📄 কবরে কি শিশুদেরকেও সওয়াল-জওয়াব করা হয়
কেউ কেউ বলেন, শিশুদেরকেও কবরে সওয়াল-জওয়াব করা হয়, আবার কেউ কেউ বলেন, তাদেরকে সওয়াল-জওয়াব করা হয় না। ইমাম আহমদ (র)-এর অনুসারীরা এই দু'টি অভিমতেই বিশ্বাসী। যাঁরা কবরে শিশুদের সওয়াল-জওয়াবে বিশ্বাসী তাঁদের প্রমাণ হলো এই যে, শিশুদের জন্য জানাযার নামায আদায় করা জরুরি এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করা হয়, "হে আল্লাহ! এদেরকে কবরের আযাব ও কবরের ফিতনা থেকে রক্ষা করুন।” হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত: একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শিশুর জানাযার নামায পড়লেন, আর উক্ত শিশুটির জন্য দু'আ করলেন— “হে আল্লাহ, একে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করুন।" হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই দু'আ করতে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) নিজেই শুনেছেন। [মুয়াত্তা ইমাম মালিক (র)]
হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা)-এর নিকট দিয়ে একবার একটি শিশুর জানাযা বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তিনি জানাযাটি দেখে কাঁদতে লাগলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, শিশুটি এখন কবরে মাটির চাপের সম্মুখীন হবে, তাই তার জন্য আমার স্নেহের উদ্রেক হলো আর অশ্রু ঝরতে লাগলো। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) নিষ্পাপ শিশুদের জানাযার নামাযে বলতেন, “হে আল্লাহ, একে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করুন।" শিশুদেরকেও কবরে সওয়াল-জওয়াবের সম্মুখীন হতে হবে, তাঁরা এই অভিমত পোষণ করতেন।
এইরূপ অভিমত পোষণকারীরা বলে থাকেন, আল্লাহ তা'আলা কবরে শিশুদের জ্ঞান পরিপূর্ণ করে দেন, যাতে তারা ইসলামী বা ইসলাম বিরোধী বিষয়ের পরিচয় লাভ করতে পারে এবং সেই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অন্তরে প্রশ্নের জবাব উদ্রেক করে দেয়া হয়। এরূপ মতাবলম্বীরা আরো বলে থাকেন যে, অনেক হাদীসের দ্বারা জানা যায় যে, শিশুদেরকে আখিরাতে পরীক্ষা করা হবে। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে কবরে তাদেরকে পরীক্ষা করার জটিলতা কোথায়, এটাই স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত।
আর যাঁরা কবরে শিশুদের সওয়াল-জওয়াবের কথা স্বীকার করেন না, তাঁরা বলে থাকেন, সওয়াল-জওয়াব তাকেই করা হয়, যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর শরীআত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, তাহলে সে বলতে পারবে, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান এনেছিলো কিনা এবং তাঁকে অনুসরণও করেছিলো কিনা। কিন্তু শিশুদের তো এ সম্পর্কে কোন জ্ঞান বা অনুভূতি নেই। সুতরাং তাঁদের মতে শিশুদেরকে কবরে সওয়াল-জওয়াবের কোন প্রশ্নই উঠে না। তাকেই শুধু এরূপ প্রশ্ন করা যায়, “তুমি তাঁর সম্পর্কে কি বলো? যাঁকে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিলো?” যদি কবরে শিশুদের জ্ঞান পরিপূর্ণ করে দেয়া হয়, তাহলেও শিশুদের নিকট এসব বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা অর্থহীন। এছাড়া মৃত শিশুরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও দীন সম্পর্কে কোন জ্ঞান রাখে না। শিশুদেরকে এরূপ প্রশ্নের দ্বারা তাদের উপকারের কোন অবকাশ নেই। তবে শিশুদেরকে আখিরাতে কোন প্রশ্ন করা হবে কিনা, এরূপ প্রশ্ন করা অবান্তর। কেননা আখিরাতে আল্লাহ পাক শিশুদেরকে রাসূলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার হুকুম করবেন। আর তাদের জ্ঞানও পরিপূর্ণ করে দেবেন, তাদের মধ্যে যারা আনুগত্য প্রকাশ করবে তারা নাজাত পাবে, আর যারা আনুগত্য প্রকাশ করবে না তারা জাহান্নামে যাবে।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে শিশুদের কবরের আযাব বলতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ না করা বা গুনাহের কাজ করার শাস্তি বুঝায় না। কারণ আল্লাহ তা'আলা কোন নির্দোষ ব্যক্তিকে শাস্তি দেন না। যেহেতু শিশুরা মাসূম, তাই তাদের কবরে কোন শাস্তি হয় না। তবে কবরের আযাব অন্য কারণে হয়ে থাকে। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “গৃহবাসীদের ক্রন্দনের কারণে মৃতদের আযাব হয়।” অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি অশান্তি ভোগ করে। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, "কারো বোঝা কেউ বহন করবে না।" (সূরা ফাতির: আয়াত-১৮)
তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— "প্রবাস হচ্ছে আযাবের অর্থাৎ দুঃখের একটি টুকরো।" এতে জানা গেলো, 'আযাব' শব্দটি এখানে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। নিঃসন্দেহে, কবরের দুঃখ যন্ত্রণা ও অশান্তি অনেক বেশি, যার দ্বারা শিশুরাও আক্রান্ত হয় এবং তারা তা অনুভব করে। এ জন্য যাঁরা জানাযা নামায পড়েন তাঁদের জন্য সুন্নাত হলো— নিষ্পাপ শিশুরাও যাতে কবরের আযাব থেকে রক্ষা পায়, তাঁরা যেন সেজন্য দু'আ করেন।