📄 মৃতদের রূহ জীবিতদের নেক আমল দ্বারা উপকৃত হয় কিনা বা মৃত ব্যক্তি নিজের নেক আমল দ্বারা উপকৃত হয় কিনা
ফকীহ, মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণের মতে জীবিতদের নেক আমল দ্বারা মৃতদের রূহ দু'ভাবে উপকৃত হয়। এক. একজন মৃত ব্যক্তি তার জীবনকালের নেক আমলের দ্বারা পরকালের উপকার লাভের পথ সুগম করে যেতে পারেন। দুই. যখন কোনো মুমিন বান্দা কোনো মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দু'আ, ইসতিগফার, সাদকাহ, হজ্জ ইত্যাদি আদায় করেন, তখন এসবের সওয়াব মৃতদের রূহে পৌঁছে যায়। তবে এ বিষয়ে মতভেদ আছে যে, দৈহিক আমলের সওয়াব মৃতদের রূহে পৌঁছে নাকি কেবল ধনসম্পদের বিনিময়ের সওয়াব মৃতদের রূহে পৌঁছে। এক শ্রেণীর আলিমের মতে কেবল দৈহিক আমলের সওয়াব মৃত ব্যক্তির রূহে পৌঁছে। কোনো কোনো হানাফী আলিমের মতে আর্থিক দানের সওয়াবও মৃত ব্যক্তির রূহে পৌঁছে থাকে।
আগেরকার দিনের অধিকাংশ আলিম এবং ইমাম আহমদ (র)-এর মতে, এসব নেক কাজের সওয়াব মৃত ব্যক্তির রূহে পৌঁছে। ইমাম আবু হানীফা (র)-এর কোনো কোনো সঙ্গী-সাথীও এই মত সমর্থন করেছেন। মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া কুহহাল (র) বলেন, একবার ইমাম আহমদ (র)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো পুণ্যের কাজ করে, যেমন- নামায, রোযা ও সাদকাহ ইত্যাদি এবং এসব আমলের অর্ধেক সওয়াব তার পিতা বা মাতার জন্য বখশিয়ে দেয়, তাহলে সে সওয়াব তাঁরা পাবেন কিনা? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, "হ্যাঁ, আমি আশা করি পাবে।” তিনি আরো বলেছেন, "মৃতের কাছে সকল নেক আমলেরই সওয়াব পৌঁছে থাকে।”
এই প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, তিনবার আয়াতুল কুরসী ও কুলহুআল্লাহ পড়বে, তারপর বলবে, “হে আল্লাহ, এর সওয়াব মৃত কবরবাসীদেরকে পৌঁছিয়ে দিন।” অবশ্য ইমাম শাফিয়ী (র) ও ইমাম মালিক (র)-এর মতে এ সমস্ত আমলের সওয়াব মৃতদের কাছে পৌঁছে না।
এক শ্রেণীর ভ্রান্ত যুক্তিবাদীদের মতে মৃতদের কাছে জীবিতদের নেক আমলের সওয়াব পৌঁছায় না। তবে প্রথম অবস্থায় অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি যখন জীবিত থাকে, তখন সে যে আমল করে, তার সওয়াব মৃত্যুর পরও তার কাছে পৌঁছতে থাকে। এ সম্বন্ধে সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কোনো মানুষ মারা যায়, তখন তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তার তিন রকমের আমল অবশিষ্ট থাকে। আর তা হলো, এক- সাদকা-ই-জারিয়াহ, দুই- ইলম, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়ে থাকে। তিন- নেক সন্তান, যারা তাদের মাতাপিতার জন্য দু'আ করে। এখানে যে তিনটি আমলের উল্লেখ করা হলো, তা আসলে মৃত ব্যক্তির অর্জিত নেক আমল, যার দ্বারা সে মৃত্যুর পরও সওয়াব লাভ করে।
সুনানে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একজন মুমিন ব্যক্তির মৃত্যুর পর যেসব নেক আমলের সওয়াব তার কাছে পৌঁছে, তাহলো এক- ঐসব ইলম যা তিনি অন্যদেরকে শিখিয়েছেন ও তা মানুষের মধ্যে প্রচারও করে গেছেন। দুই- ঐ নেক সন্তান, যাকে তিনি দুনিয়ায় রেখে গেছেন এবং যে তার জন্য দুআ করে। তিন- লোকদের জন্য যিনি কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করে গেছেন। চার- যিনি কোনো মসজিদ নির্মাণ করে গিয়ে থাকেন। পাঁচ- তিনি যদি কোনো মুসাফিরখানা নির্মাণ করে গিয়ে থাকেন। ছয়- তিনি যদি পানির কোনো সুব্যবস্থা করে গিয়ে থাকেন। সাত- তাঁর ঐসব সাদকাহ-খয়রাত যা তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় করে গেছেন। এই সমস্ত নেক আমলের সওয়াব মৃত্যুর পরও তাঁর কাছে পৌঁছতে থাকে।
সহীহ মুসলিমে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) কর্তৃক একটি হাদীস বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে কেউ ইসলামের মধ্যে সুন্নাতে হাসানাহ অর্থাৎ নেক নিয়মনীতি প্রচলন করে গেছেন, তবে তার সওয়াব তিনি পাবেন। ঐসব লোকের সমপরিমাণ সওয়াবও তিনি পাবেন, যাঁরা ঐসব সুন্নাতের অনুসরণ করেন। এতে আমলকারীদের সওয়াব হ্রাস পাবে না। অপরপক্ষে, যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো কুপ্রথা প্রচলন করবে, সে তার ঐ পাপের বোঝা বহন করবে, আর ঐসব লোকের সমপরিমাণ পাপের বোঝাও বহন করবে যারা এর উপর আমল করবে। কিন্তু এতে আমলকারীদের পাপের বোঝা হ্রাস পাবে না। এরূপ অনেক সহীহ ও হাসান হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে।
মুসনাদ গ্রন্থে হযরত হুযাইফা (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে একবার জনৈক ব্যক্তি মানুষের কাছে কিছু সাহায্য চেয়েছিলেন, প্রথমে তাকে কেউ কিছু দিলো না। পরে একজন লোক তাকে কিছু দিলো, তাঁর দেখাদেখি অন্যান্য লোকেরাও তাকে কিছু কিছু দান করলো। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, যে ব্যক্তি কোনো সুন্দর প্রথা চালু করে আর অন্যরাও তাকে অনুসরণ করে, সে ব্যক্তি নিজের আমলের সওয়াব তো পাবেই, ঐ সমস্ত লোকদের সমপরিমাণ সওয়াবও সে পাবে, যারা তাকে অনুসরণ করে কিন্তু এতে অনুসরণকারীদের আমলের কোনো সওয়াব হ্রাস করা হবে না। আর যে ব্যক্তি কুপ্রথা চালু করে এবং অন্যরাও তাকে অনুসরণ করে, সে তার পাপের বোঝা তো বহন করবেই, যারা তাকে অনুসরণ করবে ঐ সমস্ত লোকদের সমপরিমাণ পাপের বোঝাও সে বহন করবে, এতে অনুসরণকারীদের পাপের বোঝা মোটেই হ্রাস পাবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঐ পবিত্র বাণীর দ্বারাও একথা প্রমাণিত, যাতে বলা হয়েছে, কিয়ামত পর্যন্ত যতো লোককে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে, সে হত্যার পাপের একটি অংশ হযরত আদম (আ)-এর পুত্র কাবীলকেও বহন করতে হবে। কেননা সে-ই প্রথম ব্যক্তি, যে হত্যাজনিত পাপের প্রথম প্রচলন করেছিলো। অতএব আযাব ও আরাম সম্পর্কে যে নিয়ম-নীতি প্রযোজ্য, সওয়াব ও মাহাত্ম্যের ক্ষেত্রে একই নিয়ম-নীতি প্রযোজ্য।
দ্বিতীয়ত: নিজের আমল ছাড়াও অন্যদের আমলের দ্বারা যে মৃত ব্যক্তিরা উপকৃত হন, তার প্রমাণ কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও শরীআতের অন্যান্য নীতিমালার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "যারা তাদের পরে আগমন করেছে তারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের এবং ঈমানে অগ্রগামী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা করো এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, তুমি দয়ালু, পরম করুণাময়।” (সূরা আল হাশর: আয়াত ১০)
অগ্রগামী মুমিনদের জন্য দু'আ করার কারণে আল্লাহ তা'আলা পরবর্তী মুমিনদের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এর দ্বারা বুঝা গেলো যে, জীবিতদের মাগফিরাত দ্বারা মৃতরা উপকৃত হয়।
এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে যে, অগ্রগামীরা আগে ঈমান এনে ঈমান আনার সুন্নাত বা নিয়মনীতি পরবর্তীদের জন্য রেখে গেছেন। ফলে পরবর্তীরা ঈমান এনেছেন এবং তার সুফলও লাভ করেছেন। অর্থাৎ একজন মৃত ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় নেক আমলের কারণেই মৃত্যুর পর তাঁর কাছে ঐ সওয়াব পৌঁছেছে। এছাড়া জানাযার নামাযের মাধ্যমেও মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ করা হয়।
মুসলিম উম্মাহ এ বিষয়ে একমত যে, জানাযার নামাযের দ্বারা মৃতেরা উপকৃত হন। তাই আমরা মৃতদের জন্য দু'আ করে থাকি। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমরা কোনো মৃতের জন্য দু'আ করো, তখন একনিষ্ঠভাবে দু'আ করবে। (সুনান) সহীহ মুসলিম হযরত আউফ ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি জানাযার নামাযে মৃতের জন্য যে দু'আ করেছিলেন, তা আমি মুখস্থ করে নিয়েছি। সেই দু'আয় তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া আফিহি ওয়াফু আনহু ওয়া আকরিম নুযুলাহু ওয়া আওসি মাদখালাহু ওয়া আগসিলহু বিলমায়ি ওয়াস্সালজি ওয়াল বারদি ওয়া নাক্কিহি মিনাল খাতায়া কামা নাক্কাইতাস্ সাওবাল আবইদা মিনাদ্দানাসি ওয়া আবদিলহু দারা খাইরাম মিন দারিহি ওয়া আহলান খাইরাম মিন আহলিহি ও যাওজান খাইরাম মিন যাওজিহি ওয়া আদখিলহুল জান্নাতা ওয়া আ'ফিহি মিন আযাবিল কাবরি ওয়া আযাবিন্নার।” অর্থাৎ হে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তার কবরকে প্রশস্ত করুন, তার সব গুনাহ পানি ও বরফ দ্বারা ধুয়ে ফেলুন, তাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করুন, যেমন শুভ্র বসন ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। তাকে এই ঘরের (কবরের) চেয়ে উৎকৃষ্ট ঘর, এই পরিবার পরিজন থেকে উত্তম পরিবার পরিজন, এই সঙ্গী-সাথীর চেয়ে উত্তম সঙ্গী-সাথী দান করুন, তাকে জান্নাত দান করুন এবং কবরের শাস্তি ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।"
ওয়াসিলাহ ইবনে আসফা (রা) কর্তৃক বর্ণিত: একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনৈক ব্যক্তির জানাযার নামায পড়েন এবং তাতে তিনি এ দু'আ করেন, "আল্লাহুম্মা ইন্না ফালানা ইবনা ফালানি ফী যিম্মাতিকা ও হাব্বাল জাওয়ারিকা ফাকিহি মিন ফিতনাতিল কাবরি ওয়া আযাবিন্নার ওয়া আনতা আহলুল ওফায়ি ওয়ালহাক্কি ফাগফির লাহু ওয়ারহামহু ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহীম।" অর্থাৎ “হে আল্লাহ, অমুকের পুত্র অমুক আপনারই হিফাযতে রয়েছে এবং সে আপনার আশ্রয়ের ভরসা রাখে। অতএব আপনি তাকে কবরের পরীক্ষা ও জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও পূর্ণ করুন এবং তা সত্যে পরিণত করুন, আপনি তাকে মাফ করুন এবং তার উপর রহম করুন, নিশ্চয়ই আপনি বড় মেহেরবান ও অতিশয় ক্ষমাশীল। (সুনান)
উপরের হাদীসটি ছাড়াও এই মর্মে আরো অনেক হাদীস রয়েছে। মৃতদের জন্য জানাযার নামায পড়ার এটাই উদ্দেশ্য যে, জীবিতদের দু'আর দ্বারা মৃত ব্যক্তিরা উপকৃত হন। দাফনের পর মৃত ব্যক্তিদের জন্য দু'আ করার উদ্দেশ্যও তাই।
হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো মৃত ব্যক্তিকে দাফনের পর কবরের পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইদের জন্য ক্ষমা চাও ও দু'আ করো যেন সে (সত্যের উপর) সুদৃঢ় থাকতে পারে। কেননা এখন তাকে প্রশ্ন করা হবে।
মৃতদের কবর যিয়ারত করার সময় তাদের জন্য দু'আ করার উদ্দেশ্য হলো, তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা। সহীহ মুসলিমে আছে, বুরাইদা ইবনে খাসিব (রা) বলেন, যখন তারা কবর যিয়ারতের জন্য বের হতেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে এই দুআ শিখাতেন, "আসসালামু আলাইকুম আলাদ্দিয়ারি মিনাল মুমিনীনা ওয়াল মুসলিমীনা ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকূনা নাসয়ালুল্লাহা লানা ওয়া লাকুমুল আফিয়াতা।” অর্থাৎ “হে কবরবাসী মুমিন মুসলমান! তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের উপর আল্লাহ কৃপা করুন, আল্লাহ চাহেন তো আমরাও তোমাদের সাথে এসে মিলিত হবো, আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।"
সহীহ মুসলিমে আছে, হযরত আয়িশা (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে আরয করেছিলেন, আমরা কবরবাসীদের জন্য কিভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তোমরা বলবে, "আসসালামু আলা আহলিদ্দিয়ারি মিনাল মু'মিনিনা ওয়া মুসলিমীনা ওয়া ইয়ারহামুল্লাহুল মুসতাকদিমীনা মিন্না ওয়াল মুসতায়খিরীনা ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকুন।” অর্থাৎ “হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের উপর আল্লাহ কৃপা করুন, আল্লাহ চাহেন তো আমরাও তোমাদের সাথে এসে মিলিত হবো।”
সহীহ মুসলিমে আরো আছে, হযরত আয়িশা (রা) বলেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ রাতে 'জান্নাতুল বাকী' কবরস্থানের নিকট গেলেন এবং বললেন, "আসসালামু আলাইকুম দারা কাওমিম মু'মিনীনা ওয়া আতাকুম মা তুআদুনা গাদাম মুয়াজ্জিলুনা ওয়া ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকুন। আল্লাহুম্মাগফিরলি আহলি বাকীয়িল গারকাদ।” অর্থাৎ “হে কবরবাসী মুমিনগণ, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তোমাদের সাথে আল্লাহ তা'আলা যে ওয়াদা করেছিলেন, তা তোমরা প্রত্যক্ষ করছো। কিয়ামত নিকটবর্তী, আল্লাহ চাহেন তো আমরাও তোমাদের সাথে এসে মিলিত হবো। হে আল্লাহ বাকিউল গারকাদবাসীদের ক্ষমা করুন।"
এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে মৃতদের জন্য দুআ করেছেন এবং অন্যকে এরূপ দু'আ করতে শিখিয়েছেন। সাহাবায়ে কিরাম, তাবিয়ীন, তাবে তাবিয়ীনও মৃতদের জন্য দু'আ করে গেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানগণ মৃতদের জন্য সব সময় দু'আ করে থাকেন। মৃতদের জন্য দু'আ করা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা অস্বীকার বা উপেক্ষা করা যায় না। একটি পবিত্র হাদীসে উল্লেখ আছে- আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের মধ্যে জনৈক ব্যক্তির মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে দিলে, সে কি কারণে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হলো তা জানতে চেয়েছিলো, তাকে বলা হলো, এটা তোমার সন্তানদের দু'আর কারণে করা হয়েছে।
সাদকার সওয়াবও মৃতদের কাছে পৌঁছে। হাদীসে উল্লেখ আছে যে, হযরত আয়িশা (রা) বলেছেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করলো যে, হে আল্লাহর রাসূল, আমার মা হঠাৎ ইনতেকাল করেছেন। তিনি কোনো অসিয়ত করে যেতে পারেননি। তবে আমার ধারণা তিনি বলতে পারলে সাদকাহ করার কথা বলে যেতেন। এখন আমি যদি তাঁর পক্ষ থেকে কিছু সাদকাহ করি তাহলে কি এর সওয়াব তাঁর কাছে পৌঁছবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হ্যাঁ, পৌঁছবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হযরত সাদ ইবনে উবাদা (রা)-এর মা যখন ইনতেকাল করলেন, তিনি তখন তাঁর মায়ের কাছে উপস্থিত ছিলেন না। তাই তিনি পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার মা যখন ইনতেকাল করেন তখন আমি উপস্থিত ছিলাম না। এখন আমি যদি তাঁর পক্ষ থেকে কিছু সাদকাহ করি, তাহলে কি তিনি এতে উপকৃত হবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হ্যাঁ, হবে।” তখন হযরত সাদ (রা) বললেন, আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, "আমি আমার মিখরাফের বাগানটি তাঁর জন্য সাদকা করে দিলাম।” (বুখারী)
হযরত আবু হুরাইরা (রা) কর্তৃক বর্ণিত: জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে আরয করলো, আমার পিতা ধনসম্পদ রেখে ইনতেকাল করেছেন, কিন্তু তিনি কোনো অসিয়ত করে যেতে পারেননি। এখন আমি যদি তাঁর জন্য কিছু সাদকাহ করি, তাহলে এটা কি তাঁর জন্য যথেষ্ট হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, "হ্যাঁ, হবে।” (মুসলিম)
একবার সাদ ইবনে উবাদা (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে আরয করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল, উম্মে সাদ ইনতেকাল করেছেন, এখন তাঁর জন্য কোন সাদকাহটি উত্তম হবে?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, “পানি”। তখন তিনি একটি কুয়া খনন করলেন এবং বললেন এটি আমি উম্মে সাদের জন্য উৎসর্গ করলাম। (সুনান ও মুসনাদে আহমদ)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত: আস ইবনে ওয়ায়িল জাহেলিয়াতের যুগে একবার মানত করেছিলেন, তিনি একশটি উট কুরবানী করবেন। তাঁর পুত্র হিশাম তাঁর পক্ষ থেকে ৫৫টি উট কুরবানী করে দিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করলে তিনি বলেছিলেন, তার পিতা যদি আল্লাহর একত্ব স্বীকার করে নিতো, আর তার পক্ষ থেকে সে রোযা রাখতো এবং সাদকাহ করতো তাহলে এর ফলে তার পিতা তার ছেলের দ্বারা উপকৃত হতেন। হযরত ইমাম আহমদ (রা) ও এই ঘটনাটি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
রোযার সওয়াবও মৃত ব্যক্তিরা পেয়ে থাকেন। হযরত আয়িশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যদি কারো উপর রোযা ফরয হয়ে থাকে এবং সে তা আদায় না করেই মারা যায়, তাহলে তার পক্ষ থেকে তার ওলী যেন সেই রোযা রাখে। (বুখারী ও মুসলিম)<sup>*</sup>
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত: জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা ইনতেকাল করেছেন, কিন্তু তিনি এক মাসের ফরয রোযা রাখতে পারেন নি। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে এ রোযা রাখতে পারি? তিনি বললেন, "হ্যাঁ, পারো আল্লাহর ঋণ পরিশোধ করা অতি উত্তম কাজ। (বুখারী ও মুসলিম)
জনৈকা মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল, আমার মা ইনতেকাল করেছেন, কিন্তু তাঁর উপর মানতের রোযা রয়ে গেছে। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে সে রোযা রাখবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, "তোমার মায়ের যদি কোন ঋণ থাকতো এবং তুমি তা পরিশোধ করতে তাহলে কি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হতো না? সে উত্তর দিলো, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কাজেই তোমার মায়ের পক্ষ থেকে সে রোযা রাখো। (বুখারী)
জনৈকা মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে আরয করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার মাকে তাঁর জীবিত অবস্থায় সাদকাহস্বরূপ একজন দাসী দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি এখন ইনতেকাল করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার সাদকার পুরস্কার পেয়ে গেছো এবং উত্তরাধিকার সূত্রে দাসীটি পুনরায় তোমার মালিকানায় ফিরে এসেছে। তখন সে বললো, হে আল্লাহর রাসূল, তাঁর দায়িত্বে এক মাসের রোযাও ছিলো, এখন আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে সে রোযা রাখবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তাঁর পক্ষ থেকে সে রোযা রাখো। সে আবার বললো, আমার মা হজ্জও করেননি, আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ্জও আদায় করবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তাঁর পক্ষ থেকে হজ্জও আদায় করো। (মুসলিম) অপর একটি বর্ণনায় আছে, উক্ত মহিলার মায়ের যিম্মায় দুই মাসের রোযা ছিলো।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত: জনৈকা মহিলা সমুদ্র ভ্রমণে বের হয়েছিলো। সে তখন মানত করেছিলো, যদি আল্লাহ তা'আলা বিপদাপদ থেকে তাকে রক্ষা করেন, তা হলে এক মাস রোযা রাখবে। আল্লাহ তা'আলা তাকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেছিলেন বটে, কিন্তু সে রোযা রাখার পূর্বেই মারা গেলো। তখন তার মেয়ে অথবা বোন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তার (মৃতের) পক্ষ থেকে রোযা রাখার নির্দেশ দেন। (সুনানে আহমদ)
রোযার বিনিময়ে খানা খাওয়ানোর সওয়াবও মৃত ব্যক্তিরা পেয়ে থাকেন। এই প্রসঙ্গে হযরত ইবনে উমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি মারা যায়, আর তার যিম্মায় এক মাসের রোযা রয়ে যায়, তাহলে তার পক্ষ থেকে প্রতি একদিনের বিনিময়ে যেন একজন মিসকীনকে খানা খাওয়ানো হয়। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ) ইমাম তিরমিযী (র) বলেছেন, এই সনদের হাদীসটি মারফু। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, যে ব্যক্তি অসুস্থতার কারণে রমযান মাসের রোযা রাখতে না পারে, সে যেন কোনো মিসকীনকে খানা খাইয়ে দেয়। সেই অবস্থায় তার কাযা রোযার কোনো দায়-দায়িত্ব থাকবে না। আর সে ব্যক্তির কোনো রোযার মানত থাকলে তার পক্ষ থেকে তার উত্তরাধিকারীরা সেই রোযা রাখবে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: একবার জুহায়মা গোত্রের জনৈকা মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আরয করলেন, আমার মা হজ্জ করার মানত করেছিলেন, কিন্তু হজ্জ করার আগেই তিনি ইনতেকাল করেছেন। আমি কি এখন তাঁর পক্ষ থেকে সেই হজ্জ আদায় করতে পারি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তুমি তা করতে পারো। বলতো, তোমার মা যদি কারো কাছে দেনাদার থাকতেন, তাহলে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না? তিনি আরো বললেন, আল্লাহর ঐ করযও এভাবে তুমি আদায় করো। কেননা আল্লাহর ঋণ পরিশোধ করা আরো বেশি জরুরী। এ সম্পর্কে হযরত বুরাইদা (রা)-এর একটি হাদীস ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। ঐ হাদীসে উল্লেখ আছে, আমার মা কখনো হজ্জ করেননি, আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, হ্যাঁ, তুমি হজ্জ আদায় করো।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত একবার হযরত সিনান ইবনে সালমাহ জুহালী (রা)-এর স্ত্রী আরয করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার আম্মা ইনতেকাল করেছেন, কিন্তু তিনি হজ্জ আদায় করতে পারেননি। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করলে তা আদায় হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ তোমার মা কারো কাছে দেনাদার থাকলে তুমি তা আদায় করলে তা কি আদায় হতো না? (নাসায়ী)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: জনৈকা মহিলার এক ছেলে হজ্জ আদায় না করে মারা গেলো। উক্ত মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, তার পক্ষ থেকে তুমি হজ্জ আদায় করো। অন্য এক ব্যক্তি এই মাসায়ালাটিই নিজের পিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমার পিতা কারো কাছে দেনাদার থাকতেন, তাহলে তুমি কি তা আদায় করতে না? সে বললো, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তবে আল্লাহর করয আদায় করাতো আরো বেশি জরুরী।
মুসলিম উলামায়ে কিরামের ঐক্যমত রয়েছে যে, যদি কোনো মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা হয়, তাহলে ঐ মৃত ব্যক্তি ঋণের দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে যায়, তা কোনো অজানা ব্যক্তিও যদি পরিশোধ করে থাকে। হযরত আবু কাতাদাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে আছে যে, তিনি কোনো মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দুইটি দীনারে যামিন হয়েছিলেন। তিনি যখন তা পরিশোধ করে দিলেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছিলেন, "এখন ঐ মৃত ব্যক্তি ঋণের দায় থেকে রেহাই পেয়ে গেছে।"
এই বিষয়ে সকলেই একমত যে, কারো যদি কোনো মৃত ব্যক্তির কাছে কোনো পাওনা থাকে, আর জীবিত ব্যক্তি যদি তাকে মাফ করে দেয়, তাহলে ঐ মৃত ব্যক্তি ঐ দাবি থেকে মুক্ত হয়ে যান। জীবিতদের হক মাফ করে দিলে যেমন মাফ হয়ে যায়, মৃতদের ক্ষেত্রে অবস্থাও ঠিক তদ্রূপ। কোনো জীবিত ব্যক্তির ঋণ অন্য কোনো জীবিত ব্যক্তি পরিশোধ করলে ঐ ঋণের দায়িত্ব থেকে সে রেহাই পেয়ে যান। ঠিক তেমনি কোনো জীবিত ব্যক্তি কোনো মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কোনো তোহফা বা হাদিয়া পেশ করলে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তি যে পেয়ে যাবেন সেটা খুবই যুক্তিসঙ্গত। কারণ ঋণ পরিশোধ করা ও হাদিয়া পেশ করার মধ্যে কোনোই পার্থক্য নেই। কেননা কোনো নেক আমলের সওয়াব আমলকারীর একটি সহজাত ও স্বাভাবিক অধিকার। অতএব কেউ যদি তার নিজের হক মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে মাফ করতে পারে, তাহলে মৃত ব্যক্তির জন্য হাদিয়াও পেশ করতে পারে। বিষয়টি কিয়াস ও যুক্তির দ্বারা সমর্থিত। এছাড়া কোনো আমলকারী যদি তার কোনো নেক আমল কোনো মৃত ব্যক্তিকে দান করে দেন, তাহলে ঐ সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছতে কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা থাকে না যেমনটি থাকে না ঋণ মাফ করার ক্ষেত্রে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কেউ যদি কোনো মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে রোযা রাখে, তাহলে সেই রোযার সওয়াবও মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যায় যদিও রোযা একটি দৈহিক ইবাদত। নিয়ত রোযার একটি অঙ্গ। পানাহার থেকে বিরত থাকা ও নিয়ত করা ছাড়া রোযা হয় না। আর নিয়তের সম্পর্ক হলো অন্তরের সাথে, যার খবর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অবহিত নয়। যখন রোযার সওয়াব মৃতদের কাছে পৌঁছে, তখন কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও তাদের কাছে পৌঁছা অধিক যুক্তিসঙ্গত। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করলে সওয়াব লাভ করা যায়। এই তিলাওয়াত হলো জিহ্বার আমল যা তিলাওয়াতকারীর কান শ্রবণ করে ও চোখ দেখে। সেটাও মৃত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে। সুতরাং রোযা একটি দৈহিক ইবাদত হওয়া সত্ত্বেও এর সওয়াব মৃত ব্যক্তিরা পেয়ে থাকেন।
ইবাদত দু'প্রকারের- দৈহিক ইবাদত ও আর্থিক ইবাদত। যাবতীয় দৈহিক ইবাদতের সওয়াব যেভাবে মৃত ব্যক্তিদের নিকট পৌঁছে যায়, আর্থিক ইবাদতের সওয়াবও ঠিক তেমনি মৃত ব্যক্তিদের নিকট পৌঁছে যায়। এই বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।
ঈসালে সওয়াব ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। তবে যাঁরা ঈসালে সওয়াবকে অস্বীকার করেন, তাঁদের পক্ষের বক্তব্য ও অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলো। এক- আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "মানুষ তাই পায়, যা সে নিজে উপার্জন করে।" দুই- "তোমাদের আমলের প্রতিদান দেয়া হবে।" তিন- এও বলা হবে, আজ কারো প্রতি কোনো যুলুম করা হবে না এবং তোমরা যা আমল করতে কেবল তারই প্রতিফল দেয়া হবে।” চার- মৃত ব্যক্তিরা ঐসব আমলের সওয়াব পেয়ে থাকেন, যা তাঁরা জীবিত অবস্থায় অর্জন করেন। এই অভিমতটি হযরত আবূ হুরাইরা (রা) বর্ণিত হাদীস দ্বারাও সমর্থিত।
হযরত আনাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে আছে, মৃত্যুর পর সাত রকমের আমলের সওয়াব কবরে পাওয়া যায়। (ক) কেউ কাউকে কোনো বিদ্যা শিখিয়ে গেলে, (খ) পানির নহর খনন করে গেলে, (গ) কূপ খনন করে গেলে, (ঘ) ফল-ফলাদি ও খেজুরের বাগান লাগিয়ে গেলে, (ঙ) মসজিদ তৈরি করে গেলে, (চ) পবিত্র কুরআনের শিক্ষা চালু করে গেলে, (ছ) এমন নেক সন্তান রেখে গেলে, যারা মৃত্যুর পর তাদের মাতাপিতার মাগফিরাত কামনা করে।
মৃত ব্যক্তিরা জীবিতদের কোনো নেক কাজের দ্বারা উপকৃত হন কিনা, এই প্রসঙ্গে গ্রন্থকার কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। হাদিয়া বা সওয়াব রেসানীকে এক ধরনের হাওয়ালা বলে তিনি আখ্যায়িত করেছেন। কোনো লোক তাঁর কোনো সওয়াব অন্যকে অর্পণ করতে পারে কিনা, এ বিষয়ে বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। হাদিয়া এমন একটি বিষয় যেটা অন্যের প্রাপ্তির সাথে সম্পর্কিত। একজন বান্দার কোনো নেক আমলের সওয়াব একটি দাবি দাওয়ার বিষয় নয়। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে আল্লাহর এই অনুগ্রহ বা অনুকম্পা একজন বান্দা কি করে অন্যকে সমর্পণ করতে পারে। একজন গরীব ব্যক্তির পক্ষে একজন ধনী ব্যক্তিকে কোনো কিছু দান করা যেমন একটি বিব্রতকর ব্যাপার, ঠিক তেমনি কোনো নেক কাজের সওয়াব যা আল্লাহর কাছে থেকে পাওয়া সেটা হাওয়ালা করাও তেমনি বিব্রতকর। একজন বাদশাহর কাছে এমন কোনো জিনিস হাদিয়া স্বরূপ পেশ করা মোটেই সমীচিন নয়, যা তাঁর কাছে প্রচুর রয়েছে। একজন বান্দার পক্ষে মহান আল্লাহর কাছে কোনো সওয়াব হাওয়ালা করা ঠিক তেমনি একটি অবস্থা। যাঁরা ঈসালে সওয়াব অস্বীকার করেন তাঁরা মনে করেন, কোনো সওয়াবের প্রতিফল অন্যের কাছে সমর্পণ করা উচিত নয়, সওয়াব হচ্ছে আমলের প্রতিদান। সেক্ষেত্রে কোনো সওয়াব অন্যকে দান করা কিভাবে বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত হবে? এখন প্রশ্ন এই যে, একজন বান্দা আল্লাহর কাছ থেকে যে অনুগ্রহ বা সওয়াব লাভ করে থাকে সেটা অন্য কাউকে দেওয়ার জন্য সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারে। এতে আপত্তির কোনো কারণ নেই। সওয়াব দান করা যেমন আল্লাহর এক অনুগ্রহ ঠিক তেমনি অন্যকে বখশীয়ে দেওয়াও তারই অনুগ্রহ। এটা কোনো দাবি দাওয়ার ব্যাপার নয়। এটা একজন বাদশাহকে কোনো কিছু দান করার সাথে তুলনা করা যেতে পারে না। ইমাম আহমদ (র) ও উক্ত মত পোষণ করতেন।
ঈসালে সওয়াবের বিরুদ্ধবাদীরা বলে থাকেন, যদি কোনো মৃত ব্যক্তিকে সওয়াব হাদিয়াস্বরূপ দেওয়া জায়েয হতো, তাহলে জীবিতদেরকেও ঐরূপ সওয়াব ও হাদিয়া দেয়া আরো অধিক যুক্তিসঙ্গত ও সমীচীন হতো। কারো কোনো সওয়াবকে এভাবে দান করা জায়েয হলে কোনো সওয়াবের অর্ধেক, সওয়াবের তৃতীয়াংশ, সওয়াবের সিকি অংশ এভাবে ভাগ করাও বৈধ এবং যুক্তিযুক্ত হবে। তারা আরও বলেন, কোনো নেক আমলের সওয়াব রেসানীর এই প্রক্রিয়া যদি জায়েয হয়, তবে নিজের জন্য কোনো আমল করার পর তা হাদিয়া করাও সঠিক হবে।
মৃতের জন্য কোনো নেক আমলের সওয়াব রেসানী করতে হলে হাদিয়ার নিয়ত ঠিক করে নিতে হবে, অন্যথায় মৃত ব্যক্তি সেই সওয়াব পাবে না। কোনো আমলের সওয়াব যখন অন্যকে দান করা যায়, তাহলে কোনো আমলের আগে ও পরে নিয়ত করার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? তাছাড়া কোনো আমলের হাদিয়ার পেশ করা যদি জায়েয হয়, তাহলে জীবিতদের ফরয ইত্যাদির সওয়াবও হাদিয়া করা জায়েয হবে। যেমন নফল ইবাদতের সওয়াব হাদিয়া পেশ করা জায়েয। এছাড়া দুঃখ-কষ্ট দ্বারা মানুষের এক প্রকার পরীক্ষা হয়ে থাকে। আর দুঃখ-কষ্টের কোনো বিনিময় নেই। কেননা শরীআতের আদেশ নিষেধ কার্যকর করার জন্য প্রত্যক্ষভাবে বান্দা নিজেই দায়ী। কাজেই কোনো ইবাদতের সওয়াব কারো অনুকূলে দান করার প্রশ্নই উঠে না। আল্লাহ তা'আলা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে, মানুষ চেষ্টা ও পরিশ্রম ছাড়া কোনো ফল লাভ করতে পারে না। কাজেই শরীআতে এই মূলনীতি যেমনি কার্যকর, অদৃষ্টের ক্ষেত্রেও তেমনি কার্যকর। কেউ যদি অসুস্থ, ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত ও বিবস্ত্র হয়, আর অন্য কোনো ব্যক্তি তার পক্ষ থেকে ঔষধ সেবন করে, খানা খায়, পানি পান করে কিংবা কাপড় পরিধান করে, তাহলে কি এর দ্বারা বিবস্ত্র ব্যক্তি ও ক্ষুধার্ত ব্যক্তি উপকৃত হবে?
তদুপরি অন্য কোনো ব্যক্তির আমল যদি অপর কোনো ব্যক্তির উপকার করতে পারে, তবে কারো পক্ষ থেকে যদি কেউ তাওবাহ করে, তাহলে ঐ ব্যক্তি কি উপকৃত হতে পারে? তাই একজন লোক অন্য একজন লোকের পক্ষ থেকে শরীআতের হুকুম-আহকাম যেমন নামায বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত আদায় করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না, সেক্ষেত্রে গুরুত্বহীন ইবাদতের তো কোনো প্রশ্নই উঠে না। আর দু'আ আল্লাহর কাছে আরযী পেশ করা ছাড়া আর কিছু নয়। এর দ্বারা আশা করা যায় যে, মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর তা'আলা দয়া পরবশ হবেন এবং তার পাপ মোচন করে দেবেন, মৃত ব্যক্তিদের জন্য জীবিতদের এটাই উৎকৃষ্ট হাদিয়া।
ইবাদত দু'প্রকারের। তন্মধ্যে প্রথম প্রকার ইবাদতের মধ্যে প্রতিনিধিত্ব করার কোনো অবকাশ নেই। যেমন- ঈমান, নামায, রোযা এবং কুরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি। এ ধরনের ইবাদতের সওয়াব শুধু ইবাদতকারীই লাভ করে, এটা অন্য কেউ পায় না। জীবিতাবস্তায় যেমন এগুলো একের পক্ষ থেকে অন্য কেউ সম্পাদন করতে পারে না। তেমনি মৃত্যুর পরও এসবের প্রতিনিধিত্ব অন্য কেউ করতে পারে না। দ্বিতীয় প্রকারের ইবাদতের মধ্যে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ আছে। যেমন- আমানত ফিরিয়ে দেয়া, ঋণ পরিশোধ করা, সাদকাহ দেয়া, হজ্জ আদায় করা ইত্যাদি। এসব ইবাদতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে। কেননা এসবের মধ্যে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ রয়েছে। যেমন একজনের পক্ষ থেকে অন্যজন জীবিতাবস্থায় এসব আদায় করতে পারে, তেমনি মৃত্যুর পরেও তা আদায় করতে পারে। তাঁরা আরো বলেন, মৃতদের পক্ষ থেকে রোযা রাখার ব্যাপারে হাদীসে কয়েক রকমের বর্ণনা আছে। এক. ইমাম মালিক (র) মুয়াত্তা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, "কেউ যেন কারো পক্ষ থেকে রোযা না রাখে।” তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, "এ বিষয়ে সকলে ঐকমত্য পোষণ করেন, এতে কোনো মতবিরোধ নেই। দুই: মৃতদের পক্ষ থেকে রোযা রাখা সম্পর্কে হাদীসের বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত ইবনে আব্বাস (রা)। নাসায়ী শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে: একজন লোক যেন অপর লোকের পক্ষ থেকে কোনো নামায না পড়ে। মৃত ব্যক্তিদের কাযা রোযাও যেন কেউ আদায় না করে। উক্ত হাদীসের সনদে মতবিরোধ আছে। (মুফহাম শরহে মুসলিম) তিন. "এবং একজন মানুষ তাই পায়, যে জন্য সে চেষ্টা করে, তার কর্ম প্রচেষ্টা শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে দেয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান।” (সূরা নাজম: আয়াত ৩৯-৪১)
চার. এছাড়া নাসায়ী শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত অন্য একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, কেউ যেন কারো পক্ষ থেকে নামায না পড়ে, রোযা না রাখে। তবে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে এক 'মুদ' (আধা সের) পরিমাণ গম মিসকীনকে দেয়া যেতে পারে। পাঁচ. উপরে বর্ণিত হাদীসটি হযরত ইবনে উমর (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটির পরিপন্থী। সেই হাদীসে বলা হয়েছে, কোনো মৃত ব্যক্তির যদি রমযান শরীফের রোযা বাকী থাকে, তাহলে তার পক্ষ থেকে মিসকীনকে খানা খাইয়ে দেবে। ছয়, উক্ত অভিমতটি কিয়াসেরও পরিপন্থী। যেমন কারো নামায, তাওবাহ ইসলামের অন্যান্য হুকুম-আহকাম অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করা গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি উক্ত আমলের কোনো সওয়াবও অন্যকে দান করা গ্রহণযোগ্য নয়।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর হাদীস সম্পর্কে ইমাম শাফিয়ী (র)-এর অভিমত এই যে, মানতকারী কি সম্পর্কে মানত করেছিলেন সে বিষয়ে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ও হযরত উম্মে সাদ (রা) সুস্পষ্টভাবে কোনো কিছু বলেননি। হতে পারে, তিনি মৃত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে সেই মানত আদায় করার আদেশ দিয়েছিলেন। তবে কেউ যদি নামায আদায় কিংবা রোযা রাখার মানত করে, আর তা পূরণ করার আগেই সে ব্যক্তি মারা যায়, তাহলে তার পক্ষ থেকে নামাযের কোনো কাফফারা দিতে হবে না, নামাযও পড়তে হবে না। তবে রোযার কাফফারা দিতে হবে, কিন্তু রোযা রাখতে হবে না। যদি বলা হয়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কি রোযা রাখার কোনো রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়নি? উত্তরে বলা হবে, হাঁ, হয়েছে। এই প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি রেওয়ায়েত আছে। হযরত ইমাম যুহরী (র), হযরত উবাইদুল্লাহ (র) থেকে আর তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে আর তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মানত সম্পর্কিত একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। কিন্তু উক্ত রেওয়ায়েতে কিসের মানত তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি, যেমন অন্যান্য রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। অথচ ইমাম যুহরী (র) এর স্মৃতিশক্তি ছিলো প্রখর। এছাড়া হযরত উবাইদুল্লাহ (রা), হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। হযরত উবাইদুল্লাহ (রা) ছাড়া অন্য কেউ এই হাদীসের পরিপন্থী কোনো হাদীস উপস্থাপন করলে, সেটা নির্ভরশীল হাদীস নয় বলা হবে।
হজ্জ পালনে যে অর্থ ব্যয় হয়, মৃতদের কাছে তার সওয়াব পৌঁছে। আর হজ্জ পালনের সওয়াব কেবল হজ্জ পালনকারী লাভ করে, মৃতরা এর কোনো সওয়াব পায় না। এসবই হলো ঈসালে সওয়াব বিরোধীদের অভিমত ও আকীদা।
এখন ঈসালে সওয়াব যাঁরা অস্বীকার করেন তাঁদের যুক্তি ও প্রমাণাদি খণ্ডনের জন্য পবিত্র কুরআন থেকে নিম্নোক্ত আয়াতগুলো উপস্থাপন করা হলো। এক. লাইসা লিল ইনসানে ইল্লা মা সায়া। (সূরা নাজম: আয়াত- ৩৯)
অর্থাৎ “একজন মানুষ তাই পায়, যে জন্য সে চেষ্টা করে।” এই আয়াতটি একাধিক অর্থ জ্ঞাপক। এই পবিত্র আয়াতে কারো কারো মতে 'ইনসান' বলতে কোনো কাফির ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে। কেননা একজন মুমিন বান্দা তার নেক আমলের দ্বারা উপকৃত হন, অন্যদের নেক আমলের দ্বারাও উপকৃত হন। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, এই আয়াতে 'ইনসান' শব্দের দ্বারা শুধু কাফিরদের কিভাবে নির্দিষ্ট করা হলো? এর উত্তর খুবই সোজা ও প্রমাণ ভিত্তিক। এই আয়াতে 'ইনসান' শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই এখানে শুধু কাফির নয়, কাফির ও মুসলমান সকলকেই বুঝানো হয়েছে। এই আয়াত ছাড়া অন্যান্য আয়াতও 'ইনসান' শব্দটি ব্যাপক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, আল্লা তাযিরু ওয়াযিরাতুন বিযরা উখরা। অর্থাৎ “কেউ অন্য কারো গুনাহর বোঝা বহন করবে না।” (সূরা নাজম : আয়াত-৩৮)
যেমন, ওয়া ইন্না সাইয়াহু সাওফা ইউরা, সুম্মা ইউজযাহুল জাযায়াল আওফা। অর্থাৎ “মানুষ অতিসত্বর তার চেষ্টার ফল প্রত্যক্ষ করবে। তারপর তাকে তার পুরোপুরি প্রতিদান দেয়া হবে।” (সূরা নাজম : আয়াত ৪০,৪১)
এই আয়াতে ইনসান বলতে সৎ, অসৎ, মুমিন, কাফির সবাইকে বুঝানো হয়েছে। ফামাইয়াঁমাল মিসকালা যারাতিন খাইরাইয়া রাহু ওয়া মাইয়ামাল মিসকালা যারাতিন শারাইয়ারাহু। অর্থাৎ "সুতরাং যে অণু পরিমাণ সৎকাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে, এবং যে অণু পরিমাণ মন্দকাজ করবে তাও সে দেখতে পাবে।" (সূরা যিলযাল: আয়াত ৭-৮)
আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদের লক্ষ্য করে বলেন, “হে আমার বান্দাগণ! আমি তোমাদের প্রতিটি আমল গণনা করে রেখেছি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে পরিপূর্ণ প্রতিদান দেবো। তারপর যে ব্যক্তি কল্যাণ লাভ করবে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যে ব্যক্তি অকল্যাণ দেখবে, সে যেন নিজেকেই তিরষ্কার করে।” ইয়া আইউহাল ইনসানু ইন্নাকা কাদিহুন ইলা রাব্বিকা কাদহান ফামুলাকীহ। অর্থাৎ “হে মানুষ! নিশ্চয় তোমাকে আপন প্রতিপালকের দিকে দৌড়াতে হবে, অতঃপর তাঁর সাথে সাক্ষাত হবে। (সূরা ইনশিকাক: আয়াত-৬)
এখানে উল্লেখ্য যে, 'ইনসান' শব্দের অর্থ কোথাও আবূ জাহল, কোথাও উকবা ইবনে আবী মুয়ীত, কোথাও অলীদ ইবনে মুগীরাহকে বুঝানো হয়েছে। তবে এইরূপ অর্থের দ্বারা যেন মুফাসসিরগণ ধোঁকা বা বিভ্রান্তিতে না পড়েন। 'ইনসান' বলতে এখানে অনির্দিষ্টভাবে সমগ্র মানবজাতিকে বুঝানো হয়েছে। নিম্নোক্ত আয়াতেও ‘ইনসান’ শব্দের দ্বারা মানবজাতিকে বুঝানো হয়েছে। ইন্নাল ইনসানা লাফী খুসরিন। অর্থাৎ “নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।” (সূরা আসর : আয়াত-২)
ইন্নাল ইনসানা লিরাব্বিহি লাকানূদ। অর্থাৎ “নিশ্চয় মানুষ স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।” (সূরা আদিয়াত : আয়াত-৬)
ইন্নাল ইনসানা খুলিকা হালুয়া। অর্থাৎ “নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বলচিত্ত রূপে।” (সূরা মায়ারিজ: আয়াত-১৯)
কাল্লা ইন্নাল ইনসানা লাইয়াতগা আরাহুসতাগনা। অর্থাৎ “নিশ্চয় মানুষ সীমা লংঘন করে থাকে এজন্য যে, সে নিজেকে নিজে অভাবমুক্ত মনে করে।” (সূরা আলাক: আয়াত ৬-৭)
ইন্নাল ইনসানা লাযালুমুন কাফফার। অর্থাৎ “নিশ্চয় মানুষ বড় যালিম, বড়ই অকৃতজ্ঞ।” (সূরা ইবরাহীম : আয়াত-৩৪) ওয়া হামালাহাল ইনসানু, ইন্নাহু কানা যালুমান যাহুলা। অর্থাৎ “এবং মানুষ তা বহন করলো। নিশ্চয় সে যালিম ও বড় মূর্খ। (সূরা আহযাব : আয়াত-৭২)
উপরে বর্ণিত আয়াতসমূহে ইনসান বা মানুষের যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে এসব হলো মানুষের স্বভাবগত, জাতিগত ও ধর্মীয় গুণাবলী। মানুষ স্বভাবতই এসব বৈশিষ্ট্য থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, যে পর্যন্ত না সে তার রবের তাওফীক ও মেহেরবানী লাভ করে। আল্লাহ তা'আলাই মানুষের মনে ঈমানের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করেছেন, তার অন্তরকে এর দ্বারা আলোকিত করেছেন, আর তাকে পাপাচারের প্রতি ঘৃণা করার ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনিই আম্বিয়ায়ে কেরামকে দীনের উপর কায়িম রেখেছিলেন। আর তাঁদেরকে মন্দ ও অশ্লীলতা থেকে দূরে রেখেছিলেন। আওলিয়ায়ে কেরামকেও আল্লাহ দীনের উপর কায়িম রাখেন এবং তাঁরা মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকেন। এখানে উল্লেখ্য যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে সাহাবায়ে কেরাম নিম্নোক্ত কবিতাটি গুন গুন করে আবৃতি করতেন। "ওয়াল্লাহি লাওলাল্লাহু মাহ তাদাইনা ওয়ালা তাসাদ্দাকনা ওয়ালা সাল্লাইনা” অর্থাৎ “আল্লাহর কসম, আল্লাহ বিদ্যমান না থাকলে আমরা সরল পথ পেতাম না, সাদকাহ করতাম না নামাযও পড়তাম না।” পবিত্র কুরআনে আরো উল্লেখ আছে, “ওয়ামা কানা লিনাফসিন আন তুমিনা ইল্লা বিইযনিল্লাহ" অর্থাৎ “এবং কোন ব্যক্তির সাধ্য নেই যে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া ঈমান নিয়ে আসবে।” (সূরা ইউনুস: আয়াত-১০০)
"ওয়ামা ইয়াযকুরূনা ইল্লা আইঁয়াশায়াল্লাহু” অর্থাৎ “আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না।" (সূরা মুদ্দাসসির: আয়াত-৫৬)
ওয়ামা তাশাউনা ইল্লা আইঁয়াশায়াল্লাহু রাব্বুল আলামীন- অর্থাৎ “আসলে তোমাদের চাওয়ায় কিছুই হয় না, যতোক্ষণ না আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তা চান।" (সূরা তাকবীর: আয়াত-২৯)
এক শ্রেণীর আলিমের অভিমত হলো- উপরোক্ত আয়াতসমূহের দ্বারা আমাদের পূর্ববর্তী শরীআত সম্পর্কে জ্ঞাত করানো হয়েছে। কিন্তু দলীল ও প্রমাণ অনুযায়ী আমাদের শরীআতেও এই হুকুম রয়েছে যে, মানুষ তার নিজের চেষ্টার ফল বা সওয়াব যেভাবে লাভ করে, তেমনি তার জন্য অন্যরা যে নেক আমল করে, তার সওয়াবও সে পেয়ে থাকে। আমলাম ইউনাব্বা' বিমা ফী সুহুফি মূসা, অর্থাৎ "তার নিকট কি খবর আসেনি সে সম্পর্কে, যা মূসার সহীফাসমূহে (কিতাবে) বর্ণিত আছে। (সূরা নাজম: আয়াত-৩৬)
অর্থাৎ আগেকার দিনে শরীআতে যেসব বিষয় শিক্ষা দেয়া হয়েছিলো, পরবর্তী শরীআতেও তা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। অপর মত হলো- এখানে 'লা' অক্ষরটি 'আলা' বা উপর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ওয়া লাইসা লিল ইনসানে ইল্লা মা সায়া, অর্থাৎ 'ইনসান তাই পাবে যার জন্য সে চেষ্টা করে।" মানুষ যে অসৎ কাজ করে তাকে তার ফল ভোগ করতে হয়, অন্যের কোন আমলের জন্য নয়। 'ওয়া লাহুমুল লায়নাতু' এখানে আরবি 'লাম' অক্ষরটি 'আলা' বা উপর অর্থে নয় বরং এর মূল অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর পাপীদের জন্য রয়েছে অভিশাপ। 'লীদিরহামুন' বাক্যে আলাইয়া দিরহামুনে 'আলা' শব্দের অর্থ উপর। তবে আরবি পরিভাষায় এই অর্থ গ্রহণযোগ্য নয়। এখন কেউ যদি বলে- লীদিরহামুন শব্দদ্বয়ে 'ইয়া' অক্ষরটি বাদ দেয়া হয়েছে। তদ্রূপ 'মা সায়া' শব্দের পর 'আও সায়ালাহু' অনুল্লেখিত রয়েছে, একথাও ঠিক নয়। কারণ পরবর্তী বাক্যের সাথে এটার কোন সাযুজ্য নেই। আর এটা আল্লাহর ও তাঁর কিতাবের প্রতি অজ্ঞতাপ্রসূত উক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। তবে কারো কারো মতে উপরোক্ত আয়াতটি নিম্নোক্ত আয়াতের দ্বারা মনসূখ বা রহিত হয়ে গেছে, আর যারা ঈমানদার তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের ক্ষেত্রে তাদেরকে অনুসরণ করে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকে একত্রিত করবো।” (সূরা তূর: আয়াত-২১)
এরূপ তাফসীর হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে। তবে এটাও একটি দুর্বল অভিমত ছাড়া আর কিছু নয়, তাই হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বা অন্য কেউ কোন বিষয়কে মনসূখ বা রহিত বললেই তা রহিত বলে গণ্য হবে না। আখিরাতে দুনিয়ার ন্যায় সন্তান-সন্ততি তাদের পিতামাতার সাথী হবে। আর পিতামাতার প্রতি সন্তানের আনুগত্য হবে তাঁদের সম্মান ও সওয়াবের কারণে, যা তাঁরা তাঁদের আপন চেষ্টায় অর্জন করে গেছেন। কোন নাবালিগ সন্তান কোনো নেক আমল ছাড়া কোন মর্যাদা লাভ করতে পারে না। তারা যদি কোন মর্যাদা লাভ করে তাহলে সেটা হবে তাদের পিতামাতার নেক আমলের কারণে। আল্লাহ তাআলা বেহেশতে পিতামাতার নিকট তাদের সন্তনদের পৌঁছে দিয়ে তাদেরকে শান্তি দান করবেন এবং তাঁদের কারণে সন্তান-সন্ততির প্রতিও এমন অনুগ্রহ করবেন, যেটা তাদের প্রাপ্য ছিলো না।
এখানে নাবালিগ সন্তান-সন্ততির বিষয়টি হুর-গেলমানের সাথে তুলনা করা যায়, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বিনা আমলেই বেহেশতের জন্য পয়দা করেছেন। আর তাঁদের প্রতিও মেহেরবানী করেছেন যাঁদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাঁদের কোনো নেক আমল না থাকা সত্ত্বেও বেহেশত দান করেন। অনুরূপভাবে, আল্লাহ তা'আলা ঐসব সন্তান-সন্ততিদেরকে তাদের কোনোরূপ আমল ব্যতিরেকেই তাঁর অপার করুণায় জান্নাতে দাখিল করবেন। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- "কোন বোঝা বহনকারী অন্য কোন লোকের বোঝা বহন করবে না এবং মানুষের জন্য কিছুই নেই, কিন্তু শুধু তাই যার জন্য সে চেষ্টা করে।” (সূরা নাজম: আয়াত ৩৮-৩৯)
এই পবিত্র আয়াত দু'টি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ জ্ঞাপক। আল্লাহ পাকের সুবিচার ও সুমীমাংসা, তাঁর হিকমতপূর্ণ মহিমা ছাড়া আর কিছু নয়। এছাড়া এটা জ্ঞান-বুদ্ধি ও সহজাত প্রবৃত্তির এক অনুপম মীমাংসার সাক্ষ্য বহন করে। বুদ্ধি-বিবেচনার শর্ত হলো, একের অপরাধের জন্য অন্য কেউ যেন অভিযুক্ত না হয়। একজন মানুষের সৎ স্বভাবের উদ্দেশ্য হলো, মুক্তি ও নাজাত লাভ। আর এটা কেবল তার নেক আমল ও চেষ্টার মাধ্যমে কার্যকর হয়। প্রথম আয়াতটি মানুষকে এই আশ্বাস দান করেছে যে, একে অপরের কোনো অপরাধের জন্য দায়ী হবে না। যেমন দুনিয়াতেও একজনের অপরাধের জন্য অন্য কেউ দায়ী বা অভিযুক্ত হয় না। দ্বিতীয় আয়াতটিতে এই দৃঢ়বিশ্বাস ব্যক্ত হয়েছে যে, মানুষের মুক্তি কেবল তার আমলের ভিত্তিতেই হবে বাপ দাদা বা কোন বুযুর্গ বা মাশায়েখের আমলের কারণে কেউ মুক্তি পাবে না, যেটা অনেক অজ্ঞ লোকেরা মনে করে থাকে। পবিত্র কুরআনের এই দু'টি আয়াতের আলোকে এর মধ্যে যে সামঞ্জস্য রয়েছে, সেটা প্রণিধানযোগ্য। এই প্রসঙ্গে এখানে পবিত্র কুরআনের আরো একটি আয়াতের অর্থ উল্লেখ করা হলো- "যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথ লাভ করেছে এর দ্বারা তার নিজের উপকার হবে। আর যে ব্যক্তি পথহারা হয়েছে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর কেউ অন্য কারো বোঝা বহন করবে না আর আমি কোন রাসূল পাঠাবার আগে কাউকে শাস্তি প্রদান করি না।” (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-১৫)
আল্লাহ পাক উপরে বর্ণিত আয়াতগুলোতে অমুসলিমদের জন্য এমন চারটি বিধান জারি করেছেন, যেগুলোতে তাঁর ইনসাফ ও হিকমত চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে। এক. হিদায়াতের দ্বারা হিদায়াত প্রাপ্তরা উপকৃত হবে, অন্য কেউ নয়। দুই. পথভ্রষ্টতার দরুন পথভ্রষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্য কেউ নয়। তিন. একের অপরাধের জন্য অন্য কেউ দায়ী হবে না। চার. কোনো সম্প্রদায়ের নিকট রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়নি।
উপরে উল্লেখিত চারটি বিধানের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার অপূর্ব হিকমত, সুবিচার, ফযল ও করম নিহিত রয়েছে। ঠিক এমনিভাবে আল্লাহ তা'আলার পবিত্র নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে অজ্ঞ ও অসচেতন লোকদের ভ্রান্ত ধারণা নিরসন করা হয়েছে।
উপরে উল্লেখিত ইনসান শব্দের অর্থ কারো কারো মতে জীবিত মানুষকে বুঝানো হয়েছে, মৃত মানুষকে নয়। এই বক্তব্যটিও পূর্বের ধ্যান ধারণার ন্যায় একটি ভ্রান্ত ধারণা। 'ইনসান' শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয় কোন শব্দের এই ধরনের ব্যবহার এবং মনগড়া অর্থ গ্রহণ করলে শব্দের মূল অর্থই বিকৃত হয়ে যায়। এটা হবে কোন শব্দের মূল অর্থকে বিকৃত করারই শামিল। উপরে বর্ণিত আয়াতের ধারাবাহিকতা, কিয়াস, শরীআতের মূলনীতি, দলীল, প্রমাণ এবং বিধি-বিধান এই অভিমতকে বাতিল হিসেবে গণ্য করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোন একটি শব্দের ভুল প্রয়োগ ব্যক্তি বিশেষের আকীদার উপর নির্ভর করে। মানুষ প্রথমত কোন একটি মতবাদে বিশ্বাস করে। এরপর যখন তার আকীদার পরিপন্থী কোন অকাট্য প্রমাণের সম্মুখীন হয়, তখন সে যে কোনভাবেই হোক সেটাকে প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। এভাবেই তারা সঠিক আকীদাকে ব্যর্থ করার অপপ্রয়াস অব্যাহত রাখে। আর এভাবেই হক ও বাতিলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। আসলে, সঠিক তথ্য ও প্রমাণকে কেউ প্রতিহত করতে পারে না। সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। একজন মানুষ তার ভালো ব্যবহারের দ্বারা অন্যের ভালোবাসা, সুন্দর পারিবারিক জীবন, সুনাম ও সুখ্যাতি লাভ করে থাকে। এছাড়া একজন মানুষ ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে যে কামালিয়াত ও সাফল্য অর্জন করে, এসবই তার পরিশ্রম ও সাধনার ফল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "সবচেয়ে উত্তম রুযী হলো সেটা যা মানুষ নিজে উপার্জন করে, আর তা ভোগও করে, আর সন্তান-সন্ততিরা তার সঞ্চয়ের একটি অংশ।” সাদকায়ে জারিয়াহ সম্পর্কিত একটি হাদীসও এই ধারণাকে সমর্থন করে।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে ইমাম শাফিয়ী (র) উল্লেখ করেছেন যে, কেবল নিজ সন্তানেরাই মাতা-পিতার বদলী হজ্জ আদায় করতে পারে, অন্য কেউ নয়, যেহেতু একজন সন্তানের ধনসম্পদ মাতাপিতারই ধনসম্পদ বলে গণ্য। তবে এ বিষয়ে বিভিন্ন মতের অবকাশ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ঈমান, আমল ও আনুগত্যের দ্বারা একজন মুসলমান যেমন নিজের উপকার করে থাকেন, তেমনি তিনি অন্য মুসলমান ভাইদেরও উপকারে আসেন। সম্মিলিত আমলের দ্বারা মুমিন-মুসলমানগণ উপকৃত হয়ে থাকেন। যেমন জামাআতের নামাযের মাধ্যমে প্রত্যেক নামাযী সাতাশ গুণ বেশি সওয়াব পেয়ে থাকেন। একত্রে নামায আদায় করার কারণেই এরূপ সওয়াব লাভ করা যায়। নামাযীদের সংখ্যা যতো বেশি হবে, সওয়াবের পরিমাণও ততো বেশি হবে। সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, জিহাদ, হজ্জ ইত্যাদি সওয়াবের কাজ মিলেমিশে করলে অধিক সওয়াব পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এক মুমিন অন্য এক মুমিনের জন্য এমন এক ইমারত স্বরূপ যার এক অংশ অন্য অংশকে মজবুত করে। একজনের দ্বারা অন্যজনের শক্তি বৃদ্ধি পায়, তারপর তিনি এক হাতের আংগুলের ভেতরে অন্য হাতের আংগুলি প্রবেশ করিয়ে বললেন, “এভাবে।” এটাতো সর্বজনবিদিত যে, দুনিয়ার ব্যাপারের চেয়ে দীনী ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রয়োজন অধিক। কাজেই ইসলামের রজ্জুকে আঁকড়ে ধরা পার্থিব জীবনের জন্য যেমন প্রয়োজন, পরকালীন জীবনের জন্যও তেমনি অপরিহার্য।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর আরশ বহনকারী ও এর আশেপাশে অবস্থানকারী ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে জানিয়েছেন যে, তাঁরা মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তা'আলা আরো জানিয়েছেন যে, তাঁর রাসূলগণ যেমন, হযরত নূহ (আ), হযরত ইবরাহীম (আ), এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মুমিনদের জন্য দুআ ইসতিগফার করেন। মুমিন বান্দাদের নিজ ঈমান ও আমলের কারণে এবং অন্য মুমিন বান্দা নেক দুআর বরকতে উপকৃত হন। এ সবই তাদের নেক আমলের প্রতিফল। একজন মুসলমানের দু'আ ও আমলের দ্বারা অন্য কোন মুসলমান যাতে উপকৃত হন, তজ্জন্য আল্লাহ তা'আলা ঈমানকে শর্তসাপেক্ষ করে দিয়েছেন। একজন ঈমানদার ব্যক্তি অন্য একজন ঈমানদার ভাইয়ের নেক আমল ও দু'আ দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন। এর যথার্থতা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি বাণীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, যখন তিনি হযরত আমর ইবনে আস (রা)-কে বলেছিলেন, 'তোমার পিতা যদি আল্লাহর একত্বকে স্বীকার করতেন, তাহলে তোমার এ আমলের সওয়াব তাঁর কাছে পৌঁছে যেতো। অর্থাৎ তোমার পিতার মৃত্যুর পর তুমি তাঁর পক্ষ থেকে যে একজন গোলাম মুক্ত করেছো, এর সওয়াব তিনি পেয়ে যেতেন। এটা ছিলো সওয়াব লাভের একটি সূক্ষ্ম ও সুন্দর উপায়। তবে এরূপ আকীদা বা বিশ্বাসের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।
এখানে এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হলো: পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: লাইসা লিল ইনসানে ইল্লা মা সায়া। অর্থাৎ, “মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা করে।” (সূরা নাজম: আয়াত-৩৯)
লাহা মাকাসাবাত ওয়া আলাইহা মাকতাসাবাত। অর্থাৎ “মানুষ যা উপার্জন করে, ভোগ করে এবং তার উপর বর্তায় যা সে করে।" (সূরা আল বাকারাহ: আয়াত-২৮৬)
ওয়ালা তুজযাওনা ইল্লামা কুনতুম তা'মালুন। অর্থাৎ “তোমাদেরকে তোমাদের আমলের প্রতিদান প্রদান করা হবে।” (সূরা ইয়াসীন: আয়াত-৫৪)
এই পবিত্র আয়াতগুলো দ্বারা এটাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, মানুষকে অন্য কারো আমলের জন্য নয় বরং তার নিজের আমলের জন্য দায়ী করা হবে। আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেছেন- ফালইয়াওমা লা তুযলামu নাফসুন শাইয়াওঁ ওয়ালা তুজযাওনা ইল্লামা কুনতুম তা'মালুন। অর্থাৎ আজকের দিনে কারো প্রতি সামান্যতম যুলুম করা হবে না। আর তোমাদেরকে তোমাদের নিজ আমলের প্রতিদান দেয়া হবে।” (সূরা ইয়াসীন: আয়াত-৫৪)
অর্থাৎ কারো গুনাহ বা অপরাধকে বৃদ্ধি করা হবে না, আর কারো সওয়াবকে হ্রাস করা হবে না। এছাড়া একজনের অপরাধের জন্য অন্য কাউকে দায়ী করা হবে না। তবে এই কথার অর্থ এই নয় যে, অন্যের নেক আমলের দ্বারা অন্য কেউ উপকৃত হবে না। কেননা জীবিতদের হাদিয়ার দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হন তাঁদের নিজের আমলের প্রতিদান হিসেবে নয় বরং আল্লাহ তা'আলার দান ও তাঁর দয়া হিসেবে। কোনো বান্দা তাঁর নেক আমলের সওয়াব অন্য কোনো বান্দাকে যেভাবে দান করবেন, তিনি তা সেভাবেই পাবেন। অর্থাৎ আংশিকভাবে দান করলে আংশিকভাবে পাবেন আর পুরোপুরিভাবে দান করলে পুরোপুরিটাই পাবেন।
মৃত ব্যক্তিরা যে অন্যের নেক আমলের সওয়াব পেয়ে থাকেন, সাদকায়ে জারিয়াহ সম্পর্কীয় হাদীস দ্বারা সেটার প্রমাণ পেশ করা ঠিক নয়। কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মৃত ব্যক্তির যে কোন আমল করার ক্ষমতা থাকে না তিনি সেটাই কেবল সেই হাদীসে উল্লেখ করেছেন। কারো নিজের আমল সাধারণত তার নিজেরই প্রাপ্য। তবে কোনো আমলকারী তার কোনো আমলের সওয়াব কোনো মৃত ব্যক্তিকে দান করলে তা সেই মৃত ব্যক্তি পেয়ে যায়।
এখানে উল্লেখ্য যে, কাউকে হাদিয়া পাঠানোর অর্থ হলো, কাউকে কোনো সওয়াব দান করা। কিন্তু স্রষ্টার প্রতি কোনো কিছু হাওয়ালা করা কোনো মানুষকে হাওয়ালা করার মতো নয়। কেউ যদি কোনো মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করে দেয়, কিংবা তার অন্য কোনো জরুরী হক আদায় করে দেয় অথবা তার উদ্দেশ্যে কোনো সাদকাহ প্রদান করে, তার পক্ষে হজ্জ আদায় করে, তাহলে ঐসব নেক আমল দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে। পবিত্র কুরআনের এই নির্দেশ ও ইজমায়ে উম্মতকে অগ্রাহ্য করার কোনো অবকাশ নেই। এমনি রোযার সওয়াবও মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যায়। তাই কোনো মনগড়া যুক্তি শরীআতের এই সুস্পষ্ট বিধি-বিধানকে খণ্ডন করতে পারে না।
বিরুদ্ধবাদীদের মতে "কোন ইবাদতের সওয়াব কাউকে হাওয়ালা করা বাঞ্ছনীয় নয়।” কারণ ঐ মৃত্যুপথযাত্রী ঈমানের সাথে মারা গেল কিনা তা তখনও জানা যায় না। তবে বিজ্ঞ আলিমগণ এই অভিমত ব্যক্ত করে থাকেন যে, কোন বেঈমান ব্যক্তির জন্য কোনো নেক আমলের সওয়াব বখশিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
উপরোক্ত বক্তব্য খণ্ডনে যা বলা হয়ে থাকে তা এখানে উল্লেখ করা হলো। এক. একজন লোক ঈমানের দিক থেকে ইসলামের উপরে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত থেকে ইনতিকাল করল কিনা এটা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা জানেন। সে যদি ঈমানসহ মৃত্যুবরণ করে থাকে, তাহলে তাকে যে সওয়াব হাওয়ালা করা হবে তা সে পাবে। আর যদি বেঈমান হিসেবে মারা যায়, তাহলে ঐ সওয়াব পাবে না। সেই সওয়াব প্রেরণকারীর নিকট ফিরে আসবে। দুই. বিরুদ্ধবাদীদের মতে, কারো কোনো ইবাদত অন্য কাউকে হাওয়ালা করা যায় না, এতে ইবাদতের প্রতি অবহেলা বা উদাসীনতাই প্রকাশ পায়। তবে যে কোন ইবাদতের সওয়াব হাওয়ালা করা যায়। তিন. একজন নেকবান্দা সওয়াব লাভের আশায় ইবাদত বন্দেগী যথাযথভাবে সম্পন্ন করে থাকেন। কোনো ইবাদত কাউকে হাওয়ালা করার উদ্দেশ্যে আদায় করা হলে এর মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়ে যায়। এছাড়া ইবাদত বন্দেগীর ক্ষেত্রে ভাব-ভক্তি ও নিষ্ঠা একান্ত কাম্য।
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- "নিজের রবের মাগফিরাতের দিকে এবং জান্নাতের দিকে ধাবিত হও, যার প্রশস্ততা আকাশ যমীনের সমতুল্য।" (সূরা হাদীদ: আয়াত-২১) পবিত্র কুরআনে আরো ইরশাদ হয়েছে- “নেক কাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অগ্রগামী হও।" (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-১৪৮) তবে কোনো ইবাদতের সওয়াব অন্য কাউকে বখশিয়ে দিতে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। এখানে উল্লেখ্য যে, সাহাবায়ে কেরাম ইবাদতের মধ্যে একে অপরের প্রতিযোগিতা করতেন। হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর কসম, হযরত আবুবকর (রা) ও আমার মধ্যে যে কোনো নেক কাজে প্রতিযোগিতা হতো, তবে তিনি সব সময় জয়ী হতেন। অবশেষে হযরত উমর (রা) হেরে গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, "আমি আর আপনার সাথে কোন নেক কাজে প্রতিযোগিতায় যাবো না।” পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।" (সূরা মুতাফফিফীন: আয়াত-২৬) পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের আলোকে একজন প্রতিযোগীকে প্রতিযোগিতায় ও একজন ইবাদতকারীকে ইবাদতে অবশ্য অগ্রগামী থাকতে হবে।
বিরুদ্ধবাদীদের অন্য একটি মত এই যে, মৃত ব্যক্তিদেরকে সওয়াব পৌঁছানো যদি জায়েয হয়, তাহলে জীবিতদেরকেও সওয়াব পৌঁছানো জায়েয হওয়া উচিত। এই প্রশ্নের একাধিক উত্তর রয়েছে। এক. জীবিতদেরকেও সওয়াব পৌঁছানো জায়েয। ইমাম আহমদ (র)-এর কোনো কোনো অনুসারীর এটাই অভিমত। এই প্রসঙ্গে কাযী আয়ায (র) বলেছেন, ইমাম আহমদ (র)-এর এরূপ উক্তির দ্বারা মৃত ব্যক্তিদের নিকট যে সওয়াব পৌঁছে, এটা সুনিশ্চিত নয়। একজন লোকের মৃত্যুর পর তার জন্য দু'আ, ইসতিগফার ও জানাযার নামায ইত্যাদির মাধ্যমে ঈসালে সওয়াব করার বিধান রয়েছে। একজন মুসলমান কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির কোনো বিষয়ে যিম্মাদার হলে, সে ব্যক্তি তার ঐ দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায়। একজন জীবিত ব্যক্তি অপর একজন জীবিত ব্যক্তিকে কোনো সৎকাজের সওয়াব বখশিয়ে দিতে পারে। তাহলে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, জীবিতদের গুনাহ অপর জীবিতদের তাওবাহ দ্বারা মাফ হয়ে যেতে পারে। একজন জীবিত ব্যক্তির নেক আমলের দ্বারা মৃত ব্যক্তিদের গুনাহ মাফ হয়ে যেতে পারে। তবে সেটা আল্লাহর ইচ্ছা ও অপার অনুগ্রহ। একজন জীবিত ব্যক্তিও অন্যের দুআ ও ইসতিগফার দ্বারা উপকৃত হতে পারেন। এছাড়া কেউ যদি কোনো মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করে দেন, তাহলে সেই ব্যক্তি ঐ দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যান।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অক্ষম ও অপারগ জীবিত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করার অনুমতি দিয়েছেন। কারো কারো অভিমত এই যে, কোনো জীবিত ব্যক্তি মৃত্যুর সময় যে ঈমান নিয়ে যেতে পারবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে ঐ ব্যক্তির জন্য কোনো সওয়াব প্রেরণ করা হলে এতে তার কোনো উপকার হবে না। এই প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আকীল (র)-এর অভিমত এই যে, এটাও একটি খোঁড়া যুক্তি। কারণ সওয়াব প্রেরণকারী ব্যক্তিও বেদীন হয়ে মারা যেতে পারে। আর তার আমলও বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে, যে আমলের মধ্যে মৃত ব্যক্তির জন্য হাদিয়াও রয়েছে। তবে অকাট্য প্রমাণ ও ঐকমত্য দ্বারা ঐরূপ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ ও রোযা আদায় করার অনুমতি দিয়েছেন। আর এ সম্পর্কে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, যদি কোনো জীবিত ব্যক্তি কোনো মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ঋণ আদায় করে দেয়, তাহলে সে ঐ ঋণ থেকে মুক্ত হয়ে যায়।
এ বিষয়ে আরো বলা যেতে পারে যে, জীবিত ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির জন্য যেসব সওয়াব বখশিয়েছেন, সে সবের মালিক এখন মৃত ব্যক্তি। তবে জীবিত ব্যক্তি যদি বেদীন হয়ে যায়, তাহলে তার পূর্বে পৌঁছে দেয়া নেক আমল বাতিল হতে পারে না, যেহেতু তার ঐ নেক আমল তার থেকে দান করা হয়ে গেছে। যেমন কোনো ব্যক্তি বেদীন হওয়ার পূর্বে যে দাসকে মুক্ত করেছিলো অথবা যে কাফফারা আদায় করেছিলো, তার ধর্মচ্যুতিতে তার নেক কাজে কোনো প্রকার প্রভাব পড়বে না। এমনকি কেউ কোনো অক্ষম জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে যদি হজ্জও পালন করে থাকে, তাহলে তার ধর্মচ্যুতির দরুন সেই হজ্জ পালনে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে না, যে জন্য অন্য কাউকে দিয়ে আবার হজ্জ করাতে হবে। এছাড়া জীবিতদের ও মৃতদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একজন জীবিত ব্যক্তি কোনো মৃত ব্যক্তির মুখাপেক্ষী নন। যেহেতু একজন জীবিত ব্যক্তির আমল করার সুযোগ রয়েছে। সে নিজে আমল করতে পারে। কোনো মৃত ব্যক্তির সেই সুযোগ নেই।
তদুপরি একজন জীবিত ব্যক্তি তার আমল বা তাওবাহর দ্বারা অন্য কোনো জীবিত ব্যক্তির উপকার করতে চাইলেও, সমস্যা থেকে যায়। আর তা হলো একজন ধনী ব্যক্তি তার ধনের বিনিময়ে গরীব লোকদের দ্বারা তার জন্য প্রয়োজনীয় ইবাদত করিয়ে নিতে পারে। আর যদি কোনো ইবাদত বিনিময়ের মাধ্যমে অর্জন করা হয়, তাহলে এর অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হবে, ফরয ও নফল ইত্যাদি ইবাদত বরবাদ করে দেয়া। এছাড়া যেসব ইবাদত আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের সহায়ক, সেই ইবাদতের সওয়াব থেকে ধনী ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয়ে যান। কোনো ইবাদতকারী অথবা অন্যের দ্বারা ইবাদতে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কোনো ইবাদতের কোনো প্রকার বিনিময় গ্রহণ করতে পারে না। উল্লেখ্য যে, ইবাদতের জন্য কেউ কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করলে সেই ইবাদতের প্রতিদান বা সওয়াব বিনষ্ট হয়ে যায়। একজন ইবাদতকারী সেই ইবাদতের সওয়াবই পেয়ে থাকেন, যেটা কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে করা হয়। শরীআতের সৌন্দর্যের বৈশিষ্ট্য এই নয় যে, ইবাদত বন্দেগীকে কোন পার্থিব লেনদেনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কারো কোনো ঋণ অথবা কোনো কিছুর যামানত সম্পর্কে দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করা বৈধ। যেহেতু এটা মানুষের জীবনে একটা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার, যেটা একজনের জীবিত অবস্থায় অথবা মৃত অবস্থায় হতে পারে।
যে কোনো নেক আমলের পুরাপুরি ঈসালে সওয়াব যখন জায়েয, তখন যে কোন নেক আমলের আংশিক ঈসালে সওয়াবও জায়েয। এ বিষয়ে ভিন্ন মতের কোনো অবকাশ নেই। যাঁরা এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন, তাঁদের স্বপক্ষে কোনো যুক্তি প্রমাণ নেই। এ সম্পর্কে ইমাম আহমদ (র)-এর অভিমত এই যে, কেউ নিজের কোনো জিনিস স্বেচ্ছায় ও আনন্দের সাথে কাউকে দান করলে সেটা যেমন বৈধ ও জায়েয, তেমনি কোনো একটি আমলের সওয়াব একাধিক ব্যক্তিকে দান করলে তারা সকলেই সমভাবে সেই সওয়াব পাবেন।
ঈসালে সওয়াব যখন জায়েয ও বৈধ বলে বিবেচিত, তখন একজন ব্যক্তি তার যে কোনো নেক আমল অন্য একজন ব্যক্তিকে বখশিয়ে দিতে পারেন। তবে কেউ কেউ এরূপ ধারণা পোষণ করেন যে, ঈসালে সওয়াবের জন্য আমলকারীর পক্ষে ঐ আমলের নিয়ত করা প্রয়োজন। তবে ইমাম আহমদ (র) ঈসালে সওয়াবের জন্য এরূপ নিয়তের কোনো শর্ত উল্লেখ করেননি। এছাড়া এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলিমদের কোনো অভিমত পাওয়া যায় না। অবশ্য পরবর্তীকালের আলিমদের মধ্যে কাযী আয়ায (র) প্রমুখ এরূপ শর্ত আরোপ করেছেন। কাযী আয়ায (র) আমলের শুরুতে ঈসালে সওয়াবের নিয়তকে শর্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এরূপ বলার উদ্দেশ্য হলো, কোনো নেক আমলের সওয়াব যেন সরাসরি মৃত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে যায়। আর যিনি আমল করার পর ঈসালে সওয়াবের নিয়ত করেন, তিনি প্রথমে নিজে ঐ আমলের সওয়াব পাবেন, তারপরে ঐ সওয়াব তাঁর কাছ থেকে মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে যাবে।
এই প্রসঙ্গে আবূ আবদুল্লাহ ইবনে হামাদান (র) বলেছেন, কোনো আমলকারী ঈসালে সওয়াবের নিয়ত প্রথমে না করলেও আমলকারী যদি কাউকে সেই আমলের সওয়াব বখশিয়ে দেন, তাহলে সেটা তিনি পেয়ে যাবেন। আর যে কোনো নেক আমলের সওয়াব পৌঁছে দেওয়া এভাবেই কার্যকর হয়। তাই কেউ যদি তার কোনো দাসকে মুক্ত করে দেয়, তাহলে ঐ সৎকাজের সওয়াব সে নিজেই পাবে, অন্য কেউ নয়। তবে যদি কেউ কারো পক্ষ থেকে নিয়ত করে তার কোনো দাসকে মুক্ত করে দেয়, তাহলে সেটার সওয়াব ঐ ব্যক্তিই পাবে। কেউ যদি অন্যের কোনো ঋণ কোনো নিয়ত ছাড়া ঐ ব্যক্তির পক্ষ থেকে পরিশোধ করে দেয়, আর ঋণ শোধ করার পর ঈসালে সওয়াবের নিয়ত করে, তাহলে সেটা ঠিক হবে না। এইভাবে যদি কেউ হজ্জ আদায় করে, রোযা রাখে, কিংবা নামায পড়ে তারপর অন্যের জন্য এসব আদায় করার নিয়ত করে, তাহলে সেটাও জায়েয হবে না। যাঁরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে ঈসালে সওয়াব সম্পর্কে ফতওয়া জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁরা এটাই জানতে চেয়েছিলেন, "আমরা যে নিজের পক্ষ থেকে সাদকাহ করেছি, এর সওয়াব কি মৃত ব্যক্তিরা পাবে?' এমনিভাবে জনৈকা মহিলা জানতে চেয়েছিলেন, "আমি কি আমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ্জ পালন করতে পারি?" অপর এক ব্যক্তি জানতে চেয়েছিলেন, "আমি কি আমার পিতার পক্ষ থেকে হজ্জ পালন করতে পারি?" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব পালন করার অনুমতি প্রদান করেছিলেন। তবে প্রশ্ন এই যে, কেউ তার কোনো আগের করা নেক আমল বা আমলের সওয়াব অন্য কাউকে বখশিয়ে দিতে পারেন কিনা, এরূপ কোনো প্রশ্ন কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেসই করেননি। এছাড়া কোনো সাহাবীও এমন কোনো নেক আমল করেননি, যা পরে তিনি ঈসালে সওয়াব হিসেবে দান করেছিলেন। নেক আমলের ঈসালে সওয়াবের ক্ষেত্রে এটাই হলো একটি সাধারণ নিয়ম। তবে যাঁরা নিয়তের শর্তকে স্বীকার করেন না, তাঁরা কোনো নেক আমলের সওয়াব বখশিয়ে দেয়ার কথাও স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে ইসালে সওয়াব যদি জায়েয হয়, তাহলে জীবিত ব্যক্তিদের ফরয আমলের সওয়াব ও হাদিয়া করা জায়েয হবে, তবে এই অভিমত গ্রহণযোগ্য নয়।
যাঁরা ঈসালে সওয়াবের জন্য শুরু থেকেই নিয়ত করার শর্ত আরোপ করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা যায় না। কেননা কেউ যদি অন্যের কোনো ফরয ইবাদত আদায় করেন, তাহলে এর দ্বারা তার নিজের ফরয আদায় হবে না। তবে যে ব্যক্তি তার কোনো আমলের আগে নিয়ত করা আবশ্যক মনে করে না, তার বিরুদ্ধে এরূপ অভিযোগ অবশ্যই আনা যেতে পারে। তবে এই অভিযোগের দু'টি জবাব আছে। এক. হযরত আবূ আবদুল্লাহ হামাদান (র) বলেছেন, যদি ফরয নামায অথবা রোযা ইত্যাদি আমলের সওয়াব অন্য কাউকে হাদিয়া করা হয়, তাহলে তা জায়েয এবং সওয়াব প্রদানকারীর দায়িত্ব থেকে তার ফরযও আদায় হয়ে যাবে। হযরত আবূ আবদুল্লাহ হামাদান (র)-এর বক্তব্য হলো এক শ্রেণীর লোকের অভিমত, তারা নিজের ফরয ও নফল আমলের সওয়াব অন্যকে দান করে দেয় এবং বলে, আমরা আল্লাহর সাথে শূন্য হাতে সাক্ষাৎ করবো, শরীআতের এতে কোনো বাধা নেই। সওয়াব আমলকারীর হক, সে যদি তা অন্য কাউকে দান করে, তাহলে এতে কোনো আপত্তি বা প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে না। দুই. অপর এক শ্রেণীর লোক এরূপ সওয়াব দান করা যে নাজায়েয বলেন সেটা ঠিক নয়। শরীআতের বাধ্যবাধকতা মেনে চলা একজন মুমিন বান্দার জন্য অপরিহার্য ও পরীক্ষা সদৃশ। এটা পরিবর্তন করার এমন কোনো সুযোগ নেই। যদি কোনো মুসলমান তার নিজ ভাইকে তার কোনো আমলের সওয়াব দ্বারা উপকার করে, তাহলে এতে কারো কোনো আপত্তি থাকতে পারে না। বরং এটা আল্লাহর মেহেরবানী ও ইহসানের পরম পরাকাষ্ঠা যে, তিনি তাঁর ফেরেশতাদেরকে এমনকি আরশ বহনকারী ফেরেশতাদেরকেও মুমিন বান্দাদের জন্য দুআ ও ইসতিগফার করার জন্য নিয়োজিত করে রেখেছেন। ফেরেশতারা সব সময় মুমিন বান্দাদের জন্য দু'আ করছেন, আল্লাহ পাক যেন তাদেরকে অন্যায় ও অবৈধ কাজ থেকে বিরত রাখেন। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি যেন মুমিন পুরুষ ও নারীদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন। এছাড়া কিয়ামতের দিন তিনি যেন মাকামে মাহমূদে দাঁড়িয়ে একাত্ববাদীদের জন্য সুপারিশ করেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আরো নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি যেন নিজের সাহাবাদের জন্য দুনিয়াতে থাকাকালীন ও তাঁদের ইনতেকালের পরেও দুআ করেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তাঁর উম্মতের কবরে উপস্থিত হয়ে দু'আ করতেন, এটা কুরআন হাদীস দ্বারা স্বীকৃত। এটাকে ফরযে কিফায়া হিসেবেও গণ্য করা হয়। ফরযে কিফায়া ঐ নেক কাজকে বলা হয়, যা কোনো একজন মুসলমান আদায় করলে তা সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। তদুপরি কেউ যদি কোনো মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার কোনো ঋণ আদায় করে দেয়, তাহলে আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তির বেহেশতে প্রবেশের সকল বাধা ও কবরের আযাব দূর করে দেবেন। এটা শরীআতের বিধান মান্যকারীদের জন্য একটি নি'আমতস্বরূপ। এমনিভাবে ইমামের পেছনে একজন মুক্তাদীর নামায সহীহ হওয়ার জন্য মুক্তাদীর ভুলের সাহু সিজদাহ রহিত হয়ে যায় এবং ইমামের কির'আতের দ্বারা মুক্তাদীদের কিরায়াত পড়া রহিত হয়ে যায়। এছাড়া ইমামের সুতরার দ্বারা মুক্তাদীর জন্য সুতরা রহিত হয়ে যায়। নামায পড়ার সময় সম্মুখ ভাগে কোনো কিছু রেখে আড়াল করাকে সুতরা বলে। ঈসালে সওয়াব আল্লাহ তা'আলার বিশেষ ইহসানের একটি নিদর্শন। আল্লাহ তা'আলা ইহসানকারীদেরকে পছন্দ করেন। সৃষ্টিকুল আল্লাহ তা'আলার পরিবার সদৃশ। আল্লাহ তা'আলার নিকট তিনি সবচেয়ে বেশি প্রিয় যিনি তাঁর পরিবারের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তিকে ভালোবাসেন যে তাঁর মাখলুককে এক ঢোক পানি, সামান্য কিছু দুধ অথবা এক টুকরো রুটি দান করেন। আল্লাহ তা'আলার মাখলুককে দুর্বল ও দীনহীন অবস্থায় যখন তাদের আমল করার কোনো অবকাশ থাকে না এবং যখন তারা খুব অভাবগ্রস্ত সে সময় তাদের কোনো সাহায্য বা উপকার করলে, সে বান্দাকে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই ভালোবাসবেন। তাই আগেকার যমানার কোনো কোনো বুযুর্গ ব্যক্তি বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যহ সত্তর বার এই দু'আ করে- রাব্বিগফিরলী ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া ওয়ালিল মুসলিমীনা ওয়াল মুসলিমাত ওয়াল মুমিনিনা ওয়াল মুমিনাত। অর্থাৎ “হে আমার রব, আমাকে ও আমার মাতাপিতাকে আর সকল মুসলমান পুরুষ ও মহিলাকে ও সকল মুমিন পুরুষ ও মহিলাকে মাফ করে দিন।" সে ক্ষেত্রে এই দু'আ পাঠকারী এই আমলের সওয়াব সব মুসলমানের সওয়াবের সমপরিমাণ পাবেন। যে ব্যক্তি আপন ভাইদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন, তিনি তাঁর ভাইদের জন্য সওয়াবের কাজই করে থাকেন। আর আল্লাহ সদ্ব্যবহারকারীদের প্রতিদানকে বিনষ্ট করেন না।
যাঁরা ঈসালে সওয়াব বিশ্বাস করেন না, তাঁদের মতে কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তাওবাহ করে তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। আসলে, এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা। তবে এসব বিভ্রান্তিকর ধারণার সঠিক জবাব এখানে দেয়া হলো। এক. এরূপ কোনো যুক্তি অকাট্য প্রমাণ ও ইজমা বা ঐকমত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং তা সংঘাত সৃষ্টি করে। এছাড়া যেটা পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট প্রমাণের পরিপন্থী সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তা'আলা কোনো কোনো জিনিসের মধ্যে যে পার্থক্য রেখেছেন, এর দ্বারা সে পার্থক্য দূর হয়ে যায়। দুই. কোন একজনের পক্ষ থেকে অন্য কারো ইসলাম গ্রহণ করা বা তাওবাহ করা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্য সাদকাহ দেয়া, হজ্জ করা ও দাসকে মুক্ত করা ইত্যাদি নেককাজের সওয়াব আল্লাহ তা'আলা কবুল করেন। ঈসালে সওয়াবের বিরোধীরা উপরে বর্ণিত উভয় প্রকার বিধি-বিধানকে এক রকমের মনে করেন। কোন ব্যক্তির যবেহ করা পশু, সুদের ব্যবসা ও সুদমুক্ত ব্যবসাকে একইভাবে তারা বৈধ গণ্য করেন। তিন. আল্লাহ তা'আলা ইসলামকে মুসলমানদের জন্য ইহকালে ও পরকালে একে অপরকে উপকার করার এক সুদৃঢ় বন্ধন স্থাপন করে দিয়েছেন। এই বন্ধন বিদ্যমান না থাকলে অপরের উপকার করা সম্ভব নয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হযরত আমর ইবনে আস (রা)-কে বলেছিলেন, যদি তোমার পিতা আল্লাহর একত্বকে মেনে নিতেন, আর তুমি তাঁর পক্ষ থেকে রোযা রাখতে বা সাদকাহ দিতে, তাহলে তোমার এসব নেক আমল তাঁর উপকারে আসতো। ইসলাম ও তাওহীদে বিশ্বাসী থাকা অবস্থায়ই কেবল নেক আমলের সুফল লাভ করা যায়। ইখলাসের সাথে সুন্নাতের পরিপূর্ণ অনুসরণ একজন বান্দার নেক আমল কবুল হওয়ার পূর্ব শর্ত, যেমন নামায সহীহ ও কবুল হওয়ার জন্য ওযু ও অন্যান্য শর্তাবলী যথারীতি পালন করা অত্যাবশ্যক। যে কোনো নেক আমলের যাবতীয় কার্যকারণেরও এটাই পূর্ব শর্ত। যে ব্যক্তি কারণে বা অকারণে বৈধ বা অবৈধ বিষয়কে একত্রিত করে ফেলে, সে একজন বিভ্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। নাফরমানদের জন্য যদি সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে মুশরিকদের ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য হবে না কেন? আর একাত্ববাদীদেরকে যদি জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হয়, তাহলে সমস্ত কাফিরদেরকেও বের করে আনা হবে না কেন? এরূপ যুক্তিও অবতারণা করা যেতে পারে। এটা বলা বাহুল্য যে, প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিরা এসব অবান্তর বিষয়ের প্রতি কোনো গুরুত্ব আরোপ করেননি। তবে পথভ্রষ্ট লোকেরা তাদের ভ্রান্ত মতবাদ প্রচারের দ্বারা নিজেদের আমল বিনষ্ট করে থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো- একজন লোকের পক্ষে অন্য একজন লোকের ইবাদত বা অন্য কোনো সওয়াবের কাজ ঈসালে সওয়াব স্বরূপ আদায় করা জায়েয কিনা? ইবাদত দুই প্রকারের- প্রথম প্রকার হলো একজন অন্যজনের পক্ষে যা আদায় করে থাকে। এরূপ ঈসালে সওয়াব জায়েয ও বৈধ। আর অন্য প্রকারের ইবাদত হলো যেটা কেউ অন্য কারো পক্ষে সম্পাদন করে না। এ ধরনের ইবাদত ঈসালে সওয়াব হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এরূপ অভিমতের প্রমাণ কি? এর পার্থক্যের ভিত্তি কি? এই অভিমতের সমর্থনে কুরআন হাদীসে কোনো প্রমাণ আছে কি? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোযা আদায় বৈধ করে দিয়েছেন। কিন্তু একজন জীবিত ব্যক্তি অন্য একজন জীবিতের পক্ষে রোযা রাখতে পারে না। এমনিভাবে কেউ যদি ফরযে কিফায়া আদায় করে, তাহলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়। কোনো অবুঝ বালকের পক্ষ থেকে কেউ তার হজ্জ পালন করলে ঐ বালক সওয়াব পাবে। ইমাম আবু হানীফা (র) বলেছেন, কোনো বেহুঁশ ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার সাথীরা ইহরাম বাঁধতে পারে। যদি কোনো অমুসলিম পিতামাতা ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে তাঁদের নাবালিগ সন্তানগণও ইসলাম গ্রহণের মর্যাদা লাভ করে থাকে। লক্ষণীয় যে, একজনের সৎকাজের সুফল অন্যজনের মাধ্যমে এইভাবে সম্প্রসারিত হয় সুতরাং স্বয়ংসম্পূর্ণ শরীআতের বিধান মানুষকে তার মাতাপিতার সাথে কিম্বা বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে অথবা অন্যান্য মুসলমানের সাথে তার অতি প্রয়োজনের সময় ঈসালে সওয়াব থেকে তাকে কি বঞ্চিত রাখতে পারে? কখনই নয়। কারো জন্য এটা ঠিক নয় যে, সে কাউকে এমন নেকী থেকে বিরত রাখে যা থেকে শরীআত তাকে বঞ্চিত করেনি। যেমন- হজ্জ পালন করা, সাদকাহ দেয়া, কোনো দাসকে মুক্ত করা, রোযা রাখা, নামায পড়া, কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করা এবং ইতেকাফ করা। কোন ঈসালে সওয়াবকারীর ইহসান বা উপকারকে শরীআতের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেয়া হয়নি। বরং শরীআত সর্বাবস্থায় ইহসানকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
অনেক মুমিন বান্দার স্বপ্নের ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, মৃত ব্যক্তিরা তাঁদেরকে জানিয়েছেন, জীবিতদের প্রেরিত হাদিয়া তাঁরা পেয়েছেন। এই প্রসঙ্গে এখনকার মুসলমানদের স্বপ্নের অবস্থা আর আগেকার মুসলমানদের স্বপ্নের অবস্থা এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হলে এই গ্রন্থের কলেবর অধিক বৃদ্ধি পাবে তাই সেটা পরিহার করা হলো। নবী করীম সালল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত: তিনি স্বপ্নযোগে প্রত্যক্ষ করেছেন শবে কদর রমযান শরীফের শেষ দশকে নিহিত আছে। মহান সাহাবায়ে কেরামও স্বপ্নযোগে এরূপ দেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ধারণা অনুযায়ী শবে কদর সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের স্বপ্ন যেমন গ্রহণযোগ্য, তাঁদের রেওয়ায়েত বা স্বপ্নের ঘটনা একত্রিত করা হয়, তখন সেটা সঠিক ও সত্য বলে প্রমাণিত হয়। কেননা সবাই মিথ্যাবাদী হতে পারে না, এটাই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মূল কথা।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "কোন ব্যক্তি রোযা বাকী রেখে মৃত্যুবরণ করলে, তার পক্ষ থেকে তার কোনো ওলী সে রোযা রেখে দেবে।” যুক্তি বহির্ভূত প্রমাণ খণ্ডন করার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, এরূপ ধারণা সহীহ ও সুপরিচিত হাদীসের পরিপন্থী। এছাড়া সহীহ ও সঠিক হাদীসকে মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই, কেউ তা গ্রহণ করুক বা না করুক। একজন মুমিন মুসলমানের নিকট দুনিয়ার মোহমায়া মুখ্য নয়, গৌণ। আল্লাহর রাসূলই তাঁর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ। ঈসালে সওয়াব সম্পর্কে এখানে আরো কিছু তথ্য উল্লেখ করা হলো। এক. ইমাম মালিক (র) তাঁর মুয়াত্তা নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, "কেউ কারো পক্ষ থেকে রোযা রাখবে না।” কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "এক মুসলমান অন্য মুসলমানের পক্ষ থেকে রোযা রাখতে পারে।" এখন দেখা যাক, কোন অভিমত গ্রহণযোগ্য, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস না ইমাম মালিক (র)-এর মুয়াত্তা গ্রন্থে উল্লেখিত অভিমত। তর্কের খাতিরে যদি বলা হয়, ইমাম মালিক (র) মুসলমানদের ইজমা বা ঐকমত্যের উপর ভিত্তি করে এ সম্পর্কে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তাহলে তিনি কেবল মদীনাবাসীদের ইজমার উপরই নির্ভর করেছিলেন, সমগ্র মুসলিম জাহানের ঐকমত্যের উপর নয়। এছাড়া এই বিতর্কিত বিষয় সম্বন্ধে সে সময় ইমাম মালিক (র) অবহিত ছিলেন না। সুতরাং ইমাম মালিক (র) এ বিষয়ে অবগত না থাকার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র হাদীসকে পরিত্যাগ করা যায় না। সমস্ত মদীনাবাসীও যদি কোন বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন, আর তা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসকে মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। যেহেতু অন্য আর কেউ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী নন, তাঁদের সম্মান ও পদমর্যাদার যতোই উঁচুস্তরের হোক না কেন। আল্লাহ তা'আলা অন্য কারো অভিমতকে কোনো দলীল প্রমাণের মাপকাঠি বলে গণ্য করেননি যে, এরূপ কোনো মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে সেটা গ্রহণ করা যাবে। বরং পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, “তোমাদের মধ্যে যদি কোনো বিষয়ে বিবাদ দেখা দেয়, তাহলে এটাকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি এবং আখিরাতের প্রতি তোমাদের বিশ্বাস থাকে। এর মধ্যে নিহিত রয়েছে তোমাদের কল্যাণ। আর পরিণতির দিক থেকে এটাই উত্তম।” (সূরা নিসা: আয়াত-৫৯)
যদিও ইমাম মালিক (র) ও মদীনাবাসীরা অন্যের পক্ষ থেকে রোযা রাখার বিরোধিতা করেছেন, তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) সুস্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, রমযানের রোযার বিনিময়ে তোমরা গরীব-মিসকীনকে খানা খাইয়ে দেবে, আর মানতের রোযার জন্য রোযা রাখবে। ইমাম আহমদ (রহ) অধিকাংশ আসহাবে হাদীস এবং হযরত আবূ উবায়েদ (র) এই অভিমত পোষণ করতেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আবূ সওর (র) বলেছেন, মানতের রোযা হোক বা মানত ছাড়া অন্য কোনো রোযা হোক, এসব রোযাও একে অন্যের পক্ষ থেকে রাখতে পারে। হযরত হাসান ইবনে সালিহ (র)-ও মানতের রোযা কারো পক্ষ থেকে তার ওলী রাখতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক উপরে বর্ণিত হাদীসের মর্মার্থ হলো- “কেউ কারো পক্ষ থেকে রমযানের রোযা রাখতে পারে না।” কোনো সাহাবীর ফতওয়া কোনো রেওয়ায়েতের বিপরীত হতে পারে। তবে এরূপ ফতওয়া রেওয়ায়েতের উপর প্রাধান্য পেতে পারে না। কারণ রেওয়ায়েত অভিযোগমুক্ত আর ফতওয়া অভিযোগদুষ্ট। এসব ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে, ফতওয়া দানকারী ফতওয়া দেয়ার সময় সংশ্লিষ্ট হাদীসটি তাঁর মনে নাও থাকতে পারে। অথবা হাদীসটি তাঁর মনে থাকলেও ঘটনাচক্রে তিনি তার বিপরীত অর্থ গ্রহণ করেছেন। এটাও হতে পারে যে, উক্ত হাদীসের বিপরীত অন্য কোনো হাদীস রয়েছে যে হাদীসটিকে অধিকার দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর অভিমত ও উপরে বর্ণিত হাদীসটি একটি অপরটির পরিপন্থী নয়। কেননা তিনি তো রোযা সম্পর্কে এ ফতওয়া দিয়েছেন যে, কেউ কারো পক্ষ থেকে রমযানের রোযা রাখবে না। তবে মানতের রোযার ক্ষেত্রে একজনের পক্ষ থেকে অন্যজন রোযা রাখতে পারবে। এ ফতওয়াটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর বর্ণিত অপর হাদীসের বিপরীত নয়। বরং তিনি হাদীসটিকে মানতের রোযার উপর কিয়াস করেছেন। তাছাড়া এ হাদীসটি হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা)-এর রেওয়ায়েতের উপর কোন প্রভাব ফেলেনি। বরং হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা)-এর রেওয়ায়েতের দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর অভিমতকে খণ্ডন করা শ্রেয়। তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে দুই প্রকারের রেওয়ায়েত বর্ণিত রয়েছে। কোনো রেওয়ায়েতের পরস্পর বিরোধিতার জন্য কোনো হাদীসকে প্রত্যাহার করা সমীচীন নয়। হাদীসের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ কোনো রেওয়ায়েতকে পরিহার করাও যুক্তিযুক্ত নয়। এখানে এটুকু বলা যেতে পারে যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটির সনদে মতভেদ আছে। এরূপ ধারণা নিছক অনুমান মাত্র ও অগ্রহণযোগ্য। আসলে উক্ত হাদীসটি সহীহ ও সুপ্রমাণিত এবং এর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ঐকমত্য রয়েছে। ইমাম বুখারী (র) এবং ইমাম মুসলিম (র) ও এই হাদীসটি তাঁদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। কেউ এই হাদীসের সনদে কোনো মতপার্থক্য আছে বলে উল্লেখ করেননি। ইমাম আহমদ (র) এই হাদীসটি সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন, এটা হযরত আবদুল বার (র) ও সমর্থন করেছেন। ইমাম শাফিয়ী (র)ও এ হাদীসটিকে সহীহ বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাই ইমাম শাফিয়ী (র)-এর অনুসারীরা এই হাদীসটিকে অনুসরণ করে থাকেন।
উক্ত হাদীস সম্পর্কে ইমাম বাইহাকী (র) বলেছেন, মৃতদের পক্ষ থেকে রোযা রাখা বৈধ। তাঁর এই অভিমত হযরত সায়ীদ ইবনে জুবায়ের (র), হযরত মুজাহিদ (র), হযরত আতা (র) ও হযরত ইকরামা (র) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রা) প্রমুখও সমর্থন করেছেন। কোনো কোনো রেওয়ায়েতে উল্লেখ আছে যে, জনৈকা মহিলা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করেছিলেন যে, (সম্ভবত এই মহিলা উম্মে সাআদ (রা) ব্যতীত অন্য কেউ হয়ে থাকবেন) তিনি তাঁর মৃত মায়ের পক্ষ থেকে রোযা রাখতে পারবেন কি? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ইরশাদ করেছিলেন, হ্যাঁ, রাখতে পারো।
অনেকের মতে উপরে বর্ণিত হাদীসটি পবিত্র কুরআনের কোনো কোনো আয়াতের সাথে যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে তা মোটেই ঠিক নয়। "লাইসা লিল ইনসানি ইল্লা মা সায়া” অর্থাৎ “মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।" এই আয়াতের সাথে আলোচ্য হাদীসের কোনো সংঘাত বা সংঘর্ষ নেই, হয়তো এখানে শব্দগত সাযুজ্য রক্ষা করা হয়নি। কোনো সহীহ হাদীসই পবিত্র কুরআনের পরিপন্থী নয়। সুতরাং কুরআনের সাথে হাদীসের সংঘর্ষের কোনো প্রশ্নই উঠে না। বরং হাদীস পবিত্র কুরআন বুঝার পক্ষে সহায়ক। হাদীস সম্পর্কে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ও অন্যায় অনুসরণপ্রীতি মারাত্মক পরিণতির সৃষ্টি করতে পারে। পবিত্র কুরআনের আয়াত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসের মধ্যে মতপার্থক্য লোকের ভুল বুঝাবুঝির হেতু ছাড়া আর কিছু নয়। এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা অশোভনীয় যে, পবিত্র আয়াতের বাহ্যিক অর্থের প্রেক্ষাপটে সহীহ হাদীসকে রহিত করে দেয়া হয়। হাদীসের সাথে আয়াতের সমন্বয় সাধন করাই প্রকৃত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচায়ক। যিনি পবিত্র কুরআন শিক্ষা দেন, তিনি হাদীস থেকেও সাহায্য গ্রহণ করেন। এই প্রেক্ষিতে হাদীসকে পবিত্র কুরআনের তাফসীর হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তাই পবিত্র কুরআনের সাথে হাদীসের সংঘর্ষের কোনো প্রশ্ন উঠে না।
মৃতদের পক্ষ থেকে রোযা রাখা সম্পর্কিত হাদীসটি নাসায়ী শরীফে বর্ণিত হাদীসের সাথে কোনো মতপার্থক্য সৃষ্টি করে না। এটা একটি পরিতাপের বিষয় যে, নাসায়ী শরীফে বর্ণিত হাদীসটি প্রকৃতপক্ষে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস নয় বরং এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর একটি অভিমত মাত্র। কোনো একটি সহীহ হাদীস বিদ্যমান থাকা অবস্থায় হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর একটি বক্তব্য কতোই বা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে? কোনো অবস্থায়ই হাদীসের উপর হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দেয়া যায় না। অথচ হযরত ইবনে আব্বাস (রা) নিজেই রোযা রাখা সম্পর্কিত হাদীস বর্ণনা করেছেন। নাসায়ী শরীফে বর্ণিত হাদীসটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস নয়। মুসলিম শরীফে হযরত বুরাইদা (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করেছিলেন, আমার আম্মা ইনতেকাল করেছেন, তাঁর এক মাসের রোযা আদায় করা হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, "তুমি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে রোযা রাখো।” বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থে আরো উল্লেখ আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছিলেন, কেউ যদি রোযা না রেখে ইনতেকাল করে তাহলে তার ওলীকে তার পক্ষ থেকে ঐ রোযা রাখতে হবে। অপরপক্ষে, রোযা রাখা সম্পর্কিত হাদীসটি হযরত ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত: "কেউ রমযান মুবারকের রোযা বাকী রেখে ইনতেকাল করলে তার পক্ষ থেকে গরীব মিসকীনকে খানা খাইয়ে দেবে।" এই হাদীসটির সাথে সংঘর্ষ বাধে। কিন্তু গ্রন্থকারের মতে এই হাদীসটিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস নয়।
ইমাম বাইহাকী (র) বলেছেন, উক্ত হাদীসটি সহীহ নয়। কেননা মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা (র) একজন নির্ভরযোগ্য রাবী নন। এটা হযরত ইবনে উমর (রা)-এর একটি উক্তি মাত্র। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস নাফে (র) এবং তাঁর অনুসারীগণ এই অভিমত পোষণ করতেন। এছাড়া এ হাদীসটি যুক্তিগ্রাহ্যও নয়। গ্রন্থকারের মতে এরূপ কিয়াসকে গুরুত্ব দেয়ার কোনোই যুক্তি নেই, যার দ্বারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহীহ ও স্পষ্ট হাদীসকে রহিত করা হয়। এরূপ যুক্তি গ্রহণ করলে এটা সুন্নাতের পরিপন্থী বলে গণ্য হবে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো কাফিরের মৃত্যুর পর তার পক্ষ থেকে অন্য কেউ ঈমান আনতে পারে না। তবে একজন মুসলমান মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সওয়াব করা যায়। এ দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনোই সামঞ্জস্য নেই, এটা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট। একজন মৃত মুসলমানের ঈসালে সওয়াবের সাথে একজন মৃত কাফিরের পক্ষ থেকে অন্য একজন কাফিরের ঈমান আনার উপর কিয়াস করা ভ্রান্ত কিয়াস ছাড়া আর কি হতে পারে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে ইমাম শাফিয়ী (র) ও সমালোচনা করেছেন। ইমাম শাফিয়ী (র) বলেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত হাদীসে উম্মে সাআদের মানত সম্পর্কে উল্লেখ আছে, সেটি হজ্জের মানত, নাকি উমরার মানত, নাকি সাদকাহর মানত ছিলো তা সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নয়। এর জবাব ইমাম শাফিয়ী (র)-এর ঘনিষ্ঠ সাথী ইমাম বাইহাকী (র) প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, হযরত ইবনে জুবায়ের (রা), হযরত মুজাহিদ (র), হযরত আতা (র) এবং হযরত ইকরামা (র) আর হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর রেওয়ায়েতের দ্বারা একজন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোনো নেক আমলের কাযা আদায় করা বৈধ বলে গণ্য হবে। কোনো কোনো সাহাবীর বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, জনৈকা মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করেছিলেন, (তিনি উম্মে সাআদ (রা) ছাড়া অন্য কেউ হতে পারেন) আমার মৃত মায়ের পক্ষ থেকে আমি তাঁর কাযা রোযা রাখতে পারি কিনা? ইরশাদ হয়েছিলো, "হ্যাঁ, তুমি তোমার মৃত মায়ের পক্ষ থেকে রোযা রাখতে পারো।" এই হাদীসের সমর্থনে আরো একটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা হলো। হযরত বুরাইদা (রা) থেকে বর্ণিত, তাঁর আম্মার ইনতেকালের আগে তাঁর এক মাসের রোযা কাযা ছিলো। তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করেছিলেন, তাঁর মায়ের পক্ষ থেকে তিনি এই কাযা রোযা রাখতে পারেন কিনা? ইরশাদ হলো, "হ্যাঁ।” (মুসলিম) হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে হযরত ইবনে শাইবা (রা) এর একটি হাদীস বর্ণিত আছে, একবার জনৈক ব্যক্তি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করলো, তাঁর মা ইনতেকাল করেছেন, কিন্তু তাঁর এক মাসের রোযা কাযা রয়ে গেছে। এখন সে ঐ কাযা রোযা আদায় করতে পারবে কি না? ইরশাদ হলো, তার যদি কোনো দেনা-পাওনা থাকতো, তাহলে তুমি তা পরিশোধ করতে কিনা? লোকটি উত্তর দিলো, হ্যাঁ, করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে আল্লাহর ফরয আদায় করা তোমার পক্ষে আরো বেশি সমীচীন।
এই রেওয়ায়েতটি হযরত আবূ খায়সুমা (র) ও ইমাম নাসায়ী (র) তাঁদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে হযরত উম্মে সাআদ (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস থেকে এর সনদ ও মতন উভয়টিই পৃথক। হাদীসে বর্ণিত মানত আদায় করা কোনো শর্ত ছাড়াই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হযরত আ'মাশ (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রোযার উল্লেখ আছে। এছাড়া নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক কোনো সুনির্দিষ্ট মানত উল্লেখ না করায় এ বিষয়ে কোনো পার্থক্য সূচিত হয় না। অন্যথায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত মানত রোযার না নামাযের ছিলো তা জিজ্ঞেস করে জবাব দিতেন।
মৃতদের পক্ষ থেকে জীবিতদের রোযা রাখা সম্পর্কে আরো অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলো, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ও ইমাম আহমদ (র) বলেছেন, মানতের রোযা রাখতে হবে আর রমযানের কাযা রোযার কাফফারা আদায় করতে হবে। হযরত আবূ সওর (র), হযরত দাউদ ইবনে আলী (র) ও তাঁর অনুসারীরা বলেছেন, "মানতের ও কাযার রোযা রাখতে হবে।" এই প্রসঙ্গে ইমাম আওযায়ী (র) ও হযরত সওরী (র) বলেছেন, "কাযা রোযার কাফফারা দিতে হবে অন্যথায় রোযা রাখতে হবে।” হযরত আবূ উবায়েদ কাসেম ইবনে সালাম (র) বলেছেন, "মানতের রোযা রাখতে হবে আর ফরয রোযার জন্য গরীব মিসকীনকে খানা খাইয়ে দিতে হবে।” হযরত হাসান বসরী (র) বলেছেন, "যদি কোনো মৃত ব্যক্তির রমযান মাসের রোযা বাকী থাকে আর তার পক্ষ থেকে একদিনেরই ত্রিশজন লোক রোযা রাখে, তাহলে তার কাযা রোযা আদায় হয়ে যাবে।” উক্ত বিষয়ে ইজমা বা ঐকমত্যের দরুন কারো মনে যাতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি না হয়, তজ্জন্য বিজ্ঞ আলিমদের অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলো:
কোন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে যদি কেউ হজ্জ আদায় করে তাহলে সেই মৃত ব্যক্তি হজ্জের কোন সওয়াব পাবে না। কেবল হজ্জের জন্য যে টাকা ব্যয় করা হবে সেটার সওয়াব পাবে- এরূপ অভিমতের কোনো ভিত্তি নেই। কেননা এটা হাদীসের পরিপন্থী। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "তোমরা তোমাদের পিতার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করো।" এরূপ হাদীসে শুধু বলা হয়েছে, মৃতদের পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করা যায়। ঠিক তেমনিভাবে একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, তুমি আগে তোমার নিজের হজ্জ আদায় করো, তারপর শিবারমাহ-এর হজ্জ আদায় করবে। এমনিভাবে যখন জনৈকা মহিলা তার সঙ্গে যে ছেলে ছিলো তার পক্ষ থেকেও হজ্জ আদায় করতে হবে কিনা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করায় ইরশাদ হয়েছিলো, হ্যাঁ। সে সময়ে হজ্জ করতে যে খরচ হবে সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি। বরং তিনি বলেছিলেন, তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করা উচিত। এক্ষেত্রে ঐ ছেলেটি হজ্জের কোনো কিছুই নিজে করেনি, সবই তার মাতাপিতাই করেছিলেন। এছাড়া কখনো মৃতদের পক্ষ থেকে হজ্জ পালনকারী হজ্জে প্রয়োজনীয় খরচ ছাড়া আর কোনো খরচ করেন না। কাজেই উপরোক্ত অভিমতটি হাদীস ও কিয়াসের দ্বারা রহিত হয়ে যায়।
ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে নিয়তের সঙ্গে মুখে উচ্চারণ করাও কি জরুরী? ঈসালে সওয়াব সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথাও বলেননি, হে আল্লাহ! এই সওয়াব অমুকের পুত্র অমুকের পক্ষ থেকে গ্রহণ করো, শুধু মাত্র আন্তরিক ইচ্ছা বা নিয়তই যথেষ্ট। তাই নিয়তের সাথে যদি কেউ মুখেও তা উচ্চারণ করে, তাহলে সেটা হবে আরো ভালো। আর কেউ যদি মুখে কোনো কিছু উচ্চারণ না করে তবুও সে সওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে যাবে। আল্লাহ তা'আলা নিজ বান্দাদের নিয়তের খবর সম্যক জ্ঞাত। সম্ভবত এজন্যই শর্ত আরোপকারীরা কোনো কাজের প্রথমেই নিয়তের শর্ত আরোপ করেছেন। হ্যাঁ, কেউ যদি কোনো আমল নিজের জন্য করে থাকে, তারপর এর সওয়াব অন্য কারো জন্য নিয়ত করে নেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে শুধু পরের নিয়তই যথেষ্ট নয়। কোনো ব্যক্তি যদি কারোর জন্য কোনো কিছু হেবা করে তার কোনো দাসকে মুক্ত করে অথবা কোনো কিছু সাদকাহ করে এর পরে নিয়ত করে, তাহলে শুধু নিয়তের দ্বারা সওয়াব অর্জিত হবে না। তবে কেউ যদি এ নিয়তে কোনো বাড়ি তৈরি করে যে এটা মসজিদ বা মাদরাসা অথবা মুসাফিরখানা হবে, সেক্ষেত্রে মুখে কোনো কিছু উচ্চারণ না করলেও নিয়তের সাথে সাথেই ঐ বাড়িটি ওয়াকফ হিসেবে গণ্য হয়ে যাবে। মুখে কোনো কিছু উচ্চারণ না করলেও যাকাতের নিয়তে কোনো ফকীরকে কোনো কিছু দান করলে যাকাত আদায় হয়ে যাবে। কেউ যদি কারো পক্ষ থেকে সে ব্যক্তি জীবিত হোক বা মৃত হোক, তার কোনো ঋণ শোধ করে দেয়, তাহলে সে ব্যক্তি ঋণ মুক্ত হয়ে যাবে, সেটা মুখে উচ্চারণ করা হোক বা না হোক।
ঈসালে সওয়াব আল্লাহর দরবারে কবুল হবে এরূপ দৃঢ় বিশ্বাস রেখে তা আদায় করতে হবে। এখানে এমন কোনো শর্ত আরোপ করা প্রয়োজন নেই এবং মুখেও কোনো কিছু উচ্চারণ করতে হবে না। কোন শর্ত আরোপ করা হোক বা না হোক আল্লাহ তা'আলা মৃত ব্যক্তিকে তার সওয়াব পৌঁছিয়ে দেবেন। সুদৃঢ় নিয়তের উপর ভিত্তি করে ঈসালে সওয়াবের ক্ষেত্রে প্রথমে আমলকারীকে তার আমলের সওয়াব অর্জন করতে হবে, পরে সেই সওয়াব সে অন্যকে দান করতে পারে। আসলে নিয়ত ছাড়া তা হয় না। কোনো আমলকারী যদি আমল করার সময় নিয়ত করে যে, এই নেক আমল অমুক ব্যক্তির পক্ষ থেকে আদায় করছি, তাহলে সেই সওয়াব ঐ ব্যক্তির নিকট সরাসরি পৌঁছে যাবে। কেউ যদি নিজের দাসকে কারো পক্ষ থেকে মুক্ত করে দেয়, তাহলে কেউ বলবে না যে ঐ দাসের মালিক এই সওয়াব পাবে। অর্থাৎ যার উদ্দেশ্যে নিয়ত করে ঐ দাসকে মুক্ত করা হয়েছে, সে ব্যক্তি এর সওয়াব পাবে। ঈসালে সওয়াবের বিষয়টি তদ্রূপ নিয়তের উপর নির্ভর করে।
মৃত ব্যক্তিদের জন্য কিরূপ হাদিয়া উত্তম? ঐ হাদিয়াই উত্তম যেটা তাদের অধিক উপকারে আসে ও স্থায়ী হয়, যেমন- কোনো দাসকে মুক্ত করা বা সাদকাহ আদায় করা। এসব নেক কাজ নফল রোযা রাখার চেয়ে উত্তম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, উত্তম সাদকাহ হলো পানি পান করানো যেখানে পানির প্রচণ্ড অভাব, যেখানে নদ-নদী, হাউজ ও ফোয়ারা বিদ্যমান, সেখানে পানির চেয়ে খানা খাওয়ানো উত্তম। এমনিভাবে দুআ, ইসতিগফার যদি আন্তরিকতা, একাগ্রতা ও বিনয়ের সাথে করা হয়, তাহলে সেটা হবে যে কোনো সাদকাহ আদায় করার চেয়ে উত্তম। জানাযার নামায আদায় করা এবং কবরের নিকট দাঁড়িয়ে দু'আ করা, সাদকাহ আদায় করার চেয়ে উত্তম। কোনো দাসকে মুক্ত করা, সাদকাহ আদায় করা, দুআ-ইসতিগফার করা, হজ্জ আদায় করা সবচেয়ে উত্তম ঈসালে সওয়াব। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়া কুরআন তেলাওয়াত করে তার সওয়াব পৌঁছানোও জায়েয। রোযা ও হজ্জের সওয়াবের ন্যায় কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াবও মৃত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে।
এখানে প্রশ্ন হতে পারে, কুরআন শরীফ তেলাওয়াতের মাধ্যমে ঈসালে সওয়াব করা আগেকার মুমিন মুসলমানদের আমল ছিলো কিনা? বিরোধী মতে লোকেরা বলেন, কোনো সালাফ বা প্রাথমিক যুগের লোকদের থেকে এর সমর্থনে কোনো প্রমাণ নেই। অথচ তাঁরা প্রত্যেক নেক আমল করার জন্য সচেষ্ট ও সক্রিয় ছিলেন। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কিছু বলেননি যদিও তিনি দুআ-ইসতিগফার, সাদকাহ, হজ্জ ও রোযা ইত্যাদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন। কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব যদি মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছতো, তাহলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই তা বলতেন আর সাহাবায়ে কেরাম অবশ্যই তা আমল করতেন। এসব প্রশ্নের জবাব হলো, যদি কোনো আমলের সওয়াব মেনে নেয়া হয়, তাহলে কুরআন শরীফ তেলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট না পৌঁছানোর কারণ কি? যখন কোনো নেক আমলের সওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে, তাহলে কুরআন শরীফ তেলাওয়াতও একটি বিশেষ নেক আমল। তবে এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ নেক আমলের বিরোধিতা করার হেতু কি? যদি কোনো নেক আমলের সওয়াবকে কেউ অস্বীকার করে, তাহলে সেটা হবে সহীহ সুস্পষ্ট হাদীসের বিরোধিতা করার শামিল এবং ইজমা ও কিয়াসের পরিপন্থী।
ঈসালে সওয়াব সম্পর্কে বিরোধী পক্ষের অভিমত হলো, এই সম্পর্কে আগেকার আলিমদের কোনো অভিমত লিপিবদ্ধ নেই। এর কারণ হলো ঈসালে সওয়াব সম্পর্কে তাঁদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিলো না। এছাড়া তাঁরা এখনকার মতো কবরের নিকট গিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতেন না কেন? তাঁরা কুরআন শরীফ তিলাওয়াত সম্পর্কে অথবা সাদকাহ আদায় করা ও রোযা রাখা সম্পর্কে কোনো খোঁজ-খবর রাখতেন না কেন? এছাড়া যদি প্রশ্ন করা হয় যে, আগেকার লোকদের মধ্যে কেউ কি একথা বলেছেন, "হে আল্লাহ, আমার এই রোযার সওয়াব অমুক ব্যক্তির জন্য গ্রহণ করো,” তাহলে এর জবাব কি? আগেকার লোকেরা কি তাঁদের নেক আমলকে গোপন করতেন? যদি তা না হয়, তাহলে তাঁরা ঈসালে সওয়াবের জন্য কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতেন? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে সাহাবাগণকে যদিও সরাসরি কোনো কিছু বলেননি, তবে যিনি যেমন প্রশ্ন করতেন তাঁকে তিনি সেভাবে জবাব দিতেন। আর তাঁরা অন্য যে কোনো নেক আমল করতেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো বাধা দিতেন না। যেমন রোযা রাখা- যা শুধু নিয়ত করা, পানাহার ও যৌন ক্রিয়া থেকে বিরত থাকা, যিকর-আযকার করা, পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত যা একটি নেক আমল ছাড়া আর কিছু নয় এর মধ্যে পার্থক্য কী? রোযা রাখার সওয়াব যখন মৃত ব্যক্তিদের নিকট পৌঁছে, তাহলে আল্লাহর যিকর ও কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব তাঁদের কাছে যে পৌঁছে সেটা অধিক সমীচীন, সহজ ও বোধগম্য। কেউ কেউ বলে থাকেন যে, আগেকার দিনের আলিমগণ কুরআন শরীফ তেলাওয়াতের মাধ্যমে ঈসালে সওয়াব করেননি, এরূপ ধারণা অজ্ঞতাপ্রসূত ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা তাঁদের ঐরূপ ধারণার পক্ষে তাঁরা কোন দলীল প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। তবে এ বিষয়ে তাঁদের নিয়ত সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন। এছাড়া যে কোনো নেক আমলের নিয়ত বাক্যের দ্বারা যে প্রকাশ করতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই।
আসলে কোনো নেক কাজের সওয়াব হলো আমলকারীর আমলের প্রতিফল বা প্রতিদান। কোনো আমলকারী যদি তাঁর কোনো সওয়াব অন্য কোনো মুসলমানকে দান করে দেন, তাহলে আল্লাহ পাক সেই আমলের সওয়াব ঐ ব্যক্তির নিকট পৌঁছে দেন। তবে কুরআন শরীফ তেলাওয়াতের সওয়াব কোনো মৃত ব্যক্তির নিকট না পৌঁছার কারণ কি? ঈসালে সওয়াবের নিয়ম সব সময়ই চালু ছিলো, যদিও কেউ কেউ এর বিরোধিতা করেছেন। তবে কোনো মুহাক্কিক আলিম ঈসালে সওয়াবকে কোনো খারাপ কাজ বলে আখ্যায়িত করেননি।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য ঈসালে সওয়াব সম্পর্কে আমাদের করণীয় কি? আগেকার দিনের ফিকাহবিদদের কেউ কেউ এটাকে মুস্তাহাব বলে অভিহিত করেছেন। আর কেউ কেউ এটাকে বিদ'আত বলেছেন। কেননা সাহাবায়ে কেরাম এরূপ কোনো আমল করেননি। যাঁরা এটাকে মুস্তাহাব মনে করেন, তাঁদের মতে কিয়ামত পর্যন্ত পরবর্তীকালের উম্মতদের আমলের সওয়াব তিনি এমনি পেয়ে যান কিন্তু আমলকারীদের সওয়াব হ্রাস পায় না। যেহেতু তিনি তাঁর সকল উম্মতকে সকল সৎকাজের পথ প্রদর্শন ও উৎসাহ প্রদান করেছেন; এজন্য তাঁর উম্মতের যাবতীয় নেক আমলের সওয়াব তিনি এমনি পেয়ে থাকেন, কেউ তাঁর জন্য কোনো হাদিয়া পেশ করুক বা না করুক।
টিকাঃ
<sup>*</sup> গ্রন্থকার হাদীসের আলোকে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, একজন মৃত ব্যক্তির কাযা নামায বা কাযা রোযা কেউ আদায় করলে তা আদায় হয়ে যাবে। তবে, হানাফী ও মালেকী মতাবলম্বী বিজ্ঞ আলিমগণ সহীহ হাদীসের মাধ্যমে এর বিপক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ জীবিত বা কোনো মৃত ব্যক্তির কাযা রোযা বা নামায অন্য কেউ আদায় করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। -অনুবাদক