📘 রুকইয়াহ > 📄 বদনজরের প্রামাণিকতা—হাদীসে রাসূল ﷺ থেকে

📄 বদনজরের প্রামাণিকতা—হাদীসে রাসূল ﷺ থেকে


১। বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে আছে-
حَدَّثَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ ، عن رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ أَحَادِيثَ مِنْهَا ، وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " الْعَيْنُ حَقٌّ"
“আবু হুরায়রা রা. আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বদনজর সত্য।” ৮১

২। মুসলিম এবং মুসনাদে আহমাদের হাদীস-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ ، عن النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : الْعَيْنُ حَقٌّ وَلَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابَقَ الْقَدَرَ سَبَقَتْهُ الْعَيْنُ ، وَإِذَا اسْتُغْسِلْتُمْ فَاغْسِلُوا
“আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বদনজর সত্য, ভাগ্যের চেয়েও আগে বেড়ে যায় এমন কিছু যদি থাকত তাহলে অবশ্যই সেটা হতো বদনজর। যদি তোমাদের বদনজরের জন্য গোসল করতে বলা হয় তবে গোসল করো।” ৮২

৩। আব্দুর রহমান বিন জাবির রা. থেকে বর্ণিত,
وَحَدَّثَنِي عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ جَابِرٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : " جُلُّ مَنْ يَمُوتُ مِنْ أُمَّتِي بَعْدَ قَضَاءِ اللَّهِ وَكِتَابِهِ ، وَقَدَرِهِ بِالْأَنْفُسِ " . ، يَعْنِي بِالْعَيْنِ
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদীরের পর আমার উম্মতের সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হবে বদনজরের কারণে।” ৮৩

৪। এই বিষয়ে আরেকটি হাদীস
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ فَإِنَّ الْعَيْنَ حَقٌّ
"আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। কেননা বদনজর সত্য।” ৮৪

৫। অন্য আরেকটি হাদীস রয়েছে মুসনাদে শিহাবে। হাদীসটির সনদ হাসান।
عَنْ جَابِرٍ ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِنَّ الْعَيْنَ لَتُدْخِلُ الرَّجُلَ الْقَبْرَ ، وَتُدْخِلُ الْجَمَلَ الْقِدْرَ
“জাবির রা. এবং আবূ যর গিফারি রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বদনজর মানুষকে কবর পর্যন্ত আর উটকে রান্নার পাতিল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।” ৮৫

৬। মুসনাদে আহমাদের একটি হাদীস এরকম-
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، - رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا - قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ - : " الْعَيْنُ حَقٌّ تَسْتَنْزِلُ الْحَالِقَ
"আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বদনজর মানুষকে উঁচু থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।” ৮৬

৭। জিন এবং মানুষ উভয়ের দ্বারাই বদনজর লাগতে পারে। যেমন এই হাদীসে বলা হচ্ছে-
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَعَوَّذُ مِنْ الْجَانِ وَعَيْنِ الْإِنْسَانِ حَتَّى نَزَلَتْ الْمُعَوِّذَتَانِ فَلَمَّا نَزَلَتَا أَخَذَ بِهِمَا وَتَرَكَ مَا سِوَاهُمَا
"আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বে জিনের বদনজর এবং মানুষের বদনজর থেকে আশ্রয় চেয়ে দুআ করতেন। এক সময় মুআওউইজাতাইন (সূরা ফালাক এবং সূরা নাস) নাজিল হলো। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোকে গ্রহণ করলেন এবং অন্য সবকিছু বাদ দিলেন।” ৮৭
উল্লেখ্য, আমাদের দেশে জিনের নজর লাগার বিষয়টি 'বাতাসলাগা' বলে প্রসিদ্ধ।

৮। আরেকটি হাদীস-
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى فِي بَيْتِهَا جَارِيَةً فِي وَجْهِهَا سَفْعَةٌ فَقَالَ اسْتَرْقُوا لَهَا فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةَ
"উম্মু সালামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে এক বালিকাকে দেখলেন, যার চেহারায় জিনের বদনজরের চিহ্ন ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই মেয়ের জন্য রুকইয়াহ (ঝাড়ফুঁক) করো। কারণ, তার বদনজর লেগেছে।” ৮৮

৯। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ের আরেকটি ঘটনা-
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَاهُ ، يَقُولُ: اغْتَسَلَ أَبِي سَهْلُ بْنُ حُنَيْفٍ بِالْخَرَّارِ فَنَزَعَ جُبَّةً كَانَتْ عَلَيْهِ وَعَامِرُ بْنُ رَبِيعَةَ يَنْظُرُ ، قَالَ: وَكَانَ سَهْلْ رَجُلًا أَبْيَضَ حَسَنَ الْجِلْدِ ، قَالَ : فَقَالَ لَهُ عَامِرُ بْنُ رَبِيعَةَ: مَا رَأَيْتُ كَالْيَوْمِ وَلَا جِلْدَ عَذْرَاءَ ، قَالَ : فَوُعِكَ سَهْلٌ مَكَانَهُ وَاشْتَدَّ وَعْكُهُ ، فَأْتِيَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأُخْبِرَ أَنَّ سَهْلًا وُعِكَ ، وَأَنَّهُ غَيْرُ رَائِحِ مَعَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ، فَأَتَاهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَهُ سَهْلٌ بِالَّذِي كَانَ مِنْ أَمْرٍ عَامِرٍ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " عَلَامَ يَقْتُلُ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ ؟ أَلَّا بَرَكْتَ إِنَّ الْعَيْنَ حَقٌّ تَوَضَّأُ لَهُ " ، فَتَوَضَّأَ لَهُ عَامِرٌ ، فَرَاحَ سَهْلٌ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْسَ بِهِ بَأْسٌ
“সাহল ইবনু হুনাইফ রা. কোথাও গোসলের জন্য জামা খুলেছিলেন। তিনি অত্যন্ত সুশ্রী এবং ফর্সা অবয়বের অধিকারী ছিলেন। বদরী সাহাবী আমির ইবনু রবীআ রা. তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, এত সুন্দর কাউকে আমি জীবনে কখনো দেখি নি; এমনকি কুমারীর চামড়াও তো এর সঙ্গে তুলনীয় নয়। আমির রা. কথাটা বলার পরপরই সাহল সেখানে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। তাঁর গায়ে জ্বর চলে আসল এবং তিনি জ্বরের প্রচণ্ডতায় ছটফট করতে লাগলেন। অন্য সাহাবীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবস্থা জানালেন। সংবাদ পেয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে আসলেন। সাহল রা.-কে হঠাৎ করে এমনটা হবার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি পুরো ঘটনা খুলে বললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, 'তোমরা কেন তোমাদের ভাইকে নজর দিয়ে হত্যা করছ? তুমি যখন তাকে দেখলে, তখন বরকতের দুআ করলে না কেন? নিশ্চয় বদনজর সত্য।' (অর্থাৎ দুআ করলে আর নজর লাগতো না) এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমির ইবনু রবিআ রা.-কে বললেন, তার জন্য ওযু করো। অনন্তর তিনি ওযু করলেন। তারপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে ওযুর পানি সাহল রা.-এর গায়ে ঢেলে দিলেন। তখন আল্লাহর রহমতে তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন।” ৮৯
এই ঘটনা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। আমরা বুঝতে পারি, কারও দ্বারা নজর লেগেছে-এর মানেই সে ব্যক্তিটি খারাপ নয়; বরং ভালো মানুষেরও নজর লাগতে পারে। এখানে আমির ইবনু রাবীআ রা. তো বদরী সাহাবী; আল্লাহ তাআলা যাদের সব পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। এরকম মানুষের দ্বারাই যখন নজর লেগেছে তখন অন্যদের থেকে তো লাগতেই পারে।

১০। অনেকের খুব দ্রুত নজর লেগে যায়। এ ব্যাপারেও হাদীস রয়েছে-
عن جَابِرِ بْن عَبْدِ اللَّهِ ، يَقُولُ : " رَخَّصَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِآلِ حَزْمٍ فِي رُقْيَةِ الْحَيَّةِ ، وَقَالَ لِأَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ : " مَا لِي أَرَى أَجْسَامَ بَنِي أَخِي ضَارِعَةً تُصِيبُهُمُ الْحَاجَةُ ؟ ، قَالَتْ : لَا ، وَلَكِنْ الْعَيْنُ تُسْرِعُ إِلَيْهِمْ ، قَالَ : " ارقيهِمْ " ، قَالَتْ : فَعَرَضْتُ عَلَيْهِ ، فَقَالَ : " ارْقِيهِمْ
"জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাযম পরিবারকে সাপে কাটার জন্য রুকইয়াহ করার অনুমতি দেন। আর আসমা বিনত উমায়স রা.-কে বললেন, কী ব্যাপার, আমি যে আমার ভাই জাফর (ইবনু আবি তালিব) রা.-এর সন্তানদের রুগ্ন-দুর্বল দেখতে পাচ্ছি! তারা কি কোনো সমস্যায় ভুগছে? আসমা রা. বললেন, না, বরং তাদের দ্রুত নজর লেগে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাদের জন্য রুকইয়াহ করো। তিনি বললেন, তখন আমি তাঁকে (দুআটি) শোনালাম। তিনি বললেন, (ঠিক আছে) তুমি তাদের রুকইয়াহ করো।” ৯০
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে এমন অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে—বদনজর সত্য এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই।

টিকাঃ
৮১. মুসলিম: ৪০৬৪
৮২. মুসলিম: ৪০৬৫
৮৩. মুসনাদে আবূ দাউদ ত্বয়ালিসী: ১৮৫৮, সনদ হাসান
৮৪. ইবনু মাজাহ: ৩৫০৮
৮৫. মুসনাদে শিহাব: ৯৯০
৮৬. মুসনাদে আহমাদ: ২৪৭৩, মুসতাদরাকে হাকীম
৮৭. ইবনু মাজাহ : ৩৫১১, তিরমিযী: ২০৫৮
৮৮. বুখারী: ৫৪০৭, মুসলিম: ৪০৭৪
৮৯. মুয়াত্তা মালিক: ১৬৮১
৯০. মুসলিম: ৪০৮২

📘 রুকইয়াহ > 📄 আকাবির এবং আসলাফের মূল্যায়ন

📄 আকাবির এবং আসলাফের মূল্যায়ন


আমরা ইতিমধ্যে বদনজরের বাস্তবতা নিয়ে কুরআন, হাদীস এবং তাফসীর গ্রন্থ থেকে আলোচনা করেছি। এবার আমরা সালাফে সালেহীনের দৃষ্টিতে এর মূল্যায়ন জানব।
১. ইবনু কাসীর রহ. বলেন, বদনজরের প্রতিক্রিয়া সত্য, যা আল্লাহর নির্দেশেই হয়ে থাকে। ৯১
২. হাফিজ ইবনু হাজার রহ. বদনজরের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, 'বদনজর হলো কোনো উত্তম বস্তুর প্রতি কোনো খারাপ লোকের হিংসাত্মক দৃষ্টিপাত, যার কারণে উক্ত বস্তুর ক্ষতি হয়। ৯২
তবে এটা নজরের সামগ্রিক ছবি নয়; আংশিক মাত্র। হিংসার জন্য যেমন নজর লাগে, তেমনই অতিমাত্রায় মুগ্ধতার জন্যও লাগে। যেমনটা সাহল ইবনু হুনাইফ রা.-এর ঘটনায় একটু আগে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেছেন, কিছু লোক অজ্ঞতার কারণে বদনজরের অস্তিত্ব অস্বীকার করে থাকে। যুগে যুগে জ্ঞানী ব্যক্তিদের মাঝে যদিও-বা নজর লাগার কারণ, পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে মতপার্থক্য আছে, তবে কেউই একে অস্বীকার করে নি।
যাদুল মা'আদ গ্রন্থে হাফিজ ইবনুল কায়্যিম রহ. এ বিষয়ে বেশ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, যেখান থেকে কিছু পয়েন্ট উল্লেখ করা যায়। তাঁর মতে—
'আল্লাহ মানুষের শরীরে এবং আত্মায় বিভিন্ন প্রকার ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। বদনজরের ব্যাপারটা মূলত আত্মিক। কোনো কিছুর প্রতি মুগ্ধতা অথবা হিংসা থেকে এটা অন্তরে সৃষ্টি হয়ে চোখের মাধ্যমে প্রভাব ফেলে। এখানে চোখের শক্তি নেই। এজন্য অন্ধ ব্যক্তির বদনজরও লাগতে পারে।'
- বদনজর কখনো যোগাযোগের মাধ্যমে, কখনো সরাসরি দৃষ্টিপাতে, কখনো বদ দুআ বা তাবিজের মাধ্যমে, আবার কখনো ধ্যানের মাধ্যমেও হয়ে থাকে।
- কখনো মানুষের নিজের নজর নিজেরই লাগে।
- নজর ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যেকোনো ভাবে লাগতে পারে। ৯৩
বদনজর কখনো রোগের কারণ হয়, আবার কখনো সরাসরি ক্ষতি করে। নজর লেগে কারও জ্বর চলে আসতে পারে, ডায়রিয়া হতে পারে (নজর লেগে পেট খারাপ হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার) আবার নজর কখনো হৃদরোগের কারণও হতে পারে। একের পর এক অসুখ লেগেই থাকা, অথবা অনেক ওষুধ খেয়েও কোনোই উপকার না পাওয়া, কিংবা যে কাজেই হাত দেওয়া হয় সেটাতেই লোকসান হওয়া-এসব সাধারণত বদনজরের কারণে হয়। নজর লেগে ফসল কিংবা গাছের ফলও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৪. মুফতী শফী রহ. সূরা ইউসুফ: ৬৭ এবং ৬৮ নং আয়াত প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন এবং সেই আলোচনার উপসংহারে বলেছেন-
'আলোচ্য আয়াত দুটি থেকে কয়েকটি মাসআলা ও বিধান জানা যায়:
(১) বদনজর লাগার বিষয়টি সত্য। সুতরাং ক্ষতিকর খাদ্য ও কাজকর্ম থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টার মতো নজর থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা-তদবীর করাও একইভাবে বৈধ।
(২) মানুষের হিংসা থেকে আত্মরক্ষার জন্য গুণ বা নিয়ামত গোপন রাখা জায়িয।
(৩) ক্ষতিকর কিছুর প্রভাব থেকে আত্মরক্ষার জন্য বাহ্যিক চেষ্টা করা তাওয়াককুল কিংবা নবীদের মর্যাদার পরিপন্থী নয়।
(৫) যদি কেউ কারও সম্পর্কে আশঙ্কা পোষণ করে যে, সে দুঃখ-কষ্টে পতিত হবে, তবে তাকে অবহিত করা এবং আত্মরক্ষার সম্ভাব্য উপায় বলে দেওয়া উত্তম, যেমনটা ইয়াকুব আ. করেছিলেন।
(৫) যদি কারও কোনো গুণ অথবা নিয়ামত নিজের দৃষ্টিতে বিস্ময়কর ঠেকে এবং নজর লেগে যাওয়ার আশঙ্কা হয়, তবে তা দেখে বারাকাল্লাহ অথবা মাশা-আল্লাহ বলা উচিত। যাতে অন্যের কোনো ক্ষতি না হয়।
(৬) বদনজর থেকে রক্ষার জন্য সম্ভাব্য তদবীর করা জায়িয; যার মধ্যে দুআ-ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি দ্বারা প্রতিকার করা অন্যতম। যেমন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাফর ইবনু আবি তালিব রা.-এর সন্তানদের জন্য ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে চিকিৎসা করার অনুমতি দিয়েছিলেন।
(৭) একজন মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, প্রত্যেক কাজে আসল ভরসা আল্লাহর ওপর রাখা। কিন্তু বাহ্যিক ও বস্তুভিত্তিক উপায়াদিকেও উপেক্ষা না করা; বরং সাধ্য অনুযায়ী বৈধ উপায়- উপকরণ অবলম্বন করতে ত্রুটি না করা। ইয়াকুব আ. তা-ই করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাই শিক্ষা দিয়েছেন। ৯৪

টিকাঃ
৯১. তাফসীরে ইবনু কাসীর: ৪/৪১০
৯২. ফাতহুল বারী: ১০/২০০
৯৩. যাদুল মা'আদ: ১/১৬৩-১৬৫
৯৪. মাআরিফুল কুরআন: ৫/৯৫-১০০ (সংক্ষিপ্ত সংস্করণে ৬৮০পৃ.)

📘 রুকইয়াহ > 📄 নজর কখন লাগে এবং কখন লাগে না

📄 নজর কখন লাগে এবং কখন লাগে না


কুদৃষ্টির উদাহরণ সেই বিষাক্ত তীরের মতো, যা একসাথে অনেকগুলো ছোড়া হয়; কিন্তু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে তার অধিকাংশই ব্যর্থ হয়। হিংসুকদের প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি ঈর্ষাকাতর চাহনি কিংরা অতিমাত্রার মুগ্ধতা, যেখানে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না-এসবই বদনজরের উৎস। তবে কেউ মাসনূন দুআ-যিকির ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা করলে এসবে সহজে আক্রান্ত হয় না।
তবে সাধারণত নজর লাগে বিরল এবং অপ্রসিদ্ধ বস্তুতে। উদাহরণস্বরূপ: কেউ একজন ভালো কণ্ঠের জন্য বিখ্যাত, এই অবস্থায় তার কণ্ঠে নজর লাগবে না-এটাই স্বাভাবিক। কোনো এলাকায় সবারই ২-৪ তলা বাড়ি, এখানে কেউ ৫ তলা করলে তা স্বাভাবিক ব্যাপার; এখানে নজর লাগার কথা নয়। কিন্তু আপনি এমন এলাকায় গিয়ে বিলাসবহুল ৩ তলা বাড়ি বানালেন, যেখানে ভালো কোনো একতলা বাড়িই দুর্লভ। খুবই সম্ভাবনা আছে, আপনার বাড়িতে নজর লাগবে, সেখানে আপনি শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন না, আর পরিবারে ঝগড়া লেগেই থাকবে।

বদনজর কীভাবে আমাদের ক্ষতি করে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার বদনজরের সাথে ভাগ্যের তুলনা করেছেন। যেমন: 'আল্লাহর ফায়সালা এবং ভাগ্যের পরে আমার উম্মাত সবচেয়ে বেশি মারা যাবে বদনজরের কারণে।' ৯৫ অথবা 'ভাগ্যের চেয়েও আগে বেড়ে যায় এমন কিছু যদি থাকে তবে তা হলো বদনজর। '৯৬
তাই আমরা বলতে পারি, নজরের ব্যাপারটা কিছুটা ভাগ্যের মতোই। অর্থাৎ ভাগ্য যেমন রোগ-ব্যাধি থেকে শুরু করে মৃত্যুর কারণ হয়, তেমনি নজর প্রথমে হয়তো মারাত্মক কোনো উপসর্গের কারণ হয়, তারপর সেখান থেকে প্রাণঘাতী জটিল কোনো রোগ হয়, আর তারপর কবর। এছাড়াও নজরের কারণে মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগে, যার ফলে কেউ কেউ আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে।
কীভাবে 'বদনজর উটকে ডেকচিতে, আর মানুষকে কবরে পৌঁছে দেয়'- আশা করছি, তা এখন অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে।

টিকাঃ
৯৫. মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ১৮৫৮
৯৬. মুসলিম: ৪০৬৫

📘 রুকইয়াহ > 📄 বদনজর থেকে বাঁচার উপায়

📄 বদনজর থেকে বাঁচার উপায়


১। কথার মাঝে আল্লাহর যিকির করা (এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা একটু পর আসছে)
২। মেয়ে হলে অবশ্যই শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পর্দা করা।
৩। হাদীসে বর্ণিত সকাল সন্ধ্যার দুআগুলো পড়া, বিশেষত:
بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
বিসমিল্লা-হিল্লাযি লা-ইয়াদুররু মা'আসমিহি শাইউং ফিলআরদি ওয়ালা-ফিসসামা-ই, ওয়াহুওয়াস সামি 'উল 'আলিম।
সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া। ৯৭
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ .
আ'উযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মা-তি, মিং-শাররি মা-খলাক।
সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া। ৯৮
• সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়া। ৯৯
৪। আর বাচ্চাদের সুরক্ষার জন্য কর্তব্য হচ্ছে, মাঝেমধ্যেই সূরা ফালাক, নাস পড়ে বাচ্চাদের গায়ে ফুঁ দেওয়া, যেমনটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও করেছেন।
৫। নজর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার একটা দুআ আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা পড়ে হাসান এবং হুসাইন রা.-কে ফুঁ দিয়ে দিতেন। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই একই দুআ মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম আ. নিজের ছেলেদের (অর্থাৎ ইসমাইল এবং ইসহাক আ.) জন্য পড়তেন। দুআটি হচ্ছে—
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উচ্চারণ: আউযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মাহ। মিং কুল্লি শাইত্বা-নিন-ওয়াহা-ম্মাহ। ওয়ামিং কুল্লি আইনিন লা-ম্মাহ। ১০০
এই দুআ সকাল-সন্ধ্যায় কয়েকবার পড়ে বাচ্চাদের ফুঁ দিয়ে দেবেন, নিজের জন্যও পড়বেন। ইনশাআল্লাহ বদনজর থেকে বাঁচতে তাবীজ-কবচ অথবা নজর টিপের দরকার হবেনা। আল্লাহই হেফাজত করবেন।
দ্রষ্টব্য: অন্যের জন্য পড়লে أَعُوذُ (আউযু) এর জায়গায় أُعِيدُكَ (উয়ীযু) বলা ভালো, দু'জনের ক্ষেত্রে أَعِيذُكُمَا আর অনেকজনের জন্য পড়লে أَعِيْذُكُمْ বলা ভালো। তবে সাধারণভাবে 'আউযুবিকালিমাতিল্লাহ...' বললেও সমস্যা নেই, এক্ষেত্রে নিয়ত করে নিতে হবে, কার জন্য পড়ছেন।
৬। ফেসবুক বা এরকম সোশ্যাল মিডিয়ায় অনর্থক শো-অফ না করা। অহেতুক ছবি বা ঘটনা পোস্ট দিয়ে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ছবি মানুষকে দেখিয়ে না বেড়ানো।
৭। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিজের প্রয়োজন পূরণ হওয়ার ক্ষেত্রে 'সেটা গোপন এবং লুকায়িত রাখার' মাধ্যমে সাহায্য লাভ করো। কেননা, প্রতিটা নিয়ামত লাভকারী হিংসার স্বীকার হয়ে থাকে। ১০১
মূলত এটা সফলতার একটা গোপন চাবিকাঠি। নিয়ামত গোপন রাখার মানে হলো, অন্যের সামনে অহেতুক নিজের বাণিজ্যের সম্পদের প্রশংসা না করা, সন্তানের প্রশংসা না করা, মেয়েরা নিজ স্বামীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা, ছেলেরা নিজ স্ত্রীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা। নিজের প্রজেক্ট বা ব্যবসার গোপন আলোচনা অন্যদের সামনে প্রকাশ না করা। অনেকে অহেতুক অন্যদের সামনে গল্প করেন, দৈনিক এত এত বিক্রি হচ্ছে, অমুক চালানে এত টাকা লাভ হলো। এমন আলোচনাও নজরের উৎস হতে পারে।
আমি একজন বোনের রুকইয়াহ করেছিলাম, যে তার বান্ধবীদের সামনে নিজের স্বামীর অনেক প্রশংসা করত। ইত্যবসরে তার একজন বান্ধবীর ডিভোর্স হয়ে যায়, এরপর এই হিংসুক বান্ধবী তাকে এবং তার স্বামীকে জাদু করে, যেন তাদের সংসার ভেঙ্গে যায় এবং তার স্বামীকে উক্ত বান্ধবী বিয়ে করতে পারে। আল্লাহ হেফাজত করুন।
মোদ্দাকথা, অহেতুক অন্যের সামনে নিজের কোনো নিয়ামতের আলোচনা না করাই উত্তম। প্রসঙ্গক্রমে করলেও কথার মাঝে যিকর করতে হবে। যেমন: 'আলহামদুলিল্লাহ, এ বছর ব্যবসায় কোনো লস যায়নি', 'আল্লাহর রহমতে আমার ছেলে বেশ ভালো রেজাল্ট করেছে', 'মা-শা-আল্লাহ! ভাবি, আপনি তো অনেক ভালো পিঠা বানান!' ইত্যাদি। আর অন্য কেউ যদি আপনার কিছুর প্রশংসা করে, তাহলে তিনি যিকর না করলে আপনার উচিত হবে যিকর করা। উদাহরণস্বরুপ: কেউ বলল, আপনার ছেলেটা তো অনেক কিউট!' আপনি বলুন, 'আলহামদুলিল্লাহ।'
আর অধিক পরিমাণে সালামের প্রচলন করুন, ইনশাআল্লাহ হিংসা দূর হয়ে যাবে।
সর্বোপরি আল্লাহর কাছে দুআ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। কেননা বদনজর সত্য। '১০২

টিকাঃ
৯৭. তিরমিযী: ৩৩৩৫
৯৮. তিরমিযী: ৩৫৫৯
৯৯. তিরমিযী: ৩৫৭৫
১০০. বুখারী: ৩১৯১
১০১. আল-মুজামুল আওসাত: ২৫২৯
১০২. ইবনু মাজাহ: ৩৫০৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00