📄 মুনকার-নাকীরের সওয়াল-জওয়াব কি কেবল শেষ নবীর উম্মতের জন্য, নাকি অন্য সকল নবীর উম্মতের জন্যও ছিলো
এটি একটি বিতর্কিত বিষয়। একশ্রেণীর আলিমের মতে মুনকার-নাকীরের সওয়াল কেবল শেষ নবীর উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট। আগেকার যামানার রাসূলগণ আসার পর উম্মতেরা যখন তাঁদেরকে অস্বীকার করতো, তখন তাঁরা নিরূপায় হয়ে তাদের থেকে সরে যেতেন এবং ঐসব লোকের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হতো আর তারা ধ্বংস হয়ে যেতো, তবে তারা আলমে বরযখের শাস্তি থেকে রেহাই পেতো না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাহমাতুল্লিল আলামীন রূপে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, “আমি আপনাকে সমস্ত আলমের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।” (সূরা আম্বিয়া : আয়াত-১০৭)
যারা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল হিসেবে অস্বীকার করে, আল্লাহ তাদের জন্য উপরোল্লিখিত শাস্তি স্থগিত রেখেছেন এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হয়েছে। আর আল্লাহ মুসলমানদেরকে জিহাদের জন্য উৎসাহিত করেছেন, যাতে মানুষ আল্লাহর দীনে প্রবেশ করে আর তাদের অন্তরে ঈমান সুদৃঢ় হয়। এভাবেই মুনাফিক সৃষ্টি হয়েছে। মুনাফিকরা তাদের অন্তরে কুফুরী গোপন রাখতো আর বাহ্যিকভাবে তারা মুমিন সাজতো। তাই জীবদ্দশায় মুসলমানদের কাছে তাদের প্রকৃত অবস্থা গোপন থাকতো, তবে তারা যখন মৃত্যুবরণ করতো তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রকৃত অবস্থা উদঘাটনের জন্য মুনকার-নাকীরকে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী, তাদেরকে আল্লাহ এক প্রতিষ্ঠিত প্রমাণিত কথার ভিত্তিতে পার্থিব জীবনে ও পরকালে সুদৃঢ় রাখবেন। আর আল্লাহ যালিমদেরকে পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।” (সূরা ইবরাহীম : আয়াত-২৭)
হযরত আবদুল আশবীলী ও কুরতুবীর অভিমত হলো, উম্মতে মুহাম্মদীর ন্যায় অন্যান্য নবীর উম্মতকেও মুনকার-নাকীরের সওয়ালের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো।
হযরত ইবন আবদুল বার (র) প্রমুখ উপরোক্ত বিষয়ে কোন চূড়ান্ত মতামত প্রকাশে দ্বিধান্বিত। তাঁরা বলেন, হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা)-এর হাদীসে উল্লেখ আছে—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতকে তাদের কবরে পরীক্ষা করা হবে। অপর একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে—এই উম্মতকে সওয়াল করা হবে। এসব বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, কবরের সওয়াল-জওয়াব তাঁর উম্মতদের জন্য নির্দিষ্ট। তবে এই অভিমতটি যে সঠিক ও সত্য সেটা সুদৃঢ়ভাবে বলা যায় না।
এছাড়া এ সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট অভিমতও ব্যক্ত করা যায় না যে, শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের জন্যই কেবল কবরের সওয়াল-জওয়াব নির্দিষ্ট। তবে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা)-এর বর্ণিত হাদীস দ্বারা এর প্রমাণ পেশ করা হয়ে থাকে। আর এই উক্তির দ্বারা এ কথাও প্রমাণিত হয় না যে, "আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়েছে, তোমরা তোমাদের কবরে পরীক্ষিত হবে।"
এছাড়া ফেরেশতাদের উক্তি, "ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার মত কি যাঁকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে?” মুমিন ব্যক্তি জবাব দেয়, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। এ কথা ঐ বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত বহন করে, কেননা মৃত ব্যক্তি উত্তরে নিজ নবীকে আল্লাহর রাসূল বলে উল্লেখ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, আমার সম্পর্কে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে এবং প্রশ্নও করা হবে। এটাও তাঁর বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ। যাঁরা এ বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করেন, তাঁরা এর উত্তর দিয়েছেন যে, এসব কথার দ্বারা এই উম্মতের অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হয় না। এই উম্মত শব্দ দ্বারা হয়তো সমগ্র মানব জাতিকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "যমীনের উপর বিচরণশীল কোন জন্তু এবং বাতাসে ডানার সাহায্যে উড়ন্ত কোন পাখিই দেখো, এরা তোমাদের মতোই বিচিত্র জাতি-প্রজাতি, আমরা এদের নিয়তি নির্ধারণ করায় কোন ত্রুটি রাখিনি। শেষ পর্যন্ত এদের সকলকেই তাদের রবের দিকে একত্রিত করে উপস্থিত করা হবে।" (সূরা আনআম: আয়াত-৩৮)
হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে, "কুকুরগুলো যদি অন্য উম্মতের মতো উম্মত না হতো, তাহলে আমি তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিতাম।" অন্য একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, একদা একজন নবীকে পিঁপড়া দংশন করেছিলো। সেজন্য তাঁর নির্দেশে পিঁপড়ার সমস্ত আস্তানা জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তখন আল্লাহ তা'আলা সেই নবীর কাছে এই মর্মে ওহী পাঠিয়েছিলেন—তুমি একটি পিঁপড়া দংশনের কারণে আল্লাহ তা'আলার গুণগানকারী এক শ্রেণীর উম্মতকে পুড়িয়ে মেরে ফেললে। এখানে এই উম্মত বলতে উম্মতে মুহাম্মাদিয়াকে বুঝানো হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে অন্য কোন উম্মতকে সওয়াল-জবাবের সম্মুখীন হতে হবে না, এটা অপরিহার্য নয়। বরং তাদের আলোচনা এ জন্য করা হয়েছে যে, তাদেরকে কবরের সওয়াল-জওয়াবের খবর জানানো হয়েছে একারণে উম্মতে মুহাম্মদী আগেকার উম্মতের সাথে সম্পর্কিত নন। কেননা এই উম্মত অন্যান্য উম্মতের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। এর উপর ভিত্তি করেই অন্যান্য প্রমাণাদি অনুমান করতে হবে।
অবশ্য একথা আলোচনা সাপেক্ষ যে, “এই ব্যক্তি” সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে মৃত ব্যক্তি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম উল্লেখ করে, একথা সঠিক নয়। কেননা প্রত্যেক উম্মতের মৃত ব্যক্তিরা তাদের আপন নবীর নাম উল্লেখ করতেন। হাদীসের মধ্যে কোন নবীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। বরং এ কথার উল্লেখ আছে যে, “তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।” যখন আখিরাতের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রমাণ পেশ করার পর প্রত্যেক উম্মতের উপর আযাব হবে, তাহলে আলমে বরযখে সওয়াল-জওয়াব খুবই স্বাভাবিক ও সমীচীন। আর এটাই হলো সঠিক উত্তর।