📘 রূহের রহস্য > 📄 কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়

📄 কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়


কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হলো- মানুষ যেন রাতে নিদ্রা যাওয়ার পূর্বে সারাদিন যে কর্মকাণ্ড করেছে সে সম্বন্ধে কিছু চিন্তা-ভাবনা করে, ভালোমন্দ হিসাব-নিকাশ করে দেখে, কোন গুনাহের কাজ করে থাকলে আল্লাহর নিকট অনুতপ্ত চিত্তে তাওবাহ করে আর দৃঢ় সঙ্কল্প গ্রহণ করে বাকী জীবনে যেন সে আর কোন গুনাহের কাজে লিপ্ত না হয়। এভাবে তাওবাহ করে নিদ্রা যাবে। যদি এরূপ কোন অনুতপ্ত ব্যক্তি সে রাতে মারা যান, তবে তাওবাহর অবস্থায়ই তিনি মারা গেলেন বলে গণ্য হবেন। আর তিনি যদি জীবিত থাকেন তাহলে তা হবে নেক আমল করার জন্য একটি পরম সুযোগ ও সৌভাগ্য। এছাড়া এটাও মনে করতে হবে যে, মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁর নেক আমল করার জন্য আরেকটি দিন বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। এরূপ বান্দার নেক আমল আল্লাহর পবিত্র দীদার লাভের সহায়ক হয় একজন বান্দার জন্য এরূপ নিদ্রার চেয়ে অধিক বরকতময় ও কল্যাণকর আর অন্য কোন আমল হতে পারেনা। এরূপ নিদ্রিত ব্যক্তি ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর যিকির আযকার করতে থাকে এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণিত দু'আ-দরূদ পড়তে থাকে।

এই প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কতিপয় হাদীস শরীফ এখানে উল্লেখ করা হলো: এক. আল্লাহর রাস্তায় একদিন সীমানা পাহারা দেয়া একমাসের রোযা রাখা ও রাত্রে জেগে ইবাদত করার চেয়ে উত্তম। পাহারারত অবস্থায় যদি ঐ ব্যক্তি মারা যায় তাহলে সে নেক কাজ করার অবস্থায় থাকবে, তার রিযকও বন্ধ হবেনা আর কবরের সমস্ত ফিতনা থেকেও সে বেঁচে যাবে। (মুসলিম) দুই. প্রত্যেক ব্যক্তির আমল তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু আল্লাহর পথে পাহারায় নিযুক্ত থাকা অবস্থায় মৃত্যু হলে, তার সে আমল কেয়ামত পর্যন্ত জারী থাকে এবং কবরের ফিতনা থেকে সে রক্ষা পায়। (তিরমিযী) তিন. এক ব্যক্তি কোন এক সময়ে হুযুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে আরয করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, শহীদগণ ছাড়া আর সকল মুমিন বান্দাকে কবরে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়, এর কারণ কি? ইরশাদ হলো, শহীদদের মাথার উপর তরবারীর ঝলকানি তাদের পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট। (নাসায়ী) চার. আল্লাহ তা'আলার নিকট শহীদদের ছয়টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যথা: (ক) একজন শহীদের রক্ত ঝরার সাথে সাথেই তাঁর গুনাহ মাফ হয়ে যায় এবং তাঁর জান্নাতী বাসস্থান তিনি দেখতে পান। (খ) তিনি কবরের আযাব থেকে রক্ষা পান। (গ) তিনি কিয়ামতের ভয়-ভীতি থেকে নিরাপদ থাকেন। (ঘ) তাঁর মাথার উপর মানসম্মানের মুকুট শোভা পায় যার এক একটি ইয়াকৃত দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে শ্রেয়। (ঙ) বড় বড় চোখ বিশিষ্ট বাহাত্তর জন হুরের সাথে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। (চ) সত্তরজন নিজ আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য তিনি সুপারিশ করতে পারেন। (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ)

পাঁচ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: জনৈক সাহাবী অজ্ঞাতসারে কোন এক কবরের উপর তাঁবু তৈরি করলেন। তখন কবরের ভেতর থেকে সূরা মুলক পড়ার শব্দ শুনা গেলো। ঐ কবরবাসী এই সূরার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন। তিনি হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে এসে এই ঘটনা বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই পবিত্র সূরা কবরের আযাব থেকে রক্ষাকারী ও মুক্তিদানকারী। (তিরমিযী)

ছয়. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) কোন এক ব্যক্তিকে এক সময় বলেছিলেন, তোমাকে কি তোহফা হিসেবে একটি হাদীস শুনাবো যা শুনে তুমি খুবই আনন্দিত হবে? সে ব্যক্তি বললো, অবশ্যই শুনাবেন। তখন তিনি বললেন, তুমি সূরা মুলক তিলাওয়াত করবে, এই সূরাটি তুমি মুখস্থ করো, তোমার স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে, আর তোমার পরিবারের অন্যান্য লোকজন ও পাড়া প্রতিবেশী সকলকেও মুখস্থ করিয়ে দাও। কেননা এই সূরাটি (কবরের আযাব থেকে) মুক্তি প্রদানকারী ও প্রতিরোধকারী। এছাড়া এই পবিত্র সূরাটি কিয়ামতের দিন পাঠকারীর জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে। সেই ব্যক্তি যদি জাহান্নামী হয়, তাহলেও এই সূরা আল্লাহ পাকের নিকট জাহান্নাম থেকে তার মুক্তির দরখাস্ত করবে। আল্লাহ তা'আলা এই সূরার বরকতে তাকে কবরের আযাব থেকেও রক্ষা করবেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেছেন, আমার ইচ্ছা যে, সূরা মুলক আমার উম্মাতের প্রত্যেকেরই মুখস্থ থাকুক। (আবদে ইবনে হামীদ)

সাত. একটি সহীহ হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ত্রিশ আয়াত বিশিষ্ট এই সূরা (মুলক) যে পাঠ করবে তাকে এই সূরা এরূপ সুপারিশ করবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে মাফ করে দেবেন। (イবনে আবদুল বার)

আট. যে ব্যক্তি পেটের অসুখে বা কলেরায় মারা যাবে, সেই ব্যক্তি শহীদের মর্যাদা লাভ করবে এবং কবরের আযাব থেকে রক্ষা পাবে এবং তার নিকট সকাল-সন্ধ্যা জান্নাত থেকে রিযক আসতে থাকবে। (ইবনে মাজাহ) নয়. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াশকার (রা) বলেছেন, আমি সুলাইমান ইবনে সারদ ও খালিদ ইবনে আলফাতাহর নিকট একদিন বসা ছিলাম, তখন লোকেরা এসে বললো, এক ব্যক্তি পেটের অসুখে মারা গেছেন। এঁরা দুইজন তাঁর জানাযায় শরীক হতে চাইলেন। একজন বললেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেননি, যে ব্যক্তি উদরাময় রোগে মারা যাবে তার কবরে কোন আযাব হবে না। (নাসায়ী) দশ. আবূ দাউদ তায়ালিসীতে এই হাদীসটি সম্পর্কে এতোটুকু অধিক বর্ণিত আছে যে, দ্বিতীয় ব্যক্তি উত্তরে বলেছিলেন, "কেন নয়”?

এগার. যে মুসলমান জুমুআর দিনে বা রাতে মৃত্যুবরণ করবেন, আল্লাহ তা'আলা তাকে কবরের ফিতনা থেকে রক্ষা করবেন। (তিরমিযী) তবে এই হাদীসের সনদ মুত্তাসিল বা ধারবাহিকতা বিশিষ্ট নয়। কেননা রাবীয়া (রা) নামক জনৈক সাহাবী ইবনে আমর (রা)-এর কাছ থেকে যে এই হাদীসটি শুনেছেন, সেটার কোন প্রমাণ নেই। অন্য এক বর্ণনায় আছে-রাবীয়া (রা) এবং ইবনে আমর (রা)-এর মধ্যে আয়ায ইবনে উকবাহ ফাহদরী (রা)ও রয়েছেন। (তিরমিযী) হাফিয আবু নায়ীম (র) এই মারফু হাদীসটি মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির (র) থেকে আর তিনি হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। যেই ব্যক্তি জুমুআর রাত্রে বা দিনে মৃত্যুবরণ করে, তাঁকে কবরের আযাব থেকে রেহাই দেয়া হয়। আর কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি এমনভাবে উঠবে যে, তাঁর মধ্যে শাহাদাতের সীলমোহর লেগে থাকবে। কিন্তু উপরোক্ত ভাষ্যে উমর ইবনে মূসা ওয়াজিহী মাদানী একক বর্ণনাকারী মাত্র। এছাড়া ইনি রাবী হিসেবে দুর্বল।

"তার মাথার উপর তলোয়ারের আঘাতের ঝলক তাকে কবরের ফিতনা থেকে রক্ষার জন্য যথেষ্ট।” নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বাণীর মর্মার্থ হলো, একজন শহীদের মাথার উপর শত্রুর তলোয়ারের আঘাতের ঝলকের মাধ্যমে তার নিফাক ও ঈমানের পরীক্ষা হয়ে যায়। যেহেতু সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যায়নি। এইভাবে জানা গেল, তার মধ্যে ঈমানের দৃঢ়তা ছিলো আর ঈমানের জোরেই আল্লাহর জন্য তিনি তার জীবন উৎসর্গ করতে পেরেছিলেন। এছাড়া তার অন্তরে আল্লাহর জন্য বিধর্মীদের বিরুদ্ধে ক্রোধ, ঘৃণা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিলো যার ফলশ্রুতিতে আল্লাহর দীন জয়লাভ করে ও তাঁর কালিমার ইযযত বৃদ্ধি পায়। তাই কবরে তাঁর পরীক্ষার কোন প্রয়োজন নেই।

এই প্রসঙ্গে আবূ আবদুল্লাহ কুরতুবী (র) বলেন, একজন শহীদকে যখন কবরে প্রশ্ন করা হয় না, তখন একজন সিদ্দীককে কবরে প্রশ্ন না করাই অধিক যুক্তিগ্রাহ্য। কেননা সিদ্দীকের মর্যাদা একজন শহীদের মর্যাদার চেয়ে অধিক। পবিত্র কুরআনে শহীদগণের পূর্বে সিদ্দীকগণের উল্লেখ রয়েছে "আর যে কেউ আল্লাহর এবং তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য করবে, সেই ব্যক্তি যাদের প্রতি আল্লাহ নি'আমত দান করেছেন, তাদের সঙ্গী-সাথী হবে তাঁর তাঁরা হলেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যেই হলো উত্তম।” (সূরা আন-নিসা: আয়াত-৬৯)

পবিত্র কুরআনে আরো উল্লেখ আছে, "আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তারাই তাদের পালনকর্তার কাছে সিদ্দীক ও শহীদ বলে বিবেচিত। তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার ও নূর এবং যারা কাফির ও আমার নিদর্শন অস্বীকারকারী, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী।" (সূরা আল হাদীদ: আয়াত-১৯)

উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিতদেরকেও কবরে প্রশ্ন করা হবে না, যদিও তাদের মর্যাদা শহীদগণের চেয়ে কম। অপরপক্ষে সিদ্দীকদের মর্যাদা শহীদদের মর্যাদার চেয়েও অধিক। তবে সহীহ হাদীসের দ্বারা প্রমাণিত যে এরূপ সিদ্দীকদেরকেও কবরে প্রশ্ন করা হবে। এখানে হযরত উমর (রা)-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো- একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উমর (রা) সম্পর্কে বলেছিলেন, সিদ্দীকদের মাথার মুকুট। একথা শুনে হযরত উমর (রা) বিস্ময় সহকারে আরয করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমিও কি ঐ অবস্থার শিকার হবো?” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছিলেন "হাঁ”।

কবরে কি আম্বিয়া কেরামকেও প্রশ্ন করা হয়েছে? এই প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ (র) প্রমুখের দু'টি অভিমত রয়েছে। এক- আম্বিয়ায়ে কেরামও কবরে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। দুই- তাঁদেরকে কবরে কোন প্রশ্ন করা হয়নি। শহীদগণ কবরে কোন প্রশ্নের সম্মুখীন না হওয়ার কারণে এটা এমন কোন ব্যাপার নয় যে সিদ্দীকগণও এই নিয়মের অন্তর্ভুক্ত থাকবেন, যদিও তারা শহীদের চেয়ে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন। ইবনে মাজাহর একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন অসুস্থ অবস্থায় থেকে মারা যান, তিনি শহীদের মর্যাদা পাবেন এবং কবরের ফিতনা থেকেও রক্ষা পাবেন। এই হাদীসটি ইবনে মাজাহর ইফরাদ বা একজন রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস হওয়ার কারণে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য না করাই শ্রেয়। এছাড়া তাঁর এই গ্রন্থে কিছু কিছু অপ্রচলিত ও আপত্তিকর হাদীসও রয়েছে। এই হাদীসটিকে যদি সহীহ হাদীস হিসেবে মেনে নেয়া হয়, তবুও সেটা ত্রুটিমুক্ত নয়।

তবে কবরের আযাব থেকে রেহাই পাওয়া সম্পর্কে একটি সান্ত্বনাদায়ক হাদীস আছে। যেটা আবূ মূসা মাদানী (র) তাঁর তারগীব ও তারহীব শীর্ষক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। ফারাজ ইবনে ফুযালা, হিলাল আবূ জাবাল্লাহ থেকে তিনি সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব (র) থেকে এবং তিনি আবদুর রহমান সামুরাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আমরা একদিন মদীনার কোন এক বিশেষ স্থানে একত্রিত হলাম। এমন সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট তাশরীফ আনলেন এবং দাঁড়ানো অবস্থায় ইরশাদ করলেন, গত রাত্রে আমি একটি আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেছি। আমি আমার এক উম্মতকে দেখলাম যে, মালাকুল মাউত তার রূহ কবয করার জন্য তার নিকট এসেছেন। কিন্তু সে ব্যক্তির মাতাপিতার প্রতি আনুগত্যের নেক আমল এসে মালাকুল মাউতকে সরিয়ে দিলো।

অন্য এক উম্মতকে দেখলাম শয়তান তাকে ঘিরে রেখেছে এবং বিরক্ত করছে। কিন্তু আল্লাহর যিকর এসে শয়তানকে তাড়িয়ে দিলো। আমার অপর এক উম্মতকে দেখলাম আযাবের ফেরেশতারা এসে তাকে ভয় দেখাচ্ছে। সেই অবস্থায় তার নামায এসে তাকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করছে। আমার উম্মতের আরো একজনকে দেখলাম, সে পিপাসায় কাতর ও অস্থির। সে যে হাউযের কাছেই যায় সেখান থেকে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এই সময়ে তার রামাযানুল মুবারকের রোযা এসে তাকে তৃপ্তির সাথে পানি পান করালো। আমি আরো দেখলাম, আম্বিয়ায়ে কেরামগণ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, আর আমার উম্মতের একজনকে দেখলাম সে যে সারিতে বসতে যায়, সেখানেই তাকে বাধা দেয়া হয় অবশেষে তার অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হওয়ার গোসল এসে তাকে হাত ধরে আমার কাছে এনে বসিয়ে দিলো। তারপর আমার উম্মতের অপর একজনকে দেখলাম, তার চারদিকে অর্থাৎ ডানে-বামে, উপরে, নিচে গভীর অন্ধকার আর সে জন্য সে হতাশাগ্রস্ত ও দিশেহারা। তখন তার হজ্জ ও উমরাহ এসে তাকে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে আলোতে পৌঁছে দিলো।

এই প্রসঙ্গে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতের একজনকে দেখলাম, সে আগুনের গোলা ও জ্বলন্ত কয়লার আযাব থেকে রক্ষা পেতে চায়, এমন সময় তার সাদকাহ এসে সেই আগুনকে আড়াল করে দিলো এবং তার মাথার উপর ছায়া দিতে লাগলো। আমার উম্মতের আরেকজনকে দেখলাম, সে মুমিনদের সাথে কথাবার্তা বলতে চায়, কিন্তু তাঁরা কেউ তার সাথে কথা বলছেন না। তখন তার "আত্মীয় বন্ধন" এসে বললো, হে মুসলমানগণ! এই ব্যক্তি আত্মীয়তা রক্ষা করার ব্যাপারে অগ্রগামী ছিলো, তাই তোমরা তার সাথে কথাবার্তা বলো। অবশেষে ঐ মুমিন ব্যক্তিরা সেই লোকটির সাথে কথাবার্তা বলতে লাগলেন, আর তারা তার সাথে মুসাফাহাও করলেন। আমার উম্মতের অপর একজনকে দেখলাম, জাহান্নামের ফেরেশতারা তাকে পেরেশান করছেন, কিন্তু "আমর বিল মারুফ ও নাহী আনিল মুনকার” অর্থাৎ “সৎকাজের নির্দেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” এসে তাকে ওদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রহমতের ফেরেশতাদের হাতে তুলে দিলো। আমার উম্মতের অন্য একজনকে দেখলাম সে তার দু'হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে বসে আছে, আর তার ও আল্লাহর মাঝখানে একটি পর্দা রয়েছে। তখন তাঁর "সদাচার” এসে তার হাত ধরে তাঁকে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিলো। আমার উম্মতের অন্য একজনকে দেখলাম, তার আমলনামা তার বামহাতের দিকে যাচ্ছে, এমনসময় তার "আল্লাহ ভীতি” এসে আমলনামা তার ডানহাতে তুলে দিলো। আমার উম্মতের মধ্যে আরো একজনকে দেখলাম, তার নেক আমলের ওযন হালকা হয়ে গেছে, কিন্তু শিশুকালে তার যেসব সন্তানরা মারা গিয়েছিলো তারা এসে তার আমলের ওযন ভারী করে দিলো। আমার উম্মতের অপর একজনকে জাহান্নামের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখলাম, কিন্তু তার নিকট "আল্লাহর প্রতি তার ঐকান্তিক দয়ার আশা" এসে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়ে চলে গেলো। আমার উম্মতের আরো একজনকে দেখলাম যে, সে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, এমন সময়ে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করার "অশ্রু” এসে তাকে জাহান্নাম থেকে উদ্ধার করে দিলো। আমার উম্মতের অপর একজনকে দেখলাম, সে পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে যেন ঝড়ে কম্পিত খেজুর গাছের মতো কাঁপছে। তখন আল্লাহর "অপার করুণা সম্পর্কে তার সুদৃঢ় ধারণা ও বিশ্বাস” এসে তার ভয় ও ভীতি দূর করে দিলো। আমার উম্মতের অপর একব্যক্তিকে দেখলাম, পুলসিরাতের মধ্যে একবার হামাগুড়ি দিচ্ছে আবার ঝুলছে। তখন তার "নামায" এসে তাকে পুলসিরাতের অপর পাড়ে পৌঁছে দিয়ে এই বিপদ থেকে রক্ষা করছে। এভাবে আমার উম্মতের আরো একজনকে দেখলাম, সে জান্নাতের দরজায় পৌঁছে গেছে, কিন্তু সে সময় দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। তখন "কালিমায়ে তাওহীদ" এসে তাকে দরজা খুলে দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিলো।

উপরে বর্ণিত হাদীসটি সম্পর্কে হাফিয আবূ মূসা (র)-এর অভিমত এই যে হাদীসটি উচ্চস্তরে হাসান হাদীস শ্রেণীভুক্ত অর্থাৎ এই হাদীসটি নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য। হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব (র), হযরত উমর ইবনে যর (র) এবং হযরত আলী ইবনে যায়িদ (র) থেকে হাদীসটি রেওয়ায়েত করেছেন, স্বপ্নে দেখা এই শ্রেণীর হাদীস আম্বিয়ায়ে কেরামের ওহীর অন্তর্ভুক্ত। কাজেই ঐ হাদীসটির অর্থ সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য।

স্বপ্নে দেখা হাদীসের সম্পর্কে আরো কয়েকটি ঘটনা নিম্নে উল্লেখ করা হলো: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, যেন আমার (যুলফাকার) তরবারিটি ভেঙ্গে গেছে। তিনি আরো বলেছেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম কিছু গাভীকে যবেহ করা হয়েছে। তিনি এই দু'টি স্বপ্নের ব্যাখ্যা এরূপ করলেন যে, উহুদের যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজয়বরণ করবে। হযরত হামযা (রা) সহ অনেক মুসলমান শাহাদাতবরণ করবেন। হযরত সামুরা (রা), হযরত আলী (রা) এবং আবূ উমামা (রা) প্রমুখ বর্ণিত সহীহ রেওয়ায়েতগুলোতেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বপ্নে দেখা হাদীসের উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে বরযখে যাদেরকে আযাব বা আরাম দেয়া হবে তার বর্ণনা আছে। তবে এই ধরনের স্বপ্নে দেখা হাদীস ব্যাখ্যা-নির্ভরশীল। কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে আযাবের সাথে ঐসব আমলেরও বর্ণনা রয়েছে, যেসব আমলের উসীলায় আযাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

হিলাল আবূ জাবাল্লা মাদানী একজন অপরিচিত রাবী। উপরোক্ত এই একটি মাত্র হাদীস ছাড়া আর কোথাও তার কোন উল্লেখ নেই। হযরত আবি হাতিম (র) তাঁর পিতা থেকে এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ঠিক এমনিভাবে আবু আহমদ, হাকিম আবূ আবদুল্লাহ, আবূ জাবাল্লা মুসলিম শরীফ থেকে নকল করে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। এই হাদীসটি আবূ জাবাল্লাহ থেকে ফারাজ ইবনে ফুযালাহ বর্ণনা করেছেন। ইনি একজন মধ্যম স্তরের হাদীস বর্ণনাকারী। একেবারে নির্ভরযোগ্য ও অগ্রহণীয় নন। তাঁর থেকে আবুল খতীব বাশার ইবনে অলীদ ফকীহও এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। যাঁর চিন্তা ধারা ছিলো স্বচ্ছ ও স্পষ্ট। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (র) থেকে গ্রন্থকার এই হাদীসের মহত্ত্ব ও মর্তবার কথা শুনেছিলেন। হাদীসের মূলনীতির আলোকেও শাইখুল ইসলাম এই হাদীসটিকে উত্তম হাদীস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00