📄 নাফস কি? নাফসের মূল রহস্য কি
নাফস কি? এর মূল রহস্য কি? নাফস কি দেহের একটি অংশ, না কোন একটি বাহ্যিক লক্ষণ, না নাফসই দেহ যা দেহের সাথে মিশে থাকে, নাকি নাফসকে দেহের মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে, না নাফস নিজেই একটি মৌলিক পদার্থ, নাফস কি নিজেই রূহ না কি রূহ থেকে একটি পৃথক সত্তা? নাফসে আম্মারাহ, নাফসে লাউয়ামাহ ও নাফসে মুতমায়িন্নাহ কি একই জিনিস নাকি ভিন্ন ভিন্ন তিনটি সত্তা? এসব বিষয় সম্পর্কে অনেকেই আলোচনা করেছেন এবং অনেকে মারাত্মক ভুলও করেছেন। এছাড়া তাঁদের সব বক্তব্য পরস্পর বিরোধী। তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর রাসূলগণের অনুসরণকারীদেরকে এসব ভুল-ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেন। আল্লাহর রাসূলগণের পবিত্র বাণী, তাদের আদেশ-নির্দেশ সবই নির্ভরযোগ্য ও নির্ভুল। এখানে নাফস সম্পর্কে বিভিন্ন জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিবর্গের অভিমত তুলে ধরা হলো:
প্রথমেই ইমাম আবুল হাসান আশআরী (র)-এর বক্তব্য উল্লেখ করা হলো। তিনি বলেছেন, রূহের জীবনী শক্তি আছে কি নেই সে বিষয় মতবিরোধ রয়েছে। এ নিয়েও মত বিরোধ আছে যে, রূহ কি একটি জীবনী শক্তি না অন্য কোন কিছু। রূহের কি দেহ আছে, না দেহ নেই।
দার্শনিক নাযযামের অভিমত হলো, রূহ আসলে দেহেরই নাম। আর সেটাই নাফস। তিনি আরো বলেন রূহ একটি জীবন সত্তা। তিনি বলেন, হায়াত ও কুওয়তের অর্থ- হাইউন, কাবিউন অর্থাৎ জীবিত ও শক্তিশালী। রূহ সম্পর্কে আরো একটি অভিমত রয়েছে যে, এটা একটি দেহধারী পদার্থ।
জাফর ইবনে হারাব প্রমুখের অভিমত এই যে, আমরা জানি না রূহ কি একটি মৌলিক পদার্থ নাকি আরায বা পরমূর্ত। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।" (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৮৫)
এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেননি, রূহ কি জাওহার বা মৌলিক পদার্থ না আরায বা পরমূর্ত। তবে গ্রন্থকারের মতে জা'ফর ইবনে হারাব এটা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, রূহ এবং জীবনী শক্তি একই পদার্থ নয়, এরা হলো পৃথক ও ভিন্ন সত্তা।
イমাম জুববাই এর মতে- রূহ হলো দেহ ও জীবনী শক্তি থেকে মুক্ত, আর জীবনী শক্তি হলো আরায বা পরমূর্ত। আভিধানিক অর্থে "ইনসানের রূহ বের হয়ে গিয়েছে বলা হয়।" ইমাম জুববাই-এর দৃষ্টিতে রূহ আরাযের বা পরমূর্তের অধীন নয়।
অপর এক শ্রেণীর দার্শনিকের মতে রূহকে দেহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করা হয়। তাঁদের দৃষ্টিতে দুনিয়ার সমস্ত জিনিস চারটি উপাদানে ঘটিত যথা- আগুন, বায়ু, পানি ও মাটি। এসবের মধ্যে উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতা লক্ষ্য করা যায়।
অপর একশ্রেণীর দার্শনিকের দৃষ্টিতে রূহ হলো চারটি প্রাকৃতিক উপাদানের বহির্ভূত। দুনিয়ার মধ্যে এই চারটি উপাদান ও রূহ অবস্থান করছে। রূহের কর্মকাণ্ডের মধ্যেও যথেষ্ট তারতম্য রয়েছে। কারো কারো মতে এ অবস্থা হলো স্বাভাবিক, আবার কারো মতে স্বাভাবিক নয়।
কোন কোন চিকিৎসাবিদেরা বলেন, রূহ হলো একটি শক্তি। তাঁরা আরো বলেন, এটা হলো এক ধরনের বিশুদ্ধ ও পরিষ্কার রক্ত যার মধ্যে দুর্গন্ধযুক্ত কোন কিছু নেই। অন্য একশ্রেণীর চিকিৎসাবিদের মতে, রূহ জৈবিক উত্তাপ ছাড়া আর কিছু নয়। আরও একশ্রেণীর চিকিৎসাবিদ আছেন যাদের মতে রূহের অপর নাম জীবন। তবে প্রকৃতিবাদীদের মতে জীবনী শক্তির অপর নামই রূহ।
রূহ সম্পর্কে ইমাম আসিম (র)-এর অভিমত হলো- জীবনী শক্তি বা রূহের জন্য দেহ ছাড়া অন্য কোন প্রমাণ গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরো বলেন, একজন জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি যাঁর মধ্যে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা আছে সেটাই তার দেহ। তিনি আরো বলেন, নাফস বলতে দেহকেই বুঝায়, অন্য কিছুকে নয়।
দার্শনিক এরিস্টটলের দৃষ্টিতে নাফসকে কোনভাবেই প্রভাবান্বিত করা যায় না, এটা একটি স্বাধীন সত্তা। এর কোন ধ্বংস নেই। জীব জগতের সাথে এই নাফসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নাফস এবং দেহ সহঅবস্থান করে। নাফসকে দেহ থেকে পৃথক করা যায় না। এটা তার সত্তার সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে সম্পর্কিত। যেসব গুণ অন্য প্রাণীর সাথে যুক্ত হয় না, ঐসব শক্তি সম্পর্কে তিনি ঐকমত্য পোষণ করেন। অর্থাৎ নাফসের ঐসব গুণ অন্য কারো ক্ষেত্রে পৃথক করা যায় না। দুনিয়ার প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যে এ সম্পর্ক একইভাবে বিদ্যমান।
সানবিয়াহ নামক জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তির অভিমত অনুযায়ী নাফস একটি বাস্তব সত্তা। যার নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা আছে। পার্থিব জগতের নাফসের এই পরিধি বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বীকৃত। নাফস হলো একটি মৌলিক শক্তির অধিকারী। দীসানিয়া নামক একজন চিন্তাশীল ব্যক্তির মতে নাফস হলো ঐসব গুণের অধিকারী, যেসব গুণ সম্পর্কে উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। নাফসের ঐসব গুণ অন্য কারো ক্ষেত্রে পৃথক করা যায় না।
জা'ফর ইবনে মুবাশ্বির এর মতে নাফস হলো জাওহার বা একটি মৌলিক পদার্থ। নাফসের নিজস্ব কোন দেহ নেই। কিন্তু জাওহার বা মৌলিক পদার্থ দেহে অবস্থান করে।
চিন্তাবিদ আবুল হোযায়েলের মতে নাফস হলো রূহ থেকে মুক্ত আর রূহের কোন জীবনী শক্তি নেই। আর জীবনী শক্তি হলো বিমূর্ত পদার্থ। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষ স্বপ্নের মধ্যে নাফস ও রূহ উভয় থেকে মুক্ত থাকতে পারে, কিন্তু জীবনী শক্তি থেকে মুক্ত হতে পারে না। এর সমর্থনে কুরআন শরীফের পবিত্র আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো, "আল্লাহ মানুষের রূহ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময় আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার রূহকে ছাড়েন না, তবে অন্যান্যদের (রূহকে) ছেড়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।" (সূরা আয-যুমার: আয়াত-৪২)
জা'ফর ইবনে হারাযের মতে নাফস হলো একটি বিমূর্ত পদার্থ। এটা মানুষের কার্যনির্বাহের একটি সহায়ক শক্তি। আর জাওহার হলো একটি মৌলিক পদার্থ, এটি দেহের কোন গুণে গুণান্বিত নয়।
হযরত আবূ বকর বাকিলানী (র) বলেন, এক শ্রেণীর চিন্তাবিদের মতে নাফস হলো ঐ বায়ু যা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে আসা যাওয়া করে। রূহ হলো এটি বিমূর্ত পদার্থ। রূহ হলো নাফস থেকে পৃথক একটি জীবনী শক্তি মাত্র। আবূ বকর বাকিলানী (র) ও তাঁর অনুসারীরা এই মত পোষণ করেন।
মাশশাইঈন সম্প্রদায়ের মতে নাফস কোন দেহ নয়, বিমূর্ত পদার্থও নয়। নাফস কোন জায়গায় আবদ্ধ নয়। সেজন্য এর কোন অবস্থান, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা, রং বা ভগ্নাংশ নেই। পার্থিব জগতের সাথে এটা যুক্ত বা পৃথক নয়। আর আশআরী সম্প্রদায় এবং এরিস্টটল এই অভিমতই পোষণ করেন।
নাফস সম্পর্কে দার্শনিক ইবনে সীনার অভিমত হলো, কিছু চিন্তাশীল লোকের ধারণা এই যে, দেহ হলো নাফসের একটি সহায়ক শক্তি, এটা কোন প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক নয়, স্থায়ী বা সংকুচিত হওয়ার কারণও নয়। ইবনে সীনা প্রমুখের এই অভিমত মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নাফস সম্পর্কে ইমাম ইবনে হাযম (র)-এর অভিমত হলো, যাঁরা ইসলাম ও মাযহাবে বিশ্বাসী, মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাসী তাঁরা মনে করেন, নাফস একটি দেহ বা বস্তু যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা রয়েছে, যেটা কোন এক স্থানে অবস্থান করে এবং দেহকে প্রভাবান্বিত করতে পারে। আসলে নাফস ও রূহ একই জিনিস।
আবূ আবদুল্লাহ ইবনে খতীব নাফস সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, "আমরা যখন কথা বলি, তখন আমরা আমাদের বক্তব্য সম্পর্কে ইঙ্গিত করে থাকি। সেটা হবে হয়তো দেহ নতুবা বিমূর্ত পদার্থ। নাফস দেহ বিশিষ্ট হতে পারে অথবা দেহের সাথে যুক্ত হতে পারে। কিংবা দেহ থেকে পৃথকও হতে পারে। নাফস যে দেহবিশিষ্ট এটা একটি সর্বসম্মত অভিমত। আর অধিকাংশ দার্শনিক এই অভিমত সমর্থন করেন।
নাফস সম্পর্কে যাদের অভিমত উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রন্থকারের মতে এরা ছিলেন বিদআতী ও পথভ্রষ্ট। ইমাম রাযী (র) ঐসব বিদ'আতীদের অভিমতগুলো একত্রিত করে লিপিবদ্ধ করেছেন। তবে গ্রন্থকারের মতে ইমাম রাযী (র) এ বিষয় কুরআন, হাদীস, মহান সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়ীন এবং আহলে হাদীসের বক্তব্য সম্পর্কে ততোটা অবহিত ছিলেন না। গ্রন্থকারের দৃষ্টিতে উপরোক্ত কোন অভিমতই ঠিক নয়। কেননা ইমাম রাযী (র)-এর অভিমত "মানুষ কেবল দেহবিশিষ্ট মানুষই" এটা একটি ভ্রান্ত ধারণা। অধিকাংশ মুসলিম চিন্তাবিদের মতে মানুষ দেহ এবং রূহ উভয়ের দ্বারা গঠিত। কোন সময় বিশেষ লক্ষণের উপর ভিত্তি করে শুধু দেহকেও মানুষ বলা হয়, আবার কোন সময় শুধু রূহকেই মানুষ বলা হয়। মানুষ বলতে প্রকৃতপক্ষে কি বুঝায় সে সম্পর্কে চারটি অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলো। এক. ইনসান শুধু রূহকে বলা হয়। দুই. ইনসান কেবল দেহকে বলা হয়। তিন. দেহ ও রূহ উভয়ের সমষ্টিকে ইনসান বলা হয়। চার. উপরোক্ত তিনটির মধ্যে একটিও ঠিক নয়। তবে নাফসের যে বাকশক্তি আছে, এই বিষয়েও ভিন্নমত রয়েছে।
রূহ সম্পর্কে ইমাম রাযী (র)-এর ছয়টি অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলো। তিনি বলেন, মানুষ যদি কোন বিশেষ ধরনের দেহ বিশিষ্ট হয়, যা এই প্রকাশ্য দেহের ভেতরে লুকায়িত আছে, তাহলে এই অভিমত সমর্থনকারীগণ এই দেহ নিয়েও বিভিন্ন মত পোষণ করতে পারেন। এক. এক শ্রেণীর লোকের মতে দেহ বলতে এর চারটি উপাদানের সংমিশ্রণকে বুঝায়। দুই. অন্য এক শ্রেণীর লোকের মতে এই দেহ হলো রক্ত। তিন. অন্য এক শ্রেণীর লোকের মতে এই দেহ হলো, একটি সূক্ষ্ম রূহ যেটা হৃৎপিণ্ড থেকে সৃষ্টি হয়ে ধমনীর মাধ্যমে দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। চার. অন্য একটি মতে এই দেহ হলো রূহ যা হৃৎপিণ্ডে সৃষ্টি হয়ে মস্তকে পৌঁছে যায়। এটাই মানুষের স্মৃতিশক্তি, এরই সাহায্যে মানুষ চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারণা করে থাকে। পাঁচ. আরেকটি মত হলো, এই দেহ হৃৎপিণ্ডের মধ্যে একটি অখণ্ডিত অংশ। ছয়. অপর আরেকটির মতে নাফস এটি সত্তা যা প্রকৃতপক্ষে ইন্দ্রিয়গত দেহ থেকে পৃথক এবং একটি ঊর্ধ্বলোকের নূরানী সূক্ষ্ম দেহ যেটা জীবন্ত ও সচল। এছাড়া একটি মৌলিক পদার্থ যা লোকের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পরিব্যাপ্ত, যেমন, গোলাপের মধ্যে নির্যাস, জলপাইয়ের মধ্যে তৈল আর কয়লার মধ্যে আগুন মিশে থাকে, সে পর্যন্ত এ সূক্ষ্ম সত্তা দেহের মধ্যে সচল ও সক্রিয় থাকে। আর এভাবেই মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি ও কল্যাণ কার্যকর হয়ে থাকে। তবে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্ন থাকার কারণে রূহ কলুষিত হয়ে যায়, তখন রূহের ঐসব শক্তি গ্রহণ করার যোগ্যতা লোপ পেয়ে যায়। রূহ তখনই দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রূহানী জগতে চলে যায়।
গ্রন্থকারের মতে ইমাম রাযী (র)-এর এই ষষ্ঠ অভিমতটিই কেবল গ্রহণযোগ্য ও নির্ভুল। এছাড়া অন্য কোন অভিমত তাঁর মতে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম রাযী (র)-এর এই অভিমতের সমর্থনে কুরআন, হাদীস, সাহাবাদের ইজমা বা ঐকমত্য, যুক্তি প্রমাণ বিদ্যমান আছে। গ্রন্থকার এই অভিমতের স্বপক্ষে শতাধিক প্রমাণ এখানে উপস্থাপন করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আল্লাহ মানুষের রূহ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময় আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার রূহকে ছাড়েন না, তবে অন্যান্যদের (রূহকে) ছেড়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।" (সূরা আয-যুমার: আয়াত-৪২)
এই আয়াতের মধ্যে ষষ্ঠ অভিমতের পক্ষে তিনটি প্রমাণ রয়েছে। তাহলো- ১. রূহকে উপরে উঠানো, ২. রূহকে আটক করা হয়, ৩. এক পর্যায়ে রূহকে ছেড়ে দেয়া হয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "আফসোস, যদি আপনি প্রত্যক্ষ করতেন, যখন যালিম মৃত্যুর কষ্টের মধ্যে থাকে, আর ফেরেশতারা তাদের হাত প্রসারিত করে বলেন, নিজের প্রাণ বের করো। আজকে তোমাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেয়া হবে।" (সূরা আনআম: আয়াত-৯৩)
এখানে রূহের চারটি প্রমাণ বিদ্যমান আছে। ১. রূহকে নেয়ার জন্য ফেরেশতাদের আগমন, ২. রূহকে দেহ থেকে বের করা, ৩. রূহের বের হয়ে আসা, ৪. ঐসময় রূহের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হওয়া এবং মহান রবের সামনে রূহের উপস্থিত হওয়া।
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, "তিনিই রাতে তোমাদের রূহ কবয করেন, আর তিনি জানেন যা কিছু তোমরা দিনের বেলা কর। তারপর তিনি তোমাদেরকে (দ্বিতীয়) দিনে সেই কর্মজগতে ফিরিয়ে পাঠান, যেন জীবনের নির্দিষ্ট আয়ু পূর্ণ হতে পারে।" "এমনকি যখন তোমাদের মধ্যে থেকে কারো মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন তার প্রতি প্রেরিত ফেরেশতারা তার প্রাণ বের করে নেন। আর তাঁরা নিজেদের কর্তব্য পালনে বিন্দুমাত্রও ত্রুটি করেন না।" (সূরা আল আনআম: আয়াত ৬০-৬১)
এই আয়াতগুলোর মধ্যে রূহের অবস্থা সম্পর্কে তিনটি প্রমাণ রয়েছে: (৮) রূহকে নিদ্রাবস্থায় উঠিয়ে নেয়া হয়। (৯) রূহকে আবার দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয়, (১০) মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা রূহকে কবয করেন।
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: "হে প্রশান্ত চিত্ত, তোমার রবের দিকে সন্তুষ্টচিত্তে ফিরে যাও এ অবস্থায় যে, তুমি সন্তুষ্ট এবং তোমার রবের নিকট প্রিয়পাত্র। আমার বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।" (সূরা আল ফাজর: আয়াত ২৭-৩০)
এই পবিত্র আয়াতগুলোতে রূহের তিনটি প্রমাণ রয়েছে- ১১. রূহের ফিরে আসা, ১২. রূহের প্রবেশ করা, ১৩. রূহের সন্তুষ্ট হওয়া।
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, "আমার বান্দাদের মধ্যে শামিল হও, আর আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।" আগেকার দিনের মনীষীদের মধ্যে এ বিষয়ে মতবিরোধ ছিলো, এসব কথা মৃত্যুর সময়, কেয়ামতের দিন বেহেশতে প্রবেশের সময়, না এ উভয় স্থানেই বলা হবে। একটি মারফু হাদীসে উল্লেখ আছে যে, হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে একবার বলেছিলেন, "এসব কথা ফেরেশতারা তোমাকে তোমার ইনতেকালের সময় বলবেন।" হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (র) বলেছেন, রূহকে তিনটি স্থানে জান্নাতের শুভ সংবাদ দেয়া হবে। মৃত্যুর সময়, হাশরের দিন ও কেয়ামতের দিন। হযরত আবূ সালিহ (রা) বলেছেন, "একজন নেককার বান্দাকে তাঁর ইনতেকালের সময় আমার বান্দাদের সাথে মিলিত হও" এই শুভ সংবাদ দেয়া হয়। আর বেহেশতে প্রবেশের শুভ সংবাদ দেয়া হবে কেয়ামতের দিন।"
হাদীস: রূহ যখন কবয করা হয় এবং উপরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সে মৃত্যুপথযাত্রী রূহকে দেখতে পায়। এই হাদীসে রূহের দু'টি প্রমাণ রয়েছে- ১৪. রূহের কবয হওয়া, ১৫. রূহকে দেখতে পাওয়া। ১৬. হযরত খোযায়মা (রা) বলেছেন যে, "আমি স্বপ্নে দেখেছি যেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র কপালে আমার মাথা রেখেছি। আমি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই স্বপ্নের কথা আরয করলে তিনি বললেন, এক রূহ অন্য রূহের সাথে স্বপ্নের মধ্যে সাক্ষাৎ করে থাকে। তারপর তিনি শির মুবারক উপরে উঠালেন, তখন আমি আমার কপাল তাঁর পবিত্র কপালের উপর স্থাপন করলাম।" (নাসায়ী) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "রূহ স্বপ্নের মধ্যে পরস্পর সাক্ষাৎ করে।" এই প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর বক্তব্য ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে স্বপ্নের মধ্যে মৃত ব্যক্তিদের রূহের সাথে জীবিত ব্যক্তিদের রূহের দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে থাকে এবং তাদের মধ্যে কথাবার্তাও হয়। অতঃপর আল্লাহ যাদের মৃত্যু ঘটাবেন, তাদের রূহ আটকে রাখেন।
হযরত বিলাল (রা) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের রূহ কবয করা হয়েছিলো, আর তিনি (আল্লাহ) যখন ইচ্ছা করলেন রূহ তোমাদের নিকট ফিরিয়ে দিলেন। এই হাদীসের মধ্যে রূহের দু'টি প্রমাণ আছে- ১৭. রূহকে কবয করা হয়, ১৮. আর রূহকে ফিরিয়েও দেয়া হয়।
হাদীস: মুমিনের রূহ হলো পাখির ন্যায়, যারা জান্নাতের বৃক্ষরাজি থেকে ফলফলাদি আহার করে। এখানে রূহের দু'টি প্রমাণ রয়েছে- ১৯. রূহ হলো পাখির ন্যায়, ২০. রূহ জান্নাতের বৃক্ষরাজিতে চড়ে, উঠা বসা করে ও সেসবের ফলফলাদি ভক্ষণ করে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "শহীদগণের রূহ সবুজ রংয়ের পাখিদের পক্ষপুটে থাকে। বেহেশতের যেখানে খুশি উড়ে বেড়ায়। আর আরশের মধ্যে ফানুসের মধ্যে অবস্থান করে। তারপর তোমাদের রব তাদেরকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করেন, "তোমাদের ইচ্ছা কি?" এই হাদীসে রূহের ছয়টি প্রমাণ আছে- ২১. রূহ পাখির পক্ষপুটে থাকে, ২২. রূহ জান্নাতে বিচরণ করে, ২৩. রূহ জান্নাতী ফল খায় ও জান্নাতের নহরের পানি পান করে, ২৪. ফানুসে গিয়ে অবস্থান করে, ২৫. আল্লাহ তা'আলা রূহের সাথে কথাবার্তা বলেন, জবাব দেন, ২৬. রূহ দুনিয়ার ফিরে আসার ইচ্ছা রাখে। এর দ্বারা জানা গেলো রূহ দুনিয়ায় ফিরে আসতে পারে।
রূহ সম্পর্কে এখানে একটি সন্দেহের নিরসন করা হলো। যদি বলা হয়, এইসব গুণ পাখির, রূহের নয়। তাহলে এর জবাব হবে, ঐসব রূহ পাখির মধ্যে রেখে দেয়া হয়েছে। আর হযরত আবু আমর (রা)-এর বর্ণিত রেওয়ায়েত থেকে এটা জানা যায়, "আরওয়াহুশ শুহাদায়ে কা তাইরিন" অর্থাৎ "শহীদগণের রূহ পাখির ন্যায়।" কাজেই জানা গেল রূহ পাখির ন্যায়।
হযরত তালহা (রা) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, একদা তিনি কোন এক জঙ্গলের মধ্যে নিজের কৃষি খামার দেখতে গিয়েছিলেন। রাত হয়ে গেলে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রা)-এর কবরের নিকট অবস্থান করেছিলেন। তিনি তাঁর কবর থেকে কুরআন শরীফ পাঠের সুমিষ্ট আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করলে ইরশাদ হলো, সে হলো আবদুল্লাহ! তোমরা কি জানো না যে, যাঁর রূহকে কবয করার পর আল্লাহ তা'আলা যমরুদ ও ইয়াকূতের ফানুসে রেখে দিয়েছেন। তারপর ফানুসটিকে জান্নাতের মাঝখানে ঝুলিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে। রাতের বেলায় এ রূহকে কবরে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তারপর সকাল বেলায় সে রূহ আবার ঐখানে ফিরে আসে। এই হাদীস থেকে রূহ সম্বন্ধে চারটি প্রমাণ পাওয়া যায়- ২৭. রূহ বেহেশতের মধ্যে ফানুসে অবস্থান করে, ২৮. রূহ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আসা যাওয়া করে, ২৯. নেককারের রূহ তাদের কবরে কথাবার্তা বলে ও কুরআন তিলাওয়াত করে, ৩০. এছাড়া রূহ একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে।
হযরত বারা ইবনে আযিব (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রূহ সম্পর্কে কুড়িটি প্রমাণ আছে। ৩১. মৃত্যুর সময় মানুষের রূহকে মালাকুল মাউত তাঁর রবের দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেন। আর জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন সচেতন রূহকেই এরূপ করা হয়, ৩২. নেক রূহকে আরো বলা হয়, তোমার রবের প্রতিদান ও তাঁর সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে এসো, ৩৩. মশকের মুখ দিয়ে পানির ফোঁটার ন্যায় বেরিয়ে এসো, ৩৪. রূহকে মালাকুল মাউতের হাত থেকে অন্য ফেরেশতাদের হাতে তুলে দেয়া হয়। তাঁরা রূহকে নিয়ে আকাশের দিকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যান, ৩৫. নেক রূহকে জান্নাতের কাফনের কাপড় পরিয়ে দেয়া হয়, ৩৬. তারপর ফেরেশতারা রূহকে নিয়ে আকাশের দিকে চলে যান, ৩৭. রূহকে জান্নাতী সুগন্ধিও দেয়া হয়। রূহ থেকে মেশকের চেয়ে বেশি সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, ৩৮. রূহকে আকাশে তুলে নেয়া হয়, ৩৯. রূহের জন্য আকাশের সব দরজা খুলে দেয়া হয়। রূহকে আকাশের সমস্ত নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা কর্তৃক বিদায় দেয়া হয়, ৪০. আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে রূহকে যমীনে ফিরিয়ে আনা হয়, ৪১. রূহকে দেহে ফিরিয়ে আনা হয়, ৪২. কাফিরদের রূহ কবয করার সময়ে তাকে ভীষণ আযাবের সম্মুখীন হতে হয়, ৪৩. কাফিরদের দেহ থেকে বিশ্রী দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, ৪৪. সেসব রূহকে আকাশ থেকে যমীনে ছুঁড়ে দেয়া হয়। আর তারা যমীনে এসে পড়ে, ৪৫. ফেরেশতারা নেক রূহকে মুবারকবাদ জানান। আর খারাপ রূহের প্রতি দুর্ব্যবহার করেন, ৪৬. কবরের মধ্যে মুনকার-নাকীর মৃত ব্যক্তিকে উঠিয়ে বসান ও সওয়াল-জওয়াব করেন। রূহকে যদি সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, তাহলে সেটা হবে অতি সাধারণ ব্যাপার। সেই মৃত ব্যক্তি যদি নেককার হয়, তাহলে ঐ রূহকে দেহে ফিরিয়ে আনা হয়, ৪৭. রূহকে তার রবের নিকট নিয়ে গিয়ে বলা হয়, হে রব! এ হলো আপনার অমুক বান্দা, ৪৮. তখন রবের আদেশ হয়, এর জন্য যেসব নি'আমতের ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে, সেগুলো তাকে দেখিয়ে দাও। এছাড়া রূহকে তার জান্নাতী বা জাহান্নামী ঠিকানাও দেখিয়ে দেয়া হয়, ৪৯. ফেরেশতাগণ নেককার রূহের নামাযে জানাযা আদায় করেন, যেমনি দুনিয়ায় মুসলমান মৃত ব্যক্তিদের নামাযে জানাযা আদায় করা হয়, ৫০. রূহ তার জান্নাতী বা জাহান্নামী আবাসস্থল কেয়ামত পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করে থাকে যদিও তখন দেহের কোন চিহ্ন বা অস্তিত্ব থাকে না।
হাদীস: হযরত আবূ মূসা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে আছে যে, যখন একজন মুমিন বান্দার রূহ বের হয়ে আসে, তখন তার থেকে মেশকের চেয়ে অধিক সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। আর ফেরেশতারা তাকে নিয়ে রওয়ানা হন, আর আসমানের নিচের ফেরেশতাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করেন। আর তাঁরা তার উত্তম আমলসমূহের সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তার নামও উল্লেখ করেন। এসব ফেরেশতা রূহ বহনকারী ফেরেশতাগণকে এবং ঐ রূহকে মুবারকবাদ দেন। তারপর তাঁরা রূহকে নিয়ে এর আমল যেসব দরজা দিয়ে ফেরেশতারা আকাশে নিয়ে যান ঐসব দরজা দিয়ে উপরে উঠেন। আর নেক রূহ সূর্যের মতো ঝলমল করতে থাকে, এমনিভাবে তাঁরা পবিত্র আরশ পর্যন্ত পৌছে যান। ফেরেশতারা যখন কাফিরদের রূহ নিয়ে উপরে উঠেন তখন আকাশের ফেরেশতারা জিজ্ঞেস করেন, এই রূহটি কার? ফেরেশতারা তার মন্দ আমলের কথা উল্লেখ করে বলেন, অমুকের পুত্র অমুকের। তখন ফেরেশতারা বিরক্ত হয়ে বলেন, এ রূহকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। তাই ঐ রূহকে সবচেয়ে নিচের যমীনে ফিরিয়ে দেয়া হয়। এই হাদীসে রূহ সম্পর্কে দশটি প্রমাণ আছে- ৫১. রূহে বের হওয়া, ৫২. নেক রূহ থেকে খুশবু ছড়িয়ে পড়া, ৫৩. ফেরেশতাগণ কর্তৃক রূহকে নিয়ে যাওয়া, ৫৪. অভ্যর্থনাকারী ফেরেশতাগণ কর্তৃক রূহকে মুবারকবাদ জানানো, ৫৫. রূহকে কবয করা, ৫৬. রূহকে নিয়ে উপরে উঠা, ৫৭. নেকরূহের রওশনীতে আকাশসমূহ উদ্ভাসিত হওয়া, ৫৮. রূহের পবিত্র আরশ পর্যন্ত পৌঁছা, ৫৯. ফেরেশতা কর্তৃক রূহকে প্রশ্ন করা। আসলে রূহকে এ ধরনের প্রশ্ন একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবেই করা হয়, ৬০. আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে বদ রূহকে সবচেয়ে নিচের যমীনে ফিরিয়ে নেয়া হয়।
হযরত আবূ হুরাইরা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে আছে যে, যখন কোন মুমিন ব্যক্তির রূহকে বের করা হয়, তখন সেই রূহকে নিয়ে দু'জন ফেরেশতা আকাশের দিকে উঠেন, তখন আকাশবাসী ফেরেশতাদেরকে তাঁরা বলেন, এটি একটি পবিত্র রূহ যা যমীন থেকে এসেছে। তখন আকাশবাসী ফেরেশতারা বলেন, হে রূহ! তোমার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, আর ঐ দেহের উপরও যেটা তোমার আবাসস্থল ছিলো। তারপর সুগন্ধিসহ তাকে তার রবের নিকট ফেরেশতারা নিয়ে পৌঁছেন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, একে নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত তার নির্দিষ্ট স্থানে ফিরিয়ে দাও। এই হাদীসে রূহ সম্পর্কে ছয়টি প্রমাণ রয়েছে- ৬১. দু'জন ফেরেশতার রূহের সাথে সাক্ষাৎ করা, ৬২. দু'জন ফেরেশতা কর্তৃক রূহকে নিয়ে আকাশের দিকে উঠা, ৬৩. ফেরেশতাদের একথা বলা যে, এই পবিত্র রূহ যমীন থেকে এসেছে, ৬৪. ফেরেশতা কর্তৃক রূহের জন্য দু'আ করা, ৬৫. রূহের সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়া, ৬৬. রূহকে নিয়ে আল্লাহর কাছে যাওয়া।
হযরত আবূ হুরাইরা (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে রূহ সম্পর্কে দশটি প্রমাণ আছে- ৬৭. রূহের পবিত্র দেহে অপবিত্র দেহে অবস্থান করা, ৬৮. ফেরেশতাদের নেক রূহকে একথা বলা যে, হে নেক রূহ! বের হয়ে এসো, তুমি প্রশংসারযোগ্য, ৬৯. রূহকে শান্তি ও নিআমতের শুভ সংবাদ দেয়া, রূহ দেহ থেকে বের হয়ে যে স্থানে যাবে সেখানকার শুভ সংবাদ দান, ৭০. আকাশ পর্যন্ত এই শুভ সংবাদ পৌঁছে যাওয়া, ৭১. রূহের জন্য আকাশের দরজা খুলে দেওয়া, ৭২. নেক রূহকে একথা বলা যে, প্রসন্নচিত্তে জান্নাতে প্রবেশ করো, ৭৩. রূহের ঐ আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া যেখানে আল্লাহ তা'আলা সমাসীন আছেন, ৭৪. বদকার ও কাফিরের রূহের প্রতি একথা বলা যে, লাঞ্ছিত অবস্থায় ফিরে যাও, ৭৫. কাফিরের রূহের জন্য আকাশের দরজা বন্ধ রাখা, ৭৬. কাফিরের রূহকে যমীনের দিকে ছুঁড়ে দেয়া, তারপর কবরে ফিরে আসা।
৭৭. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, রূহ হচ্ছে একটি ঐক্যবদ্ধ বাহিনীর ন্যায়। সেখানে যেসব রূহের মধ্যে পরিচয় হয়েছিলো, এখানেও তাদের মধ্যে সখ্যতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আর যাদের মধ্যে তা হয় না, তারা অপরিচিত থেকে যায়। এখানে সমস্ত রূহকে ঐক্যবদ্ধ বাহিনী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
৭৮. হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে, রূহের মধ্যে পরস্পর দেখা সাক্ষাৎ হয়। রূহের মধ্যে ভালো ও মন্দ আছে।
৭৯. হযরত ইবনে আমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে আছে যে, রূহ বহু দূরদূরান্ত থেকেও পরস্পর দেখা সাক্ষাৎ করে, যদিও এর আগে এদের কোন দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।
৮০. ঐসব আসার বা হাদীস যা আদম (আ)-এর সৃষ্টি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে: যখন রূহ হযরত আদম (আ)-এর মস্তিষ্কে প্রবেশ করলো, তখন তাঁর হাঁচি এলো এবং তিনি "আলহামদুলিল্লাহ" বলেছিলেন। তাঁর রূহ যখন চোখে পৌঁছালো, তখন তিনি জান্নাতের ফল-ফলাদি দেখতে পেলেন। এরপর সেই রূহ যখন তাঁর পেটের মধ্যে পৌঁছালো, তখন তিনি ক্ষুধা অনুভব করলেন। যখন তাঁর কদম মুবারকে রূহ পৌঁছালো, এই অবস্থায় তিনি দাঁড়ালেন। তবে এটা সত্য যে, রূহ দেহে প্রবেশ করার সময়েও কষ্ট হয়, আবার বের হওয়ার সময়ও কষ্ট হয়।
৮১. রূহের মধ্যে ভালো ও মন্দ আছে। রূহকে বের করানোর এবং প্রবেশ করানোর বর্ণনা হাদীসে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলার হুকুমে রূহকে বের করার, রূহের আলো ও অন্ধকারের যে অবস্থা উল্লেখ আছে, তা সবই সত্য। আম্বিয়ায়ে কেরামের পবিত্র রূহ থেকে প্রদীপের ন্যায় যে উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত হয়, সেটাও রূহের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।
৮২. হযরত তামীমুদদারী (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে, মুমিনদের রূহ আল্লাহ তা'আলার দরবারে উপস্থিত হয় ও তাঁকে সিজদাহ করে। আর ফেরেশতারা তাদেরকে শুভ সংবাদ দান করেন। আল্লাহ তা'আলা মালাকুল মাউতকে বলেন, আমার এই নেক বান্দার রূহকে নিয়ে যথাস্থানে রেখে দাও।
৮৩. রূহের অবস্থা সম্পর্কে যে সমস্ত আসার বা হাদীস বর্ণিত আছে, সে সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। তবে এ সম্পর্কে ঐকমত্য রয়েছে যে, মৃত্যুর পর রূহের অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। তবে সেসব স্থান কোথায় সে সম্পর্কে কোন ঐকমত্য নেই।<sup>১</sup>
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, "মানুষের দেহ আবার কবরে গঠিত হবে। তারপর যখন ইসরাফীল (আ) তাঁর শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন, তখন সকল রূহ তাদের দেহে প্রবেশ করবে। তখন যমীন ফেটে যাবে, আর সকল মানুষ তাদের কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে।"
শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া সম্পর্কে হাদীসে আরো উল্লেখ আছে যে, "হযরত ইসরাফীল (আ) সব রূহকে আহবান করবেন, তখন সমস্ত রূহ সেখানে সমবেত হবে। মুমিনদের রূহ হবে উজ্জ্বল, আর কাফিরদের রূহ হবে অন্ধকারে আচ্ছন্ন। হযরত ইসরাফীল (আ) সব রূহকে তাঁর শিঙ্গায় রেখে দেবেন, তারপর এর মধ্যে ফুঁ দেবেন। সেই অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার আদেশ হবে, আমার ইযযতের কসম, প্রত্যেকটি রূহ নিজেদের দেহে চলে যাও। অবশেষে সব রূহ শিঙ্গা থেকে মৌমাছির মতো বেরিয়ে আসবে। এভাবে আকাশ এবং পাতালের সব জায়গা রূহের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে এবং প্রতিটি রূহ নিজের দেহে প্রবেশ করবে। তারপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে যমীনে ফেটে যাবে। আর সমস্ত মানুষ কবর থেকে বের হয়ে তাদের রবের দিকে দৌড়াতে থাকবে। অবশেষে আহবানকারী ফেরেশতার নিকট ছুটে এসে দাঁড়াবে। আর প্রত্যেকেই আহ্বানকারীর সেই আওয়াজ শুনতে পাবে। তারপর সবাই দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকবে।" আল্লাহর রাসূল যে সংবাদ দিয়েছেন, তা একেবারেই সত্য ও সঠিক। আল্লাহ তা'আলা সেই অবস্থায় মানুষের নতুন কোন রূহ পয়দা করবেন না। বরং ঐসব রূহেই সমাবেশ হবে, যারা দুনিয়ায় ভালো বা মন্দ কাজ করে গেছে। আল্লাহ তা'আলা তাদের দেহ পয়দা করে তাদেরকে তার মধ্যে ফিরিয়ে দেবেন।
৮৪. কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সামনে রূহ ও দেহ উভয়ে ঝগড়া করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, কেয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে ঝগড়াঝাটি হবে। এমনকি রূহ দেহের সাথে ঝগড়া করবে। রূহ বলবে, হে রব! আমি আপনার সৃষ্ট রূহ ছিলাম। আপনি আমাকে দেহের মধ্যে অর্পণ করেছিলেন। আমার কোন অপরাধ নেই। দেহ বলবে, হে রব! আমি একটি দেহ ছিলাম, যাকে আপনি পয়দা করেছিলেন। আর অগ্নিসম এই রূহ আমার ভেতরে প্রবেশ করেছিলো। এর দরুন আমি উঠা বসা করতাম, দাঁড়াতাম এবং চলাফিরা করতাম। আমি কোন অন্যায় করিনি, আমার কোন অপরাধ নেই। তখন ইরশাদ হবে, আমি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিচ্ছি। ইরশাদ হলো- একবার এক অন্ধ ও এক খঞ্জ কোন এক বাগানে গেলো। খঞ্জ অন্ধ ব্যক্তিকে বললো, আমি ফলফলাদি দেখতে পাচ্ছি, যদি আমার পা সুস্থ থাকতো তবে এগুলো পেড়ে আনতাম। অন্ধ ব্যক্তি বললো, আমি তোমাকে আমার কাঁধে তুলে নিচ্ছি। অন্ধ ব্যক্তি খঞ্জকে তার কাঁধে তুলে নিলো, তারপর খঞ্জ ব্যক্তি ফল পেড়ে আনলো এবং উভয়ে খেলো। এখন বলো, তোমরা কে অপরাধী? তারা উত্তর দিলো, আমরা উভয়েই অপরাধী। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, তোমরা নিজেরাই নিজেদের ফয়সালা করেছো।
৮৫. কবরের আযাব ও সওয়াব সম্পর্কে যেসব হাদীস ও সাহাবাদের বর্ণনা রয়েছে তা থেকে জানা যায় যে, মৃত ব্যক্তির দেহ মাটির সাথে মিশে গেলে তার কোন নাম-নিশানা থাকে না। কিন্তু তার আযাব বা আরাম কেয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকে। আরো জানা গেলো, বরযখের আযাব বা আরামের সাথে একজন মৃত ব্যক্তি সরাসরি জড়িত।
৮৬. যখন শহীদগণের রূহকে জিজ্ঞেস করা হয়, তোমাদের ইচ্ছা কী? তখন তাঁরা বলেন, আমাদের রূহকে আমাদের দেহে ফিরিয়ে দেয়া হোক যেন আবারও আপনার রাস্তায় শহীদ হতে পারি। লক্ষণীয় যে, এই ধরনের সওয়াল ও জওয়াব এমন সত্তাকে করা হয়, যারা বুদ্ধিমান ও বাকশক্তিসম্পন্ন। যাদের মধ্যে দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার এবং স্ব স্ব দেহে প্রবেশ করার যোগ্যতা বিদ্যমান। আর ঐসব রূহকে যাঁরা জান্নাতে চলাফিরা করে তাঁদেরকেই এই প্রশ্ন করা হয়। অথচ এসব মৃত ব্যক্তির দেহ অনেক আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে।
৮৭. হযরত সালমান ফারেসী (রা) প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে যে, মুমিনদের রূহ বরযখে তাঁদের ইচ্ছা মতো চলাফিরা করে। আর কাফিরদের রূহ সিজ্জীন নামক স্থানে বন্দী থাকে।
৮৮. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ শরীফে হযরত আদম (আ)-এর ডানে ও বামে সকল রূহকে দেখেছিলেন এবং একটি নির্দিষ্ট স্থানও প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
৮৯. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ শরীফে আকাশমণ্ডলীতে মর্যাদা অনুযায়ী আম্বিয়ায়ে কেরামের রূহ দেখেছিলেন। তাঁরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বর্ধনা জানিয়েছিলেন এবং তাঁর জন্য দু'আও করেছিলেন। তাঁদের দেহ মুবারক ছিলো সে সময় যমীনে।
৯০. হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের রূহ হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আ)-এর আশেপাশে দেখতে পেয়েছিলেন।
৯১. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলমে বরযখে রূহের বিভিন্ন ধরনের আযাব হতে দেখেছিলেন। বুখারী শরীফে হযরত সামুরাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এদের দেহ অনেক আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো।
৯২. পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: "শহীদগণ তাঁদের রবের কাছে জীবিত আছেন, তাঁরা পানাহার করেন তাঁরা আনন্দিত এবং আপন ভাইদের আনন্দদায়ক অবস্থার কথা শুনে সন্তুষ্ট হন।" শহীদগণের রূহেরই এই বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য। শহীদগণের দেহ কেয়ামতের দিন আবার সৃষ্টি হবে।
৯৩. হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর বর্ণিত হাদীসটি দ্বারা বেদীন ও বিদআতীদের অনেক ভ্রান্ত মতবাদ বাতিল হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, একদিন কোন এক জায়গায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপবিষ্ট ছিলেন। সে সময়ে তিনি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করে শুনালেন। "তুমি যদি যালিমদেরকে সেই অবস্থায় দেখতে পেতে, যখন তারা মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে এবং ফেরেশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলতে থাকেন, দাও, বের করো তোমাদের জানপ্রাণ, আজ তোমাদেরকে সেসব অপরাধের শাস্তি হিসেবে লাঞ্ছনাকর আযাব দেয়া হবে।" তারপর ইরশাদ করলেন, আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন রয়েছে, কোন মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার আগে সে জান্নাতী কি জাহান্নামী এটা দেখে বিদায় গ্রহণ করে। তার অন্তিম সময়ে ফেরেশতাদের দু'টি দল যমীন থেকে আকাশ পর্যন্ত তার নিকট উপস্থিত থাকেন। ফেরেশতাদের চেহারা সূর্যের মতো চমকাতে থাকে। আর অন্তিম যাত্রীই কেবল ওদেরকে দেখতে পায়, যদিও তোমরা দেখতে পাও সে ব্যক্তি তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঐ ফেরেশতাদের হাতে কাফন ও খুশবু থাকে। মৃত্যুপথযাত্রী যদি মুমিন হন, তাহলে ফেরেশতাগণ তাকে জান্নাতের শুভ সংবাদ দেন। আর বলেন, হে প্রশান্ত আত্মা! আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও জান্নাতের দিকে বের হয়ে এসো। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য সম্মানিত নিআমত নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, যা দুনিয়া ও তার মধ্যস্থ সবকিছুর চেয়ে উত্তম। ফেরেশতারা বার বার তাকে ঐ শুভ সংবাদ দিতে থাকেন এবং তার জন্য তারা মায়ের চেয়েও অধিক স্নেহপরায়ণ দয়ালু হয়ে থাকেন। তারপর তাঁরা তার রূহকে শরীরের প্রত্যেক অংশ থেকে টেনে বের করেন। যে অঙ্গ থেকে রূহকে টেনে বের করা হয়, সে অঙ্গ অসাড় হয়ে যায়। ফেরেশতাদের জন্য এ কাজটি খুবই সহজ যদিও তোমাদের জন্য তা খুব কঠিন। অবশেষে রূহ কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর শিশু যেমনিভাবে মায়ের পেট থেকে বের হওয়ার সময় হকচকিয়ে যায়, এর চেয়েও অনেক বেশি হকচকিত অবস্থায় রূহ দেহ থেকে বের হয়ে আসে। এই অবস্থায় উপস্থিত সকল ফেরেশতাই ঐ রূহকে কবয করতে চান। কিন্তু রূহ কবয করার ব্যাপারে মালাকুল মাউত এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। মালাকুল মাউত এভাবে সে লোকটির জান কবয করেন। তারপর রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এই বক্তব্য শেষে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন, "তাদেরকে বলুন, মৃত্যুর যে ফেরেশতাকে তোমাদের উপর নিযুক্ত করা হয়েছে, সে তোমাদেরকে পুরোপুরি নিজের মুষ্টির মধ্যে ধারণ করে নেবে। তারপর তোমাদেরকে তোমাদের রবের দিকে ফিরিয়ে আনা হবে।" (সূরা সাজদাহ: আয়াত-১১)
"তারপর মালাকুল মাউত ঐ ব্যক্তির রূহকে সাদা কাপড়ের মধ্যে নিয়ে নেন, তারপর একে বুকের সাথে লাগান এবং মায়ের চেয়েও বেশি আদর করেন। এর থেকে মেশকের চেয়েও অধিক সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ফেরেশতাগণ এই পবিত্র খুশবু গ্রহণ করেন এবং তার নিকট এসে বলেন, এই পবিত্র খুশবু ও পবিত্র রূহের প্রতি মারহাবা। হে আল্লাহ! এ রূহের প্রতি আপনি রহমত বর্ষণ করুন। আর ঐ দেহের উপরও যেখান থেকে এ রূহ বের হয়ে এসেছে। তারপর তারা রূহকে নিয়ে উপরে চলে যান। তখনও এর থেকে মেশকের চেয়ে অধিক প্রিয় খুশবু ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফেরেশতাগণ ঐ রূহের সওয়াবের উদ্দেশ্যে নামায পড়েন এবং তার সাথে সাথে থাকেন। তার জন্য আকাশের সব ফটক খুলে দেয়া হয়। তারপর এ রূহ যে আকাশ অতিক্রম করে, ওখানকার ফেরেশতারা ঐ রূহের প্রতি স্বাগত জানান। ফেরেশতারা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে ঐ রূহকে নিয়ে গিয়ে পৌঁছান। তখন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, হে পবিত্র রূহ, তোমাকে মুবারকবাদ। হে ফেরেশতাগণ! একে জান্নাতে নিয়ে গিয়ে এর জান্নাতী স্থান আর সম্মানের যাবতীয় উপকরণ দেখিয়ে দাও, যা আমি এর জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি। তারপর একে পৃথিবীতে নিয়ে যাও। আমি ফয়সালা করেছি যে, আমি মানুষকে মাটি দিয়ে পয়দা করেছি, এর মধ্যে একে ফিরিয়ে আনবো, আর পুনরায় মাটি দিয়েই পয়দা করবো। তাঁর শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জান রয়েছে, জান্নাত থেকে বের হওয়ার সময় রূহ দেহ থেকে বের হওয়ার চেয়েও বেশি হকচকিয়ে যায়। সে বলে, আমাকে কোথায় নিয়ে যাও, ঐ দেহের মধ্যে যেখানে আমি আগে ছিলাম? তখন ফেরেশতাগণ বলেন, আমরা তো আল্লাহ তা'আলার হুকুমের অধীন। আর তোমাদেরও সে হুকুম না মেনে উপায় নেই। এভাবে ফেরেশতাগণ তাকে নামিয়ে আনেন। এই সময়ের মধ্যে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন তার গোসল ও কাফনের কাজ সেরে ফেলেন। তারপর ফেরেশতারা রূহকে দেহ ও কাফনের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেন।" এই হাদীসের প্রতিটি শব্দকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে যাবতীয় ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণার অবসান ঘটবে।
৯৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেন যে, মুমিনের মৃত্যুর সময় তাঁর কাছে দু'জন ফেরেশতা পাঠানো হয়। তাদের হাতে জান্নাতী ফল ও কাফন থাকে। ঐ কাফনে রূহ কবয করা হয়। তার থেকে এমন সুগন্ধ বের হয় যে, এমন সুগন্ধ কেউ কখনো গ্রহণ করেনি। এমনকি তাঁকে আল্লাহ তা'আলার নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে ফেরেশতারা আল্লাহকে সিজদাহ করেন, তারপর রূহ আল্লাহকে সিজদাহ করে। তারপর হযরত মীকাঈল (আ)-কে ডেকে বলা হয়, এই রূহকে নিয়ে মুমিনদের রূহের সাথে রেখে দাও যে পর্যন্ত না আমি কিয়ামতের দিন আবার এ ব্যাপারে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করি।
সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুমিনের রূহ আরশের সম্মুখে নিদ্রাজনিত মৃত্যু ও স্বাভাবিক মৃত্যুর পরে সিজদাহ করে। আল্লাহ তা'আলার মহান দরবারে গিয়ে রূহের উত্তম সালাম হলো- "আল্লাহুম্মা আনতাস সালামু ওয়া মিনকাস সালামু তাবারাকতা ইয়াজাল জালালি ওয়াল ইকরাম।" অর্থাৎ "হে আল্লাহ! তুমি শান্তিদাতা, তোমার কাছে রয়েছে শান্তি। তুমি সকল প্রতাপ, ইযযাত এবং বরকতের অধিকারী।"
রূহ সম্পর্কে প্রখ্যাত কাযী নুরুদ্দীন (র) থেকে বর্ণিত: তিনি তাঁর খালার মৃত্যুর সময় তাঁর নিকট উপস্থিত ছিলেন। তাঁর খালা একজন খুবই নেককার ও ইবাদতকারিণী ছিলেন। একবার খালা আমার নিকট জানতে চাইলেন, একটি রূহ যখন দেহ থেকে বের হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট হাযির হয় তখন কিভাবে সেই রূহ আল্লাহকে সালাম পেশ করে। এটা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। আমি একটু চিন্তা করে বললাম, "আল্লাহুম্মা আনতাস সালামু ওয়া মিনকাস সালামু তাবারাকতা ইয়া জালজালালি ওয়াল ইকরাম" বলে আল্লাহর কাছে সালাম পেশ করে। এরপর তিনি ইনতেকাল করলেন। একবার আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম, স্বপ্নে তিনি আমাকে বললেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমাকে আল্লাহর সামনে হাযির করলে আমি ভয় পেয়ে গেলাম, কি বলবো তা বুঝে উঠতে পারিনি। হঠাৎ তোমার কাছ থেকে যা শুনেছিলাম তা মনে পড়ে গেলো। আল্লাহ তা'আলার সমীপে সেটাই বলে দিলাম।
৯৫. এটা সকলেই জানেন যে, জীবিতদের রূহ মৃতদের রূহের সাথে স্বপ্নযোগে মিলিত হয় এবং তাদের থেকে কিছু কিছু বিষয় জেনে নেয়। এছাড়া অনেক অজানা বিষয়ও রূহেরা জানিয়ে দেয়। সেসব বিষয় জাগ্রত অবস্থায়ও বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়। এরূপ অসংখ্য ঘটনা ঘটতে শুনা যায়।
একজন ঘুমন্ত ব্যক্তির রূহকে স্বপ্নযোগে অনেক নিদর্শন দেখানো হয়, এটা হলো এক রূহের সাথে অন্য রূহের সম্পর্কের প্রতিক্রিয়া। এ প্রসঙ্গে কিছু ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো: আগেকার দিনের জনৈক ব্যক্তি কর্তৃক বর্ণিত: তাঁর এক প্রতিবেশী হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমর (রা)-কে গালিগালাজ করতো। একদিন সে তাঁদেরকে খুব বেশি গালিগালাজ করলো, যার ফলে আমার ও তার মধ্যে হাতাহাতিও হয়ে গেলো। অবশেষে আমি গভীর দুঃখ ও মনোবেদনায় বাড়িতে পৌঁছলাম। আমি ঐদিন মনের দুঃখে খানা পর্যন্ত খেলাম না এবং এই অবস্থায় আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখলাম, আমি তাঁর খিদমতে অভিযোগ পেশ করলাম যে, অমুক ব্যক্তি আপনার সাহাবায়ে কেরামকে গালমন্দ করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কাকে গালমন্ধ করে? তখন আমি বললাম, হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমর (রা)-কে। তখন তিনি আমাকে একটি ছুরি দিলেন। সুতরাং আমি স্বপ্নের মধ্যেই ঐ ব্যক্তিকে জবাই করে দিলাম, আমার হাত রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেলো। আমি ছুরিটি মাটিতে ফেলে দিলাম এবং মাটিতে হাত মুছতে লাগলাম। এমন সময় আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো এবং আমি শুনতে পেলাম ঐ ব্যক্তির ঘর থেকে কান্নার শব্দ আসছে। আমি জানতে চাইলাম, এটা কিসের চিৎকার? লোকেরা বললো, অমুক ব্যক্তি হঠাৎ মারা গেছে। সকাল বেলা আমি গিয়ে দেখলাম তার গলায় জবাই এর চিহ্ন বিদ্যমান। (আল কিরওয়ানীর কিতাবুল বুস্তান)
জনৈক কুরাইশ বংশীয় শাইখ থেকে বর্ণিত: তিনি একবার সিরিয়ায় কোন এক ব্যক্তিকে দেখেছিলেন, যার অর্ধেক চেহারা ছিলো কালো রংয়ের। সেই ব্যক্তি তার চেহারার কালো অংশটুকু ঢেকে রাখতো। তিনি তাকে এর কারণ কি জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিলো, আমি আল্লাহ তা'আলার সাথে অঙ্গীকার করেছি যে, এ সম্পর্কে যে কেই জানতে চাইবে আমি অবশ্যই তাকে তা জানাবো। আমি হযরত আলী (রা)-কে অনেক গালমন্দ দিতাম। এক রাত্রে আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, কোন এক ব্যক্তি এসে আমাকে বললো, তুমিই কি আমাকে গালমন্দ দেও? তখন সে ব্যক্তি আমাকে একটি চড় মারলো। সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে দেখলাম লোকটি যে জায়গায় চড় মেরেছিলো সে স্থানটি কালো হয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত তা কালোই আছে। (কিতাবুল মানামাত)
হযরত সুফিয়া বিনতে শাইবাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো। তিনি একদিন হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা)-এর নিকট উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় তাঁর কাছে একজন মহিলা আসলেন যাঁর একটি হাত ছিলো পট্টি বাঁধা। মহিলাটি বললেন, "এই হাতের ব্যাপারে আমি আপনার নিকট এসেছি।" আমার পিতা ছিলেন একজন দানশীল ব্যক্তি। একবার আমি স্বপ্নে একটি হাউজ দেখলাম। সেখানে লোকের ভিড় ছিলো, তাদের প্রত্যেকের হাতে গ্লাস ছিলো। যে কেউ তাদের কাছে যায়, তাকে তারা পানি পান করায়। আমি সেখানে আমার পিতাকেও দেখলাম। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার আম্মা কোথায়? আমার পিতা বললেন, ঐ যে তোমার আম্মা। আমি দেখলাম আমার মায়ের পরিধানে ছোট একটি কাপড়ের টুকরো আর হাতে এক টুকরো চর্বি। আমার মাকে সারা জীবনে শুধু ঐ ছোট এক টুকরো কাপড় এবং গরুর গোশত থেকে এক টুকরো চর্বি দান করতে দেখেছি। আমি দেখলাম আমার মা সেই চর্বির টুকরো চাটছেন আর পানির পিপাসায় পানি পানি করে চিৎকার করছেন। আমি তখন তাঁকে এক গ্লাস পানি পান করালাম। এর পরপরই আমি শুনতে পেলাম, "একে কে পানি পান করিয়েছে, এর হাত বেকার হয়ে যাক।" একথাগুলো আমি উপর দিক থেকে শুনতে পেলাম। আর ঘুম থেকে জেগে উঠেই দেখি আমার হাত পঙ্গু হয়ে গেছে।
হযরত সায়ীদ ইবনে মুসলিমাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত: হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা)-এর নিকট এক মহিলা উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এসব কথার উপর বাইআত করেছি যে, আমি শিরক, চুরি, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা করা, কারো প্রতি অপবাদ দেয়া এবং প্রভৃতি গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করবো। উক্ত অঙ্গীকারের উপর আমি এখনো টিকে আছি। আমি আশা করি আল্লাহ তা'আলাও তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন, আর আমাকে আযাব থেকে রক্ষা করবেন। তারপর উক্ত মহিলা একবার একজন ফেরেশতাকে স্বপ্নে দেখলেন। ফেরেশতা তাঁকে বললেন, "তুমি তো তোমার সৌন্দর্য প্রদর্শন করো আর তা প্রকাশ করো, আল্লাহর নি'আমতের শুকরিয়া আদায় করো না, প্রতিবেশীকে কষ্ট দাও আর তোমার স্বামীর সাথে অবাধ্য আচরণ করো। তারপর ফেরেশতা তার চেহারার উপর পাঁচটি অঙুলী রেখে বললেন, উক্ত পাঁচটি গুনাহের পরিবর্তে এই পাঁচটি আঙুল রাখলাম যদি তুমি আরো গুনাহ করো তাহলে তোমাকে আরো আঙুলের চাপ দেয়া হবে।" সকাল বেলা মহিলা ঘুম থেকে উঠলে পাঁচটি আঙুলীর চিহ্ন তার চেহারার মধ্যে দেখা গেলো।
আবদুর রহমান ইবনে কাসেম, মালিক নামক জনৈক লোক থেকে শুনেছিলেন যে, ইয়াকূব ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আশাজ একজন সৎলোক ছিলেন। যেদিন তিনি শাহাদাতবরণ করেন ঐদিন রাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখলেন- তিনি যেন জান্নাতে প্রবেশ করছেন, আর তাঁকে সেখানে দুধ পান করানো হচ্ছে। কেউ যেন তাকে বললো, আচ্ছা আপনি বমি করেন তো। তিনি বমি করলেন। এতে দুধই বের হয়ে আসলো। ঐ লোকটি পরের দিন শহীদ হয়ে গেলেন। আবদুর রহমান ইবনে কাসেম বলেন, ঐ লোকটি সামরিক জাহাজে এমন জায়গায় ছিলেন যেখানে দুধ পাওয়া যেতো না। এমনকি দুধ দেয়ার মতো কোন প্রাণীও ছিলো না।
হযরত নাফে (রা) একজন প্রখ্যাত ক্বারী ছিলেন। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন তাঁর মুখ থেকে মেশকের সুগন্ধ বের হতো। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে আপনি কি সুগন্ধি মেখে আসেন? তিনি বললেন, না, আমি সুগন্ধির নিকটেও যাইনি। তবে একদা আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছিলাম, তিনি আমার মুখের কাছে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করছেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত কুরআন তিলাওয়াত করার সময় আমার মুখ থেকে খুশবু বের হয়।
হযরত রাবী ইবনে রাক্কাসী (র) থেকে বর্ণিত: এক সময় তার নিকট দু'জন লোক এসে বসলো এবং জনৈক ব্যক্তির গীবত করতে লাগলো। আমি তাদেরকে থামিয়ে দিলাম। তারপর কিছুদিন পর তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি এসে আমাকে বললো, আমি স্বপ্নে দেখলাম, এক হাবশী আমার নিকট একটি প্লেট নিয়ে এসেছে, যার মধ্যে শুকরের মাংসের একটি বড় টুকরো ছিলো। সে আমাকে বলতে লাগলো, "খাও"। আমি বললাম, আমি কি করে শুকরের মাংস খাবো। সে আমাকে ধমক দিলো। অবশেষে আমি তা খেতে বাধ্য হলাম। তিনি বললেন, সকালে ঘুম থেকে উঠলে আমার মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসতে লাগলো। আর এ দুর্গন্ধ দু'মাস পর্যন্ত ছিলো। (কিতাবুর রুইয়া)
হযরত আলা ইবনে যিয়াদের একটি স্বপ্নের ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো। হযরত আলা ইবনে যিয়াদ একরাত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য উঠতেন। একরাতে তিনি ঘরের লোকদেরকে বললেন, আমি আজ খুবই ক্লান্ত, তোমরা আমাকে তাহাজ্জুদ নামাযের সময়ে জাগিয়ে দিও। কিন্তু তাঁরা কেউ তাঁকে জাগাননি। এই অবস্থায় তিনি স্বপ্নে দেখলেন, কে যেনো তাঁর মাথার চুল ধরে বলছে, “হে আলা! আপনি উঠুন ও আল্লাহকে স্মরণ করুন। তাহলে আল্লাহও আপনাকে স্মরণ করবেন।” ঐ চুলগুলো আলা ইবনে যিয়াদের ইনতেকালের পরও খাড়া ছিলো। হযরত ইয়াহইয়া ইবনে বিসতাম (র) আলা ইবনে যিয়াদের ইনতেকালের পরে তাঁকে গোসল দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, সে সময় পর্যন্ত তাঁর মাথার ঐ চুলগুলো খাড়াই ছিলো।
হযরত মুহাম্মদ ইবনে আলী (র) থেকে বর্ণিত: আমরা একদিন মক্কা শরীফে মসজিদে হারামে বসা ছিলাম। ঐ সময়ে একব্যক্তি দাঁড়িয়ে গেলো। লোকটির মুখের অর্ধেক ছিলো কালো ও বাকী অর্ধেক ছিলো সাদা। সে বললো, “হে লোকসকল! আমার থেকে উপদেশ গ্রহণ করো। আমি শাইখাইন অর্থাৎ হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ও হযরত উমর (রা)-কে গালমন্দ করতাম। একরাত্রে আমি স্বপ্নে দেখলাম, কে যেন এসে আমার গালে চড় মারলো আর আমাকে বললো, হে আল্লাহর শত্রু, হে ফাসিক, তুমি কি ঐ ব্যক্তি নও যে আবূ বকর সিদ্দীক (রা) ও উমর (রা)-কে গালমন্দ করো? ঘুম ভাঙ্গার পর দেখা গেলো, আমার মুখের রং অর্ধেক কালো হয়ে গেছে, যা আজ পর্যন্ত কালোই রয়ে গেছে।
প্রখ্যাত বুযুর্গ হযরত মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ মুহলিবী (র)-এর একটি স্বপ্ন এখানে উল্লেখ করা হলো। তিনি বলেন, আমি একরাত্রে স্বপ্নে দেখলাম, জনৈক ব্যক্তির ঘরের বারান্দায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। সে সময় দেখতে পেলাম, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি টিলার উপর বসে আছেন। আর তাঁর সামনে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) ও হযরত উমর (রা) দাঁড়িয়ে আছেন। হযরত উমর (রা) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, অমুক ব্যক্তি আমাকে ও হযরত আবূ বকর (রা)কে গাল-মন্দ করে। ইরশাদ হলো, লোকটিকে এখানে নিয়ে এসো। তাকে সেখানে নিয়ে আসা হলো, দেখা গেলো, সে আম্মানের একজন অধিবাসী। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) ও হযরত ওমর (রা)-কে গালি দেওয়ার ব্যাপারে সে খুবই পরিচিত ছিল। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, একে এখানে শোয়াও। তাঁরা তাকে শোয়ালেন। হযরত মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (র) বলেন, অবশেষে চিৎকার শুনে আমি জেগে গেলাম। আমি মনে করলাম, তাকে গিয়ে এই স্বপ্নের কথা জানাবো। হয়তো সে তাওবাহ করে নিজেকে সংশোধন করে নেবে। যখন আমি তার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন কান্নার আওয়ায শুনতে পেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কি? লোকজন আমাকে বললো, কাল রাতে কোন ব্যক্তি আম্মানবাসী লোকটিকে তার বিছানায় যবাই করে ফেলেছে। তারপর আমি তার নিকট গিয়ে তার ঘাড়টি প্রত্যক্ষ করলাম। দেখতে পেলাম, তার এক কান থেকে অপর কান পর্যন্ত জমাট রক্ত লেগে আছে।
মসজিদে নববীর এক সময়ের ইমাম হযরত আবুল হাসান মুত্তালেবী (র) থেকে বর্ণিত: একদিন তিনি মদীনা মুনাওয়ারায় একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। জনৈক ব্যক্তি হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমর (রা)-কে গালিগালাজ করতো। একদিন ফজরের নামাযের পর একজন লোক আমাদের কাছে আসলো, তার চোখ দুটি বের হয়ে গালের উপর লটকানো ছিলো। তার থেকে আমরা এর কারণ জানতে চাইলাম। সে বললো, গতরাত্রে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখলাম। হযরত আলী (রা) তাঁর সম্মুখে আছেন আর হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমর (রা)ও সেখানে আছেন। হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমর (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এই ব্যক্তি আমাদেরকে কষ্ট দেয় এবং গাল-মন্দ করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আবুল কায়েস, তোমাকে কে এসব গালি শিখিয়েছে? সে হযরত আলী (রা)-কে দেখিয়ে বললো, উনি। একথা শুনে হযরত আলী (রা) নিজের দু'টি আঙুল দ্বারা আমার চোখের দিকে ইঙ্গিত করলেন এবং বললেন, তুমি যদি মিথ্যা কথা বলে থাকো, তাহলে আল্লাহ তা'আলা যেন তোমার চোখ দু'টি উঠিয়ে দেন। এই অবস্থায় হযরত আলী (রা)-এর আঙুল দুটি আমার চোখে ঢুকে পড়লো। এমন সময় আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। সে সময় আমার চোখ দু'টো বের হয়ে এসে গালের উপর লটকিয়ে গেলো। লোকটি তখন কান্নাকাটি করে আল্লাহর দরবারে তাওবাহ করেছিলো।
জনৈক বিশিষ্ট আলিম কর্তৃক বর্ণিত আরেকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো। তিনি বলেন, তাঁদের নিকট এমন একজন লোক ছিলেন যিনি সবসময় রোযা রাখতেন। কিন্তু বিলম্বে রোযা খুলতেন। একদিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, দু'জন কালো রংয়ের লোক তাঁর হাত ধরে তাঁকে একটি প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। ঐ লোকটি ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমাকে ওখানে নিক্ষেপ করছেন কেন? তাঁরা বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের উল্টো কাজ করো। তিনি তো তাড়াতাড়ি রোযা খোলার আদেশ দিয়েছিলেন কিন্তু তুমি সেই আদেশ অমান্য করে দেরীতে রোযা খোলো। এই ঘটনার পর থেকে লোকটি আগুনের তাপে কালো হয়ে গিয়েছিলো। এই জন্য সে তার মুখমণ্ডল কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতো।
কোন একজন লোক স্বপ্নের মধ্যে ক্ষুধা, পিপাসা ও ব্যথা অনুভব করলো। এই অবস্থায় কেউ যেন তাকে খানা খাওয়ালো, পানি পান করালো ও ঔষধ দিয়ে সাহায্য করলো। ঘুম ভাঙ্গার পর সে দেখতে পেলো তার ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও অসুখ সেরে গেছে। অনেকেই এরূপ ঘটনা স্বপ্নে দেখে থাকেন।
হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত : এক দাসী তাঁকে যাদু করেছিলো। এই অবস্থায় একজন সিন্দীর অধিবাসী তাঁকে বললো, আপনাকে যাদু করা হয়েছে। তিনি বললেন, কে যাদু করেছে? সে বললো, একজন দাসী যার কোলে একটি বাচ্চা ছিলো। আর ঐ বাচ্চাটি তার উপর পেশাব করে দিয়েছিলো। মা আয়িশা (রা) ঐ দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আমাকে যাদু করেছো? সে বললো, হ্যাঁ। তিনি জানতে চাইলেন, কেন? সে উত্তর দিলো, আপনি যাতে বিলম্ব না করে আমাকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করে দেন। তারপর হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা) তাঁর ভাইকে ডেকে এনে যার থেকে সে মুক্ত হতে চায় তার থেকে ঐ দাসীকে মুক্ত করে দেন। তারপর হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা) স্বপ্নে দেখেন যে, কে যেন তাঁকে বলছেন, "তিন কূপের পানি মিশিয়ে ঐ পানি দিয়ে আপনি গোসল করুন।" তিনি তাই করলেন এবং আল্লাহ তা'আলার মেহেরবানীতে যাদুর প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্তি পেলেন।
স্বপ্নযোগে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আ)-এর পবিত্র হাত বুলানীতে এক ব্যক্তির চোখের জ্যোতি ফিরে পাওয়ার একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো। হযরত সাম্মাক ইবনে হারাব (র)-এর চোখের জ্যোতি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। তিনি হযরত ইবরাহীম (আ)-কে স্বপ্নে দেখলেন, তিনি তাঁর চোখের উপর হাত বুলাচ্ছেন আর বলছেন, "ফোরাত নদীতে তিন দিন গোসল করে নাও।" তিনি তাই করলেন এবং তাঁর চোখের স্বাভাবিক জ্যোতি ফিরে পেলেন।
হযরত ইসমাঈল ইবনে বিলাল হাযরামী (র) এক সময় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। স্বপ্নযোগে তাঁকে কোন বুযুর্গ বলে দিয়েছিলেন, ইয়া কারীবু, ইয়া মুজীবু, ইয়া সামীয়াদ্দুআয়ী, ইয়া লাতীফু, বি মাইঁয়াশাউ রুদ্দা আলাইয়া বাসারী। এই দু'আটি পড়ে তুমি তোমার চোখে ফুঁকে দাও। তিনি তাই করলেন এবং আল্লাহর মেহেরবাণীতে চোখের দৃষ্টি ফিরে পেলেন।
হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে আবী জাফর (রা) থেকে বর্ণিত: তিনি একবার ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতে তার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। এই অবস্থায় তিনি আয়াতুল কুরসী পড়ে তাঁর শরীরে ফুঁক দিতেন। একরাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তাঁর সম্মুখে দু'জন লোক দাঁড়িয়ে আছেন এবং একে অপরকে বলছেন, ইনি এমন একটি বরকতময় আয়াত পাঠ করেন যার মধ্যে তিনশ ষাটটি রহমত নিহিত আছে। এই বেচারা কি এতোসব রহমত থেকে একটি রহমতও পাবে না। এরপর তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আর ঐদিন থেকেই তাঁর অসুখ কমতে লাগলো।
জনৈকা নেককার মহিলা পেটের ব্যথায় ভুগছিলেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, কে যেন তাঁকে বলছেন, "আল্লাহ ব্যতীত কোন মা'বুদ নেই, তিনি অভাবমুক্ত। আপনি গোলাপ নির্যাস ব্যবহার করুন।" তিনি তাই করলেন এবং আল্লাহর মেহেরবানীতে তাঁর পেটের ব্যথা সেরে গেলো।
উপরোক্ত নেককার মহিলা এরূপ আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি এক রাতে স্বপ্নে দেখলেন, কে যেন তাকে বলছেন, "সানায়ে মক্কীর পাতা, খাঁটি মধু আর কালো ছোলার পানি হাঁটুর ব্যথাগ্রস্ত রোগীকে ব্যবহার করতে দিন। জনৈক মহিলা আমার নিকট তাঁর হাঁটুর ব্যথার অভিযোগ করলে, আমি তাঁকে আমার স্বপ্নে দেখা ঔষুধ ব্যবহার করতে বললাম। তিনি তাই করলেন। আল্লাহর মেহেরবানীতে তিনি আরোগ্য লাভ করেন।
প্রখ্যাত হাকীম জালীনুস থেকে বর্ণিত, স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে শিঙ্গায় চিকিৎসার নিয়ম-পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়া হয়েছিলো। অল্প বয়সেই তিনি এই সম্পর্কে দু'বার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির কথা জানেন, যিনি তাঁর এই চিকিৎসার দ্বারা পাঁজরের ব্যথা থেকে আরোগ্য লাভ করেছিলেন। আরও অনেকেই ঐ চিকিৎসার দ্বারা উপকৃত হয়েছিলেন।
বিশিষ্ট হাকীম ইবনে খাররায থেকে বর্ণিত: জনৈক ব্যক্তি পেটের অসুখে আক্রান্ত হন এবং তিনি তাঁর চিকিৎসাধীন ছিলেন। রোগীটি তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলেন। আমি তাঁর অবস্থা জানতে চাইলাম, তখন তিনি বললেন, আমি হাকীম জালীনুসকে স্বপ্নে দেখলাম, তাঁকে একজন হাজীর মতো দেখাচ্ছিলো এবং তাঁর হাতে একটি লাঠিও ছিলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি পেটের অসুখে ভুগছো? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি আমাকে বললেন, "গুলকান্দ ও মুসতালিগী ব্যবহার করো।" আমি এই ঔষধ কিছুদিন ব্যবহার করলাম, তাতে আমার রোগ সেরে গেলো। স্বপ্নে এরূপ অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, চিকিৎসা পদ্ধতি দু'ভাবে প্রসার লাভ করেছে। একটি হলো স্বপ্নযোগে, অন্যটি হলো প্রযুক্তি, গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। এছাড়া এমন কিছু চিকিৎসা আছে যা কামিল ব্যক্তিদের অন্তরে আল্লাহ প্রকাশ করে দেন। এই বিষয়ে তথ্য জানতে যাঁরা আগ্রহী তাঁরা তারীখুল আতিব্বা এবং কীরাওয়ানী কর্তৃক লিখিত কিতাবুল বুস্তান পড়ে দেখতে পারেন।
রূহের অস্তিত্ব সম্পর্কে এ গ্রন্থে যেসব আলোচনা করা হয়েছে সে পরিপ্রেক্ষিতে আরও কিছু তথ্য এখানে উল্লেখ করা হলো:
৯৬. পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, "নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে অস্বীকার করেছে, আর তা থেকে অহঙ্কার করেছে, তাদের জন্য আকাশের দরজা খোলা হবে না।" (সূরা আ'রাফ: আয়াত-৪০)
অর্থাৎ মৃত্যুর পর কাফিরদের রূহ উপরে উঠার জন্য আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয় না। এই প্রসঙ্গে কিছু সংখ্যক হাদীস আগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হাদীসে উল্লেখ আছে যে, মৃত্যুর পর মুমিনদের রূহের জন্য আকাশের ফটক খুলে দেয়া হয়। পক্ষান্তরে, কাফিরদের রূহের জন্য আকাশের ফটক খোলা হয় না।
৯৭. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলাল (রা)-কে উদ্দেশ্য করে একবার ইরশাদ করেছেন, "হে বিলাল! বেহেশতে আমার সামনে আমি তোমার পায়ের চলার শব্দ শুনেছিলাম। তুমি এমন কি আমল করো? হযরত বিলাল (রা) আরয করলেন, যখন আমার ওযূ ভেঙ্গে যায় তখনই আমি আবার ওযু করে নেই এবং দু'রাকাত নামায আদায় করি। ইরশাদ হলো, এটা তোমার নামাযের প্রতিদান। আসলে, তিনি হযরত বিলাল (রা)-এর রূহের আওয়ায শুনতে পেয়েছিলেন। তাঁর দেহতো দুনিয়াতেই ছিলো, আর তখন তিনি জীবিতই ছিলেন।
৯৮. মহান সাহাবাগণের বর্ণনা ও হাদীস শরীফ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও তত্ত্ব অনুযায়ী নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলো যে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য এ বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই। এ বিষয়গুলো হলো, কবর যিয়ারত, কবরবাসী যে তাদের সালামকারীদেরকে চিনতে পারে, কবরবাসীদেরকে সম্বোধন করে যে সালাম করা হয় এবং কবরবাসীরা তাদের সালামের জবাব দেয়।
৯৯. অনেক সময় মৃত ব্যক্তির রূহ তাদের আত্মীয়-স্বজন সম্পর্কে অভিযোগ করে থাকেন যে, তাদের খারাপ আমলের দরুন তাদের কষ্ট হয়। সুতরাং জীবিত আত্মীয়-স্বজনের উচিত তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে সেগুলো সংশোধন করা।
১০০. রূহ যদি বিমূর্ত বা জড় পদার্থ হতো, যা দেহের ভেতরের জিনিস নয়, তাহলে আমরা বের হয়ে গেছি, দাঁড়িয়েছি, বসেছি, এসেছি, চলাফেরা করেছি, প্রবেশ করেছি, ফিরে এসেছি ইত্যাদি কথা বলা অবান্তর হতো। কেননা বিমূর্ত বা জড়পদার্থ সম্পর্কে এগুলো নেতিবাচক। অথচ সবারই একথা জানা যে, এসব বিষয় সঠিক ও সত্য।
এই ধরনের প্রমাণ মানুষের বাক্য ও ব্যবহারের উপর নির্ভর করে, যার মধ্যে হাকীকত ও মাজায অর্থাৎ বাস্তব ও রূপক এ দু'টির সম্ভাবনা থাকে। হতে পারে এখানে এটা রূপক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। আমাদের প্রমাণের ভিত্তি, বুদ্ধিবিবেচনা ও প্রবৃত্তির উপর নির্ভরশীল। যখন বলা হয় আসলাম, গেলাম, তখন মূলত রূহের আসা যাওয়াকেই বুঝায়। আর সেটা হয় দেহের অধীন।
১০১. দেহ হলো রূহের বাহন বা মহল। তাই দেহের পরিচর্যা রূহই করে থাকে। কাজেই দেহের আসা যাওয়া এবং স্থানান্তরিত হওয়া এসব রূহের বাহনেরই কাজ। যদি রূহের মধ্যে স্থান পরিবর্তনের ক্ষমতা না থাকতো, তাহলে এটা এমন হতো যেমন কারো সওয়ারী আসা-যাওয়া করে কিন্তু সে নিজে সওয়ার নয়। অথচ এটা একটি ভুল ধারণা। এছাড়া সকলেই জানেন যে, রূহ প্রবেশও করে, বেরও হয়। আর দেহ রূহের অধীন থেকে প্রবেশ করে ও বের হয়ে আসে। মানুষের জ্ঞান চক্ষু রূহকে আসতে ও যেতে দেখতে পায়।
১০২. রূহ যদি বিমূর্ত হতো, তাহলে একই সময়ে একজন মানুষ হাজার হাজার রূহে পরিবর্তিত হতো। আসলে, মানুষ শুধু রূহের কারণে মানুষ, দেহের কারণে নয়। রূহকে এভাবে বিমূর্ত স্বীকার করলে, এই মানুষই অন্য মানুষ হিসেবে গণ্য হতো। মোট কথা, একই মানুষ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারতো। অথচ মানুষ একজনই। যদি রূহ একটি স্বতন্ত্র সত্তা হতো আর দেহের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক না থাকতো, রূহ যদি কোন দেহে অবস্থান করতো, তাহলে এটা সম্ভব হতো। এই অবস্থায় একটি রূহের সম্পর্ক এক দেহ থেকে ছিন্ন হয়ে অন্য দেহে যুক্ত হয়, যেমন কোন একজন প্রশাসক এক এলাকা থেকে বদলী হয়ে অন্য এলাকায় চলে যান, তখন সেখানকার লোকজনের সাথে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দেয়, এই রূহটি কি প্রথম রূহ নাকি দ্বিতীয় রূহ। এই ব্যক্তি কি প্রথম ব্যক্তি নাকি অন্য কেউ। জ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এই ধারণা ভুল ও ভ্রান্ত। রূহ যদি বিমূর্ত হতো বা স্বতন্ত্র জিনিস হতো, তাহলে উক্ত প্রশ্ন দেখা দিতো।
১০৩. মানুষ এটা বিশ্বাস করে যে তার রূহ, জ্ঞান, চিন্তাধারা, ভালোবাসা, শত্রুতা, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি ইত্যাদি মানবিক গুণে ভূষিত। আর এটাও একজন মানুষ জানে যে এসব গুণে গুণান্বিত রূহ বিমূর্ত নয় এবং মৌলিক পদার্থও নয় যা তার দেহ থেকে পৃথক হয়, আর দেহের প্রতিবেশীও নয়। এটাও মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস যে এসব অনুভূতি এমন একটি জিনিসের যা তার দেহের ভেতরে রয়েছে। শ্রবণ করা, দর্শন করা, ঘ্রাণ নেয়া, স্বাদ গ্রহণ করা, বাছাই করা, নড়াচড়া করা বা না করা বা এসবের দ্বারাই রূহ প্রভাবিত ও কার্যকর হয়। কাজেই রূহ কোন মৌলিক বা বিমূর্ত পদার্থ নয়। যেহেতু বিমূর্ত ও মৌলিক পদার্থের দ্বারা এসব কার্যকর হওয়া সম্ভবপর নয়। বরং এমন স্থান গ্রহণকারী পদার্থের দ্বারা সম্ভব যা জগতে বিদ্যমান এবং যা স্থান পরিবর্তন করতে পারে। এই গুণ ঐ দেহের যার মধ্যে রূহ রয়েছে। সেই রূহ বের হয়ে গেলে দেহ প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
১০৪. রূহ যদি কোন মৌলিক স্বতন্ত্র পদার্থ হতো আর দেহের সাথে তার কর্তৃত্বের সম্পর্ক থাকতো যেমন থাকে মাঝির তাঁর নৌকার সাথে, উষ্ট্র চালকের তার উটের সাথে; তাহলে রূহের এক দেহের সাথে সম্পর্ক ছেড়ে দিয়ে অন্য কোন দেহের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব হতো। সেই ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট দেহ থেকে অন্য কোন নির্দিষ্ট দেহে রূহের স্থানান্তর বা গমনের নিয়ম চালু হতো, যেটা মোটেই সম্ভব নয়।
এখন কেউ যদি বলে যে, রূহ ও দেহের মধ্যে ঐক্যের সম্পর্ক রয়েছে অথবা নিজের দেহের সাথে রূহের সহজাত অনুরাগ রয়েছে, অথবা সত্তাগত ভালোবাসা বিরাজমান আছে, তাহলে রূহের অন্য দেহে স্থানান্তরিত হওয়া অসম্ভব। এর উত্তরে বলা যায়, একটি স্থান বিশিষ্ট ও একটি স্থানহীন জিনিসের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন সম্ভব নয়। তবুও যদি রূহ দেহের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে দেহের অবসানের সাথে সাথে রূহও ধ্বংস হয়ে যেতো। এছাড়াও দেহের এবং রূহের ঐক্যের পরে উভয়ের মধ্যে স্থায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠিত হয়, তা ঠিক নয়। আর যদি এরা উভয় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়, তাহলে তৃতীয় আরেকটি সত্তা জন্ম নেবে। এতে দেহ এবং রূহের ঐক্য বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি একটি স্থায়ী হয় আর অপরটি ধ্বংস হয়, তাহলেও এদের মধ্যে কোন ঐক্য থাকতো না। তাই রূহের সাথে দেহের স্বাভাবিক ভালোবাসার সম্পর্ক রয়েছে, যেজন্য রূহ আনন্দ উপভোগ করে। আর দেহ যখন কোন উদ্দেশ্য সাধনে রূহের সমতুল্য হয়, তখন দেহ আর রূহের সম্পর্ক সমান হয়ে যায়। তাহলে এ ধারণা সঠিক নয় যে, বিশেষ রূহ বিশেষ দেহের জন্য আকৃষ্ট। যেমন কোন পিপাসিত ব্যক্তি গ্লাস ভর্তি পানি দেখে যে কোন একটি বেছে নেয়। ঠিক তেমনি ঐ পিপাসার্ত ব্যক্তির কোন নির্দিষ্ট একটি গ্লাসের প্রতি আকর্ষণ থাকতে পারে না।
১০৫. রূহ যদি একটি স্বতন্ত্র মৌলিক পদার্থ হতো, আর বিশ্বজগতের ভেতরে বাহির না হতো বরং মধ্যপন্থী হতো, তাহলে সেটা দুনিয়ার সংশ্লিষ্ট, পৃথক কিংবা নিরপেক্ষ বা পক্ষপাতী হতো না। তাহলে স্পষ্টভাবে জানা যেতো যে, রূহের এই সব গুণের সাথে সম্পর্ক আছে। কেননা মানুষের নিজের রূহ ও তার গুণাবলী সংক্রান্ত জ্ঞান অন্য যে কোন জানা জিনিসের চেয়ে স্পষ্ট ও প্রবল। মানুষের অন্যান্য জানা বিষয় নিজের রূহ সংক্রান্ত জ্ঞানের আওতাধীন। কিন্তু এটা একটি ভ্রান্ত ধারণা। সবাই জানে যে এসব বৈশিষ্ট্যের সাথে রূহের যুক্ত থাকা সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি তার সম্পর্কে এই ধরনের ধ্যান-ধারণা পোষণ করে সে নিজের রূহকে চিনতে পারেনি, আর তার রবের পরিচয়ও লাভ করতে পারেনি।
১০৬. এখানে রূহ ও দেহের সম্পর্কের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। রূহ দেহের মধ্যে অবস্থান করে এবং রূহের যাবতীয় গুণাবলী এই দেহকে কেন্দ্র করেই প্রকাশ পায় ও কার্যকর হয়। দৃশ্যত আমরা আমাদের দেহকে ভিত্তি করে আমাদের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকি। আসলে রূহই হচ্ছে সকল শক্তির আধার। যদিও রূহকে একটি স্বতন্ত্র পদার্থ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না।
১০৭. দেহ একটি দৃশ্যমান বস্তু। রূহের যাবতীয় গুণাবলী ও অনুভূতি এই দেহই ধারণ করে আছে। এই অনুভূতি বা গুণাবলী সাময়িক হোক অথবা স্থায়ী হোক এতে কিছু যায় আসে না। রূহের অনুভূতি ও গুণাবলী রূহেরই অধীন। রূহের ধারক যে জাওহারে মুজাররাদ অর্থাৎ স্বতন্ত্র মৌলিক পদার্থ, এই ধারণা ঠিক নয়।
১০৮. রূহ যদি দেহের সাথে সম্পর্ক বিহীন হয়, আর দেহের অধীনতা থেকে মুক্ত থাকে, তাহলে ঐ ব্যক্তির দেহের কর্মকাণ্ডের সাথে রূহ সম্পৃক্ত হতে পারবে না। কেননা যে জিনিস অধীনতা স্বীকার করে না সেটা সেই শক্তির সাথে সংশ্লিষ্টও হয় না। যদি এটা ঠিক হতো, তাহলে রূহের কর্মকাণ্ড অন্য রকম হতো। আর দেহের সাথে তার কোন সম্পর্ক রাখার প্রয়োজনই হতো না। আসলে রূহের কর্মচাঞ্চল্য ছাড়া দেহ কোন কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারে না। সুতরাং রূহকেই গুরুত্ব প্রদান করতে হবে, দেহকে নয়। রূহ এবং দেহ উভয় মিলেই আমাদের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত করে।
কারো কারো ধারণা এই যে, রূহ মানুষের দেহকে প্রভাবিত না করেই তার যাবতীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে, কিন্তু এরূপ ধারণা ঠিক নয়। আসলে রূহই দেহকে গতিশীল করার ক্ষমতা রাখে। বস্তুত প্রত্যেকটি জিনিস যা দেহের সাথে সংশ্লিষ্ট বা দেহের সাথে যুক্ত আছে, সেগুলো দেহের সাথেই মিশে আছে, সেটাই দেহ।
রূহের সাথে দেহের যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেটা কতোটুকু কার্যকর তা নির্ভর করে দেহের সাথে রূহের সম্পৃক্ততার উপর। রূহ এবং দেহ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। দেহকে ছেড়ে রূহ তার বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রকাশ করতে পারে না। তাই রূহ ও দেহের মধ্যে সমঝোতার ও সংশ্লিষ্টতার সম্পর্ক অপরিহার্য। দেহ এবং রূহ কেউ কারো অধীন নয়। তারা তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তাদের দায়-দায়িত্ব পালন করে থাকে। সুতরাং রূহ এবং দেহ উভয়কে একযোগে কাজ করে যেতে হবে, ভিন্নভাবে নয়।
১০৯. সকল জ্ঞানী ব্যক্তি এ ব্যাপারে একমত যে, মানুষ সচেতন, বাকসম্পন্ন, পানাহারকারী, লালন-পালনযোগ্য, অনুভূতিশীল এবং স্বেচ্ছায় চলাফেরা করতে সমর্থ। এসব গুণ দু'প্রকারের- কতেক দেহ সম্পর্কিত ও কতেক রূহ সম্পর্কিত। রূহ যদি স্বতন্ত্র একটি মৌলিক পদার্থ হয়, যা জগৎ সংসারের ভেতরে নয় বা বাইরেও নয়; বা তাদের সাথে জড়িত বা পৃথকও নয়, তাহলে মানুষও সেই প্রকৃতিরই হতো। জ্ঞানী ব্যক্তিদের দৃষ্টিতে এসব ধারণা সঠিক নয়। তাঁদের দৃষ্টিতে একজন মানুষ রূহ ও দেহ সহকারে জগৎ সংসারে বিদ্যমান আছে। কেউ যদি মনে করে যে, নাফস হলো আদিম, অনাদি ও চিরন্তন, তাহলে সে ধারণা হবে ভুল ও অবান্তর। কেননা এই অবস্থায় একজন মানুষের দেহের অর্ধেক হতো সৃষ্ট ও বাকী অর্ধেক হতো চিরন্তন।
মানুষ কি? মানুষ হলো স্বতন্ত্র মৌলিক পদার্থ। আর সেটাই মানুষের তত্ত্বাবধায়ক শক্তি। তাই জিজ্ঞাসা যে, এই স্বতন্ত্র মৌলিক পদার্থ কি মানুষ নাকি অন্য কিছু, না এটাই মানুষের প্রকৃতস্বরূপ। তবে দু'টোর মধ্যে একটা হতেই হবে। এখানে প্রথমত প্রশ্ন হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে মানুষের নাফসকে গণ্য করা হয়। আসলে, মানুষের হাকীকত বা বাস্তবতা তত্ত্বাবধায়ক নয়। কেননা সমস্ত মানুষের ও সৃষ্টি জগতের তত্ত্বাবধায়ক হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।
যখন কোন জ্ঞানী ব্যক্তিকে কেউ জিজ্ঞেস করে, মানুষ কি? তখন তিনি মানুষের দেহের দিকেই ইঙ্গিত করেন। মানুষের দেহের মধ্যে যে স্বতন্ত্র মৌলিক পদার্থ আছে সে দিকে ইঙ্গিত করেন না। এটা একটি স্পষ্ট বিষয়, যার মধ্যে সন্দেহের বা ভুলভ্রান্তির কোন অবকাশ নেই।
১১০. প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিরা জানেন যে, মানুষকে যখন সম্বোধন করা হয়, তখন মানুষের দেহ ও রূহ উভয়কেই করা হয়। ভালো-মন্দ, শান্তি ও অশান্তি, উৎসাহ প্রদান ও ভয় প্রদর্শনের কেন্দ্রস্থল হলো, এই দেহ ও রূহ। তবে যদি কেউ বলে, এসব বিষয়ের কেন্দ্র হলো স্বতন্ত্র মৌলিক পদার্থ, তাহলে জ্ঞানী ব্যক্তিরা একথা শুনে অবাক হবেন। ঐ ব্যক্তিকে সর্বসম্মতিক্রমে ভ্রান্ত বলে অভিহিত করবেন।
যাঁরা রূহকে দেহ থেকে পৃথক মনে করেন তাঁদের কিছু বক্তব্য ও প্রমাণ এখানে উল্লেখ করা হলো:
প্রথম প্রমাণ- জ্ঞানী ব্যক্তিরা সকলেই দেহ ও রূহ বা নাফস ও দেহ এভাবে উল্লেখ করে থাকেন। এতে বুঝা যায় যে, রূহ হলো দেহ থেকে পৃথক অন্য কিছু। যদি রূহই দেহ হতো তাহলে তাঁদের এরূপ কথার কোন অর্থ হতো না।
দ্বিতীয় প্রমাণ- তাঁদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ এই যে, এমন কোন কিছু কোথাও নেই যা অবিভাজ্য, যেমন বিন্দু বা কোন মৌলিক পদার্থ। কাজেই এটা অত্যাবশ্যক যে, এমন সব জিনিসের জ্ঞানও অবিভাজ্য হওয়ার যোগ্য। তাই জানা গেলো যে, নাফস ও অবিভাজ্য। নাফস যদি দেহ হতো তাহলে এটা দেহের মতো বিভক্তির যোগ্য হতো। আরো বলা যেতে পারে, উলূমে কুল্লিয়া বা সামগ্রিক জ্ঞানের প্রভাব যদি দৈহিক হতো, তাহলে ঐ জ্ঞান বিভক্ত হয়ে যেতো। কোন জিনিসকে যদি ভাগাভাগি করা হয়, তাহলে সেটা তার অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়ে থাকে। তাই জ্ঞানের কোন বিভক্তি সম্ভবপর নয়।
তৃতীয় প্রমাণ- এতে কোন সন্দেহ নেই যে, কাল্পনিক ভাবমূর্তিগুলো স্বতন্ত্র হয়ে থাকে। এই ভাবমূর্তিগুলো সংগ্রহের কারণে অথবা সংগ্রহ করার কারণে তা হয়ে থাকে। কেননা এই ভাবমূর্তিগুলো বিভিন্ন ব্যক্তি থেকে বিভিন্ন পন্থায় একত্রিত করা হয়। অন্য কারণ হলো যৌগিক শক্তি যাকে নাফস বলা হয়।
চতুর্থ প্রমাণ- যৌগিক শক্তি সীমাহীন কার্যাবলীর উপর ক্ষমতাশীল। কেননা এটা সীমাহীন অনুভূতির উপর নির্ভর করে। আর দৈহিক শক্তি সীমাহীন কার্যাবলীর উপর ক্ষমতাশীল নয়। কেননা দৈহিক শক্তি ক্ষেত্র বিশেষে ভাগাভাগি হতে পারে। যে জিনিস কতেক কার্যাবলীর উপর ক্ষমতাশীল হয়, অনিবার্য কারণে তার পরিমাণ কম হতে বাধ্য। অপরপক্ষে যে জিনিস বিভিন্ন কার্যাবলীর উপর ক্ষমতাশীল, অবশ্যই এর শক্তি হবে অধিক। আমাদের দেহের মধ্যে যে শক্তি কাজ করে, সেটা সক্রিয় হতে পারে বা নিষ্ক্রিয় হতে পারে। এটা নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর। দৈহিক শক্তি বা বুদ্ধিদীপ্ত শক্তি দেহের অস্তিত্ব হতে পারে না।
পঞ্চম প্রমাণ- বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি যদি দেহের মধ্যে সক্রিয় হয়, তাহলে তাকে সেই দেহের অনুধাবণকারী হতে হবে, না হয় একেবারেই অনুভূতিহীন হতে হবে। উভয় অভিমতই ভ্রান্ত ও বাতিল। কেননা বুদ্ধিবৃত্তি শক্তির দৈহিক অনুভূতি যদি অবিকল দেহের অস্তিত্ব হয়, তাহলে এটা হবে এক অসম্ভব ব্যাপার। আর যদি এর অস্তিত্বের কোন সমতুল্য ও যুক্তিগ্রাহ্য হয় বা দেহে ক্রিয়াশীল শক্তির ধারক হয়, তাহলে দু'টির অবস্থা একইভাবে একত্রিত হওয়া জরুরী হয়ে পড়ে। তবে এরকম হওয়া মোটেই সম্ভবপর নয়। জানা গেলো, বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি যদি যাবতীয় জ্ঞানের অনুভূতি লাভ করে, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, বুদ্ধিবৃত্তির কাছে নাফস জ্ঞান অর্জন করেছে। কাজেই এই জ্ঞান সদাসর্বদা বিদ্যমান থাকা জরুরী। যদি এতোটুকু জ্ঞান অর্জন যথেষ্ট হয় বা না হয়, তাহলে কোন সময়ই জ্ঞান অর্জিত হবে না। যদি কোন সময় জ্ঞান অর্জিত হয় আর কোন সময় না হয়, তাহলে সেটা হবে একটি অনুষ্ঠান সর্বস্ব ব্যাপার।
ষষ্ঠ প্রমাণ- প্রত্যেক ব্যক্তি তার রূহকে উপলব্ধি করে থাকে। এই অনুভব করার অর্থ হলো রূহের সাথে সংশ্লিষ্ট জিনিসের প্রকৃত রূপ কি তা জানা। এভাবে যখন রূহ সম্পর্কে আমাদের জানা হয়ে যায়, তখন আমাদের দেহ সম্পর্কেও আমরা সঠিক ধারণা করতে পারি। কাজেই প্রথম অবস্থায় প্রমাণিত হলো যে, আমাদের সত্তা আমাদের মধ্যেই রয়েছে। এই অবস্থা তখনই সম্ভব, যখন একটি রূহ তার স্বতন্ত্র সত্তাসহ কোন কিছুকে ধারণ করে মুক্ত হয়। কেননা রূহ যদি বিশেষ কোন স্থানের সাথে যুক্ত হয়, তাহলে রূহ ঐখানেই থেকে যাবে।
সপ্তম প্রমাণ- হযরত আবুল বারাকাত বাগদাদী (র)-এর অভিমত এই যে, পদ্মফুল ভর্তি সমুদ্র, ইয়াকৃতের পাহাড় এবং বহু সংখ্যক সূর্য ও চাঁদের কল্পনা করা সম্ভবপর। এই সব জিনিসের কাল্পনিক আকৃতি অস্তিত্বহীন নয়। কেননা কল্পনা শক্তির মাধ্যমেই এই সব জিনিসের আকৃতি আমরা দেখতে পাই, যদিও এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এসব কল্পনা সময় সময় এমন বাস্তব ও জীবন্ত রূপ ধারণ করে যে, যেন সেগুলো আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়ে যায়। এসব কল্পনার বস্তু একেবারেই অস্তিত্বহীন হলে এমনটি হতো না। প্রকৃতপক্ষে, এসব কল্পনার কোন অস্তিত্ব নেই। তবে মনের দিক দিয়ে এদের অস্তিত্ব আছে। এখন প্রশ্ন এই যে, এসব কল্পনার ক্ষেত্র হবে দেহ কিম্বা দেহের অভ্যন্তর। অন্যথায় কোনটাই হবেনা। এই দু'টোর কোনটাই গ্রহণযোগ্য নয়। সমুদ্র ও পাহাড়ের আকৃতি অনেক বড়, আর মানুষের অন্তর ও মেধাশক্তি সে তুলনায় ক্ষুদ্র। কোন বৃহৎ কাল্পনিক জিনিস দেহের মধ্যে ধারণ করা সম্ভবপর নয়। তাই জানা গেলো যে, এসব কাল্পনিক ছবির ক্ষেত্র দেহ নয়, দৈহিকও নয়।
অষ্টম প্রমাণ- যদি বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি দৈহিক হতো, তাহলে একজন লোক বার্ধক্যজনিত কারণে দুর্বল হয়ে যেতো, যদিও তা হচ্ছে না।
নবম প্রমাণ- বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য দেহের মুখাপেক্ষী নয়। যে জিনিস দেহের উপর নির্ভরশীল নয় সেসব তার দেহ থেকে নিরপেক্ষ হওয়া জরুরী। দেহ থেকে বুদ্ধিবৃত্তি মুক্তি লাভের কারণ এই যে, সে নিজেই নিজেকে উপলব্ধি করতে পারে। আর বুদ্ধিবৃত্তি ও নাফসের মধ্যে কোন প্রকার মাধ্যম থাকার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা এই মাধ্যম ছাড়াই রূহ সক্রিয় এবং সবকিছু উপলব্ধি করতে পারে। উপরন্তু, দেহের বাহন হলো বুদ্ধিবৃত্তি। এছাড়া বুদ্ধিমত্তা ও দেহের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা পঞ্চইন্দ্রিয় বলতে, দর্শন ও শ্রবণশক্তি, ধ্যান-ধারণা ও অনুমান শক্তিকে বুঝায়। যেহেতু এগুলো দৈহিক এজন্য এদের সত্তা অনুধাবন করা তাদের উপরই নির্ভর করে। যদি বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি দৈহিক হতো তাহলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সকল কাজ কঠিন হতো। আর এসব কাজের উৎপত্তিস্থল হলো নাফস। নাফস যদি তার অস্তিত্বের জন্য দেহের সাথে সংশ্লিষ্ট হতো, তাহলে ঐসব কার্য দেহের অংশ গ্রহণ ছাড়া সম্পন্ন হতো না। কিন্তু এরূপ হতে দেখা যায় না। জানা গেল বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি দেহের মুখাপেক্ষী নয়।
দশম প্রমাণ- দৈহিক শক্তি অধিক পরিশ্রমের ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এই দুর্বলতার দরুন কোন কঠিন কাজ সে সমাধা করতে পারে না। এর কারণ সুস্পষ্ট। অধিক পরিশ্রমের কারণে দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপাদান নিঃশেষ হয়ে যায়, যে জন্য এগুলোতে দুর্বলতা দেখা দেয়। পক্ষান্তরে, অধিক পরিশ্রমের দরুন বুদ্ধিমত্তার কোন প্রকার দুর্বলতা আসে না। কাজেই জানা গেলো, এটা দৈহিক শক্তি নয়।
একাদশ প্রমাণ- একথা সর্বজনবিদিত, কালো রং হলো সাদা রংয়ের বিপরীত। উভয়ের স্বরূপও আমাদের জানা আছে। উল্লেখ্য যে, কালো ও সাদা রংয়ের সংমিশ্রণ, উষ্ণতা ও শীতলতার সংমিশ্রণ অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু এরূপ সংমিশ্রণ বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে অসম্ভব কিছু নয়। যেহেতু এটা দৈহিক শক্তি নয়।
দ্বাদশ প্রমাণ- যদি অনুধাবনের ক্ষেত্র দেহ হতো, তাহলে দেহের কোন কোন অংশের ব্যাপারে সে অজ্ঞ থাকতো এবং কোন কোন অংশের ব্যাপারে জ্ঞাত থাকতো। তাহলে মানুষের একই সময় জ্ঞানী হওয়া, অজ্ঞ থাকা অনিবার্য হতো, অথচ এটা সম্ভবপর নয়।
ত্রয়োদশ প্রমাণ- যখন কোন দৈহিক উপাদানের মধ্যে বিশেষ ধরনের নকশা বা আকৃতি গড়ে উঠে, তখন ঐ নকশা বিদ্যমান থাকার কারণে অন্য কোন নকশা সৃষ্টি হতে পারে না। তবে জ্ঞানগত নকশা হলো এর বিপরীত। রূহ যখন যাবতীয় জ্ঞান ও অনুভূতি থেকে শূন্য হয়, তখন এর পক্ষে কোন বিদ্যাচর্চা করা কঠিন হয়। তারপর যখন রূহ কিছু শিখে নেয় তখন ঐ জ্ঞান অন্যান্য জ্ঞানের জন্য সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই জানা গেলো, দৈহিক নকশা হলো নমুনার বিপরীত ও উল্টো, আর মানসিক নকশা হলো নমুনার সহায়ক ও সহযোগিতাকারী।
চতুর্দশ প্রমাণ- কোন রূহ যদি দেহ হতো, তাহলে কারো পা নাড়ানোর ইচ্ছা বা পা নাড়ানোর মাঝে কিছু না কিছু সময়ের ব্যবধান হতো। নাফসই দেহের সঞ্চালন শক্তি এবং তাকে গতিশীল করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। দেহ যদি পায়ের সঞ্চালনকারী শক্তি হতো, তাহলে ঐ সঞ্চালনের মধ্যে দেহ সক্রিয় থাকতো, অথবা ঐ শক্তি অন্য কোথাও থেকে আসতো। সেই ক্ষেত্রে ঐ সঞ্চালন শক্তির জন্য সময়ের প্রয়োজন। তাই জানা গেলো, পায়ের নড়াচড়ার শক্তি অন্য কোথাও থেকে এসেছিলো।
পঞ্চদশ প্রমাণ- নাফস যদি দেহ হতো, তাহলে তা খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার যোগ্য হতো। সেই অবস্থায় মানুষ কতেক অঙ্গের অনুধাবন করতো আর কতেক অঙ্গের অনুধাবন করতে পারতো না, কিন্তু এটা সম্ভবপর নয়।
ষোড়শ প্রমাণ- রূহ যদি দেহ হতো তাহলে দেহের মধ্যে এর প্রবেশের কারণে দেহের ওযন বেড়ে যেতো। কারণ একটি শূন্য দেহের বৈশিষ্ট্য হলো, যখন তার মধ্যে কোন জিনিস প্রবেশ করে, তখন তার ওযন বেড়ে যায়। একটি খালি মশকের ওযন হালকা হয়, আর যখন এর মধ্যে পানি ভরা হয়, তখন এর ওযন ভারী হয়ে যায়। কিন্তু রূহের ব্যাপার এর বিপরীত। যখন একজন মানুষের রূহ তার দেহে বিদ্যমান থাকে তখন তা হালকা হয়। রূহ যখন বের হয়ে যায় তখন দেহের ওযন বেড়ে যায়।
সপ্তদশ প্রমাণ- রূহ যদি দেহবিশিষ্ট হতো তাহলে এটাও অন্যান্য জড় পদার্থের ন্যায় দৈহিক গুণে গুণান্বিত হতো। তাই রূহ দেহধারী নয়।
অষ্টাদশ প্রমাণ- রূহ যদি দেহবিশিষ্ট হতো তাহলে যাবতীয় অনুভূতি শক্তির কোন একটির দ্বারা প্রভাবিত হতো। এটা দৃষ্ট হয় যে, কোন কোন দেহকে সকল ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে চিনতে হতো। আবার কোন কোন দেহকে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে চিনতে পারা যায়। অথচ রূহকে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা চিনতে পারা যায়না। এটা হলো ঐ প্রমাণ যেটা দার্শনিক জাহাম যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে অস্বীকার করেছিলো তার সম্মুখে উপস্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলাকে অস্বীকারকারী ঐ ব্যক্তি বলেছিলো, "আল্লাহ যদি সত্যি বিদ্যমান থাকতেন, তাহলে কোন না কোন ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে তাঁর পরিচয় লাভ করা যেতো।" সে প্রসঙ্গে দার্শনিক জাহাম রূহের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর তখনই সঠিক হতে পারে, যখন রূহ দেহ বিশিষ্ট না হয়। অন্যথায় রূহের পরিচয় কোন না কোন ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে লাভ করা যেতো।
উনিশতম প্রমাণ- রূহ যদি দেহ বিশিষ্ট হতো, তাহলে তার মধ্যে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা বিদ্যমান থাকতো, যেগুলো জড় পদার্থে বা তার অন্য কোন আধারের মধ্যে থাকে। একটি রূহের উপাদান বা আধার যদি অন্য রূহ হয়, তাহলে রূহের আকৃতি বিশিষ্ট হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে একজন মানুষকে দু'জন মানুষ হিসেবে গণ্য করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে যেটা মোটেই সম্ভবপর নয়।
বিশতম প্রমাণ- কোন একটি বস্তুর বৈশিষ্ট্য হলো এটাকে বিভক্ত হয়ে যায়। দেহের একটি ক্ষুদ্র অংশ বৃহৎ অংশের মতো নয়। রূহ যদি বিভক্ত করা যায় আর তার প্রত্যেক অংশই যদি রূহ হয়, তাহলে একজন মানুষের একাধিক রূহ থাকা জরুরী হয়ে পড়ে। এখন প্রশ্ন এই যে, মানুষের প্রত্যেক অংশ যদি রূহ না হয় তাহলে গোটা মানুষটিও রূহ বলে গণ্য হবে না। যেমন পানির একটি ফোঁটা যদি পানি না হয়, তাহলে এর সমষ্টিও পানি হবে না।
একুশতম প্রমাণ- যে কোন দেহ নিজের হিফাযত ও স্থায়িত্বের জন্য রূহের উপর নির্ভরশীল। তাই রূহ দেহ থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার পর দেহ বিলীন হয়ে যায়। একটি রূহ যদি দেহ বিশিষ্ট হয়, তাহলে সেই রূহ অন্য রূহের মুখাপেক্ষী হতো। এর দ্বারা, 'তাসালসুল' অর্থাৎ বিবর্তন বা সীমাহীন ক্রমবিকাশ আবশ্যক হয়ে পড়ে, যা একটা অসম্ভব ব্যাপার।
বাইশতম প্রমাণ- রূহ যদি দেহ বিশিষ্ট হয়, আর ঐ দেহের সঙ্গে সম্পর্ক যদি অনুপ্রবেশজনিত হয়, তাহলে রূহের দেহে অনুপ্রবেশ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। এছাড়া রূহের দেহে অনুপ্রবেশ যদি প্রতিবেশীসুলভ হয়, তাহলে একই ব্যক্তিকে দু'টি দেহের অধিকারী হতে হয়। সেই ক্ষেত্রে একটি দেহ দৃষ্টিগোচর হবে, অন্যটি হবে না।
গ্রন্থকারের মতে উপরে বর্ণিত সকল যুক্তি ও প্রমাণ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাই এসব ভ্রান্ত ধারণা ও প্রশ্নের সঠিক উত্তর নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রথম প্রমাণের খণ্ডন হলো এই যে, প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিরা রূহ ও দেহ, নাফস ও দেহ এ শব্দগুলোকে পৃথক পৃথকভাবে ব্যবহার করে থাকেন। দার্শনিক ও ন্যায়শাস্ত্রবিদগণের মতে দেহের সাধারণ অর্থ আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থের চেয়ে ব্যাপক। কেননা, দার্শনিকের দৃষ্টিতে দেহ ঐ জিনিসকে বলা হয়, যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা আছে, সেটা হালকা হোক বা ভারী হোক, দৃষ্টিগোচর হোক বা না হোক। যেমন- বায়ু, আগুন, পানি, ধোঁয়া, বাষ্প, নক্ষত্র ইত্যাদি। কিন্তু আরবি অভিধানে এসবের কোনটাকেই বস্তু বলে স্বীকার করা হয় না। আরবি অভিধানে ও সাহিত্যে অনুসন্ধান করলে জিসিমের বা বস্তুর এই অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভাষাবিদ জাওহারী বলেন, আবু যায়েদের বক্তব্যে জিসিমকে দেহ বলা হয়েছে। এছাড়া জিসিমকে জুসমান ও জাসমানও বলা হয়। আরবি সাহিত্যিক আসমায়ী বলেন, জিসম- জাসমান, জাসাদ এবং জুসমান কোন ব্যক্তিকে বুঝায়। জাসীম, জাসমানের অর্থ মহান। যদি নাফসকে জিসম বলা হয়, তবে সেটা দার্শনিক পরিভাষায় বলা যেতে পারে, অভিধান অনুযায়ী নয়। এখানে রূহকে জিসম বলার উদ্দেশ্য হলো, আমরা রূহের জন্য ঐসবগুণ, কার্যাবলী ও নির্দেশাবলী প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেগুলো শরীআত, বুদ্ধিমত্তা ও ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভরশীল। যেমন- নড়াচড়া করা, স্থান পরিবর্তন করা, চড়া, অবতরণ করা, নিআমত ও আনন্দ উপভোগ করা, আযাব ও কষ্টে পতিত হওয়া, বন্দী হওয়া, মুক্ত হওয়া, কবয করা, প্রবেশ করা, বের হওয়া, মোটকথা এই সব বিষয়কে প্রমাণ করার জন্য রূহকে জিসম বলা হয়। তবে কোন আভিধানিক রূহকে জিসম হিসেবে অভিহিত করেননি। কাজেই এই বাতিল ফিরকার সঙ্গে রূহ ও জিসমের পার্থক্য হবে অর্থগতভাবে, শব্দগতভাবে নয়। তাই প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিরা এই অর্থে রূহকেও জিসম বা দেহ বলে থাকেন।
দ্বিতীয় প্রমাণ খণ্ডন- এই প্রমাণটি সম্পর্কে বিরুদ্ধবাদীরা খুবই সোচ্চার ও গর্বিত। এটি চারটি উপাদানের উপর প্রতিষ্ঠিত। (ক) সৃষ্টির মধ্যে এমন কিছু জিনিসও আছে, যাকে বিভক্ত করা যায় না। (খ) এগুলো এমন জিনিস যে সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা যায়। (গ) জ্ঞান হলো অবিভাজ্য। (ঘ) জ্ঞানের আধারও অভিবাজ্য। রূহ যদি দেহ বিশিষ্ট হতো তাহলে সেটা ভাগাভাগি করা যেতো, অথচ অবস্থা সে রকম নয়। অধিকাংশ বিজ্ঞজন প্রথম যুক্তিকে স্বীকার করেন না এবং বলে থাকেন এটা একটি অযৌক্তিক বক্তব্য ছাড়া আর কিছু নয়, যার কোন বাস্তবতা নেই। উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়েছে, আল্লাহ যে ওয়াজিবুল অজুদ অর্থাৎ যাঁর সত্তা বিদ্যমান থাকা অপরিহার্য, এই যুক্তিটি ভ্রান্ত ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা রবের স্বরূপ ও গুণাবলীকে স্বীকার করে না। কিন্তু তাদের এই বিশ্বাস শরীআত, যুক্তি ও ইজমার পরিপন্থী। বিরুদ্ধবাদীরা আল্লাহ তা'আলার কুদরত ও ইচ্ছাকে, তাঁর ইলম ও অনুধাবনের ক্ষমতাকে, তাঁর শ্রবণ ও দর্শনের শক্তিকে এবং তাঁর সৃষ্টির উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করে। তারা এটাও অস্বীকার করে যে, আল্লাহ তা'আলা ছয়দিনে আকাশ ও যমীন তৈরি করেছেন, আর এর নাম রাখা হয়েছে তাওহীদ বা একত্ব। অথচ তাদের এই ভ্রান্ত যুক্তি হলো যাবতীয় প্রতিবন্ধকতার মূল। এছাড়া বিন্দুর উদাহরণ দিয়ে তাদের যুক্তিকেই তারা খণ্ডন করেছে। কেননা, বিন্দু হলো অবিভাজ্য। অথচ সেটা বিভাজ্য দেহে প্রবেশ করে আছে। তাই দেখা গেলো বিভাজ্য জিনিস অবিভাজ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। প্রত্যেক মৌলিক পদার্থের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য যুক্তিবাদীরাও এ মূলনীতিকে স্বীকার করে না। তাঁদের মতে মৌলিক পদার্থ দেহের ভেতরে প্রবেশ করে আছে। এমনকি যে কোন দেহ মৌলিক পদার্থের দ্বারা গঠিত। এখানেও বিভাজ্যের মধ্যে অবিভাজ্য যুক্ত হয়ে আছে। মৌলিক পদার্থকে অস্বীকার না করলে এর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। যদি বলা হয়, বিন্দু সরল রেখার সমাপ্তি ও বিলীন হওয়াকে এবং এর অস্তিত্বহীনতাকে বলা হয়, তাহলে এটা হবে একটি অস্তিত্বহীন বিষয়। কাজেই এই প্রমাণও বাতিল বলে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে, যদি সেটা কোন অস্তিত্ব সম্পন্ন জিনিস হয়, তাহলে সেটা হবে অবিভাজ্যের মধ্যে বিভাজ্যের অনুপ্রবেশ। মোটকথা উভয় অবস্থায় তাদের যুক্তি প্রমাণ বাতিল। এছাড়া যুক্তিবাদীদের মতে ইলম নিজ আধারে প্রবেশ করে আছে, কেননা নিজের শ্রেণী বা প্রকার অনুযায়ী কার্যকর হয়।
প্রত্যেক জিনিস তার আধারের আনুপাতিকভাবে প্রবেশ করে। যেমন- ঘরে জীবজন্তুর প্রবেশ করা এক ধরনের প্রবেশ, বহিরাগত জিনিসের পরমূর্ত দেহের মধ্যে প্রবেশ করা দ্বিতীয় প্রকারের প্রবেশ, পুস্তক বা মসৃণ কিছুর ভেতরে রেখার প্রবেশ তৃতীয় প্রকারের প্রবেশ, তিলের মধ্যে তৈলের প্রবেশ চতুর্থ প্রকারের প্রবেশ, বিমূর্ত বা বহিরাগত জিনিসের দেহের মধ্যে প্রবেশ করা পঞ্চম প্রকারের প্রবেশ, রূহের দেহের মধ্যে প্রবেশ করা ষষ্ঠ প্রকারের প্রবেশ, আর ইলম ও মা'রেফাত রূহের মধ্যে প্রবেশ করা সপ্তম প্রকারের প্রবেশ। এছাড়া ওয়াজিবুল ওজুদ অর্থাৎ আল্লাহর অনিবার্য অস্তিত্বের একত্ব যদি অবিভাজ্য মৌলিক পদার্থ হয়, তাহলে জাওহারে ফর্দ বা মৌলিক পদার্থ বলে তা প্রমাণিত হয়। এর দ্বারা জানা গেলো যে, এটাকে জাওহারে ফর্দ বা মৌলিক পদার্থ হিসেবে স্বীকার করা যায় না। যদি আল্লাহ একটি বহিরাগত পদার্থ হন, তাহলে তার জন্য একটি আধার অপরিহার্য। যদি কোন আধারকে বিভক্ত করা হয়, তাহলে অবিভক্তের অস্তিত্ব বিভক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর সেটিই মৌলিক পদার্থ। তাই বিরুদ্ধবাদীদের অভিমত প্রত্যাখ্যাত হলো।
এই প্রসঙ্গে আরো বলা হয় যে, অনিবার্য সত্তা তথা স্রষ্টার একত্ব একটি অস্তিত্বহীন জিনিস। বাইরে এর কোন অস্তিত্ব নেই। তাহলে যার দ্বারা অবিভাজ্যের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত করা হয়, সেটাতো সবই অস্তিত্বহীন, বাইরে এর কোন অস্তিত্ব নেই। তাই অনিবার্য সত্তা আল্লাহ তা'আলা যে এক ও অদ্বিতীয় তা প্রমাণিত হলো।
যদি বলা হয়, কোন জিনিসের সঙ্গে অন্য কোন জিনিসের যে সম্বন্ধ সেটা বহিরাগত বা অবিভাজ্য জিনিস হতে পারে, যেমন- কোন জিনিসের উপরে হওয়া, নিচে হওয়া, মালিক হওয়া, অধীন হওয়া ইত্যাদি বুঝায়। যদি কোন আধারের বিভক্তির দরুন প্রবেশকারীর বিভক্তি অত্যাবশ্যক হয়, তাহলে তাদের সম্পর্কের বিভক্তিও প্রয়োজন হয়। যেমন, উঁচু-নিচু হওয়ার জন্য চতুর্থাংশ, অষ্টমাংশ ইত্যাদি হওয়া জরুরী হয়ে পড়ে। কিন্তু, যুক্তি, বুদ্ধি-বিবেচনার পরিপ্রেক্ষিতে এটা মোটেই সম্ভব নয়।
প্রখ্যাত দার্শনিক ইবনে সীনার দৃষ্টিতে কুওয়তে ওহাহমিয়া ও কুওয়তে ফিকরিয়া অর্থাৎ ধারণা শক্তি ও চিন্তা শক্তি হলো দৈহিক। তাহলে তাদের বিভক্তির প্রয়োজন হয়, যদিও এটা সম্ভব নয়। এসবের বিভক্তি যদি সম্ভব হয়, তাহলে প্রত্যেকটি ধারণা শক্তি ও চিন্তা শক্তির অংশ সমান হওয়া জরুরী হয়ে পড়ে। আর যদি তা না হয় তাহলে ঐ অংশ সমান হয় না। অমুককে বন্ধু, অমুককে শত্রু মনে করা ছাড়া এরূপ ধারণা করার কোন সার্থকতা নেই। কেননা এটাকে বিভক্ত করা যায় না।
কোন একটি জিনিসের অস্তিত্ব ছাড়া অন্য কোন গুণ থাকতে পারে। যদি কোন আধারের বিভক্তির দরুন কোন বস্তুর বিভক্তির প্রয়োজন হয়, তাহলে ঐ মূল বস্তুর বিভক্তিরও প্রয়োজন হবে। কেউ যদি কোন বস্তুকে সে বস্তুর অতিরিক্ত একটি বস্তু বলে মনে করে, তাহলে তার সেই অভিমতের কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকে না।
কোন একটি সংখ্যার গুণাবলী বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন, 'দশ' সংখ্যাটি দশ এর একটি অর্থজ্ঞাপক সংখ্যা। কোন একটি সংখ্যার বিভক্তির দরুন সেটা বিভক্ত হয়ে যায়। দশ সংখ্যাটির দশ হওয়ার বিষয়টি বিভাজ্য নয়। তবে এরূপ বিভাজ্য সম্ভব নয়। অবশ্য সংখ্যাটি বিভাজ্য। সুতরাং একটি অবিভাজ্য সংখ্যা অন্য কোন বিভাজ্য সংখ্যার সাথে যুক্ত হয়ে আছে।
কোন জিনিসের বিশেষ অবস্থা বা আকৃতি দার্শনিকদের কাছে একটি আরায বা পরমূর্ত বস্তু। যেমন- গোল আকৃতি ও বিবিধ ধরনের নকশা। যদি এসব বস্তু আরায বা বিমূর্ত হয়, তাহলে সেটা সে সবের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে অথবা প্রত্যেক বস্তুর অংশের সাথে যুক্ত থাকবে। তবে সেটা কোন অবস্থায় সম্ভবপর নয়। অপরদিকে কোন বস্তুর বিভক্তির দরুন সেই বস্তুর আরায বা বিমূর্তও বিভক্ত হয়ে যাবে। তবে যে কোন একটি রেখার প্রত্যেক অংশের বিমূর্ত বস্তুর সাথে সম্পর্ক রয়েছে, এটাও সম্ভব নয়। কোন রেখার যদি কোন অংশ গোল আকৃতির না হয়, তাহলে সব অংশ একত্রিত হওয়ার সময় যদি কোন অতিরিক্ত কারণ দেখা দেয়, তবে সে বস্তুটির আকৃতি গোল হবে না। আর যদি অতিরিক্ত কোন কারণ দেখা দেয় আর সেটা বিভক্তি যোগ্য হয়, তাহলে তা বিভক্ত হতে পারে, অন্যথায় কোন প্রবিষ্ট বস্তু অবিভক্ত হতে বাধ্য। তাহলে ঐ বস্তুর প্রবেশস্থল বা আধার হবে বিভক্ত। ভিন্ন মতাদর্শের মূলনীতি অনুযায়ী এটা অত্যাবশ্যক নয়। বলা যেতে পারে কোন প্রবিষ্ট বস্তু তার প্রবেশস্থলের বিভক্তির দরুন স্বাভাবিকভাবেই বিভক্ত হয়ে যাবে। একটি বিমূর্ত বস্তুর অবস্থা তার ঠিক বিপরীত যা কোন মহল বা স্থানের সাথে যুক্ত হয়ে থাকে, যেমন- সাদা বা কালো রং ইত্যাদি। যে বস্তু অবিভাজ্য সেটা লাভ করার শর্ত হলো, তার সব অংশ একত্রিত হয়ে যাওয়া। কারণ, কোন বিষয় শর্ত সাপেক্ষ হলে, সে শর্ত পূরণ না হলে তা কার্যকর হয় না।
যে কোন বস্তু সত্তাবিশিষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। তবে কোন বিষয় সম্ভব হওয়া একটি অস্থায়ী গুণ যা এর স্বভাব ধর্ম থেকে পৃথক। এ গুণটি যদি কোন আধারের বিভক্তির দরুন বিভক্ত না হয়, তাহলে এর দ্বারা কোন কিছু প্রমাণিত হয় না। আর যদি সে বস্তুটি বিভক্ত হয়, তাহলে তার যে কোন অংশ সমষ্টির সমতুল্য হলে ধারাবাহিকতার ও ক্রমবিকাশের জটিলতা দেখা দেয়। এছাড়া এটাও জরুরী নয় যে, কোন কিছুর অস্তিত্ব বা অস্তিত্বহীনতার সম্ভাবনাকে গ্রহণ করতে হবে। আর এই যে গ্রহণ করা এটা ঐ বস্তুর স্বকীয় প্রয়োজনীয়তারই একটি অংশবিশেষ, এটা ঐ বস্তুর কোন সাময়িক গুণ নয়। কিন্তু একজন মানুষের মন-মানসিকতা এ গ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাহ্য করে। কাজেই ঐ বস্তুর স্বভাব ধর্মের সাথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া মানসিক শূন্যতার পরিচায়ক। এখন বাকী রইলো অংশ ও মূল্যের অংশীদারিত্বের প্রশ্ন। এই বিষয়ে কোন বাধা নেই, যেমন- যাবতীয় স্বভাব ধর্মী বস্তুর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। বাইরের পরিচিতি আর বাস্তবতায় যে কোন বস্তুর অংশ তাঁর সমষ্টির সমতুল্য হয়ে থাকে, যেমন- পানি, মাটি, বায়ু ইত্যাদি। কোন কিছুর অংশ ও সমষ্টির পরিমাণ কমবেশি হলেও বাস্তবতার ক্ষেত্রে তা গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া কোন রূহের মধ্যে ইলম অনুপ্রবেশ করে না। আসলে জ্ঞান ও জ্ঞানীর মধ্যে এক ধরনের সম্বন্ধ বিদ্যমান থাকে মাত্র। মানুষ যখন কোন কিছু দেখে, তখন দেখার জন্য চোখের মধ্যে কোন প্রতিচ্ছবির ছাপ পড়ে না। ঐ প্রতিচ্ছবি হলো ঐ সম্বন্ধ যা দর্শন শক্তি ও দর্শনকারীর মধ্যে যুক্ত হয়। তবে এখানে যেসব সন্দেহের অবতারণা করা হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা অবিভক্ত কোন কিছুর মধ্যে বিভক্তি সম্ভবপর নয়।
তৃতীয় প্রমাণ খণ্ডন: বিরুদ্ধবাদীদের দাবী অনুযায়ী জ্ঞানের আধার যদি দেহ বা দৈহিক হয়, তাহলে জ্ঞান ও বিভক্ত হয়ে যাবে। কেননা বিভক্তজনিত দেহে অনুপবেশকারী বস্তুর বিভক্ত হওয়া অপরিহার্য। অবশ্য তাঁরা এর কোন প্রমাণ পেশ করেননি, কেবল কিছু বক্তব্য পেশ করেছেন। এই দাবীটি এমন যে, এর প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে। কোন জিনিসের জ্ঞান লাভের অর্থ হলো, জ্ঞাত জিনিসের স্বভাব ধর্মের সমান যে ছবি জ্ঞানলাভকারীর মনে বিদ্যমান থাকে, তা। এই অভিমত যে গ্রহণযোগ্য নয়, সেসব প্রমাণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
যখন কোন একটি দৃশ্যমান জিনিসের ছবি নাফসের সত্তার সাথে যুক্ত হয়, তখন সেটি হবে আংশিক অনুপ্রবেশ। এই আংশিক অনুপ্রবেশ তার আনুসঙ্গিক বিষয়ের সাথে যখন যুক্ত হয়, তখন সেটা হবে সমষ্টির সাথে যুক্ত হওয়ার পরিপন্থী।
এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য যে, যদি বলা হয় নাফসের সামগ্রিক প্রবেশের অর্থ হলো যখন তার থেকে উপসর্গগুলো পৃথক করা হয়, আর সেটাকে সত্তা হিসেবে মনে করা হয়। সেক্ষেত্রে এটা বৈধ হলে সেটা বৈধ হবে না কেন? সেক্ষেত্রে বলা হবে, এরূপ অবস্থা একটি নির্দিষ্ট উপাদানে সামগ্রিকভাবে প্রবিষ্ট হয়ে আছে। কিন্তু যখন সেটাকে তার থেকে পৃথক করে নেয়া হয়, তখন সেটাকে পৃথক সত্তা হিসেবেই মেনে নেয়া হয়। এভাবেই একটি অনির্দিষ্ট আধার অপর একটি অনির্দিষ্ট আধারের মুখাপেক্ষী। ঠিক একইভাবে, একটি অনির্দিষ্ট আধার অপর একটি অনির্দিষ্ট আধারের সাথে সহবস্থান করে। এটা একটি যুক্তিসঙ্গত বিষয় বটে। তাই জানা গেলো, এই সন্দেহটি অধিক ভ্রান্ত। মানুষ যে এই বিষয়ে সামগ্রিক নীতি আবিষ্কার করে নিয়েছে তা তাদের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা তারা এমন কিছু নীতি গ্রহণ করেছে, যার অস্তিত্ব বাইরের জগতে বিদ্যমান নেই। অথচ তারা এগুলোকে বিদ্যমান বস্তু হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। এছাড়া ঐগুলোকে বিদ্যমান বস্তুর জন্য মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করেছে। কেউ যদি কোন বস্তুর নির্দিষ্ট কোন অংশকে গ্রহণ করে তাহলে তার আধারও আংশিক হবে। কাজেই সমষ্টির মুকাবিলায় সমষ্টি, আর আংশিকের মুকাবিলায় আংশিক হবে। প্রকৃতপক্ষে, একজন মানুষ তার চিন্তাধারায় কোন সার্বিক নীতিতে স্থিত থাকেনা। শুধু কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ছবি থাকে, যা পৃথক পৃথক ব্যক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে এটাকে কেউ সামগ্রিক অবস্থা জ্ঞান করলে আর কোন বিতর্কের অবকাশ থাকে না। নাফসের এই যে অবস্থা, এটা সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে হতে পারে, বা আংশিক দৃষ্টিকোণ থেকেও হতে পারে।
চতুর্থ প্রমাণ খণ্ডন: সূরতে আকলিয়া তথা বুদ্ধিবৃত্তি ও ভাবমূর্তি সীমাহীন কার্যকলাপ চালানোর ক্ষমতা যোগায়। তবে এখানে এমন কোন দৈহিক শক্তি নেই যা সীমাহীন কার্যকলাপের ক্ষমতা রাখে। এর উত্তর হলো, বুদ্ধিবৃত্তি ও ভাবমূত্তি সীমাহীন কার্যকলাপের ক্ষমতা যোগায়। তবে এ বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।
একথা যদি বলা হয়, বুদ্ধিবৃত্তি ও ভাবমূর্তি সীমাহীন অনুভূতির ক্ষমতা যোগায়, আর এই অনুভূতি বা উপলব্ধিও এক ধরনের কর্মকাণ্ড। তাহলে বলা হবে, এই দু'টি যুক্তিও অসার ও অচল। কেননা একজন মানুষের অনুভূতি বা উপলব্ধির ক্ষমতা যতোই থাকুক না কেন, তা সীমাবদ্ধ। প্রতিটি মনের যদি হাজার হাজার উপলব্ধি বা অনুভূতির ক্ষমতাও থাকে তবু সেটা সীমাবদ্ধ। সুতরাং অনুভূতি বা জ্ঞানের একটা না একটা সীমা থাকেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, “প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির উপরেও একজন জ্ঞানী ব্যক্তি রয়েছেন।" এভাবে জ্ঞানের শেষ সীমা গিয়ে পৌঁছে সর্বজ্ঞ আল্লাহ তা'আলা পর্যন্ত। আল্লাহর সমকক্ষ কেউ নেই এবং তাঁর সমান জ্ঞানও কারো নেই।
এখন যদি বলা হয় যে, বুদ্ধিবৃত্তি শক্তির অনুভূতি ও উপলব্ধি যদি সীমাবদ্ধই হয়, তাহলে কোন বস্তুর বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনিবার্য হয়ে পড়ে। তাহলে বলা হবে, এই বক্তব্য যদি হুবহু সত্য হয় তবে প্রমাণিত হবে যে, দৈহিক শক্তি সীমাহীন কাজের ক্ষমতা রাখে। আর এভাবেই উল্লেখিত সন্দেহ ভঞ্জন হয়। আরো উল্লেখ্য যে, সীমাহীন কল্পনা শক্তি, চিন্তা শক্তি ও স্মৃতি শক্তি মানুষের মনে সৃষ্টি হয়, এগুলো বিরুদ্ধবাদীদের মতো দৈহিক শক্তি মাত্র। তবুও যদি বলা হয়, কল্পনা শক্তি, চিন্তা শক্তি ও স্মৃতি শক্তি সীমাহীন ক্ষমতা যোগায় না, তাহলে বলা হবে, বিরুদ্ধবাদীরা এভাবেই বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি সম্পর্কে এইরূপ ভুল ধারণা পোষণ করে।
দ্বিতীয় যুক্তিটি অর্থাৎ উপলব্ধি ও অনুভূতিকে কোন কাজ হিসেবে গণ্য করা একটি ভুল ধারণা। কারণ এটা আসলে কোন কাজ নয়। তাই কোন কাজের সীমাবদ্ধতার জন্য অনুভূতির সীমাবদ্ধতা জরুরী নয়। বুদ্ধিবৃত্তি কোন জ্ঞাত বিষয়ের ভাবমূর্তি ধারণ করলেও এতে কোন কাজ হয় না। যদি বলা হয়, একই জিনিস ধারক ও বাহক হয় না, তাহলে দেহের পক্ষে সীমাহীন কাজ করা সম্ভব নয়। তবে দেহের পক্ষে সমূহ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা সম্ভব।
এই বক্তব্যের উপর যুক্তির আলোকে একথা মেনে নেয়া যায়, মানবাত্মা তার সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পরিপূর্ণতা ও শক্তিলাভ করে। কাজেই দেহধারী হওয়া সত্ত্বেও সীমাহীন কাজের ক্ষমতা রাখে। এ কথা মেনে নেয়া বুদ্ধিবৃত্তির দাবী ও রাসূলদের দাবী মেনে নেয়ার সমার্থক এবং এটা মেনে নিলেই খাঁটি মুসলমানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া যায় এবং বাতিলপন্থীদের থেকে দূরে ও নিরাপদ থাকা যায়।
পঞ্চম প্রমাণ খণ্ডন: বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি যদি একটি দৈহিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করে, তাহলে ঐ দেহ কাঠামোকে কোন কোন সময় উপলব্ধি করবে, আর কোন কোন সময় উপলব্ধি করবে না। এরূপ যুক্তির মূলে রয়েছে একটি ভ্রান্ত ধারণা যেটা কেবল হৃদয়েই উপলব্ধি করা যায়, কোন বস্তুর ভাবমূর্তির কল্পনা করা যায় না। সেই ক্ষেত্রে ঐ ভাবমূর্তি অর্জিত হওয়ার উপরই কোন কিছু উপলব্ধি করা নির্ভর করে। আর একথা মেনে নিলে বলতে হয় যে, ঐ ভাবমূর্তির হৃদয়পটে উদ্ভাসিত হওয়ার নামই উপলব্ধি। কিন্তু এ কথা কোন সুস্থ বুদ্ধিমানসম্পন্ন লোক স্বীকার করবেন না। কাজেই একথা বলায় ক্ষতি নেই যে, কুওয়াতে আকলিয়া বা বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি একটি নির্দিষ্ট দেহে প্রবিষ্ট ও ক্রিয়াশীল। বাকশক্তি কখনো কখনো একটা আপেক্ষিক অবস্থার অধিকারী হয়ে থাকে, যাকে বোধ শক্তি বা উপলব্ধি শক্তি বলা হয়। এই বোধশক্তি যখন অর্জিত হয়, তখন বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি সেই দেহ কাঠামোকে কোন সময় উপলব্ধি করে আর কোন সময় উপলব্ধি করে না। এই অবস্থা যখন সম্ভব হয়, তখন ঐ সন্দেহ বা সংশয় আর থাকে না।
আমরা যখন কোন কিছু উপলব্ধি করি, তখন আমাদের বোধশক্তিতে যে প্রতিচ্ছবি বা ভাবমূর্তি দৃষ্ট হয়, তখন ঐ উপলব্ধিকৃত বস্তুটি হয়তো সর্বতোভাবে সমকক্ষ বা সমতুল্য কোনটাই হবে না। প্রথমোক্ত অভিমতটি কোন সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি গ্রহণ করতে পারে না, যেহেতু এটি একটি মারাত্মক ভুল ও ভ্রান্ত ধারণা। এখন এটা যখন জানা গেলো, তখন কোন বস্তুর সবদিক দিয়ে সমান হওয়া মোটেই জরুরী নয়। সে অবস্থায় হৃদয়ে বা মস্তিষ্কে একটি ভিন্ন প্রতিচ্ছবি উপস্থিত হওয়ার একই রকম দু'টো জিনিসের এক হওয়া অনিবার্য হয় না।
সুতরাং বোধশক্তি হৃদয় ও মস্তিষ্কের সারবস্তুতে প্রবিষ্ট ও ক্রিয়াশীল, আর নবাগত ছবিটি বোধশক্তির মধ্যে প্রবিষ্ট ও ক্রিয়াশীল। কাজেই দু'টি ছবির একটি বোধশক্তির আধার ও অন্যটি আধার নয়। তাছাড়া আমরা যখন দূর থেকে তাকাই, তখন দর্শনার্থীর চোখে দর্শিত বস্তুর ছবি অঙ্কিত হওয়ার উপর কি দর্শন নির্ভরশীল? যদি নির্ভরশীল হয়, তবে এই রকম দু'টো জিনিস একই সময় একই স্থানে একত্রিত হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে। কেননা মানুষের দৃষ্টি শক্তি, দৈহিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃত। সুতরাং তা এমন একটি আধারে বিদ্যমান, যার আকার ও আয়তন আছে। কাজেই তাতে যখন দৃশ্যমান বস্তুর আকৃতি প্রতিভাত হয়, তখন একই সমান দু'টি বস্তুর একত্র সমাবেশ অনিবার্য হয়ে উঠে। আর এটা যদি ঐখানে দেখা সম্ভব হয়, তাহলে এখানে সম্ভব হবে না কেন? যদি কোন বস্তুর উপলব্ধি সেই বস্তুর প্রতিচ্ছবির উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে একথা বলার কোনই অবকাশ নেই যে, মন ও মগজের দ্বারা কোন বস্তুকে উপলব্ধি করা সেই বস্তুর বোধশক্তির উপর নির্ভর করে।
একথাও বলা হয়ে থাকে যে, বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি যদি দেহের ভেতরে অবস্থিত ও ক্রিয়াশীল হতো, তাহলে তা প্রতি মুহূর্তে সেই দেহকে অনুভব ও উপলদ্ধি করতো। কিন্তু আমরা আমাদের মন ও মস্তিষ্ককে প্রতি মুহূর্তে অনুভব ও উপলব্ধি করি না। অবশ্য প্রতি মুহূর্তে মন ও মস্তিষ্ককে উপলব্ধি করা অনিবার্য তখনই হতো, যখন তা মন ও মস্তিষ্কে অবস্থিত থাকতো। তবে বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি একটি বিশেষ দেহে অবস্থিত অর্থাৎ হৃদয়ে, যা দেহেরই সদৃশ। একথা মেনে নিলে বুদ্ধিবৃত্তির উপস্থিতি সর্বক্ষণ উপলব্ধি করা অনিবার্য হয় না। মানুষ এটা জানে যে, হৃদয়ও একটি বিশেষ ধরনের দেহ এবং শুধুমাত্র ভুলে থাকার সময়টুকু ছাড়া এ জ্ঞান তার মধ্যে সর্বদা বিরাজমান। তাই উক্ত আপত্তি খণ্ডিত হলো।
ষষ্ঠ প্রমাণ খণ্ডন: বলা হয় যে, প্রত্যেক মানুষ নিজের অস্তিত্ব উপলব্ধি করে থাকে। জ্ঞাত বা পরিচিত জিনিসের নিগূঢ় রহস্য নামই উপলব্ধি। এটা তখনই সম্ভব যখন কারো হৃদয় কোন আবাসস্থল বা আধারের উপর নির্ভরশীল থাকে না।
এর জবাব এই যে, এ বিষয়টা একটি প্রাচীন মূলনীতির ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সেই মূলনীতি এই যে, পরিচয় লাভকারীর মনে পরিচিত বস্তুর সমান একটা ছবি প্রতিভাত হওয়াকে ইলম বা জ্ঞান বলা হয়। জ্ঞান সংক্রান্ত আলোচনায় বলা হয়েছে যে, সেই সংজ্ঞা একাধিক কারণে ভুল। এমনকি যদি সংজ্ঞাটি সঠিক হিসেবে মেনে নেয়া হয়, তাহলেও উল্লিখিত ছবিটি প্রতিভাত হওয়া জ্ঞানার্জনের শর্ত, তবে সেটাই জ্ঞান নয়।
আরো উল্লেখ্য যে, ভাষাগত জটিলতা এবং যুক্তি হিসেবে অচল হওয়া ছাড়াও, এ সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে খণ্ডিত। কেননা আমরা যখন একটি পাথর বা কাঠ হাতে নেই, তখন বলি যে, এটি একটি স্বনির্ভর ও স্বতন্ত্র পদার্থ। অনুরূপভাবে উক্ত বস্তুর নিকটে যে জিনিস উপস্থিত, তাও তদ্রূপ। সুতরাং সকল জড় পদার্থ তাদের সত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
এ কথাও বলা হয় যে, সকল প্রাণী নিজ নিজ সত্তা সম্পর্কে সচেতন। এখন কোন জিনিসের তার নিজের সম্পর্কে সচেতন হওয়ার অর্থ এই হয় যে, তাকে জড় পদার্থ হতেই হবে, তাহলে সকল প্রাণীকে জড় পদার্থ হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে, অথচ কোন সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ একথা বলতে পারে না।
সপ্তম প্রমাণ খণ্ডন: বলা হয়ে থাকে, অনেকে পদ্মফুল ভর্তি সমুদ্র এবং ইয়াকুত ভর্তি পাহাড় কল্পনা করতে পারেন, এটা হলো আবুল বারাকাত বাগদাদীর অভিমত, যদিও এটি একটি বাতিল বক্তব্য। উল্লেখিত কাল্পনিক বিষয়গুলোকে বাস্তবে বিদ্যমান ধরে নিয়েই এবং এগুলোকে বাকশক্তি সম্পন্ন প্রাণী অর্থাৎ মানুষের যে কোন অস্তিত্বই নেই তা সর্বজনবিদিত। এটা শুধু মনের আকাশ-কুসুম কল্পনা মাত্র। আপেক্ষিক অস্তিত্বহীনতার মধ্যে কোন পার্থক্য নির্ণয় করা আপত্তিকর কিছু নয়, যেমন শ্রবণশক্তিহীনতা, দৃষ্টিশক্তিহীনতা ও ঘ্রাণশক্তিহীনতা প্রভৃতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা যায়। কিন্তু এই পার্থক্য নির্ণয়ের দ্বারা এসব অস্তিত্বহীন জিনিসের অস্তিত্ব মেনে নেয়া অনিবার্য হয়না, এমনকি সেসব রকমারি অসম্ভব জিনিসের মধ্যেও পার্থক্য নির্ণয় করা চলে, যার অস্তিত্ব একেবারই দুর্লভ।
যেসব জিনিস সর্বতোভাবে আকার ও আয়তনহীন, সেসব জিনিসের ভেতরেও যখন আকৃতি ও পরিমাণের অবস্থান বোধগম্য, তখন ক্ষুদ্রাকৃতির দেহের মধ্যে বিপুল পরিমাণের ও বিরাট আকৃতির জ্ঞানের অবস্থান বোধগম্য নয় কি? অনুরূপ, সর্বতোভাবে সামঞ্জস্যহীন হওয়া সত্ত্বেও যখন জড় পদার্থের মধ্যে ছবি ও আকৃতির অবস্থান বাধাগ্রস্ত হয় না, তখন ছোট জিনিসের সাথে বড় জিনিসের সামঞ্জস্যহীনতা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র আধারে বৃহৎ ছবির অবস্থান যে বাধাগ্রস্ত হবে না, সেটা খুবই স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য যে, পূর্ববর্তী মনীষীদের অনেকে নিরেট পদার্থের মধ্যে অবস্থানকারী ছবির স্বাভাবিক চাপ পড়া অসম্ভব বলে উল্লেখ করেছেন এবং তার স্বপক্ষে কিছু যুক্তিও তারা উপস্থাপন করেছেন।
অষ্টম প্রমাণ খণ্ডন: আরো বলা হয়েছে যে, বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি যদি দৈহিক বিষয় হতো, তাহলে বার্ধক্যে তা দুর্বল হতো। কিন্তু আসলে তা হয় না, এর জবাব কয়েকভাবে দেয়া যায়।
প্রথমত একথা বলা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত যে, বুদ্ধিবৃত্তি শক্তির পরিপূর্ণতার জন্য যেটুকু দৈহিক সুস্থতার প্রয়োজন, তার পরিমাণ নির্দিষ্ট। বুদ্ধিবৃত্তি শক্তির পূর্ণতার জন্য দৈহিক সুস্থতার কোন প্রয়োজন নেই। সুতরাং প্রয়োজনীয় দৈহিক সুস্থতা বার্ধক্যের শেষ অবধি অবশিষ্ট থাকতে পারে। কাজেই বুদ্ধিবৃত্তিরও শেষ অবধি টিকে থাকা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত হয়তো একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি সুস্থাবস্থায় বুদ্ধিবৃত্তি শক্তির উপলব্ধি অব্যাহত ও অটুট রাখতে সক্ষম এবং তার বিবেক হয়তো এমন কয়েকটি অঙ্গের সাথে টিকে থাকে, যার কাছে জরাগ্রস্ততা বিলম্বে আসে। এই অবস্থা যখন এসে যায়, তখন তার বুদ্ধি ও উপলব্ধি শক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
তৃতীয়ত কিছু কিছু শক্তির সাথে কারো কারো স্বভাব অধিকতর সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া বিচিত্র নয়। হয়তো তাই একজন বৃদ্ধ ব্যক্তির অবস্থা বুদ্ধিবৃত্তি শক্তির সাথে অধিকতর সঙ্গতিপূর্ণ। কেননা সেই অবস্থায়ও তার বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি অটুট থাকে।
চতুর্থত একজন মানুষের দেহ যখন সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে, তখন তার সকল বুদ্ধিবৃত্তি শক্তিও অটুট থাকে। তবে বার্ধক্যবশত এগুলো দুর্বল হয়ে যায়।
পঞ্চমত একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি অনেক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অধিকারী হয়। এতে তার চিন্তাশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়, ফলে তার দৈহিক শক্তির ক্ষয়ক্ষতি পূরণ হয়। ষষ্ঠত কাজের আধিক্যহেতু মেধা ও দক্ষতা বাড়ে। এই বৃদ্ধি শারীরিক বৈকল্যজনিত ক্ষতি পূরণে সহায়ক হয়।
সপ্তমত সহীহ হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আদম সন্তান যতো বৃদ্ধ হয়, ততোই তার ভেতরে লোভ-লালসা বৃদ্ধি পায়।" এর বাস্তবতা এ হাদীসের যথার্থতা প্রমাণ করে। অথচ দৈহিক শক্তিও কল্পনা শক্তির অন্তর্ভুক্ত। দেহের দুর্বলতা, লোভ ও উচ্চাভিলাষকে শক্তিহীন করে না। সুতরাং জানা গেলো যে, দেহের বৈকল্য ও দুর্বলতা হেতু দৈহিক শক্তিগুলোকে দুর্বল হতেই হবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
অষ্টমত আমরা বিপুল সংখ্যক বৃদ্ধ লোকের মধ্যে বুদ্ধির বৈকল্য ও দুর্বলতার প্রাধান্য দেখতে পাই। সত্যি বলতে গেলে অধিকাংশ বৃদ্ধ লোকের অবস্থাই এরূপ। মহান আল্লাহর নিম্নোক্ত উক্তিও এর সত্যতা প্রমাণ ও সমর্থন করে। "তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে, যাকে জীবনের নিকৃষ্টতম স্তরে নিক্ষেপ করা হয়, ফলে সে জানা জিনিসও জানে না।" (সূরা নাহল: আয়াত-৭০)
সুতরাং কোন একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি যখন বার্ধক্যের সর্বশেষ সীমায় পৌঁছে, তখন সে শিশুর মতো বা তার চেয়েও অসহায় অবস্থার শিকার হয়। বার্ধক্যের এই অবস্থা যার জীবনে আসেনা, সে এই পরিস্থিতির শিকার হয় না।
নবমত শরীর ও মনের সবলতা এবং শরীর ও মনের দুর্বলতা একে অপরের জন্য অপরিহার্য। শারীরিকভাবে সবল হয়েও মানসিকভাবে দুর্বল ও ভীরু কাপুরুষ হওয়ার বহু দৃষ্টান্ত আছে। আবার শারীরিকভাবে হীনবল হওয়া সত্ত্বেও মানসিক তেজস্বিতা ও দীপ্ততার কারণে অনেকে বীরপুরুষ বা দুঃসাহসী হতে পারে।
দশমত উপরোক্ত যুক্তি যদি মেনে নেয়া হয়, তাহলেও এটা প্রমাণিত হয় না যে, আত্মা একটি নিরেট জড় পদার্থ। জগতের অভ্যন্তরেও নয়, বাইরেও নয়। তা দেহের ভেতরেও নয়, বাইরেও নয়। কেননা রূহ বা আত্মা যখন এমন স্বচ্ছ উজ্জ্বল ও ঐশী দেহযুক্ত হবে যা পার্থিব দেহের বিপরীত, তখন কোন দেহে তার অবস্থান ও স্থানান্তর ঘটে না যেমনটি ঘটে পার্থিব দেহের ক্ষেত্রে। কাজেই মানুষের দেহের অবস্থানও স্থানান্তর দ্বারা আত্মার জন্যও তা অপরিহার্য হয় না।
নবম প্রমাণ খণ্ডন: বলা হয়েছে যে, বুদ্ধিবৃত্তি শক্তি তার তৎপরতা চালাতে দেহের উপর নির্ভরশীল নয়, আর যে জিনিস স্বীয় তৎপরতার জন্য দেহের উপর নির্ভরশীল হয় না, সে তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বের ব্যাপারে বা অন্য কোন ব্যাপারেও তার উপর নির্ভরশীল নয়। এর জবাব এই যে, কোন একটি শারীরিক শক্তি সম্পর্কে কোন বিধি-বিধান কার্যকর হলে, অনুরূপ বিধি-বিধান সকল শারীরিক শক্তির ক্ষেত্রে কার্যকরী হতে হবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এরূপ কোন দাবী করা অযৌক্তিক দাবী করারই শামিল।
এখানে আরো একটা কথা উল্লেখযোগ্য, কোন কিছুর ছবি এবং উপসর্গ একটা আধার বা অবস্থান স্থলের মুখাপেক্ষী। কিন্তু এই নিয়ম-শৃঙ্খলার সাথে ঐ আধারের মুখাপেক্ষিতা বা নির্ভরশীলতা শুধুমাত্র তাদের স্বতন্ত্র সত্তার জন্যই। ঐসব ছবি ও উপসর্গের সংশ্লিষ্টতার জন্য ঐগুলোর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব কোন আধারের মুখাপেক্ষী যে থাকবে না, এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। সুতরাং মোদ্দা কথা এই যে, কোন জিনিস যদি কোন নিয়ম-শৃঙ্খলার সাথে এককভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে, সে জন্য তার আধারের মুখাপেক্ষিতা বা নির্ভরশীলতা বিলুপ্ত হয় না।
দশম প্রমাণ খণ্ডন: এটা বলা হয়ে থাকে যে, অতিরিক্ত কাজের দরুন দেহ ক্লান্ত, শ্রান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে। দেহ দুর্বল হয়ে পড়ার পর আর কাউকে সে শক্তি যোগাতে পারে না। এর জবাব এই যে, সে চিন্তা ও কল্পনাশক্তি একটা দৈহিক শক্তি বিশেষ। এরূপ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিস কল্পনা করার পাশাপাশি বড় বড় জিনিসও কল্পনা করা যায়। সূর্য ও চন্দ্রকে কল্পনা করার পাশাপাশি একই সময় একজন লোক একটা ক্ষুদ্র অগ্নিশিখাকেও কল্পনা করতে পারে।
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ক্ষুদ্র জিনিস দেখতে পায় না। ঠিক তেমনি কোন একজন উঁচু মানের বুদ্ধি-বিবেচনা সম্পন্ন ব্যক্তি দুর্বল বোধগম্য বস্তু বুঝতে সমর্থ হয় না। কোন একজন লোক আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা ও প্রভু, মহান আল্লাহর নাম ও গুণ নিয়ে ধ্যানে মগ্ন, এরূপ ব্যক্তি একই সঙ্গে জাওহারে ফর্দ অর্থাৎ মৌলিক পদার্থ ও তার প্রকৃতস্বরূপ উদ্ঘাটনের বিষয়ে চিন্তা করতে পারে না।
একাদশ প্রমাণ খণ্ডন: বলা হয় যে, কালো সাদার বিপরীত। তখন চিত্তপটে সাদা ও কালো উভয়ের প্রকৃত রূপ একসাথে ভেসে উঠে। অথচ কোন দেহে এই দু'টো জিনিসের একত্র সমাবেশ সম্ভব নয়।
এর জবাব এই যে, এর ভিত্তি হলো এই ধারণা, যে ব্যক্তি কোন জিনিসের অনুভূতি লাভ করে তার সত্তায় উক্ত অনুভূতি জিনিসটির সমান একটা ছবির ছাপ পড়ে। কিন্তু তার এই ধারণা ভুল। যদি আয়নায় ছবির ছাপ পড়ার যুক্তি দেয়া হয়, তবে সে যুক্তিও ধোপে টিকবে না। কেননা আয়নায় কোন ছবির ছাপ মোটেই পড়ে না। এটাই অধিকাংশ দার্শনিক ও পণ্ডিত ব্যক্তির বক্তব্য। ছাপ পড়ার যুক্তি যে বাতিল, তার বহু কারণ রয়েছে। এখানে আরও বলা যেতে পারে যে, সাদা ও কালোকে উপলব্ধি করার সময় চিত্তপটে যে জিনিসটির ছাপ পড়ে, তা আসলে সাদা ও কালো নয় বরং সেটা তার নমুনা ও রূপরেখা। তাহলে এসব জিনিসের নমুনা দেহে সংগৃহীত হতে পারবে না কেন?
দ্বাদশ প্রমাণ খণ্ডন: বলা হয়েছে যে, সকল অনুভূতি ও উপলব্ধির আধার বা কর্মক্ষেত্র যদি দেহ হয়, আর দেহ যে বিভাজ্য, তাতো সবারই জানা। তাহলে এটা বিচিত্র নয় যে, দেহের কোন অংশে কোন বিষয়ের জ্ঞান নিহিত থাকবে এবং অপর অংশে থাকবে অজ্ঞতা। এভাবে একই সময় একজন মানুষ একটি জিনিস সম্পর্কে অবহিত থাকবে আবার অনবহিতও থাকবে।
এর জবাব এই যে, এই যুক্তি ভ্রান্ত। কেননা কাম ও ক্রোধ এইগুলো দৈহিক অবস্থা। এগুলোর আধার বিভাজ্য। এমতাবস্থায় কাম ও ক্রোধ শরীরের একাংশে এবং এগুলোর উল্টো জিনিস অপরাংশে থাকা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এরূপ ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির একই সময়ে কোন একটি জিনিসের প্রতি ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুক এবং কোন একজনের প্রতি ক্রুদ্ধ ও সন্তুষ্ট অনিবার্য হয়ে পড়ে।
ত্রয়োদশ প্রমাণ খণ্ডন: বলা হয় যে, কোন দেহ বিশিষ্ট পদার্থে যদি বিতর্কিত ছবি থাকে, তবে তাতে তার অনুরূপ জিনিস অঙ্কিত থাকতে পারে না। অথচ মানুষের হৃদয়ে তা থাকতে পারে।
এর জবাব এই যে, এতে একটা অসম্পূর্ণ ও অযৌক্তিক কিয়াস বা তুলনা নিহিত এবং এর দ্বারা কোন নিশ্চিত তথ্য জানাতো দূরের কথা, কোন ধারণাও জন্মে না। কোন কিছুর বুদ্ধিবৃত্তি ছবি হচ্ছে এর জ্ঞান ও উপলব্ধি, পক্ষান্তরে, কোন দৈহিক ছবি নিছক ছবি ও রেখাচিত্র ছাড়া আর কিছু নয়। আর একথা সন্দেহাতীত যে, জ্ঞান ও বিদ্যা তার রকমারি তত্ত্ব ও তথ্য সহকারে ছবি ও রেখাচিত্রের বিপরীত। আর কোন বিশেষ ধরনের মাহিয়াত বা নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে কোন বিশেষ নিয়মবিধি কার্যকর হলেই যে তা বিপরীত ধরনের হবে এমন কোন কথা নেই।
চতুর্দশ প্রমাণ খণ্ডন: রূহ যদি দেহ তথা একটি জড় পদার্থ হতো, তাহলে কোন ব্যক্তি কর্তৃক পা সঞ্চালনের ইচ্ছা করা ও সঞ্চালন করার মাঝখানে কিছু সময় লাগতো।
এর জবাব এই যে, দেহের সাথে রূহের অবস্থানকালে রূহ তিনটি অবস্থার যে কোন এক অবস্থার সম্মুখীন না হয়ে পারে না। হয় রূহ পোশাকের মতো গোটা শরীরকে ঢেকে রাখবে, না হয় তা শরীরের কোন অংশে অবস্থান করবে, নতুবা সমগ্র দেহে সঞ্চলিত হবে। এ তিন অবস্থার যেটাই ঘটুক না কেন, সে শরীরের যেটুকু নাড়াতে চায় বা যে তৎপরতা চালাতে চায়, তা তার ইচ্ছাক্রমেই চালায়, এর মাঝখানে সময়ের কোন ব্যবধান হয় না, যেমন চোখ, কান, নাক ও জিহ্বার কাজ। আর যখন কোন অঙ্গ কেটে দেয়া হয়, তখন রূহের যেটুকু ঐ অঙ্গের ভেতরে বিরাজ করছিলো, তা বিচ্ছিন্ন হয় না, তা বাহির থেকে তাকে আটকিয়ে রাখা হোক বা ভেতর থেকে আটকিয়ে রাখা হোক। বরং রূহ সেই সময়ে অনুভূতিহীন অঙ্গটিকে ছেড়ে চলে যায় এবং তা থেকে সময়ের কোন ব্যবধান ছাড়াই নিজেকে গুটিয়ে নেয়। রূহের এই অঙ্গটিকে ছেড়ে যাওয়া ঠিক একটি পাত্রে পানি রাখলে তা থেকে যেমন বাতাস সরে যায়, ঠিক সে রকম। তবে যদি রূহ শরীরের একাংশে অবস্থান করে তাহলে কর্তন করা অঙ্গ থেকে তার বিচ্ছিন্ন হওয়া জরুরী হয় না। আর যদি সে বাহির থেকে দেহকে জড়িয়ে থাকে, তাহলে অঙ্গ সঞ্চালনের কাজটি হবে লোহার ভেতরে চুম্বকের প্রতিক্রিয়ার মতো, যদিও সে লোহাকে স্পর্শ করে না। এখানে বলা যেতে পারে যে, কেউ কোন অসংলগ্ন কথাবার্তা বললে সেটা হবে সময় নষ্ট মাত্র, যেটার দায়িত্ব তাদের উপরই বর্তাবে। কারণ তাদের মতে নাফস বা রূহ দেহের সাথে সংযুক্ত নয়, বা বিচ্ছিন্নও নয়। শরীরের মধ্যে তা প্রবিষ্টও নয়, শরীর থেকে বাইরেও নয়। সুতরাং ভিন্ন মতাবলম্বীদেরকে অর্থহীন ও অসংলগ্ন কথা বলার কারণে অভিযুক্ত করা যেতে পারে।
পঞ্চদশ প্রমাণ খণ্ডন: বলা হয়, রূহ যদি দেহ হতো তা বিভাজ্য হতো এবং মানুষের পক্ষে তার কিছু অংশ জানা ও কিছু অংশ না জানার অবকাশ থাকতো। মানুষ তার নিজের সম্পর্কেই খানিকটা জানতে পারতো।
এর জবাব এই যে, এই আপত্তির উল্লেখিত অংশ দু’টো গ্রহণযোগ্য নয়। রূহ দেহ হলে তার একাংশ জ্ঞাত ও অপরাংশ অজ্ঞাত থাকার অবকাশ থাকতো। কেননা রূহ একটা একক ও অবিভাজ্য সত্তা। তাকে জানলে বা অনুভব করলে পুরোটাই জানা ও অনুভব করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
এটাও স্বীকার করা যায় না যে, মানুষ তার নিজের সম্পর্কে খানিকটা জানবে আর খানিকটা জানবে না। এ সম্পর্কে কোন প্রমাণই দেয়া হয়নি। অবশ্য এটা সবাই জানে যে, মানুষ তার নিজের সম্পর্কে কিছু কিছু জানে, তবে সবটা নয়। অবশ্য এদিক দিয়ে মানুষে মানুষে পার্থক্য থাকতে পারে। কোন একজন মানুষের জ্ঞান অন্যের তুলনায় বহুগুণে বেশি হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, "তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা নিজেদেরকে ভুলে গেছে, তারপর আল্লাহও তাদেরকে আত্মভোলা করে দিয়েছেন।" (সূরা আলহাশর: আয়াত-১৯)
এসব লোক নিজেদেরকে সব দিক দিয়ে ভোলেনি, বরং কিসে তাদের ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ, পূর্ণতা এবং সৌভাগ্য অর্জিত হবে, শুধুমাত্র সেই দিক দিয়ে ভুলেছে। কিসে তাদের পার্থিব কামনা বাসনা চরিতার্থ হবে, পার্থিব ইচ্ছা পূর্ণ হবে ও পার্থিব সৌভাগ্য অর্জিত হবে, সেদিক দিয়ে তারা নিজেদেরকে ভোলেনি। আর এর ফলে আল্লাহ তাদেরকে তাদের প্রকৃত কল্যাণ, পূর্ণতা এবং সাফল্য লাভের চেষ্টার গুরুত্ব ভুলিয়ে দিয়েছেন এবং তাদেরকে দোষত্রুটি থেকে আত্মরক্ষার প্রয়োজনের কথাও ভুলিয়ে দিয়েছেন। এসব দিক দিয়ে তারা নিজেদের সম্পর্কে অজ্ঞ ও অসচেতন, যদিও তারা অন্যান্য দিক দিয়ে যথেষ্ট আত্মসচেতন।
ষোড়শ প্রমাণ খণ্ডন: এই অভিযোগটি এক মোটা বুদ্ধির পরিচায়ক। যে ব্যক্তি এ অভিযোগটি উত্থাপন করেছে সে একজন হীন বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি। কোন বস্তুর মধ্যে এমন কোন বৈশিষ্ট্য নেই যে, তার সাথে অপর বস্তুর সংমিশ্রণে তার ওযন বেড়ে যেতে পারে। যেমন- কাঠের ওযন ভারী, তার মধ্যে আগুন ধরালে কাঠ পুড়ে গিয়ে হালকা হয়ে যায়। এমনি কোন পাত্র যদি ওযনে ভারী হয়, তাহলে তার মধ্যে বাতাসের সংযোজন ঘটলে সেটা হালকা হয়ে যায়। এই মূলনীতি ঐসব ভারী বস্তুর ক্ষেত্রে কার্যকর, যেগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় কেন্দ্র ও মধ্যমণি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। আর এর স্বাভাবিক গতিও অব্যাহত থাকে। কিন্তু যে বস্তু স্বভাবত উপরের দিকে গতিশীল, সেগুলোর মধ্যে এ নীতি কার্যকর হয় না। বরং ঐসব হলো ভারী বস্তু যা বিপরীত অন্য ভারী দেহের মিশ্রিত হয়ে সেটাকে হালকা করে দেয়। এমনিভাবে রূহের সংমিশ্রণে দেহ হালকা হয়ে যায়।
সপ্তদশ প্রমাণ খণ্ডন: এটা হলো একটি অমূলক সন্দেহ ও ভ্রান্ত ধারণা। কেননা যাবতীয় অবস্থায় ও গুণাবলীতে কোন বস্তুর সংমিশ্রণ অত্যাবশ্যক নয়। আল্লাহ তা'আলা বস্তুসমূহের গুণাবলী ও স্বভাবে স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান রেখেছেন। কোন কোন বস্তু সহজভাবে দৃষ্টিগোচর হয়, আবার কোন কোন বস্তুকে অনুসন্ধান করে জানতে হয়। কোন বস্তু রঙ্গীন আবার কোন কোন বস্তু রংহীন, কোন কোন বস্তু তাপ ও ঠাণ্ডা গ্রহণ করে, কোন কোন বস্তু তা গ্রহণ করে না। এছাড়া রূহের বিশেষ ধরনের অবস্থাদি রয়েছে, যার সাথে দেহ শরীক থাকে না। এর মধ্যে হালকা হওয়া, ভারী হওয়া, উষ্ণ হওয়া, শীতল হওয়া, কঠিন ও নম্র হওয়া ইত্যাদি অবস্থা বিদ্যমান থাকে। কোন এক ব্যক্তিকে দেখতে অত্যন্ত ভারী মনে হয়, অথচ তার দেহ ওযনে অত্যন্ত হালকা। আবার এক ব্যক্তিকে দেখতে খুব হালকা মনে হয়, কিন্তু তার দেহ অত্যন্ত ভারী। কারো হৃদয়ে নম্রতা ও দয়া বিদ্যমান, আবার কারো হৃদয় পাষাণের মতো কঠিন। যে ব্যক্তি সুস্থ অনুভূতির অধিকারী তিনি কোন কোন নাফস থেকে পচা ও গলিত লাশের দুর্গন্ধ অনুভব করেন। আর কোন কোন নাফসের খুশবু মেশকের চেয়েও অধিক প্রিয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন পথ অতিক্রম করলে সে পথ সুগন্ধিতে ভরে যেতো এবং পরক্ষণে কোন আগমনকারী বুঝতে পারতো যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পথ দিয়ে তাশরীফ নিয়েছেন। এটা ছিলো তাঁর পবিত্র রূহ ও কালবের খুশবু। তাঁর পবিত্র ঘামের খুশবুও অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক ছিলো, যা তাঁর পবিত্র শরীর ও রূহের অধীন ছিলো। তিনি ইরশাদ করেছেন, "নেক রূহ দেহ থেকে পৃথক হওয়ার পর তা থেকে প্রিয় খুশবু বের হয়, যার কাছে মেশকও হার মানে। আর বদ রূহ থেকে পচা পুঁতিগন্ধময় লাশের চেয়েও দুর্গন্ধ বের হয়।" সর্দিতে আক্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য সকল উপস্থিত ব্যক্তিরা সে দুর্গন্ধ অনুভব করতে পারে। এসব যে সত্য তা নবী করীম স্বয়ং উল্লেখ করেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেছেন, "মুমিনদের রূহ উজ্জ্বল ও কাফিরদের রূহ কালো রংয়ের হয়ে থাকে।" প্রকৃতপক্ষে, রূহের বিভিন্ন ধরনের অবস্থার পরিবর্তনের কথা নিরেট মূর্খ ছাড়া অন্য কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
অষ্টাদশ প্রমাণ খণ্ডন: রূহ যদি দেহ বিশিষ্ট হতো তাহলে কোন না কোন ইদ্রিয়ের দ্বারা তার পরিচয় জানা যেতো। এ প্রসঙ্গে প্রমাণ তো দূরের কথা কোন প্রকার সন্দেহও কেউ উত্থাপন করেনি। যদি এরূপ অপরিহার্যতাকে মেনে নেয়া হয়, তাহলে অপরিহার্যহীনতাকে প্রশ্রয় দেয়া হবে। তবে রূহকে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভব করা যায়, অনুসন্ধানও করা যায়। এমনিভাবে রূহকে দেখতে পায়, খুশবু ও ঘ্রাণ নেয়, যদিও এসব আমাদের উপলব্ধিযোগ্য নয়। ফেরেশতারা দেহধারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নন। এমনিভাবে জিন ও শয়তানকে সূক্ষ্মদেহধারী হওয়ার কারণে আমরা দেখতে পাই না। ইন্দ্রিয়ের বৃত্তরেখার মধ্যে সংশ্লিষ্ট হওয়ার ব্যাপারে বস্তুর মধ্যে তারতম্য রয়েছে। কোন কোন বস্তু বেশিরভাগ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভব করা যায়। আবার কোন কোন বস্তু বেশিভাগ ইন্দ্রিয়ের দ্বারাও অনুভব করা যায় না। কোন কোন বস্তু শুধু একটি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভূত হয় আবার কোনগুলোর অবস্থা এই যে, সেগুলোর বেশিরভাগই উপলব্ধি করা যায়না। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে অবশ্য উপলব্ধি করা যায়। যেসব বস্তুর রং বা আকার নেই, সেগুলো আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না, যেমন, বায়ু। এটা ঘ্রাণ শক্তির দ্বারাও অনুভব করা যায় না। আর যেগুলো অনুসন্ধানের দ্বারা জানা যায়না, সেগুলো ইন্দ্রিয়ের দ্বারাও অনুভব করা যায় না, যেমন- স্থির বায়ু। আসল উপলব্ধিকারী হলো রূহ। সে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধিগুলোকে বিভিন্ন উপায়ে করা যায় না। তবে কোন বস্তু বা পরমূর্তকে অনুভব করা যায়। কিন্তু রূহ এগুলোকেও উপলব্ধি করতে পারে এবং বিভিন্নভাবে আগত পরমূর্তকে গ্রহণ করতে পারে, যেমন- দোষ, গুণ, সন্দেহ ইত্যাদি। মানব দেহও তেমনি এসব উপসর্গ বা পরমূর্তকে অনুভব বা উপলব্ধি করতে পারে। তবে রূহ স্বভাবতই গতিশীল এবং সে-ই দেহকে পরিচালিত করে। রূহ দেহে প্রভাব বিস্তার করে এবং দেহের দ্বারা প্রভাবান্বিতও হয়। দেহের মাধ্যেমে রূহ সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, আনন্দ-ভালোবাসা, ক্ষমা, ঘৃণা, স্মরণ করা ইত্যাদি বিষয় অনুভব করে ও জানে। এছাড়া ভালো ও মন্দ অবস্থার সম্মুখীন হওয়া, ভুল করা উঠানামা এসব অবস্থা রূহের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যেমন স্রষ্টার পরিচয় তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে পাওয়া যায়। মানুষ যখন কর্মচাঞ্চল্য থেকে বিরত থাকে এবং নিঃসঙ্গতা তাকে পেয়ে বসে, যখন সে লোভ-লালসা বর্জন করে, সুউচ্চ সদাচার, সৎগুণ, বীরত্ব ও বদান্যতা ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহবোধ করে এবং মন্দ স্বভাব বর্জন করে, সে অবস্থার রূহের প্রতিক্রিয়া, গুরুত্ব ও শক্তি বৃদ্ধি পায়, যে কারণে দেহ ও দেহের উপসর্গগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। যেমন- রূহ কোন কোন সময় বড় পাথরকেও এক দৃষ্টিতে ফাঁক বা টুকরো করে দিতে পারে। আর কোন প্রাণী বা কোন নিআমতের প্রতি দৃষ্টিপাত করে সেগুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারে। মোটকথা, যেসব রূহ আধ্যাত্মিক শক্তিতে শক্তিমান, সেসব রূহ অনেক অলৌকিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে পারে।
রূহের বদনযর ও এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কিছু তথ্য বদনযর লাগার গূঢ় রহস্য: একজন মানুষের নযর লাগার রহস্য কি? সাধারণত বদ নযরের আছর বা ক্রিয়ার জন্য চোখকে দায়ী করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, তা চোখের ক্রিয়া নয়, বরং এটা রূহের ক্রিয়া। ঐ রূহের ক্রিয়া যেটা বিষাক্ত এবং মন্দ স্বভাবে দুষ্ট। অন্যের উপর রূহের ও ক্রিয়া কখনো চোখের মাধ্যমে হয়ে থাকে, কখনো সরাসরি রূহের মাধ্যমে হয়ে থাকে। যেমন- কারো সম্মুখে অন্য কোন ব্যক্তির কোন নিআমতের প্রশংসা করা হলে সেটার প্রভাবে প্রশংসাকারীর নাফস প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে এবং এর ফলে তার ঐসব নিআমত নষ্ট হয়ে যায়। কোন কোন সময় দেহের মধ্যে রূহের ক্রিয়া প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। যেমন- রূহ শুধু কোন কোন দেহের কাছে এলে সে দেহের মধ্যে কম্পন অথবা লাল রং বা হলুদ রং সৃষ্টি করে দেয়। এর চেয়েও বেশি ক্ষতিকর ঐ ক্রিয়া যা দেহের তাছীর বা ক্রিয়া এবং পরমূর্ত থেকে আলাদা। ঐসব জিনিসে বিশেষ ধরনের ক্রিয়া কার্যকর করে যা তার সামনে বিদ্যমান থাকে অথবা তার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে। একশ্রেণীর মানুষ সবসময় এ জগতে ক্রিয়াশীল রূহের কার্যকারিতার কথা বিশ্বাস করে এবং এসবের সাহায্যও কামনা করে। আবার এই ক্রিয়াশীলতাকে অনেকে ভয়ও করে। একশ্রেণীর মুশরিক ক্রিয়াশীল রূহের সাহায্যও কামনা করে থাকে।
বদনযরের প্রতিক্রিয়া দূর করার উপায়: কোন কোন রেওয়ায়েতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর হিকমতের মধ্যে এটিও একটি সহজাত নিয়ম যে, একজন খারাপ লোকের সাথে নাফসে আম্মারাহর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকতে পারে, এমন কোন ব্যক্তির বদনযরের কারণে অপর কেউ আক্রান্ত হলে প্রথমোক্ত ব্যক্তির গোসলের সংরক্ষিত পানি আক্রান্ত ব্যক্তির গায়ে ছিটিয়ে দিলে তার বদ নযরের বিষক্রিয়া দূর হয়ে যাবে। যেমনিভাবে লোহা ভিজানো পানি একাধিক ব্যাধি ও ব্যথার জন্য একটি অব্যর্থ প্রতিষেধক।
স্বপ্নের মধ্যে রূহ এক ধরনের নিঃসঙ্গতা লাভ করে। এ অবস্থায়ও রূহের ক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের অভিজ্ঞতা আছে এবং অনেক আশ্চর্যজনক ঘটনা দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। সেসব ঘটনা এখানে উল্লেখ করার কোন অবকাশ নেই। কিছু স্বপ্নের ঘটনা এই গ্রন্থের প্রথমাংশে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, আলমে আরওয়াহ বা আত্মার জগত, আলমে আজসাম বা জড় জগতের চেয়ে অনেক প্রশস্ত এবং ভিন্ন। এ দুনিয়া থেকে সেটি একটি আলাদা জগত। সেখানকার কর্মকাণ্ড ও নিদর্শনসমূহ বস্তু জগতের চেয়ে আলাদা ও আশ্চর্যজনক। দুনিয়ায় যতো রকম মানবিক নিদর্শন আছে, সেসব হলো দেহের মাধ্যমে রূহের প্রতীক বা চিহ্ন। সেসব কর্মকাণ্ড রূহ ও দেহ উভয়ে মিলেই সম্পন্ন করে। আবার রূহ থেকে এমন ধরনের ক্রিয়াও সংঘটিত হয়ে থাকে, যেটার সঙ্গে দেহের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু দেহ দ্বারা এমন কোন ক্রিয়া সংঘটিত হয় না, যার মধ্যে রূহের অংশীদারিত্ব নেই।
উনিশতম প্রমাণ খণ্ডন: এ তথ্য সর্বজন স্বীকৃত যে, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা যে কোন বস্তুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। রূহের সৃষ্টির ব্যাপারে বস্তুরও অবদান রয়েছে। আর রূহের একটি নির্দিষ্ট আকৃতিও আছে। যদি বলা হয় যে, রূহের মূলধাতু হলো নাফস, তাহলে দু'টি নাফসের একত্রিত হওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। আর সেটা যদি নাফস না হয়, তাহলে রূহ ও দেহ একই আকৃতিতে মিলিত হওয়া জরুরী হয়ে পড়ে, যেটা একটি ভুল ধারণা। আসলে, রূহের মূলধাতু রূহ নয়, যেমন- মানুষের মূলধাতু মানুষ নয়, জিনের মূলধাতু জিন নয় এবং প্রাণীর মূলধাতু প্রাণী নয়। কেউ যদি বলে যে, রূহের মূলধাতু যদি নাফস না হয়, তাহলে রূহ ও দেহ একই আকৃতিতে মিলিত হয়ে পড়ে। এটা একটি ভুল ধারণা। কেননা এ অবস্থায় এটা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে যে, রূহ মূলধাতু থেকে সৃষ্ট, আর রূহের নির্দিষ্ট আকৃতি রয়েছে। কেউ এই কথাকে খণ্ডন করার জন্য কোন অকাট্য অথবা সাধারণ বা সন্দেহযুক্ত প্রমাণ ও পেশ করতে পারেনি।
বিশতম প্রমাণ খণ্ডন: যদি বলা হয় যে, প্রত্যেক দেহ বাইরের জগতে বিভাজ্য, তাহলে এটা একটি ভুল ধারণা। কেননা চাঁদ, সুরুজ, তারা, নক্ষত্র এসব বাহির জগতের হওয়া সত্ত্বেও সেসবের কোন ভাগাভাগি হয় না। যিনি জাওহারে ফর্দ বা একক জড় পদার্থকে স্বীকার করেন না, তাঁর কাছে এটা একটা সাধারণ ব্যাপার, আর যিনি স্বীকার করেন, তাঁর দৃষ্টিতে সেটা পরিমাপযোগ্য বা বিভাজ্য নয়। যদি সে বস্তুর বণ্টন হওয়াকে মেনেও নেয়া হয়, তাহলে অসুবিধা কি? যদি বলা হয়, রূহের প্রতিটি অংশ রূহ, তাহলে একজন মানুষের মধ্যে একাধিক রূহের সমাবেশ হওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। আসলে এটা ঐ সময় অত্যাবশ্যক হবে যখন রূহ কার্যকারীভাবে বিভক্ত হবে, আর এটা হওয়া সম্ভবপর নয়। যদি বলা হয়, রূহের প্রত্যেকটি অংশকে যদি রূহ হিসেবে স্বীকার না করা হয়, তাহলে এক্যবদ্ধ রূহও রূহ বলে স্বীকৃতি পাবে না। তাই এই যুক্তিটাই ভুল। অনেক মৌলিক পদার্থ এমনি ধরনের আছে যে, এগুলোর অংশ একত্রিত হলেই সেগুলোর পরিচিতি প্রকাশ পায়, যেমন- ঘর, মানুষ, দেশ ইত্যাদি।
একুশতম প্রমাণ খণ্ডন: দেহ তার হিফাযতের জন্য রূহের মুখাপেক্ষী। তবে একটি রূহের স্থায়িত্বের জন্য সেটা অন্য রূহের উপর নির্ভরশীল নয়। এটা একটি ভ্রান্ত যুক্তিহীন ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়। যেহেতু কোন বস্তুর হিফাযত ও স্থায়িত্বের জন্য রূহের প্রয়োজন নেই, যেমন- খনিজ সম্পদ, বায়ু, পানি, আগুন, মাটি এবং যাবতীয় জড় বস্তুসমূহ। যেহেতু এগুলো জীবন্ত বা বাকসম্পন্ন নয়। সেক্ষেত্রে অবস্থা এ দাঁড়ায় যে, প্রত্যেক জীবন্ত বাকসম্পন্ন দেহের হিফাযত ও স্থায়িত্বের জন্য রূহের বিদ্যমান থাকা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু ধারণাটাই ভুল জিন ও ফেরেশতা জীবন্ত ও বাকসম্পন্ন। তারা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অন্য কোন রূহের মুখাপেক্ষী নয়। এখানে এই বক্তব্যের আলোচ্য বিষয়বস্তু জিনও ফেরেশতা নয়। যেহেতু এদের দেহ মুতাহাইয়েযাহ বা পরিমাপযোগ্য নয়। আল্লাহর প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলগণের প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি যাঁদের ঈমান আছে, তাঁদের সাথেই উপরোক্ত আলোচনা সীমাবদ্ধ। কিন্তু যাঁরা এসব বিষয় বিশ্বাস করে না তাঁদের সাথে রূহ সম্পর্কে আলোচনা করা অর্থহীন। কেননা তারা রূহের স্রষ্টার প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর শরীআতের প্রতি, যে শরীআত তাঁর রাসূলগণ নিয়ে এসেছেন সে সবের প্রতি ঈমান রাখে না। অথচ সে সবের উপর দলীল-ভিত্তিক মুশাহাদাহ বা দর্শনের ন্যায় বিশ্বাস রাখার একান্ত প্রয়োজন রয়েছে, যেসবকে তাঁরা পরিত্যাগ করেছেন। এই দুনিয়ায় জিন ও ফেরেশতাদের বিদ্যমান থাকার যেসব নিদর্শন ও প্রমাণ রাব্বুল আলামীন পেশ করেছেন, সেগুলোকে এবং তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। আর ইনসানী শক্তি যে অনেক ক্ষেত্রে জিন ও ফেরেশতাদের উপর ক্ষমতাশীল নয়, তাও অস্বীকার করা যায় না।
বাইশতম প্রমাণ খণ্ডন: উল্লেখ্য যে, দু'টি স্থূলদেহবিশিষ্ট বস্তু একই স্থানে একসাথে অবস্থান করা সম্ভবপর নয়। তবে সূক্ষ্মদেহধারী কোন কিছু স্থূলদেহের মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে ও মিশ্রিত হতে পারে, এটা কোন অসম্ভব ব্যাপার নয়। একই সময় কোন একটি বস্তু অন্য একটি বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করার বিষয়টি অবান্তর। তবে পানি কাঠের মধ্যে ও মেঘখণ্ডের মধ্যে বিদ্যমান থাকতে পারে। এছাড়া লোহার মধ্যে আগুন সংযোগ করলে, সেখানে আগুন দেখা যায়। খাদ্যের উপাদান ও দেহের সর্বত্র মিশে যায়। এমনিভাবে জিনের আসর করা লোকের মধ্যেও জিন অনুপ্রবেশ করে। অনুরূপভাবে রূহের বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষের দেহের শিরায় শিরায় অতি সহজে মিশে আছে। রূহের জন্য যেমন দেহ, পাখির জন্য তেমনি বাতাসের প্রয়োজন। রূহের বাসস্থান হলো দেহ, আর দেহের উপাদান হলো যার মধ্যে দেহ মিশে আছে। এরূপ অনুপ্রবেশ কোন অসম্ভব ব্যাপার নয়। রূহ যখন দেহ থেকে পৃথক হয়ে যায়, তখন তার অন্য একটি বাসস্থানের প্রয়োজন দেখা দেয়। দেহের সাথে রূহের যুক্ত হওয়া বিষয়টি মাটির সাথে পানি মিশ্রিত হওয়া ও দেহের মধ্যে তেল মিশে যাওয়ার ন্যায়।
আল্লাহুম্মা ওয়াফিকনা লিলহাক্কে ওয়াল হাক্কু আইউত্তাবায়া। “হে আল্লাহ, আমাদেরকে হক বা সত্যকে জানার ও অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন, আর যা সত্য তাই অনুসরণীয়।"
টিকাঃ
১. মানুষের দেহের সাথে রূহের তিন প্রকার সম্পর্ক রয়েছে: প্রথমটি হলো- 'রূহে মুকিম' বা স্থায়ী রূহ। এটাই আসল রূহ। এই রূহ দেহ থেকে বিদায় নিলে মানুষের মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গতিশক্তি ও অনুভব শক্তি চিরতরে রহিত হয়ে যায়।
দ্বিতীয় প্রকার রূহ হলো- 'রূহে জার' বা প্রতিবেশীসুলভ রূহ। এর অপর নাম 'রওয়া'। এই রূহ দেহ থেকে চলে গেলে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে, আবার ফিরে আসলে জেগে উঠে। এই রূহ মানুষের দু'চোখের মাঝখানে অবস্থান করে।
তৃতীয় প্রকার রূহ হলো- 'রূহে আমীন'। এটা সব সময় মানব দেহে অবস্থান করে। এমনকি মৃত্যুর পরেও এই রূহ দেহে বা কবরে থেকে যায়। কারো কারো মতে, মুনকার ও নাকীরের সওয়াল-জওয়াব এই রূহের মাধ্যমে হয়ে থাকে। (তথ্যসূত্র: তাহযীবুস সালাত) -অনুবাদক