📘 রূহের রহস্য > 📄 নাফস ও রূহ কি এক, না ভিন্ন

📄 নাফস ও রূহ কি এক, না ভিন্ন


অধিকাংশ জ্ঞানী লোকের মতে নাফস ও রূহ একই। কারো কারো মতে এ দুটো আলাদা ও পৃথক। নাফস শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে।

এক. জাওহারীর মতে, নাফসের অর্থ হলো রূহ। যেমন— আরবিতে বলা হয়, ‘খারাজাৎ নাফসুহু’ অর্থাৎ তার রূহ বের হয়ে গেছে।

দুই. রক্তকেও নাফস বলা হয়। যেমন— আরবিতে বলা হয়, ‘সায়ালাৎ নাফসুহু’ অর্থাৎ তার রক্ত বয়ে গেছে। হাদীস শরীফে আছে, “মালা নাফসুন লাহু সায়েলাতুন লা ইউনজ্বিসুল মা-আ ইযা মাতা ফীহি।” অর্থাৎ “যার মধ্যে প্রবাহমান রক্ত নেই তা যদি পানিতে মারা যায়, তাহলে পানি নাপাক হবে না।”

তিন. জিসম বা দেহ। জনৈক আরবদেশীয় কবি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আমাকে বলা হয়েছে, বনী তামীম নিজের পুত্রদেরকে মুনযেরের দেহের রক্তে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে।”

চার. বদ নযর অর্থাৎ নাফসুল আইন। আরবিতে বলা হয় “আসাবাৎ ফুলানান আইন” অর্থাৎ অমুক ব্যক্তির বদ নযর লেগেছে। কিন্তু এখানে নাফসের অর্থ হবে রূহ। কেননা দৃষ্টির মাধ্যমে রূহ নিজের তাছীর বা প্রতিক্রিয়া কার্যকর করে থাকে। এই জন্য বলা হয়ে থাকে অমুকের নযর লেগেছে, যার অর্থ হলো— বদ রূহের নযর পড়েছে।

পাঁচ. নাফসের অর্থ কোনো মানুষ বা ব্যক্তিকে বুঝায়। পবিত্র কুরআনে ব্যক্তির অর্থে ‘নাফস’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন— “স্মরণ করো সেদিনকে যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি আত্মসমর্থনে যুক্তি উপস্থিত করতে আসবে এবং প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের ফল পুরোপুরি দেয়া হবে। আর কারো প্রতি এক বিন্দু পরিমাণ যুলুম করা হবে না।” (সূরা আন-নাহল: আয়াত-১১১)

“প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়বদ্ধ হবে।” (সূরা মুদ্দাসসির: আয়াত-৩৮)

নাফস শব্দটি রূহের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “হে প্রশান্ত আত্মা!” (সূরা ফজর: আয়াত-২৭)

“এবং আত্মাকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছিল।” (সূরা নাযিয়াত: আয়াত-৪০)

“নাফস তো মন্দ কাজেরই প্ররোচনা দিয়ে থাকে।” (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৫৩)

রূহের প্রয়োগ শুধু দেহের জন্য হয় না। আবার রূহ ও দেহের উভয়ের জন্যও হয় না। পবিত্র কুরআনে রূহের একাধিক অর্থের উল্লেখ রয়েছে।

১. রূহ শব্দের অর্থ হুকুম বা নির্দেশ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, “এবং এমনিভাবেই আমি আপনার নিকট আমার নির্দেশে একটি রূহ প্রেরণ করেছি।” (সূরা শূরা: আয়াত-৫২)

“তিনি তার বান্দাদের মধ্য থেকে যার প্রতি ইচ্ছা নিজের নির্দেশে ওহী প্রেরণ করেন, যেন সে কিয়ামতের দিন সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে।” (সূরা মু'মিন: আয়াত-১৫)

২. রূহ শব্দের অর্থ ওহী। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, “তিনি ফেরেশতাদেরকে ওহী সহকারে তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি তাঁর ইচ্ছা প্রেরণ করেন, এই মর্মে সতর্ক করার জন্য যে, আমি ব্যতীত অন্য কেহ উপাস্য নেই। সুতরাং আমাকে ভয় করো।” (সূরা নাহল: আয়াত-২)

ওহীকে রূহ বলা হয় কেন? ওহীকে এই জন্য রূহ বলা হয়, এর দ্বারা উপকারী জীবন লাভ করা যায়। ওহী ব্যতিরেকে মানুষ উপকৃত হতে পারে না। পরিণতির দিক দিয়ে মানুষের চেয়ে পশুর জীবন নিরাপদ।

রূহকে রূহ বলার কারণ কি? রূহকে এই জন্য রূহ বলা হয় যে, এর উপর জীবন নির্ভর করে। আরবি ভাষায় বাতাসকে ‘রীহ’ বলা হয়। কারণ এর দ্বারা জীবন রক্ষা পায়।

রূহ শব্দের বহুবচন হলো আরওয়াহ। যেমন একটি আরবি কবিতায় উল্লেখ আছে, “ইযা হাব্বাতিল আরওয়াহু মিন নাহবে আরদিকুম, ওয়াজাদতু লিমাসরিহা আলা কাবাদি বারাদ।” অর্থাৎ “যখন তোমাদের যমীনের দিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হয়, তখন এর দ্বারা আমি নিজের কলিজায় শান্তি অনুভব করি।” তাই আরবি ভাষায় রূহকে রূহ, রায়হান ও ইসতিরাহাত বলা হয়।

নাফসকে রূহ বলার কারণ হলো, এর দ্বারা জীবন রক্ষিত ও অর্জিত হয়। ‘নাফস’ শব্দটি ‘নাফিস’ শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এই শব্দের অর্থ হলো, “নাফাসাত ও শরাফত” অর্থাৎ পবিত্রতা ও মর্যাদা। নাফসকে নাফস বলার আরেকটি কারণ হলো, আরবি ‘তানাফফুস’ শব্দের অর্থ শ্বাসগ্রহণ করা ও শ্বাস বের হওয়া। তাই ‘তানাফফুস’ শব্দ থেকে এটি উৎপত্তি হয়েছে। এছাড়া দেহে ঘন ঘন শ্বাসপ্রশ্বাসে আসা-যাওয়া করার কারণে একে নাফস বলা হয়। এর থেকেই ‘নাফাসুন’ (শ্বাস বিরতি) শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। নিদ্রার সময় মানুষের রূহ সাময়িকভাবে বের হয়ে যায়, জাগ্রত অবস্থায় আবার ফিরে আসে, মৃত্যুর সময় একেবারেই বের হয়ে যায়, কবরে সওয়ালের সময় আবার ফিরে আসে, সওয়াল-জবাবের পর আবার বের হয়ে যায়। হাশরের দিন আবার রূহ দেহে ফিরে আসবে।

নাফস ও রূহের মধ্যে পার্থক্য কী? এদের মধ্যে পার্থক্য হলো গুণগত, সত্তাগত নয়।

রক্তকে নাফস বলার কারণ কী? রক্তকে এই জন্য নাফস বলা হয়, অধিক পরিমাণ রক্ত দেহ থেকে বের হয়ে গেলে মৃত্যু ঘটে। এই অবস্থায় নাফসের দেহ থেকে বের হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং নাফসের ন্যায় জীবনও রক্ত নির্ভর। যেমন বলা হয়— “তাসীলু আলা হাদ্দিযাবাতি নুফুসানা ওয়া লাইসাৎ আলা গায়রি যাবাতি তাসীলু।” অর্থাৎ “তরবারীর ধারের উপর আমাদের রক্ত প্রবাহিত হয়। আর তা না হলে রক্ত প্রবাহিত হয় না।” বলা হয়ে থাকে— “ফাদা নাফসুহু, খারাজাত নাফসুহু, ফারাকাত নাফসুহু।” আরবি ‘ফয়েয’ শব্দের দ্বারা কোনো কিছু প্রবাহিত হওয়াকে বুঝায়। আর ইফাদাহ বলতে দ্রুত ও অধিক পরিমাণে রক্ত প্রবাহিত হওয়াকে বুঝায়। ইফাদাহ বলতে ইচ্ছাধীন বুঝায় আর ফয়েয শব্দের দ্বারা বাধ্যবাধকতা বুঝায়।

আল্লাহ তা'আলার হুকুমে মানুষের মৃত্যুর সময় রূহ বের হয়ে যায়। মুহাদ্দিসীন, ফুকাহা ও সুফীদের এ শ্রেণীর অভিমত হলো— রূহ ও নাফসের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

রূহ ও নাফস সম্পর্কে মুকাতিল ইবনে সুলাইমান (র)-এর অভিমত হলো এই যে, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন রূহ ও নাফসের। নিদ্রার সময় মানুষের বুদ্ধি ও জ্ঞানসম্পন্ন নাফস বের হয়ে যায়। তবে দেহের সঙ্গে নাফসের যোগাযোগ থেকে যায়। একটি লম্বা আলোকরশ্মির মতো কোনো কোনো সময় নিদ্রিত ব্যক্তি তার নাফসের মাধ্যমে স্বপ্ন দেখে থাকে। তবে জীবনী শক্তি ও রূহ তার দেহে বিদ্যমান থাকে যার সাহায্যে নিদ্রিত ব্যক্তি পার্শ্ব পরিবর্তন করে ও শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। লোকটি জাগ্রত হয়ে গেলে চোখের পলকের চেয়েও অধিক দ্রুতগতিতে তার নাফস দেহে ফিরে আসে। আর যখন আল্লাহ তা'আলা কাউকে নিদ্রার মধ্যে মৃত্যু দান করতে চান, তখন তার বের হয়ে যাওয়া নাফসকে আটকে দেন। উল্লেখ্য যে, নিদ্রিত অবস্থায় নাফস বের হয়ে উপরের দিকে যায়, আর স্বপ্ন দেখার সময় ফিরে আসে। এভাবে নিদ্রাভঙ্গের পর তার স্বপ্নের সব কথা মনে পড়ে। আর সমস্ত স্বপ্ন বৃত্তান্ত নিদ্রিত মানুষের রূহকে জানিয়ে দেয়া হয়।

রূহ ও নাফস সম্পর্কে ইবনে মান্দা (র)-এর অভিমত হলো— রূহ ও নাফস কি, এ বিষয়ে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন, নাফস হলো মাটি ও আগুনে মিশ্রিত, রূহ হলো নূর ও রূহানিয়াতের দ্বারা ঘটিত। আরেকটি অভিমত এই যে, রূহ হলো ঐশী আর নাফস হলো পার্থিব সত্তা। নাফসের দ্বারা মানুষের ভালো-মন্দের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। হাদীসবেত্তাগণ বলেন যে, রূহ ও নাফসের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নাফসের জীবন নির্ভর করে রূহের উপর আর নাফস হলো মানুষের একটি সুরত বা আকৃতি। এটা আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-বেদনা, লোভ-লালসার সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের জন্য নাফসের চেয়ে বড় শত্রু আর কিছু নেই। নাফস শুধু দুনিয়ার মোহমায়ায় আকৃষ্ট। অপরপক্ষে, রূহ মানুষকে আখিরাতের দিকে উদ্বুদ্ধ করে ও আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেয়। আর শয়তানকে নাফস ও লালসার অধীন করে দেয়া হয়েছে। ফেরেশতাদের রূহ ও জ্ঞানের সাথে মানুষের রূহের সম্পর্ক আছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর খাস বান্দাদের ইলহামের মাধ্যমে কোনো কোনো সময় সাহায্য করে থাকেন।

রূহ সম্পর্কে আরো কিছু অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলো। কারো কারো মতে রূহ হলো আল্লাহ তা'আলার মাখলূক বা সৃষ্টি যার ইলম গোপন রাখা হয়েছে। কেউ বলেন, রূহ আল্লাহ তা'আলার দেয়া এক প্রকার নূর ও জীবনী শক্তি। তবে এ বিষয়ে মতভেদ আছে, রূহ কি দেহের ও নাফসের মৃত্যুর সময় মৃত্যুবরণ করে, নাকি করে না। এক শ্রেণীর চিন্তাবিদদের মতে রূহেরও মানুষের ন্যায় হাত, পা, চোখ, কান, নাক ও জিহ্বা ইত্যাদি আছে। অন্য এক শ্রেণীর চিন্তাবিদদের মতে একজন মু'মিনের রূহ হলো তিনটি। আর কাফির ও মুনাফিকের রূহ হলো একটি। অনেকের মতে আম্বিয়ায়ে কেরাম ও সিদ্দীকগণের পাঁচটি করে রূহ আছে। আরেক শ্রেণীর লোকের মতে রূহ একটি ঐশী শক্তি, যা ফেরেশতার জগত বা আলমে মালাকূতে সৃষ্ট। একটি রূহ যখন সকল আবিলতা থেকে মুক্ত হয়ে যায়, তখন সে আলমে মালাকূত বা ফেরেশতার জগতে ফিরে যায়।

গ্রন্থকারের মতে যেই রূহকে কবয করা হয়, সেটাই আসল রূহ। সেটাকে নাফসও বলা হয়। আর যে রূহের দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর খাস বান্দাদেরকে সাহায্য করেন, সেটা অন্য রূহ, ইনসানী রূহ নয়। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, “এরা হলো ঐসব লোক যাদের দিলে আল্লাহ ঈমান দৃঢ়মূল করে দিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহের দ্বারা তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন।” (সূরা মুজাদালাহ: আয়াত-২২)

এটাও ঐ ধরনের রূহ যার দ্বারা হযরত ঈসা (আ)-এর রূহকে সাহায্য করা হয়েছিল। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “সে সময়ের কথা চিন্তা করো, যখন আল্লাহ বললেন, হে মারইয়াম পুত্র ঈসা, আমার সে নি'আমতের কথা স্মরণ করো, যা আমি তোমাকে ও তোমাকে দান করেছিলাম। আমি পবিত্র রূহ দিয়ে তোমাকে সাহায্য করেছি।” (সূরা মায়িদাহ: আয়াত-১১০)

ঐ রূহ হলো অন্য রূহ, যা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অর্পণ করেন। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও কোনো কোনো সময় আরওয়াহ বলা হয়, যেমন— দর্শনের রূহ, ঘ্রাণ গ্রহণের রূহ, শ্রবণের রূহ ইত্যাদি। মূলতঃ এই রূহ হলো দেহে রক্ষিত শক্তি ও সামর্থ্য যা দেহের মৃত্যুর সাথে শেষ হয়ে যায়। এসব আলোচনা থেকে জানা গেল, এটি বিশেষ অর্থেও রূহ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মারেফাত, মুহাব্বত ও তাঁকে পাওয়ার যে আগ্রহ এসবই রূহের মাধ্যমে সম্ভব। রূহ এবং দেহের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। যখন আসল রূহ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন রূহ এ দেহেরই একটি অংশ হিসেবে গণ্য হয়। রূহ হলো কলুষমুক্ত, রূহের দ্বারা তরীকা অনুসরণকারী ও অনুগত বান্দাগণকে সাহায্য করা হয়। তাই বলা হয়, অমুক ব্যক্তির মধ্যে রূহ আছে। আর অমুক ব্যক্তির মধ্যে রূহ নেই। অর্থাৎ লোকটি বুদ্ধিহীন ও একটি বিকল বাদ্যযন্ত্রের ন্যায়।

কাজেই ইলমেরও রূহ আছে। আর তাওয়াক্কুল, সিদক, নির্ভরশীলতা ও সততারও রূহ আছে। উক্ত রূহের অনুপাত লোকদের মধ্যে মর্যাদার ভিত্তিতে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। কারো কারো উপর এই রূহ প্রাধান্য বিস্তার করে, আর সে তাঁদেরকে রূহানী বা আধ্যাত্মিক শক্তি দান করে। আবার কেউ কেউ এসব শক্তি থেকে সম্পূর্ণ বা আংশিক বঞ্চিত থাকে। এভাবে তারা পশুর পর্যায়ে নেমে যায়। ওয়াল্লাহুল মুসতাআ'ন— “আর আল্লাহই একমাত্র সহায়।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00