📄 কি কি কারণে কবরের আযাব হয়
কি কি কারণে কবরে আযাব হয়? এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সম্পর্কে অজ্ঞতা, তাঁর হুকুমের প্রতি অবজ্ঞা, তাঁর অবাধ্যতা, অন্যের হক বিনষ্ট করা এবং পাপাচারে লিপ্ত থাকা। তবে আল্লাহ তা'আলার মুহাব্বত ও মা'রেফাতের যাঁরা অধিকারী তাঁদের রূহের কোন আযাব হয় না। এছাড়া কবরের আযাব ও আখিরাতের আযাব হলো- আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ ও অসন্তোষের কারণ। কাজেই দুনিয়াতে যে ব্যক্তি আল্লাহর ক্রোধ সঞ্চার করেছে এবং তাঁকে অসন্তুষ্ট করেছে সে যদি তাওবাহ না করে মারা যায়, তাহলে আল্লাহর অসন্তোষের কারণে বরযখে তার আযাব হবে- তা কম হোক বা বেশি হোক, বরযখের আযাবকে কেউ স্বীকার করুক বা না করুক।
হাদীসে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'জন লোকের কবরে আযাব হতে দেখেছিলেন। তিনি তাদের আযাবের দু'টি কারণও উল্লেখ করেছেন। একজনের আযাব হচ্ছিলো এ জন্য যে, সে ছিলো চোগলখোর অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে এদিকের কথা ওদিকে, ওদিকের কথা এদিকে আদান প্রদান করতো, যে জন্য লোকের মধ্যে শত্রুতা ও ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি হতো যদিও সে যা বলতো তা সত্য হতো। অপর ব্যক্তির আযাবের কারণ হলো, সে পেশাবের অপবিত্রতা থেকে নিজেকে রক্ষা করতো না, যা ছিলো তাঁর জন্য ওয়াজিব বা অপরিহার্য।
যারা মিথ্যা আচরণ বা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মানুষের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি করে, আর যারা নামায আদায় করে না তারাও কবরের কঠিন আযাব ভোগ করবে। হযরত শো'বা (রা) বর্ণিত একটি হাদীসে রয়েছে যে, জনৈক মৃত ব্যক্তির কবরে এমন চাবুক মারা হলো, যে জন্য তার কবর আগুনে ভরে গিয়েছিলো। কেননা সে বিনা ওযূতে একবার নামায পড়েছিলো এবং কোন এক মযলূম ব্যক্তির নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে কোন সাহায্য সহায়তা করেনি।
বুখারী শরীফে হযরত সামুরাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, জনৈক ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলতো এবং সর্বত্র তা ছড়িয়ে পড়তো, এমন একজন ব্যক্তিও কবরের আযাব ভোগ করছিলো। আর এরূপ একজন ব্যক্তির কবরের আযাব হচ্ছিলো যে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতো এবং তার অর্থও বুঝতে পারতো বটে কিন্তু সে সারারাত ঘুমিয়ে কাটাতো। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী আমল করতো না। এমনিভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনাকারী পুরুষ মহিলা ও সুদখোরদের কবরে যে আযাব হয় তা তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে, কিছু সংখ্যক লোকের মাথা পাথর দ্বারা চূর্ণবিচূর্ণ করা হচ্ছিলো, কেননা ঐসব লোক নামাযকে বোঝা মনে করতো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছিলেন, আরো কিছু লোক বিষাক্ত গুল্ম ও যাক্কুম গাছের মধ্য দিয়ে পশুর মতো চলাফেরা করছিলো। কেননা এরা যাকাত দিতো না। তিনি আরো দেখেছিলেন, কিছু সংখ্যক লোক দুর্গন্ধযুক্ত পচাগলা গোশত ভক্ষণ করছিলো। এরা ছিলো ব্যভিচারী পুরুষ। তিনি আরো দেখেছিলেন, ঐসব লোকদের কারো কারো ঠোঁট লোহার কাঁচি দ্বারা কাটা হচ্ছিলো। কেননা ঐসব লোক নিজেদের কথা-বার্তা ও বক্তৃতা দ্বারা সমাজে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করতো।
হযরত আবু সায়ীদ (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বিভিন্ন ধরনের অপরাধীদের বিভিন্ন ধরনের শাস্তির কথা উল্লেখ আছে। এদের মধ্যে কারো কারো পেট ছিলো ঘরের মতো বিরাট আকৃতির আর ফিরআউনের লশকরেরা এদেরকে পদদলিত করে চলে যাচ্ছিলো। কেননা তারা ছিলো সুদখোর। আরেক শ্রেণীর লোকের মধ্যে অনেকের মুখে আগুনের কয়লা ভরে দেয়া হচ্ছিলো, সেগুলো ওদের মলদ্বার দিয়ে বের হচ্ছিলো। এরা ছিলো ঐসব লোক যারা যুলুম করে ইয়াতীমদের মাল ভক্ষণ করতো। কিছু সংখ্যক মহিলার বক্ষ বাঁধা অবস্থায় ঝুলছিলো- এরা ছিল ব্যভিচারিণী মহিলা। কিছু সংখ্যক লোকের পার্শ্বদেশ থেকে গোশত কেটে কেটে ওদেরকে খাওয়ানো হচ্ছিলো- এরা ছিলো চোগলখোর। কারো কারো নখ ছিলো তামার। এরা নখের সাহায্যে নিজের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছিলো। কেননা এরা ছিলো লোকের সম্মান হরণকারী।
একবার একব্যক্তি গণীমতের মাল থেকে একখানা চাদর চুরি করেছিলো। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, তজ্জন্য তার কবরে আগুন জ্বলছে। অথচ সেই গনীমতের মালের মধ্যে তারও হক ছিলো। কাজেই যে ব্যক্তির মালের উপর কোন হক নেই, আর যুলুম করে কারো মাল আত্মসাৎ করে তার যে আরো বেশি আযাব হবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
মানুষের অন্তর, চোখ, কান, মুখ, জিহ্বা, পেট, লজ্জাস্থান, হাত-পা এবং সমস্ত দেহের পাপের কারণেও কবরের আযাব হয়ে থাকে। এদিকের কথা ওদিকে বলা, মিথ্যাকথা বলা, চোগলখোর, মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা, পবিত্র লোকদের অপবাদকারী, অশান্তি সৃষ্টিকারী, প্ররোচনাকারী, (নিকৃষ্ট) বিদআত প্রচলনকারী, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপকারী, আল্লাহর কালামের মনগড়া ব্যাখ্যাকারী, সুদখোর, অন্যায়ভাবে ইয়াতীমদের মাল আত্মসাৎকারী, ঘুষ ইত্যাদির মাধ্যমে হারাম ভক্ষণকারী, অন্যায়ভাবে মানুষের ধন-সম্পদ আত্মসাৎকারী, নেশাখোর, নিষিদ্ধ খাদ্য আহরণকারী, সমকাম ও ব্যভিচারকারী, চোর, খেয়ানতকারী, বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক, প্রবঞ্চক, সুদের কারবারে সাক্ষ্যদাতা ও লিখক, অন্যায়ভাবে টালবাহানাকারী ও তার সহযোগী, আল্লাহর ফরযগুলো এড়াবার জন্য টালবাহানাকারী, হারাম কাজে লিপ্ত ব্যক্তি, মানুষকে কষ্টদাতা ও তাদের দোষ অন্বেষণকারী, শরীআতের পরিপন্থী আইনের দ্বারা মীমাংসাকারী, শরীআতের পরিপন্থী ফতওয়া দানকারী, পাপী ও অন্যায়কারীদের সহায়তাকারী, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারী, পবিত্র মক্কানগরীর মসজিদে হারাম এর এলাকায় ইসলাম বিরোধী কথা প্রচারকারী, নিজের অভিমত, আশা আকাঙ্ক্ষা ও চেষ্টা তদবীরকে সুন্নাতের উপর অগ্রাধিকার প্রদানকারী, আল্লাহ তা'আলার পবিত্র নামসমূহের ও গুণাবলীর বাস্তবতাকে অস্বীকারকারী এবং এগুলোর মধ্যে দীনের পরিপন্থী বিষয় প্রচারকারী, মৃতের জন্য শোক গীতিকার, শোকগীতি শ্রবণকারী, অশ্লীল গান ও তা শ্রবণকারী, কবরকে মসজিদে পরিণতকারী, কবরে (অপ্রয়োজনীয়) বাতি বা প্রদীপ প্রজ্বলনকারী, কোন জিনিষ বিক্রয়কালে কম প্রদানকারী আর ক্রয়কালে অধিক গ্রহণকারী, যুলুমকারী, অহঙ্কারী, লোক দেখানো ইবাদতকারী ও দানকারী, চোখ ও মুখ দ্বারা অপরের দোষ অন্বেষণকারী, আগেকার লোকদেরকে গালমন্দকারী, ভবিষ্যতের গায়েবী সংবাদদাতা, গণক, জ্যোতিষী, ভবিষ্যৎ প্রবক্তা ও তাদের নিকট সেই উদ্দেশ্যে গমনকারী এবং তাদের কথায় বিশ্বাসকারী, যালিমদের সাহায্যকারী, দুনিয়ার পরিবর্তে আখিরাত বিনষ্টকারী, আল্লাহর প্রতি ভয় প্রদর্শন ও সতর্ক করা সত্ত্বেও যারা আল্লাহকে ভয় করে না ও গুনাহ থেকে বিরত থাকে না এমন ব্যক্তি, পাপ থেকে বিরত না থাকা ব্যক্তিদেরকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যদি পথ প্রদর্শন করা হয়, তাহলে তা অমান্য করে ও হিদায়াতের পথে আসে না এমন সব ব্যক্তি, আর যাদের প্রতি লোকের সুধারণা রয়েছে কেউ তাদের কুৎসা রটনা করলে তা বিশ্বাসকারী, আম্বিয়ায়ে কেরাম ছাড়া আর অন্য কাউকে নিষ্পাপ বলে বিশ্বাসকারী, (তবে আল্লাহ অন্য যাদেরকে মাসূম বলে উল্লেখ করেছেন, যেমন- অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু, তাদের কথা ভিন্ন), যারা পবিত্র কুরআন পাঠ করে, কিন্তু এর শিক্ষা গ্রহণ করে না, আর এটাকে এক নিছক বোঝা মনে করে, যারা অশ্লীল আলোচনা, কথাবার্তা ও কুরুচিপূর্ণ আমোদ আহলাদে আনন্দ পায়, যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামেও মিথ্যা কসম করে, যে গুনাহের কাজ করে গর্ববোধ করে, প্রকাশ্যে ও দম্ভ সহকারে গুনাহের কাজ করে যাদের থেকে মানুষের মান ইযযত ও সম্পদ নিরাপদ নয়, গুণ্ডামী ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য যাদেরকে লোকেরা পরিত্যাগ করে, যারা নামাযের শেষ সময়ে নামায আদায় করে, যারা মোরগের ন্যায় ঠোকর মেরে তাড়াহুড়া করে নামায পড়ে, যারা আল্লাহকে ভয় করে না, যাকাত আদায় করে না, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা হজ্জ পালন করে না, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা অপরের পাওনা পরিশোধ করে না, কুদৃষ্টি থেকে, অশ্লীল বাক্য থেকে হারাম কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করে না, উপার্জনে হালাল-হারামের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না, আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করে না, মিসকীন, বিধবা, ইয়াতীম এবং নির্বাক পশুদের সাথে নির্দয় ব্যবহার করে, ইয়াতীমদের প্রতি সদয় ব্যবহার করে না, অভাবী লোকদেরকে খাবার দেয় না এবং অন্যদেরকে সেজন্য উৎসাহিত করে না, লোক দেখানো আমল করে, সাধারণ ব্যবহারের জন্য জিনিসপত্র দিয়ে অপরকে সাহায্য করে না, যে নিজের দোষ ও পাপের প্রতি লক্ষ্য না রেখে অন্য লোকের দোষ তালাশ করে। মোটকথা, এসব লোকদেরকে কবরের আযাব ভোগ করতে হবে, তবে কারো আযাব হবে অধিক, কারো আযাব হবে লঘু।
বেশিরভাগ লোকদেরকেই কবরের আযাবের সম্মুখীন হতে হয়, যেহেতু বেশির ভাগ মানুষই গুনাহের কাজে লিপ্ত থাকে। কবরের আযাব থেকে নাজাত পাওয়া লোকের সংখ্যা খুবই কম। দৃশ্যত কবরের উপরের মাটি স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গেলেও, এটা মর্মন্তুদ আযাব ও হাহাকারে পরিপূর্ণ। বহু কবরের উপর নকশী পাথরের তৈরি ইমারত গড়ে উঠে সত্য, কিন্তু পাত্রের ভেতর খাদ্যদ্রব্য যেমন আগুনে সিদ্ধ হয়ে থাকে, অনেক কবরের অবস্থাও ঠিক তদ্রূপ।
হায় আফসোস! কবর থেকে অহরহ আওয়াজ আসছে আর কবর ডেকে বলছে, হে দুনিয়ার মানুষ, তোমরা এমন আবাস তৈরি করে রেখেছো, যা অতিসত্বর তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, আর ঐ আবাসকে বিস্মৃত হয়ে আছো, যেখানে অতিসত্বর তোমাদেরকে যেতে হবে। আর তোমরা এমন ঘর আবাদ করে রেখেছো, যেখানে অন্যরা বসবাস করবে, আর তা ভোগ করবে। আর তোমরা ঐসব ঘর পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখেছো, যেখানে তোমরা স্থায়ীভাবে বসবাস করবে। আসলে দুনিয়া হচ্ছে, যত শীঘ্র সম্ভব আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয়ের স্থান। আর কবর হচ্ছে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের মাকাম, এটা কারো জন্য হবে জান্নাতের বাগিচা, আর কারো জন্য হবে জাহান্নামের ভয়ঙ্কর গহ্বর।