📘 রুকইয়াহ > 📄 রুকইয়ার প্রস্তুতি

📄 রুকইয়ার প্রস্তুতি


আপনি যেখানে রুকইয়াহ করবেন, শুরুতেই সেখানকার পরিবেশ রুকইয়ার উপযোগী করে নেয়া উচিত। রুকইয়ার সাথে কোন সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হলে তার ব্যবস্থা আগেই করে রাখা উচিত, যেন মনোযোগে বিঘ্ন না ঘটে। রুকইয়ার প্রভাব অনেকাংশেই তিলাওয়াতের একাগ্রতার ওপর নির্ভর করে। আর নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত-

১. চিকিৎসা শুরুর পূর্বে ঘরে টাঙানো বা সাজিয়ে রাখা কোন জীবের ছবি, ছোট-বড় ভাস্কর্য বা মূর্তি, মানুষ বা প্রাণীর পুতুল থাকলে সরিয়ে ফেলতে হবে, যেন রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করতে পারে।
২. সেখানে উপস্থিত কেউ যেন অনৈসলামিক অবস্থায় না থাকে-সেটা খেয়াল রাখতে হবে। যেমন: কোনো পুরুষ রেশম (সিল্ক) বা স্বর্ণ পরে আছে, অথবা কোনো মহিলা বেপর্দা হয়ে আছে। আর কোনো বাদ্যযন্ত্র বা কুকুর ঘরে থাকা যাবে না।
৩. রোগীর সাথে কোনো তাবিজ থাকলে খুলে নষ্ট করে ফেলতে হবে। তাবিজ আল্লাহর ওপর তাওয়াককুলের প্রতিবন্ধক। অনেক সময় সাথে কুফরি তাবিজ থাকলে শরঈ রুকইয়াহ তো কাজ করেই না; বরং সমস্যা আরও বেড়ে যায়। (৪র্থ অধ্যায়ে 'জাদুর জিনিস অথবা তাবিজ নষ্টের নিয়ম' দ্রষ্টব্য)
৪. রোগী মহিলা হলে তাকে সম্পূর্ণ পর্দাবৃত অবস্থায় থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে রোগীর মাহরাম পুরুষ রুকইয়াহ করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয় তাহলে অতিরিক্ত কোনো ঝামেলা থাকে না। আর হ্যাঁ, জিনের চিকিৎসা করার জন্য রোগীর চেহারা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। উপরন্তু এটা ফিতনার উৎস হতে পারে।
৫. রাক্বী মাহরাম না হলে, মহিলা রোগীর কোনো মাহরাম যেন অবশ্যই উপস্থিত থাকে। যেমন: বাবা, ভাই অথবা স্বামী থাকতে পারে। একান্তই সম্ভব না হলে অন্তত মুরব্বি শ্রেণীর কোনো মহিলা আত্মীয়া যেন উপস্থিত থাকে। শরিয়তের বিধান যেন লঙ্ঘন না হয়-এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
৬. রোগী এবং তার পরিবারকে এ বিষয়ে ইসলামি দর্শন সংক্ষেপে বলবেন। যেমন: ‘এই চিকিৎসায় আমার কোনো ক্ষমতা নেই, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। আল্লাহ তাআলা কুরআনের মাঝে শিফা (আরোগ্য) রেখেছেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন দ্বারা চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন এজন্য আমরা রুকইয়াহ করব। সুস্থ হতে কতটুকু সময় লাগবে—সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। সুস্থতা পুরোটাই আল্লাহর হাতে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব।' আর শিরকি ঝাড়-ফুঁক বিষয়েও সতর্ক করবেন। প্রয়োজনে রোগীর দ্বীনদারি সম্পর্কে খোজ নিন। অনেককেই এমন পাওয়া যায়, যাদের একদম প্রাথমিক বিধান (যেমন: হালাল রুজি, পর্দা, ফরজ গোসল, পাক-নাপাক) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই।
৭. সমস্যার বিবরণ অনুযায়ী বদনজর, জিন ওয়াসওয়াসা, এবং জাদুতে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন করে নিশ্চিত হয়ে নিন।
এক্ষেত্রে সমস্যা ডায়াগনোসিসের উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে, রোগীর বর্ণনা শুনে যে সমস্যা মনে হয়েছে সেটার ব্যাপারে ভালোমতো জিজ্ঞেস করা, তবে অন্যান্য সমস্যার লক্ষণগুলোও কিছু কিছু খোজ নেয়া।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বদনজরের সমস্যা মনে হলে নজরের অনেকগুলো লক্ষণ সম্পর্কে প্রশ্ন করুন, সাথে জিন বা জাদুর খুব কমন কয়েকটি লক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন। যেমন: রাতে ঘুম হয় কি না, ব্যাকপেইন আছে কি না, মাথাব্যথা বা পেটব্যথা আছে কি না, প্রায়সময়ই মেজাজ খারাপ থাকে কি না ইত্যাদি। নির্দিষ্ট কোন জাদুর সমস্যা মনে হলে সে ব্যাপারে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করুন, আর জিন এবং বদনজর সম্পর্কে অল্প কিছু প্রশ্ন করুন। যেমন: একের পর এক অসুখ কিংবা আর্থিক ঝামেলা লেগে থাকে কি না, অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিক বা চুল পড়ার সমস্যা আছে কি না, ঘনঘন বোবায় ধরে কি না, কেমন স্বপ্ন দেখে, শরীরে কোথাও অনেক পুরাতন ব্যথা আছে কি না ইত্যাদি। তবে অনর্থক প্রশ্ন করে সময়ক্ষেপণ করা উচিত হবে না।
এভাবে রোগীর অবস্থা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা নিয়ে এরপর রুকইয়াহ শুরু করবেন, অথবা পরামর্শ দিয়ে দিবেন যেন সে নিজে সেলফ রুকইয়াহ করে।
৮. জিন দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করার সময় রোগীর ঠিক সামনে বা একদম কাছে কারও বসা উচিত না। তাহলে খবিস জিন তাকে আঘাত করার সুযোগ পায়। হাতের কাছে এমন কিছু থাকা উচিত না, যা দিয়ে সে নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করতে পারে। জাদু আক্রান্ত কারও রুকইয়াহ করার সময় আশেপাশে একটা পাত্র, ছোট বালতি অথবা এরকম কিছু রাখা উচিত। যেন বমি হতে লাগলে সেটা ব্যবহার করা যায়।
৯. চিকিৎসা করার পূর্বে রোগী এবং রাক্বী—উভয়েরই ওজু করে নেওয়া উচিত। আরেকটি বিষয় আবশ্যক নয়, তবে উত্তম হবে—দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বেশি থাকে—এ ধরনের কোনো সময়ে রুকইয়াহ করা। এর পাশাপাশি রাক্বী মিসওয়াক করে নিলে ভালো হয়।
১০. সবশেষে রাক্বী, রোগী এবং উপস্থিত সবাই ইস্তিগফার এবং দরুদ শরিফ পড়ে, আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে রুকইয়াহ শুরু করবেন。

📘 রুকইয়াহ > 📄 রুকইয়াহ করার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো

📄 রুকইয়াহ করার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো


অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে রুকইয়াহ করলে তেমন কোনো কষ্ট হয় না। রুকইয়াহ চলাকালীন কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও অথবা অল্প স্বল্প কষ্ট হলেও রুকইয়াহ শেষে দ্রুতই সামলে নেওয়া যায়। তবে অনেকের আবার বেশ ধকল যায়। কেউ এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েন যে, তখন আর রুকইয়াহ সেন্টার বা রাক্বীর বাসা থেকে নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার মতো অবস্থা থাকে না। নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এমন হয় যে, তারা সেলফ রুকইয়াহ করে এতটাই ক্লান্ত হয়ে যান যে, পরিবারের জন্য রান্নাবান্না পর্যন্ত আর করতে পারেন না।
এরকম সবসময়ই যে হয়, তা নয়। তবে কখনো কখনো এমন হয়ে থাকে। আর যদি আপনার ক্ষেত্রে বিষয়টা এভাবে ঘটে থাকে, প্রথমে তিন-চারদিন খুব কষ্ট হল, এরপর ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে তাহলে এতে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু যদি দেড়-দুই সপ্তাহ পরেও সমস্যা নিজ অবস্থায়ই বহাল থাকে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আগের মতই প্রকাশ পেতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে, আপনার নিজের অথবা আপনার রুকইয়াহ করার পদ্ধতিতে বোধ হয় কোনো সমস্যা রয়েছে। তাই এ ধরণের পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ কারও সাথে কথা বলুন।

রুকইয়াহ করার পর প্রতিক্রিয়া সামলে নিতে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা উচিত:
১. সময় দেওয়া। আপনি যদি রাক্কী হন তবে রুকইয়াহ করার পর রোগীকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে দিন। অবস্থা বিবেচনায় এটা ১০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত হতে পারে।
২. রুকইয়ার পর ওযু করতে বা হাত-মুখ ধুয়ে আসতে বলুন। এতে অনেক হালকা বোধ হয়।
৩. প্রস্রাব-পায়খানা করা। অনেক সময় শরীরের ভেতরের খারাপ বস্তু রুকইয়ার পর টয়লেটে গেলে বের হয়ে যায়।
৪. আরেকটি কাজ করা যেতে পারে, তাৎক্ষণিক সুস্থতার নিয়তে সূরা ফাতিহা এবং আয়াতে শিফা তিনবার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে খেয়ে নেওয়া। ইনশাআল্লাহ এতে অনেকটা ভালো লাগবে। প্রসিদ্ধ আয়াতে শিফাগুলো গ্রন্থের শেষে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
৫. রুকইয়ার গোসল করা। এটা খুব উপকারি। বলা যায়, এক্ষেত্রে সেরা সমাধান এটাই। বিশেষত রুকইয়াহ করতে গিয়ে অনেকের মাথাব্যথা, হাত-পা ব্যথা কিংবা পুরো শরীর ব্যথা হয়। কেউ কেউ অনেক দূর্বল হয়ে যান। এক্ষেত্রে রুকইয়াহ শেষে (সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, ইখলাস, ফালাক, নাস-৩ বার করে পড়ে পানিতে ফু দিয়ে অথবা অন্য যেকোন পদ্ধতিতে) রুকইয়ার গোসল করে নেওয়া উচিত। আল্লাহ চাইলে এতে যথেষ্ট আরাম পাওয়া যাবে।
জিনের রোগীর ক্ষেত্রে যদি কখনো কয়েকদিন রুকইয়াহ করা লাগে তাহলে প্রতিদিনের রুকইয়াহ শেষে রুকইয়ার গোসল করানো উচিত।
রোগের কারণে দূর্বলতা তো আছেই, এরপর আবার রুকইয়াহ করার ধকল, সব মিলিয়ে লাগাতার অনেকদিন রুকইয়াহ করলে সবারই শরীর দূর্বল হয়ে যায়। তাই এই দিনগুলোতে নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। তবে খাবার সময় অবশ্যই বিসমিল্লাহ বলবেন।
স্মতব্য যে, রুকইয়ার কারণে যদি শরীরে বা মাথায় ব্যথা হয়, তাহলে এজন্য ব্যথার ওষুধ খাবেন না। এর মন্দ প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
যদি বমি বমি ভাব আসে তাহলে আটকানোর চেষ্টা না করে বমি করার চেষ্টা করুন, পেটের মধ্যে খারাপ কিছু থাকলে যদি বমির সাথে বেরিয়ে আসে তাহলে আপনারই ভালো। মোট কথা, রুকইয়ার ইফেক্টের সাথে শরীরের খারাপ বিষয়গুলো বের হয়ে যায়, তাই এগুলোকে যেতে দিন। আর প্রয়োজনে ওপরে বলা কোন পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
তবে হ্যাঁ, সমস্যার মাত্রা বেশি মনে হলে তখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন। যেমন: জিনের রোগীর ওপর রুকইয়াহ করা হলো, এরপর রোগী ১০-১৫ মিনিট বেহুঁশ ছিল, তারপর জ্ঞান ফিরেছে। ঘটনা এ পর্যন্তই। এক্ষেত্রে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু যদি দেখেন কয়েক ঘন্টা হয়ে গেছে, মুখে অনেকব দেয়া হয়েছে, তবুও জ্ঞান ফিরছে না, তখন ডাক্তারের পরামর্শ নিন। অনুরূপভাবে বমি হওয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা। এক-দুইবার রক্ত বমি হয়েছে অথবা রুকইয়াহ চলাকালীন বমি বমি লেগেছে। এরপর ঠাণ্ডা। তাহলে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু যদি দেখেন ৫-৭ ঘণ্টা হয়ে গেছে, ১০-১২ বার রক্ত বমি হয়েছে, তবুও থামছে না, এমতাবস্থায় দ্রুত ডাক্তারের সহায়তা নিন।
কারও কারও ক্ষেত্রে শরীর থেকে একাধিক শয়তান বের হয়ে যাওয়ার সময় একটা একটা করে যেতে চায়, তাই এমন ক্ষেত্রে ধাক্কা সামলে নিতে কিছুটা দেরি লাগতে পারে। অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00