তাই না?
📄 বদনজরের চিকিৎসা
জিন বা জাদুর মতো নজরের চিকিৎসায় বিশেষ কোনো ঝামেলা নাই। এটা বেশ সহজ এবং নিজে নিজেই করা যায়, আর সুস্থ হতেও আলহামদুলিল্লাহ বেশি দিন লাগে না। এবার তাহলে বদনজরের চিকিৎসা জেনে নেওয়া যাক।
প্রথম পদ্ধতি:
যদি জানা যায়, কার নজর লেগেছে তাহলে সাহল ইবনু হুনাইফ রা.-এর হাদীস অনুসরণ করলেই যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ যার নজর লেগেছে তাকে ওযু করতে হবে এবং ওযুর পানি একটা পাত্রে জমা করতে হবে, এরপর পানিটুকু আক্রান্ত ব্যাক্তির গায়ে ঢেলে দিতে হবে। তাহলেই নজর কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ।
এই পদ্ধতি সাধারণত একবার অনুসরণ করলেই বদনজরের প্রভাব দূর হয়ে যায়। তবে প্রয়োজনে ২-৩ দিন করা যেতে পারে। আর লক্ষ কবার বিষয় হচ্ছে, অনেকের ক্ষেত্রে এই ওযুর পানি গায়ে ঢালার পর প্রচণ্ড পায়খানাবা প্রস্রাবের বেগ আসে, সেটা হয়ে গেলে এরপর সুস্থ হয়ে যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, কুলির পানিও কি জমা করতে হবে?
উত্তর হচ্ছে, যদিও এক বর্ণনায় কুলির পানির কথাও রয়েছে, তবে না নিলেও সমস্যা নেই। সাধারণত এক জনের হাত-মুখ ধোয়া পানি নিয়ে অপরজন হাত-মুখ ধুয়ে ফেললেই বদনজর নষ্ট হয়ে যায়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যদি নিজের নজর নিজেরই লাগে?
উত্তর হলো, তাহলে নিজেই ওযু করতে হবে এবং পানিগুলো একটা পাত্রে জমা করতে হবে, এরপর সেটা নিজের গায়ে ঢালতে হবে। এছাড়া নিচে বলা চতুর্থ পদ্ধতি অনুসরণ করলেও ইনশাআল্লাহ নিজের বদনজর দূর হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি:
রোগীর মাথায় হাত রেখে নিম্নলিখিত দুআ এবং সূরাগুলো পড়বেন। মাঝেমাঝে রোগীর গায়ে ফুঁ দেবেন, এভাবে কয়েকবার করবেন। নিজের সমস্যা থাকলে পড়ার পর হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে পুরা শরীরে হাত বুলিয়ে নেবেন।
১. أُعِيْذُكُمْ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উচ্চারণ: উ'ইযুকুম বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মাতি মিন কুল্লি শাইত-নিন- ওয়াহা-ম্মাহ। ওয়ামিন কুল্লি আঈ'নিন লা-ম্মাহ। ১০৩
২. بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ ، اللَّهُ يَشْفِيكَ ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
উচ্চারণ: বিসমিল্লা-হি আরকিক। মিন কুল্লি শাইয়িই ইউ'যিক। মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও 'আইনি হাসিদ। আল্লা-হু ইয়াশফিক। বিসমিল্লা-হি আরকিক। ১০৪
৩. بِاسْمِ اللَّهِ يُبْرِيكَ ، وَمِنْ كُلِّ دَاءٍ يَشْفِيكَ ، وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ ، وَشَرِّ كُلِّ ذِي عَيْنٍ
উচ্চারণ: বিসমিল্লা-হি ইউবরিক। ওয়ামিন কুল্লি দা-ইন ইয়াশফিক। ওয়ামিন শাররি হাসিদিন ইযা- হাসাদ। ওয়া শাররি কুল্লি যি 'আইন। ১০৫
৪. رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ اِشْفِ وَأَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
উচ্চারণ: রাব্বান না-স আযহিবিল বা'স। ইশফি ওয়াআনতাশ শা-ফি। লা-শিফাআ ইল্লা- শিফাউকা, শিফাআন লা-ইউগা-দিরু সাকামা-। ১০৬
৫. এরপর সূরা ফাতিহা এবং সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস ৩ বার করে পড়বেন। চাইলে সূরা ফালাক, নাস কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। ১০৭
৬. আবশ্যক নয়, তবে চাইলে এর সাথে আরও কিছু আয়াত পড়তে পারেন, যেমন:
১. أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَهُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ فَقَدْ آتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَآتَيْنَهُمْ مُلْكًا عَظِيمًا ﴿النساء ۵۴﴾
২. وَقَالَ يُبَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ وَمَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكَّلُونَ ﴿يوسف ۶۷﴾
৩. وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ إِنْ تَرَنِ أَنَا أَقَلَّ مِنْكَ مَالًا وَوَلَدًا ﴿الكهف ٣٩﴾
৪. الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمُوتٍ طِبَاقًا مَا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِنْ تَفُوتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِنْ فُطُورٍ ﴿٣﴾ ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنْقَلِبُ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ ﴿الملك ﴾
৫. وَإِنْ يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَ يَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ ﴿۵۱﴾ وَمَا هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِينَ ﴿القلم ۵۲﴾
সমস্যা বেশি হলে উল্লিখিত পদ্ধতিতে রুকইয়াহ করা শেষে এগুলো আরেকবার পড়ে পানিতে ফুঁ দেবেন। এই পানি সকাল-বিকালে খাবেন এবং গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করবেন। সমস্যা ভালো হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন এই দুটি কাজ করবেন। ইনশাআল্লাহ কিছুদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যাবেন।
আপনি বদনজর আক্রান্ত কারও কারও ওপর রুকইয়াহ করতে চাইলে এই পদ্ধতিটা অনুসরণ করতে পারেন। অনুরূপভাবে ছোট বাচ্চাদের বিবিধ সমস্যা বা রোগবালাইয়ের জন্য রুকইয়াহ করলেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়।
তৃতীয় পদ্ধতি:
যদি কোনো গাছ, খামার, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অথবা বাড়িতে নজর লাগে তাহলে প্রথমে এগুলোর মালিক নিজের জন্য বদনজরের রুকইয়াহ করবেন। আর এসব সম্পত্তির জন্য রুকইয়াহ করতে চাইলে ওপরে বলা দুআ - কালামগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দেবেন, এরপর ওই পানিটুকু গাছে, ঘরে অথবা দোকানে ছিটিয়ে দেবেন। গৃহপালিত পশুপাখির ওপর নজর লাগলে তাদের মাথায় হাত রেখে এসব পড়বেন, কিংবা কোনো খাদ্যের ওপর এসব পড়ে ফুঁ দিয়ে খাইয়ে দেবেন।
তাহলে বদনজর দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। প্রয়োজনে এভাবে পরপর কয়েকদিন রুকইয়াহ করবেন।
চতুর্থ পদ্ধতি:
যদি না জানা যায় আপনার ওপর কার নজর লেগেছে, অথবা সমস্যা যদি দীর্ঘদিনের হয়, কিংবা যদি অনেকজনের নজর লাগে তাহলে এই চতুর্থ পদ্ধতিটা অনুসরণ করা উচিত।
রুকইয়ার নিয়ম হচ্ছে—
১. সমস্যা ভালো হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন রুকইয়াহ শারইয়্যাহর আয়াতগুলো তিলাওয়াত করুন অথবা তিলাওয়াত শুনুন।
২. সম্ভব হলে প্রতিদিন আর নইলে অন্তত একদিন পরপর রুকইয়ার গোসল করবেন।
অডিও প্রসঙ্গে:
তিলাওয়াতের বিকল্প হিসেবে অডিও শুনলে প্রতিদিন অন্তত ৪৫ মিনিট অথবা এর বেশি সময় রুকইয়াহ শোনা উচিত। এ ক্ষেত্রে বদনজর 'Evil Eye' অথবা 'Eye Hasad' রুকইয়াহটি শুনুন। শাইখ লুহাইদানের রুকইয়াও শুনতে পারেন। অথবা নিজে নজরের রুকইয়ার আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে রেকর্ড করুন এবং সেটা প্রতিদিন শুনুন। জিনের বদনজরের সমস্যা প্রকট হলে এর সাথে অতিরিক্ত "সূরা ইয়াসীন, সফফাত, দুখান, জিন" এর রুকইয়াহ শুনুন।
রুকইয়ার গোসল:
এক বালতি পানি নিন, তারপর ওই পানিতে দুই হাত ডুবিয়ে পড়ুন— কোনো দরুদ শরীফ ৭ বার, ফাতিহা ১ বার, আয়াতুল কুরসী ৭ বার, সূরা কাফিরুন, ইখলাস, ফালাক, নাস প্রত্যেকটা ৭ বার, শেষে আবার দরুদ শরীফ ৭ বার'। এসব পড়ার পর হাত উঠাবেন এবং এই পানি দিয়ে গোসল করবেন।
আর যদি সময় কম থাকে তাহলে ৭ বারের জায়গায় ৩ বার পড়ুন, অথবা শুরুতে ৭ বার দরুদ পড়া বাদ দিন। হাত ডুবিয়ে বসে থাকা সম্ভব না হলে এসব পড়ে বালতির পানিতে ফুঁ দিয়ে গোসল করে নিন। তবে বেশি পড়লে বেশি উপকার হবে, আর কম পড়লে কম।
আরও কয়েকটি লক্ষণীয় বিষয়:
• যদি টয়লেট আর গোসলখানা একসাথে হয় তাহলে অবশ্যই বালতি বাইরে এনে এসব দুআ এবং সূরা পড়বেন।
• এই পানি দিয়ে গোসল করার পর চাইলে অন্য পানি দিয়ে ইচ্ছেমত গোসল করতে পারেন। কিন্তু এর সাথে পানি মিশালে প্রভাব কমে যায়।
• যার সমস্যা সে যদি পড়তে না পারে তাহলে অন্যজন পানিতে হাত রেখে এসব পড়বে, এরপর রোগী শুধু গোসল করবে।
• মেয়েদের পিরিয়ডের সময় যদি অন্য কেউ পানিতে হাত রেখে আয়াতগুলো পড়ে দেয়, তবে গোসল করতে সমস্যা নেই।
• আবশ্যক নয়, তবে উত্তম হচ্ছে, কিছুক্ষণ রুকইয়াহ শোনার পর গোসল করতে যাওয়া।
মোটকথা, প্রতিদিন রুকইয়াহ শুনবেন এবং ওপরের নিয়ম অনুযায়ী রুকইয়ার গোসল করবেন। সমস্যা ভালো হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন কম হলেও ঘণ্টাখানেক রুকইয়াহ শোনা উচিত। সমস্যা অনুপাতে সুস্থ হতে ৩ থেকে ৭ দিন লাগতে পারে। তবে সমস্যা খুব বেশি মনে হলে পরপর ২১ দিন রুকইয়াহ করুন।
সমস্যা যদি একদম ভালো হয়ে যায়, তবে রুকইয়াহ শুনলে দেখবেন, আর বিশেষ কিছু অনুভূত হচ্ছে না, সাধারণ কুরআন তিলাওয়াত মনে হচ্ছে। এর পাশাপাশি নজর আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোও চলে গেছে।
টিকাঃ
১০৩. বুখারী: ৩১৯১
১০৪. মুসলিম, তিরমিযী
১০৫. মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ
১০৬. বুখারী, মুসলিম, বাইহাকী
১০৭. বুখারী, আবূ দাউদ, তিরমিযী