📄 মৃত্যুর পর রূহ কিয়ামত পর্যন্ত কোথায় অবস্থান করে
মৃত্যুর পর কিয়ামত পর্যন্ত রূহ কোথায় থাকে— আকাশে না কি যমীনে, নাকি জান্নাতে? পার্থিব দেহ থেকে ভিন্ন এমন আর অন্য কোনো দেহ কি কবরে তাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়, যেটা আরাম বা আযাব ভোগ করে? নাকি রূহ অন্য কোথাও অবস্থান করে? নিঃসন্দেহে, এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ সম্পর্কে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এসব বিষয়ের ফয়সালা কুরআন ও হাদীসের উপর নির্ভর করে।
উক্ত মতপার্থক্য সম্পর্কে কতিপয় অভিমত এখানে উল্লেখ করা হলো। এক— এ বিষয়ে কারো কারো অভিমত এই যে, মুমিনদের রূহ জান্নাতে আল্লাহর নিকট থাকে— তারা শহীদ হোক বা না হোক। তবে শর্ত এই যে, তাঁদের জন্য কবীরা গুনাহ বা কোনো ঋণ যেন কোনো প্রকার বাধার সৃষ্টি না করে। রাব্বুল আলামীন তাঁদের সাথে ক্ষমা সুন্দর ব্যবহার করে থাকেন। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) এই অভিমত পোষণ করতেন। দুই— আরেকটি অভিমত এই যে, মুমিনদের রূহ জান্নাতের চৌহদ্দীতে ও ফটকে অবস্থান করে থাকে। এছাড়া তাঁরা জান্নাতের শীতল বাতাস, রিযক ও অন্যান্য নিয়ামত ভোগ করেন। তিন— কোনো কোনো আলিমের মতে, রূহ তাদের কবরের আশেপাশে অবস্থান করে। চার— ইমাম মালিক (র) এর অভিমত হলো— রূহ স্বাধীন ও মুক্ত, যেখানে ইচ্ছা সেখানে আসা-যাওয়া করতে পারে। পাঁচ— ইমাম আহমদ (র)-এর অভিমত এই যে, কাফিরদের রূহ জাহান্নামের আর মুমিনদের রূহ জান্নাতে থাকে। ছয়— হযরত আবূ আবদুল্লাহ ইবনে মুনদার (র) বলেন, সাহাবী ও তাবিয়ীনদের কেউ কেউ এই মত পোষণ করতেন যে, মুমিনদের রূহ আল্লাহর কাছে অবস্থান করে। এর অধিক তাঁরা আর কিছু বলেননি। সাত— সাহাবী ও তাবিয়ীনদের কারো কারো অভিমত হলো, মুমিনদের রূহ জাবিয়া নামক স্থানে আর কাফিরদের রূহ বারহুতে অবস্থান করে। বারহুত হলো হাদ্রামাউতের একটি কূপের নাম। আট— হযরত সাফওয়ান ইবনে আমর (রা) বলেন, আমি হযরত আবুল ইয়ামান আমর ইবনে আবদুল্লাহ (রা)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মুমিনদের রূহ কি একত্রিত হয়? উত্তরে তিনি পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করলেন— কিয়ামত কায়িম হবে। তারপর আল্লাহ তা'আলা সকল রূহকে স্ব স্ব দেহে প্রবেশ করাবেন। এটাই রূহের দ্বিতীয় জীবনকাল। এখানেই তাদের বিচারের কাজ সম্পন্ন হবে। তারপর প্রত্যেকেই তার স্থায়ী বাসস্থান জান্নাত বা জাহান্নাম লাভ করবে।
চৌদ্দ— হযরত আবূ আমর ইবনে আবদুল বার (র)-এর অভিমত এই যে, শহীদগণের রূহ জান্নাতে আর অন্যান্য মুমিনদের রূহ নিজ নিজ কবরের আঙিনায় থাকে।
পনের— হযরত মুজাহিদ (র)-এর অভিমত হলো, রূহ তো জান্নাতে থাকে না, তবে ওখানকার ফলফলাদি ভক্ষণ করে ও খুশবুতে আনন্দ লাভ করে।
ষোল— হযরত ইবনে শিহাব (র)-কে মুমিনদের রূহ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, শহীদগণের রূহ সবুজ রঙের পাখির ন্যায় আরশের সাথে ঝুলে থাকে, তারা সকাল-সন্ধ্যায় জান্নাতের বাগিচায় বিচরণ করে, আর প্রত্যহ তাদের রবকে সিজদাহ ও সালাম করে।
হযরত ইবনে আবদুল বার (র), হযরত ইবনে উমর (রা)-এর বর্ণিত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, মৃত্যুর পর সকাল-সন্ধ্যায় মৃত ব্যক্তির নিকট তার বরযখী বাসস্থান উপস্থাপন করা হয়। সে ব্যক্তি যদি জান্নাতী হয় তাহলে জান্নাত আর যদি জাহান্নামী হয় তাহলে জাহান্নাম তাকে দেখানো হয়। তাকে আরও বলা হয়, কিয়ামতের পর এটাই হবে তোমার স্থায়ী বাসস্থান। এ বক্তব্যের দ্বারা তাঁদের সেই অভিমতকে খণ্ডন করা হয়েছে যাঁরা বলেন, মৃত্যুর পর রূহ কবরের আঙিনায় থাকে, সহীহ হাদীসের দ্বারাও এই অভিমতটি সমর্থিত। গ্রন্থকারের মতে এর অর্থ হলো— কখনো কখনো রূহ কবরের আঙিনায় আসে, কিন্তু সবসময় সেখানে থাকে না। এই প্রসঙ্গে ইমাম মালিক (র) তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন, রূহ যেখানে ইচ্ছা চলাফিরা করে।
সতের— হযরত মুজাহিদ (র) থেকে আরো বর্ণিত আছে, মৃত্যুর পর রূহ প্রথম সাতদিন কবরের আঙ্গিনায় অবস্থান করে, এ সময় অন্য কোথাও যায় না।
আঠার— কারো কারো ধারণা যে, রূহ দেহের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এঁরা রূহকে জীবন ও অনুভূতির ন্যায় দেহের একটি উপাদান বলে মনে করেন, যদিও তাঁদের এরূপ অভিমত কুরআন, হাদীস ও ইজমার পরিপন্থী।
উনিশ— অপর একশ্রেণীর লোকের অভিমত হলো, রূহ অনুকূল স্বভাব ও গুণসম্পন্ন দেহে অবস্থান করে। যেমন, হিংস্র স্বভাবের রূহ হিংস্র জন্তুর দেহে, কুকুরের স্বভাবের রূহ কুকুরের দেহে, সাধারণ পশু স্বভাবের রূহ সাধারণ পশুর দেহে এবং হীন প্রবৃত্তির রূহ কীটপতঙ্গের দেহে অবস্থান করে। এই শ্রেণীর লোকেরা পুনর্জন্মে বিশ্বাসী। এরা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনকে বিশ্বাস করে না। এইরূপ অভিমত সকল ইসলামপন্থীদের অভিমত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অবাস্তব।
রূহ সম্পর্কিত যেসব ধ্যান-ধারণা এই গ্রন্থে, কুরআন ও হাদীসের আলোকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে, অন্য কোনো গ্রন্থে তা পাওয়া যায় না। রূহ সম্পর্কে উপরোক্ত অভিমতসমূহের সঠিক তথ্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
এক. যাঁরা বলেন, রূহ জান্নাতে থাকে, তাঁরা দলীল হিসেবে নিম্নোক্ত পবিত্র আয়াতটি পেশ করে থাকেন। "যদি সে নৈকট্যপ্রাপ্তদের একজন হয়, তবে তার জন্য আছে সুখ, উত্তম রিযক এবং নিয়ামত ভরা উদ্যান।" (সূরা ওয়াকিয়াহ: আয়াত ৮৮-৮৯) অর্থাৎ দেহ থেকে রূহ বের হওয়ার পরেই জান্নাতে অবস্থান করে। রূহ তিন ভাগে বিভক্ত— এক. আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী রূহ, এরা আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত আর তারা জান্নাতে থাকবে। দুই. ডানদিকে অবস্থানকারী রূহ, যাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— "আর যদি সে দক্ষিণ দিকের একজন হয় তাকে বলা হবে, হে দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী, তোমার প্রতি শান্তি।" (সূরা ওয়াকিয়াহ: আয়াত ৯০-৯১) তিন. সত্য প্রত্যাখ্যানকারী ও বিভ্রান্ত রূহ। এই শ্রেণীর রূহ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— "কিন্তু সে যদি সত্য প্রত্যাখ্যানকারী ও বিভ্রান্ত রূহ হয়, তাকে আপ্যায়ন করা হবে উত্তপ্ত পানি দ্বারা আর তাকে দাখিল করা হবে জাহান্নামে, এটা ধ্রুব সত্য।" (সূরা ওয়াকিয়াহ: আয়াত ৯২-৯৫)
একশ্রেণীর আলিমের অভিমত হলো রূহ দেহ থেকে পৃথক হওয়ার পর উপরোক্ত অবস্থার সম্মুখীন হয়। কিয়ামতের দিন রূহের অবস্থা কি হবে তার বর্ণনা সূরা ওয়াকিয়ার প্রথম দিকে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে— "যখন কিয়ামতের ঘটনা ঘটবে, যার বাস্তবতায় কোনো সংশয় নেই, এটা কাউকে করবে নিচু, কাউকে করবে সমুন্নত। যখন প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে পৃথিবী এবং পর্বতমালা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে; অতঃপর তা হয়ে যাবে উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণা এবং তোমরা তিনভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে। যারা ডান দিকে, কত ভাগ্যবান তারা এবং যারা বাম দিকে, কত হতভাগা তারা। অগ্রবর্তীগণ তো অগ্রবর্তীই। তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত, নিয়ামতের উদ্যানসমূহে, তারা একদল পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে এবং অল্পসংখ্যক পরবর্তীদের মধ্য থেকে, স্বর্ণখচিত সিংহাসনে তারা হেলান দিয়ে বসবে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে।" (সূরা ওয়াকিয়াহ: আয়াত ১-১৬)
সূরা ওয়াকিয়াহর প্রথম ভাগে কিয়ামতে কুবরা বা বড় কিয়ামতের পরবর্তী অবস্থা, শেষভাগে কিয়ামতে সুগরা বা ছোট কিয়ামতের পরবর্তী অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। যারা বলেন, রূহ জান্নাতে থাকে তাঁরা দলীল হিসেবে নিম্নোক্ত আয়াতগুলো পেশ করে থাকেন— "হে প্রশান্ত চিত্ত, তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।" (সূরা ফজর: আয়াত ২৭-৩০)
দুই. অনেক সাহাবী ও তাবিয়ীনের অভিমত এই যে, রূহকে মৃত্যুর সময় দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার কালে উপরোক্তভাবে সম্বোধন করা হয়ে থাকে। এই শুভ সম্বোধন কেবল মৃত্যুর সময়েই হয় না, আখিরাতে এবং কবরেও রূহকে এভাবে সম্বোধন করা হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— “নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাঁদের কাছে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না, আর প্রতিশ্রুত জান্নাতের শুভ সংবাদ শোন। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে সবকিছু তোমাদের জন্য, তোমাদের যা মন চায়, যা তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো। এটাই হবে ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়ন।” (সূরা হামীম সিজদাহ: আয়াত ৩০-৩২)
উল্লেখ্য যে, এই শুভ সংবাদ মৃত্যুর সময়, কবরে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনেও দেয়া হয়। এছাড়া আখিরাতের প্রাথমিক শুভ সংবাদ মৃত্যুর সময়েও দেয়া হয়ে থাকে। তিন. হযরত বারা ইবনে আযিব (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে ফেরেশতারা রূহ কবয করার সময় বলেন, তুমি জান্নাতের শীতল বাতাস ও রিযক পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যাও। চার. কেউ কেউ দলীল হিসেবে নিম্নোক্ত হাদীসটি পেশ করে থাকেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুমিনদের রূহ হচ্ছে একটি পাখি, যে বেহেশতের তরুলতা, গাছগাছড়া থেকে ফলফলাদি ভক্ষণ করে যতক্ষণ না আল্লাহপাক তাকে কিয়ামতের দিন আবার পুনরুত্থিত করেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক (র)) হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, “হাত্তা ইয়ারজিউল্লাহু ইলা জাসাদিহি" অর্থাৎ যে পর্যন্ত না আল্লাহ তার রূহ দেহে ফিরিয়ে আনেন।
হাদীস শরীফে যে "নাসামাহ" শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে এর অর্থ হলো রূহ। তবে কারো কারো মতে "নাসামাহ" শব্দটি ইনসান শব্দের প্রতিশব্দ। রূহকে নাসামাহ বলা হয় এ জন্য যে, মানুষের দৈহিক জীবন রূহের উপর নির্ভরশীল। নাসামাহ বলতে ইনসানকেও বুঝায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই হাদীসটিও তার প্রমাণ— "মান আতাকা নাসামাতান মুমিনাতান" অর্থাৎ “যে ব্যক্তি একজন মুমিনকে মুক্ত করলো।" আরবি নাসামাহ শব্দের অর্থ যে ইনসান, সেই সম্পর্কে হযরত আলী (রা)-এর একটি উক্তি এখানে উদ্ধৃত করা হলো: ওয়াল্লাযী ফালাকাল হাব্বাতা ওযা বারায়ান নাসামাতা, অর্থাৎ “সে সত্তার শপথ, যিনি বীজ অঙ্কুরিত করেছেন এবং ইনসান পয়দা করেছেন।" নাসামাহ শব্দের অর্থ যে ইনসান এর সমর্থনে জনৈক আরবি কবির একটি উক্তিও এখানে উল্লেখ করা হলো— ইযা নাসামাতু নাফদানুল গুবারা, অর্থাৎ "যখন মানুষ মাটি ঝেড়ে কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে।" আরবি সাহিত্যের প্রখ্যাত ব্যাকরণবিদ খলীলের মতেও "নাসামাহ" শব্দের অর্থ মানুষ ও রূহ উভয়কে বুঝায়। এছাড়া নাসীম শব্দের দ্বারা প্রবাহিত বায়ুকেও বুঝায়।
আরবি 'তালুকু' শব্দের অর্থ কি সে সম্পর্কে উল্লেখ আছে যে, 'তালুকু' শব্দের লাম অক্ষরে যবর ও পেশ এর ব্যবহার প্রচলিত। কিন্তু শব্দের অর্থ একই, অর্থাৎ খাওয়া, বিচরণ করা। রূহ জান্নাতে তরুলতা ও ফল পাকড়ি ভক্ষণ করে আর জান্নাতে চলাফিরা করে। ঠিক তেমনি উলুকাতু ও উলুক আরবি পরিভাষায় খাওয়া ও চলাফিরা উভয় অর্থই বুঝায়। যেমন বলা হয়— মাযাকাল ইওমা উলকা অর্থাৎ “সে আজ খানা খায়নি।” হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা)-এর একটি উক্তিতে উল্লেখ রয়েছে, ইন্নামাল ইয়াকুলনা উলকাতা মিনাত্তায়ামি অর্থাৎ ঐ সময়ে মহিলারা সামান্য খাবার খেতেন। উলকাতা শব্দটি তায়াল্লুক শব্দ থেকে বের হয়ে এসেছে অর্থাৎ যা খাদ্যের দ্বারা নাফস ও অন্তরকে তৃপ্তি দান করে।
পাঁচ. উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে কোনো কোনো আলিম বলে থাকেন, মুমিনের রূহ আল্লাহর সান্নিধ্যে জান্নাতে থাকে। তিনি একজন শহীদ হোন বা না হোন। তবে শর্ত হলো, তিনি যেন কবীরাহ গুনাহে লিপ্ত না হয়ে থাকেন অথবা কারো কাছে ঋণগ্রস্ত না থাকেন, আল্লাহ তাআলা তাঁকে ক্ষমা ও কৃপার দৃষ্টিতে দেখেন। হযরত আবু আমর (রা) ও হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর অভিমত হলো, মুমিনদের রূহ ইল্লিয়্যীনে ও কাফিরদের রূহ সিজ্জীনে অবস্থান করে। হযরত আবূ আমর (রা) বলেন, এই অভিমতের সাথে ঐ হাদীসের বিরোধ বাঁধে, যেখানে বলা হয়েছে, “তোমাদের কেউ যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সামনে তাঁর স্থায়ী বাসস্থান পেশ করা হয়। যদি তিনি জান্নাতী হন তাহলে তাঁর সামনে জান্নাত, আর যদি সে ব্যক্তি জাহান্নামী হয় তাহলে তার সামনে জাহান্নাম পেশ করা হয়, এই অবস্থা কিয়ামত না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।"
কারো কারো মতে উপরোক্ত হাদীসটির সারমর্ম হলো— সাধারণ মুমিনদের রূহ নয় বরং মহান শহীদগণের রূহ জান্নাতে থাকে, যা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে— "যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের নিকট থেকে তারা জীবিকা প্রাপ্ত। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের পেছনে যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি তাদের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এজন্য যে, তাদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখিত হবে না। আল্লাহর অবদান ও অনুগ্রহের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং এটা এ কারণে যে, আল্লাহ মুমিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।" (সূরা আলে ইমরান: আয়াত ১৬৯-১৭১)
এক. একটি সহীহ হাদীসে উল্লেখ রয়েছে, শহীদগণ সকাল-সন্ধ্যা বেহেশতে চলাফিরা করেন, আরশের সাথে ঝুলন্ত ফানুস হলো তাঁদের বাসস্থান। আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেন, আমি তোমাদেরকে যে ইজ্জত দিয়েছি, তোমাদের দৃষ্টিতে কি এর চেয়ে অধিক আর কোনো ইজ্জত আছে? তাঁরা বলেন, 'না', তবে আমাদের একটা আকাঙ্ক্ষা যে, আমাদের রূহ আমাদের দেহে ফিরিয়ে দেয়া হোক, যেন আমরা আবার আপনার রাস্তায় শহীদ হতে পারি।
দুই. যখন উহুদের যুদ্ধে তোমাদের ভাইগণ শহীদ হলো, তখন আল্লাহ তাঁদের রূহকে সবুজ রঙের পাখির পক্ষপুটে রেখে দেন। তাঁরা জান্নাতী নহরের উপর দিয়ে উড়ে বেড়ান আর জান্নাতের ফলফলাদি ভক্ষণ করেন এবং আরশের ছায়ায় ঝুলন্ত ফানুসে এসে অবস্থান করেন। যখন এঁরা নিজেদের উত্তম খানা-পিনা ও থাকার স্থান দেখেন, তখন তাঁদের ইচ্ছা হয়, যদি আমাদের ভাইয়েরা এ সংবাদ জানতেন যে, আমরা জান্নাতে জীবিত আছি আর উৎকৃষ্ট পানাহার করি, তাহলে তাঁরাও জিহাদ থেকে বিরত থাকতেন না। তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে বলেন, তোমাদের পয়গাম আমি তাদেরকে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি। (আহমদ, আবু দাউদ)
তিন. পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না, তারা তাদের রবের নিকট জীবিত এবং তারা জীবিকা প্রাপ্ত।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত ১৬৯) হযরত ইবনে মাসউদ (রা)-কে উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, আমি এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করলে তিনি ইরশাদ করেছিলেন, শহীদদের রূহ বেহেশতে সবুজ রঙের পাখির পক্ষপুটে অবস্থান করে ও তারা বেহেশতে যেখানে ইচ্ছা চলাফিরা করে, তারপর আল্লাহর আরশের ফানুসে গিয়ে আশ্রয় নেয়। একবার আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমাদের কোনো বাসনা আছে কি? তাঁরা বললেন, জান্নাতে তো সবই আছে আর কি চাইবো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তিনবার এই প্রশ্ন করলেন। যখন তাঁরা বুঝলেন, জবাব দিতেই হবে, তখন তাঁরা বললেন, “হে আমাদের রব! আমরা চাই আমাদের রূহ আবার আমাদের দেহে ফিরিয়ে দেয়া হোক যাতে আবার আমরা তোমার রাস্তায় শহীদ হতে পারি।” অতঃপর যখন আল্লাহ দেখলেন প্রকৃতপক্ষে তাঁদের কোনো আশা আকাঙ্ক্ষা নেই, তখন তাঁদেরকে সেই অবস্থার উপর ছেড়ে দিলেন। (মুসলিম)
হযরত হারিসা ইবনে সুরাকা (রা)-এর মাতা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাকে হারিসা (রা) সম্পর্কে বলুন, যে বদরের যুদ্ধে তীরের আঘাতে শাহাদাত বরণ করেছিল। সে যদি বেহেশতী হয় তাহলে আমি সবর করবো আর তা না হলে আমি কাঁদতে থাকবো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, হে উম্মে হারিসা! বেহেশত তো অনেকগুলো আছে, তোমার ছেলে জান্নাতুল ফিরদাউসে অবস্থান করছে যেটা সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ।
চার. হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, শহীদগণের রূহ সবুজ রঙের পাখির পক্ষপুটে থাকে ও জান্নাতে ফলফলাদি ভক্ষণ করে।
পাঁচ. হযরত কাতাদাহ (রা) বলেন, শহীদগণের রূহ সাদা রঙের পাখির আকৃতি ধারণ করে এবং বেহেশতী ফল ভক্ষণ করে।
ছয়. হযরত ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে, শহীদগণের রূহ সাধারণ পাখির চেয়ে কিছুটা বড় ধরনের পাখির মধ্যে থাকে। এরা একে অন্যের সাথে পরিচিত এবং তারা জান্নাতী ফল খায়।
হযরত আবূ আমর (রা) বলেন, উপরোক্ত 'আসার' অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, শহীদগণ সাধারণ মুমিনদের মতো নন, তাঁদের মাকাম হবে জান্নাতে। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় পাখির পেটের কথা বলা হয়েছে, কোনো বর্ণনায় সবুজ রঙের পাখির কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ঐ অভিমত অধিক যুক্তিগ্রাহ্য যিনি রূহকে পাখির আকৃতি ধারণ করে বলে উল্লেখ করেছেন। এই বর্ণনাটি হযরত কা'ব (রা)-এর অভিমতের অনুকূল যেখানে বলা হয়েছে, মুমিনের রূহ পাখির পেটের মধ্যে আছে। হযরত আবদুল্লাহ (রা)-এর বর্ণনায় রয়েছে— "কাতায়রিন খুদরিন" অর্থাৎ সবুজ পাখির ন্যায়। কিন্তু সহীহ মুসলিমে— "ফি আজওয়াফি তায়রিন খুদরিন" অর্থাৎ সবুজ রঙের পাখির পেটের মধ্যে এই কথা উল্লেখ আছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পরিপ্রেক্ষিতে ইরশাদ করেছেন, শহীদ মুমিনের রূহ একটি পাখি, যে জান্নাতের ফলফলাদি ভক্ষণ করে। মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তিদের নিকট সকাল-সন্ধ্যায় তাদের অবস্থান পেশ করা হয়। এই দুই মতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। শহীদগণের জান্নাতী মঞ্জিল যেটা খাস করে তাদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে, সেখানে তারা কিয়ামতের দিন প্রবেশ করবে। কেননা শহীদগণের মহল ঐ সব ফানুস নয় যেখানে বরযখের মধ্যে তাঁদের রূহ অবস্থান করে। সুতরাং সাধারণ মুমিনদের মতো শহীদগণও ঐ ফানুস থেকে নিজ জান্নাতী আবাসস্থল প্রত্যহ সকাল-সন্ধ্যায় অবলোকন করে থাকেন। তাঁরা তো তাঁদের আসল নিবাস কিয়ামতের দিন লাভ করবেন, বরযখে নয়। এর বাস্তব উদারহণ হলো, ঐ সব দুর্ভাগা ব্যক্তি যাদের নিকট সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নাম হাযির করা হয়, কিয়ামতের দিন তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে যা বরযখে দেখানো হয়েছিল। জানা গেল যে, জান্নাতে এবং আলমে বরযখে রূহের আরাম বা শান্তি এক রকম, আর কিয়ামতের দিন জান্নাতে নিজ নিজ আবাসে যাওয়া অন্য রকম। বরযখে রূহের যে জান্নাতী খাবার দেয়া হবে, পরবর্তী জীবনে তাদেরকে সশরীরে জান্নাতে যে খাবার দেওয়া হবে তা হবে তার চেয়ে উৎকৃষ্ট মানের। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "তবে পুরোপুরি আনন্দ, আরাম ও শান্তি তারা লাভ করবে যখন তারা বেহেশতে প্রবেশ করবে।"
অতএব জানা গেল যে, উপরোক্ত হাদীস দুটোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই বরং এদের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। হযরত কা'ব (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে শহীদদের প্রসঙ্গে যা বলা হয়েছে তা সঠিক নয়। কেননা শব্দগতভাবে এর কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। কারণ, শহীদদের সংখ্যা মুমিনদের সংখ্যার তুলনায় খুবই কম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান শহীদের প্রতিদানকে ঈমানের গুণাগুণের শর্তাধীন বলে উল্লেখ করেছেন, শাহাদাতের গুণ হিসেবে নয়। ঈমানের সেই গুণকে তিনি শহীদগণের শাহাদাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন। হযরত মিকদাম ইবনে মাআদীকারাব (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে আছে যে, আল্লাহ তাআলার নিকট শহীদের ছয়টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে— এক. রক্তের প্রথম বিন্দু ঝরার সাথে সাথেই শহীদের ক্ষমা করা হয়। দুই. তাঁকে তাঁর জান্নাতী মহল দেখিয়ে দেয়া হয়। তিন. তাঁকে ঈমানের অলঙ্কার পরিয়ে দেয়া হয়। চার. তাঁকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করা হয়। পাঁচ. তিনি সব রকম ভয়-ভীতি থেকে নিরাপদ থাকেন। ছয়. তাঁর মাথায় ইয়াকূতের মুকুট পরিয়ে দেয়া হয়, যার একটি একটি ইয়াকূত দুনিয়া ও দুনিয়ার ভেতরকার সব কিছুর চেয়ে উত্তম। বাহাত্তর জন সুলোচনা হুরের সাথে তাঁর বিবাহ হয়, আর তাঁর সত্তরজন আপন লোকের জন্য তাঁকে সুপারিশ করার অধিকার দেয়া হয় এবং তা গ্রহণ করা হয়। তাই আল্লাহ তাআলা ইন্না লিশশহীদ অর্থাৎ নিশ্চয়ই শহীদের জন্য বলেছেন ইন্নালিল মুমিন নিশ্চয়ই মুমিনদের জন্য বলেননি। এমনিভাবে হযরত কায়েস আল জাযযামী (রা) বর্ণিত হাদীসেও শহীদগণের ছয়টি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া পবিত্র কুরআন ও হাদীসে শাহাদাতের প্রতিদান শর্তাধীন করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ঐ সমস্ত আয়াতে অথবা হাদীসে প্রতিদানকে ঈমানের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে, সকল মুমিন তাতে শামিল আছেন— তাঁরা শহীদ হোন বা না হোন। ঐসব আয়াত ও হাদীস যে গুলোতে শহীদদের রিযক ও জান্নাতে তাঁদের রূহ থাকার উল্লেখ আছে, সেগুলো সবই সহীহ ও সঠিক। কিন্তু জান্নাতে যে সাধারণ মুমিনদের রূহ থাকবে না, এর কোনো প্রমাণ নেই। তবে সিদ্দীকগণের রূহ যে জান্নাতে থাকবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা তাঁদের মর্যাদা শহীদদের চেয়ে অধিক। এখন প্রশ্ন হতে পারে, সিদ্দীকগণ জান্নাতে আছেন কি নেই, এর জবাব যদি ইতিবাচক হয়, আর সেটাই স্বাভাবিক, তা হলে জানা গেল যে, ঐসব আয়াত বা হাদীসে কেবল শহীদদের সম্পর্কেই বলা হয়নি। আর এর জবাব যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে বড় বড় সাহাবী যেমন— হযরত আবুবকর (রা), হযরত উমর (রা), হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা), হযরত ইবনে মাসউদ (রা), হযরত আবুদ্দারদা (রা) ও হযরত হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান (রা) প্রমুখের রূহ জান্নাতে নন, ধরে নিতে হয়। এছাড়া আমাদের সময়ে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের রূহও জান্নাতে আছে বলে মেনে নিতে হয়। তাই এটা একটি সম্পূর্ণ ভুল ও ভ্রান্ত ধারণা।
যদি ধরে নেয়া যায়, উক্ত অভিমত শুধুমাত্র শহীদদের জন্য নির্দিষ্ট নয়, তাহলে পবিত্র কুরআন ও হাদীসে তাঁদের বৈশিষ্ট্য ও মরতবা উল্লেখ করা হলো কেন? এর জবাব হলো, আসলে এর দ্বারা শাহাদাতের ফযীলত এবং শহীদগণের উচ্চমর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাই যাঁরা শহীদ, শাহাদাতের সওয়াব ও মরতবা তাঁদেরই প্রাপ্য। যাঁরা শহীদ নন তাঁদের তুলনায় বরযখী জীবনে শহীদগণ অধিক মর্যাদা লাভ করবেন। মর্যাদার দিক থেকে শহীদগণের সাথে অন্য কারো তুলনা হয় না। আল্লাহ তা'আলা শহীদগণের রূহকে সবুজ রঙের পাখির পক্ষপুটে রেখে দেন, যেহেতু তাঁরা আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে উৎসর্গ করে থাকেন। আর এর বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে আলমে বরযখে অপরূপ দেহ দান করেন, যেখানে তাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত অবস্থান করবেন। আর শরীরের দ্বারা তাঁরা ঐসব রূহের আরামের চেয়ে অধিক আরাম ভোগ করেন, যাঁরা এরূপ দেহ লাভ করেননি। সেজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মুমিনের রূহ পাখির পক্ষপুটে থাকে। লক্ষণীয় যে, মুমিনের রূহকে এখানে পাখির সাথে তুলনা করা হয়েছে যে, তাঁদের রূহ পাখির পক্ষপুটে অবস্থান করে। প্রকৃতপক্ষে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র বাক্য এখানে একটি অপরটিকে সমর্থন করে। এভাবে আরো জানা গেল যে, এসব পবিত্র বাণী ও আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে এবং এগুলো অকাট্য সত্য। এরূপ সমন্বয় বিধান হযরত আবূ আমর (রা)-এর সমন্বয়ের বিধান থেকে উত্তম। এই রেওয়ায়েত দুটি— "শহীদদের রূহ সবুজ পাখির মতো" বা শহীদদের "রূহ সবুজ পাখির পক্ষপুটে থাকে”, সঠিক ও নির্ভুল।
রূহ জান্নাতে থাকবে এবং সেখানকার ফলফলাদি ভক্ষণ করবে ও খুশবু অনুভব করবে। এ প্রসঙ্গে এখানে কিছু আলোচনা করা হলো: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শহীদগণ জান্নাতের দরজার নিকটবর্তী নহরের পাশে সবুজ গম্বুজে অবস্থান করেন। তাঁদের রিযক সকাল-সন্ধ্যা বেহেশত থেকে তাঁদের কাছে পৌঁছে। এই হাদীসের দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে, তাঁরা বেহেশতে অবস্থান করেন না। কেননা নহরটি জান্নাতের ফটকে থাকলেও সেটা বেহেশত থেকেই প্রবাহিত। উক্ত নহরের তীরে তাঁদের মহল থাকে আর জান্নাত থেকেই তাঁদের রিযক আসে। উল্লেখ্য যে, কিয়ামতের পর শহীদগণ তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করবেন, বেহেশতের নহরের তীরবর্তী মহলে নয়। হযরত মুজাহিদ (র) বলেছেন, "বেহেশতের মহলে শহীদদের রূহ থাকবে না” এর অর্থ এই যে, হাশরের দিন বিচারের পর শহীদদের জন্য আগে যে সমস্ত জায়গা নির্ধারিত ছিল, সেগুলো পরিবর্তন হয়ে যাবে। অর্থাৎ তাঁরা বেহেশতের নতুন জায়গায় চলে যাবেন। তবে এ সম্পর্কিত আলোচনায় এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যেটা অতি সহজে বোধগম্য। আর এ সহজ ও স্বচ্ছ ভাষাই হলো— নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের ভাষা। এই বিষয়ে চিন্তা ভাবনা ও গবেষণা করলে আরো অনেক তথ্য জানা যাবে।
হযরত উম্মে কাবাসা বিনতে মারূর (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদের নিকট তাশরীফ আনলেন, আমরা তাঁর খিদমতে রূহ সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তখন তিনি এমন এক বক্তব্য রাখলেন যা শুনে আমরা সবাই কাঁদতে লাগলাম। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছিলেন, মুমিনদের রূহ ঐসব সবুজ পাখির পক্ষপুটে থাকে, যারা জান্নাতে বিচরণ করে ও জান্নাতের ফলফলাদি ভক্ষণ করে এবং জান্নাতের পানি পান করে। আর আরশের নিচে স্বর্ণের ফানুসে এসে অবস্থান করে। আর তাঁরা আরয করেন, হে আমাদের রব, আমাদের ভাইদেরকেও আমাদের নিকট নিয়ে আসুন। আর আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছেন তা পূরণ করুন। অপরপক্ষে, কাফিরদের রূহ ঐসব কালো পাখির পক্ষপুটে থাকে, যেসব পাখি আগুন ভক্ষণ করে আর আগুনের গর্তে বাস করে। আর তারা বলে, হে আল্লাহ! আমাদের কাছে আমাদের ভাইদেরকে আনবেন না। এছাড়া আপনি আমাদের সাথে যে অঙ্গীকার করেছেন তা পূরণ করবেন না। (ইবনে মানদা)
হযরত ঘুমরা ইবনে হাবীব (রা) থেকে বর্ণিত : একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে মুমিনদের রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ইরশাদ করলেন, এরা সবুজ পাখিদের মধ্যে থাকে এবং জান্নাতে যেখানে খুশি সেখানে বিচরণ করে। সাহাবীগণ তখন আরয করলেন, তাহলে কাফিরদের রূহ কোথায় থাকে? তিনি ইরশাদ করলেন, ঐগুলো সিজ্জীনে বন্দী থাকে। (তাবরানী)
হযরত ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মুমিনদের রূহ 'যার আযবার' নামক সবুজ পাখিদের মধ্যে থাকে আর বেহেশতী ফলফলাদি ভক্ষণ করে। কেউ কেউ এই উক্তিটি ইবনে আমরের নিজস্ব বক্তব্য বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, এটি কোনো হাদীস নয়।
হযরত তামীমদারী (রা) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, যখন মালাকুল মাউত মুমিনের রূহ নিয়ে আকাশের দিকে উঠেন, তখন জিবরাঈল (আ) সত্তর হাজার ফেরেশতাসহ তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। তাঁদের মধ্যে আকাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য ফেরেশতারাও শামিল থাকেন। মালাকুল মাউত আরশের কাছে গিয়ে সিজদায় পড়েন। এই অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আদেশ করেন, আমার বান্দার রূহকে কণ্টকহীন কূল বৃক্ষে যেখানে স্তরে স্তরে কদলী গাছ সাজানো রয়েছে, তার সম্প্রসারিত ছায়ায় প্রবাহমান পানির পরিবেশে রেখে দাও। আর তার জন্য সুশোভিত ও আরামদায়ক আবাস্থল নির্ধারিত করে দাও, যেখানে পানাহারের প্রচুর ব্যবস্থা রয়েছে।
"রূহ কবরে থাকে” কথাটির অর্থ যদি এই হয় যে, তারা সেখান থেকে কখনো পৃথক হয় না, তাহলে সেটা হবে একটি ভ্রান্ত ধারণা। কুরআন ও হাদীসের দ্বারা এই ধারণাকে খণ্ডন করা হয়েছে। এ সম্পর্কে কিছু তথ্য ও প্রমাণ ইতিপূর্বে পেশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আরো প্রমাণাদি পরে পেশ করা হবে, ইনশাআল্লাহ। যাঁরা মনে করেন, রূহ কখনো কখনো কবরে আসে অথবা অন্য কোনো স্থায়ী আবাসস্থল থেকে কবরের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে সে বিষয়ে দ্বিমতের কোনোই অবকাশ নেই। তবে এর দ্বারা জানা গেল, কবর রূহের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নয়। উল্লেখ্য যে, হযরত ইবনে আবদুল বার (র)ও এই অভিমতটি সমর্থন করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, এ কথার সমর্থনে আরো সহীহ হাদীস ও হাদীসের ধারাবাহিক বর্ণনা রয়েছে। এছাড়া কবরকে উদ্দেশ্য করে সালাম পেশ করা সংক্রান্ত হাদীসগুলোও এ বক্তব্যকে সমর্থন করে। এখানে মুতাওয়াতির বা ধারাবাহিক হাদীস বলতে হযরত ইবনে উমর (রা), হযরত বারা ইবনে আযিব (রা), হযরত আনাস (রা), হযরত জাবির (রা) প্রমুখের বর্ণিত হাদীসকে বুঝানো হয়েছে। এছাড়া কবরবাসীদেরকে সালাম দেয়া সম্পর্কিত সমস্ত হাদীসও এর সঙ্গে যুক্ত আছে।
নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতে রূহ যে রফীকে আ'লায় অবস্থান করে সেটাই সঠিক। মৃতদের কাছে জান্নাত বা জাহান্নামকে পেশ করার জন্য রূহের কবরে অবস্থান করা এমন কোনো অপরিহার্য ব্যাপার নয়। নির্ভরযোগ্য প্রমাণের দ্বারা কবরের সাথে রূহের সম্পর্ক ও যোগাযোগ প্রমাণিত হয়। আর সে সম্পর্কের ভিত্তিতেই রূহের অবস্থান জান্নাত বা জাহান্নামে হয়ে থাকে। কেননা রূহের ব্যাপারটা আলাদা। রূহ রফীকে আলা ও ইল্লিয়্যীনে থাকা সত্ত্বেও এমনিভাবে দেহের সাথে সংশ্লিষ্ট যে, যখন মৃত ব্যক্তিদের প্রতি কেউ সালাম পেশ করে, তখন আল্লাহ তা'আলা মৃত ব্যক্তিদের রূহ তাঁদের কবরে ফিরিয়ে দেন আর তাঁরা সেই সালামের উত্তর দেন, যদিও রূহ ইল্লিয়্যীনে অবস্থান করে। সাধারণতঃ এখানে অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা দেখা যায়, দেহের ন্যায় একই সময়ে রূহের দুই স্থানে উপস্থিতি অসম্ভব। এরূপ ধারণা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। রূহ আকাশের উপর ইল্লিয়্যীনে থাকা সত্ত্বেও কবরে এসে যিয়ারতকারীর সালামের জবাব দেয়, আর সালামকারীকে চিনতেও পারে। লক্ষণীয় যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রূহ মুবারক সর্বদা রফীকে আ'লায় আছেন। কিন্তু তিনি তাঁর রওযা মুবারক যিয়ারতকারীদের সালাম শুনেন এবং তাদের জবাবও দিয়ে থাকেন।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শবে মি'রাজের সময় হযরত মূসা (আ)-কে তাঁর কবরে নামায পড়তে দেখেছিলেন এবং ষষ্ঠ বা সপ্তম আকাশে গিয়েও তিনি তাঁর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। রূহ হয়তো এতোই দ্রুতগতি সম্পন্ন যে, এক পলকে হাজার বছরের দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। অথবা রূহের সাথে কবরের সম্পর্ক বজায় থাকে। যেমন সূর্য আকাশে আছে কিন্তু তার কিরণের দ্বারা যমীনের সঙ্গেও এই সম্পর্ক বজায় রাখে। একথা প্রমাণিত যে, ঘুমন্ত ব্যক্তির রূহ সামান্য সময়ের মধ্যে সপ্তম আকাশ পর্যন্ত অতিক্রম করে আল্লাহ তা'আলাকে সিজদাহ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন আল্লাহ তা'আলা সেই রূহের ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। রূহের জন্য জান্নাতে যে সমস্ত নিয়ামত রাখা হয়েছে ফেরেশতাগণ তাকে তা দেখিয়ে দেন। হযরত বারা (রা) ও হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে, মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের সামান্য অবকাশের মধ্যেই ফেরেশতারা তার রূহকে নামিয়ে নিয়ে আসেন এবং তার দেহের সাথে কাফনে প্রবেশ করিয়ে দেন।
এখানে হযরত তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা)-এর ঘটনা উল্লেখ করা হলো। হযরত তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেন যে, আমি একবার জঙ্গলে আমার পশুগুলোকে দেখতে গেলাম। রাত হয়ে গিয়েছিল, তাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে হারাম (রা)-এর কবরের নিকট রয়ে গেলাম। আমি কবর থেকে কুরআন পড়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম, এরূপ ভালো কিরায়াত আমি আগে কখনো শুনিনি। একথা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে আরয করলে, ইরশাদ হলো, তুমি কি জানো না যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে হারাম (রা)-এর রূহ কবয করার পর ইয়াকূত ও যমরূদের ফানুসের মধ্যে রেখে বেহেশতের মধ্যখানে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর রূহ রাতে তাঁর কবরে আসে আর সকালে নিজের জায়গায় ফিরে যায়। তাই তুমি তার সুমিষ্ট কিরায়াত শুনতে পেয়েছিলে। (ইবনে মানদাহ)
রূহ যে দ্রুতগতি সম্পন্ন এই হাদীসের দ্বারা সেটা প্রমাণিত হলো। রূহ সামান্য সময়ের মধ্যে আরশ থেকে যমীন পর্যন্ত আর যমীন থেকে আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই জন্য ইমাম মালিক (র) প্রমুখ বলেছেন, রূহ মুক্ত, যেখানে ইচ্ছা সেখানে তারা যাতায়াত করতে পারে। সাধারণ লোকও স্বপ্নে মৃতদের সাক্ষাৎ লাভ করে, এতে কেউ কোনো প্রকার সন্দেহ প্রকাশ করে না, এরা অনেক দূর থেকে আগমন করে, আবার কোনো কোনো সময় জীবিতদের রূহ উড়ে গিয়ে উপরে অন্য রূহের সাথে দেখা করে আসে। কখনো কখনো মৃতদের রূহ অবতরণ করে আর তাদের কবরের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে। কবরবাসীদের প্রতি সালাম ও সম্বোধনের দরুন এটা জরুরী নয় যে এঁদের রূহ জান্নাতে না থেকে কবরের আশেপাশে থাকে। কবরবাসীদের প্রতি সালাম ও সম্বোধনের জন্য রূহের কবরে থাকা জরুরী নয়। লক্ষণীয় যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রূহ মুবারক আ'লা ইল্লিয়্যীনে রফীকে আ'লার সাথে আছেন। তবে তিনি রওযা পাকে সালামকারীদের সালামের উত্তর দিয়ে থাকেন। এছাড়া হযরত ইবনে বারা (রা)-এর অভিমত অনুযায়ী শহীদগণের রূহ জান্নাতে থাকে। অথচ অন্যান্য মৃত ব্যক্তিদের ন্যায় এঁদের প্রতিও সালাম পেশ করা হয়, যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহীদদের প্রতি সালাম পেশ করার শিক্ষা দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামও উহুদের যুদ্ধের শহীদদের প্রতি সালাম পেশ করতেন। অথচ একথা প্রমাণিত যে, এঁদের রূহ জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা চলাফেরা করে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, এটা কি একটা আশ্চর্যজনক বিষয় নয় যে, রূহ থাকে জান্নাতে আর কবরে সালামকারীদের সালামও শুনে আর তাদের সালামের উত্তরও দিয়ে থাকে। এই বক্তব্যটি হয়তো অনেকে বুঝতে অক্ষম, কিন্তু এর জবাব হলো, রূহকে দেহের সাথে অনুমান বা ধারণা করা ঠিক নয়। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার জিবরাঈল (আ)-কে দেখেছেন যে, তাঁর সাতশ ডানা রয়েছে। তার মধ্যে দুটি পাখা মাশরিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত সবকিছু ঢেকে রেখেছে। তিনি জিবরাঈল (আ) যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে হাঁটু গেড়ে বসতেন এবং অল্প জায়গাতেই তাঁর সংকুলান হতো। চিন্তার বিষয় যে, তিনি উচ্চস্থানে নিজের জায়গায় আছে, আবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনেও আছেন। তবে এ ধরনের ঘটনা যদি কারো বোধগম্য না হয়, তাহলে কিছু বলার নেই।
যিনি উপরোক্ত বক্তব্যটি বুঝতে অক্ষম তিনিই কেবল এই কথা অবিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক রাতের শেষ প্রহরে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন। অথচ আল্লাহ আকাশমণ্ডলীর উপরে আরশে অবস্থান করছেন। আল্লাহ তা'আলার আসন সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা মহীয়ান ও গরিয়ান। আবার আল্লাহ তা'আলা আরাফাতের দিন সূর্য ঢলার পর আরাফাতে অবস্থানকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন। এমনিভাবে, কিয়ামতের দিন মাখলুকের হিসেব নিতেও তিনি আবির্ভূত হবেন, আর যমীন তাঁর নূরে ঝলমলিয়ে উঠবে। যখন তিনি যমীনকে ফরাশের মতো সুসমতল ও সুসজ্জিত করে ব্যবহার উপযোগী করে দিয়েছিলেন, তখনও তিনি দুনিয়াতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিয়ামতের দিনও সেখানে আল্লাহর আবির্ভাব ঘটবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তারপর রাব্বুল আলামীন যমীনে অবতরণ করবেন অথচ সব বসতি তখন খালি পড়ে থাকবে। এখানে লক্ষণীয় যে, একই সময়ে তিনি যমীনে থাকবেন এবং আরশের উপরও থাকবেন। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, "রাসূল ঈমান এনেছেন সেগুলোর উপর যা তাঁর পালনকর্তার নিকট থেকে তাঁর নিকট অবতীর্ণ হয়েছে আর যারা রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে তারাও হিদায়াতকে আন্তরিকভাবে মেনে নিয়েছে।" (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত ২৮৫)
রূহের বিবিধ গুণের পার্থক্যের কারণে এর রকমফেরও ভিন্ন হয়ে থাকে। কোনো কোনো রূহের শক্তি খুব বেশি, আর কোনো কোনো রূহের শক্তি কম। কাজেই শক্তিশালী রূহের ক্ষমতার তুলনায় দুর্বল রূহের ক্ষমতা হবে কম। দুনিয়াতেও রূহের কার্যকরণ ও আচার-আচরণ নানাভাবে পরিদৃষ্ট হয়। রূহের অবস্থা, রূহের ক্ষমতা, দুর্বলতা, দ্রুততা, ধীরতা, সাহায্য ও সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অনেক পার্থক্য দেখা যায়। যে রূহ দেহের বন্ধন এবং সম্পৃক্ততা থেকে মুক্ত, সে রূহের শক্তি, সাহস এবং আল্লাহর দিকে যাওয়ার ক্ষিপ্রতা অন্য রূহের চেয়ে অনেক বেশি। দেহে আটক অবস্থায়ও রূহের শক্তির পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। দেহ থেকে রূহের মুক্তি লাভের পর এর অবস্থা ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। এছাড়া দেহ থেকে মুক্তি লাভের পর রূহের যাবতীয় উপাদান ও শক্তি একত্রিত হয়। সেই অবস্থায় রূহ তার মৌলিক উপাদান ও শক্তি ফিরে পায়। এরই ফলশ্রুতিতে রূহ অধিকতর শক্তি ও উদ্যোগের অধিকারী হয়।
মানুষের মৃত্যুর পর রূহের কর্মকাণ্ড ও গতিবিধি সম্পর্কে বিভিন্ন শ্রেণীর লোকের বিভিন্ন রকমের বর্ণনা স্বপ্নের মাধ্যমে জানা যায়। রূহের বিভিন্ন উচ্চ মর্যাদা ও কর্ম তৎপরতা প্রকাশ পায়, যা রূহ দেহে থাকাবস্থায় সম্ভব ছিল না। যেমন একাকী একটি বা দুটি বা কতিপয় রূহ বিরাট সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে দিয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত উমর (রা)-কে অনেকে স্বপ্নে দেখেছেন যে, তাঁদের পবিত্র রূহ কাফির ও যালিমদের লশকরকে পরাস্ত করে দিয়েছে। পরে এসব ঘটনা বাস্তবায়িত হতে দেখা গিয়েছে। দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন বিপক্ষ দলের সেনাবহিনী, মুষ্টিমেয় এবং দুর্বল মুসলমানদের কাছে পরাজিত হয়েছে, এরূপ ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়াও এটা কি একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা নয় যে, স্বপ্নযোগে দুজন মুসলমান বন্ধুর রূহ পরস্পর সাক্ষাৎ করে থাকে অথচ তাদের মধ্যে বিরাট দূরত্ব বিদ্যমান। কোনো কোনো রূহ একে অন্যের জন্য ব্যথাও অনুভব করে এবং তারা যে একে অপরের বন্ধু সেটাও উপলব্ধি করে। অথচ এটাতো তাদের মধ্যে কোনো দৈহিক সাক্ষাৎকার নয়। অবশেষে তাদের যখন সশরীরে সাক্ষাৎ হয়, তখন তারা স্বপ্নে যা দেখেছিলেন তা হুবহু মিলে যায়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত: একজন মুমিনের রূহ অন্য কোনো মুমিনের রূহের সঙ্গে বহু দূরে থেকেও সাক্ষাৎ করে, অথচ তারা একে অপরকে কোনো দিনও দেখেননি। এই রেওয়ায়েতটিকে কেউ কেউ মারফু হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হযরত ইকরামা (র) ও হযরত মুজাহিদ (র) বলেছেন, নিদ্রার সময় রূহ তো দেহের মধ্যেই থাকে, মৃত্যুর মতো একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। তবুও রূহ দূরদূরান্তে উড়ে বেড়ায়। আবার সেই রূহ যখন দেহে ফিরে আসে তখন নিদ্রিত ব্যক্তি জেগে উঠে। সূর্যের কিরণ যেমন সূর্য থেকেই বের হয়ে আসে এবং পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে, সেই অবস্থায় সূর্যের মূল কিরণ তো সূর্যের মধ্যেই থেকে যায় যদিও সূর্যের কিরণ দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
এক শ্রেণীর আলিম বলে থাকেন, রূহ নাকের ছিদ্রপথ দিয়ে আলো বিকিরণ করে, তবে দেহই হলো রূহের মূল বাহন। রূহ মানুষের দেহ থেকে বেরিয়ে গেলেই মানুষ মৃত্যুবরণ করে। যেমন একটি প্রদীপ থেকে এর সলিতা বের করে নিলে এটা নিভে যায়, ঠিক তেমনি প্রদীপের মধ্যে যতক্ষণ সলিতা থাকে, ততক্ষণই এর আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক এমনিভাবে রূহও নিদ্রাবস্থায় দেহ থেকে বের হয়ে দূরদূরান্ত ঘুরে আসে। এই অবস্থায় কোনো কোনো মৃত ব্যক্তির রূহের সাথেও দেখা করে আসে। যদি নিদ্রিত অবস্থায় ঐ রূহকে প্রহরী ফেরেশতারা কোনো কিছু দেখান আর ঐ ব্যক্তি যদি নেককার ও বিচক্ষণ বান্দা হন, আর কোনো অবাঞ্ছিত বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত না থাকেন, তাহলে আল্লাহ তা'আলা স্বপ্নযোগে ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁকে যা কিছু দেখান তা তাঁর স্মরণ থাকে। পক্ষান্তরে, নিদ্রিত ব্যক্তি যদি বদকার ও অজ্ঞ হয়, তাহলে সে স্বপ্নযোগে যা দেখতে পায়, তা সত্য হয় না এবং সে কোনো কিছু স্মরণও রাখতে পারে না। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, একজন সৎ ও ধার্মিক লোক স্বপ্নযোগে তাই দেখে থাকেন যা তিনি চিন্তাভাবনা করেন। প্রকৃতপক্ষে, স্বপ্ন হচ্ছে আমাদের জাগতিক ধ্যান-ধারণার বাহ্যিক প্রকাশ। যে যেমন চিন্তাভাবনা করে সে স্বপ্নে সেটাই প্রত্যক্ষ করে। সাধারণতঃ অসৎ ব্যক্তির অশ্লীল ও অশুভ বিষয়ে আগ্রহ থাকে এবং স্বপ্নযোগে সে সেটাই দেখতে পায়। জীবিতকালে সে ব্যক্তি যে সব কুকর্মে লিপ্ত ছিল, মৃত্যুর পর সেজন্য তাকে শাস্তি পেতে হয়।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে— "বরং ওরা নিজের রবের নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত”। (সূরা আলে ইমরান: আয়াত ১৬৯) উপরোক্ত আয়াতের সমর্থনে নিম্নোক্ত হাদীসগুলো উল্লেখ করা হলো। এক. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মৃত্যুর পর নেক রূহকে আসমানে আল্লাহর সন্নিকটে নিয়ে যাওয়া হয়, আর বদকার রূহের জন্য প্রথম আকাশের দরজাই খোলা হয় না। বরং ঐখান থেকেই সেই বদ রূহকে নিচে ছুঁড়ে মারা হয়, তারপর সে রূহ কবরে ফিরে আসে। (সহীহ সনদ সহকারে ইমাম আহমদ (র) কর্তৃক বর্ণিত) দুই. হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) বলেন, মুমিনের রূহ যখন দেহ থেকে বের হয়ে আসে, তখন ঐ রূহ থেকে মেশকের চেয়েও বেশি খুশবু বের হয়। তারপর ফেরেশতারা তাকে প্রথম আকাশের নিকট নিয়ে যান, আকাশবাসীরা জিজ্ঞেস করেন ইনি কে? রূহ বহনকারী ফেরেশতারা বলেন, ইনি অমুকের পুত্র অমুক, একজন নেককার ব্যক্তি। তখন ঐ ব্যক্তির নেক আমলের একটি ফিরিস্তিও দেয়া হয়। তা শুনে আকাশের ফেরেশতারা, রূহ বহনকারী ফেরেশতাদেরকে ও রূহকে স্বাগত জানান এবং তাঁদের কাছ থেকে রূহকে নিয়ে যান। অতঃপর আকাশের যে পথে বান্দার আমল উপরে উঠে, সেই পথে সূর্যের মতো উদ্ভাসিত হয়ে তাঁরা গন্তব্যে পৌছে যান। কাফিরদের রূহ যখন প্রথম আকাশের নিকট পৌঁছে, তখন ফেরেশতারা জিজ্ঞেস করেন এ-কে? রূহ বহনকারী ফেরেশতারা বলেন, এ অমুকের পুত্র অমুক, আর সে একজন অসৎ ব্যক্তি। তখন ফেরেশতারা বিরক্ত হয়ে ঐ বদকার রূহকে ফিরিয়ে দেন এবং বলেন এই রূহকে সর্বনিম্ন স্থানে পৌঁছে দাও। তিন. হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা) থেকে বর্ণিত: সকল নেক রূহ আল্লাহ তা'আলার নিকট একত্রিত হয়ে আছে এবং নিজ নিজ দেহে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁ না দেয়া পর্যন্ত তারা এ অবস্থায় থাকবে। চার. হযরত ইবনে যুবায়ের (রা)-এর শাহাদাতবরণের পর তাঁর পবিত্র লাশ বাইতুল্লাহ শরীফের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়। হযরত ইবনে উমর (রা) তখন সেখানে তাশরীফ আনলেন। আর হযরত ইবনে যুবায়ের (রা)-এর আম্মা হযরত আসমা (রা)-কে এই বলে তিনি সান্ত্বনা ও প্রবোধ দিলেন যে, আপনি সবর করুন ও পরহেযগারীর পথ অবলম্বন করুন এই মৃতদেহ এমন কিছুই নয়, রূহই আসল যা আল্লাহর কাছে আছে। হযরত আসমা (রা) তখন বললেন, আমি চরম ধৈর্যধারণ করেছি। এই প্রসঙ্গে হযরত আসমা (রা) বলেন, আগেকার দিনের জনৈক যালিম বাদশাহ হযরত ইয়াহইয়া (আ)-এর শাহাদাতের পর তাঁর শির মুবারককে অবমাননা করার উদ্দেশ্যে জনৈকা ইসরাঈলী পতিতাকে উপঢৌকন হিসেবে দিয়েছিল। যখন আল্লাহর একজন নবীর শির মুবারকের প্রতি ঐরূপ জঘন্য ব্যবহার করা হয়েছিল, তখন আমরা আর কোনো ছার। পাঁচ. হযরত হিলাল ইবনে ইয়াসাফ (রা) থেকে বর্ণিত: তিনি একদিন হযরত কা'ব (রা), রাবী ইবনে খাইসুম (রা), হযরত খালিদ উরউয়াহ (রা) প্রমুখের সাথে বসা ছিলেন। এমন সময় হযরত ইবনে আব্বাস (রা) সেখানে তাশরীফ আনলেন। হযরত কা'ব (রা) তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে সেখানে উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, ইনি তোমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাতো ভাই। তারপর হযরত কা'ব (রা) হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-কে অতি সসম্মানে বসালেন। তারপর হযরত কা'ব (রা) আরয করলেন, আমি পবিত্র কুরআনের সব অর্থ বুঝতে পেরেছি কিন্তু চারটি জায়গার অর্থ বুঝতে পারিনি। আপনি মেহেরবানী করে সেগুলোর অর্থ আমাকে বুঝিয়ে দিন। এক. ইল্লিয়্যীন কি? দুই. সিজ্জীন কি? তিন. সিদরাতুল মুনতাহা কি? চার. "ওয়া রাফায়নাহু মাকানান আলিয়্যা" আয়াতের অর্থ কি? হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ইরশাদ করলেন, ইল্লিয়্যীন হলো— সপ্তম আকাশে একটি স্থানের নাম যেখানে মুমিনদের রূহ অবস্থান করে। আর সিজ্জীন হলো— সপ্তম যমীনের নিচের স্তর যেখানে কাফিরদের রূহ ইবলীস বাহিনীর নিচে অবস্থান করে। সিদরাতুল মুনতাহা হলো— একটি কুলগাছ যা আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মাথার উপরে রয়েছে। এটাই সৃষ্টির জ্ঞানের শেষ সীমা। এর উপরের খবর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জ্ঞাত নয়। তাই এই বৃক্ষকে সিদরাতুল মুনতাহা বলা হয়। "ওয়া রাফায়নাহু মাকানান আলিয়্যা” এই আয়াতের অর্থ হলো— আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত ইদরীস (আ)-এর নিকট তাঁর ইনতেকাল সম্পর্কে ওহী পাঠিয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর এক ফেরেশতা বন্ধুকে বলেছিলেন, আযরাঈল (আ)-কে বলে দিতে তিনি যেন তাঁর রূহকে কিছু বিলম্বে কবয করেন, যাতে তিনি আরো কিছু নেক আমল করার সুযোগ পান। এই কথা শোনার পর ঐ ফেরেশতা হযরত ইদরীস (আ)-কে তাঁর পিঠে তুলে চতুর্থ আকাশে চলে গেলেন। সেখানে আযরাঈল (আ)-এর সাথে তাঁর দেখা হলো। তখন তিনি হযরত ইদরীস (আ)-এর অনুরোধের কথা তাঁকে জানালেন। আযরাঈল (আ) তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ইদরীস (আ) এখন কোথায়? ঐ ফেরেশতা বললেন, তিনি এখন আমার পৃষ্ঠদেশেই আছেন। এটা শুনে আযরাঈল (আ) বললেন, আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন তাঁর রূহ চতুর্থ আকাশে কবয করি, অতঃপর হযরত ইদরীস (আ)-এর রূহ সেখানেই কবয করা হলো। (জরীর ইবনে মানদাহ) ছয়. হযরত যাহহাক (র)-এর মতে মুমিনের রূহ কবয করার পর দুনিয়ার আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারপর আকাশের সম্মানিত ফেরেশতারা দ্বিতীয় আকাশ পর্যন্ত সেই রূহকে পৌছে দেন। এইভাবে সপ্তম আকাশ অতিক্রম করার পর মুমিনের রূহ সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছে যায়। সিদরাতুল কেন বলা হয়? হযরত যাহহাক (র)-এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন— আল্লাহর কোনো নির্দেশ এই বৃক্ষকে অতিক্রম করে না। ফেরেশতারা বলেন, হে রব, এ হলো আপনার অমুক বান্দা, যদিও আল্লাহ সবকিছু পরিজ্ঞাত। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ বান্দার নিকট তার সীলযুক্ত আমলনামা পাঠিয়ে দেন, যা ঐ ব্যক্তিকে আযাব থেকে রক্ষা করে।
নিম্নোক্ত পবিত্র আয়াতে ঐ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে— "হাঁ হাঁ নিশ্চয় সৎলোকদের লিপি অর্থাৎ আমলনামা সবচেয়ে উচ্চস্থান 'ইল্লিয়্যীনে' আছে এবং আপনি জানেন 'ইল্লিয়্যীন' কেমন? ঐ লিপিটা হচ্ছে একটি সীল মোহরযুক্ত লিপি। আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্তরা (ফেরেশতাগণ) যার রক্ষণাবেক্ষণ করেন।” (সূরা আল মুতাফফিফীন: আয়াত ১৮-২১) যাঁরা বলেন, রূহ বেহেশতে থাকে এই অভিমতটি তাঁদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জান্নাত সিদরাতুল মুনতাহা ও আল্লাহর নিকটে অবস্থিত। তাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, শহীদগণের রূহ তাঁর কাছেই রয়েছে। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেসব রূহ জান্নাতে যেখানে খুশি চলাফিরা করে। মুমিনদের রূহ যে জাবিয়ায় ও কাফিরদের রূহ হাদরামাউতের বারহুত নামক কূপে অবস্থান করে এটা রাফিযীদের অভিমত বলে ইমাম ইবনে হাযম (র) উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর এই বক্তব্য সঠিক নয়। আহলে সুন্নাতের এক শ্রেণীর লোকও এই অভিমত সমর্থন করেন। সাহাবা ও তাবিয়ীনের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, মুমিনদের রূহ জাবিয়াহ নামক স্থানে অবস্থান করে। এছাড়া হযরত ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, মুমিনদের রূহ জাবিয়াতে আর কাফিরদের রূহ হাদরামাউতের লোনাভূমিতে বারহুত নামক কূপে একত্রিত হয়েছে এবং তাঁর কাছে মাসয়ালা-মাসায়েল জানতে চাইছে। সেই সময় জনৈক ব্যক্তি প্রশ্নকারীকে বললেন, তুমি ইবনে আমর (রা)-কে জিজ্ঞেস করো, মুমিনদের ও কাফিরদের রূহ কোথায় অবস্থান করে? সেই ব্যক্তি হযরত ইবনে আমরকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, মুমিনদের রূহ জাবিয়াতে ও কাফিরদের রূহ বারহুতে অবস্থান করে। (ইবনে মানদাহ) এ প্রসঙ্গে হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, পৃথিবীতে উত্তম কূপ হলো যমযম, আর নিকৃষ্ট কূপ হলো বারহুত। এছাড়া পৃথিবীর উত্তম এলাকা হলো পবিত্র মক্কার এলাকা, আর হিন্দুস্তানের ঐ এলাকা যেখানে হযরত আদম (আ) বেহেশত থেকে অবতরণ করেছিলেন। এই দুটি এলাকা থেকে তোমাদের নিকট সুগন্ধ আসে। পক্ষান্তরে, নিকৃষ্ট এলাকা হলো আহকাফ, যেটা হাদরামাউতে অবস্থিত। এখানেই কাফিরদের রূহকে ফিরিয়ে আনা হয়। (ইবনে মানদাহ) এ প্রসঙ্গে হযরত আলী (রা) আরো বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থান হলো— হাদরামাউতের উপত্যকা, যাকে বারহুত বলা হয়, যেখানে কাফিরদের রূহ থাকে। সেখানে একটি কূপ আছে। সেই কূপের পানি দেখতে পুঁজের মতো কালো রঙের, সেখানে পোকা-মাকড় জমে থাকে। জনৈক ব্যক্তি এক রাতে বারহুত নামক কূপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। যেভাবে একে অন্যকে ডাকাডাকি করে ঠিক ঐরূপ আওয়াজ সেখানে তিনি শুনতে পেয়েছিলেন। হে দাওমাহ, হে দাওমাহ, এরূপ শব্দ শুনা যাচ্ছিল। আহলে কিতাবের একজন বুযুর্গ ব্যক্তি 'দাওমাহ' শব্দের অর্থ কাফিরদের রূহের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত ফেরেশতাদেরকে বুঝায় বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত সুফইয়ান (র) থেকে বর্ণিত: তিনি হাদরামাউতের লোকদের নিকট থেকে শুনেছেন, ঐস্থানে রাতে কোনো লোক থাকতে পারে না। সেটাও কাফিরদের রূহের অবস্থানের একটি জায়গা। (ইবনে মানদাহ) রূপক অর্থে জাবিয়া শব্দের অর্থ হচ্ছে, খোলামেলা জায়গা। এছাড়া জাবিয়াহ শব্দের অর্থ যদি বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট স্থানকে বুঝায়, তাহলে এর সঠিক তত্ত্ব শরীআতের জ্ঞানের মাধ্যমে অনুধাবন করাই সমীচীন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "নিশ্চয় আমি 'যাবুর'-এর মধ্যে উপদেশের পর লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণই অবশেষে পৃথিবীর অধিকারী হবে।” (সূরা আম্বিয়া: আয়াত ১০৫) এই পবিত্র আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ও অন্যান্য তাফসীর বিশেষজ্ঞগণ 'আরদ' শব্দের অর্থ বেহেশতের যমীন বলে ব্যক্ত করেছেন। হযরত আব্বাস (রা) 'আরদ' শব্দের অর্থ সম্পর্কে আরো একটি অভিমত ব্যক্ত করেছেন, সেটা হলো— ঐসব এলাকা যা উম্মতে মুহাম্মদী কর্তৃক বিজিত হয়। 'আরদ' শব্দের দ্বিতীয় অর্থটি এখানে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য। এই অভিমতটি সূরা নূরের নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা সমর্থিত। "আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাঁদেরকে যাঁরা তোমাদের মধ্যে ঈমান এনেছেন এবং সৎকর্ম করেছেন যে, অবশ্যই তাঁদেরকে তিনি পৃথিবীতে খিলাফত প্রদান করবেন যেমনি তাঁদের পূর্ববর্তীদেরকে খিলাফত দান করেছিলেন।” (সূরা নূর: আয়াত ৫৫) এ প্রসঙ্গে একটি সহীহ হাদীসও এখানে উল্লেখ করা হলো— নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "দুনিয়ার মাশরিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত আমার জন্য বরাদ্দ করে দেয়া হয়েছে। অতিসত্বর ঐ সব দেশে আমার উম্মতের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।" এক শ্রেণীর মুফাসসিরে কুরআন বলেন যে, 'আরদ' শব্দের অর্থ বাইতুল মুকাদ্দাস। আর যে যমীনের ওয়ারিস আল্লাহর নেক বান্দাগণ হবে বলে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে— বাইতুল মুকাদ্দাস সেই যমীনের অন্তর্ভুক্ত।
মুমিনদের রূহ সপ্তম আকাশে ইল্লিয়্যীনে থাকে, আর কাফিরদের রূহ সপ্তম যমীনের নিচে সিজ্জীনে থাকে। এই প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি পবিত্র বাণী "হে আল্লাহ! উঁচু সাথীদের কাছে আমাদের পৌঁছে দিন।" উপরোক্ত বক্তব্যের সঙ্গে এ বাণীটি খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) ও হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) কর্তৃক হাদীসে এই প্রসঙ্গটি ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া হযরত হুযাইফা (রা) ও হযরত ইবনে উমর (রা)-এর অভিমতও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শহীদগণের রূহ আল্লাহর আরশের নিচে ফানুসের মধ্যে অবস্থান করে। হযরত বারা ইবনে আযিব (রা) বর্ণিত হাদীসেও সেই বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এসব প্রমাণের দ্বারা রূহ যে দেহ থেকে পৃথক হওয়ার সাথে সাথে ইল্লিয়্যীনে বা সিজ্জীনে থাকে সেটা প্রমাণিত হয় না। বরং এটাই প্রমাণিত হয় যে, রূহকে রবের সামনে পেশ করা হয় এবং তিনি ফয়সালা করে দেন এরা কোথায় থাকবে। তারপর রূহকে সওয়াল-জওয়াবের জন্য কবরে ফেরত পাঠানো হয়। এভাবে মুমিনদের রূহ মর্যাদা অনুযায়ী ইল্লিয়্যীনে আর কাফিরদের রূহ সিজ্জীনে অবস্থান করে। মুমিনদের রূহ যে যমযম কূপের মধ্যে একত্রিত হয়ে থাকে, সে ধারণা সঠিক নয়। এ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই, নির্ভরযোগ্য কোনো আলিমের অভিমতও নেই। বরং এই অভিমতটি সরাসরি হাদীসের পরিপন্থী। পবিত্র হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, মুমিনদের রূহ হলো এক ধরনের পাখি যারা জান্নাতের তরুলতা, ফলফলাদি ভক্ষণ করে। এই অভিমতটি জাবিয়াহ সংক্রান্ত মতের চেয়েও ভ্রান্ত ও বাতিল। কেননা জাবিয়াহ একটি প্রশস্ত জায়গা আর যমযম হলো একেবারেই একটি সংকীর্ণ স্থান।
রূহের অবস্থান সম্পর্কে হযরত সালমান ফারেসী (রা) বলেছেন, বরযখ হলো আড়াল দেয়া একটি অবস্থান যা দুনিয়া ও আখিরাতকে সংযুক্ত করে। অর্থাৎ রূহ মুক্ত, রূহ আলমে বরযখে অবস্থান করে এবং যেখানে ইচ্ছা সেখানে গমনাগমন করতে পারে। এটি একটি যুক্তিসঙ্গত অভিমত। কেননা রূহ দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছে আর আখিরাতের এখনো অনেক বাকী। তবে মুমিনদের জন্য বরযখ একটি আরামদায়ক স্থান যা অফুরন্ত নিয়ামতে ভরপুর। অপরপক্ষে কাফিরদের রূহ একটি সংকীর্ণ স্থানে অশান্তি ও আযাবের মধ্যে থাকে। তাই পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "তাদের সামনে বরযখ থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।" (সূরা আল মুমিনুন: আয়াত ১০০) পবিত্র হাদীসের বর্ণনানুযায়ী হযরত আদম (আ) তাঁর ডানে ও বামে রূহের সমাবেশ লক্ষ্য করেছিলেন। পবিত্র মি'রাজ সম্পর্কিত হাদীসটি এই অভিমত সমর্থন করে। কিন্তু এই হাদীসে এরূপ কোনো বিষয়ের উল্লেখ নেই যার দ্বারা রূহ যে সরাসরি হযরত আদম (আ)-এর ডানে বা বামে অবস্থান করছিল, সেটা বুঝায়। তবে কিছু সংখ্যক রূহকে, তাঁর ডানদিকে উঁচু ও প্রশস্ত স্থানে দেখা গিয়েছিল, আর কিছু সংখ্যক রূহকে তাঁর বামদিকে এক নিচু, আঁধার ও সংকীর্ণ স্থানে দেখা গিয়েছিল।
ইমাম আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযম (র) বরযখ সম্পর্কে বলেন, এটা হলো প্রথম আকাশের নিকটবর্তী একটি স্থান। যা পার্থিব উপাদান যেমন— পানি, মাটি, আগুন ও বায়ু ইত্যাদি বহির্ভূত। যাঁরা বিনা দলীল প্রমাণে কোনো বক্তব্য রাখেন, তাঁদেরকে ইমাম ইবনে হাযম (র) তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন, যদিও তিনি নিজের ঝুলির প্রতি কোনো লক্ষ্য করেননি। এছাড়া তিনি তাঁর এই অভিমতের সমর্থনে কুরআন বা হাদীস থেকে কোনো প্রমাণ পেশ করতে পারেননি। ইমাম ইবনে হাযম (র)-এর অভিমত সম্পর্কে পরবর্তীতে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ। গ্রন্থকার এর আগেও উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেককারদের রূহ প্রথম আকাশে হযরত আদম (আ)-এর ডানদিকে আর কাফিরদের রূহ তাঁর বামদিকে দেখতে পেয়েছিলেন। পবিত্র হাদীসে আরো বর্ণিত আছে যে, শহীদগণের রূহ আরশের ছায়ায় অবস্থান করে, আর আল্লাহর আরশ সপ্তম আকাশের উপরে অবস্থিত। তাহলে উপরোক্ত এই দুই মতের মধ্যে বৈপরীত্য দেখা দেয়। তবে এই প্রশ্নের একাধিক জবাব রয়েছে। এক. এর দ্বারা এটা প্রয়োজনীয় নয় যে, মুমিনদের রূহ আদম (আ)-এর ডানপাশে উঁচুতে থাকবে না, আর কাফিরদের রূহ তাঁর বামপাশে নিচুতে থাকবে না। দুই. প্রথম আকাশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে রূহকে সাময়িকভাবে পেশ করা অসম্ভব ব্যাপার নয়, যদিও নেককারদের রূহের আবাসস্থল ইল্লিয়্যীনে আর বদকারদের রূহের অবস্থানস্থল সিজ্জীনে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কোনো অভিমত ব্যক্ত করেননি যে, তিনি প্রথম আকাশে কেবল সৌভাগ্যবানদের রূহ দেখেছিলেন, বরং তিনি বলেছেন, আমি আদম (আ)-এর ডানদিকে কিছু সংখ্যক রূহ দেখেছি, আর বামদিকেও কিছু সংখ্যক রূহ দেখেছি। তবে এটা সুস্পষ্ট যে, হযরত আদম (আ) রয়েছেন প্রথম আকাশে, আর হযরত মূসা (আ) ও হযরত ইবরাহীম (আ) যথাক্রমে রয়েছেন ষষ্ঠ ও সপ্তম আকাশে। রূহ নিজ নিজ মর্যাদা অনুযায়ী ঊর্ধ্বলোকে বা নিম্নলোকে অবস্থান করে। প্রকৃতপক্ষে, এটাই হলো রফীক আ'লায় রূহের অবস্থান।
ইমাম ইবনে হাযম (র)-এর অভিমত অনুযায়ী মানুষের দেহ তৈরির আগে রূহ যেখানে ছিল, মৃত্যুর পরও সেখানেই থাকবে। তাঁর এই অভিমতের ভিত্তি হলো, মানুষের রূহ তার দেহ সৃষ্টির পূর্বেই সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে এ সম্পর্কে দুটি ভিন্ন অভিমত রয়েছে। অধিকাংশ আলিমের মতে, দেহকে সৃষ্টি করার পরই রূহকে সৃষ্টি করা হয়। দেহকে সৃষ্টি করার পূর্বে রূহকে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে যাঁরা দাবী করেন, তাঁদের কাছে কুরআন বা হাদীসের কোনো প্রমাণ বিদ্যমান নেই। এমনকি তাঁদের কাছে ইজমারও কোনো প্রমাণ নেই। তবে তাঁদের এরূপ দাবিকে প্রতিপন্ন করার জন্য তাঁরা পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলোর উপর নির্ভর করেন। এছাড়া কতক দুর্বল হাদীসের সাহায্যও তাঁরা নিয়ে থাকেন। "এবং স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরগণকে বের করেন এবং তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেদেরকে সাক্ষী করেছেন— আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? সবাই বলল, কেন নন, নিশ্চয়ই।” (সূরা আ'রাফ: আয়াত ১৭২) "নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তোমাদের নমুনা তৈরি করেছি, অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি, আদমকে সিজদাহ করো। ইবলিস ব্যতীত তারা সকলেই সিজদাহরত হলো। যারা সিজদাহ করল সে তাদের দলভুক্ত হলো না।” (সূরা আ'রাফ: আয়াত ১১)
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে জানা গেল, আল্লাহ তা'আলা সমস্ত রূহ একবারেই সৃষ্টি করেছেন। এই প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, রূহ হলো একটি সম্মিলিত বাহিনী। যখন আল্লাহ পাক রূহ থেকে স্বীয় প্রভুত্বের অঙ্গীকার নিলেন, তখন তারা আকার-আকৃতি বিশিষ্ট একটি সৃষ্টি এবং জ্ঞানসম্পন্নও ছিল। তখন পর্যন্ত ফেরেশতাদেরকে আদম (আ)-কে সিজদাহ করার নির্দেশ দেয়া হয়নি এবং রূহকে তাঁর দেহে প্রবেশও করানো হয়নি। রূহের তখন কোনো অবস্থান ছিল না। যেহেতু আল্লাহ তা'আলা উপরে উল্লেখিত আয়াতে 'সুম্মা' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ হলো— বিরতির মাধ্যমে কোনো কাজ কিছু বিলম্বে সমাধা করা। অর্থাৎ কোনো একটি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর কিঞ্চিৎ বিলম্বে অন্য কাজ সম্পন্ন করা। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা রূহকে সৃষ্টি করে রেখে দিলেন, মৃত্যুর পর তারা বরযখে ফিরে যাবে।
এখন প্রশ্ন হলো— দেহের আগে রূহের সৃষ্টি হয়েছে নাকি দেহের সাথে সাথে সৃষ্টি হয়েছে। মৃত্যুর পর রূহ কোথায় অবস্থান করে? এ সম্পর্কে ইমাম ইবনে হাযম (র)-এর অভিমত হলো— রূহ ঐ বরযখে অবস্থান করে, যেখানে মানুষের দেহ সৃষ্টি করার পূর্বেই ছিল। এটা তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস বা আকীদা। এছাড়া তাঁর মতে নেককারদের রূহ হযরত আদম (আ)-এর ডানদিকে ও বদকারদের রূহ তাঁর বামদিকে থাকে। এটা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসও বটে। "রূহের অবস্থান বরযখের ঐ স্থানে যেখানে পার্থিব জড় উপাদানের সমাপ্তি ঘটেছে।” ইমাম হাযম (র)-এর এই অভিমত নির্ভরযোগ্য বা প্রমাণ ভিত্তিক নয়। কুরআন ও হাদীসে এর কোনো প্রমাণ নেই। আর মুসলমানদের সত্যিকার আকীদার সাথে এর কোনো সাদৃশ্য বা মিল নেই। এছাড়া সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, রূহের অবস্থান হলো জড় জগতের উপাদান-উপকরণের ঊর্ধ্বে জান্নাতে। আর পবিত্র কুরআনের আয়াত দ্বারাও এটা প্রমাণিত। ইমাম ইবনে হাযম (র)-এর অভিমত অনুযায়ী শহীদগণ জান্নাতে অবস্থান করেন। তবে এটাও সত্য যে, সিদ্দীকদের মর্যাদা একজন শহীদের চেয়ে অধিক। তাহলে মহান সিদ্দীকগণও অবশ্য জান্নাতে অবস্থান করেন। অন্যথায় এটা অনিবার্য হয়ে পড়ে যে, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), হযরত আবুদ্দারদা (রা), হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা) প্রমুখ সাহাবীগণের রূহ মুবারক অবস্থান করছে— দুনিয়ার আকাশের নিচে, আর শহীদগণের রূহ জান্নাতে সিদ্দীকগণের রূহের চেয়ে উপরে অবস্থান করে। ইমাম ইবনু হাযম (র) তাঁর এই অভিমতটি হযরত মুহাম্মদ ইবনে নসর মারূযী (র) ও হযরত ইসহাক ইবনে রাহবিয়া (র) থেকে গ্রহণ করেছেন বলে দাবী করেন। এছাড়া তাঁদের এই অভিমত সমস্ত আলিমগণও সমর্থন করেছেন।
ইবনে হাযম (র)-এর এই দাবি ও অভিমত মোটেই সঠিক ও তথ্য নির্ভর নয়। কেননা হযরত মুহাম্মদ ইবনে নসর মারূযী (র) তাঁর "কিতাবুর রদ্দে আলা ইবনে কুতায়বা" শীর্ষক গ্রন্থে— “ওয়া ইয আখাযা রাব্বুকা"— আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, প্রখ্যাত আলিমগণও এ ব্যাপারে একমত যে, অন্য কোনো কিছু সৃষ্টির পূর্বেই হযরত আদম (আ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে বহির্গত রূহ থেকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রভুত্বের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। এই উদ্ধৃতি দ্বারা ইমাম ইবনু হাযম (র)-এর দাবী— “রূহের অবস্থান ঐস্থানে যেখানে পার্থিব উপাদানের সমাপ্তি ঘটেছে,” কোনো প্রকারেই প্রমাণিত হয় না। এমনকি এটাও প্রমাণিত হয় না যে, দেহের পূর্বে রূহ বিদ্যমান ছিল। তবে এটাই প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা ঐ সময় রূহকে আদম (আ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করে তাদের থেকে নিজ রাবুবিয়াতের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। তারপর আবার সেগুলোকে আদম (আ)-এর পৃষ্ঠদেশ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও আগেকার ও পরবর্তীকালের আলেমদের এক শ্রেণী এই অভিমতকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু সঠিক মত হলো এর বিপরীত যা সামনে আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ। যেহেতু ইবনে হাযম (র)-এর জবাবের মধ্যে একথা উল্লেখ নেই যে, রূহ প্রথমে দেহে ছিল নাকি পরে দেহে সংযুক্ত হয়েছে। আর যদি একথা মেনে নেয়া হয় যে, রূহ প্রথমে দেহে ছিল না, তাহলে এর দ্বারা এই দাবী প্রমাণিত হয় না যে, রূহের অবস্থান হলো ঐস্থানে, যেখানে আনাসির বা পার্থিব উপাদান শেষ হয়ে যায়। আর মৃত্যুর পূর্বেও ঐ আনাসিরই ছিল রূহের অবস্থানস্থল।
"দেহের সাথে রূহ ধ্বংস হয়ে যায়" —এটা হলো তাদের আকীদা যারা রূহকে দেহের উপাদান বলে মনে করে। ইমাম বাকিলানী (র) প্রমুখ এই মত পোষণ করতেন। হযরত আবূ হুযায়েল আল্লাফ (র)ও অনুরূপ মত পোষণ করতেন। তবে তিনি রূহকে দেহের একটি উপাদান মনে করতেন। রূহের অর্থ যে জীবন তিনি এটা স্বীকার করতেন না। অবশ্য হযরত ইমাম বাকিলানী (র) ও হযরত হুযায়েল আল্লাফ (র) প্রমুখের অভিমত এই যে, একজন মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার অন্যান্য উপাদানের ন্যায় রূহও মৃত্যুবরণ করে। তাঁরা আরো বলেন, যে কোনো উপাদান দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকে না। তবে আশআরিয়া সম্প্রদায়ের অনেকেই এই অভিমত পোষণ ও সমর্থন করেন। তাঁদের মতে প্রত্যেক পরিবর্তনের পর একটি নতুন রূহের সৃষ্টি হওয়া অপরিহার্য, অর্থাৎ জীবনের ক্ষণস্থায়ী সময়ের মধ্যে অসংখ্য রূহ জন্ম নিতে পারে, তখন তার পূর্বের অবস্থা আর থাকে না। কাজেই রূহের আকাশে উঠা, অবতরণ করা, কবরে ফিরে আসা, মুনকার-নাকীর কর্তৃক কবরে সওয়াল ও জওয়াবের সম্মুখীন হওয়া, তার জন্য আকাশের দরজা খুলে দেয়া এবং কবরের আযাব বা আরাম ইত্যাদি বিষয়ের কোনো প্রশ্নই উঠে না। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাতেই মৃত ব্যক্তির দেহে আযাব বা আরাম হয়ে থাকে। আর ঐ সময় মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করা হয়। রূহের নিজস্ব কোনো পৃথক অস্তিত্ব নেই। এই অভিমত পোষণকারীদের এক শ্রেণীর মত হলো, মানুষের জীবন শুধু মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তের হাড়ে ফিরিয়ে আনা হয়। আর এতেই মৃত ব্যক্তি আযাব বা আরাম ভোগ করে। এই অভিমত হলো তাঁদের, যাঁদের রূহ সম্পর্কে কোনোই জ্ঞান বা ধারণা নেই। সুতরাং তারা কি করে অন্যদের রূহের সঠিক অবস্থান উপলব্ধি করতে পারে?
উপরে বর্ণিত অভিমতগুলো কুরআন-হাদীস ও ইজমার সম্পূর্ণ পরিপন্থী, এই সব অভিমত যুক্তিগ্রাহ্যও নয়। দেহ থেকে রূহ বের হওয়া, প্রবেশ করা এবং ফিরে আসার নির্দেশ আল্লাহ তা'আলাই দিয়ে থাকেন। এছাড়া নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের দ্বারা এটা সঠিকভাবে স্বীকৃত যে, রূহ উপরে উঠে, নিচে নামে, রূহকে আটক করা হয়, মুক্তও করা হয়, রূহের জন্য আকাশের দরজা খোলা হয়, রূহ আল্লাহকে সিজদাহ করে, অন্য রূহের সঙ্গে কথাও বলে, আর পানির ফোঁটার ন্যায় অতি সহজে দেহ থেকে বেরিয়ে আসে, রূহকে জান্নাতী বা জাহান্নামী পোশাকও দেয়া হয়। আযরাঈল (আ) রূহকে তাঁর হাতে তুলে নেন, এসব রূহ থেকে মৃগনাভির খুশবু অথবা পচাগলা লাশের চেয়েও অধিক দুর্গন্ধ নির্গত হয়। রূহকে এক আসমান থেকে অন্য আসমানে ফেরেশতারা বিদায় সম্বর্ধনা জানান। তারপর রূহকে ফেরেশতাদের সাথে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং দেহ থেকে রূহ বের করার সময় মৃত ব্যক্তি তা প্রত্যক্ষ করে। পবিত্র কুরআন থেকেও প্রমাণিত যে, রূহ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত কণ্ঠনালী স্থলে গিয়ে পৌঁছে। ইতিপূর্বে এই মর্মে অনেক দলীল ও প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। রূহের মধ্যে পরস্পর সাক্ষাৎ ঘটে। এছাড়া রূহ হচ্ছে একটি সম্মিলিত বাহিনী। তাই ইমাম ইবনু হাযম (র) এবং তাঁর অনুসারী আলিমদের অভিমত গ্রহণযোগ্য নয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ শরীফে হযরত আদম (আ)-এর ডানপাশে ও বামপাশে রূহ দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি আরো ইরশাদ করেছেন, মুমিনের রূহ এক প্রকার পাখির ন্যায়, এরা জান্নাতের বৃক্ষরাজি ও তরুলতা থেকে ফলফলাদি ভক্ষণ করে। শহীদগণের রূহ সবুজ রঙের পাখিদের পক্ষপুটে থাকে। আর ফিরআউন গোষ্ঠীর লোকদের রূহকে সকাল-সন্ধ্যা আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। ইমাম বাকিলানী (র) মনে করেন যে, রূহ মানুষের দেহের একটি অন্যতম উপাদান। তিনি আরো মনে করেন যে, একটি দেহ থেকে হাজার হাজার রূহ সৃষ্টি হতে পারে। এরূপ ধারণা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ মৃত্যুর পর একজন মানুষকে তার আমলের আযাব বা আরাম ভোগের জন্য একটি রূহের প্রয়োজন। আসলে, মানুষের দেহে একটি রূহই অবস্থান করে।
মৃত্যুর পর রূহের অবস্থানের জন্য নতুন দেহের প্রয়োজন আছে কি নেই, এটা একটি বিতর্কিত বিষয়, এটাকে পুনর্জন্ম বা অন্য কিছু বলা হোক বা না হোক। দার্শনিকদের দৃষ্টিতে পুনর্জন্ম হলো— এই দুনিয়া ধ্বংস হবে না, আর রূহ বিভিন্ন দেহের মধ্যে আনাগোনা করতে থাকবে, যা একটি অবান্তর ও অবাস্তব ধারণা। প্রকৃতপক্ষে, শহীদগণের রূহ আরশের সাথে লটকানো ফানুসের মধ্যে অবস্থান করে। আর সেই ফানুসগুলো হলো পাখির বাসার মতো। এতে প্রমাণিত হলো যে, আল্লাহ তা'আলা শহীদগণের রূহকে সবুজ রঙের পাখির পক্ষপুটে রেখে দেন। এ প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "মুমিনের রূহ পাখির মতো বেহেশতের তরুলতা, ফলফলাদি ভক্ষণ করে।" এই হাদীসের দুটি সম্ভাব্য অর্থ হতে পারে। হয়তো মানুষের দেহের ন্যায় এই সবুজ পাখি রূহের বাহনের কাজ করে। এটা হলো— এক শ্রেণীর মুমিন ও শহীদদের রূহের জন্য। অন্য ব্যাখ্যা হলো, রূহ পাখির আকৃতি ধারণ করে।
রূহের অবস্থান সম্পর্কে ইমাম ইবনে হাযম (র) একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন যে, "মুমিনের রূহ হলো পাখির ন্যায় যারা উড়ে ও চরে বেড়ায়।” এই হাদীসটির অর্থ খুবই স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট। কোনো হাদীসের অর্থ কারো অনুমান সাপেক্ষ কোনো ব্যাপার নয়। মুমিনদের রূহ জান্নাতে পাখির মতো উড়ে বেড়ায়। এর অর্থ এ নয় যে, রূহ পাখির আকৃতি ধারণ করে। আরবি 'নাসামাতুন' শব্দটির মধ্যে 'তা' অক্ষরটি এখানে স্ত্রী লিঙ্গের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন আরব দেশীয় কোনো বক্তা বলে থাকেন— আপনি আমার বক্তব্যের লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুংলিঙ্গ থেকে স্ত্রীলিঙ্গ করে দিয়েছেন। উত্তরে লোকটি বলছিলেন— কিতাবের অপর নাম কি সহীফাতুন নয়? এর উত্তরের উপর ভিত্তি করে আরবি 'নাসামাতুন' শব্দটি অনুমান করতে হবে। এই হাদীসে আরো বলা হয়েছে— রূহ সবুজ রঙের পাখির পেটের মধ্যে আছে। এই মর্মে এটাই একমাত্র হাদীস। ইমাম ইবনে হাযম (র)-এর অভিমতটি আক্ষরিক অর্থের দিক দিয়ে ভ্রান্ত। কেননা, "নাসামাতুল মুমিনে তায়েরুন ইউলাকু ফী শাজারিল জান্নাতি" অর্থাৎ মুমিনের রূহ পাখির রূপ ধরে জান্নাতের বৃক্ষসমূহে বিচরণ করে ও ফলফলাদি ভক্ষণ করে। "আরওয়াহুশশুহাদায়ি ফী হাওয়াসিলে তাইরিন খুদরিন।” অর্থাৎ শহীদদের রূহ সবুজ রঙের পাখির পক্ষপুটে থাকে।
তবে উপরোক্ত হাদীস দুটি হলো বিতর্কিত। প্রথম হাদীসটিতে হেরফের করার কিছু সুযোগ আছে। দ্বিতীয় হাদীসটিতে হেরফের করার কোনোই সুযোগ নেই। দ্বিতীয় হাদীসটির একটি শব্দ 'হাওয়াসেল' এর পরিবর্তে 'আজওয়াফ' উল্লেখ আছে। আর অপর একটি শব্দ 'খুদরিন' এর স্থলে 'বীয' শব্দ উল্লেখ আছে। ইমাম ইবনে হাযম (র) বলেছেন, এই পাখি বেহেশতে বিচরণ করে ও সেখানকার গাছের ফলফলাদি ভক্ষণ করে, আর জান্নাতের নহর থেকে পানি পান করে। তারপর আরশের নিচে ঝাড়গুলোর মধ্যে গিয়ে বিশ্রাম করে। ঐ ঝাড়গুলো ওদের জন্য বাসাতুল্য। অতএব ইমাম ইবনে হাযম (র) এর একথা যে, সমস্ত পাখিদের পক্ষপুট ফানুসের বিশেষণ এটা নিঃসন্দেহে ভ্রান্ত ধারণা। বরং এ ঝাড়গুলো হচ্ছে পাখিগুলোর বিশ্রামাগার। এই হাদীসের মধ্যে তিনটি বিষয়ের উল্লেখ আছে। প্রথমটি হলো রূহ সম্পর্কে, দ্বিতীয়টি হলো ঝাড়সমূহ যা এসব পাখির বিশ্রামাগার, যেগুলো আরশের নিম্নস্থলে রয়েছে এবং কোথাও বিচরণ বা চলাফিরা করে না। আর পাখিগুলো চলাফিরা ও বিচরণ করে। আর রূহ থাকে পাখিদের পেটের মধ্যে।
যদি বলা হয় যে, পাখিদের রূহের বাহন মনে না করে যদি সরাসরি পাখি বলে মেনে নেয়া হয়, তাহলে অসঙ্গতির কিছু থাকে না। বরং সেটা কুরআন-হাদীসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন— "আল্লাহ তোমাকে তাঁর ইচ্ছামতো আকৃতিতে গঠন করেছেন।” (সূরা আল ইনফিতার: আয়াত ৮) পবিত্র হাদীসে উল্লেখ আছে— "তাদের অর্থাৎ শহীদদের রূহ সবুজ রঙের পাখির মতো।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই বাণীও একথা সমর্থন করে। ইমাম ইবনে হাযম (র)ও এটা সমর্থন করেছেন। উল্লেখিত হাদীসের মধ্যে দুটি শব্দই আছে, একটির অর্থ হলো, শহীদদের রূহ সবুজ রঙের পাখির পক্ষপুটে থাকে, অন্যটির অর্থ হলো, রূহ সবুজ রঙের পাখির পেটের মধ্যে থাকে। সহীহ মুসলিমের রেওয়ায়েতে— 'ফী আজওয়াফিন তাইরিন খুদরিন' এর উল্লেখ আছে, রূহ সবুজ রঙের পাখির পেটের মধ্যে থাকে। উহুদের যুদ্ধে শহীদগণ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "উহুদের যুদ্ধে যখন তোমাদের ভাইয়েরা নিহত হন, তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের রূহকে ঐ সমস্ত সবুজ পাখির পেটে রেখেছিলেন, যারা জান্নাতী নহরের উপর দিয়ে উড়ে জান্নাতী ফল-ফলাদি খায় এবং আরশের ছায়ায় ঝুলানো স্বর্ণের ঝাড়সমূহে বিশ্রাম নেয়।” (ইবনে আবী শাইবা) হযরত কা'ব (রা) থেকে বর্ণিত আছে: শহীদগণের রূহ সবুজ রঙের পাখির মধ্যে থাকে। (সুনানে আরবায়া, আহমদ) উপরোক্ত হাদীস শরীফ থেকে জানা গেল যে, শহীদদের রূহের বাহন হলো বেহেশতের সবুজ রঙের পাখি। এই অভিমত মেনে নিলে কুরআন ও হাদীসের সাথে কোনো বিরোধ থাকে না। শহীদগণ তাঁদের দেহ আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেন, এর বিনিময়ে তাঁদেরকে তাঁদের দুনিয়ার দেহ থেকেও উত্তম দেহ প্রদান করা হয়, আর এই দেহ তাঁদের রূহের বাহনের কাজ করে। এইভাবে শহীদগণ জান্নাতের মধ্যে উত্তম নিয়ামত ও আনন্দ উপভোগ করেন। তবে কিয়ামতের দিন তাঁদের রূহ দুনিয়ার দেহে ফিরিয়ে দেয়া হবে।
এই সব আলোচনা থেকে কেউ যেন পুনর্জন্মের ধোঁকা বা ভ্রান্তিতে না পড়েন। এছাড়া কাফির বা বিধর্মীগণ পুনর্জন্ম সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে, এটা সেরূপ কোনো ব্যাপার নয়। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে যা সঠিক তা সত্য এবং সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, সেটাকে বিশ্বাস ও গ্রহণ করতে হবে। পুনর্জন্মের ধারণার সাথে শহীদদের অবস্থানকে কোনোভাবেই তুলনা করা যায় না। আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী ও আসমায়ে হুসনার যেসব তথ্য শরীআতের দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত, সেসবকে যারা অস্বীকার করে এবং মনে করে আল্লাহ দেহ ধারণ করেন, তাদের এরূপ ভ্রান্ত ধারণার দ্বারা শরীআতের সুপ্রতিষ্ঠিত হাকীকতকে অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া আল্লাহ পাকের যেসব কার্যকারণ কুরআন ও হাদীসে উল্লেখ আছে, যেমন ইচ্ছে করলে তিনি কারো সাথে কথা বলেন, রাতের শেষ প্রহরে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন, কিয়ামতের দিন বিচারের জন্য আবির্ভূত হবেন, এসবই সঠিক ও সত্য। কেউ যদি এ অবস্থাকে আল্লাহ পাকের দেহ ধারণ করা অর্থে গ্রহণ করে তাহলে তা হবে চরম বিভ্রান্তি। এছাড়া শরীআতের বিধি-বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত যে, আল্লাহ পাক তাঁর সৃষ্টির সাথে রয়েছেন, আবার সৃষ্টি থেকে পৃথকও রয়েছেন, আরশের উপর সমাসীন আছেন, ফেরেশতা ও রূহ তাঁর কাছে উঠা নামা করেন, ভালো কথা ও ভালো আমল তাঁর কাছে পেশ করা হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র মি'রাজের রাতে আল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন, তাঁর নিকটবর্তী হয়েছিলেন, উভয়ের মধ্যে মাত্র দুই ধনু অথবা তার চেয়েও কম ব্যবধান বিদ্যমান ছিল। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে জাহমিয়া সম্প্রদায় বলে থাকেন, আল্লাহ দেহ ধারণ করেন এবং তাঁর উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম দিকও আছে। জাহমিয়া সম্প্রদায়ের এরূপ ধারণার দ্বারা আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলীকে অস্বীকার করা যায় না। এই সব বিষয় সম্পর্কে ইমাম আহমদ (র) বলেছেন, কোনো আপত্তিকারীর আপত্তির কারণে আল্লাহ তাআলার কোনো গুণাবলীকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। বিদআতীদের নিয়ম হলো, তারা আহলে সুন্নাত ও তাঁদের বক্তব্যকে এমনিভাবে আখ্যায়িত করে যা শুনলে অজ্ঞ লোকেরাও তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। যেমন, আল্লাহ হলেন, 'তারকীব' অর্থাৎ যৌগিক, 'তাজসীম' বা দেহধারী সত্তা। তারা আল্লাহ তা'আলার আরশকে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করে। এই সব আরবি শব্দের অর্থকে কেন্দ্র করে আল্লাহ যে তাঁর মাখলুকের সাথে রয়েছেন এবং আরশের উপরও যে আছেন তা বিদআতীরা অস্বীকার করে। তদ্রূপ রাফিযীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবাগণকে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদেরকে 'নাসিবী' বলে থাকে। আর কাদরিয়া সম্প্রদায় যারা ভাগ্যের ভালো মন্দের বিশ্বাস করে, তাদেরকে 'জাবরিয়া' বলে অভিহিত করে। আসলে, এসব উপাধিসূচক শব্দ এমন কিছু নয়, বাস্তবতার নিরিখে এর গুরুত্ব নিহিত রয়েছে। কাজেই এসব হাকীকত যে সত্য তা প্রমাণিত হওয়ার পর শহীদদের রূহ যে সবুজ পাখির মধ্যে থাকে, কেউ যদি এটাকে পুনর্জন্ম বা দেহান্তর হিসেবে অভিহিত করে তবে এর দ্বারা মূল অর্থ ব্যাহত হয় না।
পুনর্জন্ম হচ্ছে এমন একটি ধারণা যেটাকে বেদীনরা এবং ঐসব লোকেরা সমর্থন করে যারা নাস্তিক, আল্লাহ ও রাসূলের শত্রু এবং যারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনকে অস্বীকার করে। এদের ভ্রান্ত ধারণা হলো, রূহ দেহ থেকে পৃথক হওয়ার পর নিজ নিজ কর্মফল অনুযায়ী বিভিন্ন প্রাণী, কীট-পতঙ্গ ও পাখির দেহ ধারণ করে চক্কর দিতে থাকে এবং এভাবেই আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী অন্য দেহ ধারণ করে। অতঃপর তারা ঐ দেহ ছেড়ে নিজেদের কর্মফল, স্বভাব ও আচরণের দরুন আযাব ভোগ করে। এই আবর্ত থেকে তারা কখনো মুক্তি পায় না। কেননা তাদের ধারণা দুনিয়ার এই গোলক ধাঁধাঁ কখনো শেষ হবে না, মৃত্যুর পরবর্তী সময় বলতে কিছু নেই, আর দুনিয়ার কোনো শেষ নেই। এটাই হলো ঐ বাতিল পুনর্জন্মবাদ। এই পুনর্জন্মবাদ সকল নবী রাসূলগণের আকীদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। নবী রাসূলগণের আকীদা হলো, মৃত্যুর পর হাশরের দিন সকল মানুষ জীবিত হয়ে উঠবে। পুনর্জন্মবাদে যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে না। এই পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের নিকট রূহের অবস্থান হলো স্থূলদেহ থেকে পৃথক হওয়ার পর যথোপযুক্ত কোনো পশু-পক্ষীর দেহে সেই রূহ অবস্থান করে। এটা একটি অতিশয় ঘৃণিত ও ভ্রান্ত মতবাদ। এসব ভ্রান্ত ধারণা ঐসব লোকের যারা মনে করে, দেহের ন্যায় রূহও ধ্বংসপ্রাপ্ত ও বিলীন হয়ে যায়। আর তারা আযাব বা আরাম পাওয়ার মতো অবস্থায় থাকে না। তবে তাদের দেহে বা দেহের কোনো অংশের উপর আযাব বা আরাম হয়ে থাকে, সেটা মেরুদণ্ডের পেছনের হাড় হোক বা অন্য কোনো স্থান হোক। এছাড়া বাতিলপন্থীদের মতে রূহকে দেহের মধ্যে ফিরিয়ে দেয়া হয় না এবং দেহের সাথে রূহের কোনোই সম্পর্ক থাকে না, আযাব বা আরাম শুধুমাত্র রূহের উপরই হয়ে থাকে। ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, এই উভয় মত ভ্রান্ত এবং অগ্রহণযোগ্য। পবিত্র কুরআন ও হাদীস দ্বারা এটা সুস্পষ্ট যে, বরযখের আযাব বা আরাম দেহ ও রূহ উভয়ের উপরই হয়ে থাকে, একত্রে হোক বা পৃথকভাবে হোক।
রূহের অবস্থান কোথায়, এই প্রশ্নের জবাবে অনেক অভিমত, দলীল ও প্রমাণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসবের মধ্যে কোনটি অগ্রগণ্য বা বিশ্বাসযোগ্য তা জানা দরকার, যাতে করে মুসলিম জনগণ ঐ আকীদায় বিশ্বাসী হতে পারেন। আলমে বরযখে রূহের মর্যাদা অনুযায়ী তাদের অবস্থান স্থল ও স্তর ভিন্ন ভিন্ন। কোনো কোনো রূহের অবস্থান হবে উচ্চ স্থানেরও উচ্চে ইল্লিয়্যীনে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ শরীফে আম্বিয়ায়ে কিরামের মর্যাদা ও আবাসস্থল বিভিন্ন রকম দেখেছিলেন। কোনো কোনো রূহের অবস্থান ছিল সবুজ পাখির পক্ষপুটে, যারা বেহেশতের যেখানে খুশি উড়ে বেড়ায়। এসব হলো এক শ্রেণীর শহীদদের রূহ, সব শহীদদের রূহ নয়। কেননা কোনো কোনো শহীদদের রূহকে ঋণগ্রস্ত হওয়া বা অন্যান্য কোনো কারণে বেহেশতে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। মুসনাদ গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ জাহাশ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, কোনো এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি আল্লাহর রাস্তায় নিহত হই, তাহলে আমি কি প্রতিদান পাবো? ইরশাদ হলো, "তুমি বেহেশত লাভ করবে।” যখন সেই ব্যক্তি ফিরে যাচ্ছিল, তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার ইরশাদ করলেন, "শহীদের এই মরতবা সম্পর্কে এখনই আমাকে জিবরাঈল (আ) এসে জানালেন, এই মরতবা লাভ করবে ঐসব শহীদ যাঁরা ঋণগ্রস্ত নন।” আবার কোনো কোনো রূহকে বেহেশতের দরজায় আটকে রাখা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি তোমাদের এক সাথীকে দেখলাম, তাকে জান্নাতের ফটকে আটকে রাখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো রূহ বন্দী থাকে। চাদর চুরি সম্পর্কীয় একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, এক ব্যক্তি একটি চাদর চুরি করেছিল, তারপর সে শহীদ হয়ে গিয়েছিল। লোকেরা এই ব্যক্তিকে জান্নাতবাসী বলে মনে করেছিল। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে ইরশাদ করলেন, "আল্লাহর কসম, সে যে চাদরটি চুরি করেছিল, সেটি আগুনে পরিণত হয়ে তার কবরে প্রজ্বলিত হচ্ছে।” কোনো কোনো রূহ বেহেশতের দরজায় অবস্থান করবে। এই প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, শহীদগণ বেহেশতের ফটকের নিকটে নহরের কিনারায় সবুজ গম্বুজে অবস্থান করেন আর জান্নাত থেকে সকাল-সন্ধ্যায় তাঁদের খাবার আসে। (আহমদ) আরো উল্লেখ আছে যে, হযরত জাফর ইবনে আবূ তালিব (রা)-কে আল্লাহ তা'আলা তাঁর উভয় হাতের পরিবর্তে দুটি ডানা প্রদান করেছিলেন, যেগুলোর সাহায্যে তিনি জান্নাতে যেখানে খুশি উড়ে বেড়ান। আবার কোনো কোনো রূহ এই পৃথিবীতে আটক থাকে, ঊর্ধ্বলোকে যাওয়ার কোনো সুযোগ পায় না। কেননা এসব রূহ হলো নিম্ন স্তরের রূহ। এরা আসমানে অবস্থিত রূহের সাথে কখনো মিলিত হতে পারে না, যেমনি দুনিয়াতেও এই দুই শ্রেণীর রূহ একত্রিত হতে পারে না।
যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আল্লাহ তা'আলার মারিফাত, মুহব্বত, ভালোবাসা, নৈকট্য, অনুরাগ অর্জন করতে পারেনি এবং লোভ-লালসা ও পাপাচারে লিপ্ত ছিল, দেহ থেকে রূহ পৃথক হওয়ার পর সেই রূহ তার সমগোত্রীয় রূহের সাথে অবস্থান করে। পক্ষান্তরে, যে মহৎ ব্যক্তি দুনিয়ায় আল্লাহ পাকের ভালোবাসা, নৈকট্য ও গভীর প্রেমে বিভোর থাকেন, তাঁর রূহ দেহ থেকে পৃথক হওয়ার পর তাঁর সমশ্রেণীর উচ্চ মাকামের রূহের সাথে মিলিত হয়। আসলে, কিয়ামতের দিন ও আলমে বরযখে একজন মানুষ তার সাথেই অবস্থান করবে যার সাথে দুনিয়ায় তার ভালোবাসার সম্পর্ক গভীর ছিল। আল্লাহ তা'আলা বরযখে ও কিয়ামতের দিন সমমর্যাদাসম্পন্ন রূহকে একত্রিত করে দেবেন। অর্থাৎ পবিত্র রূহ পবিত্র রূহের সাথে, আর অপবিত্র রূহ অপবিত্র রূহের সাথে অবস্থান করবে। অনেক যিনাকার নর-নারীর রূহ জ্বলন্ত চুলার মধ্যে থাকবে, অনেকের রূহ রক্তের নদীতে সাঁতার কাটবে এবং তাদের মুখের মধ্যে পাথর ঠেসে দেয়া হবে। মোট কথা, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রূহ ইল্লিয়্যীনের উচ্চস্তরে অবস্থান করে, আর নিকৃষ্ট শ্রেণীর রূহ যমীনের নিচে সিজ্জীনে থাকে, এখান থেকে আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কোথাও যেতে পারে না। এই সব আলোচনা প্রসঙ্গে যে সব হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে তা সবই সহীহ। এই সব হাদীসের মধ্যে কোনো মতবিরোধ বা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই এবং একটি অপরটির সহায়ক।
রূহের অবস্থাকে দেহের অবস্থার মতো অনুমান করা ঠিক নয়। কারণ নেককারদের রূহ বেহেশতে থাকা অবস্থায়ও আসমানে, কবরের আঙিনায় এবং আপন দেহের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে। এছাড়া রূহ ঊর্ধ্বে গমনে ও নিম্নে অবতরণে অতিশয় দ্রুতগতি সম্পন্ন হয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো রূহ মুক্ত, কোনো কোনো রূহ বন্দী, কোনো কোনো রূহ উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এবং কোনো কোনো রূহ নিম্ন মর্যাদাসম্পন্ন। দেহ থেকে একটি রূহ পৃথক হওয়ার পর এর সুখ বা দুঃখ, শান্তি বা অশান্তি সবকিছুর প্রতিক্রিয়া রূহের উপর তেমনি বা তার চেয়ে অনেক বেশি পড়ে, যেমনি পড়ত দুনিয়ায় দেহের সাথে তার সংযুক্ত থাকা অবস্থায়। অর্থাৎ আত্মার জগতেও রূহের যেমন দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা ও হাহাকার রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে সুখ, সম্ভোগ, আরাম ও আয়েশ। দেহে থাকাকালীন একটি রূহের অবস্থা, ভ্রূণে থাকাকালীন একটি শিশুর অবস্থা এবং দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া রূহের অবস্থার সাথে একটি শিশুর বেশ মিল রয়েছে।
রূহের নিবাস হলো চারটি। একটি নিবাস অন্য একটি নিবাসের চেয়ে আকারে অনেক বড়। প্রথম নিবাসটি হলো মাতৃগর্ভে, যা সীমাবদ্ধ, সংকীর্ণ, অন্ধকার ও তিন ধরনের পর্দায় ঘেরা। দ্বিতীয় নিবাসটি হলো দুনিয়া, যেখানে রূহ মানবরূপে জন্মলাভ করে, বর্ধিত হয়, প্রেম-ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয় এবং পাপপুণ্য, ভালোমন্দ, সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য অর্জন করে। আর তৃতীয় নিবাসটি হলো বরযখ। এই নিবাসটি দুনিয়া থেকে বিরাট ও বহু প্রশস্ত। চতুর্থ নিবাসটি হলো আখিরাত, অর্থাৎ জান্নাত বা জাহান্নাম। এরপরে আর কোনো মঞ্জিল নেই। আল্লাহ তা'আলা ক্রমান্বয়ে তাঁর বান্দাকে এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানের দিকে নিয়ে যান এবং এইভাবে সর্বশেষে মঞ্জিল আখিরাতে পৌঁছে দেন। মানুষকে সৃষ্টি করার মূল উদ্দেশ্য হলো আখিরাতের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য লাভ করা। প্রত্যেকটি মঞ্জিলের অবস্থা ও বিধি-বিধান স্বতন্ত্র। তাঁরাই ধন্য ও সৌভাগ্যবান যাঁরা দুনিয়াতে আখিরাতের সম্বল অর্জন করেন আর দুর্ভাগ্যের কণ্টক থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখেন। আল্লাহর একত্ব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য ও অনুসরণ, লোভ-লালসা থেকে নিজেকে রক্ষা করলে এই সৌভাগ্য লাভ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, শরীআতের বিধি-বিধানই সত্য ও সঠিক আর এর পরিপন্থী সবকিছুই মিথ্যা, ভুল ও ভ্রান্ত।