📄 মৃত্যুর পর কবরের আযাব হয় কিনা কবর প্রশস্ত বা সংকীর্ণ হয় কিনা
কবরের আযাব, কবরের প্রশস্ত ও সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া, কবর জাহান্নামের অংশ বা জান্নাতের বাগিচা হয়ে যাওয়া, কবরের মৃত ব্যক্তিদের বসা ইত্যাদি বিষয় যারা বিশ্বাস ও স্বীকার করে না, তাদেরকে কী বলা যেতে পারে? তাদের কথা হচ্ছে, যে কোনো কবর খুলে দেখলে সেখানে অন্ধ ও বধির ফেরেশতা যাঁরা লোহার হাতুড়ি দ্বারা মৃতদেরকে প্রহার করেন তাঁদেরকে দেখা যায় না। সেখানে কোনো অজগর সাপ বা প্রজ্বলিত আগুনও দেখা যায় না। এমনকি মৃত দেহের মধ্যেও এগুলোর কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। মৃত দেহকে অবিকৃত অবস্থায় দেখা যায়, আর যদি মৃতদের চোখের উপর পারদ আর বুকের উপর সরষে রেখে দেয়া যায়, তাহলে সেগুলোকে ঠিক সে অবস্থায় দেখা যায়। এমনিভাবে কবরের সংকীর্ণতা বা প্রশস্ততা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় না। কবরের যে পরিমাণ জায়গা খনন করা হয় ঠিক তদ্রূপই দেখা যায়। ছোট্ট একটি কবরের মধ্যে মৃত ব্যক্তির দেহ, ফেরেশতা, বিবিধ আকৃতিধারী আমলসমূহ সে স্বল্প পরিসরে কীভাবে সংকুলন হতে পারে? বিদআতী ও গুমরাহ লোকদের ধারণা, যেসব কথা সাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেচনায় আসে না তা অবশ্যই ভ্রান্ত ও যুক্তিহীন। ফাঁসি কাষ্ঠে দীর্ঘদিন মৃত ব্যক্তির দেহ লটকে থাকলে তখন তার সওয়াল-জবাব কীভাবে হয়? কবরের মধ্যে দেহের কোনো প্রকার নড়াচড়া লক্ষ্য করা যায় না আর ঐ দেহে কোনো আগুনও দৃষ্টিগোচর হয় না। যেসব মৃত দেহকে হিংস্র জন্তু কিংবা পাখিরা খেয়ে ফেলে এবং মৃত দেহের অংশগুলো তাদের পেটে হজম হয়ে যায় কিংবা যাদের দেহ পুড়িয়ে ছাই করে বাতাসে উড়িয়ে দেয়া হয় বা সমুদ্রে বা নদ-নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়, মৃত দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে বিলুপ্ত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সে অবস্থায় কী করে মৃত ব্যক্তিদের সওয়াল-জবাব হয়? কী করে ওদের সামনে ফেরেশতারা উপস্থিত হন? কী করে কবর জান্নাতের বাগিচা বা জাহান্নামের অংশে পরিণত হয়? কী করে তাদেরকে কবর চাপ দেয়? এসব বিষয় সম্পর্কে নিম্নে আলোকপাত করা হলো:
এক- এই সম্পর্কে আম্বিয়ায়ে কেরাম এমন কোনো তথ্য প্রদান করেননি যা জ্ঞান-বুদ্ধির পরিপন্থী বা একেবারেই অসম্ভব। বরং তাঁরা দু'রকমের খবর দিয়েছেন। ক. কোনোটি এমন যে, যেগুলো সহজ ও সরল প্রকৃতির লোক মেনে নেয় এবং এগুলোর সত্যতার সাক্ষ্য প্রদান করে। খ. আবার তাঁরা এমন সব কথা বলেছেন, যা সাধারণ বুদ্ধির দ্বারা উপলব্ধি করা যায় না। যেমন, গায়েবের খবর, বরযখ ও কিয়ামতের বিস্তারিত বৃত্তান্ত, কবরের আযাব ও আরামের খুঁটিনাটি বিষয় ইত্যাদি। আম্বিয়ায়ে কেরামের বর্ণিত বিষয়গুলো কখনো জ্ঞান বা যুক্তির পরিপন্থী নয়। তবে যে বিষয়গুলো সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনার পরিপন্থী বলে ধারণা করা হয় সেগুলো দু'টি দৃষ্টিকোণ থেকে হতে পারে। হয় সেটা মিথ্যা খবর যা আম্বিয়ায়ে কেরাম উল্লেখ করেননি বরং সেগুলো তাঁদের অভিমত বলে প্রচারিত। তবে সেটা বাতিল বুদ্ধি-বিবেচনা প্রসূত বা শয়তানী ধ্যান-ধারণাজনিত প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, “হে নবী! জ্ঞানী লোকেরা ভালোভাবেই জানেন যে, আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা কিছু নাযিল করা হয়েছে এটা মানুষকে পুরোপুরি সত্য এবং পরাক্রমশালী মহা প্রশংসিত আল্লাহর পথ নির্দেশ করে।" (সূরা সাবা: আয়াত-৬)
আল্লাহ তাআলা কুরআন শরীফে অন্যত্র আরো ইরশাদ করেছেন, "আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা এই কিতাব যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তাতে আনন্দ পায়, কিন্তু কোন কোন দল এর কতক অংশ অস্বীকার করে। বলো, আমি তো আল্লাহর ইবাদত করতে ও তাঁর কোনো শরীক না করতে আদিষ্ট হয়েছি। কাজেই আমি তাঁর দিকেই আহ্বান করছি, আর তাঁরই নিকট আমার প্রত্যাবর্তন।” (সূরা রাদ: আয়াত-৩৬)
উল্লেখ্য যে, মানুষের বিবেক কখনো অসম্ভব কথায় পরিতৃপ্ত হয় না। যেমন পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, “হে মানব সমাজ, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের নিকট থেকে নসীহত এসে পৌঁছেছে, এটা মানব মনের যাবতীয় ব্যাধির পূর্ণ নিরাময়কারী, আর মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত নির্দিষ্ট হয়ে আছে। হে নবী! বলুন, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও অপার করুণা যে তিনি এটা পাঠিয়েছেন। এ জন্য তাঁদের আনন্দ উল্লাস করা উচিত। এটা সেসব জিনিস হতে উত্তম যা লোকেরা সংগ্রহ ও আয়ত্ত করেছে।" (সূরা ইউনুস: আয়াত-৫৭, ৫৮) যা কিছু অবাস্তব ও অসম্ভব তার মধ্যে কোনো রোগমুক্তি, হিদায়াত, রহমত আশা করা যায় না এবং তাতে কেউ সন্তুষ্টও হতে পারে না। এরূপ সন্দেহে ঐসব লোক পতিত হয়, যাদের অন্তরে ঈমানের শিকড় সুদৃঢ় হতে পারেনি ও যাদের কদম ইসলামের উপরে সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। এজন্য তারা সবসময় সন্দেহ, সিদ্ধান্তহীনতায় এবং অস্থিরতায় ভোগে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র কোনো বাণীর মর্মার্থ কোনো প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়া গ্রহণ করতে হবে। তাঁর বাণীর এমন কোনো অর্থ গ্রহণ করা অনুচিত যেই অর্থের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ও সারবত্তা নেই। উপরোক্ত মূলনীতির পরিপ্রেক্ষিতে হাদীসের সঠিক অর্থ অনুধাবন করতে বিভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া স্বচ্ছ ও নিষ্কলুষ নিয়ত থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো জ্ঞানী এবং মহৎ ব্যক্তির মধ্যে সঠিক উপলব্ধির অভাব দেখা যায়।
পক্ষান্তরে, ভ্রান্ত আকীদা পোষণকারীদের নিয়ত কলুষিত ও বিকৃত হওয়ার কারণে মাসয়ালা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে তারা উল্টোটাই বুঝে। এভাবে দীনদার ব্যক্তিদের সাধনা ও প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা দেখা দেয়। আসলে মারজিয়াহ, কাদরিয়া, খারিজী, মুতাযিলা, জাহমিয়াহ ইত্যাদি ফিরকার গুমরাহির এটাই প্রধান কারণ। এসব ভ্রান্ত ফিরকার কারণে দীন ইসলামের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বাণী থেকে ও সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবিয়ীনের জ্ঞানের উৎস থেকে তারা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতিও তারা মোটেই কোনো ভ্রূক্ষেপ প্রদান করেনি। উপরোক্ত অভিমতের স্বপক্ষে বহু উদ্ধৃতি বাদ দেয়া হলো। অন্যথায় এ সম্পর্কে দশ হাজারেরও বেশি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যেতে পারে। পরিতাপের বিষয় এই যে, উক্ত গুমরাহ ফিরকার প্রবক্তারা পবিত্র কুরআন, হাদীস ও শরীআতের বিধি-বিধানকে মোটেই উপলব্ধি করতে পারেনি। বস্তুত পবিত্র কুরআনের মহান শিক্ষা ও মর্মবাণীকে তাঁরাই যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন, যাঁরা আগেকার দিনের হিদায়াতপ্রাপ্ত জ্ঞানী ব্যক্তিদের আদর্শ ও ধ্যান-ধারণার সাথে সম্যকভাবে পরিচিত। ভ্রান্ত ফিরকার অনুসারীরা অতি সুকৌশলে তাদের ভ্রান্ত মতবাদকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য দীনী মাসয়ালা-মাসায়েলকে নানাভাবে বিকৃত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। আল্লাহর লাখো শুকরিয়া, তিনি আমাদেরকে এসব ভ্রান্ত ফিরকার আবর্ত থেকে রক্ষা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য তিন প্রকারের আবাসস্থল তৈরি করে রেখেছেন, যথা: দুনিয়া, বরযখ ও আখিরাত। এই সব আবাসস্থলের জন্য তিনি বিশেষ ধরনের নিয়ম-কানুন ও হুকুম-আহকাম তৈরি করেছেন। আর তিনি মানুষকে দেহ ও রূহের দ্বারা সুগঠিত করেছেন। দুনিয়ার হুকুম-আহকাম দেহের উপরই প্রযোজ্য। এজন্যই শরীআতের হুকুম-আহকাম, মানুষের কথাবার্তা, আচার-আচরণ ও কাজ-কর্মের উপর কার্যকর হয়; তাদের মনের চিন্তাধারা ও কল্পনার উপর নয়। অপরপক্ষে বরযখী জীবনের হুকুম-আহকাম ও কার্যकारण রূহের সাথে সম্পৃক্ত।
পার্থিব ব্যাপারে রূহ দেহের অনুসরণ করে, মানুষ সুখ, দুঃখ ও ব্যথা-বেদনা অনুভব করে। এর কারণ এই যে, দেহের মাধ্যমেই রূহ প্রভাবিত হয়। তেমনি বরযখে সুখ-দুঃখের সম্পর্ক সরাসরি রূহের সাথে হয়ে থাকে। আর রূহের মাধ্যমে দেহের উপরও এর প্রভাব পড়ে। দেহ হলো প্রকাশ্য একটি সত্তা, কিন্তু রূহ হলো অপ্রকাশ্য সত্তা। এছাড়া দেহ হলো রূহের অস্থায়ী নিবাস। তবে বরযখে রূহ হচ্ছে সক্রিয় একটি সত্তা, আর দেহ অপ্রকাশ্যভাবে কবরে বিদ্যমান থাকে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর হিদায়াত ও অনুগ্রহে দুনিয়ার মধ্যে বরযখের একটি নমুনা একজন ঘুমন্ত ব্যক্তির মাধ্যমে দান করেছেন। আমাদের স্বপ্নের মধ্যে যে আনন্দ ও দুঃখ-বেদনা পরিদৃষ্ট হয়ে থাকে এটা রূহের মাধ্যমে সংঘটিত হয় এবং এর প্রভাব দেহের উপরও পড়ে। আবার কোনো কোনো সময় এরূপ স্বপ্ন এতো বেশি বাস্তবমুখী হয়ে থাকে যে, তার কার্যকারিতা নিদ্রা থেকে জেগে উঠার পরেও অনুভূত হয়। যথা—কেউ স্বপ্নে দেখলো কেউ তাকে প্রহার করছে, আর সে চিৎকার করছে; জাগ্রত হওয়ার পরে সে আঘাতের চিহ্ন তার দেহের মধ্যে দেখতে পায়। অথবা কেউ স্বপ্নে দেখলো সে কোনো কিছু খেয়েছে, জেগে উঠার পর সে খাবারের স্বাদ ঐ ব্যক্তি অনুভব করে থাকে। এমনকি একজন নিদ্রিত ব্যক্তির ক্ষুধা-পিপাসাও এইভাবে নিবৃত্ত হয়ে যায়।
এভাবে একজন নিদ্রিত ব্যক্তির স্বপ্ন দেখা অবস্থায় দাঁড়িয়েও যায় এবং একজন জাগ্রত মানুষের ন্যায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যকে মারধরও করে। অথচ সেই ব্যক্তি তখনও নিদ্রিত অবস্থায় দুনিয়ার সকল বিষয় সম্পর্কে থাকে অনবহিত ও বিচ্ছিন্ন। রূহ যখন এইভাবে তার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে তখন সময় সময় অন্য দেহের সাহায্যও গ্রহণ করে। কেননা রূহ যদি নিদ্রিত ব্যক্তির দেহে ফিরে আসতো তাহলে সে ব্যক্তি জেগেই যেতো আর সব বিষয় অনুভব করতে পারতো। অতএব কোনো নিদ্রিত ব্যক্তির রূহ যেমন একাকিত্বে প্রভাবান্বিত হয়, ঠিক তেমনি বরযখী রূহের একাকিত্ব আরো গভীরভাবে অনুভূত হয়ে থাকে। এ অবস্থায় দেহের উপর এর প্রতিক্রিয়া কার্যকর হয়। মৃত্যুজনিত কারণে দেহের সাথে রূহের সম্পর্ক একেবারেই শেষ হয়ে যায় না, তখনও এক প্রকারের সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। মৃত্যুর পরে দেহ পুরোপুরি অটুট থাকুক অথবা বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটি, পানি বা অন্য কিছুর সঙ্গে মিশে অন্য কোনো আকৃতি বা রূপ ধারণ করুক, তবে কিয়ামতের দিন দেহ ও রূহ সরাসরি আযাব বা আরাম ভোগ করবে। এই রহস্যের গূঢ়তত্ত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করা যাবে যখন উপরোক্ত প্রশ্নসমূহের সমাধান হয়ে যাবে। আর এটাও বুঝা যাবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বর্ণিত কবরের আযাব বা আরাম, কবর প্রশস্ত বা সংকীর্ণ হওয়া, জাহান্নামের অংশ বা জান্নাতের উদ্যানে পরিণত হওয়া ইত্যাদি বিষয় বিবেক-বুদ্ধি সম্মত ও সন্দেহ বিবর্জিত। এ প্রসঙ্গে জনৈক কবি বলেন, "অনেক কথাই সঠিক ও সত্য কিন্তু যে বুঝবে তার বোধ শক্তি হলো দুর্বল ও ক্ষীণ।”
এটা কি একটি আশ্চর্যজনক বিষয় নয় যে, দু'জন লোক বিছানায় ঘুমুচ্ছে, কিন্তু একজনের রূহ নিআমত ভোগ করছে আর অন্যজনের রূহ শাস্তি ভোগ করছে? তারপর তারা ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজ নিজ দেহে কোনো কোনো সময় শান্তি বা শাস্তির চিহ্ন দেখতে পায়। আলমে বরযখের অবস্থা তো এর চেয়েও বেশি আশ্চর্যজনক। বরযখ ও আখিরাতের বিষয়সমূহ মানুষের সাধারণ অনুভূতি ও উপলব্ধির নাগালের বাইরে। আল্লাহ তাআলা বরযখ ও আখিরাতের বিষয়সমূহ দুনিয়াবাসীদের দৃষ্টির আড়ালে রেখেছেন, যা তাদের অনুভূতি ও উপলব্ধির সম্পূর্ণ বাইরে। এটাই আল্লাহ তাআলার রহস্যের গূঢ়তত্ত্ব যাতে করে মুসলমান ও কাফিরদের মধ্যে পার্থক্য করা যায়। দুনিয়াতেই জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ফেরেশতাদের আগমন ঘটে। দুনিয়া থেকে বিদায়ী ব্যক্তি তাদেরকে দেখতে পায়। ফেরেশতারা তার কাছে এসে বসে যান ও তার সাথে কথাবার্তা বলেন। তাঁদের নিকট জান্নাত বা জাহান্নামের কাফন, সুগন্ধ বা দুর্গন্ধ মওজুদ থাকে। তাঁরা উপস্থিত লোকজনদের দুআর সময় আমীনও বলে থাকেন এবং মৃত ব্যক্তিকে সালাম করে থাকেন আর সে ব্যক্তি তাঁদের সালামের উত্তরও দিয়ে থাকেন। আর ঐ ব্যক্তি যদি সালামের উত্তর মুখে দিতে বা ইশারাও করতে না পারেন, তাহলে তিনি মনে মনেই এর জবাব দিয়ে থাকেন। এই কারণে কোনো কোনো সময় "আসুন, আসুন, তাশরীফ নিয়ে আসুন" বলতে শোনা যায়। গ্রন্থকারের মহা সম্মানিত উস্তাদ থেকে বর্ণিত, জনৈক নেককার মৃত্যুপথযাত্রী ঠিক তার শেষ মুহূর্তে "আসুন, আসুন, তাশরীফ রাখুন" ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করে ফেরেশতাদেরকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
হযরত খাইরুন নাসসাজ (র) তাঁর মৃত্যুর সময় বলেছিলেন, "আমি সবর করবো, আল্লাহ পাক তোমাদেরকে মাফ করুন, তোমাদের প্রতি আল্লাহর যে নির্দেশ তা অপরিবর্তনীয়, এর কোনো হেরফের হবে না, আমার আয়ুর পেয়ালা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।" তারপর তিনি বলেছিলেন, "এখন তোমরা তোমাদের রবের নির্দেশ পালন করো", এই বলে তিনি চিরবিদায় নিয়েছিলেন। হযরত খাইরুন নাসসাজ (র)-এর উক্ত ঘটনাটি বহুল প্রচারিত ও তাৎপর্যপূর্ণ।
ইবনে আবিদ দুনিয়া তাঁর এক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) যেদিন শেষ বিদায় নেবেন, সেদিন তিনি বলেছিলেন, "আমাকে তুলে বসাও।" সেখানে উপস্থিত লোকজন তাঁকে উঠিয়ে বসালেন। তিনি কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, "আমি হচ্ছি ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম-আহকাম পালনে অবহেলা করেছি, আর গুনাহ করতে সংকোচবোধ করিনি।" এ কথা তিনি তিনবার উচ্চারণ করে কালিমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” পাঠ করলেন এবং মাথা তুলে মনোযোগের সাথে দেখতে লাগলেন। উপস্থিত লোকেরা বললো, "হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি এতো মনোযোগ দিয়ে কী দেখছেন?" সে অবস্থায় তিনি বলেছিলেন, "আমি এমন অদ্ভূত ধরনের আকৃতিধারীদেরকে দেখছি যাঁরা ইনসান বা জিন নন।" তারপর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
এই প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য যে, হযরত মাসলামাহ (র) বর্ণনা করেছেন: তিনি হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র)-এর অন্তিম সময়ে তাঁর নিকট উপস্থিত ছিলেন। তিনি ইঙ্গিতে আমাদেরকে ঘরের বাইরে যেতে বললেন। আমরা সবাই বাইরে চলে গেলাম এবং একটি গম্বুজের পাশে বসে গেলাম। তখন একজন মাত্র খাদিম তাঁর কাছে ভেতরে রইলো। সে সময় তিনি কুরআন শরীফের যে পবিত্র আয়াত তিলাওয়াত করেছিলেন সে আয়াতের অর্থ হলো: "এই পরলোকের ঘর যা আমি নির্ধারিত করি তাদের জন্য; যারা দুনিয়াতে বড় হতে চায় না, অশান্তি সৃষ্টি করে না। আল্লাহভীরুদের জন্য শুভ পরিণাম"। (সূরা আল-কাসাস: আয়াত-৮৩) এই পবিত্র আয়াত পাঠের পর তিনি বলে উঠলেন— "নিশ্চয় তোমরা মানুষও নও, জিনও নও”। তারপর খাদিম বাইরে এসে আমাদেরকে ভেতরে যেতে বললো। আমরা ভেতরে গিয়ে দেখলাম তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন।
হযরত ফুযালা ইবনে দীনার (র) থেকে বর্ণিত: তিনি মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসি' (র)-এর অন্তিম সময়ে তাঁর নিকট উপস্থিত ছিলেন। তিনি হঠাৎ বলতে লাগলেন, “হে আমার ফেরেশতা, এসো, যাবতীয় ক্ষমতা ও শক্তি ও সামর্থ্যের উৎস একমাত্র আল্লাহ"। সেই সময় অতিশয় প্রিয় ও প্রাণ মাতানো খুশবু ভেসে এলো। তারপর তাঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে গেলো এবং তিনি চিরবিদায় নিলেন।
উপরোক্ত ঘটনাবলীর সমর্থনে বহু নির্ভরযোগ্য হাদীস বিদ্যমান আছে। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, "অতঃপর যখন কারো প্রাণ কণ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তাকিয়ে থাকো, তখন আমি তোমাদের চেয়ে তার অধিক নিকটবর্তী থাকি। কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না"। (সূরা ওয়াকিয়াহ: আয়াত-৮৩-৯৫) অর্থাৎ আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তোমাদের চেয়েও বেশি তার নিকটবর্তী হন, কিন্তু তোমরা তাঁদেরকে দেখতে পাও না। এটা হচ্ছে দুনিয়ার জীবনের শেষ মুহূর্ত আর বরযখী জীবনের শুরু। এ কারণেই মৃত্যুপথযাত্রীর সামনে থেকে পর্দা তুলে দেয়া হয়। সে সময়ে দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণকারী ব্যক্তি যা কিছু দেখতে পায়, দুনিয়ার মানুষ তা দেখতে পায় না। অতঃপর ফেরেশতারা হাত বাড়িয়ে রূহকে সম্বোধন করেন এবং সেই রূহকে কবজ করে নেন। মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির নিকট উপস্থিত লোকজনেরা ফেরেশতাদেরকে দেখতে পান না, তাঁদের কথাও শুনতে পান না। এইভাবে দেহ থেকে রূহ বের হয়ে আসে। নেককার বান্দার রূহ থেকে তখন সূর্যের কিরণের ন্যায় আলো এবং মেশকের চেয়ে অধিক প্রাণ মাতানো খুশবু ভেসে আসতে থাকে। উপস্থিত লোকজনেরা সে আলোর কিরণ দেখতে পান না, তবে সে খুশবু অনুভব করে থাকেন। তারপর ফেরেশতারা যে রূহকে আকাশে নিয়ে যান, তাও কেউ দেখতে পায় না।
রূহকে আবার দেহে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং সেই রূহ মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়া, কাফন পরানো ও কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া সবকিছু প্রত্যক্ষ করে আর বলতে থাকে; "আমাকে তোমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ, তাড়াতাড়ি করো?" কিন্তু তার এসব কথা মানুষ শুনতে পায় না। উল্লেখ্য যে, ফেরেশতারা লাশকে মাটি দেয়ার পর কবরে আসেন। তাঁদের জন্য কবরের উপরের মাটি কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। মাটি খুঁড়ে, পাথর কেটে তার মধ্যে লাশ রেখে সীসা গালিয়ে কবরের মুখ সীলমোহর করে দিলেও ফেরেশতারা লাশের নিকট পৌঁছে যান। কেননা স্থূলবস্তুকে সূক্ষ্মদেহী ফেরেশতারা অতি সহজেই অতিক্রম করতে পারেন। এমনকি জিনেরাও সেসব বাধা অতিক্রম করতে পারে। পাখিরা যেমন হাওয়ায় উড়ে বেড়ায় ফেরেশতারাও তেমনি স্থূলবস্তু জগতে সাঁতরিয়ে বেড়ান।
একজন নেককার বান্দার জন্য তাঁর কবরের প্রশস্ততা কোনো মাধ্যম ছাড়াই হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে রূহের জন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না। তবে দেহের জন্য কবরের প্রশস্ততা রূহের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আলমে বরযখের ঘটনাবলী রূহের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। আর দেহের সাথে রূহের মাধ্যমে সেটা কার্যকর হয়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে কবরের মধ্যে নেককার বান্দার লাশ দু'-তিন হাত জায়গায় থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সে কবর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে যায়। যদি কোনো কবর খুলে দেখা হয়, তাহলে লাশটিকে স্বাভাবিক অবস্থায়ই দেখা যায়। কিন্তু কবর কোনো কোনো ব্যক্তিকে এমনভাবে চাপ দেয় যে, এদিকের পাঁজরের হাড় ওদিকে ও ওদিকের পাঁজরের হাড় এদিকে ঢুকে পড়ে। এই যে অবস্থা এটা সাধারণ উপলব্ধি, প্রজ্ঞা ও সহজাত ধ্যান-ধারণার বহির্ভূত একটি ব্যাপার। যদি কোনো লাশ কবর ছাড়া অন্য কোথাও রাখা হয় তবুও একথা বলা যাবে না যে সে লাশটি কবরের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি। ঈমান ও আকীদা সম্পর্কিত কবরের এই সব ঘটনাবলী যারা বিশ্বাস করে না তারা ধর্মহীন বা বেঈমান ছাড়া আর কিছু নয়।
এই প্রসঙ্গে জনৈক বিশ্বস্ত ও নেককার ব্যক্তি থেকে বর্ণিত আছে, একবার তিনি তিনটি কবর খনন করেছিলেন। খনন করার পর বিশ্রাম করতে গিয়ে তিনি সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তখন তিনি স্বপ্নে দেখলেন আকাশ থেকে দু'জন ফেরেশতা সেখানে নেমে আসলেন এবং উক্ত তিনটি কবরের মধ্যে থেকে একটি কবরের নিকট দাঁড়িয়ে ফেরেশতারা একে অপরকে বললেন, এ কবরটির পরিধি হবে তিন মাইল দীর্ঘ ও তিন মাইল প্রস্থ, লিখে নিন। তারপর দ্বিতীয় কবরটির নিকট গিয়ে তাঁরা বললেন, এর আয়তন হবে এক মাইল লম্বা ও এক মাইল চওড়া, এটাও লিখে নিন। তারপর তৃতীয় কবরটির কাছে গিয়ে বললেন, এর আয়তন হবে মাত্র আধ ইঞ্চি লম্বা ও আধ ইঞ্চি চওড়া, লিখে নিন। এরপর তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। এর মধ্যে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির জানাযা সেখানে নিয়ে আসা হলো। তাঁকে প্রথম কবরটিতে দাফন করা হলো। এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তির জানাযা আনা হলো। তাঁকে দ্বিতীয় কবরটিতে দাফন করা হলো। অবশেষে শহরের একজন বিখ্যাত ও মালদার মহিলার জানাযা আনা হলো। সেই জানাযায় শহরের প্রত্যেক এলাকার সর্বস্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ শরীক হলেন। সেই জানাযায় ছিল মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। তৃতীয় কবরটিতে সেই মহিলাটিকে দাফন করা হলো, যে কবর সম্পর্কে ফেরেশতারা বলেছিলেন যে, এটার আয়তন হবে মাত্র আধ ইঞ্চি লম্বা ও আধ ইঞ্চি চওড়া।
কবরের আগুন ও কবরের বাগান, দুনিয়ার আগুন ও দুনিয়ার বাগানের মতো নয় যে, দুনিয়ার মানুষ তা প্রত্যক্ষ করতে পারে। বরং আখিরাতের আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আর আখিরাতের বাগান দুনিয়ার বাগানের চেয়ে অনেক বেশি মনোরম। আখিরাতের অবস্থা দুনিয়ার মানুষ প্রত্যক্ষ করতে পারে না, বরং যে মাটি ও পাথরে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয় আল্লাহ তাআলা সেই মাটি ও পাথরকে উত্তপ্ত করে দেন। আর সেগুলো দুনিয়ার সাধারণ মাটি ও পাথরের চেয়ে অনেক বেশি উত্তপ্ত ও যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু দুনিয়ার মানুষ তা স্পর্শ করলেও বিন্দুমাত্র গরম অনুভব করে না। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা কবরের ঐ মাটি ও পাথরকে মনোরম বাগ-বাগিচায় পরিণত করে দেন। এমনকি একই কবরের দু'ব্যক্তি সমাহিত হলেও একজনের জন্য সেই কবরটি জাহান্নামে পরিণত হতে পারে, আর এর উত্তাপ অন্যজনের অনুভূত হয় না। একইভাবে কবরে সমাহিত অপর ব্যক্তির জন্য জান্নাতের বাগ-বাগিচা ও অন্যান্য আরামদায়ক নিআমত ও সুখ অপর ব্যক্তির অনুভূত হয় না। বস্তুত মহান আল্লাহর কুদরত এর চেয়েও অধিক আশ্চর্যজনক ব্যাপার। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দুনিয়ায় তাঁর কুদরতের আশ্চর্যজনক নিদর্শন দেখিয়ে থাকেন। কিন্তু মানুষ তা বুঝতে বা উপলব্ধি করতে পারে না, সেগুলোকে তারা মিথ্যা সাব্যস্ত করে। কিন্তু যাদেরকে আল্লাহ সেসব বিষয়ে উপলব্ধি করার জ্ঞান ও শক্তি দিয়েছেন ও অসত্য থেকে রক্ষা করেছেন তাঁদের কথা অবশ্য স্বতন্ত্র।
অপরপক্ষে, কাফিরদের কবরে আগুনের দু'টি তক্তা বিছিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়। যার ফলে তাদের কবর তন্দুরের ন্যায় প্রজ্বলিত হয়ে উঠে। কাফিরদের এই অবস্থা আল্লাহ তাআলা তাঁর কোনো কোনো বান্দাকে অবহিত করে থাকেন যদিও অন্যদের কাছে তা অজ্ঞাত থেকে যায়। কবরের এ অবস্থা সবই যদি জানতে পারে তাহলে গায়েবের প্রতি মানুষের ঈমান কী করে ঠিক থাকবে? সেক্ষেত্রে মানুষ মৃতদেরকে কবরে দাফন করাই ছেড়ে দেবে। হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "আমার যদি এ আশঙ্কা না হতো যে তোমরা মৃতদের দাফন করা ছেড়ে দেবে, তাহলে আমি আল্লাহর কাছে দুআ করতাম, যেন আমার ন্যায় তোমাদেরকেও তিনি কবরের আযাব দেখিয়ে দেন ও শুনিয়ে দেন।" (বুখারী, মুসলিম) যেহেতু পশুদের মধ্যে এ রহস্য উপলব্ধি করার শক্তি নেই তাই এরা কবরের আযাব শুনতে পায় এবং বুঝতেও পারে। একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খচ্চর কবরবাসীর কবরের আযাব শুনে এমন লাফালাফি শুরু করে দিয়েছিলো মনে হচ্ছিলো যেন তাঁকে তার পিঠ থেকে ফেলে দেবে।
এই প্রসঙ্গে হযরত আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে উযায়ের হারানী (র) বলেন, "আমি 'আমদ' নামক স্থানে আসরের নামায পড়ে আমার ঘর থেকে বের হয়ে একটি বাগানের দিকে গেলাম এবং সূর্যাস্তের একটু আগে কয়েকটি কবরের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। আমি স্বচক্ষে দেখলাম একটি কবর কর্মকারের চুল্লীর মতো জ্বলজ্বল করছে। আর মৃত ব্যক্তি সেই কবরে সমাহিত আছে। আমি আমার চোখ ঘষতে লাগলাম এবং ভাবতে লাগলাম, আমি কি জেগে আছি নাকি ঘুমিয়ে আছি? তারপর শহরের পাঁচিল দেখে আমার সম্বিত ফিরে এলো। বিস্ময়-বিমূঢ় অবস্থায় বাড়িতে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে আসলাম। আমার সামনে খাবার দেয়া হলো কিন্তু আমি তা খেতে পারলাম না। পরে আমি শহরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, ঐ কবরে আজকেই একজন যালিম কর আদায়কারীকে দাফন করা হয়েছে।" কবরের আযাবের এরূপ অবস্থা আল্লাহ তাআলা কোনো কোনো সময় নেককার বান্দাদের দেখিয়ে থাকেন, যেমনি তিনি কোনো কোনো সময় জিন অথবা ফেরেশতাকে দেখিয়ে দেন।
হযরত শা'বী (রা) থেকে বর্ণিত: একবার জনৈক ব্যক্তি হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে আরজ করলো, "আমি বদরের মাঠ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আমি দেখতে পেলাম একজন মানুষ মাটির নিচ থেকে বের হয়ে আসছে এবং অপর এক ব্যক্তি তাকে হাতুড়ি দিয়ে প্রহার করছে। পিটুনি খেতে খেতে ঐ লোকটি আবার মাটির নিচে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার বের হয়ে আসছে, আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, "এই লোকটি হলো আবু জাহল, কিয়ামত পর্যন্ত তার উপর এই শাস্তি অব্যাহত থাকবে।" (ইবনে আবিদ দুনিয়া কর্তৃক লিখিত 'কিতাবুল কুনূর' গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত)
এই সম্পর্কে আরো একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো: হযরত সালিম ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর পিতা আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, হযরত আবদুল্লাহ (রা) বলেন, "একদা আমি আমার সওয়ারীতে চড়ে পবিত্র মক্কা থেকে মদীনার দিকে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে সফরের জিনিসপত্র বাঁধা ছিল। পথিমধ্যে একটি কবরস্থান অতিক্রম করার সময় দেখতে পেলাম এক ব্যক্তি তার কবর থেকে উঠে এলো, তার সারা দেহে আগুন জ্বলছিল। তার ঘাড়ে একটি শিকল বাঁধা ছিল। সে এটা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। আমাকে দেখে সে বললো, 'আবদুল্লাহ! আমার উপর পানি ছিটিয়ে দাও।' জানি না সে আমাকে চিনতো কি না, নাকি লোকাচার হিসেবে সে আমাকে 'আবদুল্লাহ' নাম ধরে ডাকছিল। এর মধ্যে অপর এক ব্যক্তি কবর থেকে বের হয়ে এসে বললো, 'হে আবদুল্লাহ! এর উপর পানি ছিটিও না।' তারপর সেই ব্যক্তি তার শিকল ধরে টেনে হিঁচড়ে তাকে কবরের ভেতর নিয়ে গেলো। তখন আমি সওয়ারীর উপর চেতনা হারিয়ে ফেললাম। আর সওয়ারীটি আমাকে বয়ে নিয়ে সেখান থেকে চলে এলো।" (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
হযরত উরওয়াহ (রা)-ও উপরে বর্ণিত ঘটনাটি কিঞ্চিৎ শব্দগত পার্থক্যসহ বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, "এই ভয়াবহ ঘটনাটির কারণে আমার মাথার চুল রাতারাতি সাদা হয়ে গিয়েছিল। আমি হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা)-কে এই ঘটনাটি জ্ঞাত করলে তিনি মুসলমানদেরকে ঐ পথে একাকী ভ্রমণ করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন।" (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
হযরত আবূ কুযাআ (রা) বলেন, "আমি একবার একটি পানির কূপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম যা বসরার রাস্তায় অবস্থিত ছিল। তখন সেখানে গাধার চিৎকারের ন্যায় একটি শব্দ শুনতে পেলাম। আমি তখন লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, এ গাধার আওয়াজ কোত্থেকে আসছে? এটা কিসের আওয়াজ? লোকেরা বললো, এক ব্যক্তি আমাদের নিকটেই বসবাস করতো। যখন তার মা তার সাথে কথা বলতেন তখন সে বলতো— তুমি গাধার মতো চেচাচ্ছ কেন? ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার কবর থেকে প্রত্যহ গাধার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে।" (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
হযরত আমর ইবনে দীনার (র) থেকে বর্ণিত: মদীনায় একজন লোক বাস করতেন। তাঁর বোনও মদীনার শহরতলীতে বাস করতো। তাঁর বোনটি অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তাকে দেখাশুনার জন্য প্রায়ই তাঁর বাড়িতে যেতেন। একদিন তাঁর সেই বোনটি মারা গেলে তাকে দাফন করা হলো। এরপর তাঁর মনে হলো ভুলবশত তাঁর কোনো একটি জিনিস কবরের মধ্যে রয়ে গিয়েছে। সুতরাং তিনি তাঁর এক বন্ধুকে সাথে করে কবর খুঁড়ে তাঁর পড়ে যাওয়া জিনিসটি উদ্ধার করলেন। এরপর তাঁর সাথীকে বললেন, "তুমি একটু সরে দাঁড়াও। আমি আমার বোনকে এক নজর ভালো করে দেখে নিই, সে কী অবস্থায় আছে।" তখন তিনি দেখতে পেলেন সেই কবরের ভেতর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তিনি তাড়াতাড়ি কবরটি ঠিক করে দিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। তাঁর মা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "বাবা, তোর বোনকে কী অবস্থায় দেখলি?" তিনি বললেন, "তার অবস্থা জিজ্ঞেস করবেন না। সে তো ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আপনি আমাকে বলুন তো সে কী কাজ করতো?" মা বললেন, "সে দেরীতে এবং বিনা ওযূতে নামায পড়তো, আর প্রতিবেশীর দরজায় গিয়ে চুপিসারে তাদের কথাবার্তা শুনতো।” (সূত্র: ইবনে আবিদ দুনিয়া)
মারশাদ ইবনে হাওশ কর্তৃক আরেকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো: তিনি একদিন ইউসুফ ইবনে উমরের নিকট বসা ছিলেন। তার নিকট আর একজন লোকও উপস্থিত ছিল যার একটি গাল ছিল লোহার পাতের মতো শক্ত। ইউসুফ লোকটিকে বললো, "মারসাদকেও তোমার স্বচক্ষে দেখা ঘটনাটি শোনাও।" লোকটি বললো, "আমি তখন নওজোয়ান ছিলাম, পাপকে ততোটা ভ্রূক্ষেপ করতাম না। একবার প্লেগ মহামারী দেখা দিলে আমি ইচ্ছা করলাম সীমান্তের ওপারে চলে যাব। তারপর ঠিক করলাম আমি কবর খনন করবো ও কাফন চুরি করবো। একদিন মাগরিব ও ইশার নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে আমি একটি কবর খনন করলাম এবং অন্য একটি কবরের মাটির সাথে হেলান দিয়ে বসলাম। এর মধ্যে একটি লাশ আনা হলো এবং একে খনন করা কবরে দাফন করা হলো। লোকজন চলে গেলে আমি দেখলাম উটের ন্যায় বিরাট আকৃতির দু'টি সাদা রঙের পাখি পশ্চিম দিক থেকে এসে একটি কবরের শিয়রের দিকে এবং অপরটি পায়ের দিকে নামলো আর উভয়ের কবরের মাটি সরালো। তারপর একটি পাখি কবরে প্রবেশ করলো আর অপরটি কবরের ধারে রইলো। আমি এই অবস্থায় ভয় পেলাম না।
আমি শুনতে পেলাম ঐ পাখি মৃত ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলছে— তুমি গেরুয়া রঙের পোশাক পরে গর্ব ও অহঙ্কার সহকারে কী তোমার শ্বশুরালয়ে যেতে না? মৃত ব্যক্তি বললো, আমি এখন খুবই দুর্বল। তারপর পাখিটি তাকে এমন আঘাত করলো, এতে তার কবর তেল ও পানিতে ভরে গেলো। এমনিভাবে পাখিটি তাকে তিনবার আঘাত করলো, আর প্রত্যেকবারই একই কথা বললো। প্রত্যেকবার কবরটি তেল ও পানিতে ভরে যেতো। পাখিটি এরপর মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ওহে, এখানে বসে আছো কেন? আল্লাহ তাআলা তাঁর রহমত থেকে তোমাকে দূরে রাখুন। এরপর পাখিটি আমার গালে তার পাখা দিয়ে এমন জোরে আঘাত করলো যে আমি মাটিতে পড়ে গেলাম এবং সারারাত সেখানেই সে অবস্থায় পড়ে রইলাম। ভোরবেলা দেখলাম কবরটি যেমন ছিল তেমনই আছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিও ঐসব তেল ও পানি মনে হয়েছিল আসলে তা ছিল জ্বলন্ত আগুন যেখানে মৃত ব্যক্তির দেহ জ্বলছিল।" এই প্রসঙ্গে এখানে একটি হাদীস উল্লেখ করা হলো: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জাল সম্পর্কে বলেছেন, "তার কাছে পানি ও আগুন থাকবে। ঐ আগুন হবে আসলে শীতল পানি, আর ঐ পানি হবে শিখা বিশিষ্ট আগুন।"
জনৈক অসৎ ব্যক্তি থেকে বর্ণিত: সে ছিল কাফন চোর। সে কবর খুলে কাফন চুরি করতো। তখন সে দেখতে পেতো কোনো কোনো মৃত ব্যক্তির মুখ কিবলার বিপরীত দিকে ঘুরানো। এই অবস্থা দেখে সে অনুতপ্ত ও ভীত হয়ে গেলো। এই ঘটনাটি হযরত আবু ইসহাক ফাযারী (র)-কে জানানো হলে তিনি চুপ রইলেন ও ইমাম আওযায়ী (র)-কে লিখিতভাবে জানালেন। উত্তরে ইমাম আওযায়ী (র) বললেন, "কাফন চোরের তওবা কবুল হবে যদি সে খালিস নিয়তে তওবা করে এবং আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চায়। আর যাদের মুখ কিবলার বিপরীত দিকে ঘুরানো ছিল তারা সুন্নাতের পরিপন্থী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিল। তাই তাদের এই অবস্থা।"
অন্য একজন কাফন চোর যে তওবা করেছিল, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "তোমার জীবনে দেখা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনাটা কী?" সে বললো, "একবার আমি একজন মৃত ব্যক্তির কবর খুলে দেখতে পেলাম তার সারা শরীরে পেরেক মারা রয়েছে। একটি বড় পেরেক ছিল তার মাথায় ও আরেকটি বড় পেরেক ছিল তার পায়ে।" আরো একজন কাফন চোরকে তার জীবনের আশ্চর্যজনক ঘটনা কী জিজ্ঞেস করা হলে সে বলেছিল, সে একজন মৃত ব্যক্তির কবরে তার মাথার খুলি সীসায় ভর্তি অবস্থায় দেখেছিল। অপর এক কাফন চোরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "তোমার তওবা করার কারণ কী?" সে বলেছিল, "কবর খুঁড়লে পর সাধারণত মৃতদের মুখ কিবলার উল্টো দিকে ঘুরানো অবস্থায় দেখা যেতো। এই অবস্থা দেখে আমি তওবা করে কাফন চুরি ছেড়ে দিয়েছিলাম।" (সূত্র: কিতাবুল কুনূর)
হযরত আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মাসসাব সালামী (র) একজন অতি নেককার ও সত্যবাদী লোক ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, একবার একজন লোক বাগদাদ নগরীর বাজারে জনৈক কর্মকারের নিকট দু'মাথা বিশিষ্ট ছোট ছোট কিছু পেরেক বিক্রয় করেছিল। ঐ কর্মকার পেরেকগুলোকে নরম করতে চাইলো কিন্তু আগুন ও হাতুড়ির পিটুনিতে সেগুলো নরম হলো না। সে খুবই ক্লান্ত ও শ্রান্ত হয়ে বসে রইলো। পরে ঐ কর্মকার পেরেক বিক্রেতাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, "এসব পেরেক তুমি কোথা থেকে সংগ্রহ করে এনেছ?" সে বললো, "এগুলো আমার নিকট ছিল।" অবশেষে পীড়াপীড়ি করায় সে বললো: "এসব পেরেক আমি একটি খোলা কবরের ভেতর পেয়েছি এবং এগুলোর সাথে মৃতের হাড়গোড় আটকানো ছিল। আমি পেরেকগুলোকে হাড়গোড় থেকে খুলে আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত পাথর দিয়ে মৃত ব্যক্তির হাড়গুলো ভেঙে এসব পেরেক বের করে এনেছি।" হযরত আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে মাসসাব সালামী (র) বলেন, "আমি এ পেরেকগুলো দেখেছি, সেগুলো দেখতে ছোট ও দু'মাথা বিশিষ্ট ছিল।"
হযরত আবুল হুরায়েশ (র) থেকে বর্ণিত: "আমার আম্মা আমাকে বলেছেন, খলীফা আবু জাফর যখন কুফা নগরীতে পরিখা খনন করালেন, তখন লোকেরা তাদের আত্মীয়-স্বজনের লাশ সেখান থেকে সরিয়ে নিল। আমি ঐ সব মৃতদের মধ্যে একজন নওজোয়ানকে দেখতে পেলাম, সে নিজের হাত কামড় দিয়ে আছে।"
হযরত সাম্মাক ইবনে হারব (র) কর্তৃক বর্ণিত: একদা হযরত আবু দারদা (রা) কবরস্থানের মাঝখান দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, "হে কবরবাসীরা! তোমাদের কবরের উপরের দিকে কতো শান্তি আর ভেতরে কতোই না অশান্তি বিরাজমান।"
কবরের আযাব সম্পর্কে হযরত সাবিতুল বানানী (র) থেকে বর্ণিত আছে, একদিন তিনি কবরস্থানের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর পেছন থেকে এক আওয়াজ আসলো। তিনি শুনতে পেলেন, "হে সাবিত! কবরস্থানের নীরবতায় ধোঁকা খেয়ো না। কারণ এদের মধ্যে অনেক দুঃখী ও হতভাগ্য লোক রয়েছে।" তিনি পেছনে ফিরে দেখলেন সেখানে কেউ নেই।
হযরত হাসান (রা) কোনো এক সময়ে এক কবরস্থান দিয়ে যাবার সময় বলেছিলেন, "এখানকার মৃতদের অবস্থা আল্লাহর অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। কারণ এদের অবস্থা বাহ্যিকভাবে নীরব ও নিথর, অথচ তাদের মধ্যে অনেকেই চরম অশান্তিতে আছে।"
খলীফা হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) মাসলামাহ ইবনে আবদুল মালিক (র)-কে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তোমার পিতাকে কে দাফন করেছিল?" তিনি উত্তর দিলেন, "একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাস।" তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "অলীদকে কে দাফন করেছিল?" মাসলামাহ ইবনে আবদুল মালিক বললেন, "আমার আর এক মুক্তিপ্রাপ্ত দাস।" হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) তখন বললেন, "এ বিষয়ে আমি যা জানতে পেরেছি, আমি তোমাকে তাই বলছি। যখন তোমার পিতাকে ও অলীদকে দাফন করা হয় আর তাদের কাফনের গিরা খোলা হয়, তখন তাদের মুখ উল্টোদিকে ঘুরানো ছিল। হে মাসলামাহ! শোন, আমার মৃত্যুর পর আমাকে কবরে রাখার পর তুমি আমার মুখ খুলে দেখবে তাদের মতো আমার মুখও কিবলার উল্টো দিকে ঘুরানো, নাকি আমাকে ওদের অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।" মাসলামাহ (র) বলেন, "আমি হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র)-এর লাশ কবরে রাখার পর তাঁর মুখ দেখেছিলাম, তা যেমনটি কিবলামুখী করে রাখা হয়েছিল, ঠিক তেমনি আছে।"
আগেকার দিনের জনৈক আলিম থেকে বর্ণিত আছে যে, তাঁর একটি মেয়ে মারা গেলে তিনি তার লাশকে কিবলামুখী করে নিজ হাতে কবরে রাখলেন। পরে সেই কবরের ইট ঠিক করতে গিয়ে দেখতে পেলেন যে লাশের মুখ কিবলার উল্টো দিকে ঘুরিয়ে রাখা হয়েছে। এই অবস্থা দেখে তিনি মনে বড় ব্যথা পেয়েছিলেন। এর কিছুদিন পর তিনি স্বপ্নে দেখলেন মেয়েটি তাঁকে বলছে— "আব্বাজান, আপনি আমার মুখ কিবলার উল্টো দিকে ফিরা অবস্থায় দেখে খুব ব্যথা পেয়েছিলেন। সাধারণত আমার আশেপাশের সকল লাশই কিবলা থেকে বিপরীতমুখী। এর কারণ হলো, যারা কবীরা গুনাহে লিপ্ত অবস্থায় মারা যায়, মৃত্যুর পর তাদের সাথে এরূপ ব্যবহারই করা হয়ে থাকে।"
হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) থেকে বর্ণিত: অলীদ ইবনে আবদুল মালিককে যাঁরা কবরে নামিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন। তিনি তাকে যে অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন, এতে তাঁর ছেলে বলেছিলেন, "কাবার রবের কসম, আমার পিতা এখন কবরের মধ্যে ভালো অবস্থায় আছেন।” হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) এই কথা শুনে বলেছিলেন, "কাবার রবের কসম! তোমার পিতার দুনিয়ার জীবনও সুখের এবং শান্তির ছিল।” এ ঘটনা থেকে হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি যখন ইয়াযীদ ইবনে মুহলাবকে ইরাকের শাসনকর্তা নিয়োগ করেছিলেন, তখন তাঁকে উপদেশস্বরূপ বলেছিলেন, "আল্লাহকে ভয় করে চলবে। তাহলে মৃত্যুর পর কবরে তুমি শান্তিতে থাকবে। এই প্রসঙ্গে তিনি মালিকের কথা উল্লেখ করেছিলেন, যাকে দাফনের পর ভালো অবস্থায় দেখা গিয়েছিল।"
হযরত আবদুল হামীদ (র) কর্তৃক বর্ণিত আছে, "আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর নিকট একদিন বসা ছিলাম। এমন সময় তাঁর নিকট কিছু লোক এসে জানালো— তাঁরা হজ্জে যাচ্ছিলেন, রাস্তায় 'যুল সাফফাহ' নামক স্থানে তাঁদের একজন সাথী মারা যান। তাঁরা তাঁর দাফনের জন্য কবর খনন করেন। যখন কবর তৈরি হলো তখন একটি কালো রঙের সাপ এসে কবরে ঢুকে পড়লো। এই অবস্থায় তাঁরা সেখান থেকে সরে অন্য জায়গায় আর একটি কবর খনন করেন। সেখানেও ঐ সাপটি চলে এলো। তাঁরা তৃতীয় জায়গায় আর একটি কবর খনন করলেন। সেখানেও সাপটি এসে হাজির হলো। এই অবস্থায় তাঁরা তখন কী করবেন? তাঁরা হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর শরণাপন্ন হলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, 'এটা তার চুরি করার পরিণাম। যাও, তাকে যে কোনো একটি কবরে রেখে দাও। আল্লাহর কসম, দুনিয়ার যে কোনো জায়গায় তার কবর খনন করা হোক না কেন, ঐ সাপটি সেখানে যাবেই।' অবশেষে তাঁরা ঐ লোকটিকে একটি কবরে দাফন করে দিলেন। হজ্জের শেষে তাঁরা তার সামান-পত্র তার বাড়িতে পৌঁছে দিলেন এবং তার বিধবা স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন— 'তোমার স্বামী কী কাজ করতো?' তার স্ত্রী বললো, 'সে খাদ্যশস্যের ব্যবসা করতো। খাদ্যশস্যের মধ্য থেকে পরিবারের জন্য প্রত্যেক দিনের প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য সরিয়ে নিতো এবং সে পরিমাণ অন্য কোনো জিনিস শস্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিতো'।"
হযরত আবু ইসহাক (র) থেকে বর্ণিত: তাঁকে এক মৃত ব্যক্তির গোসল দেয়ার জন্য ডাকা হলো। তিনি যখন মৃত ব্যক্তির মুখ থেকে চাদর সরালেন, তখন দেখতে পেলেন তার ঘাড়ে একটি বড় আকারের সাপ জড়িয়ে আছে। অবশেষে তিনি তাকে গোসল না দিয়েই চলে এলেন। লোকেরা তখন বলতেছিল— "ঐ ব্যক্তি নাকি মহান সাহাবাগণকে গালিগালাজ করতো।" তাই তার এই পরিণতি।
বসরাবাসী জনৈক কবর খননকারী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একদিন একটি কবর খুঁড়লেন এবং পরে ঐ কবরের নিকট ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্নে দেখলেন তাঁর নিকট দু'জন মহিলা আসলেন। তন্মধ্যে একজন মহিলা তাঁকে বললেন, "হে আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর ওয়াস্তে ঐ মহিলার লাশটি আমার নিকট থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও এবং তাকে আমার পাশে দাফন করো না।" হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ইতিমধ্যে এই কবরের নিকট একজন মহিলার জানাযা আনা হলো। তখন তিনি ঐ মহিলার লাশটিকে এ কবরে দাফন না করে অন্য কবরে দাফন করতে বললেন। রাত্রে স্বপ্নযোগে আবার সেই দুইজন মহিলা তাঁকে দেখা দিলেন। একজন মহিলা তাঁকে বললেন, "আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন, তুমি আমার নিকট থেকে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি সরিয়ে দিয়েছ।" তিনি বললেন, "এই মহিলা কেন আপনার মতো কোনো কথা বলছেন না?" তিনি বললেন, "এই মহিলা মৃত্যুর পূর্বে প্রয়োজনীয় কোনো অসিয়ত ও উপদেশ না দিয়েই মারা গিয়েছিলেন। এই জন্য তিনি কিয়ামত পর্যন্ত কোনো কথা বলতে পারবেন না।" (কবরের এই সব বিষয় সম্পর্কে যাঁরা জানতে আগ্রহী তাঁরা ইবনে আবিদ দুনিয়ার 'কিতাবুল মানামাত' এবং কাইরাওয়ানীর 'কিতাবুল বুস্তান' পাঠ করতে পারেন।)
আলমে বরযখের ঘটনাবলীর চেয়ে অধিক আশ্চর্যজনক ঘটনাবলী দুনিয়াতেও ঘটতে দেখা যায়। হাদীস শরীফ থেকে জানা যায় যে, হযরত জিবরাঈল (আ) মানুষের আকৃতি ধারণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে হাজির হতেন ও কথা বলতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাঈল (আ)-এর কথা শুনতে পেতেন। অথচ তাঁর আশেপাশের লোকজন তাঁকে দেখতে পেতেন না এবং তাঁর কথাও শুনতে পেতেন না। সকল আম্বিয়ায়ে কেরামের অবস্থা ছিল ঠিক এ রকম। কোনো কোনো সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ঘণ্টা ধ্বনির শব্দের মতো ওহী আসতো, যা তিনি ছাড়া আর কেউ শুনতে পেতেন না। যেমন জিনেরা আমাদের মধ্যে অবস্থান করে ও উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলে, কিন্তু আমরা তাদের কথাবার্তা শুনতে পাই না। কোনো কোনো সময় ফেরেশতারা কাফিরদেরকে চাবুক মেরেছেন সেজন্য তারা চিৎকারও করতো। মুসলমানেরা নিকটে থেকেও ফেরেশতাদেরকে দেখতে পেতেন না, তাঁদের কথাও শুনতে পেতেন না। আল্লাহ তাআলা মানুষের কাছ থেকে দুনিয়ার অনেক বিষয় লুকিয়ে রেখেছেন। হযরত জিবরাঈল (আ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পবিত্র কুরআন শিক্ষা দিতেন অথচ উপস্থিত লোকজন তা শুনতে পেতেন না। প্রকৃতপক্ষে যিনি আল্লাহর খাসবান্দা এবং তাঁর একচ্ছত্র কুদরতে বিশ্বাস করেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর অপার করুণায় ঐসব ঘটনাবলী যা সাধারণ মানুষ দেখতে বা বুঝতে পারে না তা তাঁকে অবহিত করেন। এটা কি কেউ অবিশ্বাস করতে পারে?
সাধারণ মানুষের দর্শন ও শ্রবণশক্তি কবরের আযাব বা আরাম প্রত্যক্ষ বা উপলব্ধি করতে পারে না। পক্ষান্তরে আল্লাহর খাস বান্দা কবরের ঐসব ঘটনাবলী বুঝতে পারেন ও শুনতে পারেন। কেউ কেউ কবরের ঐসব দৃশ্য দেখে চিৎকার করে বেহুঁশ হয়ে যান, এমনকি মৃত্যুবরণও করে থাকেন। এসব ঘটনাবলীকে রহস্যগত কারণে আল্লাহ পাক যে আমাদের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন তা আমাদেরকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে। বরযখী জীবনে যখন এই সব রহস্যের অবসান ঘটবে তখন সবকিছু আমরা সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাবো। এছাড়া একজন মানুষ কোনো মৃত ব্যক্তির চোখ থেকে পারদ বা বুক থেকে সরষে তুলে অতিসত্বর ঐগুলো স্বস্থানে রেখে দিতে পারে, তাহলে ফেরেশতারা তো এর চেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখেন। আল্লাহর কুদরত সর্বত্র বিরাজমান। তিনি যে কোনো মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা পুরস্কৃত করতে পারেন।
বরযখী জীবনের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করা সম্পর্কে কোনো অনুমান করা মূর্খতা ও গুমরাহী ছাড়া আর কিছু নয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আল্লাহর রাসূল এটাকে অস্বীকার করা, আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতাকে অস্বীকার করারই শামিল। মানুষ একটি কবরকে প্রশস্ত বা সংকীর্ণ রূপে তৈরি করে, একটি লাশ সেখানে আড়াল করে রাখতে পারে বা নাও রাখতে পারে। কিন্তু আল্লাহর কুদরতের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। একজন নেককার বান্দার ক্ষেত্রে একটি কবর দৃশ্যত দু'-আড়াই হাত গভীর দেখা গেলেও সেটা অনেক প্রশস্ত, সুগন্ধিযুক্ত ও আলোময় হতে পারে। শুধু তাই নয়, বদকার ব্যক্তিদের কবর অতিশয় সংকীর্ণ, দুর্গন্ধময় ও অন্ধকার হতে পারে। তবে কবরের এই রূপ অবস্থা জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি বা অনুভব করা সম্ভবপর নয়।
দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু বিদ্যমান, আল্লাহ তাআলা মানুষকে সেসব প্রত্যক্ষ করার শক্তি ও জ্ঞান দিয়েছেন। তবে আখিরাতের ঘটনাবলীর উপর পর্দা টেনে দিয়েছেন যাতে মানুষ ঐসব বিষয় না দেখেও বিশ্বাস করে সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারে। বান্দার রহস্যের এ পর্দা যখন তুলে নেয়া হয়, তখন তার রূহ সবকিছুই দেখতে পায়। অনুরূপভাবে মৃত ব্যক্তির লাশ মানুষের সামনে রাখা থাকলেও ফেরেশতারা এসে মৃত ব্যক্তিকে যেসব প্রশ্ন করেন, মৃত ব্যক্তি ফেরেশতাদের সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন। তবে জীবিত মানুষ ফেরেশতাদেরকে দেখতে পায় না ও তাদের কথাও শুনতে পায় না। সেই অবস্থায় একজন মৃত ব্যক্তি যে আযাব বা আরাম ভোগ করেন মানুষের পক্ষে তা জানা বা অনুভব করা সম্ভব নয়।
এখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, দুজন লোক একই বিছানায় শুয়ে থাকার পর একজন ঘুমিয়ে পড়ে অপরজন জেগে থাকে। অতঃপর ঘুমন্ত ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে যে তাকে প্রহার করা হচ্ছে, সে প্রহারের ব্যথাও অনুভব করছে; কিন্তু তার পাশে জাগ্রত ব্যক্তি ঐসবের কোনো কিছুই বুঝতে বা জানতে পারে না। এরূপ আঘাত ও কষ্টের চিহ্ন দেহের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়, যদিও রূহও সেই কষ্ট অনুভব করে। এটা কতোই না মূর্খতা ও মূঢ়তার বিষয় যে, কবরের পাথরের দেয়াল ভেদ করে মৃত ব্যক্তির কাছে ফেরেশতাদের উপস্থিতিকে এক শ্রেণীর লোক অযৌক্তিক ও অসম্ভব বলে মনে করে। অথচ আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের জন্য সবকিছু অতিসহজ করে দিয়েছেন— যেমন পাখিরা শূন্যে উড়ে বেড়ায়। তাই কোনো স্থূলবস্তু যে রূহের কোনো প্রতিবন্ধকতা বা বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এরূপ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এ ধরনের আকীদা পোষণ করা মহান রাসূলগণকে অস্বীকার করারই শামিল।
জড় পদার্থেও অনুভূতি ও সচেতনতা বিদ্যমান থাকে। ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলন্ত কোনো ব্যক্তি অথবা সমুদ্রে ডুবন্ত কোনো ব্যক্তি, আগুনে ভস্মীভূত কোনো দেহ অথবা অন্য যে কোনো ধরনের লাশের মধ্যে রূহকে ফিরিয়ে আনা আল্লাহ পাকের জন্য কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়। কেননা রূহকে দেহে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটি একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। এটা সে ধরনের কোনো জ্ঞান নয় যা মানুষ উপলব্ধি করতে পারে। একজন বেহুঁশ ব্যক্তি অথবা একজন মৃগী রোগী অথবা একজন অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তি যখন জীবিত থাকে তখন তার রূহ তার দেহের মধ্যেই থাকে। কিন্তু সেই অবস্থায় তার জীবনী শক্তির স্বাভাবিক অবস্থা কেউ অনুভব করতে পারে না। যেসব লাশের অংশগুলো পৃথক হয়ে বিচ্ছিন্ন ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তাদের চেতনা বা অনুভূতি সম্পর্কে আমরা কোনো কিছুই জ্ঞাত নই। মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষে মৃত ব্যক্তির নিশ্চিহ্ন অঙ্গগুলোর মধ্যে রূহকে ফিরিয়ে আনা মোটেই কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়। সেই মৃত ব্যক্তির কোনো অংশ যদি মাশরিকে আর কোনো অংশ মাগরিবে থাকে, তবুও ঐ অঙ্গগুলোর মধ্যে আযাব বা আরাম দেয়া আল্লাহর পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়।
আল্লাহ তাআলা জড়বস্তুর মধ্যেও অনুভূতি এবং সম্যক উপলব্ধি করার শক্তি দান করেছেন যা দ্বারা তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। আল্লাহর ভয়ে পাহাড়ের উপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ে, পাহাড় ও বৃক্ষরাজি তাঁকে সিজদাহ করে। পাথরের টুকরো, বৃক্ষরাজি এবং পানির বিন্দুরাশি তাঁর পবিত্রতা ঘোষণায় রত। তাই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এদের মধ্যে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। আর এ সৃষ্ট জগতে এমন কিছুই নেই যা তাঁর সপ্রশংসা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পারো না। নিশ্চয়ই তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ”। (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-৪৪)
আল্লাহর এই পবিত্রতা ঘোষণার অর্থ যদি এদের স্রষ্টার কেবল অস্তিত্বকে প্রমাণ করা বুঝায় তাহলে আল্লাহ তাআলা কখনো বলতেন না, "তোমরা তাসবীহ পাঠ ও মহিমা ঘোষণা অনুধাবন করতে পারো না।” কেননা প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তিই জানেন যে সৃষ্টি দ্বারা স্রষ্টাকে জানা যায়। প্রতিটি সৃষ্টিই পরোক্ষভাবে স্রষ্টার অস্তিত্বকেই প্রমাণ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, "আমি পর্বতমালাকে তার [দাউদ (আ)-এর] অনুগামী করে দিয়েছিলাম, তারা সকাল-সন্ধ্যায় তার সাথে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতো।” (সূরা সোয়াদ: আয়াত-১৮) প্রকাশ থাকে যে, আপন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে পরোক্ষভাবে প্রমাণ করাই কেবল উক্ত দু'টি সময়ের অর্থাৎ সকাল-সন্ধ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, "হে পর্বতমালা, তোমরা দাউদের সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা করো এবং হে পক্ষীসকল, তোমরাও। আমি তার জন্য লৌহকে নরম করে দিয়েছিলাম।” (সূরা সাবা: আয়াত-১০)
উল্লেখ্য যে, স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রতি পরোক্ষভাবে সম্মান প্রদর্শন বা তাসবীহ পাঠ হযরত দাউদ (আ)-এর কোনো নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ ব্যাপার ছিল না। ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী যে বলে— আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা ধ্বনি প্রতিধ্বনির সাথে সংশ্লিষ্ট। কেননা যে কোনো শব্দেরই প্রতিধ্বনি হয়ে থাকে। কাজেই হযরত দাউদ (আ)-এর সাথে এ বিষয়ে সম্পর্কিত করার মধ্যে কোনো নতুন কিছু নেই। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, "আপনি কি দেখেন না, সবই আল্লাহকে সিজদাহ করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে ও পৃথিবীতে— সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পর্বতমালা, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং মানুষের মধ্যে অনেকে। আবার অনেকের উপর অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে লাঞ্ছিত করেন তাকে কেউ সম্মান দিতে পারে না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন।" (সূরা হজ্জ: আয়াত-১৮) আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, "আপনি কি দেখেন না যে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যারা আছে তারা এবং উড়ন্ত পক্ষীসকল তাদের পাখা বিস্তার করত আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এছাড়া প্রত্যেকেই তার যথার্থ ইবাদত এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার নিয়ম কানুন জ্ঞাত আছে। তারা যা করে, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।" (সূরা আন-নূর: আয়াত-৪১)
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা জানা গেলো যে এই সালাত ও তাসবিহর গূঢ় রহস্য একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন, যদিও এই বিষয়টি মূর্খেরা অথবা নবীদের উপর মিথ্যা আরোপকারীরা অস্বীকার করে। আল্লাহ তাআলা পাথর সম্পর্কে বলেছেন যে কোনো কোনো পাথরও আল্লাহর ভয়ে নিজ স্থান থেকে গড়িয়ে পড়ে। তাই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "এ ঘটনার পরে তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। তা পাথরের মতো বা তদপেক্ষাও কঠিন। পাথরের মধ্যে এমনও আছে যা থেকে ঝরণা প্রবাহিত হয়, এমনও আছে যা বিদীর্ণ হয় অতঃপর সেটা থেকে পানি নির্গত হয় এবং এমনও আছে যা আল্লাহর ভয়ে খসে পড়তে থাকে। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।” (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-৭৪)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন যে, যমীন ও আসমান তাঁর (আল্লাহর) কথা শুনে ও মানে। আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে কথা বলেছেন এবং তারাও আল্লাহর কথা শুনেছে ও তার সঠিক উত্তর দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে, "অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ, অতঃপর তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে আসো, ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বললো আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম। অতঃপর তিনি আকাশরাজিকে দু'দিনে সাত আকাশ করে দিলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তাঁর আদেশ প্রেরণ করলেন। আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।” (সূরা হামীম সিজদা: আয়াত-১১, ১২)
কোনো কোনো সাহাবী খানা খাওয়ার সময় খাবারের তাসবীহ পাঠ শুনতে পেতেন। তাঁরা মসজিদে শুকনো কাষ্ঠখণ্ডের ক্রন্দনও শুনতে পেয়েছিলেন। সুতরাং যখন এসব জড়বস্তুর মধ্যেও চেতনা ও অনুভূতি থাকে, তাহলে যেসব দেহের মধ্যে এককালে দীর্ঘদিন পর্যন্ত রূহ বিদ্যমান ছিল, সেগুলোর মধ্যে আরো বেশি চেতনা বা অনুভূতি ফিরে আসা তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আল্লাহ তাআলা এ দুনিয়ায় রূহকে সে সমস্ত দেহের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন, যে সমস্ত দেহ থেকে তাদেরকে সাময়িকভাবে কবজ করা হয়েছিল। ঐ সমস্ত দেহ জীবিত হয়ে চলাফিরা করেছে, পানাহার করেছে, বিয়ে-শাদী করেছে এবং তারা সন্তানাদি জন্ম দিয়েছে আর মানুষ তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষও করেছে। যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের বাড়ি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল? অথচ তাঁরা ছিল সংখ্যায় হাজার হাজার। তারপর আল্লাহ তাদেরকে বললেন, মরে যাও। তারপর আবার তাদেরকে জীবিত করে দিলেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের উপর অনুগ্রহকারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক শুকরিয়া আদায় করে না।” (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২৪৩)
"আপনি কি সে লোককে দেখেননি যে এমন এক জনপদ দিয়ে যাচ্ছিল যার ঘর বাড়ি সব ভেঙে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সে বললো, কেমন করে আল্লাহ মরণের পর একে জীবিত করবেন? অতঃপর আল্লাহ তাকে মৃত অবস্থায় রাখলেন একশ বছর। তারপর তাকে উঠালেন এবং বললেন, কতোকাল তুমি এভাবে ছিলে? সে বললো, আমি ছিলাম একদিন কিংবা একদিনের কিছু কম সময়। আল্লাহ তাআলা বললেন, তা নয় বরং তুমি তো একশ বছর অবস্থান করেছ। এবার তুমি চেয়ে দেখো নিজের খাবার ও পানীয়ের দিকে— সেগুলো পচে যায়নি এবং দেখো নিজের গাধাটির দিকে। আর আমি তোমাকে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চেয়েছি। আর হাড়গুলোর দিকে চেয়ে দেখো যে আমি এগুলো কেমন করে জুড়ে দেই এবং গোশত দ্বারা ঢেকে দেই। অতঃপর যখন তার নিকট এ অবস্থা প্রকাশিত হলো, তখন সে বলে উঠলো— আমি জানি নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশীল।” (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-২৫৯)
এই প্রসঙ্গে বনী ইসরাঈলের ঐ নিহত ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যাকে আল্লাহ তাআলা পুনরায় জীবিত করেছিলেন এবং সে তার হত্যাকারীর নাম বলে দেয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আবার মৃত্যুবরণ করেছিল। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "যখন তোমরা একজনকে হত্যা করে পরে সে সম্পর্কে একে অপরকে অভিযুক্ত করছিলে, যা তোমরা গোপন করছিলে তা প্রকাশ করে দেয়াই ছিল আল্লাহর অভিপ্রায়। অতঃপর আল্লাহ মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন এবং তোমাদেরকে তার নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করেন যাতে তোমরা চিন্তা করো।” (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-৭২-৭৩) ঐসব লোকের কথাও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যারা হযরত মূসা (আ)-কে বলেছিল, "আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যে না দেখা পর্যন্ত কখনো তাঁকে বিশ্বাস করবো না। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদের মৃত্যু দান করেছিলেন এবং আবার তাদের জীবিত করেছিলেন।" এ ঘটনাটি পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে। "আর যখন তোমরা বললে— হে মূসা, কস্মিনকালেও আমরা তোমাকে বিশ্বাস করবো না যতোক্ষণ না আমরা আল্লাহকে দেখতে পাবো। বস্তুত তোমাদেরকে পাকড়াও করলো বিদ্যুৎ। আর তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে। মৃত্যুর পর তোমাদেরকে পুনরায় জীবিত করলাম যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।” (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-৫৫-৫৬)
এ প্রসঙ্গে আসহাবে কাহাফের ঘটনাও এখানে উল্লেখ করা হলো। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দীর্ঘদিন ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে পুনরায় জীবিত করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন, "আপনি কি মনে করেন যে গুহা ও গর্তের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল? যখন যুবকরা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে তখন তারা দুআ করে— হে পালনকর্তা, আমাদেরকে আপনার কাছ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজ সঠিকভাবে পূর্ণ করুন। তারপর আমি কয়েক বছরের জন্য গুহায় তাদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম। অতঃপর আমি তাদেরকে পুনরায় জীবিত করি, একথা জানার জন্য যে দু'দলের মধ্যে কোন দল তাদের অবস্থানকাল পরিপূর্ণভাবে নির্ণয় করতে পারে। আপনার কাছে তাদের ইতিবৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক, তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি তাদের মন দৃঢ় করেছিলাম যখন তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। তখন তারা বললো— আমাদের পালনকর্তা আসমান ও যমীনের পালনকর্তা, আমরা কখনো তাঁর পরিবর্তে অন্য কোনো উপাস্যকে আহ্বান করবো না, যদি করি তা হবে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এরা আমাদের স্বজাতি, এরা তাঁর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে। তারা এদের সম্পর্কে প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তার চেয়ে অধিক যালিম আর কে? তোমরা যখন তাদের থেকে পৃথক হলে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাদের থেকে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করো। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্য দয়া প্রদর্শন করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ-কর্মকে ফলপ্রসূ করবার ব্যবস্থা করবেন। আপনি সূর্যকে দেখবেন যখন উদিত হয় তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায় তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়, অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত। এটা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলীর অন্যতম। আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান সেই সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন আপনি কখনো তার জন্য কোনো পথপ্রদর্শনকারী বা সাহায্যকারী পাবেন না। আপনি মনে করবেন তারা জাগ্রত অথচ তারা ছিল নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডানদিকে ও বামদিকে। তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দু'টো গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতেন তবে পেছন ফেরে পলায়ন করতেন এবং তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। আমি এমনিভাবে তাদেরকে জাগ্রত করলাম যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বললো— তোমরা কতোকাল অবস্থান করেছ? তাদের কেউ বললো— একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি। কেউ কেউ বললো— তোমাদের পালনকর্তাই বলতে পারবেন তোমরা কতোকাল অবস্থান করেছ। এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ শহরে প্রেরণ করো, সে যেন দেখে কোন্ খাদ্য উত্তম। অতঃপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন সতর্কতার সাথে কাজ করে ও কিছুতেই যেন তোমাদের খবর কাউকে না জানায়। আর যদি তারা তোমাদের খবর জানতে পারে তবে পাথর মেরে তোমাদেরকে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। তাহলে তোমরা কখনো সাফল্য লাভ করবে না। এমনিভাবে আমি তাদের খবর মানুষের কাছে প্রকাশ করে দিলাম যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কিয়ামতে কোনো সন্দেহ নেই। যখন তারা নিজেদের কর্তব্য বিষয়ে পরস্পর বিতর্ক করছিল, তখন অনেকে বললো— তাদের উপর সৌধ নির্মাণ করো। তাদের পালনকর্তা তাদের বিষয়ে ভালো জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হলো তারা বললো— আমরা অবশ্যই তাদের পার্শ্বে মসজিদ তৈরি করবো।” (সূরা কাহাফ: আয়াত-৯-২১)
হযরত ইবরাহীম (আ) ও তাঁর চারটি পাখির ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, "যখন হযরত ইবরাহীম (আ) বললেন— হে আমার পালনকর্তা, আমাকে দেখান কেমন করে আপনি মৃতকে জীবিত করবেন। তিনি বললেন— তুমি কি বিশ্বাস করো না? হযরত ইবরাহীম (আ) বললেন— অবশ্যই বিশ্বাস করি, কিন্তু আমি এজন্য দেখতে চাইছি যাতে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করতে পারি। তিনি বললেন— তাহলে চারটি পাখি ধরে আনো। পরে সেগুলোকে নিজের পোষ মানিয়ে নাও, অতঃপর সেগুলোর দেহের একেকটি অংশ বিভিন্ন পাহাড়ের উপর রেখে দাও তারপর সেগুলোকে ডাকো, তোমার নিকট এরা দৌড়ে চলে আসবে। আর জেনে রেখো নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, অতি জ্ঞানী।” (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত-২৬০)
উপরে বর্ণিত মৃত্যুর ঘটনাবলী থেকে জানা যায় যে যখন আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জীবজন্তুর মধ্যে পুনরায় পূর্ণ জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তখন তাঁর বিস্ময়কর কুদরতের কাছে এটা অসম্ভব নয় যে মৃত্যুর পর মানুষের মধ্যে এক ধরনের জীবন দান করবেন এবং তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। অতঃপর তাদের আমল অনুযায়ী তাদেরকে কোনো না কোনোভাবে শাস্তি অথবা পুরস্কার প্রদান করবেন। এটা আল্লাহর কাছে কঠিন কিছু নয়। আল্লাহর কুদরত কাফির ও মিথ্যাবাদী ছাড়া অন্য কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
কবরের আযাব ও আরাম বলতে বরযখী জীবনের আযাব ও আরামকে বুঝায়। বরযখ হচ্ছে দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী সময়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, "তাদের সামনে পর্দা থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।" (সূরা আল-মু'মিনূন: আয়াত-১০০) দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী সময় বা অবস্থার নাম হলো বরযখ। সাধারণ অবস্থার প্রেক্ষাপটে এটাকে কবরের আযাব বা আরাম এবং জান্নাতের বাগান বা দোযখের গর্ত বলা হয়ে থাকে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলন্ত ব্যক্তি, আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ব্যক্তি, পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তি এবং হিংস্র পশু বা পাখি কর্তৃক ভক্ষণ করা মানুষকেও তার আমল অনুযায়ী বরযখের আযাব বা আরাম প্রদান করা হয়ে থাকে। তবে আযাব বা আরামের কার্যকারণ এবং এর অবস্থান বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।
প্রাচীনকালে কোনো এক ব্যক্তি ধারণা করেছিল যদি তার লাশ পুড়িয়ে ভস্মে পরিণত করে তার কিছু অংশ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া হয় এবং কিছু অংশ প্রবল বাতাসে উড়িয়ে দেয়া হয়, তাহলে আযাব থেকে সে বেঁচে যাবে। সুতরাং সে ব্যক্তি তার ছেলেদের এরূপ অসিয়ত করে গেলো এবং মৃত্যুর পর ছেলেরা তার সে ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করলো। তারপর আল্লাহ তাআলার হুকুমে সমুদ্র ও ভূভাগ ঐ ব্যক্তির দেহের যাবতীয় বিক্ষিপ্ত অংশ একত্রিত করে দিল এবং আল্লাহ পাক তাকে দাঁড়াবার আদেশ করলেন। সে তখন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে গেলো। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন— তুমি এরকম করলে কেন? সে উত্তর দিল— হে রব! আপনি তো ভালো করেই জানেন আমি আপনার ভয়েই এরকম করেছিলাম। অবশেষে আল্লাহ তার প্রতি রহম করলেন। তাহলে দেখা গেলো বিক্ষিপ্ত এবং বাহ্যিক নাম-নিশানা বিহীন দেহের অণু-পরমাণুর উপরও বরযখের আযাব বা আরাম হয়ে থাকে। যদি কোনো পাপী ব্যক্তির লাশকে শূন্যে গাছের সাথে ঝুলিয়ে দেয়া হয়, তাহলেও সে তার আমল অনুযায়ী বরযখের আযাব ভোগ করবে। আর যদি কোনো নেককার ব্যক্তির লাশকে অগ্নিকুণ্ডে ফেলে দেয়া হয়, তাহলে সে তার আমল অনুযায়ী বরযখে শান্তি লাভ করবে। আল্লাহ তাআলা তার জন্য আগুনকে শীতল ও শান্তিময় করে দেন। আর পাপী ব্যক্তির জন্য আগুনকে অতিশয় উষ্ণ ও যন্ত্রণাদায়ক করে দেন। দুনিয়ার যাবতীয় পদার্থ ও উপাদান তাদের স্রষ্টার আজ্ঞাধীন। তারা কখনো আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতা করে না, বরং আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী সে সবের ব্যবহার করেন। আর কেউ যদি একথা না মানে তবে সেটা হবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রাবুবিয়াতকে অস্বীকার করারই শামিল।
আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য মৃত্যুর পর দু'টো জীবন নির্ধারণ করে রেখেছেন, যেখানে সৎকর্মের প্রতিদান ও অসৎকর্মের শাস্তি প্রদান করা হয়। বরযখের প্রথম জীবন শুরু হয় যখন মানুষের রূহ দেহ থেকে পৃথক হয়ে আযাব বা আরাম ভোগ করতে শুরু করে। আরেক জীবন শুরু হবে যখন রোয কিয়ামতে মানুষ আল্লাহর নির্দেশে তাদের কবর থেকে উঠে আসবে এবং হিসাব-নিকাশের পর জান্নাতে বা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তাই একটি সহীহ হাদীসে উল্লেখ আছে, "ঈমানের এটাও একটি অংশ যে মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে তোমরা দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে।” কেননা প্রথম বরযখী জীবনকে তো কেউই অস্বীকার করতে পারে না, যদিও কেউ কেউ এর মধ্যে প্রতিদান, শাস্তি এবং আযাব বা আরামকে বিশ্বাস করে না। আল্লাহ তাআলা মৃত্যু ও মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের বর্ণনা সূরা আল-মু'মিনুন, সূরা ওয়াকিয়াহ, সূরা কিয়ামাহ, সূরা মুতাফফিফীন আর সূরা ফজরে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা অতিশয় বিচক্ষণ ও সুবিচারক। তাই তিনি নেককার ও বদকারদের পৃথক পৃথক আবাসস্থল তৈরি করে রেখেছেন। সেখানে তারা রোয হাশরের বিচারের পর প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "এরপর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে, আর কিয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে।” (সূরা আল-মুমিনূন: আয়াত-১৫-১৬) পবিত্র কুরআনে আরো উল্লেখ আছে, "তারা বলতো— আমরা যখন মরে অস্থি ও মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাবো, তখনও কি পুনরুত্থিত হবো আমাদের পূর্ব পুরুষগণসহ? বলুন— পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণ সকলেই একত্রিত হবে এক নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ে।” (সূরা ওয়াকিয়াহ: আয়াত-৪৭-৫০) "যখন কিয়ামতের ঘটনা ঘটবে যার বাস্তবতা সম্পর্কে কোনো সংশয় নেই; এটা কাউকে করবে নিচু, কাউকে করবে সমুন্নত।” (সূরা ওয়াকিয়াহ: আয়াত-১-৩) "আমি তোমাদের মৃত্যুকাল নির্ধারণ করেছি এবং আমি অক্ষম নই এ ব্যাপারে যে তোমাদের মতো লোককে নিয়ে আসি এবং তোমাদেরকে এমন করে দেই যা তোমরা জানো না। তোমরা অবগত হয়েছ প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে, তবে তোমরা অনুধাবন করো না কেন? (সূরা ওয়াকিয়াহ: আয়াত-৬০-৬২)
কিয়ামত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: "আমি শপথ করি কিয়ামত দিবসের, আরও শপথ করি সেই মনের যে নিজেকে ধিক্কার দেয়— মানুষ কি মনে করে যে আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করবো না? পরন্তু আমি তার অংগুলিগুলো পর্যন্ত সঠিকভাবে সন্নিবেশিত করতে সক্ষম। বরং মানুষ তার ভবিষ্যৎ জীবনেও ধৃষ্টতা দেখাতে চায়। সে প্রশ্ন করে— কিয়ামত দিবস কবে? যখন দৃষ্টি চমকে যাবে, চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে যাবে এবং সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে। সেদিন মানুষ বলবে— পলায়নের জায়গা কোথায়? না, কোথাও আশ্রয়স্থল নেই। আপনার পালনকর্তার কাছেই সেদিন ঠাঁই হবে।" (সূরা আল-কিয়ামাহ: আয়াত ১-১২) "তারা কি চিন্তা করে না যে তারা পুনরুত্থিত হবে সেই মহাদিবসে? যেদিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্বপালনকর্তার সামনে। এটা কিছুইতেই উচিত নয়; নিশ্চয় পাপীদের আমলনামা সিজ্জীনে আছে। আপনি কি জানেন সিজ্জীন কী? এটা একটি লিপিবদ্ধ কিতাব।” (সূরা মুতাফফিফীন: আয়াত ৪-৯) "নিশ্চয় সৎলোকদের আমলনামা আছে ইল্লিয়্যীনে। আপনি কি জানেন ইল্লিয়্যীন কী? এটাও একটি সুলিখিত কিতাব।" (সূরা মুতাফফিফীন: আয়াত ১৮-২০)
"কখনো নয় পৃথিবীকে যখন ক্রমাগত ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে বালুকাময় বানিয়ে দেয়া হবে এবং আপনার পালনকর্তা আত্মপ্রকাশ করবেন এমতাবস্থায় ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হবে ও জাহান্নামকে সেদিন সর্বসমক্ষে উপস্থিত করা হবে। সেদিন মানুষ চেতনা লাভ করবে কিন্তু তখন তার বোধ শক্তি জাগ্রত হওয়ায় কী লাভ হবে? সে বলবে— হায়, আমি যদি এই জীবনের জন্য অগ্রিম কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতাম! সেদিনের শাস্তির মতো শাস্তি কেউ দেবে না এবং তার বন্ধনের মতো বন্ধন কেউ দেবে না। হে প্রশান্ত চিত্ত, তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।" (সূরা আল-ফজর: আয়াত ২১-৩০)
"আর আমি মালিক ইহকালের ও পরকালের। তাই আমি তোমাদেরকে প্রজ্বলিত অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি। নিতান্ত হতভাগ্য ব্যক্তিই এতে প্রবেশ করবে যে মিথ্যা আরোপ করে ও সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এ পথ থেকে দূরে রাখা হবে খোদাভীরু ব্যক্তিকে যে আত্মশুদ্ধির জন্য তার ধন-সম্পদ দান করে এবং তার উপর কারো কোনো প্রতিদানযোগ্য অনুগ্রহ থাকে না আর মহান পালনকর্তার সন্তুষ্টি অন্বেষণ ব্যতীত। সে সত্বরই সন্তুষ্টি লাভ করবে।” (সূরা আল-লাইল: আয়াত ১৩-২১) "আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতর অবয়বে, অতঃপর তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি নিচ থেকে নিচে। কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম করেছে তাদের রয়েছে অশেষ পুরস্কার। অতঃপর কেন তুমি অবিশ্বাস করছো কিয়ামতকে? আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বিচারক নন?” (সূরা ত্বীন: আয়াত ৪-৮)
"আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে থেকে যেসব লোক কুফুরী করেছে তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারাই সৃষ্টির সেরা। তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান চিরকাল বসবাসের জন্য জান্নাত, যার তলদেশে নির্ঝরণী প্রবাহিত। তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এসব কিছু তার জন্য যে তার পালনকর্তাকে ভয় করে।” (সূরা বায়্যিনাহ: আয়াত ৬-৮) "পৃথিবী যখন তার কম্পনে প্রকম্পিত হবে, যখন সে তার বোঝা বের করে দেবে এবং মানুষ বলবে— এর কী হলো? সেদিন সে তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে কারণ আপনার পালনকর্তা তাকে আদেশ করবেন। সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে প্রকাশ পাবে যাতে তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানো হয়। অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।” (সূরা যিলযাল: আয়াত ১-৯)
"সে কি জানে না যখন কবরে যা আছে তা উত্থিত হবে, অন্তরে যা আছে তা প্রকাশ করা হবে? সেদিন তাদের কী হবে সে সম্পর্কে তাদের পালনকর্তা সবিশেষ জ্ঞাত।" (সূরা আদিয়াত: আয়াত ৯-১১) "যেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো এবং পর্বতমালা হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো। অতএব যার পাল্লা ভারী হবে সে সুখী জীবন যাপন করবে আর যার পাল্লা হালকা হবে তার স্থান হবে হাবিয়ায়। আপনি কি জানেন তা কী? তা প্রজ্বলিত অগ্নি।” (সূরা আল-কারিয়াহ: আয়াত ৪-১১)
আল্লাহর বিচক্ষণতা ও সুবিচারের শর্ত এই যে তিনি সৎকর্মশীল ও অসৎকর্মশীলদেরকে তাদের কর্মের প্রতিদানের জন্য দু'টি গৃহ তৈরি করেছেন। কিন্তু তাদেরকে পুরোপুরি প্রতিফল মৃত্যুর পরবর্তী পুনরুত্থানের পর হাশর ময়দানে প্রদান করা হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন: "প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ প্রতিদান প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোযখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোনো জিনিস নয়।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৮৫)
আল্লাহ তাআলার সুবিচার, আসমায়ে হুসনা আর পবিত্র কামালিয়াতের এটাই চাহিদা যে তিনি তাঁর বন্ধুদের দেহ ও রূহকে শান্তিতে রাখবেন; আর দুশমনদের দেহ ও রূহকে শাস্তি প্রদান করবেন। এ কারণেই আল্লাহর অনুগতদের দেহ ও রূহকে যথাযোগ্য নিআমত ও আরাম দেওয়া হয়, আর অবাধ্যদের দেহ ও রূহকে যথাযোগ্য শাস্তি ও কষ্ট দেওয়া হয়। যেহেতু দুনিয়া কর্মক্ষেত্র ও পরীক্ষাস্থল, প্রতিদানের স্থল নয়, তাই এখানে প্রতিদানের ফল প্রকাশিত হয় না। অবশ্য বরযখ হচ্ছে নেক আমলের প্রতিদান ভোগ করার প্রথম আবাসস্থল। তবে প্রাথমিক আবাসস্থল হিসেবে সেখানে নেক আমলের প্রতিদান ও বদ আমলের প্রতিফল প্রকাশ পায়। বরযখী জীবনে মানুষের এটাই কাম্য। তবে কিয়ামতের দিন যার যেটা প্রাপ্য তা পুরোপুরি প্রদান করা হবে। উপরের আলোচনা থেকে এটা বুঝা গেলো যে বরযখের আযাব বা আরাম প্রমাণিত। যেমন একটি হাদীসে আছে— নেককার কবরবাসীর জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় আর তাঁর কাছে বেহেশতের আরাম ও নিআমত পৌঁছতে থাকে। আর বদকার কবরবাসীদের জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং এর উত্তাপ ও অশান্তি সে ভোগ করে। ঐসব ব্যাপার মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও উপলব্ধির সীমা-পরিসীমার বাইরে। তবুও বিশেষ বিশেষ নেককার বান্দা সে সম্পর্কে অবহিত হন যদিও এর সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করতে তাঁরা অক্ষম।
কোনো জিনিসের অস্তিত্ব সেটার ব্যাখ্যা বা উপলব্ধির উপর নির্ভর করে না। আসলে মানুষ প্রকৃত জ্ঞানের অভাবে এর সঠিক তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে না। মৃত্যুর পর বরযখ জীবনের প্রতিক্রিয়া দ্রুত প্রকাশ পায়। দুনিয়া, বরযখী ও আখিরাতের অবস্থাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর হিকমতের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল করে রেখেছেন।