📘 রুকইয়াহ > 📄 তিন স্তরের রুকইয়াহ

📄 তিন স্তরের রুকইয়াহ


রুকইয়াহ শারইয়্যাহ'র ক্ষেত্রে যা কিছু পাঠ করা হয়, সেগুলোকে আমরা তিন স্তরে ভাগ করতে পারি: ১. সর্বোত্তম ২. উত্তম ৩. বৈধ।
আমরা এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। তবে এর আগে জেনে রাখা ভালো যে, আপনাকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিটা ক্যাটাগরি থেকেই পড়তে হবে, এমনটা জরুরি নয়। আপনি চাইলে উল্লিখিত সর্ব প্রকারের আয়াত এবং দুআ থেকে পড়তে পারেন, অথবা চাইলে যে কোনো এক প্রকারের রুকইয়াহ থেকে পড়তে পারেন। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে, শুধু মাসনূন রুকইয়াহগুলো বারবার পড়ে দীর্ঘক্ষণ রুকইয়াহ করলে তুলনামূলক বেশি উপকার হয়, আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম হয়।
আরেকটি কথা, 'সাধারণ রুকইয়ার আয়াত' বলতে যে আয়াতগুলো আমরা বুঝি, সেটা নিচে উল্লিখিত প্রথম দুভাগের রুকইয়াত দিয়ে সাজানো হয়েছে।

১. সর্বোত্তম এবং সুন্নাত রুকইয়াহ (أفضل)
ক. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, জিবরীল আ. অথবা সাহাবায়ে কিরাম রা. যেসব দুআ এবং আয়াত দ্বারা রুকইয়াহ করেছেন।
যেমন: اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ اِشْفِهِ وَأَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
সূরা ফাতিহা, সূরা ফালাক, সূরা নাস প্রভৃতি।
খ. যেসব আয়াত এবং দুআ শয়তান থেকে নিরাপদ থাকতে, বিপদ থেকে বাঁচতে, কিংবা সুস্থতার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়েছেন অথবা কাউকে পড়তে বলেছেন। যেমন: সম্পূর্ণ সূরা বাকারা, আয়াতুল কুরসী, সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন দুআসমূহ।
গ. কুরআনুল কারীম অথবা বিশুদ্ধ সূত্রে হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য নবীগণের দুআ। যেমন: হযরত আইয়ূব আ.-এর দুআ- رَبِّ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
হযরত মূসা আ.-এর দুআ- رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
হযরত ইবরাহীম আ.-এর দুআ- أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

২. উত্তম রুকইয়াহ (خير)
কুরআনুল কারীমের যে সকল আয়াত আক্রান্ত ব্যক্তির সমস্যার সমাধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল। মাসনূন রুকইয়ার পর তুলনামূলকভাবে এ সকল আয়াত অন্যান্য আয়াতের চেয়ে অধিক উপকারি। উদাহরণস্বরূপ:
যে আয়াতে জাদুর কথা আছে, সেটা জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য। যে আয়াতে জিন বা শয়তানের কথা আছে, সেটা জিনের রোগীর জন্য অধিক উপকারি। যেমন: জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য সূরা আরাফ: ১১৭-১১১ সরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯ নম্বর আয়াত।
জিন-আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য সূরা বাকারা: ১০২, সূরা সফফাত: ১-১০ এবং সূরা জিন: ১ থেকে ৯ নম্বর আয়াত।
বদনজরে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য সূরা ইউসুফ: ৬৭, সূরা কাহাফ: ২৯ এবং সূরা কালামের শেষ ২ আয়াত।
হাড়ক্ষয় রোগের চিকিৎসায় সূরা ইয়াসীন: ৭৮-৭৯ এবং সূরা কিয়ামাহ: ৩-৪ নম্বর আয়াত।

৩. বৈধ রুকইয়াহ (مباح)
এ ছাড়া আপনি কুরআনুল কারীমের অন্য যেকোনো আয়াত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত যে কোনো দুআ দিয়ে রুকইয়াহ করতে পারেন। এর পাশাপাশি নিজে থেকে চাইলে কোনো দুআও করতে পারেন। যেমন: প্রসিদ্ধ কিছু দুআ হচ্ছে-
اللَّهُمَّ أَبْطِلْ كُلَّ سِحْرٍ أَيْنَمَا كَانَتْ وَكَيْفَمَا كَانَتْ
“হে আল্লাহ, সব জাদুটোনা ধ্বংস করে দাও; তা যেখানেই থাকুক এবং যেভাবেই থাকুক।”
اللَّهُمَّ أَنْزِلِ الشَّفَاء وَارْفَعْ كُلَّ الدَّاءِ
“হে আল্লাহ, সুস্থতা অবতীর্ণ করো এবং সব রোগব্যাধি তুলে নাও।”
শরঈ বিধানের সীমারেখা লঙ্ঘন না করলে ওপরের সবগুলোই জায়িয। আর সবগুলোই রুকইয়াহ শারইয়্যাহর মধ্যে গণ্য হবে। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।

📘 রুকইয়াহ > 📄 সুন্নাহ সম্মত যত রুকইয়াহ

📄 সুন্নাহ সম্মত যত রুকইয়াহ


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সঙ্গীরা আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। ইহলৌকিক এবং পরলৌকিক মুক্তি এবং সফলতার জন্য তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য। তাই এবার আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কিরামের পদ্ধতি দেখব।
তবে সতর্কতাস্বরূপ একটা বিষয় প্রথমেই বলে নেওয়া উচিত, এখানে রুকইয়ার যেসব পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা হবে, এর মধ্যে যেগুলোতে রোগীকে স্পর্শ করার কথা এসেছে, সেগুলো সাধারণভাবে গাইর মাহরামদের ওপর রুকইয়াহ করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। গাইর মাহরামদের ক্ষেত্রে এমন কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে তাকে হাত দ্বারা স্পর্শ করার কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে না। যেমন: শুধু কুরআন থেকে তিলাওয়াত করা কিংবা তিলাওয়াত করে ফুঁ দেওয়া প্রভৃতি।

১. দুআ, আল্লাহর নাম অথবা কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা (কোনো ফুঁ দেওয়া বা স্পর্শ করা ব্যতীত)
“আবূ সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, জিবরীল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, হে মুহাম্মদ, আপনি কি (আল্লাহর কাছে আপনার সমস্যার ব্যাপারে) অভিযোগ করেছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। জিবরীল আ. বললেন-
بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ ، اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
আমি আপনাকে আল্লাহর নামে রুকইয়াহ করছি-সেই সব জিনিস থেকে, যা আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে। সকল প্রাণের অনিষ্ট কিংবা হিংসুকের বদনজর থেকে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুক; আমি আল্লাহর নামে রুকইয়াহ করছি।” ১
“আবদুল আযীয রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এবং সাবিত একবার আনাস ইবনু মালিক রা.-এর নিকট যাই। সাবিত বললেন, হে আবূ হামযা, আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। তখন আনাস রা. বললেন, আমি কি তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রুকইয়াহ দিয়ে রুকইয়াহ করব না? তিনি বললেন, নিশ্চয়! তখন আনাস রা. বললেন— اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ مُذْهِبَ الْبَاسِ اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
'হে আল্লাহ, হে মানুষের রব, হে ব্যথা নিবারণকারী, তুমি আরোগ্য দান করো। তুমিই তো আরোগ্যদাতা। তুমি ব্যতীত আর কোনো আরোগ্য দানকারী নেই। এমন আরোগ্য দাও, যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।' ২

২. রোগীর মাথায় অথবা আক্রান্ত অঙ্গে হাত রেখে তিলাওয়াত করা
“উসমান ইবনু আবিল আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে তার শরীরের এক ধরণের ব্যথার ব্যাপারে বললেন, যা তিনি ইসলাম গ্রহণ করার সময় থেকে অনুভব করছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তোমার শরীরের যে জায়গায় ব্যথা হয়, তার ওপর তোমার হাত রেখে তিনবার বলবে- “بِاسْمِ الله এবং সাতবার বলবে— أَعُوذُ بِعِزَّةِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ
উচ্চারণ: আ‘উযু বি‘ইযযাতিল্লা-হি ওয়াকুদরতিহি মিন শাররি মা-আজিদু ওয়াউহা-যিরু। অর্থ: আমি আল্লাহর সম্মান এবং তাঁর ক্ষমতার আশ্রয় নিচ্ছি, যা আমি অনুভব করি এবং যা আশঙ্কা করি, তার অকল্যাণ থেকে। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, আমি এমনটা করলাম আর ব্যথা ভালো হয়ে গেল। এরপর থেকে আমার পরিবারের বা অন্য কারও সমস্যা হলে আমি এটা করতে নির্দেশ দিতাম।” ৩

৩. তিলাওয়াত করার পর ফুঁ দেওয়া
"ইয়াযিদ ইবনু আবি উবাইদাহ রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি সালামা রা.-এর পায়ের গোছায় একটি ক্ষত চিহ্ন দেখে বললাম, এটা কী? তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধে এখানে আঘাত পেয়েছিলাম। লোকেরা বলতে লাগল যে, সালামা আহত হয়েছেন। এরপর আমাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নেওয়া হলে তিনি আমার ক্ষতস্থানে তিনবার ফুঁ দিলেন। যার ফলে আজ পর্যন্ত আমি সেখানে কোনো ধরণের ব্যথা অনুভব করিনি।” ৪

৪. তিলাওয়াত করার পর থুতু দেওয়া, অথবা হাতে থুতু নিয়ে আক্রান্ত স্থানে লাগানো
"আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একদল সাহাবী এক সফরে ছিলেন। এক পর্যায়ে তারা একটি আরব গোত্রের নিকট স্বল্পকালীন অবস্থান করেন এবং তাদের কাছে মেহমান হতে চান; কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারি করতে অস্বীকৃতি জানায়। ঘটনাক্রমে সেই গোত্রের সর্দারকে সাপ দংশন করে। তারা তাকে সুস্থ করার জন্য সবরকম চেষ্টা-তদবীর করে; কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছিল না। তখন তাদের একজন বলল, তোমরা যদি ওই দলের কাছে যেতে, যারা তোমাদের কাছে এসেছিল, তাহলে হয়তো ভালো হতো। তাদের কাছে কোনো তদবীর থাকতে পারে। তখন তারা এসে বলল, হে দলের লোকেরা, আমাদের সর্দার দংশিত হয়েছেন। আমরা তার জন্য সব রকমের চেষ্টা করেছি; কিন্তু কোনো ফল হয়নি। তোমাদের কারও নিকট কি কোনো তদবীর আছে? কাফেলার একজন বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয় আমি ঝাড়ফুঁক জানি। তবে আমরা তোমাদের নিকট মেহমান হতে চেয়েছিলাম; কিন্তু তোমরা আমাদের মেহমানদারি করো নি। তাই আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঝাড়ফুঁক করব না, যতক্ষণ না তোমরা আমার জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করবে। তখন তারা বিনিময়স্বরূপ তাদের একপাল বকরি দিতে সম্মত হলো। তারপর সেই সাহাবী সেখানে গেলেন এবং সূরা ফাতিহা পড়ে থুতু দিতে থাকলেন। অবশেষে সে ব্যক্তি এমন সুস্থ হলো, যেন বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে উঠল। সে এমনভাবে চলাফেরা করতে লাগল, যেন তার কোনো রোগই নেই। বর্ণনাকারী বলেন, তখন তারা যে পারিশ্রমিক ঠিক করেছিল, তা পরিশোধ করল। এরপর সাহাবীদের মধ্যে একজন বললেন, এগুলো বণ্টন করে দাও। তখন যিনি ঝাড়ফুঁক করেছিলেন, তিনি বললেন, যতক্ষণ না আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এই ঘটনা জানাচ্ছি এবং তিনি আমাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন, ততক্ষণ আমরা এই পারিশ্রমিক বণ্টন করব না। তারপর তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর নিকট এসে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন, তুমি কি করে জানলে যে এটা (সূরা ফাতিহা) একটা 'রুকইয়াহ'? তোমরা ঠিকই করেছ। তোমরা এগুলো বণ্টন করে নাও এবং সাথে আমার জন্যও এক ভাগ রেখো।" ৫

৫. একাধিক পদ্ধতির মধ্যে সমন্বয় করা
উপরে উল্লিখিত হাদীসটি অনেকগুলো সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যার কোনোটায় ফুঁ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কোনোটায় থুতু দেওয়ার কথা এসেছে, কোনোটায় আবার থুতু নিয়ে ওই জায়গায় লাগানো এবং বারবার হাত বুলানোর কথা এসেছে। আরেকটি বর্ণনায় উক্ত সাহাবী সাত বার সূরা ফাতিহা পড়েছিলেন বলে উল্লিখিত রয়েছে। সবগুলো সূত্র একত্র করলে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কিরাম রুকইয়ার একাধিক পদ্ধতি একত্রে প্রয়োগ করেছেন। তাই রুকইয়ার কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য আমরাও একসাথে কয়েকটি পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারি।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আলিমরা ওপরের দুটো পদ্ধতি (ফুঁ দেওয়া এবং থুতু দেওয়া)- এর মধ্যে এভাবে সমন্বয় করেন- 'এমনভাবে ফুঁ দেওয়া, যেন সাথে হালকা থুতুও বেরিয়ে আসে।' এটা রুকইয়ার পর শুধু ফুঁ দেওয়ার চাইতে অধিক উপকারি।
আর হ্যাঁ, ফুঁ এর সাথে থুতু বেরিয়ে আসা মানে একদলা থুতু নয়; বরং জিহ্বা ভিজিয়ে নিয়ে একটু জোরে ফুঁ দেওয়া, যাতে স্প্রের মতো সামান্য থুতু বেরিয়ে আসে। যেমনটা উক্ত গ্রন্থের ওয়াসওয়াসার অধ্যায়ে বলা হয়েছে, নামাযের মাঝে শয়তান ওয়াসওয়াসা দিলে বামে তিনবার থুতু ফেলা। তো নামাযের মধ্যে কেউ যদি মসজিদে অবস্থানরত হয়, তখন সে নিশ্চয়ই একদলা থুতু ফেলবে না।
এ প্রসঙ্গে নিচে ১০ নম্বর পয়েন্টের হাদীসটিও উল্লেখযোগ্য।

৬. পড়ার পরে হাতে ফুঁ দিয়ে আক্রান্ত স্থানে বা পুরো শরীরে হাত বুলিয়ে নেওয়া
“আয়িশা রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ব্যথা অনুভব করলে নিজেই 'মুআওয়িজাত' সূরাগুলো (অর্থাৎ সূরা নাস ও ফালাক) পড়ে ফুঁ দিতেন। ব্যথা বৃদ্ধি পেলে আমি সেগুলো পড়ে তাঁর হাতে ফুঁ দিয়ে ব্যথায় স্থানে বুলিয়ে দিতাম বরকত লাভের আশায়।” ৭
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে যেহেতু বরকত আছে, তাই নিজে হাত বুলানোর বদলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে ফুঁ দিয়ে সেটা ব্যথার জায়গায় বুলিয়ে দিতেন। বুখারীতে এই হাদীসের সাথে আরেকটু বর্ধিত হয়েছে, "...যুহরী রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে ফুঁ দিতেন? তিনি বললেন, হাতে ফুঁ দিতেন, এরপর চেহারায় হাত বুলিয়ে নিতেন।” ৮

৭. ফুঁ দেওয়া ছাড়াই আক্রান্ত স্থানে কেবল হাত বুলানো
“হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারের অসুস্থদের ওপর ঝাড়ফুঁক করতেন এভাবে-ডান হাত বুলিয়ে দিতেন আর পড়তেন, হে আল্লাহ, মানুষের পালনকর্তা, আপনি যন্ত্রণা নিবারণ করুন। তাকে সুস্থতা দান করুন। আপনিই তো সুস্থতা প্রদানকারী। আপনার প্রদত্ত সুস্থতাই প্রকৃত সুস্থতা। এমন সুস্থতা দান করুন, যাতে কোনো রোগই আর অবশিষ্ট না থাকে।” ৯

৮. ওষুধ, পানি, লবণ অথবা এরকম কিছুতে রুকইয়াহ করে সেটা ব্যবহার করা
“আলী রা. বর্ণনা করেন, একটি বিচ্ছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নামাযরত অবস্থায় দংশন করল। নামায শেষ করে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, 'আল্লাহ তাআলা বিচ্ছুকে অভিশপ্ত করুন, এটা নামাযি কিংবা বেনামাযি কাউকে ছাড় দেয় না।' তারপর তিনি পানি আর লবণ আনতে বললেন এবং সূরা কাফিরুন, ফালাক, নাস পড়তে লাগলেন আর আহত স্থানে লবণ-পানি দ্বারা মালিশ করতে লাগলেন।” ১০
কোনো কোনো বর্ণনায় শুধু সূরা ফালাক এবং সূরা নাসের কথা আছে। আর কোনোটায় তা উল্লিখিত হয়েছে এভাবে-পানিতে লবণ গুলিয়ে ওই জায়গায় ঢেলেছিলেন এবং চার কুল তথা সূরা কাফিরুন, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়েছিলেন।
আরেকটি হাদীস-
“সাবিত ইবনু কাইস ইবনু শামমাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি একবার অসুস্থ ছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুআটি পড়লেন-
اكْشِفِ الْبَأْسَ رَبَّ النَّاسِ 'হে মানুষের প্রভু, রোগমুক্ত করুন।'
এরপর একটি পাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাত্নহানের ১১ এক মুঠো মাটি রাখলেন, এরপর সেখানে পানি ঢাললেন এবং তাতে ফুঁ দিলেন। তারপর ওই পানি তাঁর (সাবিত রা.) ওপর ঢেলে দেওয়া হলো।” ১২
উল্লেখ্য, এই হাদীসের সনদকে একদল মুহাদ্দিস দুর্বল বলেছেন কেননা সনদে ইউসুফ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু সাবিত রয়েছে। কিন্তু ইবনে হাজার তাকে মাকবুল বা গ্রহণীয় বলেছেন। তাছাড়াও যেহেতু এর বিপরীত কোনো বক্তব্য অন্য কোনো হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়; বরং উল্টো অন্য অনেক হাদীস এর সমর্থন করে, তাই এটা দলিল হিসেবে উল্লেখযোগ্য। এমনকি শাইখ বিন বায রহ. রুকইয়ার গোসল এবং পানিপান প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে দলিল হিসেবে এই হাদীসটাই উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া এখানে মূলত ওষুধ এবং রুকইয়ার মধ্যে সমন্বয় করা হয়েছে। আর এ দুটো স্বতন্ত্রভাবে সুন্নাহ।

৯. মাটি বা এরকম কিছুতে হাত দিয়ে দুআ পড়া, এরপর সেটা আক্রান্ত জায়গায় লাগানো
“আয়িশা রা. বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়ম ছিল, মানুষ কোনো অসুস্থতা, ফোঁড়া কিংবা জখমের ব্যাপারে তাঁর কাছে বললে তিনি তাঁর আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করে এভাবে দুআ পড়তেন-
بِسْمِ اللَّهِ تُرْبَةُ أَرْضِنَا بِرِيقَةِ بَعْضِنَا لِيُشْفَى سَقِيمُنَا بِإِذْنِ رَبِّنَا অর্থ: আল্লাহর নামে, আমাদের জমিনের মাটি আমাদের কারও লালার সাথে (মিলিয়ে) আমাদের প্রতিপালকের হুকুমে তা দিয়ে আমাদের রোগীর আরোগ্য প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে (মালিশ করছি)।”
(কথাটা বোঝাবার জন্য) হাদীসটির বর্ণনাকারী সুফিয়ান ইবনু উওয়াইনাহ রহ. তাঁর শাহাদাত আঙ্গুল মাটিতে লাগাতেন, এরপর তুলে নিতেন। ইবনু আবি শাইবাহ রহ. সূত্রে لِيُشفى -এর স্থলে يُشفى বর্ণিত হয়েছে। ১৩

১০. পরপর কয়েকদিন রুকইয়াহ করা
“খারিজাহ ইবনু সাল্‌ত তামিমী রা. থেকে তার চাচার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে ফেরার পথে আরবের একটি জনপদে পৌঁছলাম। তারা বলল, আমরা সংবাদ পেয়েছি যে, আপনারা এ ব্যক্তি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছ থেকে কল্যাণকর কিছু নিয়ে এসেছেন। আপনাদের কারও কোনো ওষুধ বা ঝাড়ফুঁকের কিছু জানা আছে কি? কারণ, আমাদের নিকট একটি পাগল আছে, যাকে আমরা বেঁধে রেখেছি। আমরা বললাম, 'হ্যাঁ!' তখন তারা বাঁধা অবস্থায় এক পাগলকে নিয়ে এলো। 'আমি তিনদিন সকাল-সন্ধ্যা তার ওপর সূরা ফাতিহা পড়লাম। প্রতিবার পড়া শেষে থুতু ছিটিয়ে দিলাম।' তাতে সে (এভাবে সুস্থ হলো) যেন বন্দী দশা থেকে মুক্তি লাভ করল। এরপর তারা আমাকে কিছু বিনিময় দিলো। আমি বললাম, না, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করার আগে এটা গ্রহণ করতে পারি না। এই ঘটনা শুনে তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এগুলো তুমি খেতে পারো। আমার জীবনের শপথ, লোকজন তো বাতিল ঝাড়ফুঁক দিয়ে রোজগার করে। আর তুমি হক রুকইয়াহ দ্বারা রোজগার করেছ।” ১৪

টিকাঃ
১. মুসলিম: ৪০৬৩
২. বুখারী: ৫৪০১
৩. মুসলিম: ৪০৮৯, তিরমিযী: ২০০৬
৪. বুখারী: ৩৪৬৯
৫. বুখারী: ৫৩৩৫
৬. মুসলিম: ৪০৮৩
৭. আবূ দাউদ: ৩৯০২
৮. বুখারী: ৫৪০৩
৯. বুখারী: ৫৩২৯
১০. আল-মুজামুল আওসাত: ৫৮৮৬
১১. বাত্বহান মদীনার একটি উপত্যকার নাম। এক হাদীসে এসেছে- বাত্বহান জান্নাতের প্রণালীসমূহের মধ্যে একটি প্রণালীতে অবস্থিত (সিলসিলা সহীহাঃ ২/৪১১) বাত্বহানের মাটির যে আলাদা উপকারিতা আছে তা এখান থেকেও বুঝে আসে। (সম্পাদক)
১২. আবূ দাউদ: ৩৮৮৫
১৩. মুসলিম: ৪০৬৯
১৪. আবূ দাউদ: ৩৪২০

📘 রুকইয়াহ > 📄 রুকইয়াহ সাপ্লিমেন্টারি

📄 রুকইয়াহ সাপ্লিমেন্টারি


এ পর্যায়ে আমরা কিছু ওষুধ এবং ঔষধি গুণসম্পন্ন লতা-পাতা ইত্যাদির সাথে পরিচিত হব, যা রুকইয়ার সাথে ব্যবহার হয়। তবে খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, এগুলো রুকইয়াহ না; বরং রুকইয়ার সম্পূরক বা কার্যকারিতাবর্ধক বস্তু। রুকইয়াহ হচ্ছে সেসব কাজ, যা আমরা একটু আগে বর্ণনা করলাম। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, রুকইয়ার সাথে এসব ব্যবহার করতেই হবে, এটা আবশ্যক না। যদি এগুলো সহজলভ্য হয় এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে আপনার যথেষ্ট ধারণা থাকে, তখন চাইলে রুকইয়ার সাপ্লিমেন্ট হিসেবে এসব ব্যবহার করতে পারেন। ১৫

১. রুকইয়ার পানি
ক. সবচেয়ে উত্তম হলো যমযমের পানি। যমযমের পানিতে শিফা রয়েছে; উপরন্তু এর ওপর রুকইয়ার আয়াত পড়া হলে তার উপকারিতা বেড়ে যায় আরও বহুগুণ।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম পানি হচ্ছে যমযমের পানি, যাতে রয়েছে ক্ষুধার্তের জন্য খাদ্য এবং অসুস্থতার জন্য আরোগ্য।” ১৬
জাবের বিন আব্দুল্লাহ রা. কর্তৃক বর্ণিত,
“তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'যমযমের পানি যে নিয়তে পান করা হবে, তা তার জন্যই (কার্যকরী হবে)।” ১৭
খ. যমযমের পানির পর উত্তম হচ্ছে বৃষ্টির পানি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
“আমি আকাশ থেকে বরকতময় বৃষ্টি বর্ষণ করি। আর তা দ্বারা বাগান ও ফসল উদগত করি, যা আহরণ করা হয়।” ১৮
এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘটনা লক্ষণীয়:
“আনাস রা. বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম, তখন বৃষ্টি নামল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাপড় প্রসারিত করলেন, যাতে সেটা পানি স্পর্শ করে। আমরা বললাম, আপনি কেন এমন করলেন? তিনি বললেন, কারণ এটা তার মহান রবের নিকট থেকে এখনই এসেছে।” ১৯
গ. এই দুটোর কোনোটি না পেলে সাধারণ পানি হলেও চলবে। কিংবা বরকতের জন্য চাইলে সাধারণ পানির সাথে যমযম বা বৃষ্টির পানি মেশানো যেতে পারে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিকিৎসার জন্য সাধারণ পানিও ব্যবহার করেছেন। (পূর্বের অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)
ব্যবহার: রুকইয়ার পানি সাধারণত পান করার জন্য এবং গোসলে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া রুকইয়াহ চলাকালীন রোগীর ওপর তা ছিটিয়ে দেওয়া হয়। তাবীজ বা জাদুর কিছু পাওয়া গেলে সেটাকে রুকইয়ার পানিতে ডুবিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়। ২০

২. হিজামা (কাপিং থেরাপি)
"আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তাকে হিজামার পারিশ্রমিক প্রদানের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজামা করিয়েছেন। আবূ তায়বা রা. তাঁর হিজামা করেন। এরপর তিনি তাকে দুই সা' খাদ্যবস্তু প্রদান করেন। ২১ সে তার মালিকের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বললে তার থেকে পারিশ্রমিক কমিয়ে দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, তোমরা যেসব জিনিস দিয়ে চিকিৎসা করো, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো হিজামা এবং সামুদ্রিক কস্টাস।” ২২
“ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মিরাজের রাতে আমি ফেরেশতাদের যে দলকেই অতিক্রম করেছি, তাদের সকলে আমাকে বলেছেন, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি অবশ্যই হিজামা করবেন।” ২৩
ব্যবহার: রুকইয়ার পাশাপাশি হিজামা করানোর উপকারিতা অতুলনীয়। বিশেষতঃ জাদু বা বদনজর আক্রান্ত হওয়ার কারণে যদি অসুস্থ হয়, কিংবা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা থাকে, তাহলে রুকইয়ার সাথে হিজামা খুবই ফলপ্রসূ। অনেকের ক্ষেত্রে হিজামা করানোর পরেই কেবল পূর্ণ সুস্থতা লাভ হয়। উল্লেখ্য যে, হিজামা একটি আরবী শব্দ, বাংলায় যাকে শিঙ্গা লাগানো বলে। আজকাল শিঙ্গার পরিবর্তে কাপের মাধ্যমেও হিজামা করানো হয়। একে কাপিং থেরাপি বলে।

৩. মধু
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
"তার (মৌমাছির) পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় বের হয়, যাতে মানুষের জন্যে রয়েছে শিফা।” ২৪
"আবূ সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমার ভাইয়ের পেটে অসুখ হয়েছে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে মধু পান করাও। এরপর দ্বিতীয়বার লোকটি আসলে তিনি বললেন, তাকে মধু পান করাও। সে তৃতীয়বার আসলে তিনি বললেন, তাকে মধু পান করাও। এরপর লোকটি পুনরায় এসে বলল, আমি অনুরূপই করেছি (অন্য বর্ণনায় আছে: আমি অনুরূপই করেছি, কিন্তু সমস্যা তো বেড়ে যাচ্ছে)। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ সত্য বলেছেন, আর তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যা বলছে। তাকে মধু পান করাও। সে তাকে আবার মধু পান করালো। তখন সে আরোগ্য লাভ করল।” ২৫
ব্যবহার: মধু সাধারণত খাওয়ার জন্য ব্যবহার হয়, কালোজিরা আর মধু একত্রে খাওয়া প্রসিদ্ধ। তবে সুন্নাত হচ্ছে পান করা, অর্থাৎ পানিতে গুলিয়ে সেটা পান করা। এ ছাড়া বিভিন্ন ওষুধের সাথে মধু ব্যবহার হয়।
এই হাদীসের একটি বিষয় লক্ষণীয় তা হলো, 'মধু খাওয়ার পর প্রথমে সমস্যা বেড়ে গিয়েছিল'। অনুরূপভাবে রুকইয়াহ করার সময়েও অনেকের সমস্যা বাড়তে পারে, তখন চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া যাবে না, নিয়ম মাফিক রুকইয়াহ করে যেতে হবে। আল্লাহর ইচ্ছায় এক সময় আরোগ্য পাওয়া যাবে।

৪. কালোজিরা
"আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নিজেদের জন্য এই কালোজিরার ব্যবহারকে আবশ্যক করে নাও। কেননা, মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের নিরাময় এর মধ্যে রয়েছে।” ২৬
“আয়িশা রা. বর্ণনা করেছেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, এই কালোজিরা মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের ওষুধ।” ২৭
ব্যবহার: রুকইয়াহর পাশাপাশি কালোজিরা সাধারণত মধুর সাথে খাওয়া হয়, শুধু কালোজিরাও চিবিয়ে বা পিষে খাওয়া হয়। এছাড়া কালোজিরার তেল মাথায় এবং শরীরে ব্যবহার করা হয়।

৫. অলিভ অয়েল (যাইতুনের তেল)
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
"..যেটি জ্বালানো হয়েছে বরকতময় যাইতুন গাছ থেকে, যা প্রাচ্যেরও নয়, পাশ্চাত্যেরও নয়।” ২৮
এই প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত হাদীসটিও আমরা দেখতে পারি,
"আবূ উসাইদ রা. থেকে হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা যাইতুনের তেল খাও এবং সেটা শরীরে মালিশ করো। কেননা এটি বরকতময় গাছের তেল।” ২৯
ব্যবহার: রুকইয়ার সাথে অলিভ অয়েল সাধারণত শরীরে এবং মাথায় মাখার জন্য ব্যবহার হয়। ফিলিস্তিনের এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল হলে সবচেয়ে ভালো। নইলে শরীরে ব্যবহারের উপযোগী ভালো মানের যেকোনো অলিভ অয়েলই চলতে পারে।

৬. খেজুর
"সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সকাল বেলায় সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন তাকে কোনো বিষ বা জাদু ক্ষতি করবে না।” ৩০
এ বিষয়ে আরেকটি হাদীস হলো,
“আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মদীনার উঁচু ভূমির অঞ্চলের আজওয়া খেজুরে আরোগ্য রয়েছে, অথবা প্রতিদিন সকালে এর আহার বিষনাশক (হিসেবে কাজ করে)।” ৩১
ব্যবহার: সিহরের অর্থাৎ জাদুর রুকইয়ার পর রোগীকে আজওয়া খেজুর খেতে পরামর্শ দেওয়া হয়। অনেক রাক্বী নিজের কাছে আজওয়া খেজুর রাখেন এবং রুকইয়ার পূর্বেই রোগীকে খেতে বলেন। ৩২
এখানে উল্লেখ্য বিষয় হলো, আজওয়া খেজুর সংক্রান্ত সব রকম হাদীস বিবেচনার পর আলিমদের মত হচ্ছে, সর্বোত্তম হলো মদীনার উঁচু অঞ্চলের আজওয়া খেজুর, এরপর মদীনার অন্য আজওয়া খেজুর, এরপর অন্যান্য এলাকার আজওয়া খেজুর। তারপর মদীনার অন্য খেজুর, শেষ বিকল্প হিসেবে উন্নতমানের যে কোনো খেজুর চিকিৎসার জন্য উপকারী হবে ইনশাআল্লাহ।

৭. বরই পাতা অথবা কপূর পাতা
বরই পাতা না পেলে তখন কপূর বা কপূর পাতা ব্যবহার করা যায়।
"আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আসমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হয়ে কীভাবে গোসল করবে? তিনি বললেন, সে গোসলে বরই পাতা মিশ্রিত পানি ব্যবহার করবে।” ৩৩
“উম্মু আতিয়্যাহ্ আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা যাইনাব রা. ইন্তিকাল করলে তিনি আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমরা তাকে তিনবার বা পাঁচবার বা প্রয়োজন মনে করলে তার চেয়ে অধিকবার বরই পাতা মিশ্রিত পানি দিয়ে গোসল দাও। শেষবারে কপূর (কিংবা বলেছেন: অল্প কিছু কপূর) ব্যবহার করবে।” ৩৪
ব্যবহার: বরই পাতা সাধারণত জাদুর চিকিৎসার জন্য রুকইয়ার গোসলে ব্যবহার হয়। এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ নিয়ম হচ্ছে, ৭টি বরই পাতা বেটে পানিতে মিশ্রিত করবে, আর আয়াতুল কুরসী এবং সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস ৩ বার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিতে থাকবে। এরপর এই পানি থেকে কিছুটা খাবে এবং গোসল করবে। এভাবে কিছুদিন করলে ইনশাআল্লাহ সুস্থ হয়ে যাবে।

৮. সোনাপাতা
"আসমা বিনতু উমায়স রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি রেচক (laxative) হিসেবে কী ব্যবহার করো? আমি বললাম, শুবরুম (ছোলার মত এক প্রকার দানা)। তিনি বলেন, তা তো খুব গরম। এরপর আমি সোনামুখী গাছের পাতার রেচক নিলাম (অর্থাৎ নেওয়ার কথা বললাম)। তখন তিনি বললেন, কোনো ওষুধ যদি মৃত্যু থেকে নিরাময় দিতে পারত, তবে তা হতো সোনামুখী।” ৩৫
ব্যবহার: সোনাপাতার সিরাপ বা ট্যাবলেট একবার খেলে সাধারণত এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত ডায়রিয়া থাকে, যার মাধ্যমে পেটে জাদুর কিছু থাকলে বের হয়ে যায়। ইয়েমেনে এই পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
আর এখন ইউনানি চিকিৎসালয়েও senna ট্যাবলেট পাওয়া যায়, এছাড়া বিকল্প হিসেবে অন্যান্য laxative মেডিসিন রয়েছে, যা ফার্মেসীতে পাওয়া যাবে। তবে পূর্ব ধারণা না থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত কোনো রেচকই গ্রহণ করা উচিত হবে না। আর অবশ্যই সতর্ক থাকবেন, যেন এটা অতিরিক্ত না খাওয়া হয়। বিশেষত যদি কিডনির সমস্যা, হৃদরোগ বা প্রেগনেন্সি থাকে তাহলে রেচক ব্যবহারের আগে অবশ্যই কোনো দ্বীনদার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নেবেন।
সিহরের চিকিৎসায় যদি ল্যাক্সেটিভ বা রেচক ব্যবহার করেন তাহলে সিহরের আয়াতগুলো (অর্থাৎ সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯) এবং সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ে সেটার ওপর ফুঁ দেবেন, এরপর নিয়ম মাফিক সেবন করবেন। আর যতক্ষণ এটার প্রভাব থাকবে, সে পর্যন্ত বেশি বেশি পানি পান করবেন।

৯. ভারতীয়/সামুদ্রিক কস্টাস
"উন্মু কায়স বিনতে মিহসান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তোমরা ভারতীয় কস্টাসের ব্যবহার আবশ্যক করে নাও। কেননা তার মাঝে সাত ধরনের শিফা রয়েছে। শ্বাসনালীর ব্যথায় এটা নাক দিয়ে (ড্রপ হিসেবে) নেওয়া যায়, নিউমোনিয়া দূর করার জন্যও তা সেবন করা যায়।” ৩৬
ব্যবহার: রুকইয়ার সাথে দুইভাবে কস্টাস ব্যবহার হয়- প্রথমতঃ জিনের রোগীর রুকইয়ার সময় অলিভ অয়েল এবং কস্টাস পাউডার একত্র করে ড্রপ হিসেবে নাকে দেওয়া হয়। তবে প্রথমে এর ওপর কিছু রুকইয়ার আয়াত এবং আয়াতুল হারক ৩৭ পড়তে হয়। দ্বিতীয়তঃ গরম পানি বা দুধের মধ্যে গুলিয়ে খাওয়া হয়। অথবা অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশিয়ে হালুয়া বা ওষুধ বানানো হয়। সামুদ্রিক কস্টাস এবং ভারতীয় কস্টাসের মাঝে দ্বিতীয়টি বেশি প্রসিদ্ধ।

১০. সদকা করা ও দুআ করা
"আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের সম্পদ হেফাজত করো যাকাত প্রদানের মাধ্যমে, তোমাদের রোগের চিকিৎসা করো সদকার মাধ্যমে, আর তোমাদের বিপদ দূর করো দুআর মাধ্যমে।” ৩৮
ব্যবহার: রুকইয়াহ চলাকালীন সময়ে রোগ থেকে মুক্তির জন্য কিছু দান-সদকা করা সুস্থতাকে ত্বরান্বিত করবে ইনশাআল্লাহ। আর দুআ তো অবশ্যই করতে হবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জাদু আক্রান্ত হয়েছিলেন, তখন কয়েকদিন অনেক দুআ করেছেন, এরপরেই আল্লাহ তাআলা তাঁর চিকিৎসার জন্য সূরা ফালাক এবং সূরা নাস নাযিল করেছেন। সেই সাথে জানিয়ে দিয়েছেন কে জাদু করেছে, কীভাবে জাদু করেছে, জাদুর জিনিসগুলো কোথায় আছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ আমরা জাদু সংক্রান্ত অধ্যায়ে দেখব। সুতরাং আমাদেরও উচিত বেশি বেশি দুআ করা। একটা একটা সমস্যার কথা উল্লেখ করে দুআ করা, আল্লাহর কাছে সুস্থতা প্রার্থনা করা এবং বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়া।

১১. রাতের সালাত (তাহাজ্জুদ)
তাহাজ্জুদ সুস্থতা লাভের উসিলা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার একটি চমৎকার সুযোগ। এজন্য রুকইয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন রাতে অল্প কয়েক রাকআত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে সুস্থতা এবং বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়া অনেক ফলদায়ক।
“বিলাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা তাহাজ্জুদ পড়াকে আবশ্যক করে নাও। কারণ, এটা তোমাদের সালাফে সালেহীন (পূর্ববর্তী নেককার ব্যক্তিদের) অনুসৃত রীতি। রাতের নামায তোমাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম, গুনাহ থেকে বারণকারী, পাপ মোচনকারী এবং শরীর থেকে রোগ-ব্যাধি দূরকারী।” ৩৯
"জাবির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, রাতে এমন একটি সময় রয়েছে, কোনো মুসলমান ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দুনিয়া- আখিরাতের কোনো কল্যাণ প্রার্থণারত অবস্থায় যদি সময়টি পেয়ে যায় তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করবেন। আর এই সময় রয়েছে প্রতিটি রাতেই।” ৪০
"আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাদের বরকতময় ও মহান প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকার সময় পৃথিবীর আসমানে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন, কে আছে আমাকে ডাকবে তাহলে আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। কে আছে আমার কাছে চাইবে, তবে আমি তাকে দিয়ে দেবো। কে আছে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তবে আমি তাকে মাফ করে দেবো।” ৪১
ব্যবহার: রুকইয়ার শুরুতে এবং রুকইয়াহ চলাকালীন তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে বিপদ থেকে মুক্তি এবং আরোগ্য প্রার্থনা করা অনেক উপকারি প্রমাণিত হয়েছে। অনেকে বিশেষ কোনো কারণে নিজে নিজে রুকইয়াহ করতে পারেন না, অন্যকে দিয়ে বা কারও কাছে গিয়ে রুকইয়াহ করানোর সুযোগও থাকে না। এরকম ক্ষেত্রে তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করা উচিত।

১২. তাওবা (ইস্তিগফার)
বেশি বেশি ইস্তিগফার করলে আয়রোজগার, বিয়ে অথবা সন্তান-সন্ততি বিষয়ক বিপদ, ডিপ্রেশন, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি থেকে আল্লাহ্‌ তা'আলা সহজেই মুক্তি দেন। যদি কোন পাপের কারণে বিপদ এসে থাকে, তবে তো ইস্তিগফারের কোন বিকল্প নেই। আল্লাহ্‌ কুরআনে নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনায় উল্লেখ করেছেন-
“এরপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা চাও (ইস্তিগফার করো)। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তাহলে তোমাদের জন্য তিনি আসমান থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন; ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন আর তোমাদের জন্য নদ-নদী প্রবাহিত করবেন।” ৪২
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “নিশ্চয় আমি আল্লাহর নিকট প্রতিদিন সত্তরবারের অধিক তাওবা – ইস্তিগফার করি।” ৫০
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নিজের জন্য ইস্তিগফার করা আবশ্যক বানিয়ে নেয় (অন্য বর্ণনায় আছে, যে অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করে) আল্লাহ তার যেকোনো সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন। ৪৪
ব্যবহার: বিপদের সময় প্রচুর পরিমাণে ইস্তিগফার করা উচিত। পূর্বে কৃত অপরাধের জন্য ভালভাবে তাওবা করা উচিত। এছাড়াও অপেক্ষা কিংবা অবসরের সময়গুলো, জ্যামে অথবা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়গুলোকে ইস্তিগফারের মাধ্যমে মূল্যবান বানানো যায়। এক্ষেত্রে মনোযোগের সাথে বারবার শুধু “আস্তাগফিরুল্লাহ” পড়লেও হবে।

টিকাঃ
১৫. সহযোগী পথ্য, চিকিৎসার গতি বাড়াতে, ঔষধ এর উপকারিতা বাড়াতে যা ব্যবহার হয়
১৬. আল-মুজামুল আওসাত: ৮১২৫, সনদ সহীহ
১৭. ইবনু মাজাহ : ৩০৬২
১৮. সূরা কাফ, আয়াত: ৯
১৯. মুসলিম: ৮৯৮
২০. রুকইয়ার পানি বিষয়ে আরও জানতে দেখুন: bd.org/blog/664
২১. এক সা' হল ৩ কেজি ১৮৪.২৭২ গ্রাম সমপরিমাণ।
২২. বুখারী: ৫৩৭১
২৩. ইবনু মাজাহ : ৩৪৭৬
২৪. সূরা নাহল, আয়াত: ৬৯
২৫. বুখারী: ৫৩৬০
২৬. তিরমিযী: ২০৪১
২৭. বুখারী: ৫৩৬৪
২৮. সূরা নূর, আয়াত: ৩৫
২৯. তিরমিযী: ১৮৫২
৩০. বুখারী: ৫৪৩৬
৩১. মুসলিম: ৩৮১৫
৩২. রুকইয়াহ প্রয়োগকারী চিকিৎসক অর্থাৎ যিনি রুকইয়াহ করেন।
৩৩. মুসলিম: ৫০৫
৩৪. বুখারী: ১১৯৫
৩৫. তিরমিযী: ২০৮১, সনদ হাসান
৩৬. বুখারী: ৫৩৬৮
৩৭. যেসব আয়াতে জাহান্নামের আগুন, আযাব, শাস্তি ইত্যাদির কথা আছে।
৩৮. আল-মুজামুল আওসাত ২০০৬, বাইহাকি ৩২৫৩
৩৯. তিরমিযী: ৩৫৪৯, বাইহাকী: ৪৫৩২
৪০. মুসলিম: ৭৫৭
৪১. বুখারী: ৫৯৬২
৪২. সূরা নূহ, আয়াত: ১০-১২
৫০. বুখারী: ৫৯৪৮
৪৪. আবূ দাউদ : ১৫১৮, মুসতাদরাকে হাকীম : ৪/২৬২

📘 রুকইয়াহ > 📄 রুকইয়ার অডিও নিয়ে জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্ন এবং তার উত্তর

📄 রুকইয়ার অডিও নিয়ে জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্ন এবং তার উত্তর


সাধারণত রুকইয়ার অডিও বা অডিও রুকইয়াহ বলতে সেসব রেকর্ডিংকে বোঝানো হয়, যাতে সাধারণভাবে ব্যবহৃত রুকইয়ার আয়াত এবং দুআ থাকে।
তবে ব্যাপারটা এমন না যে, আমরা মুসলমানরাই শুধু শরঈ রুকইয়ার অডিও শুনি; বরং অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও এক্সোর্সিজমের অডিও ব্যবহার করে।
যেমন: বিখ্যাত একটি ডিসি কমিকসে একজনকে অডিও টেপ দিয়ে সেলফ-এক্সোর্সিজম করতে দেখা যায়, কিন্তু শক্তপোক্ত জিনের সমস্যা বিধায় নিজে নিজে করা রুকইয়াহ যথেষ্ট হয় না। এতো গেল খ্রিষ্টানদের গল্প। অনেকে ইউটিউব থেকে রুকইয়াহ শোনে, ইউটিউবেও বহু কিসিমের রুকইয়াহ আছে। মুসলমানদের রুকইয়াহ যেমন আছে, শিয়া ধর্মানুসারী বা বিদআতিদের শিরকি রুকইয়াও ভুরি ভুরি আছে। আবার অর্থ উপার্জনের জন্য প্রস্তুতকৃত আকর্ষণীয় শিরোনামের অনর্থক অডিওর অভাব নেই। অধিকাংশ মানুষ যেহেতু এত সব পার্থক্য বোঝে না, তাই আমরা কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তিকে দিয়ে যাচাই না করিয়ে ইউটিউব থেকে ইচ্ছেমত রুকইয়াহ শোনার ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করে থাকি।
রুকইয়ার অডিও নিয়ে প্রায়শ জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্ন এবং তার উত্তর:

১. রুকইয়ার জন্য রুকইয়ার অডিও শোনাই কি যথেষ্ট?
- না, অডিও হচ্ছে রুকইয়ার একটা সাপ্লিমেন্ট মাত্র; এটাই সব নয়। বরং পাগলের মতো শুধু অডিও শুনতে থাকলে ফায়দা কম এবং কষ্ট অনেক বেশি হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কেউ যদি নিজে তিলাওয়াত করতে পারে, তাহলে অডিও না শুনে নিজে পড়াটাই উত্তম। তিলাওয়াত করলে সোনার চেয়ে অনেক বেশি উপকার হয়।

২. তাহলে রুকইয়াহ অডিও কেন দরকার?
- ক্ষেত্র বিশেষে অডিওর বিকল্প নেই। যেমন: মেয়েদের পিরিয়ডের সময়; তখন তারা নিজেরা তিলাওয়াত করতে পারবে না। অন্য কেউ প্রতিদিন রুকইয়াহ করবে, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াও তো মুশকিল ব্যাপার। তাই বাধ্য হয়েই এমন ক্ষেত্রে সেরা অপশন হচ্ছে রুকইয়ার অডিও। অনেকের কোরআন তিলাওয়াত একদমই শুদ্ধ না। তারা রুকইয়ার জন্য নিশ্চিন্তে রুকইয়ার অডিও ব্যবহার করতে পারেন।
এছাড়া সবসময় তিলাওয়াত করা সম্ভবও হয় না। যেমন: কেউ গাড়িতে করে সফরে যাচ্ছে, অথবা সারাদিন চাকরিতে সময় দিতে হচ্ছে। তার রুকইয়াহ করা দরকার প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা। এক্ষেত্রে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে চাইলে তার জন্য অডিওর বিকল্প নেই। ঘুমের সমস্যায় ঘুমের আগে এক ঘণ্টা ধরে লাইট জ্বালিয়ে সূরা ইয়াসীন, সফফাত, দুখান, জিন তিলাওয়াত করা বেশির ভাগ মানুষের পক্ষেই সম্ভব না; তাই এক্ষেত্রেও অপশন হচ্ছে অডিও। কোন অমুসলিমের রুকইয়াহ করানো দরকার, কিন্তু সহায়তার জন্য কোন মুসলমানকে পাওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রেও অডিওর সহায়তা নেয়া যায়। অনেক সময় জিনের সমস্যার জন্য নিজে নিজে রুকইয়াহ করার প্রয়োজন পড়ে। তখন দেখা যায় শয়তান গলা চেপে ধরে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে অডিও চালু করে দিয়ে রুকইয়াহ করা যায়। মোটকথা, রুকইয়ার অডিও বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রয়োজন পড়ে এবং বলা যায়, এটি আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত।
লক্ষণীয়: ড্রাইভিং অথবা এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার সময় রুকইয়াহ শোনা উচিত না।

৩. অডিও তিলাওয়াত শোনা বিদআত হবে কি?
কখনোই নয়। অজ্ঞতার কারণে কেউ হয়তো এটাকে বিদআত বলে দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রুকইয়াহ বিষয়ে তাদের না যথেষ্ট ধারণা আছে, আর না তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। একটু বিস্তারিত বলা যাক।
প্রথম বিষয়, এটা নামায-রোজা ইত্যাদির মতো নিরেট ইবাদাত (ইবাদাতে মাখসুসাহ) কিসিমের কিছু নয়। এটা একটা চিকিৎসা পদ্ধতি। সুতরাং অন্যান্য চিকিৎসার মতো এক্ষেত্রেও শরীয়তের নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না হলে এটা বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ব্যাপারে মূলনীতি পাওয়া যায় দু'টি হাদীসে-
"আওফ ইবনু মালিক আল-আশজায়ী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা জাহিলিয়াতের সময়েও রুকইয়াহ করতাম। তাই এ ব্যাপারে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি এ বিষয়টা কীভাবে দেখেন? তখন তিনি বললেন, তোমাদের ঝাড়ফুঁকগুলো আমাকে দেখাও; রুকইয়াতে যদি শিরক না থাকে তাহলে কোনো সমস্যা নেই।" ৪৬
“আবূ দারদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ রোগ এবং ঔষধ নাযিল করেছেন। আর তিনি প্রত্যেক রোগের জন্য ঔষধ সৃষ্টি করেছেন। তাই তোমরা ঔষধ ব্যবহার করবে, তবে হারাম বস্তুর ঔষধ ব্যবহার করবে না।” ৪৭
সুতরাং এ ব্যাপারে মানদণ্ড হচ্ছে হারাম অথবা শিরকি কোনো কিছু না থাকা। শিরক না থাকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহিলি যুগের মন্ত্র দিয়েও রুকইয়ার অনুমতি দিয়েছেন। আর এটা তো সরাসরি কুরআনুল কারীম! সুতরাং রুকইয়াতে কোন সমস্যা নেই, যদি তাতে শিরক না থাকে, এটা হোক অডিও কিংবা প্রত্যক্ষ কোনো মাধ্যম। তবে হ্যাঁ, এর পাশাপাশি উলামায়ে কিরাম ঝাড়ফুঁক বৈধ হওয়ার জন্য যে শর্তগুলো বলেছেন, সেগুলোর প্রতি পুরোপুরি খেয়াল রাখা আবশ্যক। যেমন: কোনো কুফর- শিরকের সংমিশ্রণ না থাকা। বাক্যগুলো এমন স্পষ্ট হওয়া, যার অর্থ বোধগম্য। আর এই বিশ্বাস থাকা যে, ঝাড়ফুঁকের নিজস্ব কোনো প্রভাব নেই, আরোগ্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। ইমাম সুয়ূতী রহ., ইমাম নববী রহ. এবং ইবনু হাজার রহ. এ ব্যাপারে উম্মতের ইজমা উদ্ধৃত করেছেন।
দ্বিতীয়ত: আমরা প্রথম অধ্যায়ে দীর্ঘ হাদীস উল্লেখ করেছি, যেখানে আমরা দেখেছি, সাহাবায়ে কিরাম রা. ঝাড়ফুঁক করে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অবগতির প্রত্যুত্তরে হেসে বলেছেন, 'তুমি কিভাবে জানলে সূরা ফাতিহা একটি রুকইয়াহ!' ৪৮ এছাড়া এই হাদীসটিও লক্ষণীয়:
"আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন এক মহিলার চিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁক করা হচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কুরআন দ্বারা তার চিকিৎসা করো।” ৪৯
এ থেকেও বোঝা যাচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকইয়াকে বিশেষ কিছু পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেননি; বরং তিনি মূলনীতি বলে গিয়েছেন। আর কুরআন দ্বারা রুকইয়াহ করতে উৎসাহিত করেছেন। সাহাবায়ে কিরামও সে অনুযায়ী রুকইয়াহ করেছেন, সন্দেহ লাগলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে নিশ্চিত হয়েছেন।
সুতরাং যেহেতু রুকইয়ার অডিও শরীয়তের মূলনীতি লঙ্ঘন করছে না, অতএব এটা বৈধ।
তৃতীয়ত: কুরআন তিলাওয়াত করা হচ্ছে সর্বোত্তম ইবাদাতগুলোর একটি। ৫০ আর আল্লাহ তাআলা নিজে কুরআন মনোযোগ দিয়ে শুনতে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর হাদীসটি উল্লেখযোগ্য:
“আব্দুল্লাহ রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার উদ্দেশে বললেন, আমাকে কুরআন পড়ে শোনাও। তিনি বললেন, আপনার ওপরই তো কুরআন নাজিল হয়েছে, আর আমি কিনা আপনাকেই তিলাওয়াত করে শোনাবো! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয় আমি অন্যের থেকে তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করি।” ৫১
সুতরাং এ থেকে বুঝতে পারছি, কুরআন শোনাও একটি উত্তম আমল। কিন্তু বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম কখনোই বলেন না, ইলেকট্রনিক ডিভাইসে কুরআন শোনা বিদআত। এই একই কুরআন রুকইয়াহ হিসেবে শুনলে কোনোভাবেই বিদআত হবে না। যেখানে রুকইয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতোটা প্রশস্ততা রেখেছেন, সেখানে এটাকে সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ করার অধিকার আছে আর কার!
'আম' (ব্যাপক) বিষয়কে 'খাস' (সীমাবদ্ধ) করার অধিকার না ফিকহ কাউকে দেয়, আর না ইসলামের ভাবধারার সাথে এটা কোনো অবস্থায় মানানসই।
বিখ্যাত আরব শাইখ সালিহ আল মুনাজ্জিদ হাফিযাহুল্লাহ-কে গাড়িতে কুরআন তিলাওয়াতের অডিও শোনার বৈধতার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেছেন,
'কুরআন তিলাওয়াত শোনা মুস্তাহাব'। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কুরআন তিলাওয়াত শোনা বিষয়ক কিছু হাদীস উল্লেখ করে বলেছেন –
'হে প্রশ্নকারী ভাই, একইভাবে সিডি থেকে কুরআন শোনা-যেমনটা আপনি জিজ্ঞেস করেছেন-অথবা টেপরেকর্ডার, রেডিও বা টিভি থেকে কুরআন শোনা সব একই হুকুমে পড়বে। অর্থাৎ এসবই মুস্তাহাব। সেটা বাড়িতে শুনেন, অথবা কার, বাস কিংবা উপযুক্ত যেকোনো স্থানেই শুনেন, এসব কিছুর একই বিধান। তবে তিলাওয়াত এমন সময় শোনা উচিত নয়, যখন আপনি অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন। আর আপনি এভাবে (অডিও বা ভিডিও থেকে) তিলাওয়াত শুনলেও সওয়াব পাবেন। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।” ৫২

৪. মোবাইলে কুরআন শুনলে সওয়াব হবে?
একটু আগেই আমরা শাইখ সালিহ আল মুনাজ্জিদ হাফিজাহুল্লাহ-এর ফাতাওয়া উল্লেখ করেছি। কুরআনের আদব ঠিক রেখে অডিও তিলাওয়াত শুনলেও সওয়াব হবে। এ ছাড়া এই হাদীসটি খেয়াল করুন-
আবু যর গিফারি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার অনেকগুলো সওয়াবের কাজ নিয়ে বলছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, '..আর তোমাদের নিজের স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও সদকা।' সাহাবায়ে কিরাম অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের কারও যৌন আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হলো, আর সে স্ত্রীর সাথে সহবাস করল, এতেও সওয়াব হবে! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কেন? সে যদি এই চাহিদা হারাম পন্থায় (যিনার মাধ্যমে) পূরণ করত তবে কি তার গুনাহ হতো না?' ৫০
সুতরাং মোবাইলে গান কিংবা অশ্লীল কিছু শুনলে বা দেখলে যদি গুনাহ হয়, তবে আপনি নিশ্চিত থাকুন, কুরআন তিলাওয়াত শুনলে সওয়াবও হবে ইনশাআল্লাহ!

৫. কোন অডিওটা সবচেয়ে ভালো?
নির্দিষ্ট কোন অডিওকে সেরা বলা মুশকিল, উপরন্তু সবার ক্ষেত্রে একই অডিও সমান কার্যকরী হয় না। তবে এ বিষয়ের উসূল বা মূলনীতি বলা যায় এরকম -
এক. সবচেয়ে ভালো হচ্ছে, নিজের রুকইয়ার অডিও শোনা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনার ওপর রুকইয়াহ করা হলো, অথবা আপনি নিজেই রুকইয়ার জন্য তিলাওয়াত করলেন, পরবর্তীতে আপনি যদি সেটার অডিও রেকর্ডটা শোনেন, তবে ইনশাআল্লাহ সবচেয়ে বেশি উপকার হবে।
দুই. রুকইয়ার অডিও হিসেবেই যেটা রেকর্ড করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, www.ruqyahbd.org ওয়েবসাইটে শেয়ার করা 'বদনজর, সিহর এবং আয়াতুল হারকের অডিওগুলো। শাইখ লুহাইদান এবং খালিদ হিবশির অডিও।' এগুলোতে অন্য অডিওর চেয়ে তুলনামূলক বেশি প্রভাব হয়।
তিন. এছাড়াও অন্যান্য সাধারণ কুরআন তিলাওয়াতের অডিও, যেগুলো রুকইয়ার নিয়তে বিশেষভাবে রেকর্ড করা হয়নি, বরং স্বাভাবিক কুরআন তিলাওয়াত হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। আল্লাহর ইচ্ছায় সেগুলোতেও অনেক উপকার হবে। যেমন- সূরা তাগাবুনের অডিও, সূরা ইয়াসীন, সফফাত, দুখান, জিনের অডিও। এছাড়া সূরা বাক্কারার তিলাওয়াত অনেক শক্তিশালী রুকইয়াহ।
আল্লাহ যেন আমাদের রুকইয়ার অডিওর সদ্ব্যবহার করার তাওফীক দেন। আমীন।

টিকাঃ
৪৬. মুসলিম: ৪০৭৯। এছাড়া হাদীসটি আবূ দাউদ এবং আল-মুজামুল আওসাতেও বর্ণিত হয়েছে।
৪৭. আবূ দাউদ: ৩৮৭৪
৪৮. বুখারী: ৫৩৩৫
৪৯. ইবনু হিব্বান: ৬২৩২
৫০. শুআবুল ইমান; বাইহাকি: ১৮৬৯
৫১. বুখারী: ৪৭৬২
৫২. উৎসঃ ইসলাম কিউএ, ফাতাওয়া নং ১৪৫৯০
৫০. মুসলিম: ১৬৭৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00