📄 প্রথমে রূহ, না দেহের সৃষ্টি হয়েছে
এ বিষয় সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) দু'টি গুরুত্বপূর্ণ অভিমতের উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। শাইখুল ইসলামের বক্তব্য হলো—হযরত মুহাম্মদ ইবনে নাসর মারুযী (রহ.) ও হযরত আবূ মুহাম্মদ ইবনে হাযম (রহ.)-এর অভিমত অনুযায়ী রূহের সৃষ্টি হয়েছে প্রথমে। ইবনে হাযম (রহ.) আরো দাবি করেছেন যে, তাঁদের এই অভিমত সম্পর্কে ইজমা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রূহ সম্পর্কে এ দু'টি অভিমতের আনুষঙ্গিক তথ্য নিম্নে বর্ণিত হলো।
এক. পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: “আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছি। এরপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি—আদমকে সিজদা করো তখন সবাই সিজদাহ করেছে।” (সূরা আরাফ: আয়াত-১১)
আরবি ভাষায় ‘সুম্মা’ শব্দটি কোনো বিষয়ে ধারাবাহিকতা অথবা বিরতিকে বুঝায়। আর ‘খালক’ শব্দের অর্থ হলো সৃষ্টি। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত আদম (আ.)-এর পবিত্র দেহ সৃষ্টির পূর্বেই তাঁর পবিত্র রূহ সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর তাঁর দেহে পবিত্র রূহ ফুঁকে দেয়ার পরই ফেরেশতারা আল্লাহর আদেশে তাঁকে সিজদাহ করেছিলেন। এক্ষেত্রে ‘খালক’ শব্দের দ্বারা খালকে আরওয়াহ বা রূহের সৃষ্টিকে বুঝানো হয়েছে।
দুই. পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: “ওয়া ইয আখাযা রাব্বুকা মিম বানী আদামা মিন যুহুরিহিম যুররিইয়াতা হুম। ওয়া আশহাদাহুম আলা আনফুসিহিম।” অর্থাৎ “আর যখন আপনার রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং নিজের উপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করালেন।” (সূরা আরাফ: আয়াত-১৭২)
এই যে অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি এটা রূহের নিকট থেকে গ্রহণ করা হয়েছিলো, দেহের সাথে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। একবার হযরত উমর (রা.)-এর নিকট এই আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও এই আয়াত সম্পর্কে একই প্রশ্ন করা হয়েছিলো। ইরশাদ হয়েছিলো, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-কে পয়দা করে তাঁর পিঠের উপর নিজের কুদরতী ডান হাত রেখেছিলেন। এতে তাঁর পৃষ্ঠদেশ থেকে তাঁর সমস্ত সন্তান বের হয়ে এসেছিলো। তখন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করলেন—এদের অর্ধেক হবে জাহান্নামী আর এরা সেরূপ আমলও করবে। সে সময় জনৈক ব্যক্তি আরয করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাহলে আমলের প্রয়োজন কী? ইরশাদ হলো, যখন আল্লাহ তা'আলা কোনো বান্দাকে বেহেশতের জন্য পয়দা করেন তখন সে বান্দাকে জান্নাতীদের আমলের ন্যায় আমল করান। এমনিভাবে তার অন্তিমকালেও উত্তম আমলের উপরই হয়ে থাকে। আর তাঁকে ঐ আমলের বদৌলতে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেন। আর যখন আল্লাহ কাউকে জাহান্নামের জন্য পয়দা করেন, তখন তার দ্বারা জাহান্নামীদের আমলের ন্যায় আমল করান। এমনকি তার অন্তিমকালও খারাপ আমলের উপর হয়ে থাকে। আর তাকে এই জন্য জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রহ.))
উপরোক্ত হাদীস সম্পর্কে ইমাম হাকিম (রহ.) বলেছেন, এই হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর শর্তের অনুকূল। ইমাম হাকিম (রহ.)-এর হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত সেই মারফু' রেওয়ায়েতটি হলো এই, "আল্লাহ পাক হযরত আদম (আ.)-কে পয়দা করে যখন তাঁর পিঠে (কুদরতী) হাত বুলিয়েছিলেন, তখন তাঁর পৃষ্ঠদেশ থেকে সমস্ত রূহ যারা কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়াতে আসবে, তারা পিপীলিকার মতো বের হয়ে আসলো। তারপর আল্লাহ তা'আলা এদের সবার ললাটে নূরের চমক রেখে দিলেন। এরপর এদের আদম (আ.)-এর নিকট পেশ করলেন। তিনি জানতে চাইলেন এরা কারা। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করলেন, এরা তোমার সন্তান। এই অবস্থায় হযরত আদম (আ.) এদের মধ্যে একজনের কপালে নূর দেখতে পেয়ে আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলেন, হে রব ইনি কে? আল্লাহ তা'আলা বললেন, ইনি তোমার সন্তান দাউদ। তিনি দুনিয়ার শেষভাগে কোনো এক কাওমের নিকট প্রেরিত হবেন। আদম (আ.) আবার জানতে চাইলেন, তাঁর আয়ু কত বছর হবে? ইরশাদ হলো, ষাট বছর। আদম (আ.) আরয করলেন, হে আমার রব! আমার বয়স থেকে চল্লিশ বছর তাঁকে দান করে দিন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করলেন, তাহলে বিষয়টি সীল-মোহর করে দিতে হবে এবং এর আর কোনো পরিবর্তন হবে না। যখন হযরত আদম (আ.)-এর জীবনকাল পূর্ণ হয়ে গেলো তখন মালাকুল মাউত তাঁর নিকট আসলেন, আদম (আ.) বললেন, এখনো তো আমার আয়ু চল্লিশ বছর বাকী আছে। আযরাঈল (আ.) বললেন, আপনি কি আপনার সন্তান দাউদকে তা দান করে দেননি? এই ঘটনা সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আদম (আ.) তা অস্বীকার করলেন। এই কারণেই আদম (আ.)-এর সন্তানদের মধ্যেও ভুলে যাওয়ার প্রবণতা চলে আসছে।" (তিরমিযী, হাসান ও সহীহ হাদীস)
ইমাম আহমদ (রহ.) উপরোক্ত হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যখন আদম (আ.)-এর বয়স সম্পর্কীয় আয়াত নাযিল হলো, তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছিলেন, সবার আগে বয়স সম্পর্কে আদম (আ.) অস্বীকার করেছিলেন। অর্থাৎ হযরত আদম (আ.) তাঁর নির্দিষ্ট আয়ু থেকে যে ৪০ বছর হযরত দাউদ (আ.)-কে দিয়েছিলেন, সেটা তিনি তাঁর মৃত্যুর সময় ভুলে গিয়েছিলেন। হযরত আযরাঈল (আ.) তাঁর এই ভুল সংশোধন করে দিয়েছিলেন। হযরত ইবনে সা'আদ (রা.) এই হাদীস সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য যোগ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-এর বয়স পুরোপুরি এক হাজার বছর নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন, আর হযরত দাউদ (আ.)-এর বয়স একশ বছর পূর্ণ করে দিলেন। ইমাম হাকিমের আবী ওয়ালী হাদীসের মধ্যে এই আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে যেসব রূহকে বের করেছিলেন, তারা কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়াতে আসতে থাকবে। প্রকৃতপক্ষে, রূহের সৃষ্টি হয়েছে আগে দেহের সৃষ্টি হয়েছে পরে। আল্লাহ তা'আলা রূহের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, তিনিই একমাত্র প্রভু, আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছিলেন, তোমাদের এই প্রতিশ্রুতি ও স্বীকৃতির সম্পর্কে সাত আসমান ও সাত যমীন সাক্ষী রাখলাম এবং মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কেও সাক্ষী হিসেবে রাখা হলো, যেন কিয়ামতের দিন এই প্রতিশ্রুতির কথা কোনো রূহ অস্বীকার করতে না পারে। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আরো বলা হলো, তোমরা তোমাদের মা'বুদের সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। আমি তোমাদের নিকট রাসূল পাঠাবো যাঁরা এই ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেবেন। এছাড়া তোমাদের নিকট তাঁদের মাধ্যমে কিতাবও প্রেরণ করা হবে। তখন সকল রূহ ঘোষণা করলো, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনিই আমাদের রব এবং আমাদের মা'বুদ। আপনি ছাড়া আমাদের আর কোনো রব নেই। সে সময় হযরত আদম (আ.)-কে সেখানে উপস্থিত করা হলো। হযরত আদম (আ.) সকল রূহের দিকে লক্ষ্য করলেন এবং আল্লাহর নিকট আরয করলেন, হে আমার রব! ভালো-মন্দ, ধনী-দরিদ্র, সুন্দর-অসুন্দর আমার সকল সন্তানকে যদি আপনি সমান মর্যাদায় সৃষ্টি করতেন, তাহলে কতোই না ভালো হতো। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর তরফ থেকে বলা হলো, কৃতজ্ঞতা ও শোকরগোযারী তাঁর নিকট খুবই পছন্দনীয়। আর এই কারণেই সকল বনী আদমকে সমান মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করা হয়নি। সে সময় হযরত আদম (আ.) তাঁর সন্তানদের মধ্যে আম্বিয়ায়ে কেরামকে উজ্জ্বল প্রদীপের মতো দেখতে পেলেন।
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: "আমি যখন নবীদের কাছ থেকে আপনার কাছ থেকে এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারইয়াম তনয় ঈসা-এর কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম।” (সূরা আহযাব: আয়াত-৭)
এই আয়াতের দ্বারা জানা গেলো যে, আম্বিয়ায়ে কেরামও আল্লাহর রাবুবিয়াতের শপথ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে হযরত ঈসা (আ.)-এর রূহ মুবারকও ছিলো। আল্লাহ তা'আলা এই পবিত্র রূহকে হযরত মারইয়াম (আ.)-এর নিকট ফেরেশতার মাধ্যমে প্রেরণ করেছিলেন। হযরত মারইয়াম (আ.) যখন তাঁর পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ব দিকের কোনো এক স্থানে চলে গিয়েছিলেন তখন সেই রূহ তাঁর ভেতর প্রবেশ করলো। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতার মাধ্যমে হযরত ঈসা (আ.)-এর পবিত্র রূহকে হযরত মারইয়াম (আ.)-এর মধ্যে প্রবেশ করিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি পবিত্র কুরআন ও হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত।
হযরত হিশাম ইবনে হাযম (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করলো, হে আল্লাহর রাসূল! একজন মানুষের আমল প্রথম কার্যকর হয় নাকি তার অদৃষ্ট। ইরশাদ হলো, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে তাঁর সন্তানদের বের করেছিলেন, তখন তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। তারপর আল্লাহ তা'আলার কুদরতী মুষ্টি দ্বারা রূহগুলোকে নিক্ষেপ করে বলেছিলেন, এদের এক অংশ হবে জান্নাতী আর অপর অংশ হবে জাহান্নামী। জান্নাতীদের নিকট জান্নাতে যাওয়ার আমল সহজ হবে, আর দোযখীদের নিকট দোযখে যাওয়ার আমলও তদ্রূপ হবে। (হযরত ইসহাক ইবনে রাহবিয়া (রহ.) কর্তৃক এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।)
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি তাঁর রূহকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুমি আমার কোনো হাত পছন্দ করো যার দ্বারা আমি তোমার সন্তানকে তোমাকে দেখাবো। হযরত আদম (আ.)-এর পবিত্র রূহ আরয করেছিলো, আমি আমার রবের ডান হাত পছন্দ করি, আর আমার রবের উভয় হাতই (কুদরতী) ডান হাত। অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁর ডান হাত প্রসারিত করেছিলেন। যার মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ায় আগমনকারী আদম (আ.)-এর সকল সন্তান ছিলেন। এদের মধ্যে সুস্থ, অসুস্থ উভয় প্রকার আদম সন্তান ছিলেন এমনকি তাঁদের মধ্যে আম্বিয়ায়ে কেরামও ছিলেন। আদম (আ.) আরয করেছিলেন হে আমার রব! আপনি সবাইকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করেননি কেন? ইরশাদ হলো, আমি চাই যে তারা আমার শোকরগোযার বান্দা হোক। (হযরত ইসহাক ইবনে রাহবিয়া (রহ.))।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) থেকে বর্ণিত: আল্লাহ হযরত আদম (আ.)-কে পয়দা করেছিলেন। তারপর নিজের (কুদরতী) হাত দ্বারা ইশারা করে মুষ্টি বদ্ধ করে বলেছিলেন, হে আদম! আমার দুটি হাত থেকে কোনো একটি বেছে নাও। আদম (আ.) বললেন, আমি আমার রবের (কুদরতী) ডান হাত বেছে নিলাম এবং তাঁর উভয় হাতই (কুদরতী) ডান হাত। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁর হাত খুললেন, সেখানে আদম (আ.)-এর সব সন্তানই ছিলো। তখন আদম (আ.) আরয করলেন, হে আল্লাহ! এরা কারা? ইরশাদ হলো, যারা কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ায় আগমন করবে এরা হলো তোমার সে সব জান্নাতী আওলাদ। এদের ব্যাপারে জান্নাতের ফয়সালা হয়ে গেছে। (মুহাম্মদ ইবনে নাসর মরূযী)
এই প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা যখন হযরত আদম (আ.)-কে পয়দা করলেন আর তাঁর পৃষ্ঠদেশে (কুদরতী) হাত বুলালেন, তখন কিয়ামত পর্যন্ত যতো রূহ দুনিয়ায় আগমন করবে তারা সকলে সেখান থেকে বের হয়ে আসলো। (ইসহাক ইবনে রাহবিয়া)
হযরত ইবনে আমর (রা.)-এর তাফসীরে উল্লেখ আছে যে, চিরুনী দ্বারা যেমন চুলের ভেতরের ময়লা বের হয়ে আসে, তেমনি আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে তাঁর সন্তানদের বের করে এনেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনানুযায়ী আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-এর ডান কাঁধে তাঁর কুদরতী হাত দ্বারা মৃদু আঘাত করলে সব শুভ্র ও স্বচ্ছ রূহ বের হয়ে এসেছিলো, এরাই হলো জান্নাতী রূহ। তাঁর বাম কাঁধে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কুদরতী বাম হাত দ্বারা মৃদু আঘাত করলে কালো রংয়ের রূহ বেরিয়ে এসেছিলো। ইরশাদ হলো—এরাই হলো দোযখী রূহ। অতঃপর জান্নাতী রূহ থেকে ঈমান ও মা'রেফাতের প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়েছিলো। এই আয়াতের তাফসীরে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) কয়েকজন সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-কে জান্নাত থেকে বের করেছিলেন, তখন আসমান থেকে তাঁর অবতরণের পূর্ব মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশে তাঁর কুদরতী ডান হাত ফিরিয়েছিলেন। সে সময় হযরত আদম (আ.) এর পৃষ্ঠদেশ থেকে তাঁর সন্তানাদির রূহ শুভ্র ও স্বচ্ছ মুক্তার ন্যায় অথবা ক্ষুদ্র পিঁপীলিকার মতো বের হয়ে এসেছিলো। ইরশাদ হয়েছিলো, তোমরা জান্নাতে চলে যাও। পবিত্র কুরআনে আসহাবে ইয়ামীন (ডানপন্থী) ও আসহাবে শিমাল (বামপন্থী) বলতে এদেরকেই বুঝানো হয়েছে। তারপর আল্লাহ পাক উভয় প্রকার রূহ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিলেন। ইরশাদ হয়েছিলো, আমি কি তোমাদের রব নই? সব রূহ একযোগে বলেছিলো, হ্যাঁ কেন নয়? অতঃপর উভয় শ্রেণীর রূহকে হযরত আদম (আ.)-এর হাওয়ালা করে দিয়েছিলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে আদম (আ.) ও ফেরেশতারা ঘোষণা করেছিলেন যে, আমরা রূহের এই অঙ্গীকারের সাক্ষী রইলাম। যাতে কিয়ামতের দিন তারা বলতে না পারে যে, রূহের এই অঙ্গীকার সম্পর্কে তারা অবহিত ছিলো না। অথবা তারা যেন এটাও বলার কোনো সুযোগ না পায় প্রথম থেকেই তাদের পূর্বপুরুষেরা শিরকে লিপ্ত ছিলো। আর তারা তাদেরকেই অনুসরণ করেছিলো। অতএব আল্লাহ তা'আলা যে তাদের রব, এটা কারো অজানা থাকার কথা নয়।
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: "আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের পেয়েছি এক পথের পথিক।” (সূরা যুখরুফ: আয়াত-২৩)
হযরত মুহাম্মদ ইবনে কায়াব কারযী (রহ.) এই আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, সমস্ত রূহ তাদের দেহ সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ তা'আলার প্রতি তাদের ঈমান ও মা'রেফাতের অঙ্গীকার করেছিলো।
এই প্রসঙ্গে হযরত আতা (রহ.) বলেছেন, রূহ থেকে প্রতিশ্রুতি নেয়ার সময় তাদেরকে হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করে আনা হয়েছিলো। তাদেরকে আবার সেখানে ফেরত পাঠানো হয়েছিলো। প্রসিদ্ধ রাবী হযরত যাহহাক (রহ.)-ও এই সম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা যেদিন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছিলেন, ঐ দিনই তাঁর পৃষ্ঠদেশ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যেসব রূহ দুনিয়ায় আগমন করবে পিঁপড়ার মতো বের করে আল্লাহ তা'আলা তাদের নিকট থেকে তাঁর রাবুবিয়াত বা প্রভুত্বের অঙ্গীকার আদায় করেছিলেন। আর ফেরেশতারা সে বিষয়ে সাক্ষী ছিলেন। শেষ পর্যায়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁর (কুদরতী) ডান হাতের মুষ্টিতে রূহগুলোকে ধারণ করে বলেছিলেন, এরা হলো জান্নাতী এবং (কুদরতী) বাম হাতের মুষ্টিতে রূহগুলোকে ধারণ করে বলেছিলেন, এরা হলো জাহান্নামী।
এখানে আযল বা আদিকাল সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন এবং আদম (আ.)-এর সৃষ্টির ঘটনা সম্পর্কে কিছু অভিমত ব্যক্ত করা হলো। হযরত ইয়াহইয়া (রহ.) বলেছেন যে, তিনি হযরত ইবনে মুসাইয়িব (রহ.)-কে আযল বা আদিকাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে তিনি একটি সহীহ হাদীস বর্ণনা করেছিলেন। হাদীসটি হলো এই—আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-কে পয়দা করে তাঁকে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখিয়েছিলেন, যা অন্য কোনো মাখলুককে দেখানো হয়নি। এর মধ্যে দুনিয়াতে কিয়ামত পর্যন্ত যেসব রূহ আগমন করবে তাদেরকেও দেখিয়েছিলেন। এই হাদীসটিকে কমবেশি করার কোনো অবকাশ নেই। তবুও যদি কেউ কোনো হেরফের করার চেষ্টা করে, তাহলে সে মিথ্যাবাদী বলে গণ্য হবে। এমনকি সত্তরজন লোকও যদি এই সম্পর্কে একমত পোষণ করে তবুও তা গ্রাহ্য হবে না।
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: "আসমান ও যমীনের সবাই ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, কেবল আল্লাহরই জন্য সিজদাহ করে থাকে।” (সূরা রা'দঃ আয়াত-১৫)
হযরত আবুল আলিয়া (রহ.) এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, সকল রূহ যে আল্লাহর প্রভুত্ব স্বীকার করেছিলো সে কথার প্রমাণ এখানে পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে হযরত ইসহাক বলেছেন, ঐ সময় যে সকল রূহ তাওহীদের স্বীকৃতি দিয়েছিলো, এই আয়াতে সে কথাই আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা ঐসব রূহের কাছে এই প্রশ্ন রেখেছিলেন যারা এর অর্থ বুঝতে পারে ও উত্তর দিতে পারে। রূহেরা আল্লাহর প্রশ্নের যে জবাব দিয়েছিলো তা থেকে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তারা সেটা বুঝেই আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি দিয়েছিলো।
হাদীস: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা মানুষের দেহ সৃষ্টির বহু আগে তাদের রূহ পয়দা করেছিলেন। যেসব রূহের মধ্যে সে সময় পরিচয় ঘটেছিলো, দুনিয়ায় তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি গড়ে উঠে। পক্ষান্তরে, যেসব রূহের সঙ্গে সে সময় কোনো যোগাযোগ ও পরিচয় ঘটেনি, তাদের মধ্যে দুনিয়াতে কোনো ভালোবাসা ও সম্পৃতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। (ইবনে মানদা) যাঁরা মনে করেন দেহের আগে রূহ পয়দা হয়নি, তাঁদের দু'রকম বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হলো:
এক. পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: “হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে পয়দা করেছি।" (সূরা হুজুরাত: আয়াত-১৩)
এই পবিত্র আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সম্বোধন করে বলেছেন, আমি তোমাদেরকে নর-নারী হিসেবে পয়দা করেছি। এছাড়া মানুষ তাদের মাতাপিতার মাধ্যমে পয়দা হয়ে থাকে। আর মানুষ বলতে তাদের দেহ ও রূহ উভয়কেই বুঝায়।
দুই. পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: “হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে পয়দা করেছেন এবং তাঁর থেকেই তাঁর সঙ্গিনীকে পয়দা করেছেন এবং তাদের থেকে অসংখ্য নর-নারীকে ছড়িয়ে দিয়েছেন।” (সূরা নিসা : আয়াত-১)
এই আয়াতের আলোকে জানা যায়, মানব গোষ্ঠীর সৃষ্টি আদম-হাওয়া সৃষ্টির পরেই হয়েছে।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষাপটে কেউ যদি প্রশ্ন করেন, দেহের সৃষ্টির আগে রূহের সৃষ্টি হতে পারে, এতে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা আপত্তি নেই। তবে এটা মেনে নিতে হবে যে, হযরত আদম (আ.)-এর পরে সমস্ত মানুষ পয়দা হয়েছে। কিন্তু হযরত আদম (আ.)-এর দেহ সৃষ্টি হয়েছিল রূহের সৃষ্টির আগে। উপরে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, দেহের আগে রূহের সৃষ্টি হয়েছিলো। যদি ঐসব বিষয় সঠিক বলে মেনে নেয়া হয়, তাহলে এর দ্বারা জানা যায় যে, আসলে, রূহের স্রষ্টা স্বয়ং রূহের আকৃতি তৈরি করেছেন। রূহের সৃষ্টি, রূহের আয়ু, রূহের আমল ইত্যাদি বিষয়ও তিনি ঠিক করেছেন। রূহের আকৃতি রূহের উপাদান থেকে বের করেছেন। তারপর ঐ রূহকে রূহের উপাদানের মধ্যে ফিরিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া প্রত্যেক রূহকে তার সৃষ্টি হওয়ার সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তবে এটা জানা যায় না যে, রূহের সৃষ্টি কোনো স্বতন্ত্র সৃষ্টি ছিলো কিনা। রূহের সৃষ্টির পর রূহ জীবিত থেকে জ্ঞানী ও বাকসম্পন্ন হয় এবং কোনো বিশেষ মহলে অবস্থান করে। তারপর সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে নিজ নিজ দেহে প্রেরিত হয়। ইমাম ইবনে হাযম (রহ.) অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, কেউ তার ক্ষমতার চেয়ে অধিক কোনো বোঝা উঠাতে পারে না। অবশ্য আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মানুষকে সময় মতো নিয়মিত বিধান অনুযায়ী পয়দা করে থাকেন। সকল সৃষ্টির নিয়ম হলো—আল্লাহ তা'আলা তাদের পরিমাণ, সময়, গুণাবলী ও বৈষম্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তারপর সেই অনুযায়ী এদের বাহ্যিক অস্তিত্বের বিকাশ ঘটে। এই নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে বিন্দু পরিমাণ পরিবর্তন হয় না। তাই উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো অদৃষ্ট বা নিয়মিত বিধি-বিধান অনুযায়ী ঘটে থাকে। এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির আকৃতি উদ্ভাবন করেছেন। আর নেককার ও বদকার পৃথক পৃথক করে দিয়েছেন। কিন্তু রূহকে সম্বোধন করা, রূহ থেকে রাবুবিয়াত বা প্রভুত্বের অঙ্গীকার গ্রহণ করা এবং রূহের দ্বারা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের সাক্ষ্য প্রদান এসব বিষয় আগেকার দিনের আলিমগণ মেনে নিয়েছিলেন। তাঁরা পবিত্র কুরআনের আয়াতের বাহ্যিক অর্থই গ্রহণ করেছিলেন। তা না হলে, এই আয়াতটি বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে।
হযরত আবূ উমর (রহ.) মুয়াত্তা গ্রন্থে বর্ণিত হাদীসটি বর্ণনার ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি বলে মনে করেন। হযরত মুসলিম ইবনে ইয়াসার (রা.)-এর সাথে হযরত উমর (রা.)-এর সাক্ষাৎ হয়েছিলো এমন কোনো প্রমাণ নেই। এরই হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে নায়ীম ইবনে রাবীয়াহ নামক আর একজন রাবী রয়েছেন, যিনি এই সনদের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি নন। তদুপরি মুসলিম ইবনে ইয়াসার একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি। কথিত আছে যে, তিনি ছিলেন মদীনার অধিবাসী, বসরার লোক নন। এই প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আবী খায়সুমাহ (রহ.) বলেন, আমি হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ীন (রহ.) থেকে ইমাম মালিক (রহ.)-এর গ্রন্থে হাদীসটি পড়েছি। তিনি স্বহস্তে লিখেছেন যে, মুসলিম ইবনে ইয়াসার এমন কোনো পরিচিতি ব্যক্তি নন। তারপর এই রেওয়ায়েতটি আবূ আমর নাসায়ীর ধারা অনুযায়ী বর্ণনা করেছেন, যেখানে মুসলিম ইবনে ইয়াসার ও হযরত উমর (রা.)-এর মাঝখানে নায়ীম ইবনে রাবীয়াহ রয়েছেন। আবার তিনি সাখবারাহ এর ধারাবাহিকতা অনুযায়ীও এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এখানে উভয় বর্ণনাকারীর মধ্যে নায়ীমও রয়েছেন। আবূ আমর (রা.) আরো বলেন, নায়ীমের নাম বর্ণনাকারী হিসেবে যিনি উল্লেখ করেছেন, সেটি প্রমাণযোগ্য নয়। আর যিনি এটা উল্লেখ করেননি তিনি একজন স্মৃতি শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি। তাই তাঁকে একজন রাবী বলে গণ্য করা যায়। তিনি ছিলেন হাফিযে হাদীস ও চরিত অভিধানে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। হাদীসটির সনদ বা সূত্র ঠিক নয়। মুসলিম ইবনে ইয়াসার ও নায়ীম এরা কেউই হাদীস বর্ণনায় সুপরিচিত ব্যক্তি নন। তবুও এই বিষয়টি হাদীসের অনেক সনদের দ্বারা এবং হযরত উমর (রা.) ও সাহাবাদের একটি দল দ্বারা সমর্থিত।
আবূ আমর (রহ.)-এর বর্ণনার আসল উদ্দেশ্য হলো, তাকদীর বা অদৃষ্ট। এ বিষয়ে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এর বর্ণিত তাকদীর সম্পর্কিত হাদীসেরও উল্লেখ করেছেন। একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, যদি তাকদীরে সবকিছু থাকে, তাহলে আমলের প্রয়োজন কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, বেহেশতীদের বেহেশতে যাওয়ার আমল সহজ হবে, আর দোযখীদের দোযখের আমল সহজ হবে।
হযরত আবূ সালিহ এবং আবূ হুরাইরা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে, হযরত আদম (আ.) এর সন্তানাদি তাঁর পৃষ্ঠদেশ থেকে পিঁপড়ার আকৃতির ন্যায় ছিলো। তিনি বলেন যে, এই আয়াতটির তাফসীর হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। হযরত ইসহাক ইবনে রাহবিয়া (রহ.) আরো বলেন, আলিমদের ইজমা বা ঐকমত্য হয়েছে যে, দেহের আগেই রূহের দ্বারা রাবুবিয়াতের অঙ্গীকার আদায় করা হয়েছিলো। হযরত ইমাম জুরজানী বলেন, এদের দলীল হলো পবিত্র কুরআনের এই আয়াত— “যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদেরকে মৃত মনে করো না বরং তাঁরা জীবিত।” (সূরা আলে ইমরান : আয়াত-১৬৯)
অথচ এঁদের দেহ মাটিতে মিশে গেছে এবং তাঁদের নাম-নিশানা পর্যন্ত মুছে গিয়েছে। আর সে রূহকে রিযক দেয়া হয় এবং সে সন্তুষ্ট থাকে। আসলে, রূহই সুখ-শান্তি, দুঃখ-বেদনা অনুভব করে। কাউকে চেনা না চেনার অনুভূতিও রূহের আছে। এর নমুনা স্বপ্নের মধ্যে দেখা যায়। স্বপ্ন দেখার পর মানুষ যখন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে, তখন তার মনে আনন্দ বা নিরানন্দের চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়, যার সাথে শুধু রূহেরই সম্পর্ক থাকে, দেহের নয়। এই অঙ্গীকারের মূল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তা'আলা এর দ্বারা রাবুবিয়াতের প্রমাণকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন, চাই দ্বীনের দাওয়াত কারো কাছে পৌঁছাক বা না পৌঁছাক। অবশ্য যাদের মধ্যে রাসূল এসেছেন, তাঁরা তাদের প্রচারের দ্বারা এই প্রতিশ্রুতিকে আরো অধিক নির্ভরশীল ও গ্রহণযোগ্য করে দিয়েছেন। হ্যাঁ, আল্লাহ তা'আলা কারো নিকট ততোটুকু আনুগত্য চান যতোটুকু প্রমাণ তার কাছে কার্যকর হয়েছে, আর যে পরিমাণ যোগ্যতা তার রয়েছে এবং যতোটুকু প্রমাণাদি আল্লাহ তাকে দান করেছেন। বালিগ হওয়ার পর কে কী আমল করবে আর নাবালিগদের কী অবস্থা হবে, আল্লাহ সেটা আমাদের থেকে গোপন রেখেছেন কেননা আমরা জানি, আল্লাহ তা'আলা সুবিচারক, তিনি কারো প্রতি কোনো যুলুম করেন না। আর তাঁর কাজে ও ব্যবহারে কোনো প্রকার বৈষম্য নেই। আর তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।
উপরে বর্ণিত আয়াতের তাফসীরে কোনো কোনো আলিম ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, অস্তিত্বের ধারাবাহিকতার দিক থেকে যখন আদম সন্তান নিজ নিজ পিতার পৃষ্ঠদেশে শুক্রে পরিণত হয়। আর আল্লাহ তা'আলা এদেরকে পয়দা করেন, তখন এদেরকে বুদ্ধি বিবেচনা দান করে, তাঁর নিদর্শন দেখিয়ে স্বীয় প্রভুত্বের স্বীকৃতি এদের থেকে আদায় করেন। কেননা রূহের সামনে এমনি ধরনের খোলাখুলি চিহ্ন এবং প্রমাণাদি আছে যে জন্য এরা নিজের স্রষ্টা ও প্রতিপালককে মানতে বাধ্য হয়। সুতরাং এমন কেউ নেই যার মধ্যে নিজ রবের এসব কোনো কর্মকাণ্ড বিদ্যমান নেই, যা সাক্ষ্য দেয় না যে, আল্লাহ তা'আলা তার স্রষ্টা, আর আল্লাহর বিধি-বিধান তার মধ্যে কার্যকর। তারপর ঐ রূহ যখন সেসব প্রমাণাদির পরিচয় লাভ করে, তখন সে সাক্ষীর মর্যাদা লাভ করে। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে— "নিজের উপর কুফরির সাক্ষী আছে।” অর্থাৎ তারা সাক্ষীদের সমমর্যাদাসম্পন্ন। আল্লাহ নিজেও তাঁর একত্বের সাক্ষী। পবিত্র কুরআনে তিনি ইরশাদ করেছে— "তিনি ব্যতীত আর কেউই ইবাদতের যোগ্য নেই।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৮)
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা নিজেই তাঁর একত্বের কথা বলে দিয়েছেন ও ঘোষণা করেছেন। এভাবে বলে দেয়াও সাক্ষ্যের সমতুল্য। (ইবনে আম্বারী) প্রকৃতপক্ষে, ইমাম জুরজানী (রহ.)-এর বক্তব্যের উপর আম্বারী এতোটুকু যোগ করেছেন, অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যখন মাখলুক সৃষ্টি করেন আর তাদেরকে ভবিষ্যতের জ্ঞান দান করেন। যেটা ভবিষ্যতে প্রকাশ পাবে, সেটা যেন ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়ে গেছে। আল্লাহ তা'আলার ইলম বা জ্ঞান সবসময় একই রকম। আর যে বিষয়ের অপেক্ষা করা হয়, আরবি ভাষায় তাকে রূপক হিসেবে গণ্য করা হয়। আল্লাহ তা'আলা ভবিষ্যতে যা হবে সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত।
রূপকের ব্যবহার কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ আছে। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— "দোযখীরা ডেকেছে” অর্থাৎ ডাকবে। "বেহেশতীরা ডেকেছে” অর্থাৎ ডাকবে।” (সূরা আরাফ: আয়াত-৫০) "আরাফবাসীরা ডেকেছে” অর্থাৎ ডাকবে।” (সূরা আরাফ: আয়াত-৪৮)
এই দৃষ্টিকোণ থেকে উপরোক্ত আয়াতের অর্থ হলো, তোমাদের রব আদম (আ.)- এর আওলাদকে তাঁদের পিতার পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করবেন, আর জ্ঞান-বুদ্ধি প্রদান করে তাদের নাফসের উপর তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন। প্রত্যেক বালিগ ব্যক্তি যে নিজের ভালোমন্দ বুঝে এবং সওয়াব, আযাব, অঙ্গীকার ও ভয়-ভীতি সম্পর্কে জ্ঞান রাখে তার কাছ থেকে আল্লাহ তা'আলা ওয়াহদানিয়াতের বা একত্বের স্বীকৃতি ও প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন। রূহ এভাবে বাস্তবতা লাভ করেছে। রূহ যে ধ্বংসশীল ও নশ্বর সেটাও প্রমাণিত হয়েছে। রূহ বুঝতে পেরেছে যে, সে নিজেকে নিজে সৃষ্টি করেনি, বরং কেউ না কেউ তার স্রষ্টা আছেন যাঁর সমতুল্য কেউ নেই। কোনো কিছু সৃষ্টি করার যোগ্যতা কোনো মাখলুকের নেই। আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। মানুষ সুখের সময় সেটা চিন্তা না করলেও দুঃখের সময় অবশ্যই করে। যখন সে কোনো বিপদে পড়ে, তখন সে আকাশের দিকে মাথা তুলে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। তার বিশ্বাস যে, আল্লাহ আকাশেই আছেন। আসল জ্ঞান সেই জ্ঞান যে জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহকে চেনা ও জানা যায়। তাই বালিগ ব্যক্তি তার বুদ্ধি বিবেচনার মাধ্যমে আল্লাহকে চিনতে ও বুঝতে পারলে বুঝতে হবে যে তার থেকে আল্লাহ তা'আলা অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন। এভাবেই ধরে নিতে হবে যে, সে আল্লাহর একত্ব ও ওয়াদাকে স্বীকার করে নিয়েছে এবং মুসলমান হয়ে গেছে। তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "আল্লাহকে সিজদাহ করে যা কিছু আছে নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়।” (সূরা রাদ: আয়াত-১৫)
হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়, তিন ব্যক্তিকে জবাবদিহি থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে—শিশু বালিগ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত, পাগল সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত, আর ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত হওয়ার আগ পর্যন্ত। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, "আমি আসমান-যমীন ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করলো এবং ভীত হলো। আর মানুষ তা বহন করলো।" (সূরা আহযাব: আয়াত-৭২)
এখানে আমানত বলতে উপরে বর্ণিত অঙ্গীকারকে বুঝায়। যেহেতু আসমান-যমীন এবং পাহাড় জ্ঞান থেকে বঞ্চিত, সেহেতু এদের মধ্যে আমানতের বোঝা উঠাবার কোনো যোগ্যতাই ছিলো না। আর মানুষের মধ্যে জ্ঞান আছে বলে সে এই বোঝা উঠিয়ে নিয়েছে। কোনো কোনো আরবি পদ্যেও রূপক অর্থে এর ব্যবহার রয়েছে। যেমন, "কিনান পাহাড় ফাকআসের নিরাপত্তার জন্য যামিন হয়ে গেছে।" পাহাড়ের যামানত এই ছিলো যে, ফাকআস গোত্রের লোকেরা দুর্যোগের সময় তার মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নিতো।
এখানে কবি নাবিগার একটি কবিতার অংশবিশেষের অর্থও উল্লেখযোগ্য— "জাওরান ময়দানে অবস্থিত পাহাড়গুলো তাদের রবের তাওহীদের স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব পাহাড়ের মধ্যে কোনটি আছে অবনত, আর কোনটি আছে ভীত সন্ত্রস্ত।” পবিত্র কুরআনের আয়াতও এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেছেন, "তোমরা আবার না কিয়ামতের দিন বলতে শুরু করো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিলো না অথবা বলতে শুরু করো যে, অংশীদারিত্বের প্রথাতো আমাদের বাপ-দাদারা উদ্ভাবন করেছিলো আমাদের পূর্বেই।” (সূরা আরাফ: আয়াত ১৭২-১৭৩)
তাদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়েছে, যেন কিয়ামতের দিন তারা কোনো অজুহাতের আশ্রয় না নিতে পারে। এখানে অজ্ঞতা বলতে কিয়ামত সম্পর্কে অজ্ঞতা অথবা প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে অজ্ঞতাকে বুঝায়। কিয়ামত সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে কোথাও বলেননি যে, আল্লাহ তা'আলা মানুষের নিকট থেকে হিসেব ও মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন। তবে এসবের প্রতি বিশ্বাস রাখার কথা বলেছেন। আর এর অর্থ যদি প্রতিশ্রুতি হয়, তাহলে প্রতিপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী শিশু এবং অপরিণত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ শিশুদের থেকেও অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়েছে। তবে অঙ্গীকারের পর ঐ বয়স পর্যন্ত যে পৌঁছেনি এর দ্বারা তার অজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে, আর যদি এটা অস্বীকার করা হয়, তাহলে সে কী করে সেই অজ্ঞতার কৈফিয়ত দেবে যা তার দ্বারা সংঘটিত হয়নি, তার জন্য সে কী করে অভিযুক্ত হবে। আর তা নিয়ে কোনো আলোচনারও প্রশ্ন ওঠে না। পরে তাদের বাপ-দাদার শিরক সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন হয়েছে। এই শিরক বলতে যদি তাদের নিজের শিরককে বুঝায়, তাহলে সেটা হবে বালিগ হওয়ার পর ও দলীল লাভের পর। শিশুরা নিষ্পাপ বিধায় তাদের কোনো জবাবদিহির প্রশ্ন ওঠে না। আর এটাকে যদি পিতা-মাতার শিরককে বুঝায়, তাহলে আলিমগণ এই বিষয়ে একমত যে, একে অন্যের জন্য ধৃত বা দায়ী হবে না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “কোনো বোঝা বহনকারী অপর কারো বোঝা বহন করবে না।” (সূরা ফাতির : আয়াত-১৮)
এখানে এই বক্তব্যের সাথে রূহের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত হাদীসের কোনো বিরোধ নেই। এখানে অতীত কালের ক্রিয়ার অর্থ বর্তমান বা ভবিষ্যৎ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি হলো আম্বিয়াদের প্রতিশ্রুতির ন্যায়। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আর যখন আল্লাহ নবীগণ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন, আমি যা কিছু তোমাদেরকে কিতাব ও জ্ঞান দান করেছি, অতঃপর যখন তোমাদের নিকট কোনো রাসূল আসেন তোমাদের কিতাবকে সত্য বলে দেয়ার জন্য, তখন তোমরা অবশ্যই সেই রাসূলের প্রতি ঈমান এনো।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-৮১)
এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা আম্বিয়াদের উপর যে কিতাব ও হিকমত অবতীর্ণ করেছেন, সেটাকে অঙ্গীকার হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন, যে অঙ্গীকার পরবর্তীকালের উম্মত থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমানী কিতাবসমূহকে কাওমের জন্য প্রতিশ্রুতির স্বীকৃতিস্বরূপ প্রমাণ পেশ করেছেন আর কিতাবের মারেফাত বা পরিচিতিকে তাদের অঙ্গীকার হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। এরই সমার্থক আরেকটি আয়াতের অর্থ এখানে উল্লেখ করা হলো: "এরা এমন লোক, যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না।” (সূরা রা'দঃ আয়াত-২০)
এই প্রতিশ্রুতি হলো রাসূলদের জন্য ঈমান ও সত্য স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি। এর উদাহরণ হলো কুরআনের এসব আয়াত যেখানে ইরশাদ হয়েছে, “হে বনী আদম! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, শয়তানের ইবাদত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু এবং আমার ইবাদত করো, এটাই সরল পথ।” (সূরা ইয়াসীন: আয়াত ৬০-৬১)
প্রকাশ থাকে যে, এই অঙ্গীকার রাসূলদের মাধ্যমে তাঁদের কাওম থেকে গ্রহণ করা হয়েছিলো। পবিত্র কুরআনে আরো উল্লেখ আছে, "হে বনী ইসরাঈল, তোমরা আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করো, আমি তোমাদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবো।” (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত-৪০)
আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেন, "আর যখন আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাব থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, তোমরা এই কিতাবের মর্মবাণী মানুষের নিকট বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৮৭)
পবিত্র কুরআনে আরো উল্লেখ আছে, "আর আমি যখন নবীদের কাছ থেকে, আপনার কাছ কাছ থেকে, হযরত নূহ, হযরত ইবরাহীম, হযরত মূসা এবং মারইয়াম তনয় হযরত ঈসা-র কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম এবং অঙ্গীকার নিলাম তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার।” (সূরা আহযাব: আয়াত-৭)
এসব প্রতিশ্রুতি আম্বিয়ায়ে কেরাম থেকে তাঁদের আবির্ভাবের পরে গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁদের উম্মতদের থেকেও এভাবে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের নিন্দা করেছেন এবং এদেরকে শাস্তি প্রদান করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "আমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দরুন তাদের উপর অভিশাপ বর্ষণ করেছি এবং তাদের অন্তঃকরণকে কঠিন করে দিয়েছি।" (সূরা মায়েদা: আয়াত-১৩)
এই শাস্তি হলো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দরুন যে প্রতিশ্রুতি কাওমের পক্ষ থেকে রাসূলদের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছিলো।” নিম্নের আয়াত দ্বারা এটা আরো স্পষ্টভাবে জানা যায়। "আর আমি যখন তোমাদের থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছি। আর তোমাদের মাথার উপর কূহে তূরকে তুলে ধরলাম যে, আমি তোমাদেরকে যে কিতাব দিয়েছি, তা মযবুত করে ধরো। আর যা কিছু এর মধ্যে আছে তা স্মরণ করো। তাহলে তোমরা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারবে।” (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত-৬৩)
যেহেতু এই আয়াত ও উদাহরণসমূহ মদীনা শরীফের, সেহেতু এই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে আহলে কিতাবদেরকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। এসব আহলে কিতাব থেকে এই অঙ্গীকার করা হয়েছিলো যে, আল্লাহর উপর ও আল্লাহর রাসূলগণের উপর তোমরা ঈমান আনো।
পবিত্র কুরআনে আরাফ সম্পর্কীয় আয়াতে ও সূরাসমূহে সাধারণ প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ রয়েছে। এইসব আয়াতে আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ ও রাবুবিয়াতকে স্বীকার করা এবং শিরক যে হারাম সে বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। এটা এমন একটি প্রতিশ্রুতি যার দ্বারা আহলে কিতাবদের জন্য প্রমাণাদি কার্যকর হয়। আর তাদের কোনো কৈফিয়ত গ্রহণযোগ্য হয় না। আর এর বিরোধিতা শাস্তি ও ধ্বংস ডেকে আনে। কাজেই এটা সবসময় মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। যাতে বান্দা স্বীকার করে যে, কেবল আল্লাহ তার স্রষ্টা ও অভিভাবক, আর মাখলুক তাঁর নবী ও রাসূলগণকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। এছাড়া একই উদ্দেশ্য শরীআতও নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
উপরে বর্ণিত আয়াতের দ্বারা আমরা যেসব দিক নির্দেশনা পাই তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো— এক. আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন যে, "তিনি আদম সন্তান থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন।” (সূরা আরাফ: আয়াত-১৭২) তিনি একতা বলেননি যে, হযরত আদম (আ.) থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন। আসলে, হযরত আদম (আ.) ও তাঁর আওলাদ এক কথা নয়। দুই. আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, “যাঁদেরকে তিনি তাদের পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করেছেন।” (সূরা আরাফ: আয়াত-১৭২) এটা বলেননি যে, যাঁদেরকে আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করেছেন। অর্থাৎ আরবি ব্যাকরণ অনুসারে এখানে আদম থেকে বদলে বা'য অথবা বদলে ইশতিমাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু 'বদলে ইশতিমাল' হওয়াই বেশি সমীচীন। তিন. এখানে আল্লাহ পাক আদম (আ.)-এর বংশধর থেকে বলে উল্লেখ করেছেন, তাঁর বংশধর থেকে একথা বলেননি। চার. আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাঁর সত্তা সম্পর্কে সাক্ষী বানিয়েছেন। কাজেই এটা একান্ত প্রয়োজন যে, সাক্ষীদেরকে তাদের সাক্ষ্যের কথা স্মরণ রাখতে হবে। উল্লেখ্য যে, এ সাক্ষ্য হচ্ছে দুনিয়া সম্পর্কিত, আখিরাত সম্পর্কিত নয়। পাঁচ. এই সাক্ষ্য প্রদানের উদ্দেশ্য হলো পূর্ব প্রতিশ্রুতির স্বীকৃতি যেন কিয়ামত সম্পর্কে কেউ কোনো অজ্ঞতা প্রকাশ না করে। মানুষ রাসূলগণের মাধ্যমে অঙ্গীকার সম্পর্কে অবহিত ও তাদের সহজাত বুদ্ধিমত্তার দ্বারা বুঝতে পারে যে তারা আল্লাহর সৃষ্ট। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে আমি প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মতো কোনো অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে।” (সূরা নিসা: আয়াত-১৬৫) ছয়. এই প্রতিশ্রুতি স্মরণ করানো এই জন্য প্রয়োজন যে, যেন কিয়ামতের দিন কেউ না জানার কোনো অজুহাত পেশ করতে না পারে। যদি এর দ্বারা আগেকার প্রতিশ্রুতির কথা বুঝানো হয়, তাহলে তারা সেটা ভুলে যেতে পারে। সাত, আল্লাহ পাকের পবিত্র বাণীর গূঢ় রহস্য হলো এই যে, তারা যেন তাদের বাপ-দাদার বা পিতৃপুরুষের শিরকের কোনো কারণ উপস্থাপন করতে না পারে। অর্থাৎ না জানার বা অজ্ঞতার কোনো ভান করতে না পারে। আট. মুশরিকদের পক্ষ থেকে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "অতঃপর আপনি কি আমাদের বাতিল পূজারীদের অপকর্মের কারণে ধ্বংস করবেন।" (সূরা আরাফ: আয়াত-১৭৩) অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যদি এদের শিরক ও অস্বীকৃতির দরুন তাদেরকে আটকাতেন, তবে তারা একথাই বলতো। তবে আল্লাহ তা'আলা রাসূলগণের বিরোধিতার কারণে ও মিথ্যাচারের জন্য এদেরকে পাকড়াও করবেন। আল্লাহ যদি এই মুশরিকদের সাবধান না করে তাদেরকে শাস্তি দিতেন, তাহলে তাদের বাতিল কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করা যেতো না। আল্লাহর এটা নিয়ম নয় যে, কোনো লোকালয়কে অন্যায়ভাবে তাদের অজান্তে শাস্তি প্রদান করবেন। কোনো অপরাধের জন্য শাস্তি তো সাবধান করার পরই কার্যকর করা হয়। নয়. আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি ও প্রভুত্বের ক্ষেত্রে প্রত্যেক বান্দাকে সাক্ষী রেখেছেন। কুরআন শরীফের কয়েকস্থানে এর প্রমাণ উল্লেখ রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, "যদি আপনি এদেরকে জিজ্ঞেস করেন যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তখন তারা বলবে, আল্লাহ। তবুও এই স্বীকৃতি থেকে ও আল্লাহর একত্ব থেকে তারা কেন বিমুখ হয়ে যায়।” (সূরা যুখরুফ: আয়াত-৮৭) এটাই ঐ প্রমাণ, যে বিষয়ের উপর লোকদেরকে সাক্ষী বানানো হয়েছে। আর এই প্রমাণই আল্লাহর রাসূলগণ লোকদেরকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আল্লাহ সম্পর্কে কি সন্দেহের কোনো অবকাশ আছে যিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা।" (সূরা ইবরাহীম: আয়াত-১০) তাই এটা সুস্পষ্টভাবে জানা গেলো যে, আল্লাহ লোকদেরকে তাঁর রাসূলগণের মাধ্যমে এই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, মানুষকে সৃষ্টি করার আগে নয়। এ সম্পর্কে কোনো প্রমাণও উল্লেখ করা হয়নি। দশ. আল্লাহ তা'আলা রূহের এই অঙ্গীকারকে একটি নিদর্শনস্বরূপ উপস্থাপন করেছেন। কোনো বিষয়ের কোনো নিদর্শন সঠিক ও অকাট্য বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। এরূপ সুস্পষ্ট নিদর্শনকে কোনো অবস্থায় অস্বীকার করা যায় না। এছাড়া যে কোনো বিষয়বস্তুর নির্দিষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান থাকা খুবই স্বাভাবিক। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহের বিশদ বর্ণনা করে থাকি।” অর্থাৎ আমি আয়াতগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা করে থাকি যেন মানুষ শিরক ও কুফরী থেকে বিরত থাকে আর তাওহীদকে মেনে নিয়ে ঈমানদার হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা রকমারি সৃষ্টির কথা নানাভাবে কুরআনুল হাকীমে উল্লেখ করেছেন যাতে মানুষ আল্লাহ পাকের নিদর্শনসমূহ সহজে উপলব্ধি করতে পারে। সেসব নিদর্শন দু'ভাগে বিভক্ত। একটি হলো, প্রাকৃতিক নিদর্শন অপরটি হলো আল্লাহর যাত সম্পর্কিত নিদর্শন। আল্লাহর কিছু কিছু নিদর্শন মানুষের মধ্যে রয়েছে, আর কিছু নিদর্শন পরিবেশের সঙ্গে মিশে আছে। যেমন উপরে আকাশ, নিচে যমীন, চারদিকে আল্লাহ তা'আলার অগণিত সৃষ্টি বিরাজমান। এসব নিদর্শনকে আয়াতে আফাকিয়া বলা হয়। আর মানুষের দেহের মধ্যে নানাবিধ ইন্দ্রিয় রয়েছে। মানব দেহের এসব নিদর্শনকে আয়াতে নাফসিয়া বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নিদর্শন বলা হয়। এসব পবিত্র আয়াত বা নিদর্শন আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব, তাওহীদ, রাসূলগণের সত্যতা, মৃত্যু পরবর্তী জীবন এবং কিয়ামতের সত্যতা প্রকাশ করে। এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট ও উজ্জ্বল প্রমাণ হলো মানুষের অস্তিত্ব বা জীবন। মানুষের মৌলিক চাহিদা হলো, তার কোনো সাহায্যকারী, অভিভাবক বা স্রষ্টা অবশ্যই থাকতে হবে, যিনি মানুষকে অস্তিত্ব দান করেছেন। কোনো নশ্বর বস্তু তার স্রষ্টা ব্যতিরেকে নিজেই তাঁর সত্তার ধ্বংসকারী হতে পারে না। তাই এক অনন্য স্রষ্টার প্রয়োজন। এটাই মানুষের মূল অঙ্গীকার ও স্বভাবজাত দর্শন। এই দর্শনের উপরেই নির্ভর করে মানুষের সৃষ্টির রহস্য। এটা কোনো অর্জিত বস্তু নয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “যখন তোমাদের রব আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদেরকে বের করলেন।" (সূরা আরাফ : আয়াত-১৭২) এই আয়াতের সাথে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিম্নোক্ত হাদীসের মিল রয়েছে— "প্রতিটি মানব শিশু সহজাত স্বভাবের উপর জন্ম গ্রহণ করে।” আর উক্ত আয়াতের সাথে নিম্নোক্ত আয়াতেরও মিল রয়েছে। "একাগ্রচিত্তে নিজেকে দীনের উপর কায়িম বা দৃঢ় রাখো। এটা হলো আল্লাহর দীন, যার উপরে আল্লাহ তা'আলা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর দীন অপরিবর্তনীয়, এটা হলো সহজ সরল দীন। কিন্তু অধিকাংশ লোক সঠিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত।” (সূরা রূম: আয়াত-৩০)
এক শ্রেণীর মুফাসসির এই শেষোক্ত ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন, তন্মধ্যে রয়েছেন আল্লামা যামাখশারী প্রমুখ। আরো এক শ্রেণীর মুফাসসির আছেন তাঁরা প্রথমোক্ত ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেছেন। এছাড়া ইবনে জওযী, ওয়াহেদী ও মাওয়ারদী প্রমুখ মুফাসসির উভয় ব্যাখ্যাকেই মেনে নিয়েছেন।
রূহের অঙ্গীকার প্রসঙ্গে ইমাম হাসান ইবনে ইয়াহইয়া জুরজানী (রহ.) এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তাঁর মতে উপরোক্ত হাদীসটিতে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে রূহ বের করে এদের থেকে তাঁর একত্বের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। তারপর আবার আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশে রূহ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। যদি এখানে বালিগ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তির প্রতিশ্রুতির কথা মনে করা হয়, তাহলে হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশে রূহকে ফিরিয়ে দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। এই প্রশ্নের জবাব হলো, গ্রন্থকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী অতীতের প্রতিশ্রুতির অর্থ এখানে বর্তমান বা ভবিষ্যতকে মনে করতে হবে। অর্থাৎ রূহকে আদম (আ.) এর পৃষ্ঠদেশে ফিরিয়ে দেয়া হবে। অর্থাৎ মৃত্যুর পর মানুষ আবার সেই মাটিতে মিশে যায় যে মাটি থেকে তার সৃষ্টি। যেহেতু হযরত আদম (আ.) মাটির সৃষ্টি, সেহেতু তাঁকে মাটিতেই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। যখন আদম (আ.)-এর আওলাদকে মাটিতে ফিরিয়ে দেয়া হয়, তখন হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশেই তাদেরকে যেন ফিরিয়ে দেয়া হয়। যদি এই হাদীসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা হয়, তাহলে পবিত্র কুরআনের সাথে এই বিষয়ে সংঘাত সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "আর যখন আপনার রব হযরত আদম (আ.)-এর সন্তানদের থেকে অর্থাৎ তাদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের আওলাদকে বের করেছেন।" (সূরা আরাফ : আয়াত-১৭২) এই পবিত্র আয়াতে হযরত আদম (আ.)-এর কোনো উল্লেখ নেই, উল্লেখ রয়েছে তাঁর আওলাদের। অন্য একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আদম (আ.)-এর পিঠে হাত ফিরিয়ে তাঁর সমস্ত আওলাদকে বের করেছেন। এই অবস্থায় উভয় দলীলের সমন্বয়ের একটি উপায় উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে ইমাম জুরজানী (রহ.) আরো উল্লেখ করেছেন, তাঁর মতে এই আয়াতের তাফসীর যা কিছু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সলফে সালেহীন থেকে বর্ণিত হয়েছে, সেটাই অধিক গ্রহণযোগ্য ও সহীহ। এছাড়া কোনো কোনো সুন্নী আলিমও এই বক্তব্য সমর্থনকারীদের অভিমত খণ্ডন করতে গিয়ে ভিন্নমত ব্যক্ত করেছেন। রূহের অঙ্গীকার সম্পর্কে যে বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, সে সম্পর্কে ভিন্নমতের অবকাশ রয়েছে। এছাড়া নিরপেক্ষভাবে রূপকের সাহায্যে এই অর্থ গ্রহণের সুযোগ আছে। আর সেটা হলো, আল্লাহ তা'আলা প্রতিশ্রুতি গ্রহণের সংবাদ দিয়েছেন। আরবি 'ইয' শব্দের অর্থ হলো, “যখন” তাই এখানে, "যখন” শব্দটির সাথে “তখন" শব্দটির ব্যবহার প্রযোজ্য। আল্লাহ পাকের পবিত্র বাণী— "রূহেরা বললো, হ্যাঁ, আপনি আমাদের রব।" আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে আরো ইরশাদ করেছেন, "কিয়ামতের দিন মুশরিকরা বলবে 'শাহিদনা' অর্থাৎ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। আল্লাহ তা'আলা তাদের এই সাক্ষ্য রদ করে বলবেন, তোমরা কিয়ামতের দিন অবশ্য বলবে যে, আমরা ঐসব হিসাব-নিকাশ, শিরক ও কুফুরীর জন্য আবদ্ধ থেকে একেবারেই অজ্ঞ ছিলাম। তারা আরো বলবে, আমাদের পূর্বে আমাদের বাপ-দাদারা শিরক করেছে। আর আমরা তাদের পরবর্তীকালে তাদের আওলাদ ছিলাম। অর্থাৎ তারা শিরকে জড়িত ছিলো আর তারা আমাদের শৈশব থেকেই এই শিরকের জন্য প্রস্তুত করেছিলো। কাজেই আমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলাম মাত্র অতএব আমরা নির্দোষ। আর গুনাহ যা হয়েছে তাতো তাদেরই হয়েছে। তারা আরো বলবে, 'আমরা বাপ-দাদাকে একই অবস্থায় পেয়েছি। আমরা তাঁদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছি।" আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেছেন— মুশরিকরা বলবে, "তুমি কি বাতিল পূজারীদের কার্যের দরুন আমাদেরকে দায়ী করছো।" তারা আমাদেরকেও শিরকের জন্য তৈরি করেছে। এই অবস্থায় প্রথম ঘটনাটি সকল মাখলুকের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়ার বিষয়। আর দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো কিয়ামতের দিন মুশরিকদের জবাবদিহিতা সম্পর্কিত।
ভিন্ন মতাবলম্বীরা কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে যে সংঘর্ষের দাবি করেছিলো, এর জবাবে ইমাম জুরজানী (রহ.) বলেছেন, কুরআন শরীফে এ সম্পর্কে সকল ঘটনা বর্ণনা করা হয়নি। আর হাদীস শরীফে ততোটুকু উল্লেখ করা হয়েছে যতোটুকু কুরআন শরীফে উল্লেখ করা হয়নি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি হাদীসে বর্ণিত বিষয়ের অতিরিক্ত কোনো বিষয় বর্ণনা করতেন, তাহলে উভয় বক্তব্যের মধ্যে মতপার্থক্যের কোনো অবকাশ থাকতো না। যদি কোনো শব্দের অর্থ পরস্পর বিরোধী হয়, কিন্তু পরিণাম ফল একই হয়, তাহলে এর দ্বারা কোনো সংঘাত সৃষ্টি হয় না। পবিত্র কুরআনে মানব সৃষ্টি প্রসঙ্গে কোথাও বলা হয়েছে—মাটির দ্বারা, কোথাও বলা হয়েছে—সে গলানো কাদা দ্বারা, কোথাও বলা হয়েছে—আঠালো কাদা দ্বারা, কোথাও বলা হয়েছে—চাড়ার মতো মাটি দ্বারা তৈরি হয়েছে। লক্ষণীয় যে, এসব শব্দাবলী বিবিধ ধরনের এবং এগুলোর অর্থও বিভিন্ন রকমের। কিন্তু ঐ সকল শব্দের মূল অর্থ একই। অর্থাৎ উপরোক্ত আয়াতগুলোতে মাটি এবং মাটির বিবিধ গুণাবলীর উল্লেখ রয়েছে। মানব সৃষ্টির উপরোক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে পবিত্র কুরআনের আয়াত ও হাদীসের পরিপ্রেক্ষিতে এ দু'টি বিষয় একই অর্থ প্রকাশ করে। তবে এই হাদীসটিতে হযরত আদম (আ.)-এর পিঠে হাত ফিরানো আর তাঁর আওলাদ বের হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। হযরত আদম (আ.)-এর সমস্ত আওলাদ তাঁর পৃষ্ঠদেশ থেকে বের হয়নি, কেবল প্রথম শ্রেণীর আওলাদ তাঁর পৃষ্ঠদেশ থেকে বের হয়েছিলো, তারপর একের পর এক ক্রমান্বয়ে বের হয়ে এসেছে। এই অর্থ হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে বের হয়ে এসেছে এটাই সঠিক। সব আওলাদই আদম (আ.)-এর শাখা প্রশাখা আর তিনি হলেন সবার মূল।
হযরত আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে রূহ বের করা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা যে সম্বোধন করেছেন এর দু'টি অর্থ হতে পারে, আদম সন্তান অথবা আদম (আ.) নিজে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, ফাযাল্লাত আনাকুহুম লাহা খাদিয়ীন। অর্থাৎ "অতঃপর এদের ঘাড়সমূহ তাঁর সম্মুখে নুয়ে পড়েছে।” (সূরা শুআরা: আয়াত-১১) এর মধ্যে 'আনাক' শব্দের অর্থ হলো ঘাড়সমূহ। এর সম্বন্ধ সর্বনামের দিকে করা হয়েছে। বাহ্যিকভাবে নুয়ে পড়ার খবর ঘাড়সমূহের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে, ঘাড়ের মালিকের পক্ষ থেকে নয়। কিন্তু "খাদিয়ীন” শব্দটি "আ'নাকের” জন্য ব্যবহৃত হয় না। কেননা এর জন্য "খাদিয়াত” শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এমনিভাবে এই পঙ্ক্তির "কামা শারাকাত সদরুল কানাতি মিনাদ্দামি।" অর্থাৎ "রক্তের দ্বারা বল্লমের উপরের অংশ ঝলমল করে উঠেছে।" এখানে "সদর" শব্দটি পুংলিঙ্গের আর শারকাত শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গের। কেননা "সদর" শব্দটি সম্বন্ধ "কানাত” শব্দের দিকে করা হয়েছে। সুতরাং কোনো একটি অংশের উল্লেখ করে সবটুকু এবং সবটুকুর উল্লেখ করে কোনো অংশের অর্থ গ্রহণ করা যায়। এ সমস্ত বর্ণনা থেকে রূহ যে সৃষ্ট সেটাই বুঝায়। অধিক কিছু বলতে গেলে বলতে হয় যে, রূহের আকৃতি পিঁপড়ার আকৃতিতে পয়দা করা হয়েছে। আর তাদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করে তারপর এগুলোকে মূলের দিকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। উপরোক্ত হাদীসটি যদি সহীহ হয়, তাহলে এর দ্বারা মূল তাকদীর, সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরপর তোমাদের আকার অবয়ব তৈরি করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি, আদমকে সিজদা করো।" (সূরা আরাফ: আয়াত-১১) এই আয়াতের দ্বারা আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযম (রহ.) কর্তৃক বর্ণিত: "দেহের আগে যে রূহের সৃষ্টি, সেরূপ প্রমাণ দাঁড় করানো একেবারেই ভুল। কেননা এর মধ্যে আদম সন্তানের আকৃতির উপর হযরত আদম (আ.) কে সিজদাহর নির্দেশ সুশৃঙ্খলিত করা হয়েছে। আর এই সমষ্টিগত বিষয় হচ্ছে হযরত আদম (আ.)-এর জন্মের পরের অবস্থা। এই কারণে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) প্রথম 'কুম' শব্দের অর্থ হযরত আদম (আ.) আর দ্বিতীয় 'কুম' শব্দের অর্থ হযরত আদম (আ.)-এর আওলাদ বলে তাফসীর করেছেন। হযরত মুজাহিদ (রা.)-ও তাই বলেন যে, প্রথম 'কুম' এর অর্থ হযরত আদম (আ.) আর 'সুম্মা বিহি' শব্দের অর্থ অতঃপর। আর 'সাওয়ারানাকুম' শব্দের অর্থ, আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশ। এখানে আরবি 'খালাকনাকুম' শব্দটি 'কুম' শব্দের অর্থ আদম (আ.)। হযরত আবু উবায়েদ (রহ.), হযরত মুজাহিদ (রহ.)-এর উপরোক্ত অভিমতটি গ্রহণ করেছেন। কেননা পরে হযরত আদম (আ.)-কে সিজদাহর হুকুম হযরত আদম (আ.)-এর আওলাদের পয়দায়েশের পূর্বের ঘটনা। আর 'সুম্মা' শব্দটি বিরতি ও ধারাবাহিকতা বুঝায়।
কাজেই যিনি খালক ও তাসবীর শব্দ দু'টির দ্বারা জরায়ুতে হযরত আদম (আ.)-এর আওলাদের পয়দায়েশ অর্থ গ্রহণ করেছেন, তিনি ধারাবাহিকতার মধ্যে 'সুম্মা'র হুকুমকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অবশ্য আখফাশের বক্তব্য অনুযায়ী এখানে 'সুম্মা' এর অর্থ 'ওয়াও' গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যাজ্জাজ বলেন যে, এটা ভুল। খলীল, সিওয়াইয়া এবং বিশ্বস্ত জ্ঞানী ব্যক্তিরা এটা অনুমোদন করেননি। হযরত আবু উবায়েদ (রহ.) বলেন যে, হযরত মুজাহিদ (রহ.) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ.)-এর আওলাদকে তাঁর পৃষ্ঠদেশ থেকে পয়দা করেছিলেন। তারপর তাদেরকে সিজদাহ করার হুকুম দিয়েছিলেন। যেমন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, তাদেরকে পিঁপড়ার ন্যায় হযরত আদম (আ.)-এর পিঠ থেকে বের করা হয়েছিল। পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ একটি অপরটির পরিপূরক। ইরশাদ হয়েছে, “হে মানবমণ্ডলী, যদি মৃত্যুর পরবর্তী কালের জীবন সম্পর্কে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে, তাহলে তোমাদের জানা উচিত যে, আমি তোমাদেরকে মাটি দ্বারা পয়দা করেছি, তারপর শুক্র দ্বারা পয়দা করেছি।” (সূরা হজ্জ: আয়াত-৫) এখানে মাটি দ্বারা হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি হওয়া বুঝায়। কেননা মাটিই তাঁর দেহের উপাদান। কিন্তু সম্বোধন উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে করা হয়েছে। সুতরাং অর্থ এই দাঁড়ালো যে, আমি তোমাদেরকে অর্থাৎ তোমাদের বাপ-দাদাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি। এ প্রসঙ্গে আরো দৃষ্টান্তও লক্ষণীয়, ওয়া ইয কুলতুম বি মূসা। আর যখন তোমরা অর্থাৎ তোমাদের বুযুর্গগণ মূসা (আ.) কে বলেছিলেন, ওয়া ইয কাতালতুম নাফসান। আর যখন তোমরা অর্থাৎ তোমাদের বুযুর্গগণ এক ব্যক্তিকে মেরে ফেললো। ওয়া ইয আখাযা মীসাকাকুম। অর্থাৎ “আর যখন তোমাদের থেকে অর্থাৎ তোমাদের বুযুর্গদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন।” কুরআনুল হাকীমে এরূপ ব্যবহারের দ্বারা আধিক্য বিদ্যমান যে, উপস্থিতজনকে সম্বোধন করে বুযুর্গদেরকে বুঝানো হয়েছে। এর উপর এ আয়াতকে কিয়াস বা অনুমান করা যেতে পারে, ওয়া লাকাদ খালাকনা কুম, অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে পয়দা করেছি, অর্থাৎ তোমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কে পয়দা করেছি। কখনো ব্যক্তির উল্লেখ করে সমষ্টির অর্থ গ্রহণ করা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আমি ইনসানকে (হযরত আদমকে আ.) মাটির পিণ্ড দ্বারা পয়দা করেছি। তারপর তাদেরকে (মানব জাতিকে) শুক্র দ্বারা যা একটি জায়গায় সংরক্ষিত থাকে তা দিয়ে সৃষ্টি করেছি।"
রূহের সৃষ্টি দেহ সৃষ্টির দু'হাজার বছর আগে হয়েছে—এই হাদীসের সনদ বা সূত্র সহীহ নয়। কেননা এর মধ্যে উৎবা ইবনে সাকান আছেন, যিনি ইমাম দারু কুতনীর নিকট পরিত্যাজ্য। আর ইরতাৎ ইবনে মুনযির আছেন, যাঁর সম্পর্কে ইবনে আদী বলেন, এঁর বর্ণিত কোনো কোনো হাদীস মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে হযরত আযরাঈল (আ.) যমীন থেকে এক মুষ্টি মাটি আনলেন। তারপর এর দ্বারা পিণ্ড তৈরি করা হলো এবং তা কাদার মতো হলো। তারপর এর দ্বারা হযরত আদম (আ.)-এর দেহ তৈরি হলো। তারপর এর মধ্যে রূহ ফুঁকে দেয়া হলো। যখন রূহ আদমের দেহে প্রবেশ করলো, তখন মাংস, চামড়া এবং রক্ত ইত্যাদি তৈরি হলো। আর হযরত আদম (আ.) জীবন লাভ করলেন এভাবে শক্তি লাভ করলেন। সাহাবাদের এক দলের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী সবকিছু সৃষ্টিসম্পন্ন করলেন, তখন তিনি আরশের উপর সমাসীন হলেন। ইবলীসকে প্রথম আকাশের ফেরেশতাদের মধ্যে শামিল করা হলো। এর আগে ঐ ফেরেশতাদের, যাদের জিন বলা হতো সে তাদের সর্দার ছিলো। এদেরকে জিন বলার কারণ হলো, এরা ছিলো জান্নাতের রক্ষক। ইবলীস নিজের অধীনস্থ ফেরেশতাদের সাথে জান্নাতের মুহাফিয ছিলো। তার মনে এ কুমন্ত্রণা সৃষ্টি হলো যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে যে ফেরেশতাদের নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, এর কারণ নিশ্চয়ই আমার মধ্যে কোনো গুণ নিহিত আছে। তার এ অহঙ্কারের কথা আল্লাহ তা'আলা জানতে পারলেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বললেন যে, আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি পাঠাবো। ফেরেশতারা আরয করলেন, হে রব, এই প্রতিনিধি কী ধরনের হবে আর পৃথিবীতে সে কী করবে? তার সন্তানরা তো দুনিয়াতে অশান্তি সৃষ্টি করবে। হে রব! আপনি কি দুনিয়াতে অশান্তি সৃষ্টিকারী ও রক্তপাতকারী সৃষ্টি করবেন। আমরা আপনার হামদ, তাসবীহ ও পবিত্রতা ঘোষণা করছি। তিনি বললেন, আমি যা জানি তোমরা তা জানো না। অর্থাৎ ইবলীসের অবস্থা আমার যেমন জানা আছে তা তোমরা জানো না।
তারপর আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল (আ.)-কে পৃথিবী থেকে মাটি আনতে বললেন। যমীন বললো, আমি আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় চাই যে তুমি আমার মাটি নিয়ে যাবে। অবশেষে হযরত জিবরাঈল (আ.) শূন্য হাতে ফিরে এলেন এবং আরয করলেন, হে রব, যমীন মাটি আনতে আপনার আশ্রয় কামনা করছে। আমি আপনার নাম শুনে মাটি আনিনি। তারপর হযরত মীকাঈল (আ.)-কে পাঠালেন। তিনি যমীনের আশ্রয়ের কথা শুনে শূন্য হাতে ফিরে এলেন। তারপর মালাকুল মউতকে পাঠালেন। যমীন তাঁকে তাই বললো। কিন্তু জবাব দিলেন যে, আমি আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় চাই যে তাঁর নির্দেশ পালন না করে ফিরে যাবো। সুতরাং তিনি বিভিন্ন স্থানের কিছু কিছু মাটি নিয়ে সবগুলো একত্রিত করে রবের নিকট গিয়ে পৌঁছলেন। যেহেতু বিভিন্ন রংয়ের মাটি—লাল, সাদা এবং কালো আযরাঈল (আ.) সংগ্রহ করেছিলেন, এজন্য হযরত আদম (আ.)-এর সন্তানদের মধ্যে রংয়ের পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়। তারপর আল্লাহ তা'আলা এ মাটি দিয়ে আঠাযুক্ত চকচকে নরম মাটির পিণ্ড তৈরি করলেন। তারপর ফেরেশতাদেরকে বলা হলো, আমি এ কাদা মাটি দিয়ে ইনসান সৃষ্টি করবো। তারপর আমি যখন একে সুবিন্যস্ত করবো, তারপর তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেবো, তখন তার সামনে তোমরা সিজদাহরত হবে। তারপর আল্লাহ তাআলা স্বহস্তে হযরত আদম (আ.)-এর পুতুল তৈরি করলেন যেন ইবলীস যখন অহংকার করবে তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে বলতে পারেন, আমি তো তাকে স্বহস্তে তৈরি করেছি, তাহলে তুমি কেন অহঙ্কার করছো।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাঁর পুতুল তৈরি করে চল্লিশ বছর পর্যন্ত রেখে দিলেন। ফেরেশতারা এ পুতুল দেখতে পেয়ে ঘাবড়িয়ে গেলো। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য ইবলিসের মধ্যে পরিলক্ষিত হলো। যখনই সে পুতুলের কাছে যেতো তখনই সে তা বাজিয়ে দেখতো, ঘন ঘন শব্দকারী মাটির ন্যায় তার থেকে শব্দ বের হতো, আর ইবলিস পুতুলকে লক্ষ্য করে বলতো, তোমাকে পয়দা করার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো রকমের মঙ্গল নিহিত আছে। আর সে পুতুলের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে পেছনের রাস্তা দিয়ে বের হয়ে আসতো। তারপর ফেরেশতাদেরকে বলতো এ পুতুল দেখে তোমরা কেন ভীত হচ্ছো। তোমাদের রব তো অভাবহীন আর এই সৃষ্টিটা তো ফাঁপা। আমি যদি এর উপর বিজয়ী হই, তাহলে একে ধ্বংস না করে ছাড়ছি না। তারপর ঐ সময় উপস্থিত হলো, যখন আল্লাহ তা'আলা এর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিতে চাইলেন। তখন তিনি ফেরেশতাদেরকে বললেন, যখন আমি এর মধ্যে রূহ ফুঁকে দেবো, তখন তোমরা একে সিজদাহ করবে। তারপর আল্লাহ তা'আলা তার মধ্যে যখন রূহ ফুঁকে দিলেন, তখন তাঁর মাথার মধ্যে রূহ পৌঁছার সাথে সাথেই হযরত আদম (আ.) হাঁচি দিলেন। ফেরেশতারা তখন তাঁকে 'আলহামদুলিল্লাহ' পড়তে বললেন। হযরত আদম (আ.) বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ'। আল্লাহ তা'আলা এর জবাব দিলেন, 'ইয়ারহামুকা রাব্বুকা'। অর্থাৎ তোমার রব তোমার উপর রহম করুক। চোখের মধ্যে রূহ প্রবেশ করলে জান্নাতের ফলসমূহ দেখলেন, পেটে পৌঁছলে ক্ষুধা অনুভব করলেন, এর মধ্যে রূহ পদদ্বয় পর্যন্ত পৌঁছলো। হযরত আদম (আ.) তাড়াতাড়ি বেহেশতের দিকে যাবার চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তা'আলা তখন বললেন, ইনসানকে তাড়াহুড়ার মধ্যে পয়দা করা হয়েছে। (তাফসীরে আবূ মালিক ও আবূ সালিহ ইবনে আব্বাস (রহ.) থেকে এবং তাফসীরে মুররা ইবনে মাসউদ (রহ.) থেকে তিনি একদল সাহাবা থেকে) হযরত ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন, যখন আল্লাহ তা'আলা আগুন পয়দা করলেন, সেটা দেখে ফেরেশতাদের মধ্যে ভয়ানক ভয়-ভীতি দেখা দিলো এবং তারা আরয করতে লাগলেন, হে আমাদের রব! এ আগুন আপনি কেন পয়দা করেছেন এবং কার জন্য পয়দা করেছেন। তিনি বললেন, 'নাফরমান ও অবাধ্য মাখলুকের জন্য।' সে সময় ফেরেশতারা ছাড়া দুনিয়ার বুকে অন্য কোনো মাখলুক বিদ্যমান ছিলো না। পরে আদম (আ.)-কে পয়দা করা হয়েছে। এর প্রমাণ হলো আল্লাহর বাণী: "নিশ্চয়ই ইনসানের উপর এক যামানা অতিবাহিত হয়েছে যে, তখন এর নাম নিশানও ছিলো না।” এই প্রসঙ্গে হযরত উমর (রা.) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আফসোস, যদি ঐ যামানাই বিদ্যমান থাকতো। ফেরেশতারা আরয করলেন, আমাদের উপরও কি এমন সময় আসবে যে, আমরা আপনার নাফরমানী করবো? কেননা ফেরেশতারা ব্যতীত অন্য কোনো মাখলুক তখন ছিলো না। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করলেন, 'না' আমি দুনিয়ায় অন্য এক কাওম সৃষ্টি করবো এবং আমার এক প্রতিনিধি সমাসীন করবো।"
এই সম্পর্কে ইবনে ইসহাক (রহ.) বলেছেন, কথিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা আদম (আ.)-এর পুতুল তৈরি করে চল্লিশ বছর রেখে দিলেন। সেই পুতুল শব্দযুক্ত চাড়ার মতো হয়ে গেলো। যখন রূহ আদম (আ.)-এর শির মুবারকে প্রবেশ করলো, তখন তার হাঁচি এলো, সেই সময় তিনি বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ'।
দেহ সৃষ্টির পর যে রূহের সৃষ্টি হয়েছিলো এ সম্পর্কে যুক্তিভিত্তিক প্রমাণ নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ
প্রথম প্রমাণ— কুরআন ও হাদীস এবং সাহাবাদের বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা আদম (আ.)-এর দেহ সৃষ্টি করার পর তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলেন। এভাবে ফুঁকার দরুন রূহের সৃষ্টি হয়েছিলো। দেহ সৃষ্টির পূর্বে যদি রূহের সৃষ্টি হতো, তাহলে তজ্জন্য ফেরেশতারা অবাক হতো না। এটাও জিজ্ঞেস করতেন না যে, এই আগুন কী জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁরা ইনসানের রূহ দেখতেন, আর এটাও তারা জানতেন যে, তাঁদের মধ্যে মুমিন ও কাফিরের রূহ রয়েছে।
দ্বিতীয় প্রমাণ— সমস্ত কাফিরের রূহ ইবলীসের অধীন। তাই যাঁরা মনে করেন দেহের আগে রূহের সৃষ্টি হয়েছিলো, এটা তাদের ভুল ধারণা। সমস্ত কাফিরের রূহ ইবলীসের কুফুরীর পূর্বে সৃষ্টি হয়েছিলো। আল্লাহ তা'আলা ইবলীসের প্রতি কুফরের হুকুম হযরত আদম (আ.)-এর দেহ ও রূহ সৃষ্টি হওয়ার পরে কার্যকর করেছিলেন। এর পূর্বে সে কাফির ছিলো না। তাহলে সে সময় রূহ কী করে কাফির বা মুমিন হতে পারে। অথচ ইবলীস সে সময় কাফির ছিলো না। পরবর্তীতে প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণায় তার মধ্যে কুফরী সৃষ্টি হয়েছিলো। যদি একথা বলা হয় যে, প্রথমে সমস্ত রূহ মুমিন ছিলো, তারপর ইবলীসের কারণে ধর্মত্যাগী হয়ে গেছে, তাহলে সেটা অন্য কথা। কিন্তু রূহের প্রথম সৃষ্টির প্রমাণ এই ধারণার পরিপন্থী।
তৃতীয় প্রমাণ— হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি বিষয় হযরত আবু হুরাইরা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে আছে যে, হযরত আদম (আ.)-কে জুমুআর দিনে পয়দা করা হয়েছিলো। যদি রূহ দেহের পূর্বে পয়দা হয়ে থাকতো, তাহলে রূহ ঐসব মাখলুকের মধ্যে গণ্য হতো, যেগুলো ছয় দিনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিলো, তার মধ্যে রূহের সৃষ্টির কোনো উল্লেখ নেই। এর দ্বারা জানা গেলো যে, রূহের সৃষ্টি হযরত আদম (আ.)-এর আওলাদের সৃষ্টির অধীন। উক্ত ছয় দিনে শুধু হযরত আদম (আ.)- এর জন্ম হয়েছিলো, আর তাঁর আওলাদের জন্ম প্রত্যেক যামানায় হচ্ছে। যদি রূহ দেহের পূর্বে বিদ্যমান থাকতো এবং জীবন্ত, জ্ঞান, অনুভূতিসম্পন্ন ও বাকসম্পন্ন হতো, তাহলে এরা দুনিয়ায় আসার পর ঐ জগতের কথা যেখানে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়েছে সেটা তাদের মনে থাকতো। রূহের মধ্যে জীবনী শক্তি, ইলম, বাকশক্তি এবং রূহের জামাআতে দীর্ঘকাল অতিবাহিত করা সত্ত্বেও দেহে স্থানান্ত রিত হওয়ার পর অতীতের কোনো সামান্যতম অবস্থা তার মনে না থাকা সম্ভবপর নয়। রূহ দেহ থেকে পৃথক হলেও তার অনেক কিছু জানা থাকার কথা। অথচ রূহ দেহে আসার পর তার পরিপূর্ণতার জন্য অনেক বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হতে হয়। কাজেই ঐ সময়ের অবস্থা তার জানা থাকা অধিক সমীচীন যখন কোনোই বাধা-বিঘ্ন ছিলো না।
এ সম্পর্কে এখানে একটি সন্দেহের নিরসন করা হলো। যদি ধরে নেয়া হয় যে, দেহের সাথে রূহের সম্পর্ক ও কর্মতৎপরতা অতীতের অবস্থা অবগত হওয়া একটি বাধাস্বরূপ, তাহলে ধরে নেয়া যেতে পারে, ছোটখাটো অবস্থা সম্পর্কে হয়তো কোনো বাধাবিঘ্ন ছিলো। তবে এটা কী করে সম্ভব যে, রূহের আগেকার কিছুই মনে থাকবে না। দেহের সাথে রূহের প্রাথমিক অবস্থা জানা সম্পর্কে যদি কোনো বাধা না থাকে, তাহলে পূর্বের অবস্থা জানা সম্পর্কে কী করে বাধাবিঘ্নের সৃষ্টি হতে পারে?
চতুর্থ প্রমাণ— রূহ যদি দেহের পূর্বে বিদ্যমান থাকতো তাহলে রূহ জ্ঞান, জীবনী শক্তি, বাকশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত হতো। যখন রূহের সাথে দেহের সম্পর্ক গড়ে উঠতো, তখন তার ঐসব গুণ লোপ পেয়ে যেতো। এর মধ্যে বুদ্ধি ও জ্ঞান ধীরে ধীরে আসতো। যদি একথা মেনে নেয়া হয়, এটা হবে একটি আশ্চর্যের বিষয়। প্রথমত রূহ পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হয়, তারপর জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে জ্ঞান লাভ করে। এর যুক্তিসঙ্গত, শরীআভিত্তিক ও ইন্দ্রিয়গত কোনো প্রমাণ নেই। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "আর আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের পেট থেকে বের করেছেন, তখন তোমরা কিছুই জানতে না। আর তিনি তোমাদের কান, চোখ ও অন্তঃকরণ প্রদান করেছেন, যেন তোমরা তাঁর শোকর আদায় করো।” (সূরা নাহল: আয়াত-৭৮) জানা গেলো, যে অবস্থায় আমাদেরকে পয়দা করা হয়েছে, সেটাই আমাদের বাস্তব অবস্থা। আর জ্ঞানবুদ্ধি, অনুভূতি, শক্তি ও ক্ষমতা সবই পরে এসেছে। এর পূর্বে আমরা কিছুই জানতাম না। কেননা তখন আমাদের কোনো অস্তিত্বই ছিলো না যে কারণে আমাদের মধ্যে জ্ঞান বুদ্ধি থাকবে।
৫ম প্রমাণ— রূহ যদি দেহের পূর্বেই সৃষ্টি হতো, আর রূহের ভালোমন্দও তখন ঠিক হয়ে যেতো, তাহলে সে রূহের আমল ভালো কি মন্দ তা নির্ধারিত হয়ে যেতো। প্রকৃতপক্ষে, রূহ দেহের মধ্যে আসার পরেই তার আমল ভালো কি মন্দ তা ঠিক হয়। আমরা আমাদের ভাগ্যকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করি না। তবে এমন যদি কোনো নিদর্শন থাকে যে, সব রূহ একই সময় সৃষ্টি করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেয়া হয়েছিলো, আর তাদেরকে জীবনী শক্তি ও বাকশক্তি দান করা হয়েছিলো, পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবস্থায় রূহকে তাদের দেহে প্রেরণ করা হয়, সেক্ষেত্রে বাস্তবতাকে স্বীকার না করার কোনো উপায় ছিলো না। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাশীল। রূহের সৃষ্টি সম্পর্কে শরীআতের বিধানই গ্রহণযোগ্য। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "মানুষ তার মায়ের জরায়ুতে চল্লিশ দিন পর্যন্ত শুক্রাকারে থাকে, তারপর চল্লিশ দিন জমাট রক্ত আকারে থাকে। এরপর চল্লিশ দিন থাকে গোশতের পিণ্ডাকারে। অবশেষে আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতারা এসে তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেন।” এভাবে মানুষের সৃষ্টি হয়।
অতএব দেখা যায়, ফেরেশতারা মানুষের দেহে রূহ ফুঁকে দিতে থাকেন। এটা বলা হয়নি যে, রূহসহ ফেরেশতাকে পাঠানো হয় আর ফেরেশতা সেই রূহ ভ্রূণে প্রবেশ করিয়ে দেন।