📘 রূহের রহস্য > 📄 কবরের আযাব স্থায়ী না সাময়িক

📄 কবরের আযাব স্থায়ী না সাময়িক


কোন কোন ক্ষেত্রে কবরের আযাব স্থায়ী হয়, আবার সাময়িকও হয়। এক. স্থায়ী কবরের আযাব বলতে ঐ আযাবকে বুঝায়, যা মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে ইসরাফীল (আ)-এর শিঙ্গায় প্রথম ফুঁ দেয়া পর্যন্ত চালু থাকবে। কোন কোন হাদীসে উল্লেখ আছে, শিঙ্গায় দুটি ফুঁ এর মধ্যবর্তী বিরতির সময় কবরের আযাব লাঘব করা হবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, আর তখন তারা নিজেদের পালনকর্তার সমীপে উপস্থিত হওয়ার জন্য নিজেদের কবর থেকে বের হয়ে আসবে। তারা ভীত-শঙ্কিত হয়ে বলবে, হায়! আমাদের দুর্ভোগ, কে আমাদেরকে আমাদের শয়নগাহ থেকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলো? এটা সেই জিনিস, দয়াময় আল্লাহ যার ওয়াদা করেছিলেন। আর নবী রাসূলগণের কথা তো সঠিকই ছিলো। একটি মাত্র প্রচণ্ড শব্দ হবে, আর সকলকেই আমার সামনে উপস্থিত করা হবে।" (সূরা ইয়াসীন: আয়াত ৫১-৫৩)

নিম্নোক্ত আয়াতটিও কবরের আযাব যে স্থায়ী তা প্রমাণ করে— "অতঃপর আল্লাহ তাঁকে তাদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফিরআউন গোত্রকে শোচনীয় আযাব গ্রাস করলো। সকাল ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে ফিরআউন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল করো।" (সূরা আল মুমিন: আয়াত ৪৫-৪৬)

এছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বপ্ন সম্পর্কীয় একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, "তাদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত এ রকম শাস্তি হতে থাকবে।" (বুখারী) দুটি কবরের উপর খেজুরের দুটি তাজা ডাল পুঁতে দেয়া সম্পর্কীয় হাদীসে আছে— হয়তো ঐ ডাল শুকানো পর্যন্ত কবরের আযাব বন্ধ থাকবে। এ হাদীসে তাজা ডালের সজীবতা দূর হওয়ার শর্ত উল্লেখ রয়েছে। সজীবতা দূর হয়ে গেলে আবার কবরের আযাব শুরু হবে। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে আরো উল্লেখ আছে, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কিছু লোকের নিকট আসলেন, যাদের মাথা পাথর দ্বারা চূর্ণবিচূর্ণ করা হচ্ছিলো এবং চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার পরক্ষণে আবার সেগুলো ঠিক হয়ে যাচ্ছিলো। তাদেরকে এভাবেই সবসময় আযাব দেয়া হচ্ছিলো। অন্য একটি সহীহ হাদীসে ঐ লোকটির ঘটনা বর্ণিত আছে, যে লোকটি দুখানা চাদর পরে গর্ব সহকারে চলাফেরা করতো, আল্লাহ তাআলা তাকে মাটির নিচে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে মাটির নিচে প্রবেশ করতে থাকবে।

হযরত বারা ইবনে আযিব (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে কাফির সম্পর্কে উল্লেখ আছে যে, তারপর তার জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হয় আর জাহান্নামে সে নিজের স্থান দেখে নেয়। এই অবস্থা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এই হাদীসের এক সনদের মাধ্যমে একথাও উল্লেখ রয়েছে যে, তারপর তার জন্য জাহান্নামের একটি ছিদ্র খুলে দেয়া হয়, যার মাধ্যমে তার নিকট জাহান্নামের ধোঁয়া ও উত্তাপ কিয়ামত পর্যন্ত আসতে থাকবে।

দুই. কবরের সাময়িক আযাব হবে তাদের জন্য যারা সাধারণ গুনাহগার বান্দা। ঐ গুনাহের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা আযাব ভোগ করবে, তারপর তার আযাব বন্ধ হয়ে যাবে এবং সে রেহাই পেয়ে যাবে। কবরের এরূপ সাময়িক আযাব, সওয়াব রেসানী অর্থাৎ দুআ, সাদকাহ, ইসতিগফার, হজ্জ, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি নেক কাজের মাধ্যমে মাফ হয়ে যায়। মৃত ব্যক্তিদের আপনজনের পক্ষ থেকে ঐসব নেক কাজ করে মৃতদের জন্য সওয়াব পৌঁছালে তা তাদের নিকট পৌঁছে যায়। যেমন দুনিয়াতে কাউকে শাস্তি দেয়ার হুকুম হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে সুপারিশের মাধ্যমে সে ছাড়া পেয়ে যায়। এসব সুপারিশের ক্ষেত্রে কোন পূর্ব অনুমতির প্রয়োজন হয় না।

কোন সুপারিশকারী আল্লাহর অনুমতি নিয়েই আল্লাহর দরবারে হাজির হবে। আল্লাহ তাআলার অনুমতি ছাড়া কেউ তাঁর কাছে কোন সুপারিশ করতে পারে না। তাই আল্লাহ তাআলা যখন কারো প্রতি রহম করতে চান তখন তিনি নিজেই সুপারিশকারীকে তার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি প্রদান করেন। সুতরাং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা এরূপ সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন। আল্লাহ ছাড়া মানুষেরা যে নানারকম মনগড়া সুপারিশকারী ঠিক করে রেখেছে, তা সবই বাতিল ও শিরক। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "সে কে, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে? তাদের সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু রয়েছে, সেসবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে কেউ কোন কিছু আয়ত্ত করতে পারো না, তবে তিনি যতোটুকু ইচ্ছা করেন। আকাশ-পৃথিবী সর্বত্র তাঁর আসন পরিব্যাপ্ত। এদের হিফাযত তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনিই সর্বোচ্চ মহামর্যাদাশীল।" (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত-২৫৫)

"তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। তাঁরা শুধু তাদের জন্য সুপারিশ করেন, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত।" (সূরা আম্বিয়া: আয়াত-২৮)

"তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে তাঁর সুপারিশ করার কেউ নেই। ইনিই আল্লাহ, তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তাঁর ইবাদত করো। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করো না?" (সূরা ইউনুস: আয়াত-৩)

"যার জন্য অনুমতি দেয়া হয়, সে ব্যতীত আল্লাহর কাছে অন্য কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে, তখন তারা পরস্পর বলবে, তোমাদের পালনকর্তা কি বলেছে? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনিই সবার উপরে মহান।" (সূরা সাবা: আয়াত-২৩)

"বলুন, সমস্ত সুপারিশ আল্লাহরই ক্ষমতাধীন, আসমান ও যমীনে তাঁরই সাম্রাজ্য। অতঃপর তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।" (সূরা আয-যুমার: আয়াত-৪৪)

সুপারিশের কারণে যে কোন মৃত ব্যক্তি কবরের আযাব থেকে মুক্তি পেতে পারে, সে সম্পর্কে একটি হাদীসে এখানে উল্লেখ করা হলো— হযরত ইবনে নাফি (র) কর্তৃক বর্ণিত আছে, একজন মদীনাবাসী মারা গেলে তাঁকে কোন একব্যক্তি স্বপ্নে দেখলেন, তিনি জাহান্নামে আছেন। তা দেখে তিনি খুবই দুঃখিত হলেন। কিছুদিন পর তিনি আবার তাঁকে স্বপ্নে দেখলেন, তিনি জান্নাতে আছেন। তখন তিনি সেই কবরবাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জাহান্নামী ছিলে না? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, ঘটনা তাই ছিলো। কিন্তু আমাদের পাশে একজন নেককার বান্দাকে সমাহিত করা হয়েছে। তিনি তাঁর পার্শ্ববর্তী চল্লিশজন লোকের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁর সুপারিশ কবুল করেছিলেন। আর আমি হচ্ছি ঐ চল্লিশজনের একজন।

কবরের আযাব থেকে মুক্তি প্রসঙ্গে হযরত আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া (র) বলেন, আমাদের এক সঙ্গী বলেছেন, তাঁর এক ভাই মারা গেলে পর তিনি একবার তাকে স্বপ্নে জিজ্ঞেস করলেন, দাফনের পর কবরে তুমি কি অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলে? তিনি বললেন, ফেরেশতারা আগুনের গোলা নিয়ে আমার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। ঐ সময় আপনাদের দুআর কারণে আমি বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। (ইবনে আবিদ দুনিয়া) এই প্রসঙ্গে হযরত আমর ইবনে জরীর (র) বলেন, যখন কোন ব্যক্তি তাঁর কোন মৃত ভাইয়ের জন্য দুআ করেন তখন ঐ দুআকে একজন ফেরেশতা কবরে নিয়ে যান এবং বলেন, হে বিপদগ্রস্ত কবরবাসী, এই নাও, তোমার দয়ালু ভাইয়ের নিকট থেকে প্রেরিত হাদিয়া। এতে জানা গেলো দুআর বরকতে মৃত ব্যক্তিরা কবরে উপকৃত হন।

হযরত বাশশার ইবনে গালিব (র) থেকে বর্ণিত আছে যে, আমি হযরত রাবিআ বসরী (র)-এর জন্য অনেক দুআ করতাম, একদিন আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি বললেন, তোমার হাদিয়া নূরানী বর্তনে রেখে ও রেশমী রুমাল দিয়ে ঢেকে আমার নিকট আনা হয়। আমি বললাম, সেটা কিভাবে? তিনি বললেন, যখন জীবিত মুমিন ব্যক্তি মৃতদের জন্য দুআ করেন, আর সে দুআ আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়, তখন ঐ দুআ নূরানী বর্তনে নিয়ে রেশমী রুমাল দিয়ে ঢেকে যার জন্য দুআ করা হয়েছে তার নিকট ফেরেশতারা নিয়ে আসেন। আর মৃত ব্যক্তিকে বলা হয়, এসব আপনার নিকট অমুক ব্যক্তি হাদিয়াস্বরূপ পাঠিয়েছেন।

হযরত আবূ উবায়েদ (র) ইবনে বুহাইর (র) থেকে বর্ণিত আছে, আমার এক সাথী সওয়াব রেসানী সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তাঁর এক মৃত সাথী ভাইকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, জীবিতদের দুআ কি আপনাদের নিকট পৌঁছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম, সে দুআ নূরানী মিহির রেশমী কাপড়ের দ্বারা ঢেকে ফেরেশতারা নিয়ে আসেন, আর মৃত ব্যক্তি সেটা আনন্দের সাথে গ্রহণ করেন। (ইবনে আবিদ দুনিয়া) "জীবিতদের প্রেরিত হাদিয়া দ্বারা যে মৃতদের উপকার হয়" এই সম্পর্কে পরবর্তীতে আরো আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00