📘 রূহের রহস্য > 📄 নাফস কি একটি না তিনটি

📄 নাফস কি একটি না তিনটি


যাবতীয় লোভ-লালসামুক্ত থেকে নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালন করে মনে শান্তি লাভ করা। তাছাড়া নিজের ইচ্ছাকে অথবা কারো অনুসরণকে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের উপর প্রাধান্য না দেয়া। যেসব বিষয়ের সাথে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের সঙ্গে সংঘাত বাধে এমন কোন কাজে লিপ্ত ও সম্পৃক্ত না হওয়া। এমন কোন বাসনা পোষণ না করা যা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের পরিপন্থি। বরং এ জাতীয় কোন বিষয়ের উদ্ভব হলে সেটাকে সে শয়তানী প্ররোচনা বলে মনে করে। এ প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "এটা হলো খাঁটি ঈমান।" এরূপ ঈমানের চিহ্ন হলো গুনাহের দরুন বিচলিত হওয়া ও পেরেশানী থেকে দূরে সরে এসে তাওবাহ করে প্রশান্তি ও আনন্দ লাভ করা। এ বিষয়ে চিন্তা করলে এটা বুঝা যায় যে, এই শান্তি ও তৃপ্তি তাওবার কারণেই অর্জিত হয়েছে। যিনি এরূপ অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, তিনিই কেবল এর বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারেন। গুনাহের যে অশান্তি সেটা তাওবার মাধ্যমে দূরীভূত হয়। কোন গুনাহগার ব্যক্তি যদি তার গুনাহ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে, তাহলে তার মধ্যে যে ভয়-ভীতি, চঞ্চলতা, অস্থিরতা এবং পেরেশানী আছে তা সে উপলব্ধি করতে পারে, যদিও লোভ-লালসা, অলসতা, কাম-ক্রোধ তাকে বিভ্রান্ত করে রেখেছে। প্রত্যেক লোভ-লালসার এক প্রকার নেশা আছে, যা মাদকদ্রব্যের নেশার চেয়েও অধিক প্রবল। এমনিভাবে ক্রোধের নেশা শরাবের নেশার চেয়েও মারাত্মক। এজন্য একজন প্রেমিক ও ক্রোধান্বিত মানুষ এমন সব কাজ করে বসে যা একজন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিও করে না। এমনিভাবে একজন গুনাহগার ব্যক্তি অলসতা, উদাসীনতা এবং অস্থিরতা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার ধ্যানের প্রশান্তির দিকে, আল্লাহর যিকরের তৃপ্তির দিকে এবং আল্লাহর মুহাব্বত ও মারেফাতের দিকে এসে যায়। এসব প্রক্রিয়ায় রূহের কখনো শান্তি লাভ হয় না। অন্যথায় রূহ সীমাহীন অস্থিরতা ও দুর্ভোগের শিকার হয়। এভাবে একজন মানুষ বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও অলসতা থেকে মুক্ত হয়ে যায়।

আল্লাহ তা'আলা মানুষের প্রত্যেকটি অঙ্গকে একটি বিশেষ গুণ প্রদান করেছেন। মানুষের যদি ঐসব গুণ না থাকতো, তাহলে সে সমূহ অশান্তি ও অস্থিরতায় ভুগতো। যেমন- চোখের গুণ হলো দর্শন করা, কানের গুণ হলো শ্রবণ করা আর মুখের গুণ হলো কথা বলা। যখন এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শক্তি লোপ পায়, তখন মানুষ গভীর দুঃখ ও বেদনা ভোগ করে। কোন একজন মানুষ যদি আল্লাহর এসব নি'আমত থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তার জীবন অসার, অচল ও অর্থহীন হয়ে পড়ে। সারা দুনিয়া তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও অধিকারে থাকুক না কেন এবং দুনিয়ার সকল বিদ্যায় সে সুপণ্ডিত হোক না কেন। কাজেই যে পর্যন্ত না আল্লাহ তা'আলা সে ব্যক্তির নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং তার মা'বুদ হবেন, সে পর্যন্ত সে শান্তি ও স্বস্তি লাভ করতে পারবে না। একজন বান্দার জন্য আল্লাহ তা'আলার ইবাদত-বন্দেগী অপরিহার্য।

প্রশান্ত আত্মা কাকে বলে? এ সম্পর্কে তাফসীর বিশেষজ্ঞদের অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলো। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, "প্রশান্ত আত্মা হলো সত্য ও মাহবুবিয়াতের স্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী রূহ।” হযরত কাতাদাহ (রা) বলেন, "ঐ মুমিন ব্যক্তি যার দিল আল্লাহ তা'আলার প্রতিশ্রুতির প্রতি সন্তুষ্ট ও প্রশান্ত।” হযরত হাসান (রা) বলেন, "ঐ রূহ যে আল্লাহ তা'আলার বাণীকে সত্য বলে স্বীকার করে।” হযরত মুজাহিদ (রা) বলেন, "ঐ রূহ আল্লাহ যে তার রব বা প্রতিপালক সেটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের সামনে অবনত হয়।” হযরত মানসূর (র) বলেন, "আল্লাহর নির্দেশাবলী সঠিকভাবে পালন করে আনুগত্যের মাধ্যমে একজন মানুষের মধ্যে যে দৃঢ়তা সৃষ্টি হয়, সেটাই প্রশান্ত আত্মা।" হযরত ইবনে নাজীহ (র) বলেন, "আল্লাহ তা'আলার সম্মুখে অবনত এবং তাঁর সাক্ষাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী রূহ হলো প্রশান্ত আত্মা।" তাছাড়া ইবাদত ও আমলের দ্বারা রূহ প্রশান্তি লাভ করে।

নাফসে মুতমায়িন্নাহ সম্পর্কে পূর্বেকার জ্ঞানী ব্যক্তিরা যে দু'টি মূলনীতিকে সমর্থন করতেন, সেগুলো হলো ইলম ও ঈমান। একজন মানুষ সন্দেহ থেকে বিশ্বাসের দিকে, মূর্খতা থেকে ইলমের দিকে, আল্লাহর বিস্মৃতি থেকে যিকরের দিকে, গুনাহ থেকে তাওবাহর দিকে, লোক দেখানো ইবাদত থেকে ইখলাসের দিকে, মিথ্যা থেকে সত্যের দিকে, উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে শৃঙ্খলার দিকে এবং আমলহীনতা থেকে আমলের দিকে অগ্রসর হলে রূহের প্রশান্তি লাভ হয়। এসব সতর্ক বাণীর মূল উদ্দেশ্য হলো যাতে আমরা ঈমান ও আমল ঠিক রেখে জীবনকে আরো সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করতে পারি। আখিরাতের জীবন সম্পর্কে যার কোন চিন্তা-ভাবনা নেই, আর আল্লাহ তা'আলার সাক্ষাৎ সম্পর্কে উদাসীন, সে ব্যক্তির অবস্থা হলো একজন নিদ্রিত ব্যক্তির ন্যায়, না, এর চেয়েও তার অবস্থা আরো শোচনীয় ও জঘন্য। একজন নেককার জ্ঞানী ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে সদা সতর্ক থাকেন। কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত করতে তার মনের অলসতা ও অনীহা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এরূপ হতভাগ্য ব্যক্তি লোভ-লালসার তাড়নায় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত থাকে ও ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা তাকে অতি সহজেই পথভ্রষ্ট করে দেয়। তার অবস্থা একজন নেশাগ্রস্ত লোকের ন্যায়। সৌভাগ্যবশত যদি এই অবস্থায় কোন হাক্কানী আলিমের উপদেশ ও সাবধান বাণী তার মনে রেখাপাত করে আর তার সে অলসতা দূর করে দেয়, তাহলে সে তার অন্তর্নিহিত সৎপ্রবৃত্তির কারণে সম্বিত ফিরে পায় এবং বলে উঠে, হে প্রভু! আমি হাযির। এভাবেই অর্জিত হয় তার সে সাহস ও শক্তি, যার ফলে সে আল্লাহর নাম ও মাহাত্ম্য সমুন্নত করে এবং সুদৃশ্য জান্নাতী মহলসমূহ দেখতে পায়। এরই প্রেক্ষাপটে আরবের জনৈক কবি বলেছেন, "হে প্রশান্ত আত্মা, আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে দাও, কেননা আমাদেরকে অন্ধকার রাতে সফরের দুর্গম গিরিপথ অতিক্রম করতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই সুউচ্চ গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হবে। এভাবেই আমরা বসন্ত ঋতুর সুশীতল পরিবেশ ভোগ করবো।" এই সুন্দর ও স্বচ্ছ ধ্যান-ধারণা এমন এক ধরনের নূর সৃষ্টি করে যার সাহায্যে ঐসব জিনিস সে দেখতে পায়, যেজন্য তাকে পয়দা করা হয়েছে। ঐসব জিনিসও সে দেখতে পায় যেগুলো তার মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে জান্নাত পর্যন্ত প্রয়োজন হবে। দুনিয়া যে এক পলকে শেষ হয়ে যাবে, সেটাও সে সম্যক উপলব্ধি করতে পারে। সেই অবস্থায় দুনিয়ার সকল মন্দ অবস্থা, হানাহানি, কাটাকাটি ইত্যাদি দেখে অনুতপ্ত হৃদয়ে বলে উঠে, "আফসোস! আমার ঐসব ত্রুটির জন্য আমি আল্লাহ তা'আলার কাছে ভীষণ লজ্জিত।" এরই ফলশ্রুতিতে সে নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ লাভ করে এবং সে যতোটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা পূরণ করার জন্য সচেষ্ট হয়। আল্লাহ না করুন, এমন সময় ও সুযোগ যদি কারো হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে তার পরিতাপ ও অনুশোচনার কোন সীমা-পরিসীমা থাকবে না। মানুষ তার রবের নি'আমতসমূহে ডুবে আছে। শুক্রকীট থেকে জীবনভর দিন রাত রবের নি'আমতসমূহের মধ্যে সে লালিত পালিত হয়ে থাকে। এ নি'আমতসমূহ যদি কেউ গুণতে চায় তাহলে সেগুলো সে গণনা করতে সমর্থ হবে না। এসব নি'আমতের মধ্যে রয়েছে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস যা দৈনিক চব্বিশ হাজার বার আসে যায়। এছাড়া অন্যান্য নি'আমত গণনা করার তো কোন প্রশ্নই উঠে না।

প্রকৃতপক্ষে, সে কখনো আল্লাহর অফুরন্ত নি'আমত গণনা করে শেষ করতে পারবে না। আল্লাহ যদি তার সমস্ত নি'আমতের হিসাব চান, তাহলে কেউ সে হিসাব দিতে পারবে না এবং একটি নি'আমতের হকও আদায় করতে পারবে না। এর দ্বারা এটাও উপলব্ধি করা যায় যে, আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ ও ক্ষমা ছাড়া আমাদের মুক্তির কোন পথ নেই। একজন মানুষ যতোই আমল করুক না কেন এমনকি সে আমল যদি সমস্ত জিন ও ইনসানের নেক আমলের সমানও হয়, তবুও আল্লাহ তা'আলার মাহাত্ম্য ও মহিমার তুলনায় সেটা কিছুই নয়, একেবারেই তুচ্ছ ও নগণ্য। অবশ্য যে কোন আমলই আল্লাহর তাওফীক ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়।

একজন বান্দা ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে তার হৃদয়ে যে আলো বা রৌশনি লাভ করে, সেটার সাহায্যে সে তার সকল দোষত্রুটি ও গুনাহের কাজ সুস্পষ্টভাবে দেখতে পায়। এভাবেই তার সকল মন্দ আমলকে সংশোধন করার শক্তি ও সুযোগ লাভ করে। এভাবেই বান্দা জানতে পারে যে, দয়াময় আল্লাহ তাকে তার আমলের সঠিক বিনিময় প্রদান করেছেন, একটুও কম করেননি। বান্দা আল্লাহর রহমত লাভ করে এভাবেই শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করে এবং তজ্জন্য নিজেকে ধন্য মনে করে। আর সে বিনয়ী হয় এবং মাথা আল্লাহর মহান দরবারে অবনত হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় সে আল্লাহর অফুরন্ত নি'আমত প্রত্যক্ষ করে এবং তার সমূহ গুনাহের কাজও সে দেখতে পায়। আর আল্লাহর দরবারে এই প্রার্থনা জানায়, “হে আমার রব! তোমার নিআমত অফুরন্ত, আমার গুনাহে আমি অনুতপ্ত এবং আমি তোমার কাছে তাওবা করছি। আমাকে ক্ষমা করো, তুমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আমার কোনই পুণ্য নেই। কল্যাণ ও সৌভাগ্যের আমি উপযুক্ত নই। তবে আমি তোমার রহমতের আশাবাদী ও ক্ষমাপ্রার্থী।" এ ধারণা ও বিশ্বাসের দ্বারা বান্দা দু'টি বিরাট উপকার লাভ করে। তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার নিআমত বৃদ্ধি পায় ও সে আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের প্রতি সুদৃঢ় হয়। এ পর্যায়ে বান্দা আরেকটি আলো দেখতে পায়, যার সাহায্যে তার নিজ সময়ের মূল্য বুঝতে পারে যে এটাই তার সৌভাগ্য লাভের উপায়। এইভাবে যাবতীয় গুনাহ হতে তাওবাহ করে একজন লোক যখন অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর পথে আসে, তখন সে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক ও সাবধান হয়ে যায়। অর্থাৎ সে সকল মন্দ কাজ থেকে নিজেকে সংযত রাখে এবং দিনের শেষে এই চিন্তা করে যে তার দিনটি কিভাবে অতিবাহিত হলো? একজন মানুষ এভাবেই গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।

এই অবস্থায় বান্দা তার সকল জাগতিক কর্মকাণ্ডের জন্য লজ্জা বোধ করে যে, সে আল্লাহকে ভুলে গিয়ে দুনিয়ার মোহমায়ায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। এই উপলব্ধিই নাফসে মুতমায়িন্নাহর প্রথম স্তর, যেখান থেকে একজন খাঁটি বান্দা আল্লাহর পথে যাত্রা শুরু করে।

এখানে নাফসে লাউয়ামাহর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে নাফসে লাউয়ামাহর কসম করেছেন, ইরশাদ হয়েছে, “ওয়া লা উকসিমু বিন্নাফসিল লাউয়ামাহ।” অর্থাৎ “আমি আরও শপথ করছি সেই তিরস্কারকারী মনের।” (সূরা কিয়ামাহ: আয়াত-২)

নাফসে লাউয়ামাহ কি? এ সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। একশ্রেণীর লোকের মতে নাফসে লাউয়ামাহ এক অবস্থার উপর স্থির থাকে না। আরবি 'লাউয়ামাহ' শব্দটি 'তালুম' শব্দ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, যার অর্থ হলো তারাদ্দুদ বা ইতস্তত করা। নাফসে লাউয়ামাহ আল্লাহ তা'আলার একটি বড় নিদর্শন এবং তাঁর একটি মাখলুক বা সৃষ্টি, যেটা প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন রূপ ধারণ করে। কখনো আল্লাহ তা'আলার যিকর করে, আবার কখনো অলস হয়ে যায়, কখনো আল্লাহ তা'আলার দিকে অগ্রসর হয়, আবার কখনো পেছনে সরে পড়ে। কখনো হালকা হয় আবার কখনো থেমে যায়। কখনো সৎকাজ পছন্দ করে, আবার কখনো অপছন্দ করে। কখনো সে আনন্দিত হয়, আবার কখনো নিরানন্দে ভোগে। কখনো সন্তুষ্ট হয়, আবার কখনো অসন্তুষ্ট হয়। কখনো ভালোকাজ করে, আবার কখনো মন্দ কাজ করে। মোটকথা, প্রতি মুহূর্তে নাফসে লাউয়ামাহ তার কার্যক্রম পরিবর্তন করে।

অপর এক শ্রেণীর লোকের মতে আরবি 'লাউম' শব্দ থেকে লাউয়ামাহ শব্দটি নেয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে মতবিরোধ আছে যে, নাফসে লাউয়ামাহ কোন ব্যক্তির নাফস? কারো কারো মতে নাফসে লাউয়ামাহ একজন মুমিন ব্যক্তির নাফসকে বলা হয়। আর এই নাফসের অন্যান্য গুণের মধ্যে একটি গুণ হলো, তিরস্কারের মাধ্যমে একজন মুমিন বান্দাকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা।

নাফসে লাউয়ামাহ সম্পর্কে হযরত হাসান বসরী (র)-এর অভিমত হলো, একজন মুমিন বান্দা সর্বদা নিজের নাফসকে এই মর্মে তিরস্কার করে যে, একটি মন্দ কাজ সে কেন করলো, এই কাজটি না করে সে অন্য একটি নেক কাজ করলো না কেন? কারো কারো মতে মুমিনের নাফসকে নাফসে লাউয়ামাহ বলা হয়, যে নাফস একজন মুমিনকে পাপে লিপ্ত করে, আবার এই জন্য তাকে তিরস্কার করে। অবশ্য এই তিরস্কার করাটা ঈমানের একটি লক্ষণ। কেননা বদবখত বা দুর্ভাগা ব্যক্তির নাফস গুনাহের জন্য তিরস্কার করে না বরং গুনাহ না করার জন্য তাকে তিরস্কার করে।

অন্য একশ্রেণীর জ্ঞানী লোকের মতে নাফসে লাউয়ামাহ কাফির ও মুমিন উভয়ের নাফসকেই বলা হয়। একজন মুমিন বান্দা কোন গুনাহে জড়িত হওয়ার দরুন ও আল্লাহর আনুগত্য পরিহার করার কারণে নাফস তাকে তিরস্কার করে। আর একজন বেঈমান ব্যক্তিকে এই নাফস ঈমানদার ও সৎ না হওয়ার জন্য তিরস্কার করে।

অপর একশ্রেণীর আলিমের মতে নাফসে লাউয়ামাহর এই তিরস্কার কিয়ামতের দিন কার্যকর করা হবে। সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তির নাফস তাকে তিরস্কার করবে। সে ব্যক্তি মন্দ হলে মন্দের জন্য আর সৎ হলে আরো ভালো আমল না করার জন্য তিরস্কার করবে। উপরোক্ত সবগুলো অভিমতই সঠিক। এসবের মধ্যে কোন প্রকার সংঘাত বা সন্দেহ নেই। কেননা নাফস এসব গুণে গুণান্বিত। এজন্যই এই নাফসকে নাফসে লাউয়ামাহ বলা হয়।

নাফসে লাউয়ামাহ দু'প্রকার। এক. লাউয়ামাহ মালুমাহ অর্থাৎ মূর্খ ও অত্যাচারী নাফস, যাকে আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর ফেরেশতারা ভর্ৎসনা করেন। দুই. লাউয়ামাহ গায়র মালুমাহ। এটি হলো ঐ নাফস যে সব সময় নিজ দেহের আমলের ত্রুটির জন্য তাকে তিরস্কার করে। অবশ্য সামর্থ্য অনুযায়ী সে নেককাজ করার চেষ্টা করে থাকে।

সবচেয়ে উত্তম নাফস হলো ঐ নাফস যে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের ত্রুটির জন্য ও তার অপরাধের জন্য লজ্জাবোধ করে। আল্লাহ তা'আলার সন্তোষজনক কাজের জন্য লোকেরা তাকে মন্দ কথা বললে সে সেটা নীরবে সহ্য করে। আর এসব বিষয় সম্পর্কে কোন গুরুত্ব দেয় না। নিশ্চয় এরূপ ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ লাভ করে। পক্ষান্তরে, কেউ তাকে অবহেলা করলে সে ব্যক্তির নাফস নিজের আমলের দ্বারা সন্তুষ্ট থাকে। কেউ তার দোষত্রুটি অন্বেষণ করলে তার নাফস তা সহ্য করে না। অন্য কেউ তাকে ঠাট্টা বিদ্রূপ করলে সে নির্বিকার থাকে না। এরূপ লোক আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়।

নাফসে আম্মারাহ হলো খারাপ নাফস। সে প্রত্যেক মন্দকাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে। এটাই হলো তার সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু যাকে আল্লাহ তা'আলা তাওফীক দান করেন তাকে দৃঢ়পদ রাখেন এবং সাহায্য করেন, সে নাফসে আম্মারার চক্রান্ত থেকে রক্ষা পায়। কোন মানুষ তার নাফসের কু-প্ররোচনা থেকে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য ছাড়া রক্ষা পেতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে হযরত ইউসুফ (আ)-এর পক্ষ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, "আমি নিজের নাফসকে নির্দোষ মনে করি না। নিশ্চয় মানুষের নাফস অপকর্মের দিকে অধিক উৎসাহ প্রদান করে। কিন্তু যাকে আমার রব রহম করেন।” (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৫৩)

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেছেন, "তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহ তা'আলার দয়া ও অনুগ্রহ না থাকতো তাহলে তোমাদের মধ্যে কেউ কখনো পাক ও পবিত্র হতে পারতো না।" (সূরা নূর: আয়াত-২১)

আল্লাহ তা'আলা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত বান্দা ও রাসূল সম্পর্কে বলেছেন, "আমি যদি আপনাকে দৃঢ়পদ না রাখতাম, তাহলে আপনি তাদের প্রতি কিছু না কিছু ঝুঁকে পড়তেন।" (সূরা বনী ইসরাইল: আয়াত-৭৪)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খোতবা বা ভাষণের প্রাথমিক বাক্যগুলোর অর্থ লক্ষণীয়, "আল্লাহ তা'আলার শোকর ও তারীফ। আমরা তাঁর শোকর করি, তাঁর কাছে সাহায্য চাই, তাঁর কাছে মাফ চাই এবং আমাদের মনের দৌরাত্ম্য ও কুপ্রবৃত্তি থেকে রক্ষা পাবার জন্য তাঁর আশ্রয় চাই। আর আমাদের মন্দকাজ থেকে রক্ষা পাবার জন্য তাঁর আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা'আলা যাকে হিদায়াত করেন তাকে কেউ গুমরাহ করতে পারে না, আর আল্লাহ তা'আলা যাকে গুমরাহীতে রাখেন তাকে কেউ হিদায়াত করতে পারে না।"

নাফসের মধ্যে কুপ্রবৃত্তি লুকিয়ে আছে, তাই নাফস মন্দ আমল করিয়ে দেয়। আল্লাহ তা'আলা যদি কোন বান্দাকে তার নাফসের কাছে ছেড়ে দেন, তাহলে সেই বান্দা নাফসের দৌরাত্ম্য ও মন্দ আমলের দরুন ধ্বংস হয়ে যাবে। যদি আল্লাহ তা'আলা তাকে তাওফীক দান করেন ও সাহায্য করেন, তাহলে সে রক্ষা পেতে পারে। আসুন, আমরাও মহান মা'বুদের কাছে দুআ করি- "হে আমাদের রব, আমাদেরকে নাফসের দৌরাত্ম্য থেকে ও মন্দ কাজ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।"

আল্লাহ তা'আলা নাফসে আম্মারাহ ও লাউয়ামাহ দ্বারা মানুষকে পরীক্ষা করেন। আর নাফসে মুতমায়িন্নাহ দ্বারা সম্মান বর্ধন করেন। আসলে, নাফস একটাই। তবে এর বিভিন্ন নাম রয়েছে। যেমন- আম্মারাহ, লাউয়ামাহ ও মুতমায়িন্নাহ।

প্রকৃতপক্ষে, ইতমীনান বা প্রশান্তি হলো নাফসের চরম পরিপূর্ণতা ও সাবধানতা। আল্লাহ তা'আলা নাফসে মুতমায়িন্নাহকে তাঁর সহযোগী শক্তির দ্বারা সহযোগিতা প্রদান করেন। তিনি প্রত্যেক নাফসের জন্য একজন ফেরেশতা সঙ্গী করে দিয়েছেন, যিনি সবসময় তার সঙ্গে থাকেন। তাকে সরল পথ প্রদর্শন করেন, তাকে সৎ, সত্য ও ন্যায় পথে চলতে উৎসাহিত করেন। আর নেক আমলের সুন্দর ও মনোরম আকৃতি তাকে দেখান। মন্দ লোককে তার মন্দ আমলের জন্য তিরস্কার করেন, তার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করেন, আর তার খারাপ আমলের খারাপ আকৃতি তাকে দেখান। আর নেক বান্দাকে কুরআন তিলাওয়াত, যিকর-আযকার ও নেক আমলের প্রতি উৎসাহিত করতে থাকেন। সবদিক থেকে নেকীর প্রহরা ও আল্লাহর তাওফীক তার নসীব হয়। আর এসব নেককাজ ও ভালো আমলের শোকর আদায়ের জন্য তার সাহস ও শক্তি বাড়তে থাকে। তখন সে দৃঢ়তার সাথে নাফসের মুকাবিলা করতে পারে। একজন বান্দার মূল শক্তি হলো তার ঈমান ও ইয়াকীন। সে নাফসের কুপ্রবৃত্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঈমানী শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করে। ঈমানের শাখা প্রশাখা হলো- নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ, ওয়ায-নসীহত, লোকের সঙ্গে ভালো ব্যবহার ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া আর যেসবের সঙ্গে অন্তরের সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলো হলো- ইখলাস, তাওয়াক্কুল, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাওবাহ, আত্মসমালোচনা, সবর ইত্যাদি।

এছাড়া নেক বান্দার দিলে আল্লাহ তা'আলার এবং তাঁর রাসূলের প্রতি সীমাহীন ইশক মুহাব্বত থাকতে হবে। আল্লাহ তা'আলার হুকুম-আহকাম পালনের জন্য ত্যাগ ও তিতিক্ষা, সুন্দর চরিত্র, সততা ইত্যাদি গুণাবলী একজন নেক বান্দার জন্য অপরিহার্য। একজন খাঁটি ও সত্যবাদী ব্যক্তি এই সরল পথে চলতে গিয়ে ক্লান্ত হয় না এবং সতর্কতার সাথে সে সামনে অগ্রসর হয়। কিন্তু শয়তান সততা ও নিষ্ঠাবর্জিত ব্যক্তিকে সরল পথ থেকে সরিয়ে দেয়, তাই এই ব্যক্তি উদাসীন, ভ্রান্ত ও মাতালের ন্যায় হয়ে যায়, সে কোন সৎ আমল করুক বা না করুক। বরং তার উদাসীনতা তাকে আল্লাহর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সাহায্যে নেকপথে অগ্রসর হয়, সে নাফসে মুতমায়িন্নাহ অর্জনকারীদের দলভুক্ত হয়ে যায়।

নাফসে আম্মারার সাথী হলো শয়তান, যে তার কাছে মিথ্যা অঙ্গীকার করে, মিথ্যা আশার বাণী শোনায় এবং তাকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেয় আর অসৎ কাজের দিকে প্ররোচিত করে, মন্দ কাজগুলোকে সুন্দর আকৃতিতে উপস্থাপন করে বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখায়। মিথ্যা বিষয়গুলোকে অতি সুন্দর আকৃতিতে দেখায় যাতে মানুষ বিনা দ্বিধায় সেটা গ্রহণ করে এবং সেদিকে আকৃষ্ট হয়। এছাড়া শয়তান ঐ ব্যক্তিকে ধোঁকা দিতে সচেষ্ট থাকে। সে মানুষের অন্তরে মিথ্যা আশা জাগিয়ে তোলে, ক্ষতিকর লালসায় লিপ্ত করে। একজন শয়তানরূপী মানুষও জানে কাউকে মন্দকাজে প্ররোচিত করার জন্য লোভ-লালসার কোন বিকল্প নেই। অবশেষে শয়তান তার প্রিয় ও পছন্দনীয় জিনিস খুঁজে বের করে, আর সর্বাত্মক চেষ্টার মাধ্যমে ঐগুলোকে অনুসরণ করার জন্য প্রলুব্ধ করে ও তাকে পথভ্রষ্ট করে দেয়। তারপর যখন নাফস লোভ-লালসার দরজা খুলে দেয়, তখন ঐ ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশ করে চরম হৈ চৈ ও অশান্তির সৃষ্টি করে, হত্যা ও লুটতরাজ চালায়।

এভাবে শয়তান মানুষের ঈমান, তিলাওয়াতে কুরআন এবং যিকর-আযকার ও নামাযের কার্যক্রম ধ্বংস করে দেয়, মসজিদকে ধ্বংস করে, গীর্জা ও অগ্নিকুণ্ডকে আবাদ করে। আর মদখোর এবং জুয়াড়ীদের সাথে গিয়ে মিলিত হয়। এভাবে আল্লাহর কর্তৃত্বকে বিনষ্ট করতে চায় আর মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে সরিয়ে খোদাদ্রোহী ও মূর্তিপূজারী বানিয়ে ছাড়ে। আর আনুগত্যের ইয্যত থেকে বের করে পাপের স্তূপে নিয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলার পবিত্র বাণী শ্রবণ করা থেকে অশ্লীল গান-বাজনা শোনার দিকে প্ররোচিত করে। আর আল্লাহ তা'আলার সাথে মিলিত হওয়ার আশা দূর করে শয়তানের অনুচরদের সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি করে। পরিণামে যে ব্যক্তি প্রথমে আল্লাহ তা'আলার হক আদায়ের দিকে লক্ষ্য রাখতো, এখন সমূহ গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত ছিলো সে শয়তানের খপ্পরে পড়ে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়।

আসলে, নাফসে মুতমায়িন্নাহর সাথী হলো ফেরেশতা, আর নাফসে আম্মারাহর সাথী হলো শয়তান। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "মানুষের নিকট ফেরেশতা ও শয়তান উভয়েই আগমন করে।" এভাবেই ভালো-মন্দ খেয়াল মানুষকে প্রভাবিত করে। শয়তানী খেয়াল মানুষকে মন্দকাজের দিকে, আর নেক খেয়াল মানুষকে ভালোকাজে উৎসাহ দান করে। তবে যার দিলে নেক খেয়াল আসে তাকে আল্লাহ তা'আলার শোকর আদায় করা উচিত। আর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন যে, এটা আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে এসেছে। পক্ষান্তরে, বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাওয়া উচিত। তারপর রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত উপস্থিত সকলকে তিলাওয়াত করে শুনালেন, যার অর্থ হলো, "শয়তান একদিকে তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায়, আর অন্যদিকে তোমাদেরকে লজ্জাহীনতার উৎসাহ দেয়।” (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত-২৬৮)

নাফসে মুতমায়িন্নাহ ও নাফসে আম্মারাহর মধ্যে যে সংঘর্ষ ও সংঘাত দেখা দেয় সে সম্পর্কে এখানে কিছু আলোচনা করা হলো। ফেরেশতা ও ঈমানের প্রহরীগণ নাফসে মুতমায়িন্নাহর সাহায্যে তাওহীদ, ইহসান, সবর, তাওয়াক্কুল, তাওবাহ, নেকী, তাকওয়া, আল্লাহ তা'আলার প্রতি আগ্রহ, একাগ্রতা ইত্যাদির মাধ্যমে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আর শয়তান ও তার বাহিনী নাফসে আম্মারাহর সাহায্যে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। এভাবে প্রত্যেক ভালো জিনিসের দিকে শয়তানকে লেলিয়ে দেয়া হয়। শয়তান নাফসে আম্মারাহকে তার প্রতিনিধি বানাতে চায়, যাতে নাফসে আম্মারাহ শক্তিশালী হয়ে উঠে। এজন্য শয়তান নাফসে মুতমায়িন্নাহ থেকে নেক আমল ছিনিয়ে নেয়ার জন্য সর্বদা সক্রিয় থাকে। শয়তান ও নাফসে আম্মারাহ থেকে নেক আমলকে রক্ষা করা বান্দার জন্য একটি কঠিন ও দুরূহ ব্যাপার। বান্দার আমলসমূহ যথারীতি আল্লাহ তা'আলার নিকট পৌঁছে যায়। একটি নেক আমলও যদি সঠিকভাবে আল্লাহ তা'আলার নিকট পৌঁছে যায় তাহলে তা হবে ঐ ব্যক্তির নাজাতের কারণ। কিন্তু শয়তান ও নাফসে আম্মারাহ বান্দার একটি নেক আমলও পরিশুদ্ধভাবে যাতে আল্লাহর নিকট পৌঁছতে না পারে সে বিষয়ে তৎপর ও সক্রিয় থাকে। একজন আরিফ অর্থাৎ আল্লাহ প্রেমিকের বক্তব্যের অর্থ এই যে, "আমি যদি জানতে পারি, আমার একটি নেক আমল যথারীতি আল্লাহ তা'আলার দরবারে পৌঁছে গিয়েছে তাহলে সেটা হবে আমার জন্য ঐ মুসাফিরের থেকেও বেশি আনন্দদায়ক, যে দীর্ঘ সফরের পর নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছে।”

এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা)-এর বক্তব্য হলো, যদি আমি জানতে পারি যে, আল্লাহ তা'আলা আমার পক্ষ থেকে একটি সিজদা গ্রহণ করেছেন, তাহলে সেটা হবে আমার নিকট দীর্ঘ প্রবাসের পর বাড়ি ফিরে আসা মুসাফিরের চেয়েও অধিকতর প্রিয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "আল্লাহ তো মুত্তাকীদের মানতই কবুল করে থাকেন।" (সূরা মায়িদাহ: আয়াত-২৭)

নাফসে আম্মারাহ নাফসে মুতমায়িন্নাহর সম্মুখে অবনত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নাফসে মুতমায়িন্নাহ যদি কোন ভালোকাজ করে, তখন নাফসে আম্মারাহ তার বিরোধিতা করে আর তাকে মন্দকাজের দিকে উৎসাহিত করে, যেন এতে তার নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যায়। নাফসে মুতমায়িন্নাহ ঈমান, তাওহীদ ইত্যাদি নিয়ে উপস্থিত হলে নাফসে আম্মারাহ তার পরিবর্তে সন্দেহ, নিফাক, শিরক এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ভালোবাসা, গায়রুল্লাহর প্রতি ভয়ভীতি ও আশা আকাঙ্ক্ষা উপস্থাপন করে। নাফসে মুতমায়িন্নাহ কোন বান্দাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, তখন নাফসে আম্মারাহ খারাপ ও মন্দকাজের প্রতি আল্লাহ-রাসূলের হুকুমের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চায়। নেকলোকদেরকে ভ্রান্ত প্ররোচনায় খারাপ কাজে লিপ্ত করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণ অনুসরণের ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। এভাবে জনগণের নেক ধ্যান-ধারণাকে নষ্ট করে। তাই নাফসে মুতমায়িন্নাহ ও নাফসে আম্মারাহর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। আল্লাহ তা'আলা যাঁকে সাহায্য করেন সেই রক্ষা পায়। ঐ ব্যক্তি যখন পরিশুদ্ধ আমল, আল্লাহর আনুগত্য, তাওবাহ, সত্যবাদিতা ও নাফসের কার্যক্রমের হিসাব-নিকাশ ইত্যাদি সৎকর্মে নিয়োজিত হয়, তখন নাফসে আম্মারাহ এসবের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে এবং এক মুহূর্তে তার কাজ সমাধা করতে চায়। এছাড়া নাফসে আম্মারাহ মানুষকে বিশ্বাস করাবার জন্য আল্লাহর শপথ করে বলে, আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী ছাড়া আর কিছু নই। অথচ এটা একেবারেই নিরেট ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা এর একমাত্র উদ্দেশ্য মানুষকে রাসূলের সুন্নাতের অনুসরণ থেকে বিভ্রান্ত করা। আল্লাহর কসম, এসবই হচ্ছে নাফসে আম্মারাহর প্রতারণা যাতে সুন্নাতের অনুসরণ থেকে নেককার বান্দা বিরত থাকে ও লোভ-লালসায় লিপ্ত হয়ে যায়। এরই ফলশ্রুতিতে নাফসে আম্মারাহ দুনিয়াতে ও বরযখে এবং আখিরাতে সংকীর্ণ স্থানে বন্দী অবস্থায় থাকবে।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, নাফসে আম্মারাহ নেক বান্দাদের সুস্থ মন ও মগজকে পঙ্গু করে দেয়। আর যেসব কাজ উত্তম ও সম্মানজনক এবং উচ্চ মর্যদাসম্পন্ন সেগুলোকে কুৎসিত আকৃতিতে উপস্থাপন করে। অবুঝ ও দুগ্ধপোষ্য শিশুরাই সঠিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। তারা ভালোমন্দ বুঝতে পারে না। তারা যখন বালিগ হয়, তখন ভালোমন্দের পার্থক্য করতে পারে, আর ক্ষতিকর বিষয়সমূহ থেকে দূরে থেকে ভালো বিষয়গুলো গ্রহণ করে, ভালো কাজগুলোকে ত্যাগ করতে পছন্দ করে না। নাফসে আম্মারাহর প্রকৃত স্বরূপ হলো, খাঁটি তাওহীদকে সে খারাপ ও অপছন্দনীয় আকৃতিতে দেখাতে পছন্দ করে, এর দ্বারা মহৎ ব্যক্তিদের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। এভাবে নেক বান্দাদেরকে তাঁদের উচ্চস্থান থেকে নিম্নস্তরে নামিয়ে দেয়। আর হীনতা, দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের আবর্তে ঠেলে দেয়। এরূপ অবস্থায় বিভ্রান্তিতে নিপতিত নেক বান্দাদের কোন কার্যকর ক্ষমতা থাকে না। আল্লাহ তা'আলা অনুমতি ছাড়া কোন সুপারিশ করার ক্ষমতাও তাদের থাকে না। এই মায়াবী নাফসে আম্মারাহ এ বিষয়গুলোকে মহৎ ব্যক্তিবর্গের কাছে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সহিত প্রদর্শন করে, যে কারণে তাঁরা তাঁদের ন্যায্য প্রাপ্য ও সম্মান থেকে বঞ্চিত হন। এভাবে তাঁদেরকে মিসকীন ও ফকীর বানিয়ে দেয়া হয়, এটা নেককার বান্দাদের সাথে ঘৃণ্য প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। এভাবে চাকচিক্যময় কথার ফাঁদে পড়ে মানুষ খাঁটি তাওহীদের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে থাকে। পবিত্র কুরআন শরীফে তাদের কথা আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেছেন। তারা বলে, "সেকি তার সব মা'বুদকে ত্যাগ করে শুধু একজন মাত্র মা'বুদ সাব্যস্ত করেছে। এটা তো বড়ই আশ্চর্যজনক ব্যাপার।” (সূরা সোয়াদ: আয়াত-৫)

নাফসে আম্মারাহর অনুসারীরা এমনিভাবে খাঁটি ইত্তেবায়ে রাসূলকে বিকৃত করে উপস্থাপন করে। নাফসে আম্মারাহর যারা শিকার সেসব মুশরিক ও বাতিলপন্থীরা যারা খাঁটি ও ঈমানদার ও সৎ লোক তাঁদের সম্পর্কে বলে, তারা আলিমদের মর্যাদাকে হ্রাস করে, ইমামগণের মূল্যবান মতামতকে উপেক্ষা করে, তাঁরা তো কুরআন হাদীসের আলোকে মতামত সাব্যস্ত করে থাকবেন। তাঁরা তো এদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন। তাঁদের সাথে বেআদবী করতে কি এদের লজ্জা হয় না? ছোট মুখে বড় কথা কি শোভা পায়? মহৎ ব্যক্তিবর্গের সম্মুখে বড় বড় কথা বলে। আলিমদের শানে কু-ধারণা পোষণ করে। তারা তাদের ভ্রান্ত ভণ্ড নেতাদের বক্তব্যকে সঠিক ও অনুসরণীয় বলে মনে করে, পক্ষান্তরে, পূত-পবিত্র রাসূলের হাদীসগুলোকে আপত্তিকর মনে করে এবং এসব হাদীসকে তাদের মনগড়া বক্তব্য অনুযায়ী অর্থ করার চেষ্টা করে, কোন হাদীস যদি তাদের মতের সাথে খাপ খায়, তাহলে তা গ্রহণ করে, অন্যথায় তা বর্জন করে। কিংবা অলীক ও অবান্তর অর্থ গ্রহণ করে যে এগুলো আমাদের উপলব্ধি করার আওতার বাইরে। নাফসে আম্মারাহ শপথ করে জনসাধারণকে বিশ্বাস করাতে চায় যে, আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, মানুষের কল্যাণ সাধন ও সকলের সাথে আপোষ করা। অবশ্য আল্লাহ তা'আলা এদের অন্তরের ব্যাধি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। নাফসে আম্মারাহ মানুষের পরিশুদ্ধ ইবাদতকে ঘৃণার উদ্রেককারী রঙে উপস্থাপন করে। কেউ যদি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তা'আলার কোন ইবাদত বন্দেগী করে, তাহলে সাধারণ মানুষ সেটাকে বেশি পছন্দ করে না এবং তাকে এড়িয়ে চলে। পক্ষান্তরে, কেউ যদি লোক দেখানো ধর্ম-কর্ম করে এবং নানা মন্দ ফিকিরের আশ্রয় নেয়, তাহলে তার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হয় এবং তাকে পছন্দ করে। আসলে, আমাদের উচিত ইখলাসের সাথে আল্লাহর ইবাদত করা, লোক দেখানোর জন্য নয়। নাফসে আম্মারাহ এভাবেই ধোঁকা দিয়ে থাকে।

যাঁরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা, আর যারা আল্লাহর অবাধ্য, নাফসে আম্মারাহ তাদের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি করে। এ সংঘাত বা জিহাদকে নাফসে আম্মারাহ নেককার লোকদেরকে এ বলে বুঝাতে চায় যে, এতে তারা অন্যের বিরূপ সমালোচনার পাত্র হবে। অর্থাৎ তারা যেন এরূপ কোন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকে। এছাড়া নাফসে আম্মারাহ একজন নেককার বান্দাকে এ ধারণাও দেয় যে, নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করলে দুঃখ-কষ্ট ও বিরূপ সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়।

নাফসে আম্মারাহ জিহাদ সম্পর্কে আরো ধোঁকা দেয় যে, এতে করে মানুষ মৃত্যুবরণ করে, যার ফলে তাদের সন্তান-সন্ততি ইয়াতীম ও অসহায় হয়ে পড়ে। তাদের স্ত্রীগণও দুঃখকষ্টে পতিত হয়, তাদের ধনসম্পদও বিনষ্ট হয়ে যায়।

নাফসে আম্মারাহ নেককার বান্দাদেরকে যাকাত ও সাদকাহ সম্পর্কে একইভাবে ধোঁকা দেয়, যাকাত ও সাদকাহ আদায় করলে তারা কপর্দকহীন ও গরীব হয়ে পড়বে এবং অন্যের সাহায্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে।

নাফসে আম্মারাহ আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কেও নেককার বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করে এই বলে যে, সেসবকে মান্য করা হলে আল্লাহর সঙ্গে সাদৃশ্য ও সমতুল্য অনিবার্য হয়ে পড়বে, যদিও এরূপ ধারণা বাতিল ও ভ্রান্ত। নাফসে আম্মারাহ এভাবে আল্লাহ তা'আলার পরিপূর্ণ গুণাবলী ও ধর্মদ্রোহিতাকে সুন্দর, মনোরম ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে।

আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হলো যে, যেসব গুণ আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন, নাফসে আম্মারাহ সেসব গুণ, স্বভাব ও কার্যাবলীকে এমনভাবে পেশ করে যেন তা আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় নয়। আর সব কিছুতেই তালগোল লাগিয়ে দেয়। ইবলিসের এসব চক্রান্ত থেকে একজন খাঁটি বান্দাই কেবল রক্ষা পেতে পারেন। কেননা যে কোন কর্মকাণ্ড মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে, আর তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তা প্রকাশ পায়। এসব কাজ এভাবেই নাফসে আম্মারাহ সম্পন্ন করে। এমন সব কাজ দৃশ্যত এক রকম মনে হলেও অভ্যন্তরীণভাবে অন্যরকম। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, মুদারাত অর্থাৎ সৎপ্রবণতাকে উৎসাহ দান করা, আর 'মুদাহানাত' অর্থাৎ অসৎপ্রবণতাকে উৎসাহ প্রদান করা। প্রথমটি নাফসে মুতমায়িন্নাহ কার্যকর করে আর দ্বিতীয়টি নাফসে আম্মারাহ কার্যকর করে। নাফসে মুতমায়িন্নাহর কাজ হলো- ঈমানের দৃঢ়তা, আত্মসম্মানবোধ, বিনয়ী হওয়া, দীনের জন্য প্রভাব প্রতিপত্তি খাটানো, দীনের জন্য আত্মসচেতনতা, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্রোধের সঞ্চার ও নাফসে আম্মারাহকে দমনের জন্য সচেষ্ট হওয়া, দীনী কাজে সহায়তা করা, দানশীল হওয়া, আবরুর হিফাযত করা, দূরদর্শিতা অবলম্বন করা, মিতব্যয়ী হওয়া, সতর্কতা ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া, সুধারণা পোষণ করা, সৎ উপদেশ প্রদান করা, সবর করা, ক্ষমা প্রদর্শন করা, অন্তরকে নিষ্কলুষ রাখা, আল্লাহর শোকর করা ও তাঁর উপর ভরসা রাখা, নেক আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা, চিত্তের পরিতৃপ্তি লাভ করা, বিনম্র অন্তরের অধিকারী হওয়া।

অপরপক্ষে, নাফসে আম্মারাহর কর্মকাণ্ড হলো মুনাফিকীর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করা, অহঙ্কারী হওয়া, অত্যাচার করা, ব্যক্তি স্বার্থে লিপ্ত হওয়া, অপচয় করা, অহমিকা পোষণ করা, ভীরুতা অবলম্বন করা, কার্পণ্য করা, অমূলক সন্দেহ পোষণ করা, পরনিন্দা-পরচর্চা করা, উৎকোচ গ্রহণ করা, মায়া-মমতাশূন্য হৃদয়ের অধিকারী হওয়া, ক্ষমাহীনতা, অলসতা, মূর্খতা, ধোঁকাবাজি, আল্লাহর নিআমতের শোকর না করা, প্রবৃত্তির দাসত্ব করা, অধৈর্য হওয়া, অন্যের প্রতি ঈর্ষা ও হিংসা পোষণ করা, অবৈধভাবে নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা করা। এসবই হলো শয়তানী বৈশিষ্ট্য।

এ প্রসঙ্গে কয়েকটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা হলো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এক ধরনের আত্মসম্মানবোধ আল্লাহ তা'আলার নিকট পছন্দনীয়, আর এক ধরনের আত্মসম্মানবোধ অপছন্দনীয়। ব্যভিচারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া একটি প্রশংসনীয় কাজ, কারণ ব্যভিচার হলো গর্হিত, অপছন্দনীয় ও ঘৃণ্য কাজ। এক ধরনের অহঙ্কারী চাল-চলন আল্লাহ তা'আলার নিকট পছন্দনীয়। আর অন্য এক ধরনের অহঙ্কারী চাল-চলন আল্লাহ তা'আলার নিকট অপছন্দনীয়। যুদ্ধের ময়দানে অহঙ্কারী চাল-চলন আল্লাহ তা'আলার নিকট পছন্দনীয়। অন্য সময় সেটা অপছন্দনীয়। অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, শুধু দুই অবস্থায় ঈর্ষা করা যায়। আল্লাহ তা'আলা কাউকে ধনদৌলত দিয়েছেন, আর তিনি দিনরাত তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে থাকেন। আর কাউকে আল্লাহ তা'আলা দীনের জ্ঞান দান করেছেন, আর তিনি এর দ্বারা ধর্মীয় বিষয় ফয়সালা করে থাকেন, আর অন্যদেরকে শিক্ষা দেন। অপর একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ তা'আলা দয়ালু, তিনি নম্রতাকে পছন্দ করেন এবং নম্রতার জন্য এতো বেশি দান করেন, যতোটা কঠোরতার জন্য করেন না। তিনি আরো ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি নম্রতার অংশ লাভ করেছে, সে কল্যাণের অংশ পেয়েছে। তাই জানা গেলো যে, নম্রতা একটি উত্তম গুণ, আর অলসতা ও দুর্বলতা হলো একটি মন্দ গুণ। একজন অলস ব্যক্তি সম্ভাব্য উপকারী হওয়া সত্ত্বেও উপকার করতে বিলম্ব করে। আর একজন নম্র স্বভাবের লোক যে কোন সুযোগ সুবিধা অর্জনে নম্রতা অবলম্বন করে। এমনিভাবে মুদারাত বা কাউকে খাতির করা একটি ভালো গুণ এবং মুদাহানাত বা অন্যায়ের সাথে আপোষ করা একটি মন্দ গুণ। উভয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো, মুদারাতকারী নিজের হক অর্জনের জন্য অথবা কাউকে সরলপথে আনার জন্য স্নেহ-ভালোবাসার মাধ্যমে অগ্রসর হয়। আর একজন মুদাহানাতকারী কাউকে বাতিলপন্থী বানানোর জন্য অথবা তাকে নিজ ইচ্ছার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য চাটুকারিতা অবলম্বন করে। একজন ঈমানদার ব্যক্তি অন্যকে খাতির ও সমাদর করেন, আর একজন মুনাফিক ব্যক্তি চাটুকারিতা অবলম্বন করে। এর উদাহরণ হলো; একজন লোক ফোঁড়ার দরুন ব্যথায় ছটফট করছে। তার চিকিৎসার জন্য জনৈক কোমল হৃদয়ের অধিকারী চিকিৎসক আসেন, তিনি তাকে দেখে শুনে ফোঁড়াকে নরম করে পাকিয়ে এর ভেতরের দূষিত রক্ত পুঁজ বের করে দিয়ে আবশ্যকীয় ঔষধের ব্যবস্থা করে দেন। লোকটি ঐ রোগীকে বলে থাকে, তোমার কোন ভয় নেই, চিন্তা করো না, পট্টি বেঁধে নাও, সব ঠিক হয়ে যাবে। এরপর সে এ রোগীর ব্যাপারে কোন খোঁজ-খবর রাখে না। ফলে ফোঁড়ার মধ্যে পুঁজ জমে যায় এবং প্রত্যহ দূষিত বস্তু বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাতে একটি জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়। ঠিক এ ধরনের উপমা নাফসে মুতমায়িন্নাহ ও নাফসে আম্মারাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যখন একটি ছোলার সমান জখমের এই অবস্থা, তখন ঐ রোগীর কি অবস্থা হবে যা নাফসে আম্মারাহ কর্তৃক সৃষ্ট, যা যাবতীয় লোভ- লালসার খনি, যাবতীয় মন্দ বিষয়ের মূল কারণ এবং তার সাথে শয়তানও চরম প্রতারণা ও অঙ্গীকার করে, তাকে আশান্বিত করে থাকে। তাকে সব ধরনের তন্ত্র- মন্ত্র শেখাতে থাকে, আর ভালোকে মন্দ এবং মন্দকে ভালো দেখতে থাকে। সত্যি বলতে কি, এটি হলো নাফসে আম্মারাহর সবচেয়ে বড় ধরনের একটি চক্রান্ত। অনেকেই অতি সহজে এ চক্রান্তের শিকার হয়ে যায়। অবিশ্বাসীরা রাসূলগণের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপন করেছিলো যে, তাঁদের উপর জিন ভূত আসর করেছে। অথচ তাঁরা এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। কিন্তু অভিযোগকারীরা ঘাড় নিচু করে উঁকি মেরে দেখেনি যে, তারা নিজেরা এ মিথ্যাচারে পতিত রয়েছে। আর রাসূলগণের প্রতি তারা এ অভিযোগও উত্থাপন করেছিলো যে, তাঁরা নিরাপত্তা ব্যাহত করে বেড়ান। তাঁরা উন্মাদ, তাঁদের তেমন বুদ্ধিশুদ্ধি নেই। প্রকৃতপক্ষে, অভিযোগকারীরাই উপরোক্ত মন্দ কাজগুলোতে লিপ্ত ছিলো।

আম্বিয়ায়ে কেরাম ও উলামায়ে ইযাম নাফসে আম্মারাহর চক্রান্ত থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় চাওয়ার জন্য মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, নাফসে আম্মারাহ ও শয়তান সকল অন্যায় কাজের মূল হোতা এবং এরা একযোগে কাজ করে থাকে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "যখন কুরআন পাঠ শুরু করবে তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চেয়ে নেবে।' (সূরা নাহল: আয়াত-৯৮)

"শয়তান যদি তোমাকে কখনো উসকানি দেয়, তবে আল্লাহর নিকট পানাহ চাও, তিনি সব শুনেন, সব জানেন।” (সূরা আরাফ: আয়াত-২০০)

"বলুন, হে রব! আমি শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই। বলুন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি, আমার নিকট ওদের উপস্থিতি থেকে।” (সূরা মুমিনুন: আয়াত ৯৭-৯৮)

"বলুন, আমি আশ্রয় চাই সকাল বেলার স্রষ্টার নিকট সেসব প্রত্যেক জিনিসের অনিষ্ট থেকে যা তিনি সৃষ্টি করেছেন। আর রাতের অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং গিরায় ফুঁকদানকারী (বা ফুঁকদানকারিণী) এর অনিষ্ট থেকে, হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।” (সূরা ফালাক)

"বলুন, আমি পানাহ চাই মানুষের রব, মানুষের প্রভু, মানুষের প্রকৃত মা'বুদের নিকট, বারবার ফিরে আসা ওয়াসওয়াসা উদ্রেককারীর অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের অন্তরে কু-প্রবৃত্তির উদ্রেক করে সে জিনের মধ্য থেকে হোক, কি মানুষের মধ্য থেকে।” (সূরা নাস)

নাফসে আম্মারাহ ও তার সাথী শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একজন বান্দাকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া অপরিহার্য। শয়তান হলো নাফসে আম্মারাহর এক নিকৃষ্ট সাথী। আল্লাহ তা'আলা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আর মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমার সর্বব্যাপী ও কামিল রাবুবিয়াত বা প্রভুত্বের কাছে শয়তান ও নাফসে আম্মারার চক্রান্ত, প্রতারণা এবং ফাসাদ থেকে তোমরা আশ্রয় চাও। এই দু'টি দুশমনের মধ্যবর্তী স্থান হলো দিল বা অন্তর। এ দু'টির প্ররোচনা অনবরত মানুষের অন্তরের দরজায় আঘাত করে এবং সব সময় আসা যাওয়া করে। এই ভয়ঙ্কর প্ররোচনার মূল উপাদান হলো লোভ-লালসা, হিংসা, যুলুম, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ, আর এসব নাফসে আম্মারাহর মাধ্যমে ঘটে থাকে এবং মানুষের অন্তরকে বিভ্রান্ত করে।

তারপর ধূর্ত শয়তান একজন ক্ষতিকর চিকিৎসকের রূপ ধরে রুগ্ন ব্যক্তির কাছে আসে, অর্থাৎ তার রোগের চিকিৎসা করার বাহানায় তাকে বিপথগামী করে এবং তার ফন্দিফিকিরের মারফত তার মনে এরূপ বিশ্বাস জন্মায় যে, এটাই হলো তার রোগমুক্তির অমোঘ পন্থা। অর্থাৎ মানুষ এভাবে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে। এভাবে অন্তরের দুর্বলতাজনিত রোগের কারণে নাফসে আম্মারাহর শক্তির সাথে শয়তানের শক্তি মিলিত হয়ে একযোগে প্রতারণা চালিয়ে যায়। একজন পথভ্রষ্ট ব্যক্তি এভাবেই শয়তান ও নাফসে আম্মারাহর দ্বারা প্রভাবান্বিত ও প্রতারিত হয়। এরই ফলশ্রুতিতে লোভ-লালসা তাকে মন্দকাজে উৎসাহিত করে। শয়তান ও নাফসে আম্মারাহর প্ররোচনার ফলে একজন বিপথগামী ব্যক্তি সাময়িক আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করে। তার খারাপ কাজ যখন ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন ঈমান ও আমল সে রক্ষা করতে পারে না। অবশ্য আল্লাহ তা'আলা যাকে তাওফীক দান করেন, সাহায্য করেন ও রহমতের দ্বারা অনুগৃহীত করেন এবং তার হিফাযত করেন, তার অন্তরচক্ষু খুলে দেন। তখন সে ব্যক্তি নাফসে আম্মারাহ ও শয়তানের চক্রান্তের পরিণতি উপলব্ধি করতে পারে। এভাবে একজন খাঁটি ঈমানদার ব্যক্তি দুনিয়া ও দুনিয়ার মোহে আকৃষ্ট লোকদের থেকে যতোশীঘ্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর কারণ এই যে, একজন লোক সমুদ্রের পানিতে অঙ্গুলিতে ডুবিয়ে তুললে যে পানিটুকু তার অঙ্গুলিতে লেগে থাকে, চিরস্থায়ী আখিরাতের জীবনের তুলনায় দুনিয়ার জীবন ঠিক তেমনি সামান্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00