📘 রূহের রহস্য > 📄 রূহ নশ্বর, না অবিনশ্বর

📄 রূহ নশ্বর, না অবিনশ্বর


রূহকে যদি নশ্বর বলে মেনে নেয়া যায় যে, এটা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশাবলীর অন্যতম একটি নির্দেশ, তাহলে সে নির্দেশ কিভাবে ধ্বংস হয় বা সৃষ্ট হয়? আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি আদম (আ)-এর মধ্যে স্বীয় রূহ ফুঁকে দিয়েছেন, তাহলে রূহ যে চিরন্তন সেটা প্রমাণ হয় কিনা? আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ)-এর সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি তাঁকে নিজের হাতে তৈরি করেছেন, আর তাঁর মধ্যে স্বীয় রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। এখানে আল্লাহর হাত ও রূহ বলতে আমরা কি বুঝবো?

উপরোক্ত বিষয়গুলো খুবই জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এ সম্পর্কে যুগে যুগে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়েছে। অনেক সম্প্রদায় এই বিষয়টি নিয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের অনুসারীদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। “রূহ ধ্বংসশীল ও আল্লাহর সৃষ্ট” এ কথার উপর আম্বিয়ায়ে কেরামের ইজমা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত আছে। আম্বিয়ায়ে কেরাম যে দীন প্রতিষ্ঠা করেছেন তাতে এটা সুস্পষ্ট যে, আলম বা বিশ্ব ভূ-মণ্ডল ধ্বংসশীল, মৃত্যুর পরবর্তী জীবন নিশ্চিত, যাবতীয় জিনিসের স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ, তিনি ছাড়া সবকিছুই সৃষ্ট। এমনিভাবে রূহের ধ্বংস হওয়া ধ্রুব সত্য। ইসলামের স্বর্ণযুগে রূহ যে ধ্বংসশীল ও মাখলুক, এ বিষয়ে ঐকমত্য ছিলো। তখন কেউ এর বিরোধিতা করেননি। তাবিয়ীনের যামানা যখন শেষ হলো, তখন এমনি এক সম্প্রদায় দেখা দিলো যাদের কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে জ্ঞান ছিলো খুবই কম ও সীমাবদ্ধ। তারা দাবী করলো রূহ চিরন্তন, তা সৃষ্ট নয়, আর প্রমাণ হিসেবে তারা বললো, রূহ আল্লাহর নির্দেশ বৈ কিছু নয় আর আল্লাহর নির্দেশ সৃষ্টি থেকে মুক্ত। আল্লাহ তা'আলা তাঁর ইলম, তাঁর কিতাব, কুদরত, শ্রবণ, দর্শন ও হাতের ন্যায় রূহকেও নিজের বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ যেমনি চিরন্তন ও সৃষ্ট নন, রূহও ঠিক তেমনি চিরন্তন। তবে কেউ কেউ নিরপেক্ষতার খাতিরে বলেছেন, "আমরা রূহকে সৃষ্ট বা চিরন্তন কোনটাই বলি না।”

একবার কোন এক ব্যক্তি হযরত ইবনে মান্দাহ (র)-কে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো, আল্লাহ তা'আলা কি রূহকে মাখলুকের প্রাণ ও দেহের ব্যবস্থাপক হিসেবে তৈরি করেছেন? প্রশ্নকারীর অভিমত হলো, কেউ কেউ রূহকে সৃষ্ট নয় বলে দাবী করেন। তাঁরা আরো দাবী করেন, রূহ আল্লাহর যাত বা সত্তার অংশবিশেষ। নিম্নে আগেকার দিনের উলামায়ে কেরামের চিন্তাধারা ও ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করা হবে, আর পরে কুরআন ও হাদীসের আলোকে পক্ষের ও বিপক্ষের অভিমত তুলে ধরা হবে।

রূহ কি এবং নাফসের সাথে এর কি সম্পর্ক? এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কারো কারো মতে রূহ হলো সৃষ্ট। আহলে সুন্নাত ও আহলে হাদীস এই মত সমর্থন করেন। তাঁদের প্রমাণ হলো, এক. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, রূহ হলো একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী, যাদের সাথে একে অন্যের পরিচয় হয়, তাদের মধ্যে ভালোবাসা জন্মে। আর যাদের সাথে কোন পরিচয় হয় না, তারা অপরিচিত থেকে যায়। এর দ্বারা জানা যায় যে, রূহ সৃষ্ট। কেননা কোন সংঘবদ্ধ বাহিনী সৃষ্টই হয়ে থাকে। দুই, অন্য এক শ্রেণীর লোকের অভিমত এই যে, রূহ হলো আল্লাহর নির্দেশের আওতাধীন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি থেকে এর হাকীকত ও মা'রেফাত গোপন রেখেছেন। এই শ্রেণীর লোকের প্রমাণ হলো, আল্লাহ তা'আলার পবিত্র বাণী- “কুলিররূহু মিন আমরে রাব্বী।” অর্থাৎ আপনি বলে দিন যে, রূহ হলো, আমার রবের একটি হুকুম। তিন. আরেক শ্রেণীর লোকেরা বলেন, রূহ হলো, আল্লাহ চিরঞ্জীব নূর থেকে সৃষ্ট যা অমর। আর তাঁদের প্রমাণ হলো এই হাদীস- “আল্লাহ তা'আলা অন্ধকারের মধ্যে তার মাখলুক পয়দা করেছেন, তারপর এর উপর নিজের নূর অর্পণ করেছেন।” রূহ মৃত্যুবরণ করে কি করে না, বরযখ ও আখিরাতে দেহের সাথে রূহকে আযাব দেয়া হয় কি হয় না, রূহই নাফস না কি অন্য কোন কিছু- এ সম্পর্কে মতবিরোধ রয়েছে।

চার. হযরত মুহাম্মদ ইবনে নাসর মরূযী (র) বলেন, বেদীন ও রাফিযীগণ হযরত আদম (আ)-এর রূহ সম্পর্কে ঐ তাবীল বা বিকল্প অর্থ গ্রহণ করেছে, যা খ্রিস্টানগণ হযরত ঈসা (আ) এর রূহ সম্পর্কে গ্রহণ করেছেন। তা হলো হযরত ঈসা (আ)-এর রূহ আল্লাহর পবিত্র সত্তা থেকে পৃথক হয়ে হযরত মারইয়াম (আ)-এর মধ্যে এসে গেছে। এরূপ ধারণার ভিত্তিতে খ্রিস্টানদের এক সম্প্রদায় হযরত ঈসা (আ) ও হযরত মারইয়াম (আ)-এর পূজা আরম্ভ করে। কেননা তাদের ধারণা হযরত ঈসা (আ) আল্লাহ তা'আলারই রূহ যা হযরত মারইয়াম (আ)-এর মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছিলো। এজন্য খ্রিস্টানদের মতে রূহ সৃষ্ট নয়।

পাঁচ. বেদীন ও রাফিযীদের এক সম্প্রদায়ের ধারণা যে, হযরত আদম (আ)-এর রূহও এই শ্রেণীর যা সৃষ্ট নয়। তাঁরা এই আয়াতে পাকের দ্বারা তাঁদের প্রমাণ পেশ করে থাকেন- ওয়া নাফখতু ফীহে মিরূহি। অর্থাৎ “আমি তাঁর মধ্যে নিজ রূহ ফুঁকে দিয়েছি।” সুম্মা সাওওয়াহু ওয়া নুফিখা ফীহে মিররূহি। অর্থাৎ “আল্লাহ তা'আলা তাঁকে ঠিক মতো পয়দা করে তাঁর মধ্যে স্বীয় রূহ ফুঁকে দিয়েছেন।” বিধর্মী ও রাফিযীরা এ আয়াতের ভুল অর্থ করে থাকে, আর বলে থাকে হযরত আদম (আ)-এর রূহও সৃষ্ট নয়। আর যারা রূহকে নূর বলে তারা এই অর্থ গ্রহণ করে যে, আল্লাহর নূর সৃষ্ট নয়। তারা আরো বলে থাকে, এই রূহ হযরত আদম (আ) থেকে পর্যায়ক্রমে তাঁর বংশধরদের মধ্যে এসেছে। তারপর হযরত হাসান (রা) ও হযরত হুসাইন (রা)-এর মধ্যে এসেছে এবং পরবর্তী ইমামগণের মধ্যে এসেছে। কাজেই ইমামগণ কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া এই নূর পেয়ে আসছেন। এ বিষয়ে তাঁদেরকে কোন কিছুর শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন হয় না। এটাই রাফিযীদের বিশ্বাস। রূহ যে সৃষ্ট এ বিষয়ে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। সে রূহ নবী রাসূলগণের হোক বা অন্য কোন সাধারণ লোকেরই হোক। আল্লাহ তা'আলা সকল রূহকে সৃষ্টি করেছেন এবং অস্তিত্ব দান করেছেন। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- "আল্লাহ তা'আলা আকাশ-যমীনের সমস্ত মাখলুক তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন।” (সূরা জাসিয়া: আয়াত-১৩)

ছয়. এই প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র)-এর অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলো: তিনি বলেন, সমস্ত আহলে সুন্নাত, আম্বিয়ায়ে কেরাম, অতীতের সকল উম্মতের ইজমা বা ঐকমত্য এই যে, রূহ সৃষ্ট। অনেক ইমাম এই অভিমতের উপর উলামায়ে কেরামের ইজমা সংকলন করেছেন। তাঁদের মধ্যে হযরত মুহাম্মদ ইবনে নাসর মরূযী (র) যিনি ছিলেন, তাঁর যুগের একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেষ্ঠ আলিম। এমনিভাবে হযরত আবু মুহাম্মদ কুতায়বা (র) রূহ সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেছেন, 'নাসামা' শব্দের অর্থ রূহ এবং এটা হলো সৃষ্ট। সকল বিজ্ঞ আলিমের এই বিষয়ে ইজমা এই যে, আল্লাহ তা'আলা বীজ অঙ্কুরণকারী ও রূহ সৃষ্টিকারী। হযরত আবু ইসহাক ইবনে সাকিলা (র) এই বিষয়ে উল্লেখ করেছেন যে, সত্য অনুসারীদের মতে রূহ যে সৃষ্ট এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এছাড়া শ্রেষ্ঠ স্থানীয় উলামা ও মাশায়েখগণ এই অভিমত গ্রহণ করেছেন। যাঁরা মনে করেন যে, রূহ সৃষ্ট নয়, তাঁদের অভিমতকে তাঁরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। হযরত আবু আবদুল্লাহ ইবনে মান্দাহ (র) এই বিষয়ের সমর্থনে একখানা বৃহৎ গ্রন্থও রচনা করেছেন। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে নাসর মরূযী (র) প্রমুখ এবং শাইখ আবু সায়ীদ খারায (র), আবূ ইয়াকূব নহরজুরী (র) এবং কাযী আবুল উলা (র) উক্ত গ্রন্থের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অনেক বড় বড় ইমাম এই গ্রন্থের বিষয়বস্তুকে সমর্থন করেছেন। যাঁরা হযরত ঈসা (আ) এর রূহ সৃষ্ট নয় বলে থাকেন, তাঁদেরকে তিনি তীব্র ভাষায় তিরস্কার করেছেন। ইমাম আহমদ (র) রূহ সম্পর্কে বেদীন ও জাহমিয়া সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত মতবাদকে খণ্ডন করেছেন।

জনৈক জাহমী দাবী করেছেন যে, পবিত্র কুরআনের এমন একটি আয়াত আছে, যেখানে উল্লেখ আছে- কুরআন সৃষ্ট। আর সে আয়াতটি হলো- ইন্নামাল মাসীহু ঈসা ইবনু মারইয়ামা রাসূলুল্লাহি ওয়া কালিমাতুহু আলকাহা ইলা মারইয়ামা ওয়া রূহুম মিনহু। অর্থাৎ “ঈসা ইবনে মারইয়াম আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর কালিমা যাঁকে আল্লাহ মারইয়ামের প্রতি প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর রূহ যেটা তাঁরই কাছ থেকে আগত।” (সূরা নিসা: আয়াত-১৭১) তাই হযরত ঈসা (আ) হলেন মাখলুক বা সৃষ্ট। উত্তরে জাহমীকে বলা হলো, আল্লাহ তা'আলা তোমার নিকট থেকে কুরআনের জ্ঞান ছিনিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ তুমি কুরআন সম্পর্কে একেবারই অজ্ঞ। হযরত ঈসা (আ)-এর জন্য এমন সব ভাষা প্রয়োগ করা হয় যা কুরআন সম্পর্কে প্রয়োগ করা যায় না। যেমন, তাঁকে মৌলুদ, দুগ্ধপোষ্য শিশু, চালাক চতুর বালক, বুদ্ধিমান নওজোয়ান ও পানাহারকারী বলা হয়।

হযরত ঈসা (আ), হযরত নূহ (আ) ও হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর। তাই হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে আমরা যে উক্তি করতে পারি, কুরআন সম্পর্কে সেরূপ উক্তি করা আমাদের জন্য মোটেই বৈধ বা উচিত নয়। একথাটি কি কেউ দাবী করতে পারে যে, আল্লাহ হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে যা বলেছেন তাই কুরআন সম্পর্কেও বলেছেন। এ আয়াতের অর্থ হলো- 'কালিমা' মানে 'কুন' বা হয়ে যাও। 'কুন' যে আল্লাহ তা'আলার বাণী তাও সৃষ্ট নয়। হযরত ঈসা (আ) 'কালিমায়ে কুন' দ্বারা পয়দা হয়েছেন। আসলে, তিনি 'কালিমায়ে কুন' নন। হযরত ঈসা (আ) এ কালিমার দ্বারা পয়দা হয়েছেন, কাজেই তিনি মাখলুক।

ঈসায়ী ও জাহমীগণ হযরত ঈসা (আ) এর সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে। জাহমীরা বলে যে, হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর রূহ ও তাঁর কালিমা। জানা গেলো যে, কালিমা হলো মাখলুক। তাই হযরত ঈসা (আ) হলেন মাখলুক। ঈসায়ীরা বলে যে, হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর রূহ ও তাঁর কালিমা। আর তিনি আল্লাহর সত্তার একটি অংশ। যেমন বলা হয়, এই কাপড়খানা এই থানের। আমরা বলবো, হযরত ঈসা (আ) কালিমার দ্বারা পয়দা হয়েছেন। তবে তিনি মূল কালিমা নন। কেননা কালিমা তো আল্লাহর বাণী ‘কুন’। আর ‘রুহুম মিনহু’ এর অর্থ হলো- তাঁর মধ্যে আল্লাহ্‌ তা'আলার হুকুমের রূহ আগমন করেছে। আল্লাহ্‌ তা'আলা ঈসাকে বলছেন, “আল্লাহ্‌ তা'আলা আকাশ যমীনের সমস্ত মাখলুক তোমাদের অধীনে করে দিয়েছেন তাঁর পক্ষ থেকে অর্থাৎ তাঁর নির্দেশে।” (সূরা জাশিয়াঃ আয়াত-১৩)

‘রুহুল্লাহ’ শব্দের অর্থ হলো- আল্লাহ্‌ তা'আলা নিজ কালিমা বা কুন শব্দের দ্বারা যেই রূহ পয়দা করেছেন, সেই রূহ। যেমন, আবদুল্লাহ্‌- আল্লাহর বান্দা, সামাউল্লাহ্‌- আল্লাহর আকাশ, আরদুল্লাহ্‌- আল্লাহর যমীন প্রভৃতি বলা হয়ে থাকে। ইমাম আহমদ (র) এ কথার ব্যাখ্যায় বলেছেন, হযরত ঈসা (আ)-এর রূহ মাখলুক বা সৃষ্ট। তাহলে অন্যান্য রূহও যে সৃষ্ট তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ্‌ তা'আলা নিজের দিকে এ রূহকে সম্বোর্ডন করেছেন, যে রূহকে হযরত মারইয়াম (আ)-এর নিকট প্রেরণ করা হয়েছিলো। কাজেই ঈসা (আ) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। এর দ্বারা এটা জরুরি নয় যে, রূহ হবে চিরন্তন। আল্লাহ্‌ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ফায়ানারসালনা ইলাইহা রুহানা ফাতা মাছালা লাহা বাশারান সাভিয়্যা। কালাত ইন্নি আউজু বিররাহমান্নি মিনকা ইন্ কুনতা তাক্বিয়া। কালা ইন্নামা আনা রাসুলু রাব্বিকি লিআহাবা লাকিয়া গুলামান যাক্বিয়া। অর্থাৎ “তারপর আমি মারইয়াম (আ)-এর প্রতি স্বীয় রূহ প্রেরণ করেছি। আর তাঁর সামনে সেই রূহ ইনসানী আকৃতিতে প্রকাশিত হলো। তিনি বললেন, আমি তোমার থেকে রহমানের আশ্রয় চাই, যদি তোমার মধ্যে আল্লাহ্‌র ভয় থাকে। সে বললো, আমি তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত, আমি তোমাকে এক পবিত্র পুত্র প্রদান করবো।” (সূরা মারইয়ামঃ আয়াত-১৭-১৯) এই রূহ ছিল আল্লাহ্‌ তা'আলার প্রেরিত, আর তিনি ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর প্রতি সম্বোধন করা হয়েছে এরূপ বহুসমূহের রকমারি বর্ণনা নিয়ে উল্লেখ করা হলো। এখানে আরো বর্ণনা করা হবে কখন আল্লাহর সম্বোধন করা বন্ধু তাঁর চিরন্তন গুণে গুণান্বিত হয়, আর কখন তা মাখলুক হিসেবে গণ্য হয় আর এর ফলমূলই বা কী?

এক. আল্লাহ্‌ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ্‌ স্বালিকু কুল্লে শাইইন। অর্থাৎ “আল্লাহ্‌ প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা।” (সূরা আয-যুমারঃ আয়াত-৬২) এখানে স্রষ্টা শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ্‌ যে স্রষ্টা, এর মধ্যে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। এখানে আল্লাহ্‌ তা'আলার গুণাবলীর সাথে কোন রকমের কিছু মিশতে বা প্রবেশ করতে পারে না, কেননা আল্লাহ তা'আলা হলেন মা'বৃদ এবং তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর জ্ঞান, কুদরত, স্থিতিশীলতা, ইচ্ছা, শ্রবণ, দর্শন এবং অন্যান্য গুণাবলী তাঁর পবিত্র নামের মধ্যে বিদ্যমান আছে, এই সব গুণ তাঁর সৃষ্টির সাথে সম্যক যুক্ত নয়। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাঁর সত্তা ও গুণসহ স্রষ্টা। আর অন্য সিফাত বা গুণাবলীর সাথে রূহের কোন সম্পর্ক নেই। বরং এটি আল্লাহর কর্মকুশলতার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। ফেরেশতা, জিন ও মানুষের ন্যায় রূহও একটি সৃষ্টি।

দুই. আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ওয়াকাদ খালাকতুকা মিন কাবলু ওয়ালামতাকু শাইয়া, অর্থাৎ “(হে যাকারিয়া) আমি তো এর পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি এবং তুমি কিছুই ছিলে না।” (সূরা মারইয়াম : আয়াত-৯) উল্লেখ্য যে, এখানে এই সম্বোধনটি যাকারিয়া (আ)-এর রূহ ও দেহ উভয়কেই করা হয়েছে। শুধু তাঁর দেহকে সম্বোধন করা হয়নি। যেহেতু দেহের মধ্যে কোন বোধশক্তি, জ্ঞান, অনুভূতির যোগ্যতা নেই। এই যোগ্যতা আছে কেবল রূহের। তাই জানা গেলো- রূহ মাখলুক বা সৃষ্ট।

তিন. আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ওয়াল্লাহু খালাকাকুম ওয়ামা তা'মালুন। অর্থাৎ “আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের কর্মসমূহকে।” (সূরা আসসাফফাত : আয়াত-৯৬)

চার. আল্লাহ তা'আলা পাক কালামে ইরশাদ করেছেন, ওয়া লাকাদ খালাকনাকুম সুম্মা সাওয়ারনাকুম সুম্মা কুলনা লিলমালায়িকাতিস জুদ লিআদামা। অর্থাৎ “আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের আকৃতি দান করেছি। তারপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি, আদমকে সিজদাহ করো।" (সূরা আ'রাফ: আয়াত-১১) এখানেও রূহ এবং দেহ উভয়কে বুঝানো হয়েছে। তবে কারো কারো মতে এখানে কেবল রূহকে বুঝানো হয়েছে। উভয় অর্থেই রূহ যে সৃষ্ট সেটাই প্রমাণ করে।

পাঁচ. কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা মানুষ ও অন্য সব সৃষ্টির রব। কাজেই তাঁর রাবুবিয়াত আমাদের দেহ ও রূহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দেহের ন্যায় রূহও আল্লাহর অধীন। যতো কিছু আল্লাহর অধীন সবই তার সৃষ্ট। সুতরাং রূহও আল্লাহর সৃষ্ট।

ছয়. কুরআনুল হাকীমের প্রথম সূরা- সূরায়ে ফাতিহা থেকে একাধিকভাবে জানা যায় যে, রূহ আল্লাহর মাখলুক বা সৃষ্ট। (ক) এই সূরায় আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, তিনি রাব্বুল আলামীন। যেহেতু আলম বা জগতের মধ্যে রূহ বিদ্যমান আছে, সেহেতু রূহেরও রব আছেন। (খ) এই সূরায় আরো উল্লেখ আছে, আমরা তোমারই ইবাদত করি ও তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। সুতরাং রূহ সৃষ্ট। (গ) রূহ আপন স্রষ্টার নিকট হিদায়াতের মুখাপেক্ষী এবং সরল পথের প্রার্থী। (ঘ) রূহের প্রতি আল্লাহর দয়া ও পুরস্কার বর্ষিত হয়, পক্ষান্তরে, কোন কোন রূহের উপর শাস্তি ও অভিশাপ নেমে আসে। এই অবস্থা কেবল মাখলুক বা সৃষ্টির ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, যা চিরন্তন ও সৃষ্ট নয়, তাদের ক্ষেত্রে এটা হয় না।

সাত. এসব প্রমাণ দ্বারা এটাই জানা যায় যে, মানুষ আল্লাহর বান্দা। সুতরাং আল্লাহর ইবাদত রূহকে ছাড়া শুধু দেহের দ্বারা হতে পারে না। আসলে, ইবাদত-বন্দেগী রূহ ও দেহ উভয়ের। যেমন দেহের যাবতীয় বিধি-বিধান রূহের অধীন। রূহ দেহের মধ্যে গতি সঞ্চার করে ও কাজ করিয়ে নেয়।

আট, আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, হাল আতা 'আলাল ইনসানে হীনুম মিনাদ্দাহারে লাম ইয়াকুন শাইয়াম মাযকূরা। অর্থাৎ "নিশ্চয় মানুষের উপর এমন সময়ও অতিবাহিত হয়েছে যখন কোথাও তার কোন নাম নিশানাও ছিলো না।" (সূরা দাহর: আয়াত-১-৩) রূহ যদি চিরন্তন হতো তাহলে তার নাম নিশানা সবসময় বিদ্যমান থাকতো। আসলে মানব জীবনের যাত্রা শুরু হয় রূহের দ্বারা, দেহের দ্বারা নয়। এ প্রসঙ্গে আরবি কবিতার একটি পঙ্ক্তি এখানে উল্লেখ করা হলো: ইয়া খাদিমাল জিসমে কাম তাশাক্কা বিখিদমাহিহি, ফা আনতা বিরূহি লা বিল জিসমি ইনসানু। অর্থাৎ “হে দেহের সেবক, দেহের সেবা করে আর কত কষ্ট পাবে, তুমি তো দেহের দ্বারা নও, রূহের দ্বারাই ইনসান।"

নয়, আল্লাহ তা'আলা সবসময় বিদ্যমান ছিলেন, আছেন ও থাকবেন। প্রথমে তিনি ছাড়া অন্য আর কোন কিছু ছিলো না। একদল ইয়ামানবাসী একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে আরয করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা দীন ইসলামের জ্ঞান লাভ করার জন্য আপনার কাছে এসেছি। আপনি বলুন, দুনিয়ার সূচনা কিভাবে হয়েছে? তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা ছিলেন, তিনি ব্যতীত অন্য আর কেউ বা কিছু ছিলো না। তাঁর 'আরশ পানির উপর ছিলো। তারপর তিনি সকল বস্তুর নাম লিখে নিলেন। (বুখারী) এর দ্বারা জানা গেলো, আল্লাহ চিরন্তন, রূহ বা নাফস চিরন্তন নয়। তাই আল্লাহ তা'আলা অনাাদি ও অনন্ত। তাঁর কোন সমকক্ষ নেই।

দশ. আল্লাহর ফেরেশতারাও মাখলুক বা সৃষ্ট। এছাড়া ফেরেশতারা এমনি ধরনের রূহ যারা দেহ থেকে মুক্ত। এদেরকে মানুষ ও মানুষের রূহের অনেক আগেই সৃষ্টি করা হয়েছিলো। তারপর ফেরেশতারা যখন মানুষের দেহে রূহ ফুঁকে দেন তখন সেটা মাখলুক বা সৃষ্ট হয়ে যায়। যে রূহ ফেরেশতার মাধ্যমে মানবদেহে ফুঁকে দেয়া হয়, তা কি করে চিরন্তন হয়? যারা ভ্রান্তিতে নিপতিত তাদের ধারণা এই যে, ফেরেশতাদেরকে চিরন্তন ও অনাদি রূহসহ পাঠানো হয়। আর তাঁরা ঐ রূহকে মানবদেহে প্রবিষ্ট করে দেন। যেমন পোশাক সহকারে একজন মানুষকে অন্য কোন ব্যক্তির কাছে পাঠানো হয়ে থাকে যেন তিনি তার কাছে গিয়ে এই পোশাকটি তাকে পরিয়ে দেন। কিন্তু এটা চরম পথভ্রষ্টতা ও প্রতারণা বৈ আর কিছু নয়। আসলে, ফেরেশতারা রূহকে মানবদেহে ফুঁকে দেন এবং এভাবেই রূহের সৃষ্টি হয়। আর দেহ জরায়ুতে শুক্রের দ্বারা তৈরি হয়, তাই রূহের উপাদান হলো আসমানী, আর দেহের উপাদান হলো যমীনি। কোন কোন রূহে আসমানী উপাদান প্রাধান্য লাভ করে। আর সে রূহ ঊর্ধ্বলোকের পবিত্র ফেরেশতাদের সাথে থাকার যোগ্যতা অর্জন করে। অপরপক্ষে, কোন কোন রূহে যমীনি উপাদান প্রাধান্য লাভ করে। আর সেই রূহ নিম্নস্তরের ও নিম্নমানের রূহদের সাথে থাকার যোগ্য হয়। সুতরাং ফেরেশতা হলো রূহের সৃষ্টির বাহন আর মাটি হলো দেহের উপাদান।

এগারো, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "রূহ হলো একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী।" তাই এরা সৃষ্ট। হযরত আবূ হুরাইরা (রা), হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা), হযরত সালমান ফারেসী (রা), ইবনে আব্বাস (রা), ইবনে মাসউদ (রা), হযরত ইবনে উমর (রা), হযরত আলী (রা), হযরত আমর ইবনে আবাসা (রা) প্রমুখ থেকে এই হাদীসটি বর্ণিত।

বার, মৃত্যুজনিত কারণে অথবা আটক রাখা বা ছেড়ে দেয়ার কারণে রূহ দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি হলো মাখলুকের একটি অবস্থা। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- “আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুর মাধ্যমে রূহকে তুলে নেন। আর যেসব রূহ জীবিত থাকে, তাদেরকেও নিদ্রার সময়ে উঠিয়ে নেন। তারপর ঐসব রূহকে আটক করে নেন যেগুলোর মৃত্যু নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। বাকী সব রূহকে তাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ছেড়ে দেন।" (সূরা আয যুমার: আয়াত-৪২) এই আয়াতে 'আনফুসু' শব্দের দ্বারা রূহকে বুঝানো হয়েছে।

হযরত আবূ কাতাদা আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত: আমরা একবার এক রাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সফরে রওয়ানা হলাম। পথিমধ্যে বিরতির জন্য তাঁর খিদমতে আবেদন জানানো হলো। তিনি বললেন, তোমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমাদেরকে নামাযের জন্য কে জাগাবে? হযরত বিলাল (রা) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি আপনাদেরকে জাগাবো। সুতরাং সেখানে অবস্থান করার ব্যবস্থা হলো। আর সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন। হযরত বিলাল (রা) নিজ সওয়ারীর সাথে হেলান দিয়ে বসে রইলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনিও ঘুমিয়ে পড়লেন। তারপর সূর্যের কিছু অংশ দেখা দেয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুম ভাঙলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কিহে বিলাল, তুমি তো বেশ আমাদেরকে জাগিয়েছো। হযরত বেলাল (রা) আরয করলেন, আল্লাহর কসম, এরূপ ঘুম আমার আর কখনো হয়নি যেমন আজ হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তা'আলা যতোক্ষণ ইচ্ছা তোমাদের রূহকে আটক রেখে দেন, আর যখন ইচ্ছা ছেড়ে দেন। (বুখারী, মুসলিম) সুতরাং আটক রূহ বলতে ঐ রূহকে বুঝায় যে রূহকে আল্লাহ তা'আলা মৃত্যু ও নিদ্রার সময় তুলে নেন। তারপর মৃত্যুর সময় তুলে নেয়া রূহকে আর ফিরিয়ে দেয়া হয় না। মৃত্যুর ফেরেশতা মৃত্যুপথ যাত্রী ব্যক্তির শিয়রে এসে বসেন, আর তার দেহ থেকে রূহ কবয করেন আর জান্নাতে অথবা জাহান্নামের কাফন তাকে পরিয়ে দেন। তারপর আসমানে নিয়ে যান। পথিমধ্যে যেসব ফেরেশতাদের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়, তাঁরা মৃত ব্যক্তি সৎ হলে তাঁর প্রশংসা করেন আর অসৎ হলে তাঁর নিন্দা করেন। এভাবে ঐ মৃত ব্যক্তির রূহকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সম্মুখে হাযির করা হয়। আর আল্লাহ তা'আলা তার সম্পর্কে ফয়সালা করে দেন। তারপর রূহকে যমীনের দিকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। আর মৃত ব্যক্তির রূহকে তার কাফনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কবরের মধ্যে মুনকার-নাকীর মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করেন এবং অবশেষে মৃত ব্যক্তিকে আযাব বা আরাম দেয়া হয়। নেকাকরদের রূহকে সবুজ রংয়ের পাখির মধ্যে রাখা হয় আর তারা বেহেশতী নি'আমত ভোগ করেন। পক্ষান্তরে, বদকারদের রূহ সকাল সন্ধ্যা আগুনে রাখা হয়। এটাই হলো সত্যকে স্বীকার করার ও মেনে নেয়ার শুভ ফল, আর অস্বীকার ও অবাধ্যতার পরিণতি।

মানুষের এই যে রূহ এটাই হলো ভালো কাজ ও মন্দ কাজের চালিকা শক্তি। এই রূহই আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে এবং ক্ষেত্র বিশেষ আল্লাহর হুকুম আহকামের বিরোধিতাও করে। মানুষের রূহই সকল সৎকাজ বা অসৎকাজের জন্য দায়ী, পুরস্কার বা তিরস্কার রূহই লাভ করে। রূহের আবার তিনটি শ্রেণী রয়েছে: এক- আম্মারাহ অর্থাৎ অসৎকাজের নির্দেশ দানকারী রূহ। দুই- মুতমায়িন্নাহ অর্থাৎ প্রশান্ত আত্মা। যে আত্মা আল্লাহর যিকর ও বন্দেগীর মাধ্যমে অপার পরিতৃপ্তি লাভ করে। তিন- লাউয়ামাহ অর্থাৎ রূহের দ্বিমুখী অবস্থা। ভালো কাজ না করলে একদিকে রূহ যেমন তিরস্কার করে অন্যদিকে তেমনি খারাপ কাজ করলে ক্ষুব্ধ হয় ও ভর্ৎসনা করে। রূহের এই যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও রূপ এটাই প্রমাণ করে যে, রূহ সৃষ্ট, চিরন্তন নয়। আর রূহকেই আরাম বা আযাব দেয়া হয়। রূহের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য এভাবেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। এই রূহকে আটক করা হয় বা ছেড়ে দেয়া হয়। রূহই সুখ ভোগ করে বা ভয়-ভীতির সম্মুখীন হয়ে থাকে। রূহের ঐসব গুণ মাখলুকেরই বৈশিষ্ট্য।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিদ্রা যাওয়ার আগে এ দু'আ পাঠ করতেন- আল্লাহুম্মা খালাকতা নাফসী ওয়া আনতা তাতাওয়াফফাহা, লাকা মামাতুহা ওয়া মাহইয়াহা, ফাইন আমসাকতাহা ফারহামহা ওয়া ইন আর সালতাহা ফাহফিযু বিমা তাহফিযু বিহি ইবাদাকাস সালিহীন। অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তুমি আমার রূহ সৃষ্টি করেছো এবং তুমিই তাকে তুলে নেবে, আর এ রূহের জীবন ও মরণ তোমারই হাতে। তারপর তুমি যখন একে আটক করবে তখন তাকে রহম করবে। আর তুমি যদি এ রূহ মুক্ত করে দাও, তাহলে নেক বান্দাদের ন্যায় তার হিফাজত করো।"

ওয়া হুয়া তা'আলা বারিউনুফুসি কামা হুয়া বারিউল আজসাদ। অর্থাৎ “আল্লাহ তা'আলা দেহের ন্যায় রূহেরও স্রষ্টা। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, মা আসাবা মিম মুসিবাতিন ফিল আরদে ওয়ালা ফী আনফুসিকুম ইল্লা ফী কিতাবিন মিন কাবলি আন নাবরায়াহা। অর্থাৎ “তোমাদের জীবনের উপর দুনিয়ার যেসব বিপদাপদ আসে, সেসব আসার পূর্বেই একটি কিতাবে তা সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকে।” (সূরা আলহাদীদ: আয়াত-২২) উল্লেখ্য যে, এখানে এই আয়াতে উল্লেখিত 'নাবরায়াহ' শব্দের সর্বনাম যমীনের সাথে যুক্ত। আর অন্য এক শ্রেণীর লোকের মতে 'আনফুসুকুম' এর সাথে যুক্ত। উল্লেখ্য যে, 'আনফুসুকুম' শব্দটি সর্বনামের কাছাকাছি হওয়ায় এটা জীবনের দিকে ফিরাটা সমীচীন। রূহ চিরন্তন স্রষ্টা থেকে কি করে স্বয়ং সম্পূর্ণ ও স্বাধীন হতে পারে, যখন সকল প্রয়োজনের জন্য তাকে তার স্রষ্টার নিকট মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। রূহ শুধু একটি সত্তাই নয়, বরং এর সকল কার্যকরণ ও গুণাবলী আল্লাহর দেয়া। রূহের সত্তার চাহিদা হলো নাস্তি অর্থাৎ রূহ থাকলে সবকিছুই আছে, আর রূহ না থাকলে কিছুই নেই। রূহ ততোটুকু নেকী অর্জন করে যতোটুকু আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। রূহ দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তা'আলা হিদায়াতের দ্বারা উপকৃত হয়। আল্লাহ তা'আলা রূহকে যতোটুকু সৎকাজের তাওফীক দান করেন, ততোটুকু সে অর্জন করে। আল্লাহ তা'আলা হিদায়াতের মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করে। আর আল্লাহর দেয়া জ্ঞানের চেয়ে অধিক কোন জ্ঞান সে লাভ করতে পারে না। এতেই প্রমাণিত হয়, রূহ একটি সৃষ্ট সত্তা। আল্লাহ মানুষের আকৃতি ও গঠন তৈরি করেছেন এবং ভালো মন্দ সম্পর্কে তার অন্তরে ধারণা দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি সকল রূহের স্রষ্টা এবং রূহের ভালো মন্দ সকল কাজেরও নিয়ন্তা। কোন রূহ অবিনশ্বর নয়, যেমন এক শ্রেণীর অজ্ঞ লোকেরা মনে করে, রূহ কোন কাজ কর্মের নিয়ন্ত্রকও নয়, যেমন কোন কোন নির্বোধ লোকেরা মনে করে। যদি রূহ চিরন্তন হতো, তাহলে নিজের অস্তিত্ব ও গুণাবলী ও পরিপূর্ণতায় স্বয়ং সম্পূর্ণ হতো। অথচ রূহ একান্তভাবেই মুখাপেক্ষী, আর এই যে নির্ভরশীলতা এটা তার সত্তাগত, অন্য কোন কারণে নয়। আল্লাহ তা'আলা অনাদি অনন্ত এবং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী তিনি পূত পবিত্র- এসব গুণ আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। রূহ দেহের মতো নশ্বর ও সৃষ্ট। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা আল্লাহর নিকট যাঞ্চাকারী আর আল্লাহ অভাবমুক্ত ও সকল প্রশংসার মালিক।" (সূরা ফাতির: আয়াত-১৫) এই যে সম্বোধন, এটা কেবল দেহকে করা হয়নি, দেহের সাথে রূহকেও করা হয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলার সার্বভৌমত্বে কেউ শরীক নেই। "অতঃপর, যখন কারো প্রাণ কণ্ঠাগত হয়, আর তখন তোমরা তাকিয়ে থাকো, এবং আমি তার অধিক নিকটে থাকি তোমাদের চেয়েও, কিন্তু তোমরা দেখতে পাওনা। যদি তোমাদের হিসাব-কিতাব না হওয়াটাই ঠিক হয়, তবে তোমরা এই আত্মাকে ফিরাও না কেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” (সূরা ওয়াকি'আহ: আয়াত-৮৩-৮৭) রূহ যে সৃষ্ট, এই আয়াতে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

রূহ সম্পর্কে যে নিয়ম-কানুন ও অবস্থা উপরে বর্ণিত হয়েছে এবং মৃত্যুর পর রূহের যে বরযখী অবস্থান নির্দেশ করা হয়েছে এর থেকে জানা যায় রূহ মাখলুক আর সেটা দিবালোকের মতো সমুজ্জ্বল এটা কোন প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। ভণ্ড ও পথভ্রষ্ট সুফী ও বিদ'আতী এবং কুরআন-হাদীসের ভুল ব্যাখ্যাদানকারী যদি না থাকতো তাহলে এসব প্রমাণের কোন প্রয়োজন হতো না। কিন্তু এক শ্রেণীর লোক ভ্রান্তির মধ্যে থাকায় রূহ সম্পর্কে এমন সব বক্তব্য রেখেছে যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন সাধারণ জ্ঞানী ব্যক্তি কোন সঠিক বক্তব্যকে অস্বীকার করতে পারেন না। কেবল আল্লাহর সত্তা ও তাঁর গুণাবলীই নয়, বরং আসমান যমীন ও অন্য সকল সৃষ্টি সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছুই মাখলুক ও সবকিছুই সৃষ্ট।

রূহকে যারা চিরন্তন বলে দাবী করেন, তাঁদের যুক্তি ও প্রমাণের উৎস হলো কুরআনুল হাকীমের ঐসব আয়াত যেসবের অর্থ সুস্পষ্ট নয়, তাঁরা রূহ সম্পর্কে যেসব সুস্পষ্ট আয়াত রয়েছে সেগুলো চতুরতার সাথে এড়িয়ে যান। এটাই সকল পথভ্রষ্ট ও বিদ'আতী ফিরকার অনুসারীদের কলা-কৌশল। কুরআন পাকের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবগুলো সুস্পষ্ট আয়াত এটাই প্রমাণ করে যে, রূহের স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আপনি বলে দিন যে, রূহ হলো আপনার পালনকর্তার আদেশে সৃষ্ট।” (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৮৫) ভ্রান্ত মতাবলম্বীরা এই আয়াতের দ্বারা রূহ যে চিরন্তন তা প্রমাণ করার চেষ্টা করে। তবে এখানে এই পবিত্র আয়াতে 'আমর' শব্দের অর্থ হবে 'মা'মূর' অর্থাৎ নির্দেশপ্রাপ্ত। আরবি ভাষায় 'আমর' শব্দটি মা'মূর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআন শরীফে বিভিন্ন জায়গায় 'আমর' শব্দটি মা'মূর অর্থে বহুল ব্যবহৃত। যথা- আতা আমরুল্লাহি। অর্থাৎ “আল্লাহর নির্ধারিত আযাব এসে গেছে।” লাম্মা জায়া আমরু রাব্বিকা। অর্থাৎ "যখন আপনার রবের নির্ধারিত আযাব আসলো।” ওয়ামা আমরুস সা'আতি ইল্লা কালামহিল বাছার। অর্থাৎ “কিয়ামতের নির্ধারিত সময় চোখের পলকে এসে যাবে। এমনিভাবে 'খালক' শব্দটি মাখলুক শব্দের অর্থে ব্যবহৃত হয়। রূহ যে চিরন্তন এই আয়াতগুলো সেটাই প্রমাণ করে।

আগেকার দিনের এক শ্রেণীর আলিম এ আয়াতগুলোর তাফসীর করেছেন যে, রূহ আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে মাখলুকের দেহে এসেছে। আর তাঁর মহিমায় মানব দেহে অবস্থান করছে। এই ব্যাখ্যা তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন রূহ সম্পর্কীয় আয়াতে রূহ বলতে মানুষের রূহকেই বুঝাবে। তবে এখানেও মতানৈক্য রয়েছে যে রূহ বলতে মানুষের রূহ না অন্য কোন বিশেষ রূহকে বুঝানো হয়েছে। আগেকার প্রায় সকল বিজ্ঞ আলিম একমত যে, এখানে রূহ বলতে ঐ রূহকে বুঝাবে, যে রূহ কিয়ামতের দিন ফেরেশতাদের সাথে দাঁড়াবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, ইয়াওমা ইয়াকুমুরূহু ওয়াল মালাইকাতু সাফফান। অর্থাৎ “যেদিন রূহ ও সব ফেরেশতারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে।” (সূরা নাবা: আয়াত-৩৮)

হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণনা করেছেন, একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে মদীনা মুনাওয়ারার কালোপাথরের এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে পথ চলছিলেন। পথে কয়েকজন ইয়াহুদীর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হলো। তারা তখন পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, চলো আমরা তাঁকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। একজন বললো, না, দরকার নেই। তিনি হয়তো এমন কথা বলবেন যা তোমাদের মনঃপূত হবে না। তবুও একজন ইয়াহুদী বললো আমি এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবোই। সুতরাং সে দাঁড়িয়ে বললো, আবুল কাসেম! রূহ কি? তিনি চুপ রইলেন। আমি বুঝতে পারলাম, তাঁর নিকট ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। ওহী আসা শেষ হলে তিনি "কুলির রূহ মিন আমরি রাব্বী" এই আয়াতটি পাঠ করে শুনালেন। (বুখারী) এখানে ইয়াহুদীরা মানুষের রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেননি বরং ঐ রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো, যা ওহী ছাড়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ ঐ রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যা আল্লাহর নিকট আছে এবং সে সম্পর্কে মানুষ অবহিত নয়।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছিলেন যে, একবার মক্কার কুরাইশরা উকবা ইবনে মুয়ীতকে এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়াকে মদীনার ইয়াহুদীদের নিকট নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিলো। তারা এসে ইয়াহুদীদেরকে বললো, আমাদের মধ্যে একব্যক্তি নবুয়তের দাবী করেছেন। তিনি আমাদের ধর্মে নেই এবং তোমাদের ধর্মেও নেই। ইয়াহুদীরা জিজ্ঞেস করলো, তাঁকে কারা মান্য করে? এরা বললো, গোলাম, দুর্বল, নীচ ও হীন শ্রেণীর লোকেরা তাঁকে মানে ও অনুসরণ করে। উচ্চ শ্রেণীর কোন ভদ্র ও সম্মানিত ব্যক্তি তাঁকে মানে না। ইয়াহুদীরা বললো, নবীর আবির্ভাবের সময় তো এসে গেছে। আর তোমরা যাঁর বর্ণনা দিচ্ছো, তিনি ঐসব অবস্থার সম্মুখীন হবেন। আমরা তোমাদেরকে তিনটি বিষয়ের কথা বলে দিচ্ছি। তোমরা তাঁকে গিয়ে এ প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করো। যদি তিনি ঐসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন তাহলে তিনি সত্য নবী, অন্যথায় মিথ্যাবাদী। তাঁকে গিয়ে ঐ রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো যে রূহকে আদম (আ)-এর মধ্যে ফুঁকে দেয়া হয়েছিল। তিনি যদি বলেন, রূহ আল্লাহর নিকট থেকে আগত, তাহলে বলবে, আল্লাহ এমন জিনিসকে কি করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন, যা তাঁর কাছ থেকে এসেছে। কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ প্রশ্ন করলে তিনি হযরত জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে "কুলির রূহু মিন আমরে রাব্বী" আয়াতটি নাযিল করেছিলেন। যার অর্থ হলো- "রূহ আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ বৈ কিছু নয়।” এছাড়া রূহ আল্লাহ তা'আলার কোন অংশ নয়। এর দ্বারা জানা গেলো, রূহ বলতে এখানে মানুষের রূহকে বুঝানো হয়েছে।

উপরের আলোচনা থেকে জানা গেলো, এখানে রূহ বলতে মানুষের রূহকেই বুঝানো হয়েছে। কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা এই রেওয়ায়েতটি ইমাম সুদ্দীর তাফসীর গ্রন্থে আবূ মালিক কর্তৃক বর্ণিত আছে। তবে সকল সিহাহ সিত্তা হাদীস গ্রন্থে এবং মুসনাদসমূহে এই রেওয়ায়েতের ধারা বর্ণনা ইমাম সুদ্দীর রেওয়ায়েতের পরিপন্থী। হযরত আ'মাশ (রা), মুগীরা ইবনে ইবরাহীম (রা) থেকে তিনি আলকামা (রা) থেকে আর তিনি হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহুদীদের একটি জামাআতের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রা) তাঁর সাথী ছিলেন। তখন ইয়াহুদীরা হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করলো। তিনি একটু চুপ থাকলেন। ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, তিনি বুঝতে পারলেন, যেন ওহী নাযিল হচ্ছে। তখনই এই আয়াতটি নাযিল হলো- "এবং তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আপনি বলে দিন, রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ বৈ আর কিছু নয়। এই বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। (সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত-৮৫) এটাই হযরত ইবনে মাসউদ (রা)-এর মূল বর্ণনা। সে সময় ইয়াহুদীরা বলেছিলো, তাওরাতে এরূপ কথাই লিপিবদ্ধ রয়েছে। (জারীর ইবনে আবদুল হামীদ প্রমুখ) এই প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতটি এই অর্থই ব্যক্ত করে। এসব হাদীসের দ্বারা সুদ্দী বর্ণিত হাদীসটি যে দুর্বল তা প্রমাণিত হলো। এই প্রসঙ্গে এটাও উল্লেখ্য যে, উক্ত ঘটনাটি মদীনা শরীফের, মক্কা শরীফের নয়। এই হাদীসে এবং হযরত ইবনে মাসউদ (রা)-এর হাদীসে উল্লেখ আছে যে, এই প্রশ্ন মদীনা শরীফে করা হয়েছিলো, মক্কা শরীফে নয়।

এখানে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর উপরে বর্ণিত রেওয়ায়েত সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা হলো। উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর বিষয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে পরস্পর বিরোধী রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। এই সংঘাত হয়তো বর্ণনাকারীদের পক্ষ থেকে হয়ে থাকবে, অথবা স্বয়ং হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর অভিমতগুলোর মধ্যে সংঘাত হয়ে থাকবে। এখন সংঘাতযুক্ত রেওয়ায়েতগুলো বর্ণনা করা হচ্ছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর সুদ্দী কর্তৃক বর্ণিত রেওয়ায়েতটি উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর দ্বিতীয় রেওয়ায়েতটি দাউদ ইবনে আবী হিন্দ ইকরামা (র) থেকে আর তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে যেই রেওয়ায়েত করেছেন এটা তার বিরোধী। স্বয়ং দাউদের এই রেওয়ায়েতে সংঘাত বিদ্যমান। সুতরাং হযরত মাসরূক (র) ও ইবরাহীম (র) ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া (র) থেকে আর তিনি দাউদ থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। হযরত মুহাম্মদ ইবনে নাসর মারুযী (র) এমনিভাবে উল্লেখ করেছেন। ইসহাক, ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া, দাউদ, ইকরামা (র) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে, একবার কুরাইশরা ইয়াহুদী সম্প্রদায়কে বলেছিলো যে, তোমরা আমাদেরকে এমন একটি প্রশ্ন বলে দাও, যেটা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পেশ করবো। তিনি সেটার সঠিক উত্তর দিতে পারেন কিনা সেটা আমরা পরীক্ষা করে নেবো। ইয়াহুদীরা তখন রূহ কি এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার জন্য বলে দিয়েছিলো। এটাই হলো এই পবিত্র আয়াতের শানে নুযূল। তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর প্রথম রেওয়ায়েত ও হযরত ইবনে মাসউদ (রা)-এর রেওয়ায়েতের মধ্যে অনৈক্য রয়েছে।

রূহ সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর তৃতীয় রেওয়ায়েত এই যে, হযরত হায়শুম, আবুল বাশার, মুজাহিদ, ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন- হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি বলে দিন যে, রূহ আল্লাহর নির্দেশের মধ্যে একটি নির্দেশ আর আল্লাহর মাখলুকের মধ্যে একটি মাখলুক। এই রূহ মানুষের আকৃতির ন্যায় আকৃতি বিশিষ্ট। আকাশ থেকে যখন কোন ফেরেশতা পৃথিবীতে আসেন, তাঁর সাথে একটি রূহ অবশ্যই থাকে। এই বর্ণনা দ্বারা জানা গেলো যে, এই রূহ ইনসানী রূহ নয় বরং অন্য আর কিছু।

রূহ সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর চতুর্থ রেওয়ায়েতটি আবদুস সালাম ইবনে হারব, খাসীফ, মুজাহিদ (র) উল্লেখ করে বলেন, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন- উক্ত আয়াতের তাফসীর কুরআনে বর্ণিত রূহ 'কুন' শব্দের সমার্থক বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ হে রাসূল আপনি বলে দিন যা আপনার রব আপনাকে জানিয়ে দিয়েছেন। এই রেওয়ায়েতের পরিপ্রেক্ষিতে খাসীফ (রা) থেকে ইকরামা (রা), ইবনে আব্বাস (রা) থেকে ইকরামা উল্লেখ করেছেন যে, ইবনে আব্বাস (রা) চারটি জিনিসের তাফসীর বর্ণনা করতেন না। সে চারটি জিনিস হলো- রাকীম, গিসলীন, রূহ এবং এই আয়াত "ওয়া সাখখারা লাকুম মা ফিসসামাওয়াতি ওয়ামাফিল আরদে জামীয়ামমিনহু।” অর্থাৎ এবং তোমাদের আয়ত্তাধীন করে দিয়েছেন যা কিছু আছে আসমানসমূহে এবং যা কিছু আছে যমীনে, স্বীয় নির্দেশে।” (সূরা আল জাসিয়াহ: আয়াত-১৩)

রূহ সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর পঞ্চম রেওয়ায়েত এই যে, হযরত জুবায়ের (র) এবং যাহহাক (র), ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন- ইয়াহুদীরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলো, তখন তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন- "কুলির রূহু মিন আমরি রাব্বী ওয়া মা উতীতুম মিনাল ইলমে ইল্লা কালীলা।" অর্থাৎ “আপনি বলুন রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশ বৈ কিছু নয় এবং তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।” (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৮৫) যদি তোমাদের কাছে তোমাদের সত্তার সৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তোমাদের খাদ্য ও পানীয় এবং গমনা-গমন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে তোমরা এসবের সঠিক উত্তর দিতে পারবে না। রূহের বিষয়টি ঠিক এই রকম।

রূহ সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর ষষ্ঠ রেওয়ায়েত হযরত আবদুল গনী ইবনে সায়ীদ, মূসা ইবনে আবদুর রহমান, ইবনে জরীজ আতা, ইবনে আব্বাস এবং মুকাতীল যাহহাক (র) প্রমুখ থেকে বর্ণিত। ইবনে আব্বাস (রা) এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেছেন, একবার কুরাইশরা মিলিত হয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যেহেতু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসত্য কথা বলেন না, আর তিনি আমাদের মধ্যে সততা বিশ্বস্তার সাথে জীবন-যাপন করছেন, তাই কুরাইশরা ইয়াহুদীদের নিকট প্রতিনিধি পাঠালো যাতে তাঁর সম্পর্কে তারা খোঁজ- খবর ও চিন্তা ভাবনা করে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। ইয়াহুদীরা তাঁর শুভাগমনের সুসংবাদ জানতে পেরেছিলো এবং প্রায়ই তারা তাঁর আলোচনা করতো। তিনি যে নবী হিসেবে আসবেন সেটা প্রকাশ করতো। আর তাঁকে সাহায্য করার আশাও পোষণ করতো। এছাড়া তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো, তিনি তাদের নিকট হিজরত করে আসবেন। আর তারা তাঁর সাহায্যকারী হবে। মক্কার কুরাইশদের প্রতিনিধিদল ইয়াহুদীদের নিকট তাঁর কাছে কি জিজ্ঞেস করা যায়, জানতে চাইলো। ইয়াহুদীরা বললো, তোমরা তাঁকে তিনটি বিষয় জিজ্ঞেস করবে। তাঁকে জিজ্ঞেস করবে রূহ সম্পর্কে অর্থাৎ রূহ কী? কেননা তাওরাতে শুধু 'রূহ' শব্দটি উল্লেখ আছে, এর কোন তাফসীর বা ব্যাখ্যা নেই। এই প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেছেন- "কুলির রূহু মিন আমরি রাব্বী।" রাসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে আসহাবে কাহাফের ও যুলকারনাঈনের ঘটনা তাদের কাছে বিশদভাবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু রূহের অবস্থা বা রহস্য অস্পষ্ট রেখেছিলেন ঠিক যেভাবে বিষয়টি পবিত্র গ্রন্থ তাওরাতে অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল। ইয়াহুদীরা কুরাইশদেরকে আরো বলেছিলো তিনি যদি এই তিনটি প্রশ্নের মধ্যে দুইটির উত্তর দিতে পারেন, তাহলে তিনি যে সত্য নবী সেটা প্রমাণিত হবে। সুতরাং কুরাইশগণ রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তর শুনে হতাশাগ্রস্ত ও লজ্জিত হয়ে পড়েছিলো।

পবিত্র কুরআনে 'রূহ' শব্দটির একাধিক অর্থ রয়েছে। এক. রূহের অর্থ ওহী। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, “ওয়া কাযালিকা আওহাইনা ইলাইকা রূহাম মিন আমরিনা।” অর্থাৎ “আর এমনিভাবে আমি আপনার কাছে ওহী প্রেরণ করেছি। আমার আদেশক্রমে।" (সূরা শূরা: আয়াত-৫২) আরো ইরশাদ হয়েছে- ইউলকির রূহা মিন আমরিহি আলা মাইয়াশাউ মিন ইবাদিহি। অর্থাৎ তিনি তাঁর বান্দাদের যার প্রতি ইচ্ছা ওহী প্রেরণ করেন স্বীয় আদেশসহ।” (সূরা মুমিন: আয়াত-১৫) ওহীকে রূহ বলা হয়, কেননা এর দ্বারা রূহ ও কালব জীবনীশক্তি লাভ করে।

দুই. রূহের অর্থ শক্তি, স্থায়িত্ব ও সহায়তা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, উলায়িকা কাতাবা ফী কুলুবিহিমুল ঈমানা ওয়া আইয়াদাহুম বিরূহিম মিনহু। অর্থাৎ "তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান সুদৃঢ় করেছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ থেকে রূহের দ্বারা।" (সূরা মুজাদালা: আয়াত-২২)

তিন. রূহের অর্থ জিবরাঈল (আ)। যেমন ইরশাদ হয়েছে, নাযালা বিহির রূহুল আমীনু আলা কালবিকা। অর্থাৎ "বিশ্বস্ত ফেরেশতা অর্থাৎ জিবরাঈল এটাকে নিয়ে অবতরণ করেছেন আপনার কালবে।” (সূরা শুআরা: আয়াত-১৯৩-১৯৪) আরো ইরশাদ হয়েছে- মান কানা আদুওয়াল লি জিবরীলা ফাইন্নাহু নাযযালাহু আলা কালবিকা বিইযনিল্লাহ। অর্থাৎ “আপনি বলে দিন, জিবরাঈলের সাথে যে শত্রুতা পোষণ করে তার জেনে রাখা দরকার, জিবরাঈল আল্লাহরই অনুমতিক্রমে এই কুরআন আপনার কালবে নাযিল করেছেন।" (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত-৯৭) আরো ইরশাদ হয়েছে- কুল নাযযালাহু রূহুল কুদুসি মিররাব্বিকা। অর্থাৎ “আপনি বলুন, আপনার রবের পক্ষ থেকে যথাযথভাবেই রুহুল কুদুস (জিবরাঈল) সত্যসহ কুরআন নিয়ে এসেছেন।" (সূরা নাহল: আয়াত-১০২)

চার. ঐ রূহ যার সম্পর্কে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলো। উত্তরে বলা হয়েছিলো- এটি হলো আমার রবের আদেশ থেকে একটি মাখলুক। এটি ঐ রূহ যার সম্পর্কে নিম্নের দু'টি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়াওমা ইয়াকুমুর রূহু ওয়াল মালায়িকাতু সাফফান। অর্থাৎ “যেদিন রূহ ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে।” (সূরা নাবা: আয়াত-৩৮) তানাযযালুলল মালায়িকাতু ওয়ার রূহু ফীহা বিইযনি রাব্বিহিম। অর্থাৎ “ফেরেশতাগণ ও রূহ এ রাতে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হয়।” (সূরা কদর : আয়াত-৪)

পাঁচ. রূহের অর্থ হযরত ঈসা (আ)। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- ইন্নামাল মাসীহু ঈসা ইবনু মারইয়ামা রাসূলুল্লাহি ওয়া কালিমাতুহু আলকাহা ইলা মারইয়ামা ওয়া রূহুম মিনহু। অর্থাৎ "নিঃসন্দেহে মারইয়াম তনয় ঈসা মসীহ ছিলেন আল্লাহর এক রাসূল এবং তাঁর একটি কালিমাহ, যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁরই (আল্লাহর) নিকট থেকে আগত একটি রূহ।” (সূরা নিসা : আয়াত-১৭১)

পবিত্র কুরআনে মানুষের রূহের অর্থে 'নাফস' শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে- ইয়া আইউহাতুন্নাফসুল মুতমায়িন্নাহ। অর্থাৎ “হে প্রশান্ত আত্মা।” (সূরা আল ফাজর: আয়াত-২৭) আরো ইরশাদ হয়েছে- ওয়া লা উকসিমু বিন্নাফাসিল্লাউয়ামাহ। অর্থাৎ “আরো শপথ করছি সেই মনের, যে নিজেকে খুব তিরস্কার করে।” (সূরা কিয়ামাহ: আয়াত-২) ইরশাদ হয়েছে- ইন্নান্নাফসা লা আম্মারাতুম বিসসুয়ি। অর্থাৎ "নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ।” (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৫৩) ইরশাদ হয়েছে- আখরিজ আনফুসাকুম। অর্থাৎ “বের করো স্বীয় আত্মা।” (সূরা আল আনআম: আয়াত-৯৩) আরো ইরশাদ হয়েছে- ওয়া নাফসিওঁ ওয়ামা সাওয়াহা, ফা আলহামাহা ফুজুরাহা ওয়া তাকওয়াহা। অর্থাৎ "শপথ আত্মার এবং যিনি তা সুবিন্যস্ত করেছেন, অতঃপর তাকে তার অসৎ কর্ম ও সৎ কর্মের জ্ঞান দান করেছেন। (সূরা আশ শামস: আয়াত ৭-৮) কুলু নাফসিন যায়িকাতুল মাউত। অর্থাৎ “প্রাণী মাত্রকেই মৃত্যুর আস্বাদন গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৮৫)

হাদীস শরীফে মানুষের রূহ সম্পর্কে 'নাফস' শব্দটির উল্লেখ আছে। এছাড়া রূহের অর্থ বুঝানোর জন্য রূহ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। রূহ আল্লাহ তা'আলার আমর বা নির্দেশ হওয়ার কারণে এটা যে চিরন্তন বা অবিনশ্বর তা প্রমাণিত হয় না।

রূহের সাথে আল্লাহর যে সম্পর্ক সে বিষয়ে এখানে কিঞ্চিত আলোকপাত করা হলো। আল্লাহ তা'আলার সাথে কোন কিছুর তুলনা করতে হলে তা দু'রকমভাবে করা হয়ে থাকে। আল্লাহ পাকের স্থায়ী গুণাবলী। যেমন- ইলম, কুদরত, কালাম, দর্শন, শ্রবণ, ইরাদাহ, জীবনী শক্তি এগুলো হলো আল্লাহর বিশেষ বিশেষ গুণের বিভিন্ন বিকাশ। আল্লাহ তা'আলার এসব গুণাবলী তিনি যে চিরন্তন তার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া তাঁর হাত ও চেহারা বলতে তাঁর কুদরতী হাত ও কুদরতী চেহারাকে বুঝায়।

দ্বিতীয় প্রকারের সম্পর্ক হলো- জওয়াহের বা মৌলিক পদার্থ যা আল্লাহ তা'আলা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। যেমন, বাইত (ঘর), নাকা (উটনী), আবদুন (বান্দা), রাসূল (প্রেরিত) এবং রূহ বা আত্মা। এসব হলো স্রষ্টার সাথে সৃষ্টের সম্পর্ক যা তাশরীফী নিসবত বা সম্মানসূচক সম্বোধন। যেমন কোন জিনিস প্রস্তুতকারীর সাথে এর স্থায়িত্ব বা উৎকৃষ্টতা প্রকাশ করার লক্ষ্যে সম্বোধন করা হয়। আর এরূপ সম্বোধন দ্বারা উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রকাশ পায়, যেমন বলা হয়, বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর, কিম্বা নাকাতুল্লাহ বা আল্লাহর উষ্ট্রী। অথচ প্রত্যেক ঘর ও প্রত্যেক উষ্ট্রীই আল্লাহর। এরূপ সম্বোধন দ্বারা আল্লাহ তা'আলার সাথে যাদের নিবিড় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন- ওয়া রাব্বুকা ইয়াখলুকু মাইয়াশাউ ওয়া ইয়াখতার। অর্থাৎ "আপনার রব যা ইচ্ছা পয়দা করেন এবং তাকে সেভাবেই মনোনীত করেন।” (সূরা কাসাস: আয়াত-৬৮) আল্লাহ তা'আলার সাথে রূহের যে সম্পর্ক তা একটি বিশেষ ও মৌলিক সম্পর্ক তা কোন সাধারণ বা অস্থায়ী সম্পর্ক নয়। বিষয়টি এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে বহু পথভ্রষ্টতা থেকে মানুষ রক্ষা পেতে পারে।

পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: ওয়া নাফাখতু ফীহি মির রূহি। অর্থাৎ “আর আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম।” (সূরা সোয়াদ: আয়াত-৭২) এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা যে রূহকে আদম (আ)-এর মধ্যে ফুঁকে দিয়েছিলেন সেটাই এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: খালাকতু বিইয়াদাইয়া অর্থাৎ “আমি নিজ হাত দিয়ে তাকে সৃষ্টি করেছি।" (সূরা সোয়াদ: আয়াত-৭৫) এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহ পাক যে নিজে আদম (আ)-কে সৃষ্টি করেছেন সেই কথাই এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি সহীহ হাদীসে এই সব বিষয় সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে- মানবমণ্ডলী হাশরের ময়দানে হযরত আদম (আ)-এর কাছে এসে আরয করবে, "আপনি মানব জাতির আদি পিতা! আপনাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কুদরতের হাতে পয়দা করেছেন। আর আপনার দেহে তাঁর রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। এছাড়া আপনাকে তাঁর ফেরেশতাদের দ্বারা সিজদাহ করিয়েছেন। আপনাকে সকল জিনিসের নাম শিখিয়ে দিয়েছেন।" উপরোক্ত হাদীসে মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ)-এর চারটি বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। ফেরেশতারা যদি আদম (আ)-এর পবিত্র রূহকে ফুঁকে দিতেন, তাহলে তাঁর মধ্যে এই সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকতো না। আর হযরত আদম (আ) ও হযরত ঈসা (আ) সাধারণ মানুষের পর্যায়ে হতেন। এখানে উল্লেখ্য যে, ফেরেশতারা মানুষের মধ্যে রূহকে ফুঁকে দিয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ রূহকে চিরন্তন বলে অভিহিত করেছেন। আবার কেউ কেউ নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছেন। উভয় দলই কুরআনের মর্মবাণী উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আল্লাহর সাথে রূহের যে সম্পর্ক তা এখানে উল্লেখ করা হলো।

রূহকে ফুঁকে দেয়ার বিষয়টি সম্পর্কে দু'টি মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, রূহ হলো চিরন্তন, আর কেউ কেউ মনে করেন রূহ চিরন্তন নয়। গ্রন্থকারের মতে এই উভয় ধারণাই ভ্রান্ত। কেননা তাঁরা কুরআনের মর্মবাণী সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। রূহের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক এটা একটি সম্মানসূচক সম্পর্ক। কোন একজন সম্মানিত ব্যক্তি একটি বাড়ি তৈরি করার পর যদি বলেন, আমি এই বাড়িটি তৈরি করেছি। এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি নিজ হাতে কাজ করে বাড়িটি তৈরি করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আ) সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন- "আমি আমার পক্ষ থেকে তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম।” (সূরা তাহরীম: আয়াত-১২) অর্থাৎ ফেরেশতাগণকে রূহ ফুঁকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। পবিত্র কুরআনে আরো উল্লেখ আছে, তাঁর (মারইয়াম আ.) নিকট ফেরেশতা পাঠিয়েছি। আর সে ফেরেশতা তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। অর্থাৎ ফেরেশতা আমার নির্দেশে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন।

যখন এই কথা সাব্যস্ত হলো যে রূহ ফুঁকে দেয়ার জন্য ফেরেশতা মুতায়েন রয়েছেন, তাহলে হযরত ঈসা (আ)-কে রূহুল্লাহ বলা হয় কেন? আর আদম (আ)-এর মধ্যেও কি ফেরেশতারা তাঁর রূহ ফুঁকে দিয়েছিলেন নাকি আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং ফুঁকে দিয়েছেন। এর উত্তর হলো- আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আ)-এর রূহ মুবারককে তাঁর নিজের রূহ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। এর দ্বারা জানা গেলো, হযরত ঈসা (আ)-এর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সমস্ত রূহের মধ্যে হযরত ঈসা (আ)-এর রূহকে বিশেষভাবে মনোনীত করেছেন। আর এই বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ প্রক্রিয়াকে ফেরেশতাদের উপর ন্যস্ত করেননি। কাজেই হযরত ঈসা (আ)-এর রূহের সাথে অন্য কোন রূহের তুলনা করা যায় না। তাঁর পবিত্র রূহ পিতার মাধ্যম ছাড়াই মাতৃগর্ভে স্থান লাভ করেছিলো। আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ)-এর পবিত্র রূহকে নিজেই ফুঁকে দিয়েছিলেন। হযরত আদম (আ) ঈসা (আ)-এর ন্যায় শুধু মায়ের দ্বারা পয়দা হননি। এছাড়া অন্যান্য মানুষের মতো মাতা পিতার মাধ্যমেও পয়দা হননি, বরং পিতা ছাড়াই তিনি পয়দা হয়েছিলেন। এটাই আদম (আ)-এর রূহের অনন্য বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-এর মধ্যে যে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন, পবিত্র কুরআনে তার উল্লেখ রয়েছে।

হযরত আদম (আ)-এর পবিত্র দেহ আল্লাহর কুদরতী হাতে সৃষ্টি হয়েছিলো। আর সেই দেহে তাঁর রূহ ফুঁকে দেয়া হয়েছিলো। আমাদের সহজ উপলব্ধির জন্য রূপকের সাহায্যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রূহ ফুঁকে দেয়ার যে প্রক্রিয়া এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা অন্য কারো সাথে যে সংশ্লিষ্ট নন, এ বিষয়ে মতানৈক্য রয়েছে। গ্রন্থকারের মতে রূহকে ফুঁকে দেয়ার যে প্রক্রিয়া আল্লাহর পবিত্র যাত বা সত্তা থেকে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। হযরত আদম (আ)-এর মধ্যে রূহ ফুঁকে দেয়ার যে প্রক্রিয়া, এটা হলো সৃষ্ট। আর সৃষ্ট রূহই হযরত আদম (আ)-এর রূহের মূল উপাদান। কাজেই তাঁর এই রূহ সৃষ্ট ও ধ্বংসশীল।

অবশ্য হযরত মারইয়াম (আ)-এর রূহকে ফুঁকে দেয়ার বিষয়টি ছিলো আল্লাহর একটি বিশেষ ব্যবস্থা। এই অলৌকিক ঘটনাটি আল্লাহ তা'আলার এক অনন্য কুদরত। এটা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার একটি ব্যতিক্রমধর্মী অভিব্যক্তি। হযরত আদম (আ)-এর মধ্যে রূহ ফুঁকে দেয়া আল্লাহর কোন প্রক্রিয়া হোক বা না হোক, উভয় অবস্থায়ই রূহ সৃষ্ট, যা চিরন্তন নয়। রূহ হযরত আদম (আ)-এর পবিত্র রূহেরই অন্যতম উপাদান বৈ আর কিছু নয়।

টিকাঃ
* এখানে মাত্র একটি প্রশ্নের উল্লেখ আছে।
* প্রশ্ন তিনটি হলো: এক. আসহাবে কাহাফের ঘটনাটি কী? দুই. যুলকারনাঈনের ঘটনাটি কী? তিন. রূহের অবস্থা কী? রাসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে আসহাবে কাহাফের ও যুলকারনাঈনের ঘটনা তাদের কাছে বিশদভাবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু রূহের অবস্থা বা রহস্য অস্পষ্ট রেখেছিলেন ঠিক যেভাবে বিষয়টি পবিত্র গ্রন্থ তাওরাতে অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল। ইয়াহুদীরা কুরাইশদেরকে আরো বলেছিলো তিনি যদি এই তিনটি প্রশ্নের মধ্যে দুইটির উত্তর দিতে পারেন, তাহলে তিনি যে সত্য নবী সেটা প্রমাণিত হবে। সুতরাং কুরাইশগণ রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তর শুনে হতাশাগ্রস্ত ও লজ্জিত হয়ে পড়েছিলো। —অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00