📄 একজন ভালো রাকীর বৈশিষ্ট্য
নিজের জন্য নিজে রুকইয়াহ করলে তেমন বিশেষ কিছু হওয়ার দরকার নেই। প্রতিদিন অনেক অনেক নিয়মকানুন অনুসরণ করা বা বিরাট আমলদার হওয়ারও আবশ্যকতা নেই। তবে কেউ যদি জনগণের জন্য নিয়মিত রুকইয়াহ করতে চান, পারিভাষিকভাবে বললে ‘রাক্বী’ হতে চান তাহলে তার নিজের এবং পরিবারের জন্য কিছু বিষয় গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হয়। তাই এখন আমরা জানব, যিনি চিকিৎসা করবেন তার কী কী গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত—
১. আক্বীদা বিশুদ্ধ হওয়া। শিরক-বিদআতমুক্ত পরিচ্ছন্ন ইসলামী আক্বীদার অনুসারী হওয়া এবং আল্লাহর ওপর নিখাদ ভরসা থাকা।
২. আল্লাহর কালাম যে রোগব্যাধি, কুনজর, জাদু, জিনের ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম-এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। সুস্থতা কেবল আল্লাহরই হাতে, আমার কোন সাধ্য নেই মানুষকে সুস্থ করার-এটা খুব ভালভাবে অন্তরে গেঁথে নেয়া। কোন রুগী সুস্থতা লাভ করার খবর পেলে আত্মগর্বে আক্রান্ত না হওয়া বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। শোকরানা সালাত আদায় করা। এর ভাল প্রভাব রয়েছে।
৩. প্রতিদিনের মৌলিক আহকাম তথা নামায-রোজা, মাহরাম-গাইর মাহরাম ইত্যাদি বিষয়ে যত্নবান হওয়া। হালাল-হারামের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া, হারাম থেকে সম্পূর্ণভাবে বেঁচে থাকা।
৪. মানসিকভাবে দৃঢ় এবং সাহসী হওয়া। আর অধিক পরিমাণে যিকির-আযকার, নফল রোজা, তাহাজ্জুদ ইত্যাদির মাধ্যমে আত্মিকভাবেও সুদৃঢ় হওয়া।
৫. জিন জাতির অবস্থা তথা: প্রকারভেদ, সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, তাদের আচার-আচরণ, জিনেরা কীভাবে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, এরপর তারা কীভাবে বিদায় হয় ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত থাকা। জিনদের মাঝে মিথ্যা বলার প্রবণতা খুবই বেশি। এজন্য জিনদের স্বভাব, ধোঁকাবাজি, কূটকৌশলের ব্যাপারে সজাগ এবং সতর্ক থাকা।
৬. জাদু, জিন, বদনজর, ওয়াসওয়াসা-এই সব বিষয়গুলোতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে পর্যাপ্ত ধারণা রাখা। অজ্ঞতা নিয়ে কাজে নেমে অন্যদের কাজের ক্ষেত্র নষ্ট না করা।
৭. কুরআন তিলাওয়াত সহীহ-শুদ্ধ হওয়া। অশুদ্ধভাবে কুরআন পড়লে উল্টা গুনাহ হবে।
৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত প্রতিদিনের মাসনূন আমলগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া। বিভিন্ন সময়ে হেফাজতের দুআ যেমন: সকাল-সন্ধ্যার দুআ, ঘুমের আগের দুআ, বাড়ি থেকে বের হওয়ার দুআ, নির্জন জায়গায় গেলে পড়ার দুআ, টয়লেটে প্রবেশের দুআ-এসব গুরুত্বের সাথে আদায় করা। প্রয়োজনীয় কিছু দুআ এই গ্রন্থের 'মাসনূন আমল' অংশে পাওয়া যাবে। এছাড়াও অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের সহায়তা নিতে পারেন। যেমন: হিসনুল মুসলিম, হিসনে হাসীন, সিলাহুল মুমিন, আযকারে মাসনূনাহ, নবীজির দুআ, আযকার ইত্যাদি।
৯. নিজের পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া, তাদের প্রতিদিনের মাসনূন আমলগুলোতে অভ্যস্ত করে তোলা। তাদের অধিকারের ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকা। রুকইয়াহ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে যেন কোনোভাবেই তাদের হক নষ্ট না হয়।
১০. নিজের বাড়িকে গুনাহের সরঞ্জাম থেকে পবিত্র রাখা। যেমন: কোনো জীবের ছবি, ভাস্কর্য বা মূর্তি, মানুষ বা প্রাণীর পুতুল সাজিয়ে বা ঝুলিয়ে না রাখা। গান-বাজনা না চলা, বাদ্যযন্ত্র না রাখা; ঘরে যেন রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করতে পারে আর শয়তান না থাকতে পারে—সেই ব্যবস্থা করা।
১১. আর সর্বদা নিজের গুনাহের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকা। কারণ, আপনি নিজেই পরাজিত হলে অন্যের ওপর ভর করা শয়তানকে শায়েস্তা করবেন কীভাবে? তাই কখনো এমন কিছু না করা, যার মাধ্যমে শয়তান আপনার ওপর বিজয়ী হতে পারে এবং আপনাকে এই কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
১২. রাক্বী বিবাহিত হওয়া উত্তম। অবিবাহিত কারও তুলনায় বিবাহিত ব্যক্তি রুকইয়াহ করলে এর প্রভাব বেশি পড়ে। আর পুরুষ হওয়া আবশ্যক না। তবে নারীর তুলনায় পুরুষ হলে ভালো হয়।
১৩. রোগীর শারীরিক সুস্থতার প্রতি খেয়াল রাখার পাশাপাশি আল্লাহর সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দেয়া। দ্বীনদারির খোঁজখবর নেয়া এবং সে অনুযায়ী দ্বীনের দাওয়াত দেয়া, উৎসাহিত করা। কারণ অনেকেই দুনিয়াতে পূর্ণ সুস্থতা পায়না, এমন হতেই পারে। কিন্তু কেউ যেন আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
১৪. জিন বা জাদু-সংক্রান্ত সমস্যা যেহেতু মেয়েদের বেশি হয়, সুতরাং নারীঘটিত ফিতনার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে হবে। এ বিষয়ে কেউ অতি-সংবেদনশীল হলে, তাঁর জন্য ঢালাওভাবে মানুষের রুকইয়াহ করা উচিত হবে না।
১৫. সমস্যা সমাধানে রাক্বীকে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে। এজন্য উচিত হল, চিকিৎসকের শিষ্টাচার (Medical Ethics) সম্পর্কে ধারণা রাখা, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করা, রুকইয়ার ভিডিও যেনতেন ভাবে প্রচার করে শয়তানের ফাঁদে পা না দেওয়া। রোগীর সুস্থতার জন্য নাম উল্লেখ করে দুআ করা।
১৬. যেকোনো পরামর্শ বা প্রেসক্রিপশন দেওয়ার ক্ষেত্রে রোগীর সময় এবং সামর্থ্য বিবেচনায় রাখা উচিত। একইভাবে আরও উচিত হল এ বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখা—যাতে রোগীর কষ্ট কম হয়, রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়, সে অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচতে পারে, একে একে সবগুলো সমস্যা দূর হয়ে যায় ইত্যাদি।
১৭. প্রতিটি রাক্বীর জন্য সতর্কবার্তা হচ্ছে, এমন কিছু করবেন না, যাতে আপনার কারণে রুকইয়াহ শারইয়্যাহ'র প্রতি মানুষের মাঝে বিরূপ ধারণা বিস্তার করে। সর্বদা আল্লাহকে ভয় করা। অতিরিক্ত টাকার লোভ না করা, এটাকে ব্যবসা না; বরং খিদমাহ ও দাওয়ার সুযোগ হিসেবে নেওয়া।
আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন এবং কাজে ইখলাস দান করুন, আমীন।
আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
১. আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, ঝাড়ফুঁক করতে হলে ইজাযত বা অনুমতি লাগে। এ ব্যাপারে শাইখ আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর একটি উক্তি মালফুযাতে সংকলিত হয়েছে:
'তাবিজ-তুমারের ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম নিজেদের দোকান হেফাজত করার জন্য এই মাসআলা বানিয়ে নিয়েছেন যে, যতক্ষণ ইজাযত বা অনুমতি না হবে, ততক্ষণ তদবির কোনো কাজই করবে না। এগুলো সব অনর্থক কথা। এ কথার কোনই ভিত্তি নেই যে, ইজাযত বা অনুমতি হলে তবেই তদবির কাজে আসবে। সাধারণ মানুষের ধারণা হল, ইজাযত ছাড়া আসর হয় না। এর কোনো শরঈ দলিল নেই। বরং এটি একটি দলিলবিহীন ভিত্তিহীন কথা।...'
তবে হ্যাঁ, ব্যাপকভাবে রুকইয়াহ করতে চাইলে এ ব্যাপারে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি কারও রুকইয়াহ করা দেখে বুঝে নেওয়া ভালো। এটা নিজের সুবিধার জন্য। আর তিলাওয়াতের উদাহরণ হিসেবে ভালো কোনো ক্বারীর অনুসরণ করা যেতে পারে।
২. রুকইয়ার ক্ষেত্রে কাউকে হুবহু অনুসরণ করতে হবে ব্যাপারটা এমন না। বরং বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতিটা রাক্বীর নিজস্ব রুকইয়ার স্টাইল থাকে, শুরুতে না থাকলেও কদিনের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়। তবে এক্ষেত্রে নিজের রুকইয়াকে যথাসম্ভব সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা উচিত, আর শুরুতে অন্তত কয়েকদিন কারও রুকইয়াহ করা দেখে অভিজ্ঞতা অর্জন করা উচিত। বলা বাহুল্য, ইউটিউবে দেখা আর বাস্তবে দেখার মধ্যে যথেষ্ট তফাত রয়েছে।
৩. আর দুইটা বিষয়ে না বললেই নয়।
প্রথম বিষয় হচ্ছে, 'নিয়াত'। রুকইয়াহ করার বা শোনার সময় আপনি কেন রুকইয়াহ করছেন, এজন্য স্পষ্টভাবে নিয়াত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে কয়েকগুণ বেশি উপকার পাবেন।
এক্ষেত্রে সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করে নিয়াত করতে পারেন (যেমন: আমার পারিবারিক সমস্যার জন্য রুকইয়াহ করছি) অথবা নির্দিষ্ট বিষয়ের নিয়াতও করতে পারেন (যেমন: বদনজরের জন্য রুকইয়াহ করছি, জিনটাকে মেরে ফেলতে রুকইয়াহ করছি)। তবে চাইলে আমভাবেও নিয়াত করতে পারেন যে, আমার যত সমস্যা আছে সবগুলোর জন্য রুকইয়াহ করছি। তবে এভাবে ফায়দা কম হয়।
দ্বিতীয়ত: ডেডিকেশন। অর্থাৎ আপনার যে সমস্যা আছে আর আপনি সমাধান চান এজন্য আক্ষরিক অর্থেই আপনাকে সময় আর মেহনত নিবেদন করতে হবে। রুকইয়া করলাম, একটু ভালো লাগলো আর বন্ধ করে দিলাম। কদিন পর আবার করলাম, আবার বাদ দিলাম। এক বেলা করলাম আরেক বেলা করলাম না, এমন না। সত্যিকারার্থেই এর পেছনে লেগে থাকতে হবে একটা লম্বা সময়ের জন্য।
সমস্যা বেশি পুরনো হলে অন্তত কয়েক মাস সময় ভালভাবে চিকিৎসা করুন, এরপর একটু হালকা একটা কমন রুটিন ফলো করতে থাকুন।
৪. রুকইয়াহ শারইয়াহ দুইভাবে মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। একটা হল ঝাড়ফুঁক হিসেবে শব্দগুলো সরাসরি প্রভাব ফেলে। আরেকটা হল দুআ হিসেবে, অর্থাৎ এর দ্বারা আল্লাহর কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করা হয়। তাই রুকইয়ার সময় আপনার মন মস্তিষ্ক আল্লাহর দিকে রুজু করুন। আর সবসময় নিজের ঈমান-আমলের উন্নতির ফিকির করুন।
৫. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, চিকিৎসার মাঝে উদ্ভট এবং সন্দেহজনক পন্থা অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকা। কোথাও ঝাড়ফুঁকের কোনো পদ্ধতি দেখলে অতি উৎসাহী হয়ে আগ-পিছ না ভেবে, বিজ্ঞ আলিমদের মতামত না জেনে সেটা পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করতে না যাওয়া। যেহেতু আমাদের সমাজে সঠিক পন্থার রুকইয়ার চেয়ে শিরকি-কুফরির প্রচলনই বেশি, তাই এব্যাপারে খুব সতর্ক থাকা উচিত।
সেলফ রুকইয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা, কোথাও চটকদার একটা মন্ত্র বা তদবির পেলেন, আর সহীহ পন্থার চিকিৎসা বন্ধ করে ওইটা শুরু করে দিলেন, এমনটা না করা চাই। আর সঠিক এবং ভ্রান্ত আমলের মিশ্রণ ঘটানো তো আরও খারাপ।
📄 রুকইয়ার প্রস্তুতি
আপনি যেখানে রুকইয়াহ করবেন, শুরুতেই সেখানকার পরিবেশ রুকইয়ার উপযোগী করে নেয়া উচিত। রুকইয়ার সাথে কোন সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হলে তার ব্যবস্থা আগেই করে রাখা উচিত, যেন মনোযোগে বিঘ্ন না ঘটে। রুকইয়ার প্রভাব অনেকাংশেই তিলাওয়াতের একাগ্রতার ওপর নির্ভর করে। আর নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত-
১. চিকিৎসা শুরুর পূর্বে ঘরে টাঙানো বা সাজিয়ে রাখা কোন জীবের ছবি, ছোট-বড় ভাস্কর্য বা মূর্তি, মানুষ বা প্রাণীর পুতুল থাকলে সরিয়ে ফেলতে হবে, যেন রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করতে পারে।
২. সেখানে উপস্থিত কেউ যেন অনৈসলামিক অবস্থায় না থাকে-সেটা খেয়াল রাখতে হবে। যেমন: কোনো পুরুষ রেশম (সিল্ক) বা স্বর্ণ পরে আছে, অথবা কোনো মহিলা বেপর্দা হয়ে আছে। আর কোনো বাদ্যযন্ত্র বা কুকুর ঘরে থাকা যাবে না।
৩. রোগীর সাথে কোনো তাবিজ থাকলে খুলে নষ্ট করে ফেলতে হবে। তাবিজ আল্লাহর ওপর তাওয়াককুলের প্রতিবন্ধক। অনেক সময় সাথে কুফরি তাবিজ থাকলে শরঈ রুকইয়াহ তো কাজ করেই না; বরং সমস্যা আরও বেড়ে যায়। (৪র্থ অধ্যায়ে 'জাদুর জিনিস অথবা তাবিজ নষ্টের নিয়ম' দ্রষ্টব্য)
৪. রোগী মহিলা হলে তাকে সম্পূর্ণ পর্দাবৃত অবস্থায় থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে রোগীর মাহরাম পুরুষ রুকইয়াহ করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয় তাহলে অতিরিক্ত কোনো ঝামেলা থাকে না। আর হ্যাঁ, জিনের চিকিৎসা করার জন্য রোগীর চেহারা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। উপরন্তু এটা ফিতনার উৎস হতে পারে।
৫. রাক্বী মাহরাম না হলে, মহিলা রোগীর কোনো মাহরাম যেন অবশ্যই উপস্থিত থাকে। যেমন: বাবা, ভাই অথবা স্বামী থাকতে পারে। একান্তই সম্ভব না হলে অন্তত মুরব্বি শ্রেণীর কোনো মহিলা আত্মীয়া যেন উপস্থিত থাকে। শরিয়তের বিধান যেন লঙ্ঘন না হয়-এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
৬. রোগী এবং তার পরিবারকে এ বিষয়ে ইসলামি দর্শন সংক্ষেপে বলবেন। যেমন: ‘এই চিকিৎসায় আমার কোনো ক্ষমতা নেই, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। আল্লাহ তাআলা কুরআনের মাঝে শিফা (আরোগ্য) রেখেছেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন দ্বারা চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন এজন্য আমরা রুকইয়াহ করব। সুস্থ হতে কতটুকু সময় লাগবে—সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। সুস্থতা পুরোটাই আল্লাহর হাতে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব।' আর শিরকি ঝাড়-ফুঁক বিষয়েও সতর্ক করবেন। প্রয়োজনে রোগীর দ্বীনদারি সম্পর্কে খোজ নিন। অনেককেই এমন পাওয়া যায়, যাদের একদম প্রাথমিক বিধান (যেমন: হালাল রুজি, পর্দা, ফরজ গোসল, পাক-নাপাক) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই।
৭. সমস্যার বিবরণ অনুযায়ী বদনজর, জিন ওয়াসওয়াসা, এবং জাদুতে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন করে নিশ্চিত হয়ে নিন।
এক্ষেত্রে সমস্যা ডায়াগনোসিসের উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে, রোগীর বর্ণনা শুনে যে সমস্যা মনে হয়েছে সেটার ব্যাপারে ভালোমতো জিজ্ঞেস করা, তবে অন্যান্য সমস্যার লক্ষণগুলোও কিছু কিছু খোজ নেয়া।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বদনজরের সমস্যা মনে হলে নজরের অনেকগুলো লক্ষণ সম্পর্কে প্রশ্ন করুন, সাথে জিন বা জাদুর খুব কমন কয়েকটি লক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন। যেমন: রাতে ঘুম হয় কি না, ব্যাকপেইন আছে কি না, মাথাব্যথা বা পেটব্যথা আছে কি না, প্রায়সময়ই মেজাজ খারাপ থাকে কি না ইত্যাদি। নির্দিষ্ট কোন জাদুর সমস্যা মনে হলে সে ব্যাপারে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করুন, আর জিন এবং বদনজর সম্পর্কে অল্প কিছু প্রশ্ন করুন। যেমন: একের পর এক অসুখ কিংবা আর্থিক ঝামেলা লেগে থাকে কি না, অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিক বা চুল পড়ার সমস্যা আছে কি না, ঘনঘন বোবায় ধরে কি না, কেমন স্বপ্ন দেখে, শরীরে কোথাও অনেক পুরাতন ব্যথা আছে কি না ইত্যাদি। তবে অনর্থক প্রশ্ন করে সময়ক্ষেপণ করা উচিত হবে না।
এভাবে রোগীর অবস্থা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা নিয়ে এরপর রুকইয়াহ শুরু করবেন, অথবা পরামর্শ দিয়ে দিবেন যেন সে নিজে সেলফ রুকইয়াহ করে।
৮. জিন দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করার সময় রোগীর ঠিক সামনে বা একদম কাছে কারও বসা উচিত না। তাহলে খবিস জিন তাকে আঘাত করার সুযোগ পায়। হাতের কাছে এমন কিছু থাকা উচিত না, যা দিয়ে সে নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করতে পারে। জাদু আক্রান্ত কারও রুকইয়াহ করার সময় আশেপাশে একটা পাত্র, ছোট বালতি অথবা এরকম কিছু রাখা উচিত। যেন বমি হতে লাগলে সেটা ব্যবহার করা যায়।
৯. চিকিৎসা করার পূর্বে রোগী এবং রাক্বী—উভয়েরই ওজু করে নেওয়া উচিত। আরেকটি বিষয় আবশ্যক নয়, তবে উত্তম হবে—দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বেশি থাকে—এ ধরনের কোনো সময়ে রুকইয়াহ করা। এর পাশাপাশি রাক্বী মিসওয়াক করে নিলে ভালো হয়।
১০. সবশেষে রাক্বী, রোগী এবং উপস্থিত সবাই ইস্তিগফার এবং দরুদ শরিফ পড়ে, আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে রুকইয়াহ শুরু করবেন。
📄 রুকইয়াহ করার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো
অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে রুকইয়াহ করলে তেমন কোনো কষ্ট হয় না। রুকইয়াহ চলাকালীন কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও অথবা অল্প স্বল্প কষ্ট হলেও রুকইয়াহ শেষে দ্রুতই সামলে নেওয়া যায়। তবে অনেকের আবার বেশ ধকল যায়। কেউ এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েন যে, তখন আর রুকইয়াহ সেন্টার বা রাক্বীর বাসা থেকে নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার মতো অবস্থা থাকে না। নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এমন হয় যে, তারা সেলফ রুকইয়াহ করে এতটাই ক্লান্ত হয়ে যান যে, পরিবারের জন্য রান্নাবান্না পর্যন্ত আর করতে পারেন না।
এরকম সবসময়ই যে হয়, তা নয়। তবে কখনো কখনো এমন হয়ে থাকে। আর যদি আপনার ক্ষেত্রে বিষয়টা এভাবে ঘটে থাকে, প্রথমে তিন-চারদিন খুব কষ্ট হল, এরপর ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে তাহলে এতে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু যদি দেড়-দুই সপ্তাহ পরেও সমস্যা নিজ অবস্থায়ই বহাল থাকে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আগের মতই প্রকাশ পেতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে, আপনার নিজের অথবা আপনার রুকইয়াহ করার পদ্ধতিতে বোধ হয় কোনো সমস্যা রয়েছে। তাই এ ধরণের পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ কারও সাথে কথা বলুন।
রুকইয়াহ করার পর প্রতিক্রিয়া সামলে নিতে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা উচিত:
১. সময় দেওয়া। আপনি যদি রাক্কী হন তবে রুকইয়াহ করার পর রোগীকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে দিন। অবস্থা বিবেচনায় এটা ১০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত হতে পারে।
২. রুকইয়ার পর ওযু করতে বা হাত-মুখ ধুয়ে আসতে বলুন। এতে অনেক হালকা বোধ হয়।
৩. প্রস্রাব-পায়খানা করা। অনেক সময় শরীরের ভেতরের খারাপ বস্তু রুকইয়ার পর টয়লেটে গেলে বের হয়ে যায়।
৪. আরেকটি কাজ করা যেতে পারে, তাৎক্ষণিক সুস্থতার নিয়তে সূরা ফাতিহা এবং আয়াতে শিফা তিনবার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে খেয়ে নেওয়া। ইনশাআল্লাহ এতে অনেকটা ভালো লাগবে। প্রসিদ্ধ আয়াতে শিফাগুলো গ্রন্থের শেষে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
৫. রুকইয়ার গোসল করা। এটা খুব উপকারি। বলা যায়, এক্ষেত্রে সেরা সমাধান এটাই। বিশেষত রুকইয়াহ করতে গিয়ে অনেকের মাথাব্যথা, হাত-পা ব্যথা কিংবা পুরো শরীর ব্যথা হয়। কেউ কেউ অনেক দূর্বল হয়ে যান। এক্ষেত্রে রুকইয়াহ শেষে (সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, ইখলাস, ফালাক, নাস-৩ বার করে পড়ে পানিতে ফু দিয়ে অথবা অন্য যেকোন পদ্ধতিতে) রুকইয়ার গোসল করে নেওয়া উচিত। আল্লাহ চাইলে এতে যথেষ্ট আরাম পাওয়া যাবে।
জিনের রোগীর ক্ষেত্রে যদি কখনো কয়েকদিন রুকইয়াহ করা লাগে তাহলে প্রতিদিনের রুকইয়াহ শেষে রুকইয়ার গোসল করানো উচিত।
রোগের কারণে দূর্বলতা তো আছেই, এরপর আবার রুকইয়াহ করার ধকল, সব মিলিয়ে লাগাতার অনেকদিন রুকইয়াহ করলে সবারই শরীর দূর্বল হয়ে যায়। তাই এই দিনগুলোতে নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। তবে খাবার সময় অবশ্যই বিসমিল্লাহ বলবেন।
স্মতব্য যে, রুকইয়ার কারণে যদি শরীরে বা মাথায় ব্যথা হয়, তাহলে এজন্য ব্যথার ওষুধ খাবেন না। এর মন্দ প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
যদি বমি বমি ভাব আসে তাহলে আটকানোর চেষ্টা না করে বমি করার চেষ্টা করুন, পেটের মধ্যে খারাপ কিছু থাকলে যদি বমির সাথে বেরিয়ে আসে তাহলে আপনারই ভালো। মোট কথা, রুকইয়ার ইফেক্টের সাথে শরীরের খারাপ বিষয়গুলো বের হয়ে যায়, তাই এগুলোকে যেতে দিন। আর প্রয়োজনে ওপরে বলা কোন পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
তবে হ্যাঁ, সমস্যার মাত্রা বেশি মনে হলে তখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন। যেমন: জিনের রোগীর ওপর রুকইয়াহ করা হলো, এরপর রোগী ১০-১৫ মিনিট বেহুঁশ ছিল, তারপর জ্ঞান ফিরেছে। ঘটনা এ পর্যন্তই। এক্ষেত্রে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু যদি দেখেন কয়েক ঘন্টা হয়ে গেছে, মুখে অনেকব দেয়া হয়েছে, তবুও জ্ঞান ফিরছে না, তখন ডাক্তারের পরামর্শ নিন। অনুরূপভাবে বমি হওয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা। এক-দুইবার রক্ত বমি হয়েছে অথবা রুকইয়াহ চলাকালীন বমি বমি লেগেছে। এরপর ঠাণ্ডা। তাহলে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু যদি দেখেন ৫-৭ ঘণ্টা হয়ে গেছে, ১০-১২ বার রক্ত বমি হয়েছে, তবুও থামছে না, এমতাবস্থায় দ্রুত ডাক্তারের সহায়তা নিন।
কারও কারও ক্ষেত্রে শরীর থেকে একাধিক শয়তান বের হয়ে যাওয়ার সময় একটা একটা করে যেতে চায়, তাই এমন ক্ষেত্রে ধাক্কা সামলে নিতে কিছুটা দেরি লাগতে পারে। অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত。