📘 রুকইয়াহ > 📄 রুকইয়ার গোসল

📄 রুকইয়ার গোসল


রুকইয়ার গোসল খুবই উপকারি এবং জরুরি অনুষঙ্গ। রুকইয়াহ শেষ করে রুকইয়ার গোসল করলে অনেকটা স্বস্তি পাওয়া যায়। এছাড়া জিনের রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিদিন রুকইয়ার পর গোসল করিয়ে দিলে জিনের ওপর বেশ ধকল যায়, আর রোগী তাৎক্ষনিকভাবে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আর জাদু এবং বদনজরের চিকিৎসাতে তো রুকইয়ার গোসল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রুকইয়ার গোসলের বেশ কিছু পদ্ধতির বিবরণ হাদীস, আকাবির-আসলাফের বর্ণনা ও অন্যান্য আলিমদের থেকে পাওয়া যায়।

ক. হাদীসে নববীতে রুকইয়ার গোসল
১. বদনজর বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'ভাগ্যের চেয়েও আগে বেড়ে যায় এমন কিছু যদি থাকত তবে সেটা হতো বদনজর। যদি (বদনজরের জন্য) তোমাদের গোসল করতে বলা হয়, তবে এর জন্য গোসল করো।' ৫৪
২. আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, যে ব্যক্তির বদনজর অন্যের ওপর লাগত, তাকে ওযু করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হতো। এরপর ওই পানি দিয়ে সেই ব্যক্তিকে গোসল করানো হতো, যার ওপর বদনজর লেগেছে। ৫৫ এভাবে একবার গোসল করলেই সাধারণত বদনজর দূর হয়ে যায়।
৩. অন্য দুআ পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে গোসল করার উদাহরণও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কিরাম থেকে পাওয়া যায়। যেমন: সাবিত ইবনু কাইস ইবনু শামমাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি একবার অসুস্থ ছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসলেন। এরপর এই দুআটি পড়লেন:
اكْشِفِ الْبَاسَ رَبَّ النَّاسِ (হে মানুষের প্রভু, রোগমুক্ত করুন) এরপর একটি পাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার বাত্বহান প্রান্তরের এক মুঠ মাটি রাখলেন, এরপর সেখানে পানি ঢাললেন এবং তাতে ফুঁ দিলেন। তারপর ওই পানি তার (সাবিত রা.-এর) ওপর ঢেলে দেওয়া হলো। ৫৬
বিন বায রহ. রুকইয়ার গোসলের নিয়ম বর্ণনা করার সময় উপরিউক্ত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন দলিল হিসেবে।

খ. বিভিন্ন যুগের আলিমদের মতে রুকইয়ার গোসল
১. জাদুর চিকিৎসায় রুকইয়ার বিখ্যাত গোসল হচ্ছে, বরই পাতা বেটে পানিতে মিশ্রিত করা, এরপর কিছু দুআ পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে সেটা খাওয়া এবং গোসল করা। পূর্ববর্তী আলিমদের অনেক বর্ণনাতে এই গোসলের কথা পাওয়া যায়। তবে এই গোসলের সময় পড়ার দুআগুলো কী হবে—সে বিষয়ে একাধিক মত রয়েছে। ইমাম কুরতুবী রহ. জাদুর চিকিৎসা বর্ণনা করতে গিয়ে এই গোসলে শুধু আয়াতুল কুরসী পড়তে বলেছেন। আর ইবনু কাসীর রহ. সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। ৫৭
২. ওয়াহাব ইবনুল মুনাব্বিহ রহ. থেকে গোসলের নিয়মটি বর্ণিত আছে এরকমভাবে: সাতটি বরইয়ের পাতা পিষে পানিতে ঢেলে নাড়তে থাকুন এবং আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পড়ে পড়ে ফুঁ দিতে থাকুন। এরপর সেই পানি তিন ঢোক পান করুন এবং বাকিটা দিয়ে গোসল করুন। ৫৮
শাইখ ওয়াহিদ বিন আবদুস সালামও এভাবেই বলেছেন। তবে এর সাথে আরও বলেছেন, 'সেই পানি গরম করবে না বা সেখানে অন্য পানি মেশাবে না। আশা করা যায়, প্রথম গোসলেই জাদু নষ্ট হয়ে যাবে। আর এভাবে কয়েকদিন গোসল করলে ইনশাআল্লাহ রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে।' ৫৯
৩. শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ. এই বরই পাতার গোসলের নিয়ম বর্ণনা করেছেন শাইখ আবদুর রহমান বিন হাসানের ফাতহুল মাজীদ গ্রন্থ থেকে, তবে সেখানে পানিতে বরই পাতা গুলিয়ে অনেক কিছু পড়তে বলা হয়েছে। যথা:
১. সূরা ফাতিহা ২. আয়াতুল কুরসী ৩. সূরা আরাফের ১০৬-১২২ নং আয়াত ৪. সূরা ইউনুসের ৭৯-৮২ নং আয়াত ৫. সূরা ত্বহা এর ৬৫-৬৯ নং আয়াত ৬. সূরা কাফিরুন ৭. সূরা ইখলাস [৩বার] ৮. সূরা ফালাক [৩বার] ৯. সূরা নাস [৩বার]
সাথে কিছু দুআ যেমন-
১০. 'আল্লাহুম্মা রব্বান নাস, আযহিবিল বা'স। ওয়াশফি, আনতাশ শাফি। লা শিফাআ ইল্লা শিফাউক। শিফাআন লা ইয়ুগা-দিরু সাকামা।' [৩বার]
১১. 'বিসমিল্লাহি আরক্কীক মিন কুল্লি শাইয়িন ইয়ু'যীক। মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন; আল্লাহু ইয়াশফীক। বিসমিল্লাহি আরক্বীক।' [৩ বার]
সেই ফাতাওয়াতে বিন বায রহ. অবশ্য একটি সহজ নিয়মের কথাও বলেছেন- জাদুতে আক্রান্ত রোগীর ওপর অথবা কোনো একটি পাত্রে পানি নিয়ে 'উপরে উল্লিখিত' আয়াত এবং দুআ সমূহ পড়ে ফুঁ দেবে। এরপর জাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তি সে পানি পান করবে, আর অবশিষ্ট পানি দিয়ে গোসল করবে। প্রয়োজন মতো এক বা একাধিকবার এরকম করলে আল্লাহর ইচ্ছায় রোগী আরোগ্য লাভ করবে। ৬০

গ. আমরা আরও যেসব গোসলের পরামর্শ দিই
১. জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ (এটি মূলত শাইখ ওয়াহিদ আব্দুস সালামের একটি পদ্ধতি এবং বিন বায রহ.-এর পদ্ধতির সারসংক্ষেপ)
'...একটি বোতলে পানি নিন, এরপর ক. সূরা আরাফ: ১১৭-১২২ খ. সূরা ইউনুস: ৮১-৮২ গ. সূরা ত্বহা: ৬৯ নম্বর আয়াত ঘ. সূরা ফালাক, সূরা নাস সব তিন বার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিন।
এই পানি দুই বেলা খাবেন, আর প্রতিদিন গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করবেন।' ৬১
তবে এভাবে একবারে বোতলে না পড়ে যদি প্রতি বার খাওয়া বা গোসলের পানিতে আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দেওয়া হয় তবে সেটা আরও উত্তম।
২. বদনজরের রুকইয়ার গোসল
'একটা বালতিতে পানি নিয়ে তাতে দুই হাত ডুবিয়ে যেকোনো দরুদ শরীফ, সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা কাফিরুন, ইখলাস, ফালাক, নাস শেষে আবার কোনো দরুদ শরীফ—সব ৭বার করে পড়া, এরপর এই পানি দিয়ে গোসল করা।'
এটা মুম্বাইয়ের মুফতী জুনাইদ সাহেবের লেকচার থেকে নেওয়া। তবে যদিও সাধারণত এটা বদনজরের রোগীকে করতে বলা হলেও জাদু ও জিনের রোগীর জন্যও এটা অনেক উপকারি।
তবে খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, এসব গোসলের হুবহু নিয়ম হাদীস থেকে নেওয়া নয়; বরং হাদীস থেকে মূলনীতি গ্রহণ করে আলিমদের অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণা থেকে উদ্ধৃত। তাই সময় কম থাকলে সংক্ষেপ করে সাত বারের জায়গায় তিন বার পড়তে পারে, দুরুদ শরীফ চাইলে এক বারও পড়তে পারে। চাইলে সূরা কাফিরুন বাদ দেওয়া যায়। চাইলে এসবের সাথে আরও কিছু দুআ এবং আয়াত পড়া যায়। আর পানিতে হাত ডুবিয়ে বসে থাকার সুযোগ না পাওয়া গেলে পড়ার পর পানিতে ফুঁ দিয়ে গোসল করলেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। বরই পাতার গোসলের ক্ষেত্রে ওই পানি খেতে না পারলে আলাদা গ্লাসে বিশুদ্ধ পানি নিয়ে সেখানে ফু দিয়ে পান করা যেতে পারে।
এখানে মূলনীতি হচ্ছে, যা সরাসরি হাদীস থেকে নেয়া হবে, সেটা হুবহু ওই সংখ্যাতেই বা ওই পরিমাণেই করতে হবে। আর যদি এটা ইজতিহাদ হয় তবে অভিজ্ঞ কাউকে জিজ্ঞেস করে সংখ্যা (এক, তিন, সাত এরকম) কমবেশি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বেশি পড়লে বেশি ফায়দা, কম পড়লে কম। তবে আপনার জন্য সর্বনিম্ন কতটুকু পড়া উচিৎ, এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কারও সাথে কথা বলে নেওয়া ভালো। উল্লেখ্য, রুকইয়ার গোসলের জন্য পানি স্বাভাবিক ঠাণ্ডা হওয়াই উত্তম, তবে একান্ত প্রয়োজন হলে গরম পানিও ব্যবহার করা যায়।
৩. এছাড়া রুকইয়ার গোসলে বাথ সল্ট ব্যবহার করা যায়।
এমনিতেই বাথ সল্ট বা গোসলের লবণের অনেক উপকারিতা রয়েছে। যেমন: ব্যথা কমানো, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি, ঘুমের সমস্যা কমানো, ত্বকের দাগ দূর হওয়া, ইত্যাদি। এছাড়াও আমরা চাইলে এটাকে রুকইয়ার গোসলে ব্যবহার করতে পারি।
গোসলটা এভাবে হতে পারে: একটি ছোট পাত্রে গরম পানি নিয়ে সেখানে এক টেবিল চামচ বাথ সল্ট এবং (সম্ভব হলে) সাতটি বরই পাতা পিষে গুলিয়ে নিন। আর সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, ইখলাস, ফালাক, নাস তিন বার করে পড়ুন এবং ফুঁ দিন। (চাইলে আরও কিছু আয়াত বা দুআ পড়তে পারেন) পড়া শেষে এটা গোসলের হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে গোসল করে নিন।
১৫. অন্যান্য
এ ছাড়া আরও কিছু সাপ্লিমেন্টারি আছে, যেগুলো রুকইয়ার সাথে বিভিন্নভাবে ব্যবহার হয়। যেমন: Tuffle (কন্দক জাতীয় ছত্রাক), Asafoetida (হিং), Rhubarb (রেউচিনি), আপেলের সিরকা, জিরাপানি, যষ্টিমধু, কড়া সুগন্ধি অথবা আতর, গোলাপজল, জাফরান ইত্যাদি। সবগুলো এখানে উল্লেখ করা মুশকিল, আর ভালোমতো না জেনে এতকিছু ব্যবহারের দরকারও নেই। শুধু সরাসরি রুকইয়াহ করা, রুকইয়ার পানি খাওয়া আর রুকইয়ার গোসল-এতটুকুই অনেক!

টিকাঃ
৫৪. মুসলিম: ৪০৬৫
৫৫. মুসলিম
৫৬. আবূ দাউদ: ৩৮৮৫
৫৭. তাফসীরে ইবনু কাসীর: ১/৬১৯
৫৮. ফাতহুল বারী: ১০/২৩৩
৫৯. আস-সারিমুল বাত্তার: ২১৪
৬০. মাজমুউল ফাতওয়া ওয়া মাক্কালাত: ৩:৮/১৪৪৩
৬১. ওয়াক্বাইয়াতুল ইনসান: ৮৮

📘 রুকইয়াহ > 📄 রুকইয়াহ শারইয়্যাহর গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা

📄 রুকইয়াহ শারইয়্যাহর গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা


প্রশ্ন উঠতে পারে, এই রুকইয়াহ নিয়ে আলোচনার কী দরকার? এর পেছনে এতো সময়, পরিশ্রম আর মেধা ব্যয় করার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী? আর এতে লাভটাই বা কী?
আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, আল্লাহর কালিমাকে প্রতিষ্ঠিত করা, সমাজ থেকে কুফরী জাদু-ফিতনা নির্মূল করা, কবিরাজ নামের শয়তান জাদুকরদের থেকে উম্মাতকে দূরে রাখা এবং প্রায় ভুলে যাওয়া রুকইয়াহ শারইয়্যাহর সুন্নাতকে পনর্জীবিত করা। আর অবশ্যই এসবের পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন!
এখানে ইবনুল কায়্যিম রহ.-এর কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি বলেন—
‘আল কুরআন হচ্ছে পরিপূর্ণ চিকিৎসা। মানসিক কিংবা শারীরিক; দুনিয়ার কিংবা আখিরাতের যাবতীয় রোগব্যাধির জন্য কুরআনে রয়েছে পরিপূর্ণ আরোগ্য।
তবে এ থেকে নিরাময় লাভের তাওফীক সবাইকে দেওয়া হয় না; সবাই এর উপযুক্তও নয়। রোগী সততা, আস্থা, পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা, অকাট্য বিশ্বাস এবং চিকিৎসার যাবতীয় শর্ত পূরণের মাধ্যমে যদি এই কুরআনকে কেউ তার রোগের ওপর উত্তমভাবে প্রয়োগ করে, তাহলে কোন ব্যাধিই এর মোকাবিলা করতে পারবে না। কীভাবে রোগ-ব্যাধি আসমান- জমিনের মালিকের ওই কথার মোকাবিলা করবে, যা তিনি পাহাড়ের ওপর নাজিল করলে তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলত, ভূমির উপর নাজিল করলে ভূমিকে বিদীর্ণ করে দিত!
সুতরাং শরীর ও মনের এমন কোনো রোগ নেই, যার চিকিৎসা আল-কুরআনে নেই। উপরন্তু এর প্রতিকার এবং তা থেকে বেঁচে থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। যাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবের বুঝ দান করেছেন, সেই কেবল এ থেকে সার্বিক সুস্থতা লাভ করে ধন্য হয়। কুরআন যাকে নিরাময় করবে না, আল্লাহও তাকে নিরাময় করবেন না। আর কুরআন যার জন্য যথেষ্ট নয়, আল্লাহও তার জন্য যথেষ্ট হবেন না।' ৬২

সেলফ রুকইয়ার প্রয়োজনীয়তা
সেলফ রুকইয়াহ অর্থাৎ নিজের জন্য বা নিজের পরিবারের জন্য নিজেই রুকইয়াহ করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। যে কোনো সমস্যা শুরুর আগেই যদি এর সমাধান জানা থাকে, তাহলে এটা বেশি দূর গড়ায় না। কয়েক যুগ আগেও শুধু ডায়রিয়ায় কত মানুষ মারা গেছে; কিন্তু এখন? এখন আমরা সবাই জানি, কারও ডায়রিয়া হলে লবণ-পানির শরবত খেলেই যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায়।
একইভাবে আমি যদি জানি আমার স্ত্রীকে কেউ জাদু করলে আমার কী করা উচিত, আমার বাচ্চার ওপর কারও নজর লাগলে অথবা শরীরের কোথাও ব্যথা হলে আমার কী করা উচিত তাহলে পরিবারের সাধারণ সমস্যাগুলোও ডিভোের্স পর্যন্ত গড়াবে না। বাচ্চাকে হয়তো অপ্রয়োজনীয় ওষুধপত্র খাওয়ানো লাগবে না।
আর নিজের জন্য রুকইয়াতে ভয়ের কিছু নেই। এর কারণ হচ্ছে-
প্রথমত: রুকইয়াহ করলে আপনি আর ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে পারবেন না-বিষয়টা কিন্তু মোটেই এমন নয়। বরং প্রয়োজন মোতাবেক ওষুধ এবং রুকইয়াহ দুটোই গ্রহণ করা সুন্নাত।
দ্বিতীয়ত: কুরআনে ক্ষতিকর কিছু নেই-উপকার ছাড়া। কুরআন শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক রোগের প্রতিষেধক। আমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রেখে যাওয়া জীবন্ত মুজিযা। এই মুজিযা আপনার হাতের কাছে থাকতেও কেন আপনি তার যথাযথ ব্যবহার করবেন না?
তৃতীয়ত: এজন্য আপনার সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। আপনি দেখে দেখে তিলাওয়াত করতে পারবেন, অথবা শুধু সূরা ফাতিহা, ইখলাস, ফালাক, নাস দিয়েও রুকইয়াহ করতে পারবেন। আর আপনার তিলাওয়াত বিশ্ববিখ্যাত ক্বারীদের মতো হওয়ারও দরকার নেই। আপনার যতদূর সম্ভব হয় শুদ্ধ করে পড়বেন। আর একদমই শুদ্ধ না হলে ধীরে ধীরে শিখে নেবেন। কুরআন পড়তে জানা তো এমনিতেও আবশ্যক।
সেলফ রুকইয়াহকে ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে নেয়া যায়, যেমনটা সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে আমরা করে থাকি। কোনো সমস্যা হলে প্রথমে ফার্মেসী থেকে বা ঘরের ওষুধের বাক্স থেকে একটা ওষুধ নিয়ে খাই। এরপর প্রয়োজন হলে এলাকার ডাক্তার বা অন্য কারও পরামর্শ নিই। এরপরও ভালো না হলে তখন বড় ডাক্তার দেখাই।
একইভাবে রুকইয়ার ক্ষেত্রেও প্রথমে এই গ্রন্থের নিয়মকানুন দেখে নিজেই রুকইয়াহ করুন। এরপর প্রয়োজন হলে আপনার চেয়ে ভালো জানে-এমন কারও পরামর্শ নিন। এসব কিছু যথেষ্ট না হলে তখন অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে রুকইয়াহ করান।

টিকাঃ
৬২. যাদুল মাআদ, ইবনুল কায়্যিম, খণ্ড-৩, পৃ.১

📘 রুকইয়াহ > 📄 কেন অন্যের জন্য রুকইয়াহ করবেন?

📄 কেন অন্যের জন্য রুকইয়াহ করবেন?


কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারে, কত শত দরকারি বিষয় আছে! ফিকহ, জিহাদ, আকাইদ, ইসলাহ-তাযকিয়া থেকে শুরু করে হাজারো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়ে রয়েছে। ইলমের খিদমত করেন, আল্লাহর রাস্তায় সময় দেন-এসব না করে কেন এই রুকইয়াহ নিয়ে কষ্ট করছেন? কেউ আবার বলেন, এসব কাজ ছোটখাটো মোল্লাদের হাতে ছেড়ে দেন, আহলে ইলমরা কেন মূল্যবান সময় ব্যয় করে এসব করবে?
তাদের জন্য সহজ কথা, আমরা খুব ভালোভাবেই জানি, জাদু, বদনজর, জিন ইত্যাদি সমস্যাগুলো মানুষের মাঝে যতটা ব্যাপক, এর সমাধানের ব্যাপারে মানুষ ততটাই অজ্ঞ। এ সকল সমস্যায় মানুষ যে পরিমাণে আক্রান্ত, বিষয়টা তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অবহেলিত।
আর শরঈ সমাধানের সাথে তো আমাদের দেশের ৯৯.৯৯% মানুষই পরিচিত নয়; বরং বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষের ভ্রান্ত বিশ্বাস হচ্ছে, 'কুফরী জাদু কাটতে কুফরীই করা লাগবে'। (নাউজুবিল্লাহ) এজন্য তারা কবিরাজ-বৈদ্যদের কাছে যায়, আর এভাবে দুনিয়া এবং আখিরাতের শুধু ধ্বংসই অর্জন করে।
আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষ এসব সমস্যায় আক্রান্ত, আমরা কেউ নিজেই ভিকটিম, কারও পরিবারস্থ লোক, আর কারও বা আত্মীয়স্বজন। বহু বৈদ্য-কবিরাজের কাছে ঘুরে ঘুরে, বহু পরিশ্রম করে তারা প্রচুর টাকা পয়সা নষ্ট করে ফেলে। এর পেছনে মেধা, শ্রম এবং সময় ব্যয় করে। অবশেষে কেউ-বা সুস্থ জীবনের আশা ছেড়ে দেয়, আর কেউ-বা স্ত্রীকে তালাক দিয়ে জীবনকে চির বিষণ্ণতার চাদরে ঢেকে দেয়। আর কবিরাজের কাজগুলো কুফরী-শিরকী হওয়ার কারণে নষ্ট হয় আখিরাতের পুঁজিও।
আমার-আপনার চারপাশে এমন মানুষের অভাব নেই। আমাদের দেশে হয়তো এমন একটা প্রাপ্তবয়স্ক লোকও পাওয়া যাবে না, যার নিজের পরিবার অথবা আত্মীয়স্বজনের মাঝে কেউই এ জাতীয় সমস্যায় ভুগছে না। এদের দুনিয়া এবং আখিরাতে ধ্বংস থেকে বাঁচানোর জন্যই রুকইয়াহ শারইয়্যাহ একান্ত অপরিহার্য একটি বিষয়।
তবে আমি বলছি না, আপনি সব ছেড়ে রুকইয়ার জন্য নিবেদিত হয়ে যান; বরং আপনি যা করছেন সেটাই করতে থাকুন। তবে সম্ভব হলে মাঝেমধ্যে এ বিষয়ে অল্প স্বল্প সময় দেন, কেউ সমস্যায় আক্রান্ত হলে তাকে এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা দেন। এতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ—সবারই উপকার।
উপরন্তু এর বিনিময়স্বরূপ নিচের ফজিলতগুলোও লাভ করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। নিম্নে রুকইয়ার কিছু উপকারিতা তুলে ধরা হলো।

১. দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ
একজন রাক্বী মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার চমৎকার সুযোগ পেয়ে থাকেন, যা রুকইয়ার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর জিন, জাদু ইত্যাদি সমস্যাগুলো নিয়ে যারা আসে, তাদের অনেকেই থাকে এমন, যারা দ্বীন পালনের ব্যাপারে উদাসীন। রুকইয়াহ করার সময় তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর সুযোগ পাওয়া যায়। আর এদের বিরাট অংশ হয় এমন, যারা সুস্থতা লাভের আশায় কবিরাজ-বৈদ্যদের কাছে ঘুরে ঘুরে ইতিমধ্যে কুফরী বা শিরকী কাজকর্মে লিপ্ত থেকেছে। ফলে এ মোক্ষম সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে এ সকল কুফরীর থাবা থেকে রক্ষা করা এবং তাদের কাছে তাওহীদের বার্তা পৌঁছানো যায়।
অবশ্যই রাক্বীদের এই সুযোগ কাজে লাগানো উচিত। কারণ, যুগে যুগে এটা নবীদের সুন্নাহ। মানুষ তাদের কাছে দুনিয়াবি প্রয়োজন নিয়ে আসলেও তাঁরা আখিরাতের দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণকেই প্রাধান্য দিতেন। এ ক্ষেত্রে ইউসুফ আ.-এর ঘটনা লক্ষণীয়। দুজন লোক তাঁর কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে এসেছিল, তিনি তাদের সমস্যা এবং সময়ের প্রতি লক্ষ রেখে অল্প কথায় তাওহীদের দাওয়াত পৌছে দিয়েছেন, এরপর তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়েছেন।
এছাড়াও খাইবার যুদ্ধের ঘটনা লক্ষ করুন-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী রা.-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন-তুমি তোমার পথ ধরে তাদের মাঝে পৌঁছে যাও, এরপর তাদের ইসলামের দিকে আহ্বান করো, আর তাদেরকে তাদের ওপর আল্লাহর হকগুলোর ব্যাপারে অবগত করো। কারণ, আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে যদি একটা মানুষকেও আল্লাহ হিদায়াত দেন, তবে তা তোমার জন্য অসংখ্য লাল উট প্রাপ্তি থেকেও উত্তম হবে। ৬৩

২. কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি
যিনি রুকইয়াহ করবেন, প্রতিদিন তাকে দীর্ঘক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করতে হয়। এতে কুরআনের সাথে সম্পর্ক দিন দিন বৃদ্ধি পায়।
এর পাশাপাশি কুরআন পাঠের বিবিধ ফজিলত তো রয়েছেই। যেমন: কুরআন তিলাওয়াতের প্রতিটি হরফে সওয়াব! আপনি যদি প্রতিদিন এক ঘন্টাও রুকইয়াহ করেন, এই এক ঘণ্টায় আপনার ঝুলিতে অনেকগুলো সওয়াব জমে যাবে।
এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কুরআন পাঠ করো। কারণ, কিয়ামাতের দিন কুরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হবে।' ৬৪

৩. মুসলিম ভাই-বোনদের বিপদে সহায়তা করা
প্রথমে একটি হাদীস খেয়াল করি, জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সময় ঝাড়ফুঁক নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। পরে আমর ইবনু হাজমের বংশের লোকেরা এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের নিকট একটি রুকইয়াহ ছিল, যা দিয়ে আমরা বিচ্ছুর ছোবলে ঝাড়ফুঁক করতাম। এখন আপনি তো ঝাড়ফুঁক নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তারা সেটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থাপন করল। তখন তিনি বললেন, কোনো সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না। তোমাদের কেউ যদি তার ভাইয়ের কোনো উপকার করতে সমর্থ হয় তাহলে সে যেন তা করে। ৬৫
এই হাদীসে আমরা দেখলাম, রুকইয়ার মাধ্যমে যে মানুষের উপকার করা যায়, এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং এতে উৎসাহিত করেছেন।
আর একজন মুসলিম ভাইকে সাহায্য করার অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। যেমন: আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো মুমিনের যেকোনো বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামাতের দিন তার বিপদ দূর করবেন। ৬৬
হাদীসের গ্রন্থসমূহে বিপদগ্রস্ত ভাই-বোনদের সহায়তা করার আরও অনেক ফজীলত বর্ণিত হয়েছে। রুকইয়াহ করার মাধ্যমে আপনি সেসব লুফে নিতে পারেন।

৪. কুফরের বিরুদ্ধে এবং তাওহীদের পক্ষে সংগ্রাম করা
ইবনু তাইমিয়া রহ. এজন্য মুখলিস রাক্বীদের ব্যাপারে বলেছেন-
“রাক্বীর উচিত গুনাহ থেকে দূরে থাকা, যেন এই সুযোগে জিন তার ওপর প্রভাব বিস্তার না করতে পারে। সে তো আল্লাহর পথে একজন জিহাদকারী ব্যক্তি। আর রুকইয়াহ চর্চা করাও জিহাদের একটি উত্তম পদ্ধতি। তাই যতদূর পারা যায়, সতর্ক থাকা উচিত, যেন তার পাপ তার শত্রুকে বিজয়ী হতে সহায়তা না করে।” ৬৭
হাকিকী জিহাদের সঙ্গে রুকইয়াহ চর্চার কোনো তুলনা যদিও হয় না, তবুও ইবনু তাইমিয়া রহ.-এর কথাটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন রাক্কী সমাজ থেকে কুফর-শিরক দূর করার জন্য নিজের প্রাণ ঝুঁকিতে ফেলে মেহনত করে। আর যখন কুফরী জাদু আক্রান্ত কারও চিকিৎসা করে অথবা শয়তান ভর করা ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করে তখন সে আল্লাহর কালামের সাহায্যে সরাসরি শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে।

৫. তাওয়াক্কুল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদীসে বলেন, 'আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীসের মধ্যে এসব ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, আর বলেছেন 'এরা শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে।' আর এমন লোকদের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, 'যারা রুকইয়ার জন্য অনুরোধ করে না, শুভ-অশুভ লক্ষণ নির্ণয় করায় না, ছ্যাকা দিয়ে চিকিৎসা করে না বরং শুধু তাদের রবের উপরই ভরসা করে। '৬৮
একজন রাক্বী এই হাদীসে উল্লিখিত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য দাবিদার। কারণ, সে নিজেই রুকইয়াহ করে, অন্যের কাছে গিয়ে রুকইয়াহ করানোর প্রয়োজন তার নেই। আর সে যখন আল্লাহর অনুগ্রহে জটিল জটিল সমস্যা সামাল দেয়, শক্তিশালী শয়তানদের শায়েস্তা করে, ভয়ঙ্কর সব জাদু নষ্ট করে। আর এতো সব অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে স্রেফ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর ভরসা রেখে লড়াই চালিয়ে যায়। একের পর এক নুসরত প্রত্যক্ষ করে মুখলিস রাক্বীর ঈমান এক অনন্য স্তরে পৌঁছে যায়। বস্তুতঃ এটা এমন এক মেহনত, যেখানে আল্লাহ ওপর তাওয়াককুল ব্যতীত কোন দুনিয়াবি সাহায্য উপকারে আসে না।
মোটকথা, এভাবেই একজন রাক্বী তাওয়াককুলে পূর্ণতা লাভ করে। সুতরাং তার জন্য খুবই যৌক্তিক, সে এই পুরস্কার আশা করতে পারে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, রুকইয়াহ নিয়ে পড়াশোনা করতে বললে অনেকে ভাবে, 'পুরো সমাজে শিরক-কুফর মিশ্রিত কবিরাজির ছড়াছড়ি। আমি একা রুকইয়াহ শিখে কী-ই বা করব!' আমি তাদের আল্লাহর বাণী মনে করিয়ে দিতে চাই-
“বলে দিন, ভালো এবং মন্দ সমান নয়; যদিও মন্দের প্রাচুর্য তোমাকে বিস্মিত করে। অতএব হে বুদ্ধিমানগণ, আল্লাহকে ভয় করো; যাতে তোমরা সফল হও।” ৬৯
এবং দাউদ আ.-এর ঘটনা স্মরণ করুন:
“...যাদের ধারণা ছিল যে, আল্লাহর সামনে তাদের একদিন উপস্থিত হতে হবে, তারা বারবার বলতে লাগল, কত সামান্য দলই আল্লাহর হুকুমে বিরাট দলকে পরাজিত করেছে। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” ৭০

হাদীসে সাবউন এবং একটি সংশয় নিরসন
একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। রুকইয়াহ করলে কি মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে না? প্রশ্নটি অদ্ভুত মনে হলেও অনেক মানুষ সত্যিই এমন ধারণা রাখে। ফলে সমস্যাক্রান্ত হওয়ার পরেও ভয়ে প্রতিকার করে না।
কেউ যদি কোনো মুহাদ্দিস বা অভিজ্ঞ কারও সহায়তা ছাড়াই বাংলা বই থেকে হাদীসে সাবউন অধ্যয়ন করেন, তখন সাধারণত এই ভুল ধারণার উৎপত্তি হয়। এই হাদীসটিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুসংবাদ দিয়েছেন, উম্মতের ৭০ হাজার লোক কোনো হিসাব বা আযাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তাদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলেছেন-
هم الذين لا يسترقون, ولا يتطيرون, ولا يكتوون, وعلى ربهم يتوكلون “অর্থাৎ তাঁরা ওই সব লোক, যারা অন্যকে রুকইয়ার জন্য অনুরোধ করে না, শুভ-অশুভ নির্ণয় করে না, দাগ দিয়ে চিকিৎসা করায় না; বরং তাদের রবের ওপর ভরসা করে।” ৭১
এখানে প্রথম সমস্যা হচ্ছে, হাদীসের لایسترقون কথাটির ভুল অনুবাদ করা হয়। এর অর্থ হচ্ছে, 'যারা কারও কাছে রুকইয়াহ করার জন্য আবেদন করে না।' অথচ এর ভুল অনুবাদ করা হয়, 'যারা রুকইয়াহ করে না!'
আরেকটু বিস্তারিত বলতে চাইলে বলব, এটা বাবে ইস্তিফআলের শব্দ। আর ইস্তিফআলের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইসতিগাসা, তথা প্রার্থনা বোঝানো। যেমন: ইসতিগফার : ক্ষমা চাওয়া, ইসতিফতা : ফাতাওয়া চাওয়া। সুতরাং ইসতিরকা অর্থ হচ্ছে, কারও কাছে রুকইয়াহ চাওয়া। যেমন: আরবের বিখ্যাত শাইখ বিন বায রহ. বলেছেন- لا يسترقون, يعني لا يسألون الناس أن يرقوهم লা-ইয়াসতারকুন, অর্থাৎ তাঁরা মানুষের কাছে তাদের রুকইয়াহ করানোর জন্য আবেদন করে না। ৭২
দ্বিতীয়ত: এই হাদীস পড়ার পর অনেকে মনে করেন, রুকইয়াহ করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে না। আর এ কারনেই রুকইয়াহ করা নিষিদ্ধ। এটাও নিরেট ভুল। কারণ, এখানে বলা হচ্ছে বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়ার কথা। অর্থাৎ এই সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে। এটা তাদের একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। উপরন্তু এটা ছাড়াও বিনা হিসেবে জান্নাতে যাওয়ার অন্য পথও রয়েছে। যেমন: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে শহিদ হওয়া। আর এখানে আযিমতের কথা বলা হচ্ছে; রুখসতের নয়। তাই এটা আবশ্যক কোনো বিষয়ও নয়।
সারকথা হচ্ছে, 'অন্যকে দিয়ে রুকইয়াহ না করানো'-মানে কখনোই এটা নয় যে, একদমই রুকইয়াহ করানোই যাবে না। বরং এর অর্থ হচ্ছে, কেউ যদি এ থেকে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে সে উল্লিখিত পুরস্কার পাবে। আর যদি কারও প্রয়োজন হয় তাহলে অন্যের কাছে গিয়ে রুকইয়াহ করানোর অনুমতিও রয়েছে। তখন সে সাধারণ মুসলমানদের মাঝেই গণ্য হবে। কারণ, এই সত্তর হাজারের বাইরেও তো মানুষ জান্নাতে যাবে। এটা তো অস্বীকারের কোনো জো নেই।
তৃতীয়ত: এখানে বলা হচ্ছে অন্যের কাছে রুকইয়াহ করার জন্য আবেদন করার কথা। সুতরাং কেউ যদি নিজেই নিজের ওপর রুকইয়াহ (অর্থাৎ সেলফ রুকইয়াহ) করে, কিংবা কেউ যদি অন্যের ওপর রুকইয়াহ করে তাহলে সে এই ফজিলত থেকে বঞ্চিত হবে না। যেমন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাভাবিকভাবেই নিজের জন্য বা পরিবারের জন্য রুকইয়াহ করতেন এবং তাঁর সাহাবীদেরও রুকইয়াহ করার জন্য বলতেন।
এমনকি কেউ যদি অন্যের কাছে গিয়ে পরামর্শ চায়, আমার এই এই সমস্যা, সেই সমস্যা। আর তিনি যদি বলেন, 'তুমি এদিকে আসো, আমি তোমার রুকইয়াহ করছি।' এক্ষেত্রেও উক্ত ব্যক্তি এ থেকে বাদ যাবে না। যেমনটা জিন বিষয়ক উদাহরণে ইয়ালা ইবনু মুররা এবং উসমান ইবনু আবিল আস রা.-এর হাদীসে আমরা দেখব।
যাহোক, তিনটি বিষয় আমাদের সামনে আসছে—
১. রুকইয়াহ করা;
২. রুকইয়াহ করানো;
৩. রুকইয়াহ করতে বাধা দেওয়া।
প্রথমটি হচ্ছে রুকইয়াহ করা—নিজের জন্য বা অন্যের জন্য। এটা জিবরীল আ. করেছেন, পূর্বের নবীরা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন, সাহাবীগণ করেছেন, এবং অন্যান্য সালাফে সালেহিনও করেছেন। সুতরাং শরীয়তের সীমারেখা ঠিক রেখে রুকইয়াহ করাতে আপত্তির কিছু নাই এবং এতে কোনো ধরনের সংশয়েরও অবকাশ নেই।
দ্বিতীয়টি হলো রুকইয়াহ করানো। এটা অবস্থার ওপর নির্ভর করবে। যদি আপনি নিজে রুকইয়াহ করতে সক্ষম হন তাহলে আপনার জন্য অন্য কাউকে দিয়ে রুকইয়াহ করানো উচিত হবে না। যদি কোন ওজর ছাড়াই অন্যকে গিয়ে বলেন, 'ভাই, আমার ওপর রুকইয়াহ করেন প্লিজ।' তাহলে আপনি এই সত্তর হাজার থেকে বাদ পড়ে যাবেন।
কিন্তু যদি আপনার প্রয়োজন থাকে তাহলে অন্যের সহায়তা নেওয়া যেতেই পারে। যেমন: কেউ জিন দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তাই সে সালাত আদায় বা তিলাওয়াত করতে পারে না। অথবা কেউ জাদুতে আক্রান্ত হয়ে এতটা অসুস্থ বা দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, এখন আর নামায পড়তে বা রোজা রাখতে পারছে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যদি সে নিজে রুকইয়াহ করতে না পারে তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে রুকইয়াহ করানো তার জন্য ওয়াজিব। কারণ, এই জাদু বা জিন তাকে আল্লাহর ইবাদাত থেকে দূরে রাখছে, আর আল্লাহর ইবাদাতের জন্যই আমাদের পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। সুতরাং ইবাদাতের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবদ্ধকতা সৃষ্টি হলে সেটার প্রতিকার করা ওয়াজিব, যদি বিষয়টা মানুষের সাধ্যে থাকে।
এছাড়াও যদি ব্যাপারটা এমন হয়, নিজে রুকইয়াহ করতে গেলে অনেক কষ্ট হচ্ছে অথবা আপনি ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছেন না, কীভাবে রুকইয়াহ করতে হয়—এমন ক্ষেত্রেও অন্যকে দিয়ে রুকইয়াহ করানো জায়িস। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
“আল্লাহ কারও ওপর সাধ্যের বেশি চাপিয়ে দেন না।” ৭৩
সুতরাং যদি আসলেই অন্যকে দিয়ে রুকইয়াহ করানোর প্রয়োজন হয় তবে সেক্ষেত্রেও আপনি সত্তর হাজার থেকে বাদ পড়বেন না, ইনশাআল্লাহ।
তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে রুকইয়াহ করতে বাধা দেওয়া। অর্থাৎ কেউ কোনো সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করছে, অথবা আপনি আক্রান্ত হয়েছেন আর আপনার ওপর কেউ রুকইয়াহ করতে চাইছে—এমন কাউকে বাধা দেওয়া। এটা অপরাধকর্মের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করার নির্দেশ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন এবং নিজেও সাহাবীদের ওপর, নিজ পরিবারের ওপর রুকইয়াহ করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্যায় আক্রান্ত হলে আল্লাহ তাআলা জিবরিল আ.-কে পাঠিয়েছেন রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর রুকইয়াহ করার জন্য। ৭৪
সুতরাং আপনি যদি কাউকে রুকইয়াহ করতে বাধা দেন তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন। এমনকি আপনি অসুস্থ হলে কেউ যদি আপনার ওপর রুকইয়াহ করতে চায় তাহলে আপনি তাকে বাধা দিবেন না। এটা সুন্নাহর খেলাফ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শেষ সময়ে অসুস্থ হয়েছিলেন, সে সময়ে আয়িশা রা. রাসূলের ওপর রুকইয়াহ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে বাধা দেননি। সুতরাং আপনারও উচিত হবে না, কেউ রুকইয়াহ করতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া। আপনি যেই হন না কেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বড় পরহেজগার হওয়ার দাবি তো কখনো করবেন না। তাই নয় কি?
আশা করছি, ব্যাপারটি পাঠকদের সামনে কিছুটা হলেও পরিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি।

টিকাঃ
৬৩. মুসলিম: ৪৪২৩
৬৪. মুসলিম: ১৩৩৭
৬৫. মুসলিম: ৪০৭৮
৬৬. মুসলিম: ৪৮৬৭
৬৭. মাজমুউল ফাতওয়া: ১৯/৫৩, রিসালাতুল জিন, পৃ. ৬৫। সম্পূর্ণ উক্তি দেখুন "জিন কি রাকীর ক্ষতি করবে?" অনুচ্ছেদে।
৬৮. বুখারী: ৫৪২০, মুসলিম: ৩২৩
৬৯. সূরা মায়িদা, আয়াত: ১০০
৭০. সূরা বাকারা: ২৪৯
৭১. বুখারী: ৬১৭৫, ইফা: ৬০৯৮
৭২. এ প্রসঙ্গে বিন বায রহ.-এর নিবন্ধ দেখুন এই লিংকে- http://bit.ly/yastarqoon
৭৩. সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬
৭৪. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের রুকইয়াহ করা প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু হাদীস ‘সুন্নাহ সম্মত যত রুকইয়াহ’ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে।

📘 রুকইয়াহ > 📄 একজন ভালো রাকীর বৈশিষ্ট্য

📄 একজন ভালো রাকীর বৈশিষ্ট্য


নিজের জন্য নিজে রুকইয়াহ করলে তেমন বিশেষ কিছু হওয়ার দরকার নেই। প্রতিদিন অনেক অনেক নিয়মকানুন অনুসরণ করা বা বিরাট আমলদার হওয়ারও আবশ্যকতা নেই। তবে কেউ যদি জনগণের জন্য নিয়মিত রুকইয়াহ করতে চান, পারিভাষিকভাবে বললে ‘রাক্বী’ হতে চান তাহলে তার নিজের এবং পরিবারের জন্য কিছু বিষয় গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হয়। তাই এখন আমরা জানব, যিনি চিকিৎসা করবেন তার কী কী গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত—

১. আক্বীদা বিশুদ্ধ হওয়া। শিরক-বিদআতমুক্ত পরিচ্ছন্ন ইসলামী আক্বীদার অনুসারী হওয়া এবং আল্লাহর ওপর নিখাদ ভরসা থাকা।
২. আল্লাহর কালাম যে রোগব্যাধি, কুনজর, জাদু, জিনের ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম-এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। সুস্থতা কেবল আল্লাহরই হাতে, আমার কোন সাধ্য নেই মানুষকে সুস্থ করার-এটা খুব ভালভাবে অন্তরে গেঁথে নেয়া। কোন রুগী সুস্থতা লাভ করার খবর পেলে আত্মগর্বে আক্রান্ত না হওয়া বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। শোকরানা সালাত আদায় করা। এর ভাল প্রভাব রয়েছে।
৩. প্রতিদিনের মৌলিক আহকাম তথা নামায-রোজা, মাহরাম-গাইর মাহরাম ইত্যাদি বিষয়ে যত্নবান হওয়া। হালাল-হারামের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া, হারাম থেকে সম্পূর্ণভাবে বেঁচে থাকা।
৪. মানসিকভাবে দৃঢ় এবং সাহসী হওয়া। আর অধিক পরিমাণে যিকির-আযকার, নফল রোজা, তাহাজ্জুদ ইত্যাদির মাধ্যমে আত্মিকভাবেও সুদৃঢ় হওয়া।
৫. জিন জাতির অবস্থা তথা: প্রকারভেদ, সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, তাদের আচার-আচরণ, জিনেরা কীভাবে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, এরপর তারা কীভাবে বিদায় হয় ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত থাকা। জিনদের মাঝে মিথ্যা বলার প্রবণতা খুবই বেশি। এজন্য জিনদের স্বভাব, ধোঁকাবাজি, কূটকৌশলের ব্যাপারে সজাগ এবং সতর্ক থাকা।
৬. জাদু, জিন, বদনজর, ওয়াসওয়াসা-এই সব বিষয়গুলোতে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে পর্যাপ্ত ধারণা রাখা। অজ্ঞতা নিয়ে কাজে নেমে অন্যদের কাজের ক্ষেত্র নষ্ট না করা।
৭. কুরআন তিলাওয়াত সহীহ-শুদ্ধ হওয়া। অশুদ্ধভাবে কুরআন পড়লে উল্টা গুনাহ হবে।
৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত প্রতিদিনের মাসনূন আমলগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া। বিভিন্ন সময়ে হেফাজতের দুআ যেমন: সকাল-সন্ধ্যার দুআ, ঘুমের আগের দুআ, বাড়ি থেকে বের হওয়ার দুআ, নির্জন জায়গায় গেলে পড়ার দুআ, টয়লেটে প্রবেশের দুআ-এসব গুরুত্বের সাথে আদায় করা। প্রয়োজনীয় কিছু দুআ এই গ্রন্থের 'মাসনূন আমল' অংশে পাওয়া যাবে। এছাড়াও অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের সহায়তা নিতে পারেন। যেমন: হিসনুল মুসলিম, হিসনে হাসীন, সিলাহুল মুমিন, আযকারে মাসনূনাহ, নবীজির দুআ, আযকার ইত্যাদি।
৯. নিজের পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া, তাদের প্রতিদিনের মাসনূন আমলগুলোতে অভ্যস্ত করে তোলা। তাদের অধিকারের ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকা। রুকইয়াহ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে যেন কোনোভাবেই তাদের হক নষ্ট না হয়।
১০. নিজের বাড়িকে গুনাহের সরঞ্জাম থেকে পবিত্র রাখা। যেমন: কোনো জীবের ছবি, ভাস্কর্য বা মূর্তি, মানুষ বা প্রাণীর পুতুল সাজিয়ে বা ঝুলিয়ে না রাখা। গান-বাজনা না চলা, বাদ্যযন্ত্র না রাখা; ঘরে যেন রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করতে পারে আর শয়তান না থাকতে পারে—সেই ব্যবস্থা করা।
১১. আর সর্বদা নিজের গুনাহের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকা। কারণ, আপনি নিজেই পরাজিত হলে অন্যের ওপর ভর করা শয়তানকে শায়েস্তা করবেন কীভাবে? তাই কখনো এমন কিছু না করা, যার মাধ্যমে শয়তান আপনার ওপর বিজয়ী হতে পারে এবং আপনাকে এই কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
১২. রাক্বী বিবাহিত হওয়া উত্তম। অবিবাহিত কারও তুলনায় বিবাহিত ব্যক্তি রুকইয়াহ করলে এর প্রভাব বেশি পড়ে। আর পুরুষ হওয়া আবশ্যক না। তবে নারীর তুলনায় পুরুষ হলে ভালো হয়।
১৩. রোগীর শারীরিক সুস্থতার প্রতি খেয়াল রাখার পাশাপাশি আল্লাহর সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দেয়া। দ্বীনদারির খোঁজখবর নেয়া এবং সে অনুযায়ী দ্বীনের দাওয়াত দেয়া, উৎসাহিত করা। কারণ অনেকেই দুনিয়াতে পূর্ণ সুস্থতা পায়না, এমন হতেই পারে। কিন্তু কেউ যেন আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
১৪. জিন বা জাদু-সংক্রান্ত সমস্যা যেহেতু মেয়েদের বেশি হয়, সুতরাং নারীঘটিত ফিতনার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে হবে। এ বিষয়ে কেউ অতি-সংবেদনশীল হলে, তাঁর জন্য ঢালাওভাবে মানুষের রুকইয়াহ করা উচিত হবে না।
১৫. সমস্যা সমাধানে রাক্বীকে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে। এজন্য উচিত হল, চিকিৎসকের শিষ্টাচার (Medical Ethics) সম্পর্কে ধারণা রাখা, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করা, রুকইয়ার ভিডিও যেনতেন ভাবে প্রচার করে শয়তানের ফাঁদে পা না দেওয়া। রোগীর সুস্থতার জন্য নাম উল্লেখ করে দুআ করা।
১৬. যেকোনো পরামর্শ বা প্রেসক্রিপশন দেওয়ার ক্ষেত্রে রোগীর সময় এবং সামর্থ্য বিবেচনায় রাখা উচিত। একইভাবে আরও উচিত হল এ বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখা—যাতে রোগীর কষ্ট কম হয়, রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়, সে অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচতে পারে, একে একে সবগুলো সমস্যা দূর হয়ে যায় ইত্যাদি।
১৭. প্রতিটি রাক্বীর জন্য সতর্কবার্তা হচ্ছে, এমন কিছু করবেন না, যাতে আপনার কারণে রুকইয়াহ শারইয়্যাহ'র প্রতি মানুষের মাঝে বিরূপ ধারণা বিস্তার করে। সর্বদা আল্লাহকে ভয় করা। অতিরিক্ত টাকার লোভ না করা, এটাকে ব্যবসা না; বরং খিদমাহ ও দাওয়ার সুযোগ হিসেবে নেওয়া।
আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন এবং কাজে ইখলাস দান করুন, আমীন।

আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
১. আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে, ঝাড়ফুঁক করতে হলে ইজাযত বা অনুমতি লাগে। এ ব্যাপারে শাইখ আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর একটি উক্তি মালফুযাতে সংকলিত হয়েছে:
'তাবিজ-তুমারের ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম নিজেদের দোকান হেফাজত করার জন্য এই মাসআলা বানিয়ে নিয়েছেন যে, যতক্ষণ ইজাযত বা অনুমতি না হবে, ততক্ষণ তদবির কোনো কাজই করবে না। এগুলো সব অনর্থক কথা। এ কথার কোনই ভিত্তি নেই যে, ইজাযত বা অনুমতি হলে তবেই তদবির কাজে আসবে। সাধারণ মানুষের ধারণা হল, ইজাযত ছাড়া আসর হয় না। এর কোনো শরঈ দলিল নেই। বরং এটি একটি দলিলবিহীন ভিত্তিহীন কথা।...'
তবে হ্যাঁ, ব্যাপকভাবে রুকইয়াহ করতে চাইলে এ ব্যাপারে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি কারও রুকইয়াহ করা দেখে বুঝে নেওয়া ভালো। এটা নিজের সুবিধার জন্য। আর তিলাওয়াতের উদাহরণ হিসেবে ভালো কোনো ক্বারীর অনুসরণ করা যেতে পারে।
২. রুকইয়ার ক্ষেত্রে কাউকে হুবহু অনুসরণ করতে হবে ব্যাপারটা এমন না। বরং বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতিটা রাক্বীর নিজস্ব রুকইয়ার স্টাইল থাকে, শুরুতে না থাকলেও কদিনের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়। তবে এক্ষেত্রে নিজের রুকইয়াকে যথাসম্ভব সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা উচিত, আর শুরুতে অন্তত কয়েকদিন কারও রুকইয়াহ করা দেখে অভিজ্ঞতা অর্জন করা উচিত। বলা বাহুল্য, ইউটিউবে দেখা আর বাস্তবে দেখার মধ্যে যথেষ্ট তফাত রয়েছে।
৩. আর দুইটা বিষয়ে না বললেই নয়।
প্রথম বিষয় হচ্ছে, 'নিয়াত'। রুকইয়াহ করার বা শোনার সময় আপনি কেন রুকইয়াহ করছেন, এজন্য স্পষ্টভাবে নিয়াত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে কয়েকগুণ বেশি উপকার পাবেন।
এক্ষেত্রে সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করে নিয়াত করতে পারেন (যেমন: আমার পারিবারিক সমস্যার জন্য রুকইয়াহ করছি) অথবা নির্দিষ্ট বিষয়ের নিয়াতও করতে পারেন (যেমন: বদনজরের জন্য রুকইয়াহ করছি, জিনটাকে মেরে ফেলতে রুকইয়াহ করছি)। তবে চাইলে আমভাবেও নিয়াত করতে পারেন যে, আমার যত সমস্যা আছে সবগুলোর জন্য রুকইয়াহ করছি। তবে এভাবে ফায়দা কম হয়।
দ্বিতীয়ত: ডেডিকেশন। অর্থাৎ আপনার যে সমস্যা আছে আর আপনি সমাধান চান এজন্য আক্ষরিক অর্থেই আপনাকে সময় আর মেহনত নিবেদন করতে হবে। রুকইয়া করলাম, একটু ভালো লাগলো আর বন্ধ করে দিলাম। কদিন পর আবার করলাম, আবার বাদ দিলাম। এক বেলা করলাম আরেক বেলা করলাম না, এমন না। সত্যিকারার্থেই এর পেছনে লেগে থাকতে হবে একটা লম্বা সময়ের জন্য।
সমস্যা বেশি পুরনো হলে অন্তত কয়েক মাস সময় ভালভাবে চিকিৎসা করুন, এরপর একটু হালকা একটা কমন রুটিন ফলো করতে থাকুন।
৪. রুকইয়াহ শারইয়াহ দুইভাবে মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। একটা হল ঝাড়ফুঁক হিসেবে শব্দগুলো সরাসরি প্রভাব ফেলে। আরেকটা হল দুআ হিসেবে, অর্থাৎ এর দ্বারা আল্লাহর কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করা হয়। তাই রুকইয়ার সময় আপনার মন মস্তিষ্ক আল্লাহর দিকে রুজু করুন। আর সবসময় নিজের ঈমান-আমলের উন্নতির ফিকির করুন।
৫. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, চিকিৎসার মাঝে উদ্ভট এবং সন্দেহজনক পন্থা অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকা। কোথাও ঝাড়ফুঁকের কোনো পদ্ধতি দেখলে অতি উৎসাহী হয়ে আগ-পিছ না ভেবে, বিজ্ঞ আলিমদের মতামত না জেনে সেটা পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করতে না যাওয়া। যেহেতু আমাদের সমাজে সঠিক পন্থার রুকইয়ার চেয়ে শিরকি-কুফরির প্রচলনই বেশি, তাই এব্যাপারে খুব সতর্ক থাকা উচিত।
সেলফ রুকইয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা, কোথাও চটকদার একটা মন্ত্র বা তদবির পেলেন, আর সহীহ পন্থার চিকিৎসা বন্ধ করে ওইটা শুরু করে দিলেন, এমনটা না করা চাই। আর সঠিক এবং ভ্রান্ত আমলের মিশ্রণ ঘটানো তো আরও খারাপ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00