📄 আকাবির এবং আসলাফের মূল্যায়ন
আমরা ইতিমধ্যে বদনজরের বাস্তবতা নিয়ে কুরআন, হাদীস এবং তাফসীর গ্রন্থ থেকে আলোচনা করেছি। এবার আমরা সালাফে সালেহীনের দৃষ্টিতে এর মূল্যায়ন জানব।
১. ইবনু কাসীর রহ. বলেন, বদনজরের প্রতিক্রিয়া সত্য, যা আল্লাহর নির্দেশেই হয়ে থাকে। ৯১
২. হাফিজ ইবনু হাজার রহ. বদনজরের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, 'বদনজর হলো কোনো উত্তম বস্তুর প্রতি কোনো খারাপ লোকের হিংসাত্মক দৃষ্টিপাত, যার কারণে উক্ত বস্তুর ক্ষতি হয়। ৯২
তবে এটা নজরের সামগ্রিক ছবি নয়; আংশিক মাত্র। হিংসার জন্য যেমন নজর লাগে, তেমনই অতিমাত্রায় মুগ্ধতার জন্যও লাগে। যেমনটা সাহল ইবনু হুনাইফ রা.-এর ঘটনায় একটু আগে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেছেন, কিছু লোক অজ্ঞতার কারণে বদনজরের অস্তিত্ব অস্বীকার করে থাকে। যুগে যুগে জ্ঞানী ব্যক্তিদের মাঝে যদিও-বা নজর লাগার কারণ, পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে মতপার্থক্য আছে, তবে কেউই একে অস্বীকার করে নি।
যাদুল মা'আদ গ্রন্থে হাফিজ ইবনুল কায়্যিম রহ. এ বিষয়ে বেশ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, যেখান থেকে কিছু পয়েন্ট উল্লেখ করা যায়। তাঁর মতে—
'আল্লাহ মানুষের শরীরে এবং আত্মায় বিভিন্ন প্রকার ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। বদনজরের ব্যাপারটা মূলত আত্মিক। কোনো কিছুর প্রতি মুগ্ধতা অথবা হিংসা থেকে এটা অন্তরে সৃষ্টি হয়ে চোখের মাধ্যমে প্রভাব ফেলে। এখানে চোখের শক্তি নেই। এজন্য অন্ধ ব্যক্তির বদনজরও লাগতে পারে।'
- বদনজর কখনো যোগাযোগের মাধ্যমে, কখনো সরাসরি দৃষ্টিপাতে, কখনো বদ দুআ বা তাবিজের মাধ্যমে, আবার কখনো ধ্যানের মাধ্যমেও হয়ে থাকে।
- কখনো মানুষের নিজের নজর নিজেরই লাগে।
- নজর ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যেকোনো ভাবে লাগতে পারে। ৯৩
বদনজর কখনো রোগের কারণ হয়, আবার কখনো সরাসরি ক্ষতি করে। নজর লেগে কারও জ্বর চলে আসতে পারে, ডায়রিয়া হতে পারে (নজর লেগে পেট খারাপ হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার) আবার নজর কখনো হৃদরোগের কারণও হতে পারে। একের পর এক অসুখ লেগেই থাকা, অথবা অনেক ওষুধ খেয়েও কোনোই উপকার না পাওয়া, কিংবা যে কাজেই হাত দেওয়া হয় সেটাতেই লোকসান হওয়া-এসব সাধারণত বদনজরের কারণে হয়। নজর লেগে ফসল কিংবা গাছের ফলও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৪. মুফতী শফী রহ. সূরা ইউসুফ: ৬৭ এবং ৬৮ নং আয়াত প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন এবং সেই আলোচনার উপসংহারে বলেছেন-
'আলোচ্য আয়াত দুটি থেকে কয়েকটি মাসআলা ও বিধান জানা যায়:
(১) বদনজর লাগার বিষয়টি সত্য। সুতরাং ক্ষতিকর খাদ্য ও কাজকর্ম থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টার মতো নজর থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা-তদবীর করাও একইভাবে বৈধ।
(২) মানুষের হিংসা থেকে আত্মরক্ষার জন্য গুণ বা নিয়ামত গোপন রাখা জায়িয।
(৩) ক্ষতিকর কিছুর প্রভাব থেকে আত্মরক্ষার জন্য বাহ্যিক চেষ্টা করা তাওয়াককুল কিংবা নবীদের মর্যাদার পরিপন্থী নয়।
(৫) যদি কেউ কারও সম্পর্কে আশঙ্কা পোষণ করে যে, সে দুঃখ-কষ্টে পতিত হবে, তবে তাকে অবহিত করা এবং আত্মরক্ষার সম্ভাব্য উপায় বলে দেওয়া উত্তম, যেমনটা ইয়াকুব আ. করেছিলেন।
(৫) যদি কারও কোনো গুণ অথবা নিয়ামত নিজের দৃষ্টিতে বিস্ময়কর ঠেকে এবং নজর লেগে যাওয়ার আশঙ্কা হয়, তবে তা দেখে বারাকাল্লাহ অথবা মাশা-আল্লাহ বলা উচিত। যাতে অন্যের কোনো ক্ষতি না হয়।
(৬) বদনজর থেকে রক্ষার জন্য সম্ভাব্য তদবীর করা জায়িয; যার মধ্যে দুআ-ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি দ্বারা প্রতিকার করা অন্যতম। যেমন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাফর ইবনু আবি তালিব রা.-এর সন্তানদের জন্য ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে চিকিৎসা করার অনুমতি দিয়েছিলেন।
(৭) একজন মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, প্রত্যেক কাজে আসল ভরসা আল্লাহর ওপর রাখা। কিন্তু বাহ্যিক ও বস্তুভিত্তিক উপায়াদিকেও উপেক্ষা না করা; বরং সাধ্য অনুযায়ী বৈধ উপায়- উপকরণ অবলম্বন করতে ত্রুটি না করা। ইয়াকুব আ. তা-ই করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাই শিক্ষা দিয়েছেন। ৯৪
টিকাঃ
৯১. তাফসীরে ইবনু কাসীর: ৪/৪১০
৯২. ফাতহুল বারী: ১০/২০০
৯৩. যাদুল মা'আদ: ১/১৬৩-১৬৫
৯৪. মাআরিফুল কুরআন: ৫/৯৫-১০০ (সংক্ষিপ্ত সংস্করণে ৬৮০পৃ.)
📄 নজর কখন লাগে এবং কখন লাগে না
কুদৃষ্টির উদাহরণ সেই বিষাক্ত তীরের মতো, যা একসাথে অনেকগুলো ছোড়া হয়; কিন্তু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে তার অধিকাংশই ব্যর্থ হয়। হিংসুকদের প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি ঈর্ষাকাতর চাহনি কিংরা অতিমাত্রার মুগ্ধতা, যেখানে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না-এসবই বদনজরের উৎস। তবে কেউ মাসনূন দুআ-যিকির ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা করলে এসবে সহজে আক্রান্ত হয় না।
তবে সাধারণত নজর লাগে বিরল এবং অপ্রসিদ্ধ বস্তুতে। উদাহরণস্বরূপ: কেউ একজন ভালো কণ্ঠের জন্য বিখ্যাত, এই অবস্থায় তার কণ্ঠে নজর লাগবে না-এটাই স্বাভাবিক। কোনো এলাকায় সবারই ২-৪ তলা বাড়ি, এখানে কেউ ৫ তলা করলে তা স্বাভাবিক ব্যাপার; এখানে নজর লাগার কথা নয়। কিন্তু আপনি এমন এলাকায় গিয়ে বিলাসবহুল ৩ তলা বাড়ি বানালেন, যেখানে ভালো কোনো একতলা বাড়িই দুর্লভ। খুবই সম্ভাবনা আছে, আপনার বাড়িতে নজর লাগবে, সেখানে আপনি শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন না, আর পরিবারে ঝগড়া লেগেই থাকবে।
বদনজর কীভাবে আমাদের ক্ষতি করে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার বদনজরের সাথে ভাগ্যের তুলনা করেছেন। যেমন: 'আল্লাহর ফায়সালা এবং ভাগ্যের পরে আমার উম্মাত সবচেয়ে বেশি মারা যাবে বদনজরের কারণে।' ৯৫ অথবা 'ভাগ্যের চেয়েও আগে বেড়ে যায় এমন কিছু যদি থাকে তবে তা হলো বদনজর। '৯৬
তাই আমরা বলতে পারি, নজরের ব্যাপারটা কিছুটা ভাগ্যের মতোই। অর্থাৎ ভাগ্য যেমন রোগ-ব্যাধি থেকে শুরু করে মৃত্যুর কারণ হয়, তেমনি নজর প্রথমে হয়তো মারাত্মক কোনো উপসর্গের কারণ হয়, তারপর সেখান থেকে প্রাণঘাতী জটিল কোনো রোগ হয়, আর তারপর কবর। এছাড়াও নজরের কারণে মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগে, যার ফলে কেউ কেউ আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে।
কীভাবে 'বদনজর উটকে ডেকচিতে, আর মানুষকে কবরে পৌঁছে দেয়'- আশা করছি, তা এখন অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে।
টিকাঃ
৯৫. মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ১৮৫৮
৯৬. মুসলিম: ৪০৬৫
📄 বদনজর থেকে বাঁচার উপায়
১। কথার মাঝে আল্লাহর যিকির করা (এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা একটু পর আসছে)
২। মেয়ে হলে অবশ্যই শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পর্দা করা।
৩। হাদীসে বর্ণিত সকাল সন্ধ্যার দুআগুলো পড়া, বিশেষত:
بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
বিসমিল্লা-হিল্লাযি লা-ইয়াদুররু মা'আসমিহি শাইউং ফিলআরদি ওয়ালা-ফিসসামা-ই, ওয়াহুওয়াস সামি 'উল 'আলিম।
সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া। ৯৭
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ .
আ'উযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মা-তি, মিং-শাররি মা-খলাক।
সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া। ৯৮
• সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া। ৯৯
৪। আর বাচ্চাদের সুরক্ষার জন্য কর্তব্য হচ্ছে, মাঝেমধ্যেই সূরা ফালাক, নাস পড়ে বাচ্চাদের গায়ে ফুঁ দেওয়া, যেমনটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও করেছেন।
৫। নজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার একটা দুআ আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা পড়ে হাসান এবং হুসাইন রা.-কে ফুঁ দিয়ে দিতেন। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই একই দুআ মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম আ. নিজের ছেলেদের (অর্থাৎ ইসমাইল এবং ইসহাক আ.) জন্য পড়তেন। দুআটি হচ্ছে—
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উচ্চারণ: আউযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মাহ। মিং কুল্লি শাইত্বা-নিন-ওয়াহা-ম্মাহ। ওয়ামিং কুল্লি আইনিন লা-ম্মাহ। ১০০
এই দুআ সকাল-সন্ধ্যায় কয়েকবার পড়ে বাচ্চাদের ফুঁ দিয়ে দেবেন, নিজের জন্যও পড়বেন। ইনশাআল্লাহ বদনজর থেকে বাঁচতে তাবীজ-কবচ অথবা নজর টিপের দরকার হবেনা। আল্লাহই হেফাজত করবেন।
দ্রষ্টব্য: অন্যের জন্য পড়লে أَعُوذُ (আউযু) এর জায়গায় أُعِيدُكَ (উয়ীযু) বলা ভালো, দু'জনের ক্ষেত্রে أَعِيذُكُمَا আর অনেকজনের জন্য পড়লে أَعِيْذُكُمْ বলা ভালো। তবে সাধারণভাবে 'আউযুবিকালিমাতিল্লাহ...' বললেও সমস্যা নেই, এক্ষেত্রে নিয়ত করে নিতে হবে, কার জন্য পড়ছেন।
৬। ফেসবুক বা এরকম সোশ্যাল মিডিয়ায় অনর্থক শো-অফ না করা। অহেতুক ছবি বা ঘটনা পোস্ট দিয়ে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ছবি মানুষকে দেখিয়ে না বেড়ানো।
৭। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিজের প্রয়োজন পূরণ হওয়ার ক্ষেত্রে 'সেটা গোপন এবং লুকায়িত রাখার' মাধ্যমে সাহায্য লাভ করো। কেননা, প্রতিটা নিয়ামত লাভকারী হিংসার স্বীকার হয়ে থাকে। ১০১
মূলত এটা সফলতার একটা গোপন চাবিকাঠি। নিয়ামত গোপন রাখার মানে হলো, অন্যের সামনে অহেতুক নিজের বাণিজ্যের সম্পদের প্রশংসা না করা, সন্তানের প্রশংসা না করা, মেয়েরা নিজ স্বামীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা, ছেলেরা নিজ স্ত্রীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা। নিজের প্রজেক্ট বা ব্যবসার গোপন আলোচনা অন্যদের সামনে প্রকাশ না করা। অনেকে অহেতুক অন্যদের সামনে গল্প করেন, দৈনিক এত এত বিক্রি হচ্ছে, অমুক চালানে এত টাকা লাভ হলো। এমন আলোচনাও নজরের উৎস হতে পারে।
আমি একজন বোনের রুকইয়াহ করেছিলাম, যে তার বান্ধবীদের সামনে নিজের স্বামীর অনেক প্রশংসা করত। ইত্যবসরে তার একজন বান্ধবীর ডিভোর্স হয়ে যায়, এরপর এই হিংসুক বান্ধবী তাকে এবং তার স্বামীকে জাদু করে, যেন তাদের সংসার ভেঙ্গে যায় এবং তার স্বামীকে উক্ত বান্ধবী বিয়ে করতে পারে। আল্লাহ হেফাজত করুন।
মোদ্দাকথা, অহেতুক অন্যের সামনে নিজের কোনো নিয়ামতের আলোচনা না করাই উত্তম। প্রসঙ্গক্রমে করলেও কথার মাঝে যিকর করতে হবে। যেমন: 'আলহামদুলিল্লাহ, এ বছর ব্যবসায় কোনো লস যায়নি', 'আল্লাহর রহমতে আমার ছেলে বেশ ভালো রেজাল্ট করেছে', 'মা-শা-আল্লাহ! ভাবি, আপনি তো অনেক ভালো পিঠা বানান!' ইত্যাদি। আর অন্য কেউ যদি আপনার কিছুর প্রশংসা করে, তাহলে তিনি যিকর না করলে আপনার উচিত হবে যিকর করা। উদাহরণস্বরুপ: কেউ বলল, আপনার ছেলেটা তো অনেক কিউট!' আপনি বলুন, 'আলহামদুলিল্লাহ।'
আর অধিক পরিমাণে সালামের প্রচলন করুন, ইনশাআল্লাহ হিংসা দূর হয়ে যাবে।
সর্বোপরি আল্লাহর কাছে দুআ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। কেননা বদনজর সত্য। '১০২
টিকাঃ
৯৭. তিরমিযী: ৩৩৩৫
৯৮. তিরমিযী: ৩৫৫৯
৯৯. তিরমিযী: ৩৫৭৫
১০০. বুখারী: ৩১৯১
১০১. আল-মুজামুল আওসাত: ২৫২৯
১০২. ইবনু মাজাহ: ৩৫০৮
📄 বদনজর আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ
১. শরীরে জ্বর থাকা, কিন্তু থার্মোমিটারে না ওঠা। এ ধরনের অন্য কোনো অসুখ থাকা, কিন্তু মেডিকেল টেস্টে ধরা না পড়া।
২. একের পর এক রকমারি সব অসুখ লেগে থাকা। একটা অসুখ ভালো হতে না হতেই আরেকটা শুরু হওয়া।
৩. সাধারণ রোগব্যাধি (সর্দিকাশি, জ্বর, ডায়রিয়া ইত্যাদি) দেখা দিয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করেও তা ভালো না হওয়া, ওষুধ কাজ না করা।
৪. পড়াশোনা বা কাজে মন না বসা। নামায-যিকরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা। কিছুতেই মনোযোগ দিতে না পারা।
৫. প্রায়শই শরীর দুর্বল থাকা। বমি বমি ভাব লাগা।
৬. সবসময় ঘুমঘুম ভাব, সারাদিন হাই ওঠা।
৭. চেহারা মলিন, ফ্যাকাসে বা হলুদ হয়ে যাওয়া। চেহারায় লাল ছোপ-ছোপ দাগ হয়ে থাকা।
৮. ক্ষুধামন্দা, খাবারে রুচি না পাওয়া।
৯. অহেতুক মেজাজ বিগড়ে থাকা।
১০. বুক ধড়ফড় করা, দম বন্ধ বা অস্বস্তি লাগা।
১১. কাঁধ ভারি হয়ে থাকা। অহেতুক মাথা ঝিম ধরে থাকা।
১২. পেটে প্রচুর গ্যাস হওয়া। এজন্য ওষুধ খেয়ে তেমন ফায়দা না হওয়া।
১৩. অতিরিক্ত চুল পড়া। এজন্য ওষুধ বা শ্যাম্পু ব্যবহারে তেমন ফায়দা না হওয়া।
১৪. হাত-পায়ে মাঝেমধ্যেই ব্যথা করা। কিংবা পুরো শরীরে ব্যথা দৌড়ে বেড়ানো।
১৫. শরীরের বিভিন্ন জায়গার গোশতে গুটলির মতো অনুভব করা।
১৬. কোনো কারণ ছাড়াই কান্না আসা।
১৭. আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের সাথে দেখা করতে ভালো না লাগা।
১৮. ব্যবসা, চাকুরী, আয়-রোজগারে ঝামেলা লেগে থাকা। কোনোভাবেই উন্নতি না হওয়া।
১৯. যে কাজে ভাল দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেটা করতে গেলেই ঝামেলা বাধা, কিংবা অসুস্থ হয়ে যাওয়া।
২০. স্বপ্নের মাঝে বোরখা পরা কাউকে দেখা, যার শুধু চোখ খোলা থাকে কিংবা লাল চোখওয়ালা মানুষ দেখা।
২১. স্বপ্নে মরা মানুষ দেখা, অথবা নিজেকে মৃত অবস্থায় দেখা।
কয়েকটি লক্ষণীয় বিষয়:
১. উল্লিখিত বিষয়গুলো এমন না যে, শুধু বদনজরের কারণেই এসব হয়। অন্য কারণেও হতে পারে। যেমন এর কয়েকটা 'জিন-আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণের' মাঝেও পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা বা অন্যান্য সমস্যা কোথায়।
২. এই লক্ষণগুলোর মাঝে সবগুলোই মিলতে পারে। এমন না। যদি অল্প কয়েকটা মিলে তবে কম, আর যদি অনেকগুলো মিলে যায়, তাহলে বুঝে নিতে হবে যে নজরের সমস্যা অনেক বেশি আছে। আর স্বপ্নের বিষয়গুলো যদি মাঝেমধ্যেই দেখা যায় তাহলে বদনজরের সমস্যা আছে বলে ধরে নেওয়া যাবে। অন্যথায় আউযুবিল্লাহ পড়ুন এবং এই চিন্তা বাদ দিন।
৩. কারও যদি বদনজরের অল্প কিছু লক্ষণ মিলে যায়, আর পাশাপাশি জিন-আক্রান্ত হওয়ার কিছু লক্ষণও মিলে যায় তাহলে সম্ভবত তার ওপর জিনের নজর লেগেছে। এটাকে আমাদের দেশে ‘বাতাসলাগা’ বলে। এই জিনের নজরের ক্ষেত্রে আরও কিছু সমস্যা হয়, যেমন: বাচ্চাদের অহেতুক খুব ভয় পাওয়া, অস্বাভাবিক কান্নাকাটি করা, বড়দের ক্ষেত্রে এমনটা মনে হওয়া যে, ‘আশেপাশে কেউ আছে’ কিংবা ঘরে কেউ না থাকা সত্ত্বেও ছায়া চলাচল করতে দেখা রাতে ঠিক মতো ঘুম না হওয়া, ওয়াসওয়াসা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।
তো যাই হোক, এজন্য লাগাতার কিছু দিন বদনজরের রুকইয়াহ করলেই সুস্থ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। আর বদনজরের সমস্যা সাধারণত লক্ষণ শুনেই বুঝা যায়, এরপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য চাইলে রুকইয়াহ করে দেখতে পারেন।
বদ নজর আক্রান্ত হলে রুকইয়াহয় যেসব প্রতিক্রিয়া হতে পারে...
বদনজর আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করলে অথবা রুকইয়ার অডিও শুনলে বিভিন্ন প্রভাব দেখা যায়, যেমন: প্রচুর ঘুম আসা বা ক্লান্তি লাগা, বারবার হাই ওঠা, হাত-পা শিরশির করা, শরীর চুলকানো বা ঘেমে যাওয়া, রুকইয়ার পর প্রস্রাব হলুদ হওয়া ইত্যাদি। এর সবগুলোই হবে এরকম না, কিছু কিছু মিলতে পারে। বিশেষত রুকইয়ার সময় প্রচুর ঘুম আসা আর পরে প্রস্রাব হলুদ হওয়া—এগুলো সাধারণত বদনজর আক্রান্ত হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বদনজর, জিন, জাদু এসবে আক্রান্ত হওয়ার আগেই যদি প্রতিরোধ করা যায় তাহলে সবচেয়ে ভালো। প্রতিকারের চেয়ে যে প্রতিরোধ উত্তম, তা তো আমরা সবাই জানি। তাই না?